বসের সাথে প্রেম পর্ব- ০৮

বসের সাথে প্রেম

পর্ব- ০৮

লেখা- অনামিকা ইসলাম।

ছেলেটির ডায়েরী_
মায়াকে রাগের বশে থাপ্পরটা মেরেছিলাম, হঠাৎ করে কোথা থেকে এই রাগ’টা চলে আসল বুঝতে পারিনি। বুঝতে পারিনি কেন’ই বা ওর গায়ে হাত তুললাম। আর যখন বুঝতে পারলাম তখন মনে হলো খুব বেশী অন্যায় করে ফেলেছি। ও না হয় অচেনা, অজানা ছেলেদের সাথে কথা বলছে, তাই বলে আমি কেন ওকে মারলাম? ওকে মারার তো আমার কোনো অধিকার নেই। ও যার সাথে কোনো তার সাথেই কথা বলবে, হাসাহাসি করবে। তাই বলে আমি ওকে মারব কেন? তাও আবার অনেক মেহমানের সামনে। কি রকম অপমানিত’ই না হলো মেয়েটি। দৌঁড়ে গেস্টরুমে, মায়াকে খুঁজলাম। নাহ, ও এখানে নেই। তারপর দৌঁড়ে গেলাম সাইমার রুমে। নাহ, ও এখানেও নেই। মা-বাবা সবার রুমে গিয়েও ওকে খুঁজে পেলাম না। হঠাৎ’ই মনে সাইমার রুমের বিছানায় কি যেন একটা দেখে এসেছি। দৌঁড়ে গেলাম সেখানে। গিয়ে দেখি বিছানায় একটা নূপুর পরে আছে। খেয়াল করে দেখলাম মায়াবতীর নূপুর। হয়তো ওর অজান্তেই পা থেকে পরে গেছে, ও খেয়াল করেনি। নূপুর’টা হাতে নিলাম। নূপুরের গায়ে হাতের স্পর্শ বুলিয়ে দিলাম। তারপর সেটা আমার পকেটের ভিতর রেখে দিলাম। রুম থেকে বের হওয়ার সময় আরো একটা জিনিস চোখে পরে। সেটা হলো বোনের ফোন। ফোন’টা দিতে গিয়ে দেখি বোন’টার কাছে গে’ষার তিল পরিমাণ জায়গা নেই। সবাই ওকে নিয়ে ব্যস্ত এখন। কন্যা সমর্পণের শেষে ওকে গাড়িতে তুলে দেওয়া হলো। ভীর ঠেলে ওর কাছে গেলাম। ফোন’টা এগিয়ে দিত যাব, তখন’ই আবির বলল। ভাইয়া মাথা খারাপ হয়েছে আপনার? এই মেয়েকে এখন ফোন হাতে দিবেন তো দেখবেন সারারাত ফেবুতে গুঁতাগুঁতি করছে। আপনি বরং ফোন’টা আপনার কাছে রেখে দেন। ৬টা Y প্রেস করে আনলক বাটনে চাপ দিবেন। ব্যস, হয়ে যাবে।
বোনকে আর ফোন’টা দেওয়া হলো না।
ফোন’টা হাতে নিয়ে বন্ধুকে সাথে নিয়ে রুমে ঢুকলাম। টেবিলের উপর ফোনটা রাখতে যাব ঠিক তখন’ই দেখি মেসেজ ফর্ম মায়া….
লকটা খুলে মেসেজটা ওপেন করলাম। লিখা—
‘ সাইমা….
রাগ করিস না।
শরীর’টা একদম ভালো লাগছিল না, তাই চলে এলাম। আফসোস, বিদায় বেলায় তোর ঐ চাঁদবরণ মুখটা দেখতে পারলাম না। সে যায় হোক।
শোন, তোর ফোনে আমার যে ছবিগুলো আছে সব চোখ বোজে ডিলিট করে দিস। ছবিগুলো খুব বাজে হয়েছে…. “
মায়ার মেসেজ পরে তাড়াতাড়ি অতি আগ্রহ নিয়ে গ্যালারীতে ঢুকলাম। গ্যালারীতে ঢুকে হাজারখানেক ছবি দেখলাম। এর মধ্যে মায়ার একক ছবি শ’খানেক। বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ড্রেসে তোলা। নববধূর মত লাজে রাঙা মুখে একটা ছবি তুলেছে, সেটা বোধ হয় আজকেরই। ছবিগুলো দেখে কেন যেন মায়া সামলাতে পারলাম না। আমার ফোনের শেয়ারইট’টা চালু করে নিয়ে গেলাম শত এর অধিক ছবি। তারপর বোনের ফোন’টা রেখে দিলাম আলমারিতে…
ছবিগুলো যতই দেখছিলাম ততই দূর্বল হয়ে পরছিলাম ওর প্রতি। কেন জানি, ছবিগুলো না দেখলে আমার ঘুম আসতো না রাত্রে। মায়ার ঐ মায়াবী মুখটা দেখেই রাত্রে ঘুমুতে যেতাম, ভোরে ঘুম থেকে উঠলাম। অফিস থেকে গুটিয়ে নিয়েছিলাম নিজেকে। কারন, খুব বেশী দুর্বল হয়ে পরছিলাম। বাবাকে সব দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে আমি সারাদিন একলা রুমের মধ্যে শুয়ে থাকি। ধীরে ধীরে শরীরটা দুর্বল হয়ে যেতে থাকে। ব্যপার’টা বাবা-মা লক্ষ করল। লক্ষ করল ওনার ছেলে একটা চাঁপা কষ্টের মধ্যে আছে। সেদিন বন্ধুর সাথে রুমে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম।
আড্ডার টপিক ছিল ‘মায়া’।
আতিক আমার বাল্যকালের একমাত্র বন্ধ হওয়ায় তার সাথে সবকিছু শেয়ার করতাম। সেদিন রুমে শুয়ে কান্না করছিলাম আর হাতে জোরে জোরে আঘাত করছিলাম। ঘটনাক্রমে আতিক এসে উপস্থিত হয় এবং আমার হাত’টা ধরে ফেলে। আমি নিজেকে কন্ট্রোল করতে না পেরে কান্না করতে করতেই বলি,
বাধা দিস না তুই…
আমি এ হাত দিয়ে ওকে আঘাত করেছিলাম, এ হাত আমি রাখব না। রাখব না আমি এ হাত।
শেষ করে ফেলব আমি আজ….
আতিক আবারো আমার হাতটা ধরে ফেলে। তারপর আমাকে শান্ত করে জিজ্ঞেস করে….
‘ কাকে আঘাত করেছিস?’
আমি মায়া বলতে গিয়ে আতিকের দিকে চেয়ে থেমে গেলাম। আতিক বলল__
” মা বলে থেমে গেলি কেন? বল। বলে ফেল মায়া’কে আঘাত করেছি। তার জন্য কষ্ট পাচ্ছি। আরে ইয়ার! ঐ মেয়েটার সাথে না তোর কোনো সম্পর্ক নেই? তবে কাঁদছিস কেন?!!! নিজেকেই বা কষ্ট দিচ্ছিস কেন? আতিকের কথা শুনে বলে ফেললাম, আছে সম্পর্ক। আছে…
মায়ার সাথে আমার সম্পর্ক আছে। আতিক চোখ বড় বড় করে বলল,
তাই?! তা কিসের সম্পর্ক আছে শুনি? জানি না, আমি কিচ্ছু জানি না। চোখ বোজে উত্তর দিলাম। আতিক আমার মুখটা ওর দিকে ঘুরালো। আমি ওর দিকে তাকিয়ে আছি…
ও বলছে-
এবার বলতো?!!!
সত্যি’ই কি তুই কিছুই জানিস না? আমি এবার আতিকের থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে বললাম,
না…
আতিক রেগে গিয়ে আমায় বললো বলবি না তো?!!!
এবার আর সত্যি গোপন করতে পারলাম না। বলে দিলাম মায়াকে আমি ভালোবাসি। ভিষণ রকম ভালোবাসি। ওকে ছাড়া আমার চলবে না।
বলেই হু হু করে কেঁদে দিলাম। কান্না’টা এত জোরেই করে ফেলেছিলাম যে, আমার কান্না শুনে বাবা-মা ছুটে আসল রুমে।
কি হয়েছে, কি হয়েছে বলে পাগল করে ফেলল।
আমি কান্না থামিয়ে চুপ করে আছি। ওদের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সাহস আমার নেই। আমি ভয়ে চুপসে আছি। ঠিক তখন’ই আতিক এর উপযুক্ত জবাব দিয়ে দেয়।
আতিকের উপস্থিত বুদ্ধির কাছে আমি সেদিন বেঁচে গিয়েছিলাম। আতিক বলেছিল, সাইমাকে ভিষন রকম মিস করি আমি। বোনের শূন্যতায় আমার ভেতর’টা হাঁহাকার করে। বাবা-মা চুপ করে রুম থেকে বের হয়ে গেল। সেদিন আমার জন্মদিন ছিল…..
সবাইকে ইনভাইট করলেও মায়াকে করিনি। করিনি বললে ভুল হবে করতে পারিনি। কেক কেটে সবাইকে খাইয়ে দিয়ে বাবা’কে যখন বললাম, বাবা! আমার এবারের সারপ্রাইজ কি?!!! বাবা আমায় চোখ বেধে উপরে নিয়ে গেলেন। উপরে আমার জন্য এত বড় সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে আমি বুঝতে পারিনি। আমার জীবনের সেরা সারপ্রাইজ বাবা আমায় সেদিন দিয়েছিল। আমার সামনে মায়া দাঁড়িয়ে…..

মেয়েটির ডায়েরী_
অসুস্থ্যতার জন্য ছুটি নিয়েছিলাম অফিস থেকে। বাসায় শুয়ে শুয়ে ছুটি কাটাচ্ছি আর একদৃষ্টিতে দুরের ঐ জানালার দিকে তাকিয়ে আছি। জানি জানালাটায় দেখতে পাব মানুষটাকে নয়। ভাবতে ভাবতেই চোখ’টা ঝাপসা হয়ে এলো, চোখের জল মুছতে যাব ঠিক তখনি ভালো আংকেলের কল। রিসিভ করে সালাম দিতেই ওনি আমায় ২ঘন্টার মধ্যে ওনার বাড়িতে যেতে বললেন। কেন জানি স্যারের সামনে যেতে মন সাই দিচ্ছিল না, তাই অসুস্থ্যতার অজুহাত দেখিয়ে না যাওয়ার কথা বলছিলাম। কিন্তু ওনার কড়া নির্দেশ ওনার ছেলের জন্মদিনে আমায় উপস্থিত থাকতেই হবে। ভালো আংকেল আমার জীবনের আশীর্বাদসরুপ। তিনি আছেন বলেই হয়তো আমি এখনো বেঁচে আছি। তাই ওনার কথা অমান্য করার মত দুঃসাহস আমার ছিল না। ছুটে গেলাম ওনার বাসায়।
আজ সিয়াম স্যারের জন্মদিন। অনেক সুন্দর করে বাড়িটা সাজানো হয়েছে। স্যারকেও আজ অনেক সুন্দর লাগছে নীল পাঞ্জাবীতে। ওনার চোখের নিষ্পাপ চাহনী যেন কাউকে খুঁজছে। একবার ঘড়ি আরেকবার বাইরের দিকে তাকাচ্ছেন ওনি।
যায় হোক….
যথাসময়ে কেক কাটা শুরু হলো। সবাই হাত তালি দিয়ে ওনাকে ওয়িশ করলেন।আমি দুর থেকে মনভরে শুভকামনা করলাম।
অনেক অনেক সুখী হোন স্যার, অনেক অনেক সুখী।
শুভকামনা নিরন্তর……..
আমি ঠিক এভাবেই আপনার জন্য দুর থেকে দোয়া করব।
কাছে কখনো পাব না জানি,তাই দুর থেকেই ভালোবেসে যাব। নিরবে ভালোবেসে যাব।
চোখের পানি মুছতে মুছতে রুমে চলে গেলাম। ক্ষাণিক বাদেই ভালো আংকেলের গলার স্বর শুনতে পেলাম।মনে হচ্ছে এদিকেই আসছে। বসা থেকে উঠে দাঁড়ালাম। সামনের দিকে এগিয়ে যেতেই থমকে দাঁড়ালাম। একি?!!!
ভালো আংকেল স্যারের চোখ বেঁধে নিয়ে আসছে কেন? আমার রুমে এনে স্যারের চোখের বাঁধনটা খুলে দেওয়া হলো। স্যার হা করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমিও স্যারের দিকে….
কি?!!! চমকে গেলেন বাপজান? স্যার কাঁপা গলায় জবাব দিলেন-
” এসবের মানে কি বাবা?”
আংকেল হেসে বলে উঠল-
” এটুকুতেই চমকে গেলে?
——————
বাবা, এসবের মানে কি?!!!
দাঁড়া বলছি বলে আমাকে
আংকেল ওনার সামনে নিয়ে গেল। আমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছি। আংকেল আমার একটা হাত ধরে আরেক হাতে সিয়াম স্যারের একটা হাত ধরলেন।
তারপর আমাকে ওনার হাতে তুলে দিলেন। অবাক হওয়ার মাত্রাটা এবার বহুগুনে বেড়ে গেল। আমি চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছি, আর আমার হাত স্যারের মুঠোবন্দি। স্যার এভাবে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বলল,
এবার কি করতে হবে বাবা?
আংকেল বললেন-
তুই না বোন হারিয়ে বিহ্বল হয়ে গিয়েছিলে? উদাসী হয়ে গিয়েছিলি? বোনের চিন্তায় চিন্তায় খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলি? তার জন্য এই ব্যবস্থা। আজ এখন থেকে তোরা দু’জন ভাই-বোনের সম্পর্কে আবদ্ধ হইলি। মায়া তোর বোন। সাইমার মত’ই আরেক বোন। এখন থেকে ও এ বাড়িতেই থাকবে। কি বলো সিয়ামের মা?
রুমে ঢুকতে ঢুকতে আন্টির মিষ্টি জবাব,
সে আর বলতে হয়?
আমার মেয়ে হয়ে সে কি ভাড়া বাসায় থাকতে পারে?
কখনো না…..
আর তাই ও এখানেই থাকবে।
-‘ সিয়াম-মায়া…….
তোরা ভাই-বোন কথা বলা শেষ করে নিচে আয়।
নিচে সবাই অপেক্ষা করছে। আংকেল-আন্টি চলে গেল। আমি চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছি মাথা নিচু করে। আর ভাবছি কি থেকে কি হয়ে গেল….
ভাবনাচ্ছেদ ঘটে স্যারের ‘মায়া’ ডাকে।
জি স্যার বলে স্যারের দিকে তাকালাম।
————+++++————–
ওনি রেগে গিয়ে বললেন,
স্যার নয়, ভাইয়া ডাকবা…..
ভাইয়া……………..
বুঝছ মায়া পরি?😊😊
আমি তোমার ভাই হয়……
ভাই………..✌✌

– মাথা নিচু করে মনে মনে মুখস্থ করতে লাগলাম—
ভাইয়া…………😒😒

চলবে।

বসের সাথে প্রেম পর্ব- ০৭

বসের সাথে প্রেম
পর্ব- ০৭

লেখা- অনামিকা ইসলাম।

মেয়েটির ডায়েরী_
সেদিন(বিয়ের) সারাটা দিন আর স্যারের সামনে যায়নি। শুধু যায়নি বললে ভুল হবে, লজ্জায় যায়নি। রাতের ঘটনায় ভিষণ লজ্জা পেয়েছিলাম। ফোন’টা আমি ভালো নিয়তেই নিয়েছিলাম আর স্যার কি না আমায় চোর ভেবে নিল….!!!!
কি লজ্জা! কি লজ্জা!!!
সত্যি’ই ব্যপারটা চরম লজ্জাকর ছিল আমার জন্য। সকাল থেকেই একমাত্র বান্ধবীটার সাথে বসে আছি। ওর মেহেদি দেওয়া,খাওয়া-দাওয়া, গোসল সবকিছুতেই আমি। আমি ছাড়া যেন ওর চলবেই না। বেলা এগারো’টা। ওকে সাজানোর জন্য পার্লার থেকে চারটা মেয়ে এসেছে। ও ওর বাবা’কে বলল, মাত্র চারটা মেয়ে কেন? আমার কমপক্ষে ১০,১২টা মেয়ে লাগবে। ওর বাবা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল__
১০,১২টা মেয়ে দিয়ে কি করবা সাইমা? বলিষ্ঠ কন্ঠে ওর জবাব- বিয়ের জন্য যেমন ৬টা বেনারসি কেনা হয়েছে, ঠিক তেমনি সাজানোর জন্যওও কমপক্ষে ১২জন মেয়ে তো লাগবেই। কেন লাগবে সেটা এখন জিজ্ঞেস করবা না একদম, উত্তর দিতে পারব না। ওর বাবা আর কথা বাড়ালেন না। সাথে সাথে ফোন দিয়ে ঢাকা শহরের সেরা পার্লার থেকে সেরা ১০জন মেয়েকে আনা হয়। তখন কে জানত ওর মাথার ভিতর এত প্যাচগোচ ঘুরপাক খাচ্ছে?! ওর ইচ্ছে, আবিরের থেকে আমরা টাকা উদ্ধার করি অন্দরমহলে। আর সেটা চেয়ে কিংবা জোর করে নয়। ও যাতে ফাঁদে পরে আপনাআপনিই দিয়ে দেয়, সেই ব্যবস্থাই করল। আমি সহ ওর ৫টা বান্ধবীকে একই সাজে বধূ সাজানো হলো। সেদিন বধূ সেজে আমি গিয়েছিলাম স্যারের রুমে। একা একা নিজেকে বধূরূপে দেখতে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে নিজেই চিনতে ভুল করছিলাম। লজ্জা পেয়ে দৌঁড়ে চলে যাচ্ছিলাম রুম থেকে। ঠিক তখন’ই স্যারের সাথে ধাক্কা খায়। স্যারের কনুই দিয়ে প্রচন্ডরকম এক আঘাত পেলাম বুকে। ওনি স্যরি বলতে সামনে আসলে আমার বধূবেশটা খেয়াল করে। প্রশ্নের পর প্রশ্ন ছুড়ে দেয় আমার দিকে। জিজ্ঞেস করে আমার এই বধূবেশে থাকার কারন। আমি জবাব দিতে ইতস্তত বোধ করছিলাম। ঠিক তখনি সাইমা এসে আমায় টানতে থাকে। সাইমাকে একটা কিছু জিজ্ঞেস করতে গিয়ে থেমে যায় স্যার। তাকিয়ে দেখি সাইমার পাশে ইরা, প্রিয়া, মুক্তা,জান্নাত এবং দিপাও এসেছে। সম্ভবত ওদের বধূবেশ দেখে স্যার কথা বলতে গিয়েও আটকে যায়। হা করে তাকিয়ে থাকে ওদের দিকে। কিছুক্ষণ পর মাথা ঘুরে পরে যায়। সাইমা দৌঁড়ে গিয়ে ওনাকে ধরে। সাথে আমরাও দৌঁড়ে যায়। ওনাকে খাটের উপর শুয়ানো হয়। সাইমা ভাইয়া, এই ভাইয়া করে ডাকার পর চোখ খুলে স্যার। সাইমা চিৎকার করে বলে, ভাইয়া তুই ঠিক আছিস তো?!!! ওনি আমার দিকে তাকিয়ে কি মনে করে যেন একটা মুচকি হাসি দিল। তারপর বলল,
এতক্ষণ ঠিক’ই ছিলামরে, এখন আর ঠিক নেই। মনে হচ্ছে, মাথাটা ঘুরছে তো ঘুরছে। সাইমা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, এই মায়া! একটু পানি এনে দে তো!!! আমি দৌঁড়ে গিয়ে পানি নিয়ে এলাম। সাইমাকে গ্লাস’টা দিতে যাব, তখন’ই স্যার বলল-
ওকে দিবেন না মায়া…..
ওর সাজ নষ্ট হয়ে যাবে। পানিটা বরং আপনি আমায় খাইয়ে দিন। আমার হাত’টা কেন যেন কাঁপছিল। তবুও গেলাম। স্যার’কে উঠিয়ে ধরে পানিটা খেতে দিলাম। স্যার পানি’টা খেয়ে আবার শুয়ে পরল। সাইমা কান্না স্বরে বলল,
-‘ এই ভাইয়া! কি হলো তোর?!
~স্যার মাথা উচু করে বলল, কিছু হয়নি তো। সাইমার পাল্টা প্রশ্ন, তাহলে এভাবে শুয়ে আছিস কেন? উঠ… না….
-‘ উঠব, তার আগে বল, তোদের এইরকম সাজার মানে’টা কি?(স্যার)
-‘ এটা বলা যাবেনা। (সাইমা)
-‘ তাহলে আমিও উঠব না….(স্যার)
ওকে, একমাত্র বোনের বিয়েতে তুই যদি শুয়ে থাকতে পারিস, তাহলে তাই কর। এই তোরা আয়’তো কথাটা বলেই সাইমা চলে গেল। সাইমার সাথে সাথে ওরাও গেল। আমি স্যারের পাশ থেকে উঠে চলে যাচ্ছিলাম, তখন’ই আঁচলে টান পরল। লজ্জায় এবং ভয়ে কুঁকড়ে গেলাম। স্যারের দিকে একটু একটু করে এগিয়ে গেলাম। আস্তে করে ডাক দিলাম স্যার……
স্যার আমার দিকে তাকালো।
মাথা নিচু করে বললাম,
আঁচল’টা আপনার পাঞ্জাবীর বোতামে। ওনি আমায় খুলে আনতে বললেন,আমি তাই করলাম। তারপর দৌঁড় দিলাম রুম থেকে।

ছেলেটির ডায়েরী_
যদিও অজ্ঞান হওয়াটা সত্যি নয়, ছিল অভিনয়। তবুও কেন জানি মনে হলো, অভিনয়’টা করে ভালো’ই হলো। সেদিন আমি আমার পি.এর চোখে আমার জন্য মায়া দেখেছিলাম। ওকে যখন পানি আনার কথা বলা হলো, ও দৌঁড়ে পানি নিয়ে এসে পানির গ্লাসটা সাইমার হাতে তুলে দিতে যাবে, ঠিক তখন’ই আমি সাজ নষ্টের মিথ্যে অজুহাত দিয়ে পানি’টা ওকে খাইয়ে দিতে বললাম। ও যখন আমায় বিছানা থেকে তুলে আধশোয়া অবস্থায় পানি খাইয়ে দিচ্ছিল, তখন ওর চোখে আমার জন্য যে মায়া দেখেছিলাম, সে মায়া আমি এর আগে আমি একজনের চোখেই দেখেছিলাম। তিনি ছিলেন আমার ‘মা’… মায়া যখন আমায় পানি খাওয়াচ্ছিল তখন খেয়াল করলাম ওর শাড়ির আঁচল’টা কাধে নয়, আমার দিকে ঝুলে আছে। খেয়াল করে দেখলাম সেটা আমার পরনের পাঞ্জাবীর বোতামের সাথে আটকে আছে যা মায়া কিংবা ওর বান্ধবীদের কারো চোখে পরেনি। আমি তখন’ই পানি খেয়ে অন্যদিকে মুখ করে শুয়ে বোনের সাথে তর্কে মেতে উঠি। বোন আমার সাথে রেগে একপর্যায়ে মায়া ছাড়া সবাইকে নিয়ে বেরিয়ে যায়। সবশেষে মায়া বিছানা ছেড়ে ফ্লোরে দাঁড়ালো। চলে যাওয়ার জন্য যেই না পা বাড়ালো, তখনি আঁচলে টান পরল ওর। ও থমকে দাঁড়ায়। আঁচল ধরে ভীরু পায়ে আমার দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। আমি ইচ্ছে করেই চোখ’টা বন্ধ করে ফেলি। কাছে এসে ছোট্ট করে কাঁপা স্বরে স্যার ডাক দিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে পরল। চোখ খুলে ওর দিকে জিজ্ঞাসো দৃষ্টিতে তাকালে, লজ্জায় মাথা নিচু করে বেচারি আস্তে করে জবাব দেয়-
” আঁচল’টা……
আপনার পাঞ্জাবীর বোতামে….”
আমি ইচ্ছে করেই নিজে না খুলে ওকে বললাম, খুলে নিতে। ও আঁচল’টা খুলতে পারছিল না কাঁপার জন্য। বহুকষ্টে আঁচলটা খুলল। আমি কিছু বলতে যাওয়ার আগেই দৌঁড়ে পালালো রুম থেকে…..

মেয়েটির ডায়েরী_
বিয়ে পরানো শেষ হলে বর-কণে’কল একরুমে দেওয়া হলো। যাকে আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় অন্দরমহল বলে থাকে সবাই। অন্দর মহলে বর এবং বরের একজন বন্ধু প্রবেশ করে। আর আমাদের পক্ষের সিয়াম স্যারকে জরুরী ভিত্তিতে ডেকে আনা হয় বর প্রবেশ করার আগেই। ওনাকে আগেই ওনার কাজ বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। বর আর বরের বন্ধু রুমে প্রবেশ করতে দেরি স্যার রুমের দরজা আটকাতে দেরি করল না। একসাথে ৬টা বউ দেখে বর হতবাক….
আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করে,
এসবের মানে কি ভাইয়া?
স্যার জবাব দেয় মানে একটাই। এখানে তো সবাই আপনার বউ না, বউ হলো একজন। এখন আপনাকে মুখ না দেখে চিনে নিতে হবে কোন’টা আপনার বউ?😊😊😊
কাজটা পারলে ভালো,
না পারলে আরো বেশী ভালো…
-স্যারের কথা শুনে বর বাবা জীবন বোধ হয় ভয় পেয়ে গেছে, আর আমরা?!!! আঁচলের নিচে মুখ লুকিয়ে হাসছি….😂😂😂
এবার বাছাধন…!!!
টাকা না দিয়ে যাইবা কোথায়?☺
-‘ তো এবার শুরু করা যাক….(স্যার)
-‘ ভাইয়া, কিভাবে চিনব আমি? সবগুলোই যে একইরকম, একই ডিজাইনের শাড়ি পরা।🙊(বর)
-‘ তুমি কিভাবে চিনবা সেটা তো আমার দেখার বিষয় না, আমি আমার কাজ বুঝিয়ে দিলাম। এখন তুমি তোমার বউ চিনে নাও।☺☺☺(স্যার)
-‘ যদি ভুলে অন্য কাউকে ধরে ফেলি, তাহলে কি আমায় বউ ছাড়া বাসায় যেতে হবে ভাইয়া?😒😒। নাকি আমার কাধে অন্যকে ঝুলিয়ে দেওয়া হবে….😫😫😫(বর)
বরের কথা শুনে আমরা মুখটা শক্ত করে চেপে রাখছি। আমরা জানি, ওনি আমাদের হাসানোর জন্য এমনটি বলেছেন। স্যার তাড়া দিয়ে বলল, বোকা ছেলে! বউ ছাড়া বাসায় যাবে কেন? বউ নিয়েই যাবে। তবে তার আগে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে যেতে হবে বাকি শ্যালিকা’দের….
আবির(বর) আমাদের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ করে আমার দিকে বারবার তাকাচ্ছে। আমি ভয়ে চুপসে গেলাম। শেষমেষ স্যারের সামনে পরপুরুষে জড়িয়ে ধরবে আমায়? এটাও দেখার ছিল?!!! যাকগে, আল্লাহর নাম নিয়ে বর কি করে সেটা দেখার জন্য চুপ করে বসে রইলাম। হঠাৎ’ই আমাদের সব পরিকল্পনায় জল ঢেলে দিয়ে সাইমার চালাক-চতুর বর’টা রুমের লাইট নিভিয়ে দেয়। সবাই ভয়ে শিউরে উঠে। এ ঘটনায় স্যারও প্রস্তুত ছিল না। সবাই ভয়ে উঠে পরল। শুধু আমি আর সাইমা বসে আছি। বর আমার দিকেই এগিয়ে আসছে। আমি ভয়ে বসা থেকে উঠে দৌঁড় দিলাম। বর সাইমা’কে গিয়ে ধরল আর আমি কার সাথে যেন ধাক্কা খেলাম। মুহূর্তেই রুমের লাইট জ্বলে উঠে…..
বরের মুখে বিজয়ের হাসি আর আমাদের মুখে লজ্জার ছাপ….
বরের উপস্থিত বুদ্ধির কাছে হার মেনে গেল দুষ্টু সাইমার দুষ্টু চাল….

ছেলেটির ডায়েরী_
বিয়ের যাবতীয় কাজ শেষে বর-কণেকে অন্দরমহলে ডাকা হলো। আবির অন্দরমহলে এসে একসাথে ৬টা বউ দেখে একটা বড়সড় ধাক্কা খেল। অনেক কান্নাকাটি করেও যখন মেয়েদের সিদ্ধান্ত থেকে একচুলও নড়াতে পারল না, তখন’ই আবির বুদ্ধি আটতে থাকে কিভাবে জয়ী হওয়া যায়। হঠাৎ’ই আবিরের মুখে অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠে। একবার সাইমা আরেকবার মায়ার দিকে তাকাতে থাকে। মনে মনে ভাবছে,
সর্বনাশ! এই ছেলেকি তাহলে দুই শুকনোকে চিনে ফেলেছে?! ধরে ফেলেছে সাইমাকে? বুঝে গেছে এই দুই বধূর একজন সাইমা আরেকজন মায়া?!!!
যাহ, ধারনা করছিলাম ঠিক তা নয়। বর পুরোপুরি চিনতে পারে নি। তবে এটা বুঝে নিয়েছিল যে, এই দুইজনের মধ্যেই ওর বউ আছে। কিন্তু দুজনেই একই স্বাস্থ্যেরর অধিকারী হওয়ায় চিনতে পারেনি। তাই উপস্থিত বুদ্ধি খাটিয়ে লাইট’টা অফ করে দেয় আবির। মুহূর্তেই পুরো রুমে ওদের ছুটাছুটি শুরু হয়। আবির বসে থাকা দুই মেয়ের দিকে এগিয়ে আসছে, এটা দেখে মায়া উঠে একদৌঁড়। ব্যস!
কেল্লাফতেহ…..
আবির তার আসল বউকে পেয়ে যায়। সেদিন উপস্থিত বুদ্ধির জোরে আবির ওর সম্মান বাঁচাতে পারলেও পারেনি বাঁচাতে পকেটের টাকাগুলোকে। বোনের নাকফুলানো, মুখফোলানো তারপর কান্না দেখে পকেটে রাখা ১৫হাজার টাকা দিয়ে দেয় মায়ার হাতে।
আহ্, আমার বোনের কি হাসি…
বরটা কানের কাছে গিয়ে হয়তো বলছে হলোতো? কিংবা এই রকম টাইপের’ই কিছু….
আমার বোন মুখ বাকা করে বর্ডার থেকে ইন্ডিয়া নিয়ে গেছে।
হা, হা, হা,😂😂😂😂
যাক, টাকা তো পেল। এটাই এনাফ। রুম থেকে বেরোতে যাব, তখনি দৃষ্টি পরে আবিরের(বর)বন্ধুর দিকে। যার সাথে একটু আগে মায়া ধাক্কা খেয়েছিল। এখন ছেলেটা কেমন ঢ্যাবঢ্যাব চোখে মায়ার দিকে তাকিয়ে আছে, মায়াও কি যেন কথা বলতেছে। খুব রাগ হলো। পারছিলাম না থাকতে এখানে। চলে গেলাম বাইরে। কিছুক্ষণ পরে দেখি এই ছেলের সাথেই মায়া বাইরে হাসাহাসি করতেছে। এবার রাগের মাত্রা’টা বহুগুনে বেড়ে গেল। মায়ার সামনে দিয়ে দুইবার করে হেঁটে গেলাম। কিন্তু কি আশ্চর্য!!!
দুরে গিয়েও দেখি একই ভাবে হেসে কথা বলতেছে। এবার আর রাগ কন্ট্রোল করতে পারলাম না। দৌঁড়ে গিয়ে ওদের সামনে দাঁড়ালাম। আমাকে দেখে ছেলেটা পরে কথা হবে, আসি বলে চলে গেল।
তারপর মায়াকে ঠাস করে একটা থাপ্পর মারলাম….
খুব বেড়ে গেছ তাই না?
অচেনা অজানা ছেলেদের সাথে আড্ডা দেওয়া শিখে গেছ, তাই না? কথাগুলো বলে আরেকটা থাপ্পর মারলাম। মায়া চোখ বন্ধ করে কান্না করা শুরু করে দিল। আর আমি?!!!
রাগে গজগজ করতে করতে বেরিয়ে গেলাম সেখান থেকে….

মেয়েটির ডায়েরী_
আজ আমায় স্যার মেরেছে। খুব জোরে জোরে দুইটা থাপ্পর দিয়েছে আমার গালে। অপরাধ কি আমি নিজেও জানি না। আমি শুধু জানি, আমি আমাদের ভার্সিটির ভালো ভাইয়াটার সাথে কথা বলছিলাম। যে কিনা আমায় আপন বোনের মত স্নেহ করত। এর ছাড়া ছেলেদের সাথে কথা আমি কোনো কালেই বলিনি। আর অচেনা, অজানা ছেলে?!! সে তো কল্পনার বাহিরে…..
স্যারের বলা কথায় এতটা কষ্ট পেয়েছি যা বলার মত না। কান্না আটকাতে না পেরে দৌঁড়ে চলে গেলাম সাইমার রুমে….
ওখানে গিয়ে দরজা আটকিয়ে ইচ্ছেমত কাঁদলাম। তারপর শাড়ি পাল্টিয়ে ভীড়ের ভিতরেই আংকেলকে বলে বাসা থেকে চলে গেলাম……

চলবে…..

বসের সাথে প্রেম পর্ব- ০৬

বসের সাথে প্রেম

পর্ব- ০৬

লেখা- অনামিকা ইসলাম।

আমি হাত-পা ছুড়া শুরু করলাম। দেখতে পেলাম অন্ধকারেই একটা ছায়া রশি নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। এসেই আমায় ধাক্কা দিয়ে ছাদের মধ্যে ফেলে আমার হাত’টাও বেঁধে ফেললেন।
ভয় এবং কষ্টে আমার দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম।
হঠাৎ’ই ছায়া’টা বলে উঠল__
আমার বাসায় চুরি করতে এসেছিস? দাঁড়া চুরি করার মজা আজ বের করব…….
কন্ঠ’টা শুনে চমকে উঠলাম। এ যে আমার বস….
” স্যার আমি চোর নয়, আমি মায়া…”
বলতে গিয়েও পারলাম না। শুধু পা গুলো ছুড়তে লাগলাম। আর আল্লাহ’কে ডাকতে লাগলাম। সাথে সাথে’ই ছাদের আলো জ্বলে উঠল। পুরো ছাদ মুহূর্তেই আলোকিত হয়ে গেল। ওনি আমার দিকে দৌড়ে আসতেছে আর বলছে মায়া তুমি?!!!🙈🙈 চোখটা বন্ধ করে ফেললাম। মনে হচ্ছে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছি;
তারপর জ্ঞান হারালাম…………
ছেলেটির ডায়েরী_
সে রাতে চোর ভেবে অন্ধকারে একটা ছায়া মানবিকে ধাক্কা দিয়ে ছাদে ফেলে ওর হাত সেই সাথে নাক-মুখ বেঁধে যখন চলে যাচ্ছিলাম, তখন শুনতে পাই ও পাগুলো ভিষণ রকম ছুড়াছুড়ি করছে। আলো জ্বালিয়ে রাগান্বিত দৃষ্টিতে চোরটার দিকে তাকাতেই দেখি আঁতকে উঠলাম। শিউরে উঠল ভেতর’টা। চোর ভেবে যার নাক,মুখ, হাত বেঁধে ছাদে ফেলে যাচ্ছিলাম সে আর অন্য কেউ নয়, আমার’ই অফিসের পি.এ,বোনের প্রাণের বান্ধবি ‘মায়া’। একমুহূর্তের জন্য আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না।মায়া মায়া বলে ছুটে গেলাম ওর কাছে। ওকে ধরে উঠালাম। তারপর ছাদে রাখা চেয়ারটায় বসালাম। বলতে লাগলাম-
‘ মায়া তুমি? আমি তো ভাবছিলাম…(..?..)….
বুঝতে পারলাম মায়া কিছু একটা বলতে চাচ্ছে। ওর বাঁধনটা খুলে দিলাম। ও ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিচ্ছে, আমি ওর দিকে চেয়ে আছে।৪,৫মিনিট পর স্বাভাবিক হয়ে ও উত্তর দিল,
‘ আসলে তাহাজ্জদ নামাজ পড়ার পরও যখন দেখলাম ফজরের আযান দিচ্ছে না, তখন কয়টা বাজে এটা দেখার জন্য আপনার ফোন’টা আনতে গিয়েছিলাম। ভাবছিলাম আযান দেওয়ার আগ পর্যন্ত ফোন’টা আমার কাছে’ই রাখব। কিন্তু তার আগেই যে…..(…..)….
মায়া এটুকু বলেই থেমে গেল। I am sorry,maya.আমি আসলে বুঝতে পারিনি….
-‘ ইটস ওকে, স্যার।(মায়া)
ওকে চলো বলে আমি ওকে রেখেই বসা থেকে উঠে পরলাম, কিন্তু একি?!!!
ও এখনো বসে আছে কেন? মায়াকে জিজ্ঞেস করলাম, কি? যাবে না আজকে? নাকি এখানেই ঘুমাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছ?
মায়া মাথা নিচু করে জবাব দিল, সিদ্ধান্তের আর কি আছে? হাতের বাঁধন খুলে না দিলে তো এখানেই ঘুমুতে হবে। ওহ, শিট! বলে ওর হাতের বাঁধন’টা খুলে দিলাম। ও আমার দিকে কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে চেয়ার থেকে উঠে ছাদের রেলিং ধরে দুরে তাকিয়ে আছে। আমি ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। প্রায় ১০,১৫মিনিটের মত দাঁড়িয়ে আছি, ওর সেদিকে কোনো খেয়ালি’ই নেই। ওর দৃষ্টি দুরে কোথাও আটকে আছে। কেন জানি ওর হাত’টা ধরতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে আবার পারছিও না। অবশেষে ধরেই ওর হাত’টা। ও চমকে তাকালো আমার দিকে…..
মেয়েটির ডায়েরী_
স্যার আমার দিকে মায়া মায়া করে ছুটতে এসে বসল। তারপর আমার মুখের বাঁধন না খুলেই জগতের প্রশ্ন জুড়ে দিল। এদিকে আমার নিঃশ্বাস খুব কষ্ট হচ্ছে। আমি শুধু স্যারকে ইশারা করছিলাম নাক-মুখের বাঁধনটা খুলে দিতে। স্যার আমার ইশারা বুঝতে পেরেছে কি না জানিনা, তবে ওনি আমার নাক-মুখের বাঁধন’টা খুলে দিয়েছিল। স্যরি, বলে আমাকে রুমে যেতে বলে একবার আমার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকালো। লজ্জিত ভঙিতে ওনি আমার হাতের বাঁধন’টা খুলে দিল। ওনার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম ৪,৫মিনিট। ওনার দৃষ্টি যখন আমার চোখে পরে তখন আমি দৃষ্টি ফিরিয়ে নেই। বসা থেকে উঠে ছাদের কিনারায় গিয়ে দাঁড়ালাম। কোথায় তাকিয়ে আছি আমি নিজেও জানি না। মনে হচ্ছিল, আমি একটা ঘোরের মধ্যে আছি। হঠাৎ’ই আমার হাতে একটা উষ্ম ছোয়া অনুভব করলাম। চমকে গিয়ে ‘বাম’ পার্শ্বে তাকালাম। অবাক হলাম সিয়ামকে দেখে। মানে আমার শ্রদ্ধেয় সিয়াম স্যারকে দেখে। একবার হাত, আরেকবার ওনার দিকে তাকাচ্ছি আমি। এটাও কি সম্ভব? একি বাস্তব নাকি কল্পনা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। ঘোর কাটে ওনার ডাকে। মায়া আযান দিচ্ছে রুমে চলো। নাহ, এ স্বপ্ন নয়, বাস্তব। ওনি আমার হাতটা বাস্তবেই ধরেছে। আমি জানি, কখনো আমার মনের গুপ্ত বাসনা কারো সামনে প্রকাশ করতে পারব না,পারব না বলতে-
” স্যার, আমি আপনাকে ভালোবাসি,ভিষণ ভালোবাসি। কি করে বলব? আমার মত ছিন্নমূল, যার কোনো অস্তিত্ব নেই তার আবার স্বপ্ন থাকে নাকি? আর আমি তো তেমন সুন্দরও না, শ্যামবর্ণের। এই শ্যামবর্ণ নিয়ে কত মুখের কত কথা যে শুনেছি তার কোনো হিসেব নেই। আর ওনারা তো অনেক বড়লোক, ওনারা কি আর একটা ছিন্নমূল, অস্তিত্বহীন মেয়েকে ওনাদের ঘরের বউ করবে? না, করবে না। এসব কথা ভাবতে ভাবতে অজান্তেই কখন যে দু’চোখ ভিঁজে গেছে বুঝতে পারিনি। চোখের জল মুছে নিচে গেলাম……
ছেলেটির ডায়েরী_
ওর হাত’টা ধরতেই ও চমকে উঠল। আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিল। এদিকে চারদিক থেকে ফজরের নামাজের আযান ভেসে আসছিল। মায়া’কে নিচে আসতে বলে আমি চলে এলাম ছাদ থেকে। পরদিন সকাল হলো, সকাল গড়িয়ে দুপুর। মায়াকে একটা বারের জন্য দেখিনি। বিয়ে বাড়ির এত্ত কাজের মধ্যেও আমার দুটি চোখ কেন যেন ওকে’ই খুঁজছিল। ওকে না দেখতে পেয়ে ভেতর’টা কেমন যেন অস্থির লাগছিল। বোনকে জিজ্ঞেস করতে গিয়েও করিনি, যদি উল্টা-পাল্টা বকার শুরু করে?! ওতো আবার একটু বেশীই ইচড়ে পাকা স্বভাবের। সবকিছুতেই এক লাইন বেশী বুঝে। দুপুরে আমার সব বন্ধুরা আমায় ধরে রেডি করে দিল। এদিকে বর আসারও সময় হয়ে গেছে। বিছানার বালিশের নিচে সকালে ফোন’টা রেখেছিলাম। ফোন’টা আনার জন্য রুমের দিকে ছুটে যাচ্ছিলাম আর কনুই উঁচু করে পাঞ্জাবীর হাতা ঠিক করতে করতে রুমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ করেই একজন ‘উহ্’ করে উঠলাম। বুঝতে পারলাম আমার অসাবধানতায় কুনো’ই গুতো লেগে এমন’টি হয়েছে। চোখ বোজে স্যরি বলতে গিয়ে থমকে দাঁড়ালাম। এ যে কোনো এক অপ্সরী বধূবেশে দাঁড়িয়ে আছে আমার সামনে। কিন্তু এও কি সম্ভব?! স্বর্গের অপ্সরী কি মাটিতে আসে কখনো?!!! হয়তো, আসে। না হলে ও আসবে কিভাবে। চলে যাচ্ছিলাম ওকে পাশ কাটিয়ে। হঠাৎ মনে হলো মায়াপরী’টাতো এখনো চোখ বোজেই আছে। ওকে তো ভালো করে স্যরি বলাটাও হয়নি। স্যরি বলার জন্য এবার ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। এবার আমার ঘোর কাটলো।
একি?! মায়া এখানে এই সাজে? এই সাজে তো বোনকে দেখেছি মাত্র। ঠিক একই রকম সাজে, শাড়ি, গহনা সবকিছু একই রকম।এবার ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
-‘ সেকি?! মায়া তুমি? তুমি বধূবেশে দাঁড়িয়ে আছ কেন? ও চুপ করে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। কি হলো মায়া?! জবাব দাও। তুমি এ সাজে কেন?
-‘ স্যার ইয়ে মানে বলতে গিয়েও পুরোটা বলতে পারল না। তার আগেই আমার বোন ওকে ধরে টানতে লাগল। আমি বোনের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলতে গিয়ে ‘থ’ হয়ে গেলাম। একি?! মায়া ছাড়াও বোনের ৫, পাঁচটা বান্ধবী একই সাজে বধূ বেশে দাঁড়িয়ে আছে। আমি আর নিতে পারছিলাম। কেন জানি আমার মাথা’টা ঘুরছিল। মাথা ঘুরে পরে জ্ঞান হারালাম আমি…….

চলবে….

বসের সাথে প্রেম পর্ব- ০৫

বসের সাথে প্রেম
পর্ব- ০৫
লেখা- অনামিকা ইসলাম।
ছেলেটির ডায়েরী_
শুয়ে শুয়ে ফোন টিপা-টিপি করছিলাম। প্রায় আধঘন্টার মত ফোন টিপার পর সবার ঘুমের অসুবিধা হবে ভেবে ফোন’টা বালিশের নিচে রেখে কপালে হাত রেখে শুয়ে পরলাম। হঠাৎ’ই মনে হলো কেউ যেন ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলছে, আমার খুব কাছ থেকে’ই শব্দটা আসছে। ভাবলাম বোন শিমু নয়তো?!!!!
বালিশের নিচ থেকে ফোন’টা এনে টর্চটা এনে তার আলোয় দেখার চেষ্টার করলাম। তারপর যা দেখলাম—
‘ নিশ্বাস’টা শিমুর নয়, মায়ার।’
মনে হচ্ছে চোখগুলো শক্ত করে বোজে আছে, ইচ্ছে করে’ই। ফোনের টর্চ’টা নিভিয়ে ডিসপ্লের আলো’টা একটু কমিয়ে নিলাম। ডিসপ্লের মৃদ্যু মৃদ্যু আলোয় স্পষ্ট দেখতে পেলাম, কাঁপা কাঁপা চোখে ও চোখ মেলে তাকাচ্ছে। চোখ মেলে তাকিয়েই ও ফোনের স্কিনের দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। একটানা ৪মিনিট স্কিনের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল মায়া। তারপর আলতো করে চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল। নিঃশ্বাসের শব্দ’টা ধীরে ধীরে কমে আসতে লাগল। ডিসপ্লে’টা অফ করে ফোন’টা হাতে নিয়েই ঘুমিয়ে পরলাম। মাঝ রাত্রে ঘুম ভেঙে যায়। কেন জানি মনে হচ্ছিল, কেউ আমার মাথার নিচের বালিশ’টা ধরে উপড়ে ফেলতেছে। মনে হচ্ছে, বালিশসহ’ই যেন কেউ আমায় ফেলে দিতে চাচ্ছে। চোর-টোর নয়তো?!!! :O
দেখার জন্য এক চোখ একটু একটু করে খুললাম। ঐ একটুখানি দৃষ্টি’তেই বুঝতে পেলাম চোর’ই আসছে। আমার ফোন’টা চুরি করতে আসছে বোধ হয়। 🙊
হুহ, আমার ফোন চুরি?! :/
দেখে নে চুর?!!!
আজ একা’ই আমি তোর কি অবস্থা করি….😎
চোরটা যখন ফোন’টা নিয়ে চলে রুম থেকে বের হয়ে গেল, তখন আমিও আলমারি থেকে বোনের একটা ওড়না বের করে ওর পিছু পিছু ছুটলাম। কিন্তু একি?!!! চোরটি ছাদে যাচ্ছে কেন?🙉
আর এতো দেখছি মেয়ে চোর?!!!😱।ওর হাঁটা দেখে তো সেটা’ই বুঝে যাচ্ছে….
ওহ্, তারমানে চোরটা বিয়ে বাড়িতে মেহমান হয়ে ঢুকেছে। ওর ধান্ধা বিয়ে খাওয়া নয়, চুরি করা। যায় হোক, আজ তোর রক্ষা নাই। ছাদ দিয়ে পালাবে ভেবেছিস? দাঁড়া। তোকে আজ রাত’টা ছাদে’ই বেঁধে রাখব। ☺☺☺
মেয়েটির ডায়েরী_
ভীরু এবং কাঁপা দৃষ্টিতে চেয়ে দেখি আমার চোখের সামনে একটা ফোন। তার স্কিনের মধ্যে আমার সিয়ামের ছবি। স্কিন’টা থেকে চোখ সরাতে পারছিলাম না। আবার তাকিয়েও থাকতে পারছিলাম না। ঘুমিয়ে পরি একসময়। মাঝরাত্রে ঘুম’টা ভেঙে যায়। কিছুতেই ঘুম চোখে আসছিল না। ভিতর’টা অস্থির অস্থির লাগছিল। তাহাজ্জদ নামাজ’টা না হয় এখন পরে নিলেই ভালো হয়। উঠলাম নামাজ পরার জন্য। অযু করে ড্রয়িংরুমে গিয়ে নামাজ’টা পরে নিলাম। তারপর ছাদে গিয়ে বেশকিছু ক্ষণ বসে থেকেও যখন দেখলাম ঘুম আসছে না, তখন কয়’টা বাজে দেখার জন্য রুমের দিকে পা বাড়ালাম। মনে হলো ফোন’টা সন্ধ্যারাত্রে সাইমা নিয়েছিল। এতরাত্রে সাইমা’কে ডাকা তো সম্ভব না, তাই মামির কাছে গেলাম। ওনাকে ডাকতে গিয়েও ডাকলাম না ঘুমের ডিস্টার্ব হবে ভেবে। নানুর কাছে এসে বালিশের নিচে হাত দিয়েও ওনার ফোন পেলাম না। এবার মনে হলো স্যার তো ওনার ফোন’টা সাথে নিয়েই ঘুমাইছে। ভীরু পায়ে হেঁটে চলে গেলাম ওনার কাছে। আশেপাশে কোথাও ফোন’টা পেলাম না। বালিশের নিচে থাকতে পারে ভেবে ওনার মাথাসহ বালিশ’টা একটু উপরে তুললাম।হ্যাঁ, ফোনটা বালিশের নিচেই। লুকিয়ে, সাবধানে ফোন’টায় হাত দিলাম। ফোন’টা হাতে আসলে সেটা নিয়ে ছাদে চলে যায় এই ভেবে, ফজরের নামাজের আগ পর্যন্ত ফোন’টা আমার কাছেই থাকবে। এত রাত্রে ওর মুখ দেখা’তো সম্ভব না, তাই স্কিনে থাকা ওনাকেই দেখব। ছাদে যাচ্ছি, কেন জানি মনে হচ্ছে আমায় কেউ অনুসরন করে আমার পিছু পিছু আসতেছে। কিন্তু এত্ত রাত্রে কে আমায় অনুসরন করবে? বিষয়’টা ভ্রম ভেবে উড়িয়ে দিলাম। এগিয়ে যেতে লাগলাম ছাদের দিকে।
হঠাৎ কেউ আমার মুখটা চেপে ধরল। প্রথমে মুখ চেপে ধরলো। তারপর মুখ’টা বেঁধে ফেলল কাপড় দিয়ে। আমি কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারছিলাম না। মুখের সাথে সাথে আমার নাক’টাও কাপড়ে ঢেকে গেছে। আমার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল।

চলবে….

বসের সাথে প্রেম পর্ব- ০৪

বসের সাথে প্রেম
পর্ব- ০৪
লেখা- অনামিকা ইসলাম।
মেয়েটির ডায়েরী_
দিন যতই গড়িয়ে যেতে থাকে, ততই সিয়ামের প্রতি খুব খুউউব দূর্বল হয়ে যাচ্ছি। শয়নে-স্বপনে, নিশিথে-জাগরনে, কাজে-কর্মে মানের আমার জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে ও যেন মিশে আছে। আমার প্রতিটা রাত ভোর হয় ওর কথা ভেবে, ওকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে। আবার রাত্রে ঘুমুতেও যায় ওকে নিয়ে ছোট্ট ছোট্ট স্বপ্ন চোখে নিয়ে। আজকাল সিয়াম স্যার’টা যেন কেমন হয়ে গেছে। ওনাকে দেখলে মনে হয় একটা অসহনীয় যন্ত্রনা ওনাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। আচ্ছা, ওনি কি ঠিক আছেন? ওনার কিছু হয়নি তো? সেদিন রাত্রে হাজার চেষ্টা করেও যখন ঘুমুতে পারছিলাম না, তখন মনটাকে শান্তনা দেওয়ার জন্য জানালা দিয়ে ওনার রুমের দিকে তাকালাম। কিন্তু একি?! একটা কিছু মনে হচ্ছে দাঁড়িয়ে আছে। রুমের লাইট জ্বালানো নেই, তাই শুধু আবছায়া’টাই দেখা যাচ্ছে। আচ্ছা, এ আমার সিয়াম, স্যরি সিয়াম স্যার নন’তো?! সেদিন ছাদে গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখি পাশের ছাদে কেউ একজন অন্যদিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। ছাদের কর্নারে গিয়ে খেয়াল করে দেখতে যাওয়ার সময় বুঝলাম- এ আমার স্যার’ই।শুধু আমার স্যার। সেদিন একদৃষ্টিতে ওনার দিকে আধঘন্টা তাকিয়ে ছিলাম। মনে হচ্ছে ওনি এদিকেই তাকাচ্ছে। ওনার দৃষ্টির আড়াল হওয়ার জন্য বসে পরলাম নিচু হয়ে। ওনি চলে গেলেন। ইদানিং রাত জেগে থাকা’টা আমার নেশা হয়ে গেছে। প্রতি’টা রাত্রে কখনো ছাদে কখনো বা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকি। কখনো কখনো সেখানের চেয়ারেই ঘুমিয়ে পরি। সেদিনও ওনার রুমের জানালায় একটা আবছায়া নিচের দিকে তাকিয়ে ছিল। বুঝতে পারলাম এ আমার স্যার’ই দাঁড়িয়ে আছে। বোধ হয় রাতের শহর দেখছে। ওনার মত আমিও ল্যাম্পপোস্টের আলোয় আলোকিত রাতের শহর’টাকে দেখার জন্য নিচে তাকালাম। কিন্তু বেশীক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলাম না। এর থেকে যে আমার রাজপুত্র’টা স্যরি শ্রদ্ধেয় স্যার’টা অনেক সুন্দর,সুদর্শন। ওনি রাতের শহর দেখছে, আর আমি ওনাকে দেখছি। দু’চোখ ভরে দেখছি…..
এ দেখার যেন কোনো শেষ নেই।
ছেলেটির ডায়েরী_
হে আল্লাহ! আমার কেন এমন লাগে? কেন?!!! আল্লাহ, তুমি আমায় মনের শান্তি ফিরিয়ে দাও প্লিজ। আর পারছিলাম না। এক বন্ধুর কথা মতো তাহাজ্জত নামাজ পড়া শুরু করলাম। নামাজ শেষে ছাদে গিয়ে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতাম, ওনি যাতে আমার মনের শান্তি ফিরিয়ে দেয়। একটু রহম করে। ছোট বোন’কে দেখে পছন্দ হয়েছিল পাত্রপক্ষের। আসছে পহেলা বৈশাখ বিবাহের দিন ধার্য করা হয়েছে। দেখতে দেখতে ওর বিয়ের দিনটা গড়িয়ে এলো। আমার অফিসের সব কর্মচারী এবং আমার সব ব্যবসায়ী বন্ধু ও স্কুল-কলেজ-ভার্সিটি লাইফের সব বন্ধু-বান্ধবদের বিয়েতে দাওয়াত করলাম। মায়াও এলো। কিন্তু সেটা আমার দাওয়াতে নয়, বোনের দাওয়াতে। ওকে দাওয়াত দেওয়ার আগেই মায়া’টা কার কাছ থেকে যেন দাওয়াত পেয়ে গেছে। ও বিয়ের তিনদিন আগেই চলে আসছে। আমি তো মনে মনে ভয় পাচ্ছি, ও তিনদিন আগে কেন চলে আসল। পরে জানতে পারি, এই মায়া’টাই আমার একমাত্র বোনের ভার্সিটির একমাত্র প্রিয় বান্ধবী। অবাক হলাম এই ভেবে, বাবা একজন দক্ষ ব্যবসায়ী হয়ে কি করে তাহলে এই পিচ্চি’টাকে কোম্পানিতে নিল। মায়া’টা শুধু নামেই মায়া না, ওর চেহেরায় অদ্ভুত এক মায়া ছিল। ওর নিষ্পাপ মুখপানে তাকালে বুকের ভেতরটা শীতল হয়ে যেত, সেই মুহূর্তের জন্য ভূলে যেতাম ও শ্যামবর্ণের একটা তরুণী। আমার তখন ওকে কেবলি এক মায়া পরি মনে হতো। কি দারুণ এক মায়ায় আবৃত ওর মুখ, আর মুখের মায়ায় যে কেউ পরে যেতে পারে। আমার বাবাও পরে গেল। আমার মা তো ওকে মা বলেই ডাকতো।
আর বাবা?!!!
বাবা ডাকতো ছোট মা বলে।
কেন জানি আমার ওকে মায়া পরি মনে হতো….
পিচ্চি মায়া পরি।
সেদিন ছিল বোন’টার হলুদ সন্ধ্যা।দুপুর থেকেই মেহমান’রা আসা শুরু করছে। আর বিকেল গড়িয়ে যাওয়ার একটু পরেই বরের বাড়ি থেকে ছেলে-মেয়ে চলে আসছে। হলুদ দিয়ে চলে যাওয়ার আগে বরপক্ষের বাড়ি থেকে আসা একটা ছেলে মায়ার সামনে গিয়ে দাঁড়াই। মায়া কিছু বুঝে উঠার আগেই ওর গালে হলুদ ভরিয়ে দেয়। তারপর সবার কি হাসাহাসি। আমার ভিতর’টা হাহাকার করে উঠল। মায়া দৌঁড়ে চলে গেল রুমের ভিতরে। সেদিন রাত্রে সব আমন্ত্রণিত মেহমানে বাড়ি ভরে গিয়েছিল। থাকার জায়গা সংকুলান হবে না ভেবে কর্ণারের রুমের ফ্লোরে থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম। উপরে খাটে দুই মামি এবং তাদের দুইটা বাচ্চা, নিচে আমি, ১৬বছরের মামা’তো ভাই, পুচকি মামা’তো বোন, নানু শুইলাম। ছোট্ট বোন’টাকে ঠিক করে শুয়াতে গিয়ে দেখি ওর সাথেই মায়া শুয়ে আছে…..
মেয়েটির ডায়েরী_
অফিস থেকে এসে সবে মাত্র ফ্রেশ হয়ে রুমে ঢুকলাম, তরকারি গরম করে খাব বলে। ঠিক তখনই মনে হলো পিঠে যেন ভাদ্র মাসের তাল পরছে। কিন্তু এখনো তো বৈশাখ মাস আসেনি, ভাদ্র মাসের তাল কোথা থেকে আসলো। পিছনে তাকালাম বিরক্তির দৃষ্টি নিয়ে। হায়রে!
একি?! এ যে সাইমা। পরাণের বান্ধবী সাইমা….😍
এসেছো কলিজা?!!!!
-‘ রাখ তোর কলিজা। কত্তগুলো কল দিয়েছি, দেখছনি একটাও? :/
~সেকি কখন কল দিলি?😱 দাঁড়া দেইখা লই…. 😊
-‘ ঐ কু্ত্তি হাসবি না। আমার সাথে কথা বলতে ভালো লাগে না, সেটাই বলতে পারিস। যাহ, আর বললাম না। শত্রু চিরকালের জন্য বিদায় হইলো। এই নে বিদায়ী মানপত্র। আসি। আল্লাহ হাফেজ।
😹😹😎😎
সাইমা চলে গেল হাতে বিয়ের কার্ড দিয়ে। জানতাম, ওর বিয়ের কার্ড’ই হবে। না খুলেই বুঝে গিয়েছিলাম পাত্র আবিরের সাথে বিয়ে’টা হচ্ছে, দীর্ঘ ৭বছরের প্রেমের মিলন হতে যাচ্ছে; না চাইতেও ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।
ভালো থাকুক ওরা,
ভালো থাকুক পৃথিবীর সমস্ত ভালোবাসা’রা…..
ওর আবদার বিয়ের একসপ্তাহ আগেই যাতে ওর বাসায় চলে যায়, কিন্তু তাতো আর সম্ভব না। তাই বিয়ের তিনদিন আগে ভালো আংকেলের আদেশে চলে এলাম ওনাদের বাসায়। ছোট বেলায় বাবা-মা মরে গিয়েছিল, তাই বাবা-মায়ের আদর কি বুঝিনি। সাইমার বাবা-মা মানে বসের বাবা-মায়ের আদর পেয়ে কেন জানি মনে হচ্ছিল বাবা-মা থাকলে মনে হয় এভাবেই আদর করত।
সাইমার হলুদ সন্ধ্যার দিনে বরের বাড়ি থেকে অনেক ছেলে-মেয়ে আসে। এর মধ্যে ৪টা ছেলে আমার দিকে হা করে তাকিয়ে ছিল। বুঝি না ওরা কালো মেয়ের মধ্যে কি এমনটা দেখেছে। সাইমাকে হলুদ দিয়ে চলে দেওয়ার সময় একটা ছেলে আমার গালে এনে হলুদ ভরিয়ে দেয়। আমি বিরক্ত হয়ে আশেপাশে তাকালাম। সিড়ির কাছে দাঁড়িয়ে ওনি আমার দিকে চেয়ে আছে, মুখটা অমাবস্যার কালো অন্ধকারের মত হয়ে গেছে। দৌঁড়ে চলে গেলাম ওনার থেকে। রুমে গিয়ে বালিশ বুকে জাপটে ধরে ভাবতে লাগলাম, ওনি আমার দিকে এভাবে তাকালো কেন?
তবে কি ওনিও আমায় ভালোবাসে….😍
সেদিন সিড়ি থেকে তাড়াহুড়ো দৌঁড়ে নামতে গিয়ে ওনার সাথে ধাক্কা খেলাম, ওনি তখন উপরে উঠছিল। আমি নিচের দিকে হেলে যায়। ওনি ধরে ফেলেন আমায়। কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে বড়দের মত ভাব নিয়ে বললেন,
দেখে চলতে পারো না?!!! যদি পরে যেতে?!!!
আমি বললাম, আপনি তো আছেন। আমার ভরসা, আমার বিশ্বাস। আমি পরে গেলে আপনি ধরবেন যে… তবে কথাটা প্রকাশ্যে নয়, মনে মনে বলছিলাম।
অধিক মেহমানের কারনে সে রাতে জায়গা হচ্ছিল না থাকার। ঠিক করলাম নানু মামিদের সাথে ফ্লোরে থাকব। ফ্লোরের একদম কর্ণারে শুইলাম। হঠাৎ করে চোখের মধ্যে একটা আলো এসে পরল। তাকিয়ে দেখি, আমার ঠিক পাশেই স্যার শুয়ে ফোন টিপছে, কাছেই, খুব কাছেই। মাঝখানে শুধু পিচ্চি বোন’টা দেয়াল হয়ে আছে….
ভিতর’টা কেমন যেন করে উঠল। চোখ’টা বন্ধ করে ফেললাম। মনে হলো আলো’টা নিভে গেছে। কিন্তু আমার হৃদকম্পন একটু একটু করে বাড়ছে। একটা সময় ঘন ঘন শ্বাস নেওয়া শুরু করি। হঠাৎ’ই চোখের উপর একটা আলো এসে পরে……
ভীরু এবং কাঁপা চোখে তাকালাম। তারপর যা দেখলাম……..

চলবে……

বসের সাথে প্রেম পর্ব- ০৩

বসের সাথে প্রেম
পর্ব- ০৩
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

ছেলেটির ডায়েরী…..
পরদিন সকাল সকাল অফিসে পৌঁছলাম। কারন, ও যেন লেইট করে এসে বলতে না পারে তাড়াতাড়ি এসেছে। একটা জিনিস আমি আজো বুঝতে পারলাম না, আমার কর্মচারীরা আমায় দেখলে ভয়ে চুপসে যায় কেন? কেন’ই বা আমায় দেখে তাড়াতাড়ি যার যার মতে কাজ করা শুরু করে। যাকগে। যে কথাটি বলছিলাম। সকাল ১০টা বেজে ০২মিনিটে মেয়েটি মানে আমার পি.এ অফিসে ঢুকে। ওর চেম্বারের দিকে যেতে গিয়ে ও মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে পরল। কারন, আমি তখন ওর চেম্বারেই বসে ছিলাম। ওকে দেখে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালাম। ও মাথা নিচু করে ফেলল। তারপর বলতেছে- আমি স্যরি স্যার। ০১মিনিট ৫৮সেকেন্ড লেইট হয়ে গেল। ওর দিকে একবার তাকিয়ে আমার রুমে চলে গেলাম। যাওয়ার সময় বলে গেলাম আমার রুমে আসতে। আমি রুমে আসার ক্ষানিক বাদেই অনুমতি নিয়ে মাথা নিচু করেই আমার রুমে প্রবেশ করে। আমি ওর সাথে তেমন কোনো কথায় বললাম না। শুধু ওর দিকে ৯টা ফাইল এগিয়ে দিয়ে বললাম, আজকে রাত্রের ভিতর যাতে এগুলো কমপ্লিট করে দেয়। ও জল ছলছল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, স্যার! এত্তগুলো ফাইল একসাথে একরাত্রের ভিতর কমপ্লিট করা সম্ভব না। দয়া করে কাজ’টা আমায় আরেকটু কমিয়ে দিলে ভালো তো। ওর কথা শুনে কাল সারাদিন থেকে মনের ভিতর পুষে রাখা রাগ’টা দ্বিগুন বেড়ে গেল। ড্রয়ার থেকে আরো তিনটা পুরনো ফাইল বের করে ধরিয়ে দিলাম ওর হাতে। ওর অবাক হওয়ার মাত্রাটা যেন বহুগুনে বেড়ে গেল এবার। ফ্যালফ্যাল চোখে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে কি যেন বলতে গিয়েও থেমে গেল, ফাইলগুলো নিয়ে চলে গেল আমার রুম থেকে। সেদিন লাঞ্চের সময় সবাই যখন লাঞ্চ করতে ব্যস্ত, মায়া তখন ফাইল নিয়ে ব্যস্ত। এই শীতের মধ্যেও মেয়েটি ঘামছে। খুব হাসি পেলো আমার। বেচারি!!!!😜😜😜
হঠাৎ করে মায়া আমার রুমের দিকে তাকালো। আমি দরজার কাছ থেকে পর্দার আড়ালে সরে যায়।

মেয়েটির ডায়েরী_
সে রাতে ভালো ঘুমাতে পারিনি। একে তো সারাদিন পরীক্ষা আর জার্নির ভিতর গেছে, তার উপর রাত্রে কিচ্ছু না খেয়েই ঘুমানোর কারনে শরীর’টা একটু দূর্বল হয়ে যায়। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে মরিচ বর্তা দিয়ে কয়টা পান্তাভাত খেয়ে নিলাম। এটা রোজকার খাবার। মামি, মামাতো ভাই-বোন’রা খাওয়ার পর যে উচ্ছিষ্ট থাকে সেটাই খেয়ে নেই। কোনো কোনো সময় সেটাও জোটে না কপালে। ওহ,যে কথাটি বলছিলাম। ভোরে রান্না করে বাড়ির যাবতীয় কাজ করে গুছিয়ে রেখে অফিসের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। অফিসে যেতে যাতে লেইট না হয় সেজন্য অন্যদিনের চেয়ে আধঘন্টা আগে বেরিয়ে পড়লাম বাসা থেকে। কিন্তু বিধি বাম। গাড়িটা মাঝ রাস্তায় নষ্ট হয়ে যায়। অন্য গাড়ি আসার অপেক্ষা করতে গিয়ে অফিসে পৌঁছতে লেইট হয়ে যায় ২মিনিট। ভয়ে ভয়ে ভিতরে প্রবেশ করি। কথায় আছে, যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই রাত হয়। সেটাই হলো। সামনে তাকিয়ে দেখি বস আমার সামনে আমার চেম্বারে বসে আছে। থমকে দাঁড়ালাম সেখানেই। ভিতর’টা শুকিয়ে আসছিল ভয়ে। ওনি বসা থেকে উঠে আমার দিকেই এগিয়ে আসছে। আমি মাথা নিচু করে স্যরি বললাম। তারপর ওনি অগ্নি দৃষ্টি দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রুমে চলে গেলেন। বলে গেলেন,আমি যাতে ওনার রুমে যায়। না জানি, আমার জন্য কি অপেক্ষা করছে ভাবতে ভাবতে ওনার রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ওনি রাগে ভাব নিয়ে আমায় ভিতরে প্রবেশ করার অনুমতি দিল। কোনো কথা-বার্তা নাই সেদিন ওনি আমার সামনে ৯টা ফাইল এগিয়ে দেয়, রাতের ভিতর এগুলোর সব অসম্পূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ করে দিতে হবে। এই ভেবে ভেতর’টা শুকিয়ে গেল, মামির সংসারে আমাকে তো রাত্রেও গাঁধার মত খাটতে হয়, তারপর ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। ওনার এই ফাইলগুলো দেখতে যে বাড়তি সময় দরকার সেটা আমি কই পাব?! এসব ভেবে কান্না চলে আসছিল তাই আমি ফাইলের কাজের ব্যাপারে অপারগতা প্রকাশ করলে ওনি আমার হাতে আরো ৩টা ফাইল ধরিয়ে দিলেন। আমি যেন এতক্ষণ সপ্ত আকাশে ছিলাম আর এখন হঠাৎ করেই সেখান থেকে মাটিতে পরে গেলাম। ওনাকে আর কিছু বলার সাহস পেলাম না। চলে গেলাম ওনার রুম থেকে। সিদ্ধান্ত নিলাম অফিসে কাজের ফাঁকে ফাঁকে ফাইলগুলোও একটু একটু দেখে নিব। লাঞ্চের সময় সেদিন আর বাইরে যায় নি খেতে। কি দরকার আছে সময় নষ্ট করার? তারচেয়ে বরং লাঞ্চের সময়’টা কাজে লাগাব। হঠাৎ’ই মনে হলো সামনে থেকে কিছু একটা সরে গেল। স্যারের রুমের দিকে তাকালাম। নাহ, কেউ নেই……

ছেলেটির ডায়েরী_
দেখতে দেখতে তিন’টা বছর চলে গেল। মায়াকে এখন আর আপনি নয়, তুমি’ই সম্বোধন করা হয়। এই তিন’টা বছরে একটু একটু করে আমি মায়াকে চিনলাম। ওর দক্ষতা সম্পর্কে জানলাম। সত্যি, দেখতে পিচ্চি হলেও মেয়েটি সাংঘাতিক বুদ্ধিমতি এবং কাজের। যাক, এতদিনে এটা বিশ্বাস করতে পারলাম বাবার মন্তব্যগুলো সম্পূর্ণ অমূলকও নয়। হঠাৎ করে মেয়েটা কেমন যেন চেঞ্জ হয়ে গেল। আগের মত হাসে না, বেশী কথাও বলে না। সবসময় কেমন যেন গম্ভীর ভাব নিয়ে থাকে। জিজ্ঞেস করলে বলে, সে কিছু না। ব্যাপার’টা আমার কেন যেন ভালো ঠেকছিল না….

মেয়েটির ডায়েরী_
সেদিন স্যারকে নিয়ে বিদেশী ক্লাইন্টদের সাথে কথা বলতে বলতে অনেক রাত হয়ে গেল। সেদিনও স্যার আমায় একা ছাড়তে সাহস পায়নি। ওনার গাড়িতে করে পৌঁছে দিয়ে আসলেন আমার বাসার সামনে। গাড়ি থেকে নেমে চলে যাওয়ার সময় ওনি আমার সাথে মজা করে বলছিলেন, বাব্বাহ! চলে যাচ্ছ? আমায় একটু সাধলে কি চলে যেতাম নাকি?! আমি মৃদ্যু হেসে বললাম, আরেকদিন স্যার। কি করব?! আমার যে হাত পা বাঁধা। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সাহস হয়নি স্যার’কে বাসায় নিয়ে যেতে। সেরাতে বাসায় পৌঁছে দেখি মামির ভাই’টা আমার রুমের পাশের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। ফ্রেশ হয়ে আমি যখন রুমে শুতে যাব, তখন’ই ওনি আমার পিছু পিছু রুমে প্রবেশ করে। ঝাপিয়ে পরে আমার উপর। প্রাণপনে বাঁচার চেষ্টা করেও যখন ওনার সাথে পারছিলাম না, তখন সতর্কতাসরুপ বালিশের কাভারের ভিতর যে চাকু’টা লুকিয়ে রেখেছিলাম, সেটা দিয়ে ওনাকে আঘাত করি। ওনার হাত কেটে রক্তাক্ত হয়ে যায়। ছেড়ে দেয় আমাকে। সে রাতেই মামির হাত থেকে বাঁচার জন্য মামাতো বোনের সহযোগীতায় বাড়ি ছেড়ে পালাই। প্রথম দিন আমার একটা চিনা আন্টির বাসায় আশ্রয় নিলেও সে বাসায় ২দিনের বেশী থাকতে পারলাম না। ঐ বাসার আংকেল’টার বাজে দৃষ্টি সবসময় আমার উপর ছিল। সেদিন ঐ বাসা ছেড়ে চলে আসি। অনেক দেখে শুনে এবং একমাত্র বান্ধবীর সহযোগীতায় একটা ভালো বাসা খুঁজে পায়। আমার কোম্পানির মালিক ভালো আংকেলের বাসার সাথের বাসা’টায় আমি ভাড়াটিয়া থাকতাম। দেখতে দেখতে আরো একটা বছর চলে গেল। একসাথে কাজ করতে, চলতে চলতে কখন যে সিয়াম’কে নিয়ে বুকের গভীরে ভালো লাগার বীজ বপন করে ফেললাম বুঝতে পারিনি। সেই ভালো লাগা’টা কি শুধু’ই ভালো লাগা নাকি অন্য কিছু সেটা দেখার জন্য স্যারের থেকে ছুটি নিলাম তিনদিনের। স্যারের থেকে তিনদিন দুরে থাকতে পারি কি না সিদ্ধান্ত নিলাম। একদিনও থাকতে পারিনি। কেন জানি দুরে থাকার কথা ভাবতে’ই আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। আর থাকতে পারলাম না। ছুটে গেলাম অফিসে। সেদিন স্যার আমাকে দেখে এতটা অবাক হয়েছিল যা বলার মত না। অবাক হওয়ার’ই কথা। বহু অনুনয়-বিণয় করে তিনদিনের এই ছুটি নিয়েছিলাম আমি। তারপর কেটে গেল আরো একটি বছর। আমার এম.বিএ’টাও কমপ্লিট হলো। পড়াশোনার কোনো চাপ নেই, বাড়তি কোনো টেনশন নেই। সারাদিন শুধু অফিস আর রাত্রে রুমের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ওর রুম’টার দিকে তাকিয়ে থাকা। আজকাল ওনার বাড়ির ছাদেরও প্রেমে পরে গেছি আমি। প্রেমে পরে গেছি ছাদের ফুলগাছগুলোর। প্রেমে পরে গেছি ওনার রুমের জানালার। যা দেখে’ই প্রতি রাত্রে’ই আমার ঘুমুতে যাওয়া। সময় বয়ে যেতে লাগল, আর আমি ওনার ওনার প্রেমে ভেঙে চূড়ে পরলাম। ওনার প্রতি আমি যেন ভিষন রকম দূর্বল হয়ে যাচ্ছিলাম। আজকাল তেমন কথাও বলি না কারো সাথে। ভাবতে ভালো লাগে। ওনাকে নিয়ে ভাবতে…..

ছেলেটির ডায়েরী_
আজকাল রাত্রে ভালো ভাবে ঘুম হয় না। ছাদে গেলে কেন যেন মনে হয় ওপাশের ছাদ থেকে একটা অস্পষ্ট ছায়া আমার দিকে চেয়ে আছে। তাকালে শূন্যতা ছাড়া আর কিছু’ই দেখতে পায় না। মাঝ রাত্রে ঘুম ভেঙে যায়। জানালার পাশে দাড়িয়ে রাতের যান্ত্রিক শহর’টা দেখতে যাব, তখন’ই কেন যেন মনে হয় ওপাশের বিল্ডিংয়ের জানালা দিয়ে কেউ একজন আমার দিকে তাকিয়ে আছে। পরক্ষণে ঐদিকে তাকায়! নাহ! এবারো শূন্যতা ছাড়া কিছু’ই দেখতে পায় না। ভ্রম ভেবে এসব চিন্তা মাথা থেকে তাড়িয়ে দেয়….. সেদিন সারা রাত ধরে বিছানায় ছটফট করে ঘুমুতে পারলাম। কিসের যেন এক শূন্যতা ভেতর’টাকে অস্থির করে তুলছিল। কিন্তু কিসের শূন্যতা? আমার তো সব আছে। মা-বাবা, ছোট বোন, বন্ধু-বান্ধব। সবাই আছে। তারপরও কিসের এত শূন্যতা?!!! ভাবতে পারছিলাম না, আবার শত চেষ্টা করার পর ঘুমও আসছিল না। বিছানা থেকে উঠে বারান্দায় গেলাম। নাহ, কিছুতেই ভালো লাগছে না। রুমে চলে আসলাম। জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। ভেতর’টা এতক্ষণে শীতল পরশে ঠান্ডা হয়ে গেল। আহ! কত শান্তি…!!!
নাহ, এখন আর খারাপ লাগছে না। আচ্ছা, আমার কি হয়েছে? কেন রোজ রোজ এমনটি হয়? কেন আমার ভিতর’টা এমন লাগে। কিসের জন্য এত হাহাকার বুকে। হঠাৎ’ই আমার এক কাব্যিক বন্ধুর কথা মনে পড়ে গেল। যে প্রায়’ই একটা কথায় ওর গার্লফ্রেন্ড’কে বলত, যদি কখনো কোনো রাত্রে ঘুম ভেঙে যায়, হাজার চেষ্টা করেও ঘুমুতে না পারো, ভিতর’টা যদি অজানা এক শূন্যতা’য় ছটফট করে, ভেবে নিও তোমার পৃথিবীর আরেক প্রান্তে তোমার জন্য অন্য একজন রাতজেগে স্বপ্ন বুনছে। যার কারনে তোমার ঘুম আসছে না। আচ্ছা, আমাকে নিয়েও কি কেউ রাতজেগে স্বপ্ন বুনছে?
-‘ ধূর! এসব কি ভাবছি? এ যুগে এমন ভালোবাসা হয় নাকি? 😞
নিজের মাথায় নিজেই হাত দিয়ে থাপ্পর দিলাম। হঠাৎ মনে হলো ওপাশের বিল্ডিংটার রুমের জানালার পর্দা’টা নড়ে উঠল। মনে হচ্ছে, কোনো আবছায়া সরে গেছে ওখান থেকে…….
চলবে।

বসের সাথে প্রেম পর্ব- ০২


বসের সাথে প্রেম
পর্ব- ০২
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

ছেলেটির ডায়েরী_
অফিসের পুরনো হিসেবের খাতা’টা হাতে নিয়ে দেখতে লাগলাম গত তিন বছরের লাভ ক্ষতির ক্ষতিয়ান। কারন, গত তিন বছর পড়াশুনার স্বার্থে আমায় দেশের বাহিরে থাকতে হয়। এর আগে অবশ্য এখানে ৪বছর কাজ করে গেছি, সেটা অন্য বিষয়। পড়াশুনা শেষ করে দ্বিতীয়ববারের মতো আজ’ই প্রথম বাবার ব্যবসায়ে জয়েন করলাম। হঠাৎ করে’ই শুনতে পেলাম দরজার সামনে মেয়েলি কন্ঠে কেউ একজন বলছে, আসতে পারি স্যার? সামনের দিকে না তাকিয়েই বললাম- Yes, coming. তারপর আমি আবারো লাভ- ক্ষতির দেখতে লাগলাম। হঠাৎ করেই মনে হলো কেউ একজন যে রুমে এসেছে সে বাবার সিলেক্ট করা পি.এ মায়া নয়তো। অতি আগ্রহ নিয়ে সামনের দিকে তাকালাম। কিন্তু একি?! এ যে সেই মেয়ে যাকে কিছুক্ষণ আগে অফিস থেকে একটু দুরে ছেড়ে দিয়ে আসছিলাম। ও এখানে কেন এসেছে? আর আমার অফিস’টায় বা চিনল কিভাবে? মেয়েটির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসো দৃষ্টিতে প্রশ্ন করলাম-
‘ আপনি? আপনি এখানে কেন?’ মেয়েটি বেশ কিছুক্ষণ পর স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জবাব দিল-
‘ স্যার, আমি মাত্র’ই অফিসে এসেছি। এসে শুনলাম আপনি আমায় ডেকেছেন স্যার। তাই এলাম।’ তার মানে আপনি..?!!!!!
মেয়েটি আমার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে বলল- স্যার, আমি মায়া। আমি ভ্রু-কুচকে বললাম, মানে আপনি আমার পি.এ মায়া?! মেয়েটি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। মেয়েটির আপাদমস্তক দেখে কেন যেন মনে হলো এই মেয়েটি খুব বেশী হলে ১৬ কি ১৭ বছরের পিচ্চি। এর বেশী নয়। যাকগে। ওকে বললাম, তা মিস/মিসেস মায়া কতদিন ধরে এমন ফাঁকি দেওয়া চলছে কাজে? আই মিন কতদিন ধরে কাজের প্রতি এই অবহেলা চলছে? মেয়েটি কান্না কান্না ভাব নিয়ে বলল- না, স্যার! আমি কখনো লেইট করি না। আজ’ই প্রথম লেইট হলো। প্লিজ স্যার আজকের জন্য মাফ করে দেন। আর কখনো এমন হবে না। আমি বললাম হুম, মাফ করে দিলাম আজকের জন্য’ই। এখন আসতে পারেন। মায়া চলে গেল।

মেয়েটির ডায়েরী_
স্যারের রুমের সামনে গিয়ে বললাম- আসতে পারি স্যার? রুম থেকে কেউ একজন বলল- Yes, coming. কেন জানি কন্ঠস্বর’টা খুব বেশী চেনা চেনা মনে হচ্ছিল। বুকের ভিতর যে কম্পন’টা এতক্ষণ ধরে চলছিল, সেটি মুহূর্তেই বন্ধ হয়ে গেল যখন দেখতে পেলাম বসের চেয়ারে বসে থাকা লোকটি আর কেউ নই। কিছুক্ষণ আগে যে যুবকটি আমায় হেল্প করেছিল এ সেই যুবক। কিন্তু এও কি সম্ভব? হয়তো সম্ভব! অবাক দৃষ্টি নিয়ে বসের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলাম। যদিও ছুটে এসেছিলাম স্যরি বলার জন্য। কিন্তু এখানে যে আমার জন্য এত বড় সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে বুঝতে পারিনি। ২২বছরের জীবনে আজ’ই প্রথম এত বড় ধাক্কা’টা খেলাম। ৫মিনিট পর বস আমার দিকে তাকালেন। কিন্তু একি?! ওনি এভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন কেন? ও বুঝেছি। আমার মত ওনিও টাস্কি খেয়েছে। 😂😂
‘ আপনি? আপনি এখানে কেন? কিভাবে এসেছেন? এমন আরো কতগুলো প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া হলো আমার দিকে। একসাথে এতগুলো প্রশ্নের উত্তর দেওয়া তো আর সম্ভব না। তাই ছোট্ট করে উত্তর দিলাম, আমি মায়া। কলিগ মুক্তা আমায় পাঠিয়েছি। ওনি আমার শেষ করার আগেই ভ্রু কিঞ্চিৎ বাঁকা করে প্রশ্ন করতে যাচ্ছিলেন বোধ হয়, আপনি মায়া? তার আগেই আমিও ওনার কাছ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে বললাম, আমি মায়া। আপনার পি.এ মায়া। ওনি আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে মুখটা কেমন যেন করল। তারপর কেন লেইট হলো, এই ফাঁকি কতদিন ধরে চলছে এসব প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন আমার দিকে। 😒
আমি ভয়ে চুপসে গেলাম, কারন ওনার হাতে তখন কর্মচারীদের হাজিরা খাতা। বোধ হয় আমার নামের পাশে কলম ঘুরাচ্ছেন। তাই ভয়ে স্যরি বলে কৃতকর্মের জন্য মাফ চেয়ে নিলাম। খাতায় লেইট মার্ক উঠে গেলে আমি শেষ। কিন্তু না। ওনি খাতা’টা রেখে দিলেন। আর কখনো যাতে এমনটি না হয় সেটা বলে আমায় যেতে বললেন। আমি খুশিতে লাফিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেলাম। 😊

ছেলেটির ডায়েরী_
মেয়েটিকে দেখে কাজের মনে হলেও কেন যেন ওর বয়স দেখে মনে হলো না ও কাজের যোগ্য। আর তাছাড়া এই চাকরী করার ক্ষেত্রে যে শিক্ষগত যোগ্যতা’টা থাকে সেটা আদৌ যে আছে সেটাই আমার সন্দেহ হচ্ছে। সে যায় হোক! দেখি এই মেয়ে কতটা কাজের। বাবার কথা তো আর পুরোপুরি মিথ্যে হতে পারে না…
সেদিন ১০টা বাজার আগেই অফিসে পৌঁছলাম। আসা মাত্রই সবাই নিজ নিজ আসন থেকে উঠে আমায় গুডমর্নিং ওয়িশ হলো। হঠাৎ—
একি?! এই মেয়ে তো দেখি আজ’ও লেইট করছে। তার মানে এই মেয়ে রোজ রোজ এমন করে। আজ আসুক, ওর চাকরীর বারো’টা বাজাবো। মনে মনে ভাবতে ভাবতে রুমে চলে গেলাম। আসার আগে বলে এলাম, মায়া আসার সাথে সাথেই সাথে আমার রুমে পাঠিয়ে দেয়। এদিকে সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে বিকাল হলো। মায়া আর আসল না। আমি তো রেগে আগুন। বাবা’কে না জানিয়েই মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম, এই মেয়েকে এর উপযুক্ত শাস্তি দিব’ই।

মেয়েটির ডায়েরী__
অফিসের খাটাখাটি শেষে বাসায় এসেও একদন্ড রেস্ট নিতে পারি না। মামির অসহনীয় অত্যাচার দিনকে দিন বাড়তে থাকে। তারউপর আবার কালকে অনার্স ৪র্থ বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা। যদিও অফিসের বড় কর্মকতার থেকে পারমিশন নেওয়ায় আছে পরীক্ষার দিনগুলোতে কাজে যেতে পারব না তবুও কেন যেন ভয় ভয় লাগছিল। মনে হচ্ছিল বসকে বলে আসলেই ভালো হতো। ভোরে ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়ে রান্না-বান্না করে রেডি হয়ে নিলাম পরীক্ষার জন্য। ১০টা থেকে পরীক্ষা। একটু আগেই যেতে হবে। দেখতে দেখতে সময় চলে গেল। পরীক্ষা দিয়ে এসে যেই না একটু বিছানায় গা এলিয়ে শুইলাম, ওমনি মামি এসে রাজ্যের ঝাড়ি ঝেড়ে নিলেন। ছুটে গেলাম রান্না ঘরের দিকে। কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেলাম। কাজ সেরে রান্না ঘর থেকে এসে না খেয়েই ঘুমিয়ে পরলাম। মনে মনে ভয় হচ্ছে, না জানি আগামীকাল অফিসে গিয়ে বসের কি ঝাড়িটায় না খেতে হয়…..

চলবে….

বসের সাথে প্রেম পর্ব- ০১

বসের সাথে প্রেম
পর্ব- ০১
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

ছেলেটির ডায়েরী__
অঘোরে বৃষ্টি হচ্ছে। বাসা থেকে যখন বের হয় তখন আকাশটা বেশ পরিষ্কার’ই ছিল। হঠাৎ করেই কোথা থেকে যেন একটুকরো মেঘ আকাশে উড়ে। ক্ষানিক বাদেই পুরো আকাশ’টা ঢেকে গেল ঘন কালো মেঘে। একটু পরেই ঝম-ঝমাঝম বৃষ্টি শুরু হলো। সেকি বৃষ্টি! সকাল ৯টায় এই টং দোকানে আশ্রয় নিয়েছি, তখনো বৃষ্টি ছাড়ার কোনো নাম-গন্ধ’ই নেই। তাই বাধ্য হয়েই বৃষ্টির মধ্যেই গাড়িতে উঠে যায়, অফিসে যাওয়ার জন্য। যদিও বাবা বলেছিল, আকাশ মেঘলা থাকলে যেন গাড়ি না চালাই। আমি যখন গাড়ি নিয়ে রাস্তার মাঝ বরাবর চলে এসেছি, ঠিক তখনই গাড়ির গ্লাসে চোখ পরতেই দেখি একটি মেয়ে এই ঘোর বৃষ্টির মধ্যে হাতে ছাতা আর কাধে ব্যাগ নিয়ে একদম ছুটে চলছে সামনের দিকে। জীবনে কখনো নিজে থেকে কোনো মেয়ের সাথে কথা বলিনি, কিন্তু আজ কেন মেয়েটির জন্য বড্ড মায়া হলো। কোনো হেল্প লাগবে কি না জিজ্ঞেস করতে ছুটে গেলাম মেয়েটির দিকে। মেয়েটির থেকে ঠিক ৩,৪হাত দুরেই গাড়িটা থামালাম। মেয়েটি থমকে তাকালো। জিজ্ঞেস করলাম-
– Can I help you,mem?
প্রতিউত্তরে মেয়েটি কিছুই বলল না। কিন্তু মুখ দেখে মনে হচ্ছে খুব তাড়া আছে। আমি আবারো বললাম, কোনো ভাবে কি আমি আপনাকে হেল্প করতে পারি? মেয়েটি মনে হচ্ছে হ্যাঁ-না কি বলবে সেই দ্বিধা সংকোচে ভুগছে আর বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে। আমি আবারো বলি- ” ম্যাম, সংকোচ না করে বলেই ফেলেন।” মেয়েটি কোনো কথা না বলে গাড়িতে উঠে বসল। জিজ্ঞেস করলে বলে, সামনেই কোথাও যাবে। আমি বললাম ঠিক আছে, আপনার গন্তব্যে এলে আমায় সংকেত দিবেন। মাথা নেড়ে মেয়েটি সম্মতি জানালো।
,
,
মেয়েটির ডায়েরী__
আজ আমাদের অফিসে নতুন এমডি আসছে। নতুন বললে ভুল হবে। প্রাক্তন’টায় এখানে খাটে। কারন, ওনি এর আগেও এখানে ৪বছর কাজ করে গেছেন। সময়টা কম হলেও এই সংক্ষিপ্ত সময়ের ইতিহাসটা ব্যপক। শুনেছি, ওনি নাকি ভিষন রগচটা আর বদমেজাজি স্বভাবের একজন মানুষ ছিলেন। কাজের ক্ষেত্রে ফাঁকি একদম বরদাস্ত করতেন না ওনি। আবার অফিসে পৌঁছাতে একমিনিট লেইট হলে একদিনের সেলারি কেটে নেওয়া হতো। খাতায় লেইট মার্ক যদি তিনদিনের বেশী হতো তাহলে বেতনের এক তৃতীয়াংশ কেটে নেওয়া হতো। তাই আজ ভয়ে প্রতিদিনের চেয়ে একটু আগেই বের হয়ে গেলাম বাসা থেকে, যদি লেইট হয়ে যায় সেই ভয়ে। কে জানত যেই ভয়ে বাসা থেকে তাড়াতাড়ি বের হলাম, সেই ভয়টায় সত্যি হয়ে যাবে। বাসা থেকে বের হওয়ার ঘন্টাখানেকের মধ্যেই আকাশ মেঘলা হয়ে গেল। ঘোর কালো অন্ধকার করে কিছুক্ষণের ভিতর বৃষ্টি শুরু হলো। কিছুক্ষণ একটা দোকানে আশ্রয় নিলেও বেশীক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না বসের ভয়ে। দোকান থেকে ছাতা কিনে ছুঁটতে লাগলাম অফিস পানে। কিন্তু এত জোরে বৃষ্টি হচ্ছিও যে হাতের ছাতাটাও বৃষ্টির কাছে হার মেনে যাচ্ছিল। বৃষ্টিতে আধভেঁজা হয়ে আল্লাহ’কে ডাকছি আর ছুটে চলছি। হঠাৎ করেই একটা গাড়ি পিছন থেকে চলে গেল। হঠাৎ করেই গাড়িতে পিছিয়ে আসল। আমি থমকে দাঁড়ালাম। গাড়ির বন্ধ জানালা খুলে গেল। এক সুদর্শন যুবক গাড়ির ভেতর থেকে আমায় বলছে, Can I help you, mem? আমি যেন যুবকটির কোনো কথায় শুনতে পাচ্ছিলাম না। ক্ষণিকের জন্য হারিয়ে গেলাম দুর অজানায়। ঘোর কাটলো ওনার ডাকে। বলছে, আমি কি কোনো ভাবে আপনাকে হেল্প করতে পারি? ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ৯টা বেজে ৩৫মিনিট। আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম। কোনো কিছু না ভেবেই উঠে গেলাম গাড়িতে। জীবনের প্রথম এত দামী গাড়িতে কোনো সুদর্শন যুবকের পাশে বসে আছি। বুকের ভিতর বসন্তের কোকিল কুহু স্বরে ডেকে উঠল, লজ্জা পেয়ে গেলাম।আচমকা ওনি বলে উঠলেন, ‘ আপনার গন্তব্যে এলে আমায় সংকেত দিবেন, কেমন?’ আমি লজ্জায় মুখ দিয়ে কিছু বলতে পারিনি, শুধু মাথা নাড়িয়ে আমার ‘হ্যাঁ’ বলাটা জানান দিচ্ছিলাম….
,
,
ছেলেটির ডায়েরী__
দেখতে দেখতে বাবার অফিসের সামনে এসে গেলাম। এখন বাবার কোনো কর্মচারী যদি দেখে আমার পাশে অচেনা মেয়ে, আমি তাকে নিয়ে অফিসে না গিয়ে, সামনে কোথাও চলে গেছি, তাহলে পরিনতি খারাপ হবে। ছয়কে নয় বানিয়ে বাবার কান ভারি করে দিবে। সেই ভয়ে মেয়েটিকে নামিয়ে দিলাম অফিসের ঠিক একটু সামনেই। মেয়েটি নেমে আমার দিকে তাকিয়ে গিয়ে কৃতজ্ঞচিত্রে একটা হাসি দিয়ে চলে গেল। আমি অফিসে প্রবেশ করলাম। সবাই নিজ নিজ আসন থেকে উঠে আমায় গুডমর্নিং জানালো। হঠাৎ’ই চোখ যায় একটা চেম্বারের দিকে, যেটা এখনো শূন্য পরে আছে। খেয়াল করে দেখলাম আসনটা পি.এর। এ নিশ্চয় বাবার পছন্দে সিলেক্ট করা পি.এ মায়ার আসন! বাবার মুখে মেয়েটির অনেক গুনগান শুনেছি, এই তার লক্ষণ? রাগে গজগজ করতে করতে আমার রুমে চলে গেলাম, যাওয়ার আগে বলে গেলাম পি.এ আসার সাথে সাথেই যাতে আমার রুমে পাঠানো হয়….
,
,
মেয়েটির ডায়েরী_
হঠাৎ’ই গাড়িটা এক জায়গায় এসে থেমে গেল। যুবক’টা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, বৃষ্টি থেমে গেছে, আমারও তাড়া আছে। আপনি বরং এখানেই নেমে যান। ট্যাংক্সি কিংবা রিক্সা করে চলে যান আপনার গন্তব্যে। গাড়ি থেকে নেমে যুবকটির দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞসরুপ একটা হাসি দিলাম। না, না। আমার রিক্সা কিংবা ট্যাংক্সি কোনো’টার প্রয়োজন হয়নি। কারন যুবকটি আমায় অফিস থেকে এমন এক জায়গায় নামিয়ে ছিল যেখান থেকে আমার অফিস মাত্র ২মিনিটের ছিল। পায়ে হেঁটেই পৌঁছে গেলাম অফিসে। হঠাৎ’ই কলিগ মুক্তা ডেকে বলল- মায়া ম্যাডাম, আপনাকে বস ডেকেছে। তাড়াতাড়ি যান, নইলে নামের শেষে লেইট মার্ক বসিয়ে দিবে। কথাটা শুনেই হৃদকম্পন বেড়ে গেল। ছুটে চললাম ওনার রুমের দিকে। দরজার কাছে গিয়ে বললাম__
” আসতে পারি স্যার?”

চলবে….

তুমিহীনা

-ঘড়ির কাটায় গুনেগুনে ঠিক রাত ১২ টা,যেকোনো সুস্থ মানুষের জন্য এটা ঘুমের সময়,সারাদিনের খাপছাড়া,অর্ধপূর্ণ সব ভাবনা গুলোকে মানুষ এখন খুটিয়ে খুটিয়ে চোখ বন্ধ করে দেখছে আর ভেসে বেড়াচ্ছে স্বপ্নের জগতে।

তবে আজ সৈকতের চোখে ঘুম নেই,হাত দুটোকে পেছনে গুজে মরা কঠের মতো ঠান্ডার মধ্যে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। ওর ঠিক পায়ের কাছেই দুটো সদ্য ফুল ফোটা গোলাপের গাছ,একটাতে কালো গোলাপ ফুটেছে আর একটাতে ফুটেছে টকটকে লাল গোলাপ।সৈকত এক দৃষ্টিতে কালো গোলাপটাকে দেখছে,রাতের কালোতে কালো গোলাপটাকে বিবর্ন আর পানসে মনে হচ্ছে,রঙ থেকেও ওকে রংহীন মনে হচ্ছে,যেন একরাশ মনখারাপের ডালি।

আর পাশের লাল গোলাপটাকে দেখলেই ফিরে তাকাতে ইচ্ছে হয়,চোখে স্বপ্ন খেলা করে,মাথা তুলে দাঁড়াবার ইচ্ছে হয়।আসলেই রঙ একটা বিশাল ফ্যাক্টর,দেখার দৃষ্টিই বদলে দেয়।তবে জগতের ডিসক্রিমিনেশনে এ নিয়ম খাটে না আবার এই যেমন মেয়েদের যোগ্যতার মাপকাঠি রুপ,যৌবন আর লাবন্য হলে ছেলেদের যোগ্যতার মাপকাঠি হয় বিসিএস ক্যাডারধারী খেতাব কিংবা ভারী ব্যাংক ব্যালেন্স,প্রেমে অবশ্য ভিন্ন বিয়েতেই বরং হয় আসল ঝামেলা।এসব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ ওর ভাবনায় ছেদ পড়লো, বুকপকেটে রাখা সৈকতের ফোনটা কেপে উঠতেই শোনা যাচ্ছে,

–ওই দুটি চোখ যেনো জলে ফোটা পদ্ম যতো দেখি তৃষ্ণা মেটে না,
ভীরু দুটি বাকা ঠোঁটে পূর্নিমা চাঁদ ওঠে, হাসলেই ঝড়ে পরে জ্যোৎস্না!।

কলার টিউনটা তিন বছর আগের সেট করা,গানটার উপর একটা বিশাল ভালোলাগা কাজ করে সৈকতের।এই একটা গানই যেনো প্রেমিকাকে স্বরনের জন্য যথেষ্ট, প্রেমে মাতাল হওয়ার জন্য যথেষ্ট।পুরোটা বাজার আগেই কিঞ্চিত অপ্রস্তুত হয়ে সৈকত ফোনটা রিসিভ করে ফেললো তবে কানের কাছে নিয়ে হ্যালো বলতে সংকোচ হচ্ছে,হাজারো এলোমেলো ভাবনা মুহূর্তেই ওর মাথায় খেলা করছে,আচ্ছা আজকের দিনে ওর ফোনটা ধরা কি ঠিক হবে?তবে ও কেনো ফোন করেছে আসলে? কিছু জানাতে‌!

………………

লেখকঃশারমিন আক্তার সেজ্যোতি
————————

কাছে_আসার_গল্প

কাছে_আসার_গল্প

অনামিকা_ইসলাম_অন্তরা

আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু শুভ্র। সেই স্কুল লাইফ থেকেই ওর সাথে আমার পরিচয়। তারপর কলেজ। কলেজ জীবন একসাথে কাটানোর পর ভর্তি হলাম ভার্সিটিতে। সেখানেও একসাথে। ওর প্রতি আগে থেকেই দুর্বল ছিলাম আমি। ভার্সিটিতে এসে একটু বেশীই ঝুঁকে পড়ি। সেখানে ক্লাসের চেয়ে আড্ডায় হতো বেশী। সেই আড্ডার মধ্যমণি ছিল ‘ও’। ভার্সিটির সবচেয়ে সুদর্শন এবং মেধাবী ছেলে ছিল শুভ্র। মেয়েদের একটা বিশাল লাইন সবসময় ওর পিছনে লেগেই লাগতো। আমি দুর থেকে দাঁড়িয়ে সে দৃশ্য দেখতাম। মেয়েরা হাসাহাসি করে ওর উপর ঢলে পড়ত। সহ্য হতো না আমার। আবার মুখ ফুটে বলতেও পারতাম না। কেননা, ওর সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা হলেও আন্তরিকতা হয়নি তখনো।

আমাদের ডিপার্টমেন্টে ছেলেদের লিডার ছিল ‘ও’ আর মেয়েদের ছিলাম আমি। স্যার একদিন আমাদের দুই লিডারের নাম্বার ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে দিলেন বাকি ছেলে-মেয়েদের যোগাযোগ করার সুবিধার্থে। আমি সে সুযোগটা কাজে লাগালাম। ওর ফোন নাম্বারটা আমি টুকে নিলাম নোট খাতায়। গ্রীষ্মের ছুটি দিয়েছিল। পড়ন্ত এক বিকেলে আমি ওর নাম্বারে কল দেই। শুরুটা সেখান থেকেই। তরপর খুব ভালো একটা বন্ধুত্ব হয় আমাদের।

ভার্সিটি লাইফ শেষ হয়। একেকজন একেকদিকে চলে যায়। কিন্তু আমাদের বন্ধন অটুট থাকে। বছর দু’য়েক আগে ও মহিলা কলেজে বাংলার প্রভাষক হিসেবে জয়েন করে। ওর বিয়ের জন্য পাত্রী দেখার শুরুটা হয় তখন থেকেই। টানা দু’বছর ধরে অসংখ্য পাত্রী দেখেছে ওর ফ্যামিলি মেম্বার’রা। অবশেষে কিছুদিন আগে ওরা ওদের মনের মতো পাত্রীর সন্ধান পায়। খুব তাড়াহুড়োর মধ্য দিয়েই দু’পক্ষের বোঝাপড়া হয়ে যায়। রাত পোহালেই ওদের আংটিবদল হবে। অনেক বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। আমার পরিবারের সবার’ই অনুষ্ঠানে থাকা বাধ্যতামূলক জানিয়ে দেয়া হয়েছে। আব্বা মা অবশ্য বিকেলেই চলে গেছে ঐ বাড়িতে। ঘন্টা খানেক আগে বড় আপু অফিস থেকে আসে। ওরাও চলে গেছে। আমাকে সেধেছিল। যাইনি। নিজে থেকেই বাড়ির প্রহরী হিসেবে রয়ে গেলাম।

রাত্রি ১১টা বেজে ১৭মিনিট__
বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করেছি অনেকক্ষণ। কিন্তু নিদ্রাদেবী কিছুতেই ধরা দিলো না। আর পারছিলাম না। ডায়েরী হাতে নিয়ে আবারো বসলাম। কি লিখা যায় ভাবতেই মনে হলো কবিতাকে ছুটি দিয়েছি বেশ ক’বছর হলো। আজ বরং একটা কবিতা’য় লিখা যাক। মুখ দিয়ে কলমের ঢাকনা খুলে লিখতে শুরু করলাম-

“তোমাকে হারিয়ে ফেলেছি ভেবে মন খারাপের দোলনায় দোল খেয়েছি সকাল থেকে সন্ধ্যা। পড়ার টেবিলে অবহেলায় খুলে রাখা বইয়ের কালো অক্ষর ঝাপসা হয়েছে কতবার!

মাথার নিচে রাখা বালিশ ভিঁজে গেছে নিরব কান্নায়…

তারপর আবার একদিন মন দোয়ারে দাঁড়িয়ে তুমি! ঠোঁটের কোণে হাসি লুকিয়ে জানতে চাইলাম– “আবার এসেছো?”

তুমি অবাক হয়ে বললে–
“কেন, আর কোথায় বা যাবো…!”

লিখা শেষে কবিতাটা পড়ে নিলাম একবার। নিজের কবিতা পড়ে নিজেরই হাসি পাচ্ছে ভিষন। ‘এও কি সম্ভব? হারানো মানুষরা আদৌ কি ফিরে আসে?’
ভাবছিলাম আরো অনেক কিছুই। ফোনটা বেজে উঠল তখনি। ডায়েরীটা বন্ধ করে ফোন রিসিভ করলাম-
” হ্যাঁ, বল…”
– নতুন নাম্বার দিয়ে ফোন করেছি। তবুও চিনে গেছিস?(শুভ্র)
— তুই ছাড়া যে কেউ নেই আমার। তাইতো চিনে নিতে অসুবিধে হয় না…!
– কি বললি?
— বলছি কি করছিস? এত রাত্রে কল কেন দিলি? ঘুমাবি কখন?
– আরে ঘুমিয়েই ছিলাম। তারপর কি যে এক বাজে স্বপ্ন দেখছি। হুট করে জেগে গেছি। ভাবলাম, তোর কিছু হলো না তো!
— বোকা ছেলে! স্বপ্ন তো স্বপ্নই। এর জন্য এত টেনশনের কি আছে?
– এই! সত্যি করে বল। তুই ভালো আছিস তো?
— হ্যাঁরে, হ্যাঁ। আমি অনেক ভালো আছি।
– কিছু লুকাচ্ছিস না তো?
— আরে গাধা না। তুই বৃথা টেনশন করছিস।
– আচ্ছা, রাতে খেয়েছিস?
— শুভ্র অনেক রাত হয়েছে। তুই ঘুমা।
– তুই ঘুমাইবি না?
— হ্যাঁ, আমিও ঘুমাবো। তুই এখন ঘুমা প্লিজ…
– আচ্ছা, রাখছি। বাই।

কল কেটে দেয় শুভ্র। চোখের জল বাঁধ মানছিল না। হু, হু করে কেঁদে দিলাম। ভিতরে যন্ত্রণা হচ্ছে প্রচুর। মনে হচ্ছে কেউ যেন হাতুড়ি দিয়ে দুরমুশ পিটাচ্ছে। লাইটটা অফ করে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু ঘুম চোখে ধরা দিল না। অন্ধকারে বিছানায় উঠে বসলাম। হাঁটুতে ভর দিয়ে বসে আছি। চোখের জলে হাঁটু ভিঁজে একাকার হয়ে গেছে। ফোনটা বেজে উঠল আবারো। শুভ্র ফোন দিয়েছে। রিসিভ করে কানে ধরলাম-
” কি হলো? ফোন কেন ধরছিস না? সেই কখন থেকে ফোন দিচ্ছি?”

কান্না লুকিয়ে কন্ঠ’টা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলামঃ-
– ইয়ে, মানে, আসলে…
— আসলে কি?
– ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম।
— ওহ, আচ্ছা।
– ঘুমাসনি এখনো?
— তোদের বাসার নিচে দাঁড়িয়ে আছি।
– কিহ?
— হ্যাঁ। আসবি?

ফোন কানে দ্রুত বারান্দায় গেলাম। নিচে তাকাতেই দেখলাম দাঁড়িয়ে আছে ‘ও’। ‘তুই দাঁড়া, আমি আসছি’ বলেই দৌঁড় দিয়ে নিচে নামলাম।
– এত রাত্রে না আসলেও পারতি…!
— এখানে দাঁড় করিয়ে রাখবি?
– আয়। ভেতরে আয়….

ও গেইটের ভেতরে ঢুকলে তালা না লাগিয়েই দোতলায় রুমের দিকে এগুতে লাগলাম। ও আমার পিছু পিছু হাঁটছে-
” বস….”
– তোদের বাড়িটা অনেক সুন্দর।
— Tnq u…
– আচ্ছা, তুই ভালো আছিস তো?
— শুভ্র, এই পানিটুকু তুই খেয়ে নে।
– ………..
— এবার বল। কি এমন স্বপ্ন দেখছিস যার জন্য তোকে এখানে ছুটে আসতে হলো?
– তুই ভালো আছিস তো…
— বার বার একই প্রশ্ন করবি না তো…!
– আমি তোকে ছুঁয়ে দেখতে পারি?
— এসব কি পাগলামী হচ্ছে শুভ্র?
– আমি না খুব বাজে স্বপ্ন দেখছি।
— কি স্বপ্ন? বল শুনি…
– বলবো। তার আগে আমায় ছুঁয়ে কথা দে আমার একটা প্রশ্নের সত্যি উত্তর দিবি।
— কথা দিলাম। এই আমি তোকে ছুঁয়ে কথা দিলাম তোর সমস্ত প্রশ্নের ঠিকঠাক এবং সত্যি উত্তর দেবো।
– ভালোবাসিস কাউকে?

ঘাবড়ে গেলাম আমি। বসা থেকে উঠে দাঁড়ালাম। ও বসা থেকেই জানায়-
” আমায় ছুঁয়ে কথা দিয়েছিস কিন্তু….”
– হু,
— এবার বল। ভালোবাসিস কাউকে?
– হু, বাসতাম।
— বাসতিস? এখন বাসিস না?
– কাল ও অন্যজনের হয়ে যাবে।
— কিহ? কিসব বলছিস তুই? কে সেই ছেলে? বাড়ি কোথায়?
– আমাদের বাসার সবাই ও বাড়িতেই আছে। দাওয়াত দিয়েছে কি না…
— এই মেয়ে! পাগল হয়ে গেলি নাকি তুই?
– পাগলই বটে। ওর প্রেমে পাগল।
— ওকে, ফাইন। এটা বল, নাম কি ছেলের?
– শুভ্র….

শুভ্র ফিরে তাকায় আমার দিকে। আমার জলে ভেঁজা চোখ দুটি যেন ওকে কিছু বলছে। ও গভীর ধ্যানে আমার সেই চোখের দিকে তাকিয়ে দৃষ্টির ভাষা বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করছে। মিনিট তিনেক পর উঠে দাঁড়ায়। প্রতিধ্বনিত হয় একটি ছোট্ট শব্দ- ” আসি…..”

ও চলে যায়। কান্নায় ভেঙে পড়ি আমি। টেবিলে মাথা রেখে ছোট বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কাঁদছি আমি…

এদিকে শুভ্র গেইট থেকে বাহির হতেই একটি যুবক ছুটে আসে ওর কাছে। হাপাতে হাপাতে লোকটি শুভ্রর সাহায্য চায়। তারপরের কথোপকথনঃ-
– কি সমস্যা ভাইয়া?
— ভাই প্লিজ আমাকে কয়টা টাকা দিন।
– কেন? আর কিসের টাকা দেবো আমি আপনাকে?
— আমার গার্লফ্রেন্ড বিষ খেয়ে মারা গেছে। পুলিশ আমাকে খুঁজছে। আমার এখন পালাতে হবে?
– কিকিকি বলছেন এসব? আপনি খুনি?
— আমি খুন করিনি। ওর বিয়ে ঠিক হয়েছিল। আজ বিকেলে আমায় দেখা করার জন্য ডেকেছিল। আমি দেখা করতে গেলে ওকে বুঝাই- ‘দেখো লিপি! যা হওয়ার তাতো হয়ে গেছে। বাবা মা যেহেতু বিয়ে ঠিক করেছেন। সেহেতু তুমি বিয়েটা করে নাও। আর তাছাড়া আমি বেকার। তোমাকে বিয়ে করে খাওয়াবো কি…?’
– তারপর?
— অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে চলে আসি আমি।
– তখনই ও বিষ খায়।
— কেউ দেখেনি/টের পায়নি?
– নাহ। ও ঐ স্থানে বসে বিষ খেয়েছে, যে নির্জন স্থানে আমাদের শেষ কথা হয়।
— মারা গেছে?
– হ্যাঁ…
— নিন। (২০০০টাকা বাড়িয়ে দিয়ে)
– অশেষ কৃতজ্ঞতা ভাইয়া।
— সাবধানে থাকবেন।
– আল-বিদা।

দেখতে দেখতে লোকটি দুরে কোথাও মিলিয়ে যায়। পিছু হটে শুভ্র। তালা’টা লাগানো হয়নি, গেইট’টা তখনো খুলা ছিল। দু’তলার ১ম রুম অতিক্রম করে ভিতর রুমের সামনে এসে দাঁড়ায় শুভ্র। দরজার সামনে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে মাথা তুলে তাকালাম আমি। ভেঁজা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে শুভ্র। ঠোঁটের কোণের হাসি লুকিয়ে জানতে চাইলাম-
” আবার এসেছিস?”

রুমের ভেতরে চলে আসলো ও। টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম আমি। পরম নিবিড়ে বুকের মাঝে জড়িয়ে নিল ও আমাকে। তারপর অনেকটা কবিতার মতই অবাক করা কন্ঠে বলল-
” কেন, আর কোথায় বা যাবো…!”

  1. #কাছে_আসার_গল্প
    #অনামিকা_ইসলাম_অন্তরা