স্যার যখন স্বামী পার্ট_৯

0
452

স্যার যখন স্বামী
পার্ট_৯
#লিখা জান্নাতুল ফেরদৌস
“পাখির মতন একদম নড়াচড়া করবে না।লক্ষ্মী মেয়ের মতন আমার বুকে শুয়ে থাক।মেঘ হাত ব্যথা করছে এখনো?”
“না,”
“তাড়াতাড়ি সেরে যাবে,ঠিকাছে।চিন্তা করিও না।মেঘ তোমাকে কিছু বলতে চাই,দেখ আমি তোমার থেকে বয়সে বড় তাই তোমার থেকে আমার বুঝ আর অভিজ্ঞতাটাও বেশি।সেই সময় তোমার হাতে সাগরের ছবিটা দেখে খুব রাগ উঠে গিয়েছিল আমার,তাই রেগে তোমাকে আঘাত করেছি। দেখ মেঘ এখন থেকে তুমি আমার স্ত্রী। তাই আমার স্ত্রীর মনে অন্যপুরুষ থাকুক তা আমি চাইনা।সাগরকে মন থেকে যত তাড়াতাড়ি মুছে ফেলতে পারবে ততই তোমার আমার আমাদের সবার জন্য মঙ্গল হবে।সেজন্য আমি তোমাকে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিতে চায় ওকে মন থেকে তাড়াতাড়ি মুছে ফেল।আর আরেকটা কথা এই বিষয় নিয়ে আমি প্রথমে তোমার সাথে রাগ করে থাকতে চেয়েছিলাম।কিন্তু পরক্ষণেই নিজের মনকে বুঝালাম আমি যদি ছোট বাচ্চার মতন আচরণ করি তাহলে কেমন করে হবে।তাই নিজের রাগকে একপাশে ফেলে দিয়ে তোমার সাথে আগের মতন করে সবকিছু ঠিক করে নিয়েছি।আজকে আমাদের মধ্যে যা কিছু হয়েছে তা এখন তুমি মন থেকে মুছে ফেলবে সাথে আমিও।যতই ঝগড়া, মান অভিমান আমাদের মধ্যে হোক না কেন রাতের বেলায় ঘুমানোর সময় আমাদের সব রাগ ঝগড়া ঝেড়ে ফেলে দিব একপাশে।ভোরের আলোতে যেমন সব অন্ধকার মুছে যায় ঠিকতেমন করে আমরাও কালকের ভোরের আলোতে আমাদের সব রাগ,অভিমান আক্রোশ ভুলে গিয়ে নতুনভাবে বাঁচব।তুমি,আমি যদি রাগ,মান অভিমান করে সারাক্ষণ বসে থাকি আর এই আশায় থাকি ও আমার রাগ ভাঙ্গাবে তাহলে দেখবে সে সম্পর্কে ফাটল তাড়াতাড়ি ধরবে।কারণ তখন একটাই কথা সামনে দাঁড়াবে তখন তোমার উচিত ছিল আমার রাগ ভাঙ্গানোর। কেন আমার রাগ ভাঙ্গাও নি?এই বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটি,আর সন্দেহের সৃষ্টি হবে।আর এজন্যই খুব ভালো সম্পর্কগুলোও তাড়াতাড়ি ভেঙ্গে যায়। আর আমাদের সম্পর্কে তা হোক আমি কিছুতেই সেটা চাইনা।মানুষ যেহেতু তাই এরকম ঝগড়াঝাটি,রাগ অভিমান থাকবেই স্বাভাবিক তবে সেসব যাতে আমাদের সম্পর্কে প্রভাব না ফেলে সেদিকেও আমাদের খেয়াল রাখা দরকার।তাই কোন অঘটন ঘটার আগে নিজেদের মধ্যে সবকিছু স্বাভাবিক করে ফেলা উচিত।আমি কি বুঝাতে চেয়েছি তা বুঝেছ মেঘ?”
“হুম, বুঝেছি,”
“এইতো আমার লক্ষ্মী বউ এই বলে আমার কপালে ভালবাসার পরশ বুলিয়ে দিলেন।তোমার থেকে আমি ঠিক এই আশায় করি।আমাদের সম্পর্কটা যাতে সুস্থ আর স্বাভাবিক থাকে সে খেয়াল রাখবে আর এত অভিমান নিয়ে বসে থাকবে না ঠিকাছে।এখন লক্ষ্মী মেয়ের মত ঘুমিয়ে যাও। সকালে তাড়াতাড়ি উঠা লাগবে।”
আসলেই উনি ঠিক বলেছেন এত রাগ অভিমান আর আক্রোশ মনের ভিতর পুষে রাখলে সবকিছু অস্বাভাবিক হয়ে উঠবে।সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখতে হলে এতটুকু সেক্রিফাইস করা উচিত।আর ভেবে কাজ নেই ঘুমিয়ে যাই।হে আল্লাহ উনি সকালে উঠে আমাকে ম্যাথ নিয়ে কিছু জিজ্ঞাস না করলেই হয়।
.
.
“এই মেঘ,”
“হুম,”
“লক্ষ্মী বউ আমার উঠ,সকাল হয়ে গেছে”
“এত তাড়াতাড়ি কেন আরেকটু ঘুমায়”
“রাতে কি করেছ হুম কোন কথা শুনতে চায় নি উঠ বলছি এই কথা বলে আমাকে টেনে উঠালেন।”
“আহহারে,আমার এত সুন্দর ঘুমটাও কি উনার সহ্য হয় না।শেষ পর্যন্ত জোর করে আমাকে উঠিয়েই ছাড়ল”
“যাও,ফ্রেস হয়ে নাস্তার টেবিলে আস,hurry up.”
“আচ্ছা”
.
.
নাস্তার টেবিলে গিয়ে দেখি আমার শাশুড়িমাও ঘুম থেকে উঠে নাস্তা বানিয়ে টেবিলে সাজাচ্ছেন।
“আরে মেঘ আয় আয় বস।বল কি খাবি আমি নিজ হাতে তোর পছন্দের সব খাবার বানিয়েছি”
“মা,ওর জন্য পছন্দের খাবার বানিয়েছ ভালো কথা। কিন্তু ওকে বল তাড়াতাড়ি নাস্তা শেষ করতে”
“কেন রে,আস্তে ধীরে খাক না মেয়েটা এইরকম কেন করছিস?”
“করছি কারণ তোমার মেয়েটা পড়ালেখায় একনম্বর ফাঁকিবাজ।কালকে ম্যাথ দেখতে বলে গিয়েছিলাম। আমি জানি আপনার এই গুণধর মেয়ে বই একটু খুলেও দেখিনি।মেঘ আমাদের কথা না শুনে তাড়াতাড়ি নাস্তা শেষ কর”
“শয়তানটার ম্যাথের কথা এখনো মনে আছে।মেঘ তুই শেষ”
“হয়েছে টাইম ওভার।আর নাস্তা করা লাগবে না।যা খেয়েছ তাই যথেষ্ট। চল রুমে চল,তোমাকে আজকে ম্যাথ করাব”
.
.
“আপনার না আজকে ভার্সিটি যেতে হবে।”
অনেক দেরি আছে আমার সেখানে যেতে।তোমাকে পড়িয়ে তারপর ভার্সিটিতে যাব।চল বলছি,এই বলে আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলেন রুমে আর এইদিকে আমার ভয়ে গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। ম্যাথে আমি একদম কাঁচা কি করে যে এই শয়তান আর রাক্ষসটাকে ম্যাথ করে দিব তা বুঝতে পারছি না। আমাকে সারাদিন ম্যাথ বুঝালোও স্যারের সব কথা আমার মাথার উপর দিয়ে চলে যায়।এখনকার মধ্যে বুঝিয়ে দেওয়া পড়া আর লেকচার আমি এখনি ভুলে যায়। ভয় লাগছে শেষে স্যার রেগে গিয়ে আমাকে আবার লাঠি দিয়ে না মারা শুরু করে দেয়।এইসব ভাবতেই অটোমেটিক আমার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। যার ভয় আমি শুধু ক্লাসে পেতাম এখন সে ক্লাস +বাসা!! দুইজায়গায় আমাকে ম্যাথ করে শেষ করে দিবে”
“মেঘ এমা কাঁদছ কেন?কি হয়েছে দেখি আমার লক্ষ্মী বউটা কাঁদছে কেন?আমাকে বল কি হয়েছে”
…..
“ও বুঝেছি এইজন্য কাঁদতে হয়।কাছে এসে আমার চোখের পানি মুছে দিলেন।আমাকে তার বুকে টেনে নিয়ে চুলে বিলি কেটে দিচ্ছেন আর বলছেন মেঘ ম্যাথকে এত ভয় পাও কেন বলত?কিচ্ছু হবে না, দেখ আমি জানি তুমি ম্যাথে দুর্বল তার মানে এই নয় যে তোমাকে দিয়ে ম্যাথ হবে না।তুমি একটু চেষ্টা করবে দেখবে ম্যাথ করতে কত সোজা লাগে।তখন দেখবে তুমি ম্যাথকে ভয় পাচ্ছো না,ম্যাথ তোমাকে উল্টো ভয় পাচ্ছে।আর আমিতো আছি।আমি থাকতে ম্যাথকে ভয় একদম পাবে না।তুমি যতক্ষণ না পর্যন্ত আমার পড়া বুঝতে পারছ আমি ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাকে ম্যাথ বুঝাতে থাকব।ম্যাথ না পারার জন্য তোমাকে কখনো বকব না কিন্তু ফাঁকিবাজি করলে বকাতো খেতে হবেই।তোমাকে সারাদিনও ম্যাথ বুঝাতে আমার একটু ক্লান্তি লাগবে না।নিজের আপনজনের জন্য করছি এইসব তাই একটু কষ্ট করার দরকার হলে করে নিব।আমি আমার দিক দিয়ে চেষ্টা করব আর তুমি তোমার দিক দিয়ে।দেখবে ম্যাথ করার কৌশল তোমার মাথায় একটু একটু করে ঢুকছে।আর কাঁদে না লক্ষ্মীটি।আস ম্যাথ করতে বসি”
.
.
স্যারের কথা শুনে মনটা ভালো হয়ে গেল।তার কথামতো পড়তে বসলাম।অনেকগুলো সূত্র দিয়ে আমাকে ম্যাথ বুঝালেন আর খাতায় করিয়ে দিলেন কিন্তু ফাটাপোড়া কপাল সব আমার মাথার উপর দিয়ে চলে গেল।
“মেঘ তোমার হাতটা দেখি।ব্যান্ডেজ খুলে আমার বাম হাতের ক্ষতটা দেখলেন।এইতো তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যাচ্ছে। ড্রয়ার থেকে ফাস্ট এড বক্স এনে নতুন করে আমার হাতে ব্যান্ডেজ করে দিলেন।মেঘ তোমার হাতের ব্যান্ডেজ তো মায়ের চোখে পড়ার কথা!”
“আমি কাপড় দিয়ে হাত ঢেকে রেখেছিলাম তাই খেয়াল করেননি”
“ও,আচ্ছা”
“মেঘ তুমি আমার করিয়ে দেওয়া ম্যাথগুলো দেখতে থাক আমি এখনি আসছি”
“আচ্ছা”
.
.
কিছুক্ষণ পরে তিনি নাস্তা নিয়ে এলেন।কি ব্যাপার ম্যাথগুলো দেখছ,
“হুম দেখছি”(আর বুঝার চেষ্টা করছি মাথা ফেটে যাচ্ছে তারপরেও কিছু মাথায় ঢুকছে না)
“এইতো লক্ষ্মী বউটা আমার।একটু চেষ্টা কর দেখবে আস্তে আস্তে মাথায় ঢুকবে।না বুঝলে আমাকে বারবার জিজ্ঞাস করবে ঠিকাছে।”
“আচ্ছা”
“আচ্ছা হা কর সকালে তেমন কিছু খাওনি,এখন খেয়ে নাও”
“আপনি আমাকে দেন আমি হাত দিয়ে খেয়ে নিব
“দেখ আমি যখন তোমাকে নিজ হাতে খাইয়ে দিতে চাইব তখন এই কথা আর বলবে না যে তুমি নিজ হাতে খেতে পারবে বা খেয়ে নিবে।আমি খাইয়ে দিতে চাইলে চুপচাপ কোন উল্টাপাল্টা কথা না বলে খেয়ে নিবে এটা আমার শেষ কথা। আমাকে বারবার যাতে এই কথাটা তোমার মাথায় ঢুকিয়ে দিতে না হয়, বুঝতে পেরেছে”
“হুম”
“এই তো লক্ষ্মী মেয়ে।নাও হা কর”
চুপচাপ উনার কথা বাধ্য হয়ে পূরণ করলাম।এরপর উনি মেডিসিন খাইয়ে দিলেন।
.
.
“মেঘ আমার আসতে আসতে বিকেল হয়ে যাবে।এখন তুমি এই ঘরের বউ তোমার হাতে অনেক দায়িত্ব।তাই বাসায় মাকে টাইম দিবে,মাকে তো তুমি আগে থেকে চিন ওনি তোমাকে নিজের মেয়ের মতন দেখেন। তাই তোমাকে দিয়ে উনি কোন কাজ করাবেন না কিন্তু তারপরেও মা যে কয়দিন এখানে আছে একটু একটু করে রান্নার কাজটা ওনার কাছ থেকে শিখে নিও।আর হ্যা পড়ার কথা খবরদার ভুলবেনা,আজকে যা পড়িয়েছি আর দেখিয়েছি তা বাসায় আবারও দেখবে আর করবে।মা এখান থেকে চলে গেলে আবার তোমাকে ভার্সিটি গিয়ে ক্লাস শুরু করতে হবে।আমার কথা মাথায় ঢুকেছে”
“জ্বী,স্যার ঢুকেছে”
“কি!What স্যার”(রেগে গিয়ে)
“সরি সরি আমার মনে ছিলনা যে আমি এখন বাসায় আছি।কিছুক্ষণের জন্য মনে হল আমি ক্লাসরুমে আছি আর আপনি আমার ক্লাস নিচ্ছেন তাই মুখ ফুসকে এই কথা…”
“প্লিজ মেঘ একটু চেষ্টা কর এই স্যার বলে ডাকাটা বন্ধ কর।তুমি বারবার কেন এই কথাটা ভুলে যাও যে আমি তোমার হাজবেন্ড”
…..
“আশা করি তোমার এই ধরণের ভুল তাড়াতাড়ি সংশোধন হয়ে যাবে। আমাকে মন থেকে তোমার স্বামী হিসেবে মানলে আর আমাকে স্বামীর চোখে দেখার চেষ্টা করলে দেখবে তখন তোমার মুখ দিয়ে স্যার শব্দটা আর আসবে না।”
…….(এত সহজ এমনভাবে কাউকে বিয়ে করে তাকে মন থেকে স্বামী হিসেবে মেনে নেওয়া।এই বিষয়টা স্যার যতটা সহজ করে দেখছেন ততটা সহজ না।উনাকে স্বামী হিসেবে মেনে নেওয়া আমার কাছে ম্যাথের মতনি অনেক কঠিন।উনাকে তো ভালবাসিই না তাহলে কেমন করে!?উনি ম্যাথের মতন কঠিন বিষয় সহজে বুঝে গেলেও কিন্তু একটা নারীর মন কি চাই এত সহজে তা বুঝতে পারবেন না।আমার মন কি চায়,এই মনের অবস্থা এখন কেমন সেটা বুঝলে হয়ত এই কথাটা তিনি কখনো….)
“যা ভাবছ ভাব।তোমার ভাবনা নিয়ে আজকে কিছু বলব না।কিন্তু এই বিষয় নিয়ে তোমার ভাবনার উত্তর যাতে পজিটিভ হয় সেদিকে খেয়াল রাখবে।হুম,আচ্ছা আমার লক্ষ্মী বউ আসি তাহলে। মার আর নিজের খেয়াল রেখো ঠিকাছে এই বলে আমার কপালে কালকের মতন করে ভালবাসার পরশ দিয়ে দিলেন”
“আচ্ছা,”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here