গল্প: ঝকমারি

0
129

গল্প: ঝকমারি

এবাড়ির বউদের গায়ের রঙ কেমন মাজাঘষা। চকমকি ব্লাউজ আর শাড়ির ভাজে ঘিয়ে বরন পিঠের একাংশ বের হয়ে থাকে।যে বউটা হারুন পাল আর কার্তিকদের দু’বেলা চা বিস্কুট নাস্তা দিতে আসে সে লম্বা সিঁথি টেনে সিদুঁর পরে। ফর্সা কপালের মাঝে সিঁদুর টিপ জ্বলজ্বল করে। বাঁকা ভ্রুর নিচে দুখানা টানা টানা চোখ। কাছে এলে
মিষ্টি প্রসাধনীর সুবাস পাওয়া যায়।

হারুন পাল সে বউয়ের গমন পথের দিকের চেয়ে মন্তব্য করে,
-বড়লোকের বউগুলি কেমন সাদা সাদা।

-হ। কত দামী দামী স্নো পাউডার মাখে।

-তারজন্যে নারে। ওরা অনেক পরিষ্কার থাকে।পাকা দালান ঘরে স্যান্ডেল পায়ে হাঁটে।

-তার সত্য কইছস। আর আমগো বউ ঝিরা…

কার্তিক বাকি কথাটুকু শেষ করে না। ন্যাতানো টোস্ট বিস্কুট চায়ে ভিজিয়ে বড় বড় কামড়ে সাবাড় করে। সুরুত সুরুত টান দিয়ে চায়ের কাপ খালি করতে থাকে।
হারুন পালের চা খাওয়া শেষ।সে লুঙ্গির গাঁট থেকে ম্যাচ বের করে বিড়ি ধরায়। লম্বা টান দিয়ে নিজের বউয়ের কথা ভাবতে থাকে।

মালতী বিয়ের সময় গায়ের রঙ ফর্সা না হলেও বেশ হালকা ছিল। রোদে পুঁড়ে সে দেহ ছাই রঙ ধারন করেছে।মালতী সাত সকালে চাল ডাল ফুটিয়ে পুকুরপাড় থেকে এটেল মাটির চাক নিয়ে আসে। পরনের শাড়ি হাঁটু অবধি তুলে নেয়। গাছকোমরে শাড়ির আঁচল গুঁজে মাটির চাকের উপর লাফাতে থাকে। সরু সরু কালচে পা, নখের ফাঁকে হ্যাজা।সে পায়ে দক্ষভাবে মাটি পিষতে থাকে। কুমোরপাড়ার আরসব বউদের মত মালতীরও শাড়ির আঁচল ঠিক থাকে না। ছেঁড়া ব্লাউজের ফাঁকে নগ্ন কাঁধ পিঠ উঁকি মারে। কুমোরপাড়ার পাশ দিয়ে কত নাম না জানা পথিক বাজারে যায়। তারা মালতীদের দিকে এক নজর তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নেয়।এমুখ না দুর্গা ঠাকুরের না কৃষ্ণকলির। এমুখে কেউ তাকায় না।

মালতীরা জন্ম থেকেই ঝগড়া করতে জানে।বিশ টাকার মাটির পাতিল পঁচিশ টাকা বিক্রি করার জন্য নথ নেড়ে নেড়ে তর্ক করে। পাশের বাড়ির বিনতির মায়ের পোষা বিড়াল তরকারীতে মুখ দিলে অকথ্য ভাষায় ঝগড়া করে।মালতীর স্বামী হারুন পাল জুয়া খেলে সব টাকা খুইয়ে এলে হারুনের বাপ-দাদা চৌদ্দগোষ্ঠী তুলে গালি দেয়।
মালতী তিনবেলা ভরপেট ভাত আর বছরে দু’খানা মোটা কাপড় পেলেই নিজেকে তৃপ্ত মনে করে। পুজোর সময় ঠাকুর গড়িয়ে দু’পয়সা বাড়তি ইনকাম হয়। তা দিয়ে পুজোর বাজার করা হয়।বড় মেয়েটার দু’চার বছর পর বিয়ে দিতে হবে। বাপের তো সে খেয়াল নাই। মালতীকে সব দিক দেখতে হয়।

সুবোধ ঘোষালের বাড়ি ঠাকুর গড়ানো শেষ।বায়না টাকা আগে দিয়েছে আজ বাকিটুকু পরিশোধ করার কথা। হারুন পাল খাওয়া দাওয়া শেষ করে সবে চৌকিতে এসে শুয়েছে।পান চিবোতে চিবোতে মালতী কাছে এল। আঙুলের ডগা থেকে একটুখানি চুন জিবে ছুঁইয়ে জিজ্ঞেস করল,
-ঘোষালরা টাকা দিছে?
-হ।
-কই রাখছ?
-শার্টের পকেটে।

শার্টের পকেট থেকে টাকা বের করে মালতী গুনতে থাকে। ভ্রু কুঁচকে জানতে চায়,
-তিনশ টাকা কম ক্যান?
-তাতে তোর বাপের কী?
-বাপ তুলি কথা কইবা না কলাম।
-ইহি।মাগীর বাপের লাগি দরদ কত!

এক কথায় দু’কথায় দুজনের গলার স্বর বাড়তে থাকে। হারুন পাল তেড়ে মারতে আসে।মালতী ঝাটা হাতে রুখে দাঁড়ায়,
-বান্দীর পুত, গায়ে হাত তুলি দেখ একবার।

কী মনে করে হারুন পাল শান্ত হয়। আলনায় ঝোলানো শার্ট গায়ে চড়িয়ে বিড়বিড় করতে করতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়।

এতক্ষনের ঝগড়ায় মালতীও পেরেশান।চৌকিতে এসে লম্বা হয়ে শুয়ে পরে।হাত পাখা খুঁজতে হাত বাড়াতে পলিথিনে মোড়া কী যেন হাতে ঠেকে। মালতী উঠে বসে। হারিকেনের সলতে একটু বাড়িয়ে দেখতে পায়,
“পলিথিনে মোড়া চকমকি কাপড়ের ব্লাউজ পিস”

#গল্প: ঝকমারি

১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৭

হাবিবা সরকার হিলা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here