নবনী

রেস্টুরেন্টের মালিক প্রায় অপমান করেই নবনী আর জাকির কে রেস্টুরেন্ট থেকে বের করে দিলো। ওরা বের হয়ে যাবার সময় মালিক অন্যান্য কাস্টমার দেখে গলা উঁচু করেই বললো, আমার রেস্টুরেন্টে এসব চুমাচুমি, ধস্তাধস্তি চলবে না। হালাল ভাবে আমি রেস্টুরেন্ট চালাই। এসব বেহালাল কাজ আমার রেস্টুরেন্টে হবে না।

রাস্তায় বের হয়ে নবনী প্রায় কেঁদে ফেললো। কি হতে কি হয়ে গেলো নবনী কিছুই বুঝতে পারেনি। জাকির নবনীর পিছুপিছু হাঁটছে। ওকে কি বলবে সে নিজেও ভেবে পাচ্ছে না। আসলে ব্যাপারটা যে এরকম হবে সেটা ও নিজেও বুঝতে পারেনি।

আজবাদে কাল নবনীর সাথে জাকিরের বিয়ে হবে। নবনীর বাবাই এই বিয়ে ঠিক করেছে। এর আগেও ওরা দুইবার বাইরে দেখা করেছে। রেস্টুরেন্টে বসে বিভিন্ন গল্পগুজব করেছে। বিয়ের পর কি কি ভাবে সংসার সাজাবে। কোথায় কোথায় ঘুরতে যাবে সেসবই ছিল গল্পের মূল বিষয়।

আজকেও স্বাভাবিক ভাবেই ওরা রেস্টুরেন্টে এসে খাবার অর্ডার দিয়ে অপেক্ষা করছিল। এমন সময় লোডশেডিং হয়। হঠাৎ জাকিরের মনে কি যেন হয়ে গেলো। অন্ধকারে চুপ করে নবনীর গালে চুমু খাবার সময়ই জেনারেটর চালু হয়ে গেলো। আলো জ্বলতেই সরাসরি ওদের দেখে ফেললো রেস্টুরেন্টের মালিক।

উনি এগিয়ে এসে বললেন, উঠুন আপনারা চেয়ার থেকে। এক্ষুনি আমার রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে যান। রেস্টুরেন্টের অন্যান্য কাস্টমার সবাই একে অন্যের মুখ দেখাদেখি করছিল তখন। আসলে ওরাও বুঝতে পারেনি। কেন এভাবে ওদের বের করে দেওয়া হচ্ছে। নবনী আর জাকির অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে আছে।
পরিবার শিক্ষা দেয়নি নাকি? লজ্জা করেনা পাবলিক প্লেসে এসে পরপুরুষের সাথে এভাবে ঢলাঢলি করতে। মুরুব্বি মানেন না?বাড়িতে আমার নিজের ছেলে মেয়ে আছে। ওদের তো আমি কখনো এমন শিক্ষা দেইনি। কেমন বাপ মা আপনাদের? এরকম নানান কথা বলে উনি চিৎকার করে যাচ্ছেন। ততক্ষণে ওরা দুজন রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে।

নবনী বেশ অপমানিত বোধ করছে। কথাগুলো ভেবে প্রায় কেঁদেই দিলো। এতগুলো মানুষের সামনে লোকটা অপমান করে বের করে দিলো তাদের।

জাকির বারবার ডাঁকছে কিন্তু নবনীর সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। কাঁদতে কাঁদতে চলে যাচ্ছে। সে এখনো বুঝতে পারছেনা এতগুলো মানুষের মধ্য থেকে কেন তাদের এভাবে অপমান করে বের করে দেয়া হলো। ঢলাঢলির কথাটা কাকে বললেন উনি। সে তো জাকিরের থেকে দূরত্ব রেখেই বসেছিলো। জাকির দ্রুত পায়ে এগিয়ে নবনীর সামনে এসে দাঁড়ায়।

~ নবনী প্লিজ শুনো, আমি সত্যিই চুমু খেতে চাইনি। এমন কোনো ইচ্ছে আমার ছিলোনা কিন্তু তখন হঠাৎ করে কিভাবে কি হয়ে গেলো বুঝে উঠতে পারছিনা।

~ তাহলে চুমু খেতে গেলেন কেন? নবনী দুহাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে নিলো।

~ বললাম তো ভুলে। এছাড়া আজ বাদে কাল তুমি আমার স্ত্রী হতে যাচ্ছ। এভাবে ওভার রিএক্ট করার কি আছে?

~ ওভার রিএক্ট! অন্তত একবার অনুমতি নেয়ার প্রয়োজন ছিলো। আমি এটা চাই কিনা। এখনো কিন্তু আপনার স্ত্রী আমি হইনি। আর আপনার স্ত্রীকে কি আপনি রাস্তাঘাটে চুমু খেয়ে বেড়াবেন?

~ ঘরের বউ যখন । অনুমতি নেয়ার কি আছে?

একথা শুনে নবনী চুপচাপ হেঁটে চলে আসে। জাকির ডাকলেও ও আর পিঁছু ফিরে তাকায়নি। জাকির বারবার কল দিচ্ছে। নবনী কলটা কেটে মোবাইল বন্ধ করে রাখে।
বাসায় এসে চুপচাপ রুমে ঢুকে দরজা আটকে দিলো। কি হতে কি হয়ে গেলো। এরকম একটা পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য সে প্রস্তুত ছিলো না। তাছাড়া জাকির এরকম করবে সেটাও সে ভাবতে পারেনি। বিয়েটা পারিবারিকভাবে ঠিক হয়েছে, দুদিন পরে বিয়ে তা না হয় মানলাম। তাই বলে অন্ধকারে পেয়ে চুমু খেতে হবে? একবার অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজনও মনে করলো না? জাকির এতটাই খারাপ। ছিঃ
.
নবনীর মনে হলো সে অন্যায় করছে নিজের সাথে। নীরবতা আর রাগ কোনো কিছুর সমাধান হতে পারেনা। নবনী জাকিরকে কল করে বিকেলে তার সাথে দেখা করতে বলে। জাকির এসেই প্রথমে নবনীর কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছে তার ভূলের জন্য। কিন্তু নবনী দমে যাওয়ার পাত্রী না। কোনভাবেই সে জাকিরকে আর মেনে নিবেনা। জাকিরের কথা বলার এক পর্যায়ে নবনী বলে উঠে,

~ শুনুন, আমি আপনাকে বিয়ে করতে পারবো না।

~ আজ বাদে কাল আমাদের বিয়ে। আর এখন তুমি আমার সাথে মশকরা করছো? নিজের এত বড় ক্ষতি করোনা নবনী।

~ নিজের ক্ষতি করতে চাইনা বলেই এ বিয়ে আমি করবো না। যে নারীদেরকে সম্মান দিতে জানেনা তার সাথে আমার যায় না।

~ বললাম তো আমার ভুল হয়ে গেছে। ক্ষমা করে দাও। আমরা যে সংসারটা সাজাতে চেয়েছিলাম সেটা সাজাতে দাও প্লিজ।

~ প্রথমে বিপরীত লিঙ্গের মানুষকে সম্মান দিতে শিখুন। যাকে বিয়ে করবেন তাকে পণ্য না ভেবে মানুষ বলে ভাবুন। তারপর সংসার সাজাবেন।

কথাগুলো বলেই নবনী ফিরে আসছে। এখন অনেক হালকা লাগছে নিজেকে। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো। চুপচাপ এরকম অন্যায় মেনে নেয়ার মেয়ে সে না। এ অন্যায় মেনে নেয়ার কোনো কারণও নেই। নবনী জানে, তার বাবা তাকে সাপোর্ট করবে। বাবার আদর্শেই তো সে আদর্শিত।
.
বাসায় ফিরে নবনী তার বাবার কাছে গিয়ে বলে, বাবা কিছু কথা ছিলো তোমার সাথে। একটু শুনো এদিকে। নবনীর বাবা তার পাশে এসে বসে। মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করে, কিছু বলবি?

~ আমি জাকিরকে বিয়ে করতে পারবো না বাবা। এ বিয়ে ভেঙে দিয়েছি আমি।

~ পাড়া-পড়শী সবাই জানে আজ বাদে কাল তোর বিয়ে হবে জাকিরের সাথে। আর এখন বলছিস বিয়ে করবি না। কাউকে পছন্দ করিস?

~ না

~ তাহলে বিয়ে করবিনা কেন?

~ যে পুরুষ নারীদের সম্মান করতে জানেনা তার সাথে আমার জীবন বাঁধা অসম্ভব। বাবা আমি “আলোকবর্তিকা” সংঘের সদস্য। সে সংঘ নারীকল্যাণমূলক কাজ করে। সমাজের অসহায়, অবহেলিত, নির্যাতিত নারীদের জন্য আমি কাজ করি। নারী সমাজকে এগিয়ে নেয়ার ব্রত নিয়ে পথ চলছি আমি। সেখানে নিজের সাথেই এতবড় অন্যায় আমি কিভাবে মেনে নিই বলো।

~ নবনী মা শোন, সে কি এমন করছে যার জন্য তুই একাই এতবড় একটা সিদ্ধান্ত নিলি। আর যা করুক না কেন। সেটার জন্য তোর কাছে না হয় ক্ষমা চেয়ে নিবে। কিন্তু বিয়েটা ভাঙিস না মা। বিয়ে ভাঙা মেয়েদের মর্যাদা এই সমাজ দেয়না।

~ প্রাচীন সমাজের ঘুণে ধরা চাকার নিচে পিষ্ট হওয়ার প্রশ্নই আসে না বাবা। আমি সমাজের উল্টো পথে হাঁটি। আমার কাছে আত্নমর্যাদা সবার আগে। আমি যদি নিজেকে সম্মান না দেই তাহলে অন্যজন থেকে সম্মান প্রত্যাশা করাটা বোকামি। আর যা-ই হোক, আমি নিজেকে অপমান করতে পারবো না।

~ নবনী একটু বুঝার চেষ্টা কর। তোর বিয়ের কথা সবার জানাজানি হয়ে গেছে। পরেরবার তোকে বিয়ে দিতে হলে কেলেঙ্কারি ঘটে যাবে। আর যদি বিয়ে না হয় তখন আজীবন সবাই তোকে ছোট করে দেখবে। অলক্ষুণে ডাকবে। পাড়া-পড়শীর একথা ওকথা শুনে হীনম্মন্যতায় বাঁচতে হবে। পারবি?

~ আজীবন মেয়েরাই কেন এসব সহ্য করে আসবে বাবা? চিরকাল ছেলেপক্ষ বিয়ে ভেঙে যায়, মেয়েটার অবস্থা বুঝার চেষ্টা করেনা। আজ কোনো মেয়ে স্বয়ং তার বিয়ে ভাঙলো। এবার তারা একটু সহ্য করুক, বুঝুক.. বিয়ে ভাঙার যন্ত্রণা। এ বিয়ে হবেনা। ব্যস।

~ নবনী আমাদের টিকে থাকা দায় হবে এ সমাজে। রাগ, জেদ এগুলো পুরুষদের মানায়। নারীদের সর্বদা কোমল হতে হয়।

~ বাবা তুমি তো আমাকে এ শিক্ষা দাওনি। তাহলে আজ কেন নিজের বিরুদ্ধে কথা বলছো? তুমিই আমাকে শিখিয়েছো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে।

~ অনেক সময় মাথা নোয়াতে হয় মা। সম্মানের সাথে বেঁচে থাকার তাগিদে।

~ আর কত বাবা? নারীরা চিরকাল মাথা নুইয়ে সব সয়েই গেছে, প্রতিবাদ করেনি। মাথা নুয়াতে নুয়াতে এখন আর নুয়াবার জায়গা নেই। কপাল মাটিতে ঠেকে গেছে। এবার একটু ঘুরে দাঁড়াই?

নবনীর কথা শুনে তার বাবা প্রায় কেঁদে ফেললো। মেয়েকে সঠিক শিক্ষা দিতে পেরেছে ভেবে গর্ব হচ্ছে। মেয়ের আত্নবিশ্বাস দেখে কলুষিত সমাজের ভয়টাও কাজ করছেনা আর।
.
আমাদের সমাজে নবনী চরিত্রের মেয়েদের খুব অভাব। এ সমাজের মেয়েরা পরিবারের জন্য চুপচাপ নিজেকে বিসর্জন দেয়। টু শব্দটি করেনা।

ঘুণেধরা সমাজে চিরকাল কন্যাপক্ষ শুধু পাত্রপক্ষের সামনে কেঁদে বুক ভাসায়। তাদের হাতে পায়ে ধরে আঁকুতি মিনতি করে। নারীরা তো দূর্বল নয়। ইসলাম নারীদের সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছে। নারী-পুরুষের মধ্যকার বৈষম্যটা আমরাই সৃষ্টি করি। নীরবে সব সয়ে অন্যের কাছে নিজেকে বলি দেওয়া কোনো যুক্তিসঙ্গত কাজ না। সবসময় সয়ে না গিয়ে কিছুসময় রুখে দাঁড়াতে হয়। বাঁচতে হলে বাঁচার মতো বাঁচুন। নিজেকে সম্মান করতে শিখুন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার সাহস রাখুন।

নবনী
~

রিফাত আহমেদ

চতুষ্কোণ

আমাদের ক্লাসে নীলিমা নামে যে কালো মেয়েটা ছিল।রনি তাকে খুব জ্বালাতন করতো। ক্লাসে ও নীলিমাকে নাইজেরিয়ান বেগুন ছাড়া কখনো ডাকতো না। মেয়েটাকে প্রায় সময় দেখতাম রনির এমন কথা শুনে প্রচণ্ড মন খারাপ করতো। মাঝেমধ্যেই ক্লাস থেকে কাঁদো কাঁদো চোখে বেরিয়ে যেতো।

অনেকবার রনি কে বুঝিয়ে ছিলাম। দেখ কোনো মানুষকে এভাবে তার চেহারা নিয়ে খোটা দেওয়া উচিৎ না।কিন্তু রনি কখনো আমার কথা শুনেনি।বারবার এই কাজ করে গেছে।

কিন্তু আজ রনির বাবার অপারেশন করতে যে টাকা লাগছে সেটা সম্পূর্ণ দিয়েছে নীলিমার বাবা। বিনিময়ে রনিকে বিয়ে করতে হয়েছে নীলিমা মতন নাইজেরিয়ান কালো বেগুন কে।

ট্রেনে একজন হিজড়া মাসুদ সাহেবের গায়ে হাত দিয়ে কথা বলায় উনি প্রচণ্ড রেগে গেলেন। নতুন বউয়ের সামনে এই অপমান সহ্য করতে না পেরে সজোরে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিলেন হিজড়ার গালে। থাপ্পড়ের চোটে ট্রেনের সীটের রড লেগে কপাল কেটে যায় হিজড়ার। কাঁদো কাঁদো চোখে মাসুদ সাহেবের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলো হিজরাটা। তারপর, ট্রেন থেকে নামবার আগে বলে গেলে “আল্লাহ এর বিচার করবে”।

একটু আগে হিজড়ার দল এসে মাসুদ সাহেবের প্রথম সন্তান কে নিয়ে গেলো।ওরা কোথা থেকে যেন খবর পেয়েছে এই বাড়িতে একটা হিজড়া সন্তান আছে মাসুদ সাহেবের। মাসুদ সাহেবের স্ত্রী চিৎকার করে কাঁদছে। হঠাৎ মাসুদ সাহেবের সেই দিনের ট্রেনের কথা মনে পড়ে গেলো।

পলাশপুরের চেয়ারম্যান বাড়ির ছেলে জয়। কিন্তু আজ ও আত্মহত্যা করতে চলেছে। মানুষের কাছে এই মুখ ও কিভাবে দেখাবে! সবাই জয়কে এখন অন্যচোখে দেখছে। এলাকার কোনো মানুষের আর কিছু জানা বাকি নেই । সবাই জেনে গেছে জয়ের বউ জয়ের ছোট ভাইয়ের সাথে ফষ্টিনষ্টি করতে গিয়ে ধরা পরেছে।

আম গাছের সাথে একটা দড়ি ঝুলছে। দড়িটাকে মালার মতো করে বানিয়ে নিজের গলায় পড়ে নিলো জয়। পায়ের নিচের চেয়ারটাকে লাথি দিতে যাবে এমন সময় কে যেন জয়ের কানে কানে বলে উঠল।” তুই বন্ধু হয়ে আমার বউয়ের সাথে এসব করতে পারলি? কি দোষ করেছিলাম আমি! যে তুই আমার বউয়ের দিকে নজর দিলি।তোকে কিছু বলার নেই।মাথার উপড়ে আল্লাহ আছে তিনি বিচার করবে “।

জয়ের হঠাৎ মনে পড়ে গেলো পাঁচ বছর আগেকার কথা। তুষারের বউয়ের সাথে জয়ের যে একটা অবৈধ সম্পর্ক ছিল সেটা তুষার জেনে গিয়েছিল। পরে লোকলজ্জার ভয়ে গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে যায়।এই ঘটনা জয় আর তুষার ছাড়া কেউ জানে না। হঠাৎ নিজের অজান্তে জয় পা দিয়ে নিচের চেয়ার টা ফেলে দিলো। বারকয়েক কেঁপে উঠে ঝুলে রইলো জয়ের শরীর।

লোকাল বাসে খুব ভিড়। আবির ও ওর ছোটবোন খুব ঠেলাঠেলি করে বাসে উঠে দাঁড়ালো। ভাই বোন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। হঠাৎ দুইজন ছেলের মুচকি হাসি দেখে আবির ছেলে দুটোর হাসির কারণ অনুসন্ধান করতে লাগলো। একটু পরেই আবির কারণ খুঁজে পেলো। ছেলে দুটো হাসছে আবিরের বোনকে দেখে। আবিরের বোনের পিঠে জামার গলার ফাঁক দিয়ে একটা সাদা ফিতা দেখা যাচ্ছে। মুহূর্তেই আবিরের কান রাগে লাল হয়ে উঠলো।ছেলে দুটোকে জবাই করতে ইচ্ছে হচ্ছিল আবিরের। কিন্তু লোকাল বাসে কিছু বলাও যাচ্ছে না। ছেলে দুটোর চোখ থেকে বোনকে আড়াল করে রইলো।

হঠাৎ দুটো সীট ফাঁকা হওয়াতে দুই ভাইবোন বসে পড়লো। কিন্তু আবিরের মনে মনে তখনো আগুন জ্বলছে। হঠাৎ আবিরের মনে পড়লো কয়েকদিন আগের কথা।

টিএসসিতে বন্ধুরা মিলে আড্ডা দিচ্ছিল। এমন সময় দুজন মেয়ে ওদের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল। তাদের একজনার পিঠের জামার গলা দিয়ে নিচের অন্তবার্সের ফিতা দেখে আবির ও ওর বন্ধুরা মিলে হাসাহাসি। অথচ মেয়ে দুইটি জানতেও পারেনি ওদের হাসির কারণ।

আজ নিজের বোনের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা দেখে নিজেই নিজের গালে মনে মনে চড় মেরে চলেছে আবির।অথচ পাশে বসা বোন কিছুই বুঝতে পারছে না।

( জগৎসংসার কখনো ঋণী থাকতে চান না। যেকোনো ভাবে তার ঋণ শোধ করে দেন। যদি কেউ ভালো কাজ দিয়ে জগৎসংসার কে ঋণী করেন। তাহলে জগৎসংসার ভালো কিছু দিয়েই সেটা শোধ করবে। আর যদি খারাপ কাজ দিয়ে ঋণী করেন তাহলে…………!)

চতুষ্কোণ

রিফাত আহমেদ

লিখা: ২৩ মার্চ ২০১৮

ডোন্ট জাজ এ বুক বাই ইটস কাভার

পরীক্ষার হলে ঢুকে দেখলাম সুন্দরী একটা মেয়ের সাথে সীট পরেছে। দেখতে এক্কেবারে ক্যাটরিনা কাইফের মতন। জামাকাপড় ও সুগন্ধির ঘ্রাণ বলে দিচ্ছে বড়লোকের মেয়ে। মনে মনে ভাবলাম একটু খাতির জমানো যাক। পরীক্ষায় টুকটাক সমস্যা হতেই পারে।

মেয়েটার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলাম আপনি কোন কলেজ থেকে এসেছেন। মেয়েটা কোনো উত্তর দিলো না। ভাবলাম শুনতে পায়নি তাই আবার একই প্রশ্ন করলাম। কিন্তু এবার বুঝলাম, মেয়েটা শুনেই না শুনবার ভান করছে। সুন্দরী মেয়েরা যেমন অহংকারী হয় আরকি। সুন্দর চেহারা ও দামি কাপড়চোপড় কিনার যোগ্যতা কোনোটাই আমার নাই। মনে মনে নিজের উপর কিছুটা রাগ হলো। কেন যে আগ বাড়িয়ে কথা বলতে গেলাম।

উচ্চ মাধ্যমিকে সাইন্সের ছাত্র ছিলাম। খারাপ ছাত্র ছিলাম না। বিশেষ করে সাইন্সের বিষয় গুলোতে।জেনারেল সাবজেক্ট গুলোর পরীক্ষা চলাকালীন মেয়াটা কখনো আমার সাথে কথা বলেনি। আমিও আর নিজেকে ওর কাছে ছোট করতে যাইনি।

 

পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষা দিন লক্ষ্য করলাম প্রশ্ন বেশ কঠিন। পরীক্ষার হলে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে একপ্রকার হাহাকার চলছে। নিজের প্রশ্ন দেখে বুঝলাম প্রায় প্রশ্ন কমন এসেছে। খাতার দিকে মনোযোগ দিয়ে লিখা শুরু করলাম। এমন সময় পাশে বসা সুন্দরী ক্যাটরিনা কাইফ বলে উঠলেন এইযে ভাই “এক নাম্বার প্রশ্নটা কি আপনার কমন এসেছে? “।
‎এইবার এসেছে আমার সুযোগ। শুনেও না শুনবার ভান করে রইলাম। সুন্দরী আবার আমাকে একই প্রশ্ন করলেন। আমিও আবার না শুনবার ভান ধরে নিজের উত্তর পত্রতে লিখে যাচ্ছিলাম।

আশেপাশে ছেলেমেয়েদের সাথে সুন্দরীর ফিসফিসানি ও কলম কামড়ানোর ধরণ দেখে বুঝে গেলাম ক্যাটরিনা আপুর কমন আসেনি। মনে মনে আমি হানি সিং ও দিপিকা পাড়ুকোনের সাথে “লুঙ্গী ড্যান্স” দিচ্ছি। ভাবছি উচিৎ শিক্ষা হয়েছে ওর। আজ কোথায় যাবে তোমার অহংকার।

অর্ধেক প্রশ্ন লিখা শেষ। এমন সময় সুন্দরী দেখি কলম দিয়ে আমাকে গুঁতা মারে। এমনেই আমার ছোটবেলা থেকে প্রচণ্ড কাতুকুতু। ক্যাটরিনার কলমের গুঁতায় এক্কেবারে লাফিয়ে উঠলাম। আশেপাশে ছেলেমেয়ে আমার বাঁদরের মতন লাফ দেখে হেসে একাকার। মুখে প্রচণ্ড বিরক্তি এনে ক্যাটরিনা আপুকে জিজ্ঞাস করলাম কি হয়েছে।
ক্যাটরিনা আপু কাঁদোকাঁদো হয়ে উত্তর দিলো “উনার নাকি কোনো প্রশ্ন কমন নাই”। আমি যদি তাকে সাহায্য না করি তাহলে নিশ্চিত ফেল। এইবার আমার মনের মধ্যে বেজে উঠলো গুরু মাইকেল জ্যাকসনের “বিট ইট” গানটা। কিন্তু গুরুজন বলেছেন মেয়েদের প্রতি দয়া দেখানো আর নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারার মধ্যে কোনো তফাৎ নেই।

আমি ক্যাটরিনা আপুকে সাহায্য করার জন্য রাজি হলাম।ক্যাটরিনা আপু শুনে তো মহাখুশি। কিন্তু উনাকে একটা শর্ত দিলাম। প্রত্যেকটা নাম্বার দেখানোর জন্য উনাকে দশ টাকা করে দিতে হবে। অর্থাৎ দশ নাম্বার মার্কের জন্য উনাকে দিতে হবে একশো টাকা।
মেয়ে আমার কথা শুনে পুরাই টাস্কি। এই ছেলে বলে কি! আমি বলে দিলাম, আপনি যদি রাজি থাকেন তাহলে জানাবেন।

ক্যাটরিনা আপু অন্য কোনো উপায় না পেয়ে আমার হাতে একশো টাকা তুলে দিলেন। আমিও নির্লজ্জ ভাবে সেই টাকা হাত পেতে নিলাম। মাসে মাসে যদি হাজার টাকা প্রাইভেট টিউটর কে দিতে পারে।তাহলে এক পরীক্ষায় কিছু টাকা খরচ করলে কোনো কিচ্ছু হবেনা এইসব ক্যাটরিনা আপুদের।

এইভাবে সম্পূর্ণ পরীক্ষায় ক্যাটরিনা আপুকে উত্তরপত্র দেখিয়ে যাচ্ছি আর আস্তে আস্তে নিজের পকেট ভারি করছি। মনে মনে যে কি পৈশাচিক আনন্দ পাচ্ছিলাম।

পরীক্ষা শেষ হলে উত্তরপত্র জমা দিয়ে বাইরে এসে বন্ধুদের সাথে কথা বলছি। এমন সময় দেখি ক্যাটরিনা আপুও বের হয়েছে। এগিয়ে গেলাম ক্যাটরিনা আপুর দিকে। পকেট থেকে টাকা গুলো বের করে উনার হাতে দিয়ে বললাম। পরীক্ষার হলে পাশের সীটে বসা কোনো ছেলে কথা বলতে চাওয়া মানে খারাপ কিছু না। সে দেখতে খারাপ হতে পারে তার কাপড়চোপড় দেখতে সুন্দর না হতে পারে। কিন্তু “প্লিজ, ডোন্ট জাজ এ বুক বাই ইটস কাভার!”

ডোন্ট জাজ এ বুক বাই ইটস কাভার

রিফাত আহমেদ

লিখা: ৫ এপ্রিল ২০১৮

(কল্পনা থেকে লিখা)

নতুন একটা সিম কিনে পরিচিত দশজন কে মেসেজ পাঠালাম। ” আমি তিয়াসের রুমমেট আকাশ বলছি। আজ সকালে তিয়াস গলায়দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। আপনারা দয়া করে ‘হল’ থেকে ওর লাশ নিয়ে যাবেন।”

মেসেজ দেওয়ার মিনিট দুয়েকের মধ্যে কল আসা শুরু। মা, বাবা, ভাই,বোন, বন্ধুবান্ধবী সবাই একের পর এক ফোন দিচ্ছে। কি বলবো না বলবো ভেবে ফোন রেখে দিলাম। যতো ইচ্ছে কল করুক।

একটুপর একটার পর একটা মেসেজ আসতে লাগলো। মেসেজ গুলো ছিল ঠিক এই রকম।

আম্মুঃ আমার ছেলে জীবনে এই কাজ করতে পারে না।ওর প্রতি আমার বিশ্বাস আছে। ওকে বলে দিও ওর জন্য বড় একটা মুরগী কিনে রেখেছি। বাড়িতে আসলে রান্না করে খাওয়াবো। আর এখন আপাতত কতো টাকা লাগবে সেটা মেসেজে বলে দিতে বলো।

আব্বুঃ বাবা, এই মাসে হাত খালি। মোটরসাইকেল কিনে চেয়েছিস দিবো। ঈদ আসুক, বাপ বেটা মিলে একসাথে গিয়ে গাড়ি কিনে আনবো। আর এইসব অলক্ষুণে কথা বলবি না। এমনিতেই দূরে থাকিস সারাদিন চিন্তায় থাকি কখন কি হয়। বাড়ি আসিস, তোর মা একটা বড় মুরগী রেখেছে। তোর জন্য আমিও খেতে পারছি না।

বড়বোনঃ লাথি খাবি হারামজাদা। মাথার মধ্যে ভূত ঢুকছে? ফাইজলামি করার যায়গা পাস না। রুনার সাথে ঝগড়া লাগছে? আচ্ছা আমি ফ্রি হয়ে রুনাকে ফোন দিবো।

ছোটভাইঃ আম্মুর কাছে কয়টাকা চামু সেইডা কও। তোমার জন্য আমার ক্যামেরা কিনা হচ্ছে না। বাবা বলছে ঈদে নাকি তোমাকে গাড়ি কিনে দিবে। তাই আমারটা দিতে দেরি হবে। তোমার জন্য আমি কিচ্ছু পাইনা।

রুনাঃ ঢং দেখাস? অন্য কাউকে পাইছিস? তুই কি মনে করছিস আমাকে ভয় দেখাবি? যা মরে যা। তোর লাশের সাথে বিয়ে বসবো। তারপর একসাথে কবরে যাবো। আজ বিকালবেলা নীল শাড়ি পরে ছবি পাঠাবো। দেখবি আর মরতে ইচ্ছে হবে না।

বন্ধু রতনঃ কি খবর মামা? রুনা ছ্যাকা দিছে? আমি ১০০% নিশ্চিত ছিলাম এই মাইয়া তোরে ছ্যাকা দিবো। দেখলি আমার কথা মিলে গেছে। মামা ট্রিট দেও ট্রিট। নতুন কাউকে পাইলে জানাস।

বান্ধবী লায়লাঃ ফাইজলামি রাখ। শুভর সাথে আমার আবার ঝগড়া লাগছে। দেখত কিছু করতে পারিস কিনা। বেচারা কাল রাতে ঘুমের ওষুধ খাইয়া ঘুমাইছে।এখনো ফোন অফ। একটু দেখবি? টেনশন হচ্ছে।

বিল্লু, চা ওয়ালাঃ মামা টেনশন নিয়েন না।বিকালবেলা চলে আসেন এককাপ স্পেশাল চা খাওয়াবো সব ঠিক হয়ে যাবে। রুনা মামীকেও নিয়ে আসবেন।

মেসেজ গুলো পড়ে মন ভালো হয়ে গেলে। মনে মনে আফসোস করতে লাগলাম সেইসব মানুষদের জন্য।যারা সামান্য কারণে সুইসাইড করে। তারা কি জানে প্রিয়জনদের কাছে তার মৃত্যু অবিশ্বাস্য ছাড়া কিচ্ছু না। তারা কি একবার ভাবে এইসব মানুষের কথা গুলো। যদি তারা একবার এইসব মেসেজ গুলো দেখতে পায়। তাহলে সারাজীবন বাঁচতে ইচ্ছে হবে তাদের। নিজের জন্য নাহলেও আপন মানুষদের জন্য।

(কল্পনা থেকে লিখা)

রিফাত আহমেদ

লিখাঃ ৭ এপ্রিল ২০১৮

শ্বশুরের অংক

ঠাস!কে যেন চড় মারল। আমার বুঝতে আর বাকি রইলো না, ঘুমের ঘোরে শ্বশুরের গায়ের উপর পা তুলে দিয়েছি। শ্বশুর বলে উঠলো “ঐ হারামজাদা গায়ের উপর থেকে পা নামা কইতাছি। তোর মতন বেআক্কেল জামাই আমি জীবনে দেখিনি।” চোরের মতন আস্তে আস্তে শ্বশুরের শরীরের উপর থেকে পা নামিয়ে নিলাম।

গ্রামে শ্বশুর বাড়ি এসেছি শালার বিয়ে খেতে। ঘর ভর্তি মানুষজন। গভীর রাতে যখন প্রচণ্ড ঘুম পেলো। তখন বউ বলল শ্বশুরের কাছে ঘুমাতে।মানুষজন বেশি, ঘুমানোর যায়গা নেই। ওকে এতো করে মানুষের সামনে ইশারায় বুঝলাম ঘুমের সময় আমার হাত পায়ের হিসাব থেকে না। কিন্তু না বউ বুঝল না। কয়েকবার মানুষের আড়ালে পায়েও চিমটি দিয়েছে। তাও বুঝল না। উপায় না দেখে শ্বশুরের পাশে এসে শুয়ে গেলাম। কিন্তু কখন যে ঘুমের ঘোরে পা চলে গেছে!

বিছানায় উঠে বসে চোখ ডলতেছি। মনে মনে বউয়ের উপর রেগে গেলাম।কেন যে মেয়েটা এইভাবে রেখে গেলো। এমন সময় পেটের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠলো। বাইরে গিয়ে দেখি আশেপাশে মানুষজন কেউ নেই। অন্ধকার রাত। একা একা কিভাবে বাথরুমে যাই! এদিকে ছোটবেলা থেকেই আমি ভূতের ভয় পাই। ছোটবেলায় মা ছাড়া কখনো রাতে বাথরুমে যাইনি। এখনো বাড়ি এলে মা কে ডেকে বাথরুমে যাই। কিন্তু এখানে মা, বউ কেউ নেই। উপায় না পেয়ে শ্বশুরের কাছে ফিরে গেলাম।

শ্বশুর আব্বা? একটা কথা বলি?
শ্বশুর আব্বা বললেন “কইয়া ফেলা” আমি বললাম
আব্বা “ছোটবেলা থেকে আমার অনেক ভূতে ভয় হয়।যদি কিছু মনে না করতেন তাহলে আমার সাথে একটু বাথরুমে যাবেন। পাশে দাঁড়িয়ে থাকলেই হবে।” শ্বশুর আব্বা আমার কথা শুনে হাঁ করে তাকিয়ে রইলো। আমি বললাম “আব্বা একটু তাড়াতাড়ি করেন। নাহলে কিন্তু অঘটন ঘটে যাবে এইখানেই। ” শ্বশুর আব্বা আমার কথা শুনে বললেন ” চল! চল! চল! তাড়াতাড়ি দৌড় দে”।

আমি কাজ সারছি আর শ্বশুর আব্বা বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। আহা! কি চমৎকার জীবন। এমন শ্বশুর কয়জনার কপালে জুটে। মনে মনে নিজেকে খুব সুখী মনে হলো। এমন সময় পাশে কি যেন নড়াচড়া করতে লাগলো। ভয়ে এক দৌড়ে আমি শ্বশুরের কোলে গিয়ে উঠে উনাকে জরিয়ে ধরে বললাম “শ্বশুর আব্বাগো ভূত ভূত।” শ্বশুর আব্বা চিৎকার করে বলে উঠলো “ওরে বাবা রে! নিচে নাম, মরে গেলাম, মরে গেলাম।” আমি ভয়ে আরো শক্ত করে শ্বশুর আব্বাকে জরিয়ে ধরলাম। পরে উনি যখন ধমক দিয়ে উঠলেন তখন নিচে নেমে এলাম। শ্বশুর তখন বলে উঠলো “তুই ছোটাতে ভাদাইম্মা ছিল সারাজীবন সেই ভাদাইম্মাই থাকবি।” আমার মেয়ে কোন চোখ দিয়ে তোরে পছন্দ করছিল আল্লাহ জানে।

আমার শ্বশুর আমাকে দুইচোখে দেখতে পারে না।
আমার দোষ একটাই,আমি তার একমাত্র মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে বিয়ে করেছিলাম।

মাধ্যমিকে থাকতে আমার শ্বশুর আমার উপর যে নির্যাতন করছে। সেসব দিনের কথা স্বপ্নে দেখে এখনো ঘুমের মধ্যে আমি চিৎকার করে উঠি। উনি ছিল আমাদের অংকের মাস্টার। কিসব আজগুবি অংক ছিল মাধ্যমিক বইয়ে। যে আমি ব্ল্যাকবোর্ডে দেখে দেখে অংক তুলতে ভুল করতাম। সেই আমি পরীক্ষায় অংকে পাশ করি কিভাবে! স্কুলে যেসব পরীক্ষায় পাশ করেছিলাম। সেসব ছিল আমার পাশে বসা ছাত্রছাত্রীদের কৃতিত্ব। ওদের দেখেই তো পাশ করেছি।

আমার শ্বশুরের ক্লাসে সবথেকে কাঁচা ছাত্র ছিলাম আমি। উনি আমাকে উঠতেও পেটাতেন। বসতেও পেটাতেন। আমাকে পেটানো যেন তার রীতিমত ব্যায়াম হয়ে গিয়েছিল। একেতো অংক পারিনি তার উপর উনার অপমানজনক কথা শুনে প্রতিশোধ নিবো বলেই উনার মেয়ের সাথে প্রেম করি।তারপর পালিয়ে বিয়ে।

কিন্তু মানুষ মরলেও নাকি অভ্যাস বদলায় না।ঠিক তেমনি আমার শ্বশুরের অভ্যাস যায়নি। প্রথম যেদিন আমরা স্বামী স্ত্রী উনার সামনে হাজির হয়ে মাফ চাইলাম। উনি হঠাৎ করে ক্লাস সেভেনের একটা পাটি গণিত দিয়ে বললেন এটা করে দেখা তাহলে মাফ করে দিবো। পাশের বাড়ির ছোট ছেলেটা সেদিন সাহায্য করেছিল বলে অংকটা পেরেছিলাম।
তারপর থেকে শ্বশুর আব্বা আমার কোনো দোষ পেলেই একটা না একটা অংক নিয়ে আমার সামনে এসে হাজির হয়। আমিও কম যাইনা। সব ক্লাসের অংকের গাইড কিনে রেখেছি। শ্বশুর বাড়ি এলেই সাথে করে সেসব নিয়ে আসি।

কালকে রাতের ভুলের জন্য আজকেও অংক করতে দিয়েছে। কিন্তু দুঃখের কথা শালার বিয়ের নানান রকম খাবারের কথা মনে করে অংকের গাইড আনতে ভুলে গেছি। কিভাবে যে করি অংকটা। কেউ কি সাহায্য করবেন?

শ্বশুরের অংক

রিফাত আহমেদ

লিখাঃ ৯ এপ্রিল ২০১৮

মা

একটা মেয়ে নাকি আম্মুর কাছে আমার নামে বিচার দিয়েছে। আমি নাকি নিয়মিত মেয়েটাকে ডিস্টার্ব করি। আম্মুর কাছে কথাটা শুনেই পায়ের রক্ত মাথায় উঠে গেলো। ক্লাসে যেসব মেয়ে আছে তারা সবাই আমার পরিচিত। দুএকজন বাদে সবার সাথে সম্পর্ক খুব ভালো। সবার সাথেই দুষ্টামি ফাজলামি হয়। কিন্তু আম্মুর কাছে বিচার দেওয়ার মতন কাউকে খুঁজে পেলাম না। অনেকবার আম্মুকে বললাম কোন মেয়ে ছিল?কিন্তু আম্মু নাম বলে না।

মনে মনে বন্ধুদের উপর ক্ষেপে গেলাম। ঐ হারামজাদা গুলাই আমাকে সাথে করে নিয়ে গিয়ে গার্লস স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে প্রেমিকাকে এক নজর দেখার জন্য। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম। এইসব কাজ গুলো এড়িয়ে চলবো। বলা যায় না, মেয়েটা আবার কবে বিচার দেয়।

কিছুদিন পর…….!

আবার মেয়েটা আম্মুর কাছে বিচার দিয়েছে। আমি নাকি দিন দিন মোটা হয়ে যাচ্ছি। দেখতে জলহস্তীর মতন লাগে।এবারের বিচার শুনে আর রাগলাম না।কারণ সত্যি আমি অনেক মোটা হয়ে গেছি। মেয়েটা এবার সত্যি বলেছে। কিন্তু এবার রেগে গেলো আম্মু।
কি! মেয়ের এতো বড় সাহস। আমার একমাত্র ছেলেকে মোটা বলে। এক মাসের মধ্যে আমার ছেলের যদি ভুঁড়ি না কমিয়েছি। দেখিয়ে দিবো মেয়েটাকে।

তারপর থেকে আম্মুর কথামত নিয়মিত ব্যায়াম করছি। আম্মু আমাকে সকাল বিকাল দৌড়ে নিচ্ছে। বাইরের খাবার খেতে দিচ্ছে না। একমাস পর যখন শরীর সেই আগের অবস্থায় ফিরে এলো। তখন আম্মু বলল ” বাঁচলাম “।

কিছুদিন পরে……!

এবার আর মেয়েটা বিচার দেয়নি, চিঠি পাঠিয়েছে। আম্মুর হাত থেকে চিঠি নেওয়ার সময় বুঝলাম চিঠিটা পড়ে আম্মুর চোখের উপর দিয়ে ঝড় চলে গেছে। কেন জানি চিঠিটা পড়াবার আগেই মেয়েটার উপর প্রচণ্ড রাগ উঠলো। মনে মনে মেয়েটার চোদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করছিলাম। চিঠিটা পড়া শুরু করলাম ।

প্রিয় আন্টি,

রাতুল আর নিয়মিত ক্লাসে পড়া দিচ্ছে না। কাল ওর রেজাল্ট শুনে প্রচণ্ড রাগ হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল ক্লাসে সবার সামনে উঠে গিয়ে থাপ্পড় মেরে আসি। কিন্তু ওকে ওভাবে অপমান করতে ইচ্ছে হচ্ছিল না।
আমি জানি আপনি ওকে অনেক কষ্ট করে মানুষ করছেন। তাই ভাবলাম আপনাকেই ব্যাপারটা জানাই।

আপনি যদি রাতুল কে শাসন না করেন। তাহলে খুব তাড়াতাড়ি ও নষ্ট হয়ে যাবে। আশাকরি আমি আপনাকে বুঝাতে পেরেছি।

ভালো থাকবেন।
ইতি
‎রাতুলের সবথেকে প্রিয় বন্ধু

চিঠি পড়ে বুঝলাম মেয়েটা মিথ্যা বলেনি। ইয়ার চেঞ্জ পরীক্ষায় খুব খারাপ রেজাল্ট হয়েছে। চিঠিটা পড়বার পর মা ছেলে দুজনার মন খারাপ। আম্মুকে কি বলবো ভেবে পাচ্ছিলাম না।

মেয়েটার উপর রাগ নিয়ে সেই রাতেই প্রতিজ্ঞা করলাম। যেভাবেই হোক আমি ভালো রেজাল্ট করবোই। আম্মুর স্বপ্নকে সত্যি করে ছাড়বো। মেয়েটাকে দেখিয়ে দিবো। আমি কি করতে পারি।
দিনরাত পড়াশুনা শুরু করলাম।

বর্তমান……!

এখন আমি মেডিকেলে পড়ছি। মেয়েটার চিঠির উপযুক্ত জবাব আমি দিয়েছি। কিন্তু সেই চিঠির পর মেয়েটার আর কোনো বিচার বা চিঠি আসেনি। আমি প্রায় সময় আম্মুকে চিঠিতে লিখে পাঠিয়েছি মেয়েটা আর কোনো বিচার বা চিঠি দিয়েছে কিনা। কিন্তু মেয়েটার কোনো বিচার বা চিঠি আম্মু পায়নি। কিন্তু আজ যে চিঠি আম্মু লিখে পাঠিয়েছে সেটা পড়ে চোখ ভিজে এলো।

“বাবা রাতুল”,
আজ তোকে তোর সব প্রশ্নের উত্তর দিবো। তুই এখনো ভাবিস মেয়েটার কথা? যে মাঝেমধ্যে আমাকে তোর বিচার দিতো। আজ তোকে সব খুলে বলছি।

সত্যি বলতে সেই মেয়েটা আর কেউ নয়। তোর আম্মু। তোর সবথেকে প্রিয় বন্ধু। জানি তুই আমাকে ভুল বুঝবি । তোর মায়ের আর কোনো উপায় ছিল না….। তোর বাবা মারা যাবার পর তোকে শাসন করার মতন মানুষ কেউ ছিল না। আমিও কখনো তোকে শাসন করতে পারিনি। তাই চুপিচাপি নিজেকে আড়ালে রেখে তোকে শাসন করা শুরু করলাম। এছাড়া আমার কাছে আর কোনো উপায় ছিল না বাবা। আমাকে ভুল বুঝিস না । একজন মা তার সন্তানের ভালোর জন্য চোখ বন্ধ করে যেকোনো কিছু করতে পারে। আমিও যা করেছি তোর ভালোর জন্য করেছি। পারলে আমাকে ক্ষমা করিস।

ইতি
তোর পঁচা আম্মু

মা

রিফাত আহমেদ

লিখাঃ ১০ এপ্রিল ২০১৮

ব্ল্যাকমেইল

ফেসবুকে আব্বুর কমেন্ট দেখে চমকে উঠলাম । একটা গ্রুপে লেখা দিয়েছি। সেখানে আব্বু কমেন্ট করেছে “ভালো লিখেছেন ভাই”। শেষমেশ নিজের ছেলেকে ভাই বানিয়ে দিয়েছে!

আমিও সেখানে কমেন্ট রিপ্লাই দিলাম “থ্যাংকস “। সাথে সাথে আব্বু কমেন্ট রিপ্লাই দিলো “ভাই আপনার লিখা পড়ে ভক্ত হয়ে গেছি। আপনাকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছি, আশাকরি আপনার লিস্টে যায়গা হবে।”

চেক করে দেখলাম আব্দুর রাজ্জাক নামে আব্বুর আইডি থেকে রিকুয়েস্ট এসেছে। প্রোফাইলে আমার ছোট ভাইয়ের ছবি দেওয়া। কি করবো ভাবছিলাম।

ভেবে দেখলাম যেহেতু আমি ফেসবুকে ছদ্মনাম ব্যবহার করি আর প্রোফাইলে আমার কোনো ছবি দেওয়া নাই। তাহলে রিকুয়েস্ট একসেপ্ট করতে সমস্যা নেই। আফটার অল, যে আব্বু সারাদিন আমাকে ঝাড়ির উপর রাখে। সে ফেসবুকে আমার ফ্যান। ভেবেই মনের মধ্যে একটা আনন্দ চলে এলো। একসেপ্ট করে দিলাম।

সাথে সাথে দেখি আব্বু আমার প্রোফাইলের কাঁপা কাঁপি শুরু করে দিলো। লাইক আর কমেন্টের ঝড়ে, ফোনের নোটিফিকেশন তুফানের মতন আসতে লাগলো। ফোন হ্যাং হয়ে গেলো। মনে হচ্ছিল পাশের রুমে গিয়ে বলি আব্বু তোমার পা ধরি এবার থামো।
যে একটা নষ্ট ফোন চালাই তার উপর তোমার এই নোটিফিকেশনের অত্যাচার থামাও। অনেকক্ষণ পর আব্বু থামলেন।

রাত ১১ টার দিকে আব্বু মেসেজ দিলেন। “ভাই তুমি মনে হয় আমার ছোট হবে। আমার বয়স আটচল্লিশ চলে। আমার দুইটা ছেলে একটা মেয়ে আছে। আমি তোমাকে তুমি করেই বলি?” আমি রিপ্লাই দিলাম “ঠিক আছে সমস্যা নেই।” আব্বু আবার মেসেজ দিলো “কাল কখন গল্প পোস্ট দিবা?” আমি রিপ্লাই দিলাম ” সকাল ১০ টার দিকে।”

পরেরদিন একটা গল্প লিখলাম যেখানে একজন বয়স্ক লোক। স্ত্রী, বাচ্চাকাচ্চা থাকার পরেও একজন মহিলার সাথে প্রেমে করে । কিন্তু তার স্ত্রী ও বাচ্চাকাচ্চা প্রেম ব্যাপারে জানতে পারলে বয়স্ক লোকটি বলে। তার একাকিত্ব কাটানোর জন্য প্রেম করে, এছাড়া কিছু না।

আব্বু গল্পটি পড়ে আমাকে মেসেজ দেয়। “ভাই, তুমি ঠিক আমার জীবনের গল্প লিখেছ ভাই।আমিও প্রচণ্ড একাকিত্বে ভুগি। আমিও প্রেম করতে চাই ভাই। তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ এমন একটা গল্প লিখবার জন্য।” আব্বুর মেসেজ দেখে আমি টাস্কি! কয় কি এইসব। দাঁড়াও আম্মুকে যদি না বলি।কিন্তু আম্মুকে বললে সব মজা এখানেই মাটি হয়ে যাবে। তাই আব্বুকে রিপ্লাই দিলাম “ধন্যবাদ, শুনে খুব ভালো লাগলো যে আমার গল্পগুলো আপনার ভালো লাগে।” আব্বু আবার মেসেজ দিলো “কাল কখন গল্প পোস্ট দিবা?” আমি রিপ্লাই দিলাম ” বিকাল ৪ টার দিকে।”

পরেরদিন এমন একটা গল্প লিখলাম যেখানে বাবা ছেলে মেয়েদের সাথে ঠিকমতন কথা বলে না।তাদের চাহিদার কথা মাথায় রাখে না। ফলে পিতার সাথে তার ছেলেমেয়ের দূরত্ব বেড়ে যায়। পিতার দোষেই এমন হয়। সেটাই ছিল গল্পের বিষয়।

আব্বুর মেসেজের অপেক্ষা করতে লাগলাম। কিন্তু আব্বুর কোনো মেসেজ আর আসে না। চেক করে দেখলাম আব্বু অনলাইনে এক্টিভ আছে কিনা। দেখি হ্যাঁ আব্বু এক্টিভ। তাই আমি মেসেজ দিলাম “আজকের গল্পটা কেমন লাগলো”।আব্বু একটা লাইক ইমু দিয়ে অফলাইন হয়ে গেলো।

পরেরদিন বিকালবেলা ঘুমিয়ে আছি।এমন সময় আব্বু এসে ডাকছে। উঠে বসলাম বিছানায়। আব্বু আমার হাতে একটা প্যাকেট দিয়ে বলল এটা তোর জন্য। অনেকদিন থেকেই চাচ্ছিলি। দিবো দিবো করে দেওয়াই হয়নি। প্যাকেট খুলে দেখি নতুন ফোন। আমার আনন্দ দেখে কে! আব্বুকে বললাম এসো ছবি তুলি। আব্বুর সাথে একটা সেলফি তুললাম। আব্বু চলে গেলে সাথে সাথে সেটা প্রোফাইল পিক করে দিলাম।

একটুপর আব্বু এসে বলে হারামজাদা তুই সেই ” দুরন্ত মুসাফির ” আইডি চালাস। আমার কাছে এইভাবে ব্লাকমেইল করে ফোন নিলি। তোর আম্মুরে যদি বিচার না দিছি। আমিও আব্বুকে বললাম তুমিও যে অন্য মেয়ের সাথে প্রেম করতে চাও এই বয়সে সেইটার স্ক্রিনশট ও আমার নেওয়া আছে।আমিও আম্মুকে দেখাবো। আব্বু আমার কথা শুনে হেসে বলে “তোর ফোন থেকে ছবিটা আমাকে পার করে দে।আমার প্রোফাইল পিক দিবো।”

ব্ল্যাকমেইল

রিফাত আহমেদ

লিখাঃ ৮ এপ্রিল, ২০১৮

হকার

হকার

রিফাত আহমেদ

লিখাঃ ১২ মে ২০১৮

প্লেনে উঠেই গার্লফ্রেন্ড বলল, “তুমি নাকি আমার জন্য সব করতে পারবা। আমি বললাম “অবশ্যই”। গার্লফ্রেন্ড বলল, ” তাহলে এই প্লেনের মধ্যে হকারি করো দেখি।”

গার্লফ্রেন্ডের কথা শুনে বেলুনের মতন গর্বে যেমন বুক ফুলে উঠেছিলাম,প্লেনে হকারির কথা শুনে ঠিক সেইভাবেই চুপসে গেলাম। জীবনে কেউ শুনেছে প্লেনে হকারি করা যায়?

গার্লফ্রেন্ডকে বললাম ” ইয়ে মানে এর থেকে কঠিন কিছু থাকলে বলো( ভাব নিয়ে)। এটা তো খুব সহজ কাজ”। গার্লফ্রেন্ড বলল ” আগে এটাই করে দেখাও। যতো সুন্দর করে করবা ততোই বাবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় এগিয়ে আসবে। নাহলে কিন্তু অন্য কাউকে নিয়ে গিয়ে বাবার সাথে পরিচিত করিয়ে দিবো”।

সম্রাট শাহজাহান যদি প্রেমের জন্য তাজমহল বানাইতে পারে।

আমি প্রেমের জন্য হকারি করলে কি দোষ? এছাড়া গার্লফ্রেন্ড সরাসরি কলিজাতে হাত দিয়েছে।

নিজের সম্মান বাঁচাতে সীট থেকে উঠে হকারি করতে যাবো এমন সময় মনে হইলো ঢাকার বাসে যারা হকারি করে তারা নানা রকম জিনিস বিক্রি করে।

কিন্তু এই প্লেনে আমি কি বিক্রি করবো।

গার্লফ্রেন্ড কে বললাম ” ইয়ে মানে হকারি করতে তো জিনিসপাতি লাগে।

আমার কাছে তো কিছুই নেই”।

গার্লফ্রেন্ড আমার কথা শুনে ওর হাতের ব্যাগটা থেকে একটা ব্রাশের পাতা বের করে দিলো।

গুণে দেখলাম সেখানে ১২ টা ব্রাশ।

ব্রাশ গুলো হাতে নিয়ে উঠে যেই দাঁড়াতে যাবো ঠিক তখনি গার্লফ্রেন্ড বলল ” যদি ঠিকমতন হকারি না করতে পারো কি হবে বলেছি তো,মনে আছে”?

আমি হকারদের মতন হাতে ব্রাশের পাতা পেঁচিয়ে বললাম “হ্যাঁ হ্যাঁ মনে আছে”।

কিছুটা সময় নিয়ে ভাবতে লাগলাম কিভাবে লোকাল বাসে হকাররা হকারি শুরু করে। তারপর ব্রাশ গুলো হাতে নিয়ে হকারি শুরু করে দিলাম।
” ডিয়ার ভাই ও বোনেরা,

আপনাদের কি দাঁতের সমস্যা? ঠিকমতন দাঁত ব্রাশ করেন না বলে দাঁতে ময়লা জমে গেছে?

দাঁতের গোড়ায় পোকা হয়ে দিন দিন দাঁত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে? মুখের দুর্গন্ধে চারপাশের মানুষের সাঠে ঠিকমতন কথা বলতে পারছেন না? তাহলে এক্ষুনী সংগ্রহ করুন বাংলাদেশের নাভানা কোম্পানির এই মূল্যবান ব্রাশ। সকালবিকাল দুবার এই ব্রাশ করে দাঁগ মাজলে আপনার দাঁত হবে চকচকে ফকফকে”। তারপর ব্রাশের পাতা থেকে একটা ব্রাশ বের করে হাত উঁচু করে সবাইকে দেখিয়ে বললাম “দাম মাত্র দশ টাকা দশ টাকা”। প্লেনের মানুষজন আমার দিকে এলিয়েন দেখার মতন করে তাকিয়ে আছে।

গার্লফ্রেন্ডের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি আমার দিকে রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। গার্লফ্রেন্ডের ভয়ে আবার বলা শুরু করলাম। “আমার দাদা ছিলেন বিখ্যাত হকার কালু শেখ, তিনি সারাজীবন ট্রেনে হকারি করেছেন। তারপর তার ছেলে লাল শেখ ছিল আমার বাবা।উনি সারাজীবন বাসে হকারি করছে। আমি লাল শেখের ছেলে ধলা শেখ তাই প্লেনে হকারি করি।”

দেখি পিছন থেকে একটা বয়স্ক মহিলা আমাকে ডাকছে। কাছে যাবার সাথে সাথে উনি আমাকে দশ টাকা দিয়ে হাতের ব্রাশ টা নিয়ে নিলো।

তারপর এক বয়স্ক সাদা লোক আমাকে ডাকলো। উনার কাছে এগিয়ে যেতেই উনি বলল ” হ্যালো মিঃ ধলা শেইখ ( ইংরেজরা বাংলা উচ্চারণ করলে যেমন হয়)। আমি বললাম ” ইয়েস স্যার”। উনি বললেন ” টোমার আইডিয়া আমার খুব পছন্দ হইয়াছে। টুমি একমাত্র হকার যে প্লেন হকারি সূচনা করিয়াছ। যদি নোবেল কমিটি এইরকম মানব সেবায় নোবেল দিতো। টাহলে আমি টোমার নামে ওদের কাচে সুপারিশ করতাম “। আমি খুশিতে বললাম ” থ্যাংকইউ স্যার”। তারপর উনি বললেন ” আমাখে দুইটা নাভানা কোম্পানির ব্রাশ দেও”। সাথে সাথে ব্রাশের পাতা থেকে দুইটা ব্রাশ খুলে উনার হাতে দিয়ে দিলাম।

এরমধ্যে দেখি দুইজন এয়ার হোস্টেজ আমার দিকে দৌড়ে আসছে। ভয়ে কলিজা শুকিয়ে গেলো। আল্লাহ! আজ নিশ্চিত ওরা আমাকে প্লেন থেকে নিচে ফেলে দিবে। ঠিক তখনি হঠাৎ করে আমার গার্লফ্রেন্ড এগিয়ে এসে ছোট বাচ্চার মতন করে আমাকে বলল ” লক্ষী সোনা এমন করে না, চলো চলো সীটে বসো। মানুষ খারাপ বলবে বাবু”। গার্লফ্রেন্ডের এতো সুন্দর ব্যবহার দেখে অবাক হয়ে গেলাম। কিন্তু সেই অবাক আর বেশিক্ষণ থাকলো না যখন সে প্লেনের সবাইকে উদ্দেশ্য করে ইংরেজিতে বলল ” আপনারা সবাই ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। আমার স্বামী একজন মানসিক রোগী। উন্নত চিকিৎসার জন্য ওকে আমেরিকা নিয়ে যাচ্ছি”।

এবার দেখি প্লেনের সবাই আমার দিকে মায়ার দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এয়ার হোস্টেজ গুলার মুখ ও দেখার মতন ছিল। একজন এয়ার হোস্টেজ এগিয়ে এসে আমার হাতে একটা ললিপপ দিয়ে বলল, “এটা খাও, অনেক মিষ্টি।”

তারপর প্লেনে আমার আর কোনো সমস্যা হয়নি। গার্লফ্রেন্ড ও খুশি আমিও খুশি।

কিন্তু বাংলাদেশে ফিরবার পর এয়ারপোর্টে বিশাল ভিড় দেখে ভয় পেয়ে গেলাম। পাশের একজন কে বললাম ভাই এতো ভিড় কিসের? লোকটি বলল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নাকি কোন দেশ থেকে বাংলাদেশে এসেছে তাই এতো ভিড়। আমি নিজের মতন একা একা হেঁটে যেইনা এয়ারপোর্ট থেকে বের হচ্ছি। দেখি সবার হাতে আমার ছবি। কেউ কেউ আমার ছবিতে মালা দিয়েছে। কেউ কেউ আমার ছবির নিচে লেখেছে দেশের গর্ব, জাতীর গর্ব মিঃ ধলা হকার। চোরের মতন এয়ারপোর্ট থেকে পালিয়ে বাসায় এসে শুনি কোন হারামজাদা যেন আমার প্লেনে হকারির ভিডিও নেটে ছেড়ে দিয়েছে। তাই বাংলাদেশের হকাররা আমাকে স্বাগতম জানাতে এয়ারপোর্ট গিয়েছিল।

 

লোকাল বাস

লোকাল বাস

রিফাত আহমেদ

লিখাঃ ১৬ মে ২০১৮

বাসে উঠে বসতে না বসতেই পাশের সীটের একটা সুন্দরী মেয়ে বলে উঠলো “ও মাই গড! আপনি এতো সুন্দর কেন? আমার গায়ে হাত দিয়ে বলল আপনার বডি এতো সুন্দর কেন! নিশ্চই জিম করেন?

জীবনে আব্বা-আম্মা আমাকে কালাচাঁদ ছাড়া ডাকে নাই। গার্লফ্রেন্ড আদর করে কালু ডাকে। কিন্তু আজ এই বাসে এই মেয়ে আমার মধ্যে এমন কি দেখে সুন্দর বলল বুঝতে পারলাম না। মনে মনে লজ্জা পাচ্ছিলাম।

একটুপর মেয়েটা আমার পাশে বসা ছেলেটাকে বলল “এই যে ভাই আপনি উঠুন, আমি এই ভাইয়ের পাশে বসতে চাই।আপনি আমার সীটে বসুন”। দেখলাম ছেলেটা সুড়সুড় করে পাশের সারির মেয়েটার সীটে গিয়ে বসল। মেয়েটা বসল আমার পাশে। খেয়াল করে দেখলাম মেয়েটা বেশ সুন্দর।
কয়েকদিন আগে টিভির বিজ্ঞাপন দেখে একটা ফেসওয়াশ কিনেছিলাম। বিজ্ঞাপনে বলা ছিল এই ফেসওয়াশ চার সপ্তাহ মাখলে ত্বক হবে উজ্জ্বল ও চকচকে। কিন্তু দুই সপ্তাহেই যে কাজে দিবে এটা ভাবিনি।

মেয়েটা এবার বলল ” আপনার গার্লফ্রেন্ড আছে”?
লোকাল বাসে সুন্দরী মেয়ে পাশে বসলে সব ছেলেরাই সিঙ্গেল হয়ে যায়। তাহলে আমি কি দোষ করছি? তাই মেয়েটাকে বললাম ” জ্বী না আমি সিঙ্গেল”। মেয়েটা এবার সরাসরি বলল ” প্রেম করবেন আমার সাথে”? মেয়েটার কথা শুনেই মনের মধ্যে জেমস ভাইয়ের ” ঝাকানাকা দেহ দোলানা” গানটা বেজে উঠলো। সারাজীবন গার্লস স্কুলের পাশে দাঁড়িয়ে থেকে মেয়ে পটাতে পারিনি। যে মেয়েকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছি সেই মেয়ে বলেছে আয়নায় নিজের চেহারা দেখতে। এক মেয়ে তো বলেই দিয়েছে কয়লা আর আমার চেহারার মধ্যে কোনো পার্থক্য নাই, দুইটাই কালা। ইসস যদি পাশে বসা সুন্দরী মেয়েটার কথাটা ভিডিও করে ওদের দেখাতে পারতাম। মেয়েটাকে উত্তর দিতে যাবো এর মধ্যে আরেকটা মেয়ে পাশে এসে দাঁড়ালো।

দাঁড়িয়ে আমার পাশে বসা মেয়েটিকে বলল ” বাসে বসা সুন্দর ছেলেদের দেখলেই প্রেম করতে ইচ্ছে করে, না? এই ছেলেকে আমার পছন্দ হয়েছে। তুই অন্য কাউকে দেখ”। দেখলাম আমার পাশে বসা মেয়েটা উঠে চলে গেলো। এবার যে মেয়েটা এলো সে আরো সুন্দরী দেখতে। আমি তাড়াতাড়ি ফোন বের করে সামনের ক্যামেরায় নিজের চেহারা দেখে নিলাম। সত্যি এটা আমি নাকি অন্য কেউ। নিজেকে রেস থ্রির সালমান খান মনে হচ্ছিল,শুধু চশমাটাই নাই। বাসায় ভুলে সানগ্লাস ফেলে এসেছি বলে নিজের উপর রাগ হচ্ছিল। নতুন মেয়াটা এবার বলল ” ওয়াও, আপনি আমার দেখা সেরা পুরুষ । প্রেম করবেন আমার সাথে”? মেয়েটার কথা শুনে বুকের মধ্যে ধপাস ধপাস শুরু হয়ে গেলো। গর্বে বুক ফুলে উঠলো। মনে মনে সেই ফেসওয়াশ কোম্পানি কে অনেক ধন্যবাদ দিলাম। মেয়েটাকে উত্তর দিতে যাবো এমন সময় দেখি আরো তিনটা মেয়ে এসে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে।

ওরা তিনজন একসাথে বলে উঠলো ” এই ছেলে প্রেম করবে আমার সাথে?”। এবার আমার পাশের বসা মেয়েটা উঠে ওদের সাথে মারামারি শুরু করলো। চারজন মেয়ে আমার চার হাত পা ধরে বাসের মধ্যে টানাটানি শুরু করলো। একজন বলে এই ছেলে আমার, আরেকজন বলে না না এই ছেলে আমার। ওদের টানাটানি তে আমার গুলিস্তান থেকে কেনা নতুন শার্ট ছিঁড়ে গেছে। প্যান্ট ছিঁড়া ছিঁড়া অবস্থা। নিজেকে সালমান খান ভাবা ছেড়ে টম ক্রুজ ভাবতে শুরু করলাম। আহা! সুন্দরী মেয়েরা আমাকে পাবার জন্য আজ মারামারি করে। এই দিন যে আসবে কল্পনাও করিনি।এর মধ্যে বাসের হেলপার এক লাঠি নিয়ে দৌড়ে এসে বলল ” ঐ তোরা সবাই বস, নাহলে কারেন্ট শখ দিবো ” সাথে সাথে চারটা মেয়ে আমাকে ছেড়ে দিলে আমি গাড়ির মধ্যে ধপাস করে পড়ে গেলাম।

হেলপার কাছে এসে বলল ” ঐ মিয়া আপনি কখন উঠলেন বাসে? ও বুঝছি, সিগারেট কিনতে নামছিলাম তখনি উঠছেন তাইনা? তাড়াতাড়ি নামেন ভাই, এই বাস পাবনা যাবে। বাসের মধ্যে যারা আছে তারা সবাই পাগল। ওদের সবাইকে পাবনার মানসিক হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি। হেলপারের কথা শুনে অজ্ঞান হয়ে গেলাম। জ্ঞান ফিরলে দেখি আমি পাবনার মানসিক হাসপাতালে।

 

অন্তরালের অনুভূতি

অন্তরালের_অনুভূতি

মিলিকে বিয়ে করার পর বাসর রাত থেকে অবাক হওয়া শুরু হয়েছে,সেটা এখনো চলছে।

আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু বাসর রাতে ঘরে ঢোকার আগে আমাকে খুব করে বলল,,,

–বউকে যতটা সম্ভব হাতের মুঠোয় রাখবি ?

–কিভাবে ?

–খুব ভয় দেখাবি,,,,আর কঠিন গলায় কথা বলবি,,,,

আমি একটু অবাক হয়ে বললাম,,,,,

–ভার্সিটি পড়ুয়া একটা মেয়ে,আমি তাকে এভাবে ভয় দেখাবো আর সে পাবে,,,,

–হুম,,,,পাবে,,,,

আমার বন্ধু হয়তো ভুলেই গেছে যে, বিয়ের পর থেকে ওর বউ ওকে এখানো হাতের মুঠো করে রেখেছে সেটা আমি যানি না।

যে মানুষ নিজের বউকে হাতে রাখতে পারেনি। এখনো নিজের বউয়ের কথায় উঠ বস করে।
এরকম একজন মানুষের থেকে টিপস নিয়ে নিজের বউকে হাতে রাখার চিন্তা করা নেহাত বোকামি ছাড়া আর কিছুই না।

তাই এসব চিন্তা বাদ দিয়ে বাসর ঘরে ডুকলাম,,,

মিলিকে আগে থেকেই হালকা চিনতাম।মিলি আমার মায়ের বান্ধবীর মেয়ে দু একবার আমাদের বাসায় এসেছিল।

আমি বিছানায় গিয়ে বসতেই মিলি বলল,,,,

–কোন বুদ্ধি করে আসছ ?


–কিসের বুদ্ধি ?


–আমাকে হাতে রাখার ?

–নাহ,,,

–সত্যি,,

–আসলে, খুঁজেছি কিন্তু কোন বুদ্ধি পাইনাই।

–আর কখনো খুঁজবাও না কোন বুদ্ধি।

–কিন্তু তুমি কিভাবে বুঝলা ?

–সব ছেলেরাই এমনই হয়,,,বাসর রাতে বিড়াল মারার চিন্তা ভাবনা করে আসে।যাতে মেয়েরা তাদের সব সময় ভয় পায়।

–ওহ্,,,,তোমার তো দেখি ভালো অভিজ্ঞতা আছে এই ব্যাপারে।আগে কি কখনো বিয়ে হয়েছিল নাকি ?

–আজব,,,এসব জানতে হলে কি বিয়ে করা লাগে নাকি।

–তাহলে,,,

–যে বান্ধবী গুলির বিয়ে হয়েছে তাদের থেকে জেনেছি।

ওহ্

–কেন তোমার বন্ধুরা তোমাকে এই ব্যাপারে কিছু বলেনাই,,,

–ওরা আর কি বলবে,,,নিজেদের বউকে হাতের মুঠোয় আনতে গিয়ে নিজেরাই বউদের হাতের মুঠোয় চলে গেছে,,,

–তাই,,,নাকি,,,

–হম,,

সেদিন থেকে মিলিকে একটু কঠিনই মনে হত।তবে এখন অতটা মনে হয়না।

কিছুদিন আগের ঘটনা,,,

রাতে বাসায় ফিরে দেখি মিলি বই পড়তেছে,,,

ওর কাছে গিয়ে বললাম কাল তো আমার অফিস বন্ধ।চলো কাল কোথাও ঘুরতে যাই,,,

আমার কথা শুনে মিলি কোন উওর দিল না।

মিলির কাছ থেকে আশা অনুরূপ কোন উওর না পেয়ে খুব হতাশ হলাম।

পরের দিন বিকেল বেলা মিলি আমাকে দুটি শাড়ি দেখিয়ে বলল কোন শাড়িটি পরলে আমাকে মানাবে,,,,

–দুটি শাড়িই খুব ভালো।তুমি যাই পরবে তাতেই তোমাকে ভাল লাগবে,,,

আধা ঘন্টা পর মিলি রুম থেকে বেরিয়ে এল নীল শাড়িটা পরে।ও নীল শাড়িটা পরাতে আমি একটু আবাকই হলাম।

কারো প্রতি ভালবাসা থাকলে হয়তো তার মনের কথা জানা যায়।আর মিলিও হয়তো এভাবেই আমার মনের কথাটা জেনেছে।

মিলি আমার কাছে এসে বলল,,,

–কেমন লাগছে আমাকে ?

–ভাল,,

–শুধু ভাল,,,আর কিছু না।

আমি মিলির কপালের টিপ টা ঠিক জায়গাতে বসিয়ে তারপর বললাম এখন পারফেক্ট লাগছে।

–আমি কপালের টিপ টা ইচ্ছা করেই ঠিক জায়গাতে পরিনি।

–কেন ?

–তোমাকে পরীক্ষা করে দেখলাম আমার সবকিছু তোমার নজরে পরে কি না।

–হম বুঝলাম,,,কিন্তু এত সেজে গুজে কোথায় যাচ্ছ তুমি ?

–ঘুরতে,,,

–কার সাথে ঘুরতে যাবে ?

–তোমার সাথে,,

–কাল রাতে যখন ঘুরতে যাওয়ার কথা বলছিলাম তখন তো কিছুই বললে না।

–তখন বলিনি তো কি হয়েছে এখন তো বলছি,,,

যাও তারাতারি রেডি হয়ে আসো আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করতেছি,,,,

আমি রেডি হয়ে এসে দেখি মিলি আমার জন্য বসে আছে।তারপর দুজন একসাথে বের হলাম।

–এই রিক্সা যাবে ?

–কোথায় যাবেন ‘স্যার’

–যাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোন গন্তব্যে নেই।তোমার ইচ্ছা অনুযায়ী এই শহরের অলিতে গলিতে সন্ধ্যা নামার আগ পযন্ত আমাদের কে তোমার রিক্সায় নিয়ে ঘুরবা।

–আচ্ছা ‘স্যার’,,,, রিক্সায় উঠে বসেন।

রিক্সা চলতেছে তার আপন গতিতে।মিলি তাকিয়ে আছে প্রকৃতির দিকে আর আমি তাকিয়ে আছি মিলির দিকে।

এভাবেই চলুক না কিছুটা সময়,,,,,,,,,,,,


(সমাপ্ত)

লেখা || Tuhin Ahamed