হারিয়ে যাওয়া অনুভূতি পার্ট-২৫

0
557

হারিয়ে যাওয়া অনুভূতি পার্ট-২৫
#আরিশা অনু
-দুপুরের পর থেকে রুহি বাইনা ধরেছে বাবাইএর সাথে সে ঘুরতে বের হবে।এদিকে অনন্যার কঠিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে যাওয়ার ক্ষমতা ও বেচারির নেই। তাই আম্মুকে লুকিয়ে বাবাইএর কানে কানে কি যেন ফিস ফিস করে বলছে।আর রোহান সেটা শুনে এক প্রকার হেসে গড়িয়ে পড়ছে।সে হাসিতে যেন সকালে প্রথম ওঠা নরম রোদের ছোয়া মিশে আছে। অনন্যা মুগ্ধ দৃষ্টিতে রোহানের হাসি দেখছে আর বাবা মেয়ের ফুসুর ফুসুর বোঝার চেষ্টা করছে।বাট সে শুনতে ব্যার্থ কারন ওরা বারান্দাই বসে কথা বলছে। আর অনন্যা বেডের উপর আধাশোয়া হয়ে আছে।
অনেকক্ষণ ধরে বাবা মেয়ের কথা শোনার চেষ্টা করেও কিছু শুনতে পেলনা অনন্যা তাই এক প্রকার বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলো কি এত কথা হচ্ছে শুনি বাবা মেয়ের মধ্যে…?
!
-সকালে ওঠা নরম রোদের মতন হাসিটা হেসে রোহান জবাব দিল এটা বাবা মেয়ের মধ্যকার কথাবার্তা। তোমাকে বলা যাবেনা তুমি বরং ঘুমাও এখন।রোহানের কথায় তেড়ে উঠে বললাম বাবা মেয়ের মাঝে আমি কি বাইরের লোক নাকি যে আমায় বলা যাবেনা।আমি শুনতে চাই বাবা মেয়ের মধ্যে এত কিসের ফুসুর ফুসুর হচ্ছে।
!
-আম্মুর এমন তেড়ে ওঠা দেখে রুহি ভয় পেয়ে গেছে। না জানি তাদের সব প্লান আবার আম্মু জেনে যাই।আর তাদের ঘুরতে যাওয়ার প্লান ভেস্তে যাই আবার।বেচারি ভয়ে ভয়ে মায়ের দিক থেকে চোখ সরিয়ে বাবার দিকে করুন চোখে তাকাল।আরে মামনি তুমি ভয় পেওনাতো। তোমার আম্মুকে কাঁচ কলা দেখিয়ে আমরা ঘুরতে যাব বলেই হেসে উঠল রোহান সাথে রুহিও হেসে ফেলল।ওদিকে অনন্যা বাবা মেয়ের কথা শুনে রাগে গজ গজ করে বলল যা পারো করো পরে যেন আবার আমায় বলতে আসবা না বলে দিচ্ছি।রোহান আর রুহির ঠোঁটের কোনায় এখনো সেই নরম হাসিটা লেগে রয়েছে।
!
-অনন্যা মুখে যতই বলুকনা কেন মনে মনে খুব খুশি যে রোহান রুহিকে নিয়ে আজ ঘুরতে বের হচ্ছে। মেয়েটার অনেক দিনের স্বপ্ন যে সে বাবার সাথে ঘুরতে যাবে।আজ আমার মেয়েটার স্বপ্ন পুরোন হতে চলেছে।অনেক খুশি আজ আমার বাচ্ছাটা। কি চাই আর আমার চোখ বন্ধ করে কথাগুলো এতক্ষণ ভাবছিল অনন্যা।ভাবতে ভাবতে কখন যে চোখ লেগে গেছে টের পাইনি ও।
!
-গোধূলির হালকা নরম লাল রোদ এসে মুখের উপর পড়তেই ঘুম কিছুটা ভেঙে গেল বেচারির।আড়ামোড়া ভেঙে একবার চোখমেলে তাকাতেই চোখে লেগে থাকা ঘুম কোথায় যেন তিরের বেগে ছুটে পালালো।এখন প্রায় সন্ধা হয়ে এসেছে। ধরমড়িয়ে উঠে পড়ল অনন্যা রুমটা অনেকটা অন্ধকার। শুধু জানালার একসাইডের পর্দা সরে গেছে তাই সূর্যের অবাধ্য আলো এসে ভির জমিয়েছে রুমের ভেতর।হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাওয়ায় সূর্যের আলো চোখে পড়ে কিছুটা অসস্থি হলেও এখন আলোটা চোখে সয়ে গেছে তাই এখন অসস্থি বোধটা কিছুটা কমে গেছে অনন্যার।
!
-বেড ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো সে। খোলা চুলগুলো হাতখোপা করে হাতমুখ ধুতে গেল অনন্যা।হাতমুখ ধুয়ে রুমে এসে দেখে আম্মু বসে আছে বেডের উপর।কিরে ঘুম হলো তোর।হ্যাঁ আম্মু রুহি, রোহন ওরা কোথায়।মেয়েটা ওর বাবার সাথে ঘুরতে বেরিয়েছে রে মা। তুই ওকে কিছু বলিসনা আর।বাচ্চাটার একটা ইচ্ছা তো পূরণ হোক।হুম আম্মু কিছু বলব না।কিন্তু আমার চিন্তা হচ্ছে তৃধাকে নিয়ে। এই শয়তান মেয়ে মনে মনে আবার কোন ফাঁদ পাতছে কে জানে।
!
-আরে রাখতো এত চিন্তা করিসনা ঠিক হয়ে যাবে সব।রোহান যদি ঠিক থাকে তাহলে তৃধার কিছু করার ক্ষমতা নাই কথাটা বলে থামলেন শাহেলা জামান।
!
-তা ঠিক কিন্তু এই তৃধা যা মানুষ জিতে যাওয়া খেলা ও যে কোনো মুহুর্তে হারিয়ে দিতে পারে এ মেয়ে। সঙ্গে সঙ্গে পাশা পালটে নিতে সময় লাগবে না এর।আরে ধুর রাখতো আই মা মেয়ে মিলে একটু শান্তিতে গল্প করি।শোন কাল রাতে কি কি হয়েছে। মুখে একঝুড়ি হাসি নিয়ে মেয়েকে পাশে বসিয়ে গল্পে মেতে উঠলেন শাহেলা জামান।
!
-অনেক আদিক্ষেতা সহ্য করেছি আর না আজ রোহান বাসায় ফিরুক এর একটা বিহীত আমি করে ছাড়ব।কি ভেবেছে কি এই ছেলে দিনের পর দিন আমায় মেয়েটার সাথে খেলা করবে আর আমি চুপচাপ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখব। নেভার অনেক হয়েছে আজ এর শেষ দেখে ছাড়ব আমি।সুদূর কানাডা থেকে আসছি কি এসব রং ঢং দেখতে।কত আশা ছিল আমার একমাএ মেয়েটাকে বড় অনুষ্ঠান করে বিয়ে দেব তা আর হলনা।কোত্থেকে এই ফালতু মিডিলক্লাস মেয়েটা উঠে আসলো আবার।প্রথম থেকেই দুচোখে সহ্য করতে পারিনা একে আমি।শুধু রোহানের সামনে ভালো থাকার অভিনয় করতাম।একরাশ ক্ষোব নিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে চা খেতে কথাগুলো বলল তমসা রহমান।
!
-যা কিছু হচ্ছে এর জন্য তুমি দায়ী মম।কি দরকার ছিল মাতব্বরি করে অনন্যা কে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার।না তুমি বের করে দিতে আর না আজ গুষ্টিশুদ্ধু সবাই এবাড়িতে এসে হাজির হত।এই রোহানের বাচ্চার এত সম্পত্তি না থাকলে কবে ওকে ছেড়ে দিয়ে আমার বয়ফ্রেন্ড হায়াটে কে বিয়ে করতাম। এতদিনে দুই বাচ্চার মা হয়ে যাই আমি।তোমাদের ফালতু সম্পত্তির চক্কোরে পড়ে আমার সব গেল।বিয়ের কোনো ঠিক ঠিকানা নাই আমার জিবন গেল চিরোকুমারি হয়ে। আমি বুঝতে পারছি না হায়াটে কে বিয়ে করলে তোমাদের প্রবলেম কোথায় ছিল একরাশ বিরক্তি নিয়ে কথাগুলো বলল তৃধা।
!
-এ পর্যায়ে তমসা রহমান ফুসে উঠে বললে তুই এখনো ঐ হারিমির বাচ্চাটার কথা ভুলিসনি।কি আছে ওর সাদা চামড়া ছাড়া আর কি যোগ্যতা আছে।
!
-মম ওর যা যোগ্যতা আছে তোমার তা নেই।তুমি আর ড্যাড মিলে আমার লাইফ পুরো হেল করে ফেলেছো।নাটক করতে করতে আজ আমি ক্লান্ত।
!
-হ্যাঁ এখন তো ক্লান্ত হবাই ওই সাদা চামড়ার বাচ্চাটার সাথে যখন রাতদিন ফুর্তি করে বেড়াতে তখন তোমার ক্লান্তি কোথায় থাকত।নাইট ক্লাব,লং ড্রাইভে ই সারাদিন রাত পার করে দিতে তখন তোমার ক্লান্তি আসতোনা।
!
-এ পর্যায়ে তৃধা এবার চরম আকারে খেপে গেল খবরদার মম তুমি আমার পার্সোনাল ম্যাটারে নাক গলাতে আসবানা।ভুলে যেওনা আমি এখন এডাল্ট। আমার যা ইচ্ছা আমি তাই করব।যেখানে ইচ্ছা যার সাথে ইচ্ছা থাকব ঘুরব তোমার কোনো অধিকার নেই আমাকে আটকানোর।এবার কানাডা ব্যাক করেই আলাদা এপার্টমেন্ট ভাড়া করব আমি থাকব না আর তোমার ঘ্যানঘ্যানানি শুনতে ওবাড়িতে।
!
-মেয়ের কথা শুনে এক প্রকার হা হয়ে গেলেন তমসা রহমান।কি বলে এসব একি আদেও তার মেয়ে। নাকি বাইরে থেকে তুলে আনা কোনো বস্তু। যার উপর সে কোনো কথা বলতে পারবে না। অথচ তার খাবে আবার তার ই গাবে।মনে মনে কথা গুলো ভেবে চুপচাপ ঝিম মেরে বসে রইলেন তমসা রহমান।আর আক বাড়িয়ে কথা বলার স্বাদ তার নেই।
!
-ঘটনা বাড়াবাড়ির দিকে যাচ্ছে দেখে এ পর্যায়ে মুখ খুললেন তুষার রহমান।এতক্ষণ চুপচাপ মা মেয়ের ঝগড়া শুনলে ও এবার আর মুখ বন্ধ করে থাকতে পারলেন না তিনি।দুজনকেই একপ্রকার ধমক দিয়ে বলে উঠলেন কি হচ্ছে টা কি এখনে অবুঝ দুধের শিশু তোমরা। যেকোনো মুহুর্তে রোহান চলে আসতে পারে এছাড়া অনন্যারা ও এবাড়িতে আছে আর তোমরা মা মেয়ে ভর সন্ধা বেলা তর্ক যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছো।একবার ভেবে দেখেছো একবার রোহানের কানে এসব কথা ঢুকলে আমাদের এত বছরের সব প্লান মাটি হয়ে যাবে।এক দমে কথা গুলো বলে থামলেন তুষার রহমান।তবে মা মেয়ের দিকে তাকিয়ে তার মনে হল এতক্ষণ তিনি সময় নষ্ট করে যে বয়ান দিলেন তাতে এদের কিছু এসে যাই।বরং সুযোগ পেলে আবার কখন তর্ক যুদ্ধে নেমে পড়বে এরা এমন ভাবসাব এদের।
!
-রাত সাড়ে আটটা ছুই ছুই তখন বাসায় আসলো রুহি আর রোহান।একগাদা শপিংব্যাগ আর খেলনা নিয়ে হাজির হল তারা।তৃধা তখন ড্রয়িং এ বসা।চোখ যেন রাগে ঝলসে উঠছে তার।মনের দুঃখে নিজের চুল নিজে ছিড়তে মন চাইছে এখন।এসব রং ঢং দেখে দেখে কি সে বুড়ি হবে নাকি। নেভার এবার একটা ব্যবস্থা করতেই হবে এই অনন্যার।মনে মনে এগুলো চিন্তা করলেও মুখফুটে কিছু বলল না।চুপচাপ দেখতে থাকল সব তামাশা।
!
-রুহি হাসি হাসি মুখে দৌঁড়ে এসে অনন্যার গলা জড়িয়ে ধরল।দানো(যানো) আম্মু বাবাই আমাতে(আমাকে)অনেককিতু (অনেককিছু)তিনে(কিনে)দিয়েছে।মেয়েকে এত খুশি দেখে অনন্যার চোখে পানি এসে গেল।তারপর রোহানকে উদ্দেশ্য করে বলল এতকিছু কেনার কি দরকার ছিল শুধু শুধু কতগুলো টাকা নষ্ট হল তোমার।
!
-অনন্যার এমন কথায় রোহান রাগে গর্জে উঠে বলল আমি আমার মামনির জন্য যা ইচ্ছা কিনবো তোমার অত চিন্তা করা লাগবে না রেস্ট নাও তুমি।তারপর ব্যাগগুলো রেখে ফ্রেশ হতে চলে গেল রোহান।
.
.
.
.
Continue….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here