নিয়তির খেলা  শেষ পর্ব

0
949

নিয়তির খেলা
শেষ পর্ব

বিকেলের দিকে বাসার কাজের মেয়ে ফোন দিয়ে বলল নিনিতার অবস্থা বেশি ভাল না।ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

খবরটা শুনে আমি অফিস থেকে ছুটে চলে গেলাম হাসপাতালে।ডাক্তারদের সাথে কথা বললাম।

ডাক্তার বলল নিনিতার অবস্থা আশঙ্কাজনক।এই মূহুর্তে কিছুই বলা যাচ্ছে না।আপনারা সবাই রোগীর জন্য দোয়া করেন।আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি ওনাকে সুস্থ করে তোলার জন্য,,,,,

এর মধ্যে নিনিতার মা-বাবাও এসে পরেছে।নিনিতার এই অবস্থার কথা শুনে ওনারা মানসিক ভাবে খুব ভেঙে পরেছেন।

রাত দশটার দিকে ডাক্তার এসে জানালো আপনাদের কন্যা সন্তান হয়েছে।আর নিনিতার জ্ঞান এখনো ফিরেনি জ্ঞান ফিরলে আপনাদের জানানো হবে।

কন্যা সন্তানের পিতা হয়েছি এই কথাটা শুনার পর মনের মধ্যে একটা অন্যরকম অনুভূতি হল।একবারের জন্যও মনে হয়নি এটা তো আমার সন্তান না,এই সন্তানের পিতা আমি না।

এদিকে নিনিতার জন্য খুব টেনশন হচ্ছে।ওর এখনো জ্ঞান ফিরছে না কেন।আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানাচ্ছি আল্লাহ্ তুমি আমার নিনিতাকে সুস্থ করে দেও।

এর মধ্যে নার্স এসে বলে গেল আপনারা চাইলে আমাদের বাচ্চাকে দেখতে পারেন।নিনিতার মা- বাবাকে বললাম চলেন আমরা বাচ্চাকে দেখি আসি।কিন্তু ওনারা এই বাচ্চাকে দেখতে যেতে আগ্রহী না।আমি ওনাদের কে বললাম,,,

আমার কাছে তো একবারের জন্যও মনে হচ্ছে না এটা আমার মেয়ে না।আমার কাছে মনে হচ্ছে এটা আমাদেরই মেয়ে।তাহলে আপনারা কেন আমার মেয়েকে দেখবেন না।আমার কথা শুনে নিনিতার বাবা-মা কেঁদে দিলেন।তারপর ওনাদের নিয়েই আমি আমার মেয়েকে দেখতে গেলাম।

আমাদের মেয়েটা দেখতে একদম ওর মায়ের মত হয়েছে।প্রথমে আমি কোলে নিলাম তারপর নিনিতার বাবা- মাও কোলে নিলেন।

অবশেষে সকাল দশটায় নিনিতার জ্ঞান ফিরলো।জ্ঞান ফিরার পর থেকেই আমাদের কে দেখতে চাচ্ছে।আমি আমাদের মেয়েকে কোলে নিয়ে নিনিতার সাথে দেখা দেখা করতে গেলাম। নিনিতাকে দেখে মনে হচ্ছে ও আমার কোলে বাচ্চা দেখে একটু এবাকই হয়েছে।আমি ওর কাছে গিয়ে বললাম দেখেন আমাদের মেয়ে দেখতে ঠিক আপনার মতোই হয়েছে,,,,,,,,

নিনিতা এখন আগের থেকে অনেকটা সুস্থ হওয়ার ডাক্তার হাসপাতাল থেকে বাসায় চলে আসার অনুমতি দিয়েছেন।বাসায় আসার পর এখন নিনিতা অনেকটাই সুস্থ আর এদিকে আমরা আমাদের মেয়ের একটা নাম ঠিক করলাম।নিনিতার পছেন্দেই মেয়ের নাম রাখা হয়েছে প্রিতি।এই নামটা আমারও খুব পছন্দ হয়েছে।

আমাদের মেয়ে একটু একটু করে বড় হচ্ছে আর মেয়ের প্রতি আমার টান টা একটু একটু করে বেড়েই যাচ্ছে।এখন আমি প্রায়ই অফিস ফাঁকি দেই আমার মেয়ের জন্য।ওর সাথে সময় কাটাতে আমার খুব ভালো লাগে।

আর এদিকে নিনিতার সাথে আমার সম্পর্কটা আর দশটা সম্পর্কের মতো না হলেও ডাক টা আপনি থেকে নেমে তুমিতে চলে এসেছে।

আমি তার কাছে কখনোই স্ত্রীর অধিকার চাইনি।আমার ইচ্ছা নিনিতা যেদিন নিজে থেকে আমাকে স্ত্রীর অধিকার দিবে সেদিনেই আমার অধিকার আমি বুঝে নিব তার আগে নয়।

প্রিতির বয়স এখন দের বছর।কয়েক দিন ধরে আমার মেয়ে আধো আধো গলায় আমাকে বাবা বাবা বলে ডাকছে।ওর মুখে বাবা ডাক শুনলে নিমিষের মধ্যেই আমার জমে থাকা সব অপূর্ণতা যেন পূর্ণতা পেয়ে যায়।

প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরার পর বাকিটা সময় আমি আমার মেয়ের সাথে কাটাই।আমাদের বাবা মেয়ের খুনসুটি দেখে নিনিতা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে।নিনিতা আমার থেকে হয়তো কখনো এতটা প্রত্যাশাই করেনি আর তাই হয়তো এভাবে তাকিয়ে থাকে।

দিনগুলি যেন আমাদের খুব ভালোই যাচ্ছিলো,,,,

কিন্তু এর মধ্যে আবার নতুন করে একটা সমস্যা দেখা দিল।অফিসের একটা কাজে পনেরো দিনের জন্য দেশের বাহিরে গিয়েছিলাম সেখান থেকে ফিরার পর থেকেই নিনিতাকে আমার কাছে একটু অন্যরকম লাগছিল।প্রয়োজনের বেশি কথা বলে না আর সারাক্ষণ কেমন জানি চুপচাপ থাকে।অনেক বার নিনিতাকে জিগ্যেস করেছি কি হয়েছে কিন্তু ও আমাকে কিছুই বলছে না।

এখন কি করব আমি কিছুই ভেবে পাচ্ছিলাম না।আমি বাহিরে যাওয়ার আগে বাসায় নিনিতা আমাদের মেয়ে প্রিতি আর সাথে কাজের মেয়ে শিমলাকে রেখে গেছিলাম।বাহিরে যাওয়ার আগে সবকিছুই তো ঠিকঠাক ছিল তাহলে এর মধ্যে কি এমন হল যার জন্য নিনিতার এত পরিবর্তন।

মাথায় কিছুই আসছে।হাটাৎ মনে হল শিমলাকে জিগ্যেস করে দেখি তো,,,, ও কিছু জানে কিনা,,,

– শিমলা একটু এদিকে আয় তো

– বলেন কি জন্য ডাকছেন।

– আচ্ছা আমি বিদেশে যাওয়ার পর কি এখানে কোন সমস্যা হয়েছিল।এই ব্যাপারে কি তুই কিছু জানিস ?

আমার কথা শুনে শিমলা কেমন জানি চুপ হয়ে গেল কোন কথা বলছে না।

– কি হল কিছু বলছিস না যে,,,,

– আপনি চলে যাওয়ার দুদিন পর বাসায় একটা লোক আসছিল আর ওনার সাথে ম্যাডামের অনেক ঝগড়া হয়েছিল সেদিন।

– কে আসছিল ? আর ঝগড়াই বা হয়েছিল কেন ?

– আমি তো ওনারে চিনি না আর কোন দিন ওনারে দেখিও নাই এই বাসায় আসতে।সেদিনেই ওনারে প্রথম দেখলাম।আর কি নিয়ে ঝগড়া হয়েছিল এটা আমি সঠিক ভাবে কইতে পারুম না তয় আমার মনে হয় আমাদের প্রিতি মামনিরে নিয়ে কিছু একটা কথা হচ্ছিল দুজনের মধ্যে,,,

– কি কথা হয়েছিল কিছু মনে আছে তোর

– আমার মনে হয় ঐ লোকটা আমাদের প্রিতি মামনিরে নিয়ে যেতে আসছিল।

শিমলার কথা শুনে আমি খুব চিন্তায় পরে গেলাম কে আসছিল সেদিন আর আমাদের মেয়েকে নিতে চায় কেন।

এসব প্রশ্নের কোন উত্তর আমি খুঁজে পাচ্ছিলাম না।আর এদিকে নিনিতাও আমাকে কিছুই বলছে না।উত্তর না জানা হাজারো প্রশ্ন আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল তখন।

রাতে শুয়ে আছি কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসছিল না।নিনিতার দিকে তাকালাম ওকে দেখে মনে হল সেও এখনো ঘুমায়নি।

এর মধ্যেই নিনিতার ফোনটা বেজে উঠলো।

নিনিতা ফোন নিয়ে বারান্দায় চলে গেল সাথে আমিও গেলাম ওর পেছন পেছন।নিনিতা বারান্দায় দাঁড়িয়ে কথা বলছিল।ওর সব কথা আমি শুনতে পেলেও অপর প্রান্ত থেকে কি বলছিল এটা আমি শুনতে পাইনি।তবে নিনিতার কথা শুনে যা মনে হল কেউ একজন আমাদের মেয়েকে নিয়ে যেতে চায়।কিন্তু সেটা কে এটা কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিলাম না।

ফোনে কথা বলা শেষ হতেই নিনিতার কান্নার আওয়াজ আমার কানে ভেসে আসলো।মনে হচ্ছে মেয়েটা কান্না করছে।খুব ইচ্ছা করছিল তখন ওর কাছে গিয়ে ওর চোখের জল মুছে দিয়ে জিগ্যেস করি কি হয়েছে আমাকে বল,,,,

কিন্তু কেন জানি তার কাছে আমার যাওয়া হল না।

তারপর সিদ্ধান্ত নিলাম যে করেই হোক নিনিতার কষ্টের কারন আমাকে খুঁজে বের করতেই হবে।

পরের দিন সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে দেখি নিনিতা পাশে নেই।ওর ফোনটা এখানেই পরে আছে।আমি ফোনটা হাতে নিয়ে কাল রাতে নিনিতাকে যে নাম্বার থেকে ফোন করেছিল ওই নাম্বারটা আমার ফোনে নেই।তারপর অফিসে গিয়ে ওই নাম্বারে ফোন দিয়ে জানতে পারলাম এটা রাফি।রাফি নামটা শুনার পর রাফিকে চিনতে আমার একটুও সময় লাগলো না।

তারপর আমি ওকে বললাম আমি নিনিতার স্বামী,আমি আপনার সাথে একটু দেখা করতে চাই।ওনি না করলেন না।আমার সাথে দেখা করতে ওনি রাজী হয়েছেন।তারপর পর আমি বললাম আপনার হাতে সময় থাকলে আমি আপনার সাথে আজকেই দেখা করতে চাই।ওনি বললেন তাহলে বিকেল 4•00 টায় এই ঠিকানাই চলে আসুন।

4•00 টার একটু আগেই আমি সেই ঠিকানাতে চলে গেলাম।কিছুটা সময় পরেই রাফি এসে জিগ্যেস করলো,,,

– আপনিই কি নিনিতার স্বামী ?

– হম আমিই নিনিতার স্বামী।

– তো আমার সাথে দেখা করার কারণ জানতে পারি কি ?

– হ্যাঁ অবশ্যই,,,,

আপনি আমাদের সুখের সংসারটা কেন ভাঙতে চাইছেন ?

– আমি তো আপনাদের সংসার ভাঙতে চাইনা।আমার মেয়েকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিন তাহলে আমি আর কখনো আপনাদের ধারে কাছেও আসবো না।

– আপনার মেয়ে ? কে আপনার মেয়ে ?

– কেন নিনিতার বিয়ের আগে আপনি জানতেন যে নিনিতা অন্তঃসত্ত্বা ছিল ?

– অন্তঃসত্ত্বা ছিল জানতাম।আর হ্যাঁ জেনেই বিয়েটা করেছি,,,,তো ??

– তো কি,,,,ও আমার সন্তান।এখন আমার সন্তান আমাকে ফিরিয়ে দিন।

– প্রিতিকে নিজের সন্তান বলে দাবি করতে আপনার লজ্জা করে না।মেয়েটা যখন অসহায় অবস্থায় আপনার কাছে গিয়েছিল তখন আপনি ওকে বলেছেন আপনি নাকি ওকে স্পর্শই করেন নি।তাহলে এখন কিসের ভিত্তিতে প্রিতিকে নিজের সন্তান দাবি করছেন ?

– তখন এটা বলা ছাড়া আমার কিছুই করার ছিল না।

– বাহ্,,,ভালো বলেছেন।নিজে বিবাহিত হওয়া সত্তেও একটা মেয়ের সাথে সম্পর্কে জরিয়ে পরলেন।আর মেয়েটার সাথে শারীরিক সম্পর্কও স্থাপন করলেন।আর এখন আসছেন ঐ সম্পর্কের ফসল নিতে।

একটা বার কি ভেবে দেখেছেন যখন স্বার্থপরের মত নিজের স্বার্থ হাসিল করে মেয়েটাকে ছেড়ে চলে গেছিলেন সেই মূহুর্তে মেয়েটার বেঁচে থাকটা কতটা কষ্টকর ছিল।

– শুনেছি আপনি নাকি সে সময় টাকার জন্য নিনিতাকে বিয়ে করেছিলেন।তো আপনার মুখে কি নীতি কথা শোভা পায়।

– হ্যাঁ আমি টাকার জন্য সেদিন নিনিতাকে বিয়ে করেছিলাম ঠিকি কিন্তু টাকার থেকে সম্পর্কটার গুরুত্ব আমার কাছে কম ছিল না।আর হ্যাঁ একটা সময় বুঝলাম টাকার থেকেও সম্পর্ক গুলির গুরুত্ব অনেক বেশি।

আপনি একটা মেয়েকে মাঝ নদীতে ফেলে চলে গেছিলেন।কিন্তু আমি সেখান থেকে মেয়েটাকে তীরে এনে একটা নতুন জীবন দিয়েছি।আর আপনি আবার মেয়েটাকে নদীতে ফেলে দিতে চাইছেন।

– কি করব বলেন বিয়ের ছয় বছর হতে চলল কিন্তু এখনো আমি সন্তানের মুখ দেখতে পারিনি।একটা সন্তানের জন্য কত জায়গাতেই না গিয়েছি।কিন্তু একটা সন্তানের মুখ আর দেখা হল না।সেদিন যখন রাস্তায় নিনিতার কোলে বাচ্চাটাকে দেখার পর খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম নিনিতা বাচ্চাটাকে নষ্ট করেনি আর ঐ বাচ্চাটাই আমার।তখন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না।বুকটা হা হা করে উঠলো।ছুটে চলে গেলাম নিনিতার কাছে যাতে আমার সন্তান আমাকে ফিরিয়ে দেয়,,,,,

কিন্তু আজ বুঝলাম এই সন্তান শুধু আমি জন্মই দিয়েছি।এই সন্তানের বাবা হওয়ার কোন যোগ্যতাই আমার নেই।আর কোন দিন সেই যোগ্যতা আমার হবেও না।

এই সন্তানের যোগ্য পিতা আপনি।আপনাদের কাছেই ভালো থাকুক আমার সন্তান।আমি আর কোনদিন এই সন্তানের দাবি নিয়ে আপনাদের সামনে আসবো না,,,,,

এতটুকু বলেই রাফি নামের লোকটা চলে গেল।

এখন নিজের মাঝে অন্যরকম একটা প্রশান্তি খোঁজে পাচ্ছি।

বাসায় এসে দেখি নিনিতা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশ পানে তাকিয়ে আছে।ওর কাঁদে হাত রাখতেই ও আমার দিকে তাকালো।ওর চোখের কোনের জল মুছে দিয়ে বললাম আমাদের মেয়েকে আর কেউ আমাদের থেকে নিয়ে যেতে চাইবে না।আমি মাত্রই রাফির সাথে দেখা করে এসেছি।রাফি বলেছে ও আর কোন দিন আমাদের কাছে সন্তানের দাবি নিয়ে আসবে না।এই সন্তান আমাদের,,,,,

এতটুকু বলতেই নিনিতা কান্না শুরু করে দিয়েই আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পরল,,,আমিও আর কিছু বললাম না। ও কাঁদুক এই কান্না কষ্টের নয় এটা যে সুখের কান্না।



আজকে আমার আর নিনিতার দ্বিতীয় বাসর রাত।অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় বিয়ে করলে বিয়েটা বৈধ হয় না।আমরা আমাদের বিয়েটাকে বৈধতায় রূপান্তরিত করতেই আজ দ্বিতীয় বারের মত বিয়েটা করলাম।

#সমাপ্ত

(ধৈর্য নিয়ে গল্পটা পড়ার জন্য সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ)

লেখা || Tuhin Ahamed

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here