শেষ_পর্যন্ত পার্ট: ২৯

0
487

শেষ_পর্যন্ত

পার্ট: ২৯

লেখিকা: সুলতানা তমা

ঘুম ভাঙ্গতেই বুকের মধ্যে গরম নিঃশ্বাস অনুভব হলো, ঘুম ঘুম চোখে তাকিয়ে দেখি আলিফা আমার বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে আর বাচ্চা মেয়ের মতো আমাকে ঝাপটে ধরে রেখেছে। খুব হাসি পাচ্ছে কোথায় বলেছিলাম ওর বুকে আমি মাথা রেখে ঘুমাবো উল্টো ও আমার বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে। আলিফাকে সরিয়ে দিয়ে উঠতে চাইলাম কিন্তু ও আরো শক্ত করে জরিয়ে ধরলো আমাকে। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি নয়টা বাজে, এতো বেলা হয়ে গেছে আর আলিফা আমাকে উঠতেই দিচ্ছে না। এখন কি করি আলিফাকে জোর করে সরাতে গেলে তো ওর ঘুম ভেঙে যাবে।
প্রিতি: ভাইয়া ভাইয়া
আমি: হুম
প্রিতি: আজ সারাদিন ঘুমাবে নাকি ভাবির ওষুধ খাওয়ার সময় হয়েছে তো
আমি: যা তুই আসছি
প্রিতি: তাড়াতাড়ি আসো।

এখন তো ওকে ডাকতেই হবে ওষুধ খেতে হবে। আলিফাকে ডাক দিতেই চোখ মেলে তাকালো আমার দিকে।
আলিফা: শান্তিতে ঘুমাতে দিবে না
আমি: ওষুধ খেতে হবে তো উঠো
আলিফা: না আজ সারাদিন এভাবেই তোমার বুকে মাথা রেখে ঘুমাবো (আবার আমাকে ঝাপটে ধরলো)
আমি: আলিফা এইটা কি হলো রাতে তো বলেছিলাম আমি তোমার বুকে মাথা রেখে ঘুমাবো এখন দেখছি উল্টো তুমি…. (আলিফা আমাকে অবাক করে দিয়ে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপ দিয়ে হেসে দিলো, কতো দুষ্টু মেয়ে)
আমি: অনেক দুষ্টু হয়ে গেছ
আলিফা: দুষ্টুমি গুলো তো তুমিই শিখিয়েছ (নিশ্চুপ হয়ে তাকিয়ে আছে আমার চোখের দিকে, আর কিছুক্ষণ পর ডিভোর্স হয়ে যাবে আমাদের ভাবতেই কেমন যেন অস্থির অস্থির লাগছে)
আলিফা: রিফাত চলে যাচ্ছ কেন
আমি: উঠে ফ্রেশ হয়ে নাও তোমার খাবার নিয়ে আসছি।
তাড়াতাড়ি ওর সামনে থেকে চলে আসলাম, আর একটু সময় থাকলে হয়তো চোখে ছলছল করা পানিগুলো ঝরে পড়বে।

ড্রয়িংরুমে তো কেউ নেই গেলো কোথায় সবাই।
নীলিমা: ভাইয়া কাকে খুঁজছ
আমি: সবাই কোথায় রে
নীলিমা: রুমেই আছে
আমি: ওহ আলিফার খাবারটা দেতো
নীলিমা: হুম (চেয়ার টেনে বসতেই কলিংবেল বেজে উঠলো)
নীলিমা: ভাইয়া দেখতো কে এসেছে
আমি: দেখছি।

দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছি, মাথা খুব ঘুরছে মনে হচ্ছে এখনি পড়ে যাবো। আস্তে আস্তে এসে সোফায় বসে পড়লাম।
নীলিমা: ভাইয়া কে এসেছে
আমি: (নিশ্চুপ)
নীলিমা: কে উনি
আমি: উকিল চাচ্চুর এসিস্টেন
নীলিমা: হুম
আমি: নীলিমা উনার থেকে পেপারটা নিয়ে তোর রুমে রেখে দে যখন বলি দিস
নীলিমা: হুম নাও ভাবির খাবার।
প্লেট’টা হাতে নিয়ে তাড়াতাড়ি রুমে আসলাম। খাটে দফ করে বসে পড়লাম।
আলিফা: রিফাত কি হয়েছে তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন
আমি: কিছু হয়নি খেয়ে নাও, খেয়ে ওষুধ খেও
আলিফা: তুমি খাইয়ে দাও (আলিফার দিকে তাকালাম কেমন বাচ্চা মেয়েদের মতো আবদার করছে। জানিনা ওর এসব স্মৃতি ভুলতে পারবো কিনা)
আলিফা: কি হলো এভাবে তাকিয়ে আছ কেন
আমি: কিছুনা খেয়ে নাও
আলিফা: খাইয়ে দাও
আমি: হুম।

আলিফাকে খাইয়ে দিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। ভাবছি আলিফাকে কি এখনি ডিভোর্স পেপারটা দিয়ে দিবো নাকি পরে দিবো। বিষয়টা যখন আলিফার খুশি হওয়ার তাহলে পরে কেন এখনি ভালো। নীলিমার কাছে যাবো পিছন ফিরতেই দেখি আলিফা।
আমি: কিছু বলবে
আলিফা: তুমি আমার থেকে কি যেন লুকাচ্ছ
আমি: নাতো কি লুকাবো
আলিফা: সত্যি তো
আমি: আলিফা তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে
আলিফা: সারপ্রাইজ
আমি: হ্যাঁ তুমি অনেক খুশি হবে আমি জানি
আলিফা: তাহলে এক্ষণি দাও
আমি: তুমি এখানে দাঁড়াও আমি আসছি
আলিফা: ঠিক আছে।

ডিভোর্স পেপারটা নিতে নীলিমার রুমে আসলাম, ও ডিভোর্স পেপারটা হাতে নিয়ে কাঁদছে।
আমি: নীলিমা (আমার ডাকে তাড়াতাড়ি চোখের পানি মুছে নিলো)
নীলিমা: হুম ভাইয়া
আমি: কি হয়েছে কাঁদছিস কেন
নীলিমা: ভাইয়া ডিভোর্স হয়ে গেলে তোমার কি হবে
আমি: আলিফা সুখে থাকবে এটাই তো অনেক কিছু
নীলিমা: তুমি না খুব ভালো কষ্ট লুকাতে পারো
আমি: তুই বুঝি কম পারিস। তুইও তো সব কষ্ট লুকিয়ে ভালো থাকার অভিনয়টা কতো সুন্দর ভাবে করছিস
নীলিমা: ভাইয়া ভালোবাসায় এতো কষ্ট কেন (ওর এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই, কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে থেকে ডিভোর্স পেপারটা নিয়ে চলে আসলাম)

আলিফা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে, দেখে ওকে খুব খুশি মনে হচ্ছে। ডিভোর্স পেপারটা পেলে হয়তো আরো বেশি খুশি হবে।
আমি: আলিফা
আলিফা: হুম
আমি: এইযে তোমার গিফট
আলিফা: কি এইটা
আমি: বলেছিলাম না সারপ্রাইজ আছে
আলিফা: দেখি কি এইটা (আমার হাত থেকে পেপারটা নিয়ে দেখেই আমার দিকে অবাক চোখে তাকালো)
আলিফা: এইটা কি রিফাত
আমি: আলিফা আমি জানি রাতুলকে তুমি ভালোবাস রাতুলও তোমায় ভালোবাসে। রাতুল ফিরে এসেছে তাও তুমি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলে না। তাই আমি….
আলিফা: তাই তুমি আমাকে এমন সারপ্রাইজ দিলে
আমি: আলিফা আমি তোমাকে ভালোবাসি, এসব মিথ্যে মায়ার জালে তোমাকে আমি আর আটকে রাখতে চাই না। নিলাকে হারিয়ে আমি কষ্ট পেয়েছি তাই তুমি নতুন করে আমাকে কষ্ট দিতে পারছ না। নিজের জন্য তো তোমার রাতুলের দুইটা জীবন আমি নষ্ট করে দিতে পারিনা
আলিফা: তাই তুমি আমাকে জিজ্ঞেস না করেই ডিভোর্স পেপার এনেছ তাও আবার আমাকে সারপ্রাইজ বলে দিয়েছ। এইটা সারপ্রাইজ হ্যাঁ এইটা সারপ্রাইজ
আমি: চেঁচামেচি করছ কেন
আলিফা: (ঠাস)
আমি: আজব তো থাপ্পড় মারলে কেন
আলিফা: তো তোমাকে কি আদর করবো। আরে আমি জানতাম মানুষ বোকা হয় কিন্তু কোনো মানুষ যে এতোটা বোকা হতে পারে সেটা তোমাকে না দেখলে আমি বুঝতামই না
আমি: তুমি রাতুলকে ভালোবাস রাতুলও তোমাকে ভালোবাসে তাই আমি আমার মিথ্যে বাঁধন থেকে তোমাকে মুক্ত করে দিতে চেয়েছি। ডিভোর্স পেপার….
আলিফা: আমি তোর কাছে ডিভোর্স চেয়েছিলাম নাকি বল চেয়েছিলাম (আমার কলার ধরে চেঁচামেচি করছে, তাহলে কি আলিফা ডিভোর্স চায় না)
আলিফা: আমি জানতাম মেয়েদের নাকি মুখ ফুটে ভালোবাসার কথা বলতে হয় না ছেলেরা এমনিতে বুঝে যায় কিন্তু তুই তো এতোই বোকা যে আমি মুখ ফুটে “ভালোবাসি” বলার পরও বুঝলি না
আমি: তুমি আমাকে সত্যি ভালোবাস
আলিফা: না মিথ্যে ভালোবাসি, আমার চোখের সামন থেকে যা নাহলে আরো কয়েকটা থাপ্পড় দিবো
আমি: হুম।
চুপচাপ বিছানায় এসে বসে রইলাম। সবকিছু মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। আলিফা এসব কি বলছে কিছুই বুঝতে পারছি না। ও যদি আমায় ভালোই বাসে তাহলে…
আলিফা: হ্যালো (হঠাৎ দেখি আলিফা কাকে যেন ফোন করছে, অপর পাশ থেকে কি বলছে কিছুই তো শুনতে পারছি না)
আলিফা: একটু এই বাসায় আসো তো (রাতুল মনে হয় কিন্তু আসতে বলছে কেন)
আলিফা: না ওকে আমি এক্ষণি ডিভোর্স দিবো, পেপার আমার হাতেই আছে সাইন করে দিলেই সব মিটে যাবে। তুমি এসো আমি আজকেই তোমার কাছে চলে যাবো। (ওহ তারমানে রাতুলকেই ফোন করেছিল। আর আজকেই চলে যাবে)
আলিফা ফোন রেখে খাটে এসে বসে পড়লো, ডিভোর্স পেপারটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে নিশ্চুপ হয়ে কাঁদছে।
আমি: আলিফা
আলিফা: (নিশ্চুপ)
আমি: তোমাকে কাঁদাতে চাই না বলেই তো আমি এই সিদ্ধান্ত নিলাম তাও তুমি কাঁদছ
আলিফা: (নিশ্চুপ)
আমি: রাতুলকে ফোন করেছিলে তাই না। সত্যিই কি আজকেই চলে যাবে।
আলিফা: একটা মেয়ে প্রতিটা কাজে তোমাকে বুঝানোর চেষ্টা করেছে, হসপিটালের বেডে শুয়ে শুধু তোমাকে বার বার খুঁজেছে, রাত হলে তোমার বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়েছে আরো কতো কিছু করেছে শুধু ভালোবাসে বুঝানোর জন্য। আর তুমি এতোটাই বোকা যে কিচ্ছু বুঝতে পারোনি উল্টো…. তোমার মতো বোকার সাথে থাকার চেয়ে ডিভোর্সই ভালো, আমি এক্ষণি সাইন করে দিচ্ছি।
ডিভোর্স পেপারটা নিয়ে নিচে চলে গেলো। আমিও পিছু পিছু আসলাম।

আলিফা: আব্বু আব্বু (আলিফার চেঁচামেচিতে সবাই ড্রয়িংরুমে চলে আসলো)
আব্বু: কি হয়েছে মা
আলিফা: এইটা একবার দেখো
আব্বু: কি
আলিফা: তোমার ছেলে আমাকে ডিভোর্স দেওয়ার জন্য এইটা এনেছে এখন তুমি বলো আমি কি করবো
ছোটমা: মা চেঁচামেচি করো না এখানে বসো
আলিফা: মানে কি তোমাদের রাগ হচ্ছে না ওর এমন বোকা কাজে
রিয়ান: রাগ হবার কি আছে এটাই তো হবার ছিল। আজ হউক কাল হউক ডিভোর্স তো দিতেই হতো।
প্রিতি: ভাবি তুমি শান্ত হয়ে বসো তোমার শরীর কিন্তু অসুস্থ
আলিফা: আমি অসুস্থ এইটা তোমাদের মনে আছে আমি তো ভেবেছিলাম ভুলে গেছ
আমি: মানে কি
আলিফা: তুমি একটা কথাও বলবা না
আমি: হুম।

সবাই নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে আলিফা বার বার আব্বুর দিকে তাকাচ্ছে, হয়তো আব্বুর সিদ্ধান্ত জানতে চাইছে। আব্বুর সিদ্ধান্তে কি বা এসে যায়। আজ যা হচ্ছে এইটা অনেক আগে হলেই ভালো হতো অন্তত সবাইকে এতো বেশি কষ্ট পেতে হতো না।
নীলিমা: ভাইয়া তোমার কষ্ট হচ্ছে না
আমি: এতো ফিসফিস করে কথা বলছিস কেন
নীলিমা: ভাবি শুনলে রেগে যেতে পারে
আমি: কষ্ট হবে কেন আলিফা রাতুলের সাথে সুখে থাকবে এইটা ভেবে ভালো লাগছে
নীলিমা: হ্যাঁ ভালোবাসার মানুষ ভালো থাকলে সুখে থাকলে সবারই ভালো লাগে কিন্তু সাথে কষ্টও হয়, যেমনটা তোমার হচ্ছে। (নীলিমার দিকে অবাক হয়ে তাকালাম, আমি তো দিব্বি হাসছি ও কষ্ট কোথায় দেখলো)
নীলিমা: ভাইয়া তোমার চোখে পানি ছলছল করছে মনে হচ্ছে সবার চোখের আড়াল হলেই কেঁদে দিবে
আমি: দূর এসব কিছু না
নীলিমা: ভাইয়া আমিও কিন্তু একি কষ্টে ভুগছি তাই আমার কাছে লুকানোর চেষ্টা করো না
আমি: আচ্ছা নীলিমা রিয়ানকে সব বলে দিলে কেমন হয়
নীলিমা: মানে
আমি: আমরা সবাই থাকতে তুই কষ্ট পাবি কেন আমি সবাইকে বলে রিয়ানকে রাজি করাচ্ছি
নীলিমা: ভাইয়া ও অন্য কাউকে ভালোবাসে আমি কি করে তার ভালোবাসার মানুষের থেকে তাকে কেড়ে নেই। তুমি নিজেই তো ভাবিকে ডিভোর্স দিয়ে দিচ্ছ শুধুমাত্র সে যেন তার ভালোবাসার মানুষের সাথে ভালো থাকে। তাহলে আমার বেলায় এমনটা ভাবছ কেন
আমি: কি করবো বল নিজে যে কষ্ট পাচ্ছি সে কষ্ট বোনকে পেতে দেই কিভাবে
নীলিমা: হুম বুঝতে পারছি কিন্তু একবার রিয়ান ভাইয়ার কথা ভেবে দেখো সবাই চাপ দিলে হয়তো ভাইয়া রাজি হবে কিন্তু আমি কি আদৌ সুখী হবো তা….
আমি: তবুও
নীলিমা: বাদ দাওনা ভাইয়া সব ভালোবাসা কি পূর্ণতা পায়, আমাদের ভালোবাসা নাহয় অপূর্ণ রয়ে গেলো।
আমি: হুম।
আলিফা: আব্বু কিছু তো বলো (আলিফার কথা শুনে সামনে তাকালাম, আব্বু মাথা নিচু করে বসে আছেন)
আলিফা: আব্বু….
আব্বু: কি বলবো বল, এটাই তো হবার ছিল
আলিফা: মানে
আব্বু: আমার ছেলেটা তোর মাঝে নিলাকে খুঁজে পেয়েছিল তাই তোকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছিল। কিন্তু তুই তো অন্য কারো তাই ডিভোর্স’টাই এখন একমাত্র রাস্তা
আলিফা: ওহ তারমানে ডিভোর্স এর সিদ্ধান্ত রিফাত একা নেয়নি তোমাদের সবার মতামত নিয়েই এইটা করেছে
আব্বু: আমার ছেলেটা কে পারলে ক্ষমা করে দিস, না বুঝে হুট করে বিয়ে করে তোর জীবনটা উ….
আলিফা: হয়েছে আর বলতে হবে না। সবাই যখন ডিভোর্স চাচ্ছ তাহলে এটাই হউক আমি সাইন করে দিচ্ছি।

আলিফা ডিভোর্স পেপারটা সামনে নিয়ে বসে আছে, হাতে কলম। আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো, রাগ দেখাচ্ছে আবার চোখে পানি ছলছল করছে। কষ্ট হচ্ছে খুব তাই ওর দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিলাম। আলিফা চোখ সরাতেই সবার দিকে তাকালাম, সবাই মাথা নিচু করে রেখেছে। আলিফা আর একবার আমার দিকে তাকালো তারপর সাইন করতে গেলো….

চলবে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here