ঘুমন্ত রাজপরী_পর্ব(০৪)

0
254
ঘুমন্ত রাজপরী
ঘুমন্ত রাজপরী_

ঘুমন্ত রাজপরী_পর্ব(০৪)

‘আমার কি সৌভাগ্য। গলা চিনে ফেলেছেন। ‘ঠাট্টা করছেন নাকি ভাই? ‘পাগল হয়েছেন। আপনার সঙ্গে কি আমার ঠাট্টার সম্পর্ক? ‘আমার চিঠিটা নিয়ে গিয়েছিলেন? ‘হা, গিয়েছিলাম। বহু কষ্টে ব্যাটার ঠিকানা বের করতে হয়েছে। ‘কী বলেছেন উনি?
‘আপনার পারসােনাল টাচওয়ালা পেনসিলের চিঠিটা পড়ে মুখ বিকৃত করে বলল, বি. করিম—এই শালা আবার কে? আমার কাছে পেনসিলে চিঠি লেখে, আস্পর্ধা তাে কম নয়।
করিম সাহেব বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। নিজেকে সামলে নিয়ে মেঘস্বরে বললেন, ‘ফিরােজ সাহেব, একটা কথা শুনুন।
‘বলুন।’
কেন সবসময় এ-রকম উল্টোপাল্টা কথা বলেন? ‘সত্যি কথা বলছি। শুধু-শুধু মিথ্যা বলব কেন?’
‘ঐ ভদ্রলােকের সঙ্গে আমার টেলিফোনে কথা হয়েছে। আপনি তাঁর কাছে এখনাে যান নি। তিনি ঠিকানা বদলেছেন, এখন থাকেন রামকৃষ্ণ মিশন রােডে।
ও, আচ্ছা। ‘আপনি গেলেই উনি আপনাকে কাজ দেবেন। ‘মেনি থ্যাংকস। ‘ফিরােজ সাহেব।
‘আচার-আচরণ সাধারণ মানুষের মতাে করার চেষ্টা করুন। ইয়ারকি- ফাজলামি তাে যথেষ্ট করলেন। বয়স কত আপনার?
‘পঁয়ত্রিশ। ‘বয়স তাে মাশাআল্লাহ্ কম হয় নি। আরেকটা কথা। ‘বলুন, শুনছি।
ফখরুদ্দিন সাহেবের বাড়িতে একবার যাবেন।
কেন? ‘ওনার মেয়ে টেলিফোনে আপনাকে চাচ্ছিল।
বলেন কী! কীরকম গলায় চাইল? কীরকম গলায় মানে! প্রেম-প্রেম গলা, না রাগ-রাগ গলা?
বি করিম সাহেব তার উত্তর দিলেন না। টেলিফোন নামিয়ে রাখলেন। রাগে তাঁর গা জ্বলে যাচ্ছে। ফিরােজ হৃষ্টচিত্তে খেতে বসল। প্রচুর আয়ােজন। টেবিলের দিকে তাকাতেই মন ভরে যায়।।
‘সিরিয়াস এক বড়লােকের মেয়ের সঙ্গে প্রেম হয়ে গেছে, বুঝলে আপা। একেবারে লুদকালদকি প্রেম।
তাজিন কিছু বলল না। একটা বিশাল আকৃতির সরপুটি ভাজা ফিরােজের পাতে তুলে দিল।
| ‘ঐ মেয়ে আমার খোঁজে দিনে চার বার পাঁচ বার করে অফিসে টেলিফোন করছে। বি করিম সাহেবের কান ঝালাপালা।
‘সত্যি-সত্যি বলছিস?’
এই যে মাছ হাতে নিয়ে বলছি। বাঙালির ছেলে মাছ হাতে মিথ্যা কথা বলে না। মেয়েটার নাম কি? ‘অপালা। বিয়ের পর অপা করে ডাকব। অপালা শব্দটার মানে কী, জানিস নাকি? জানি না। মেয়েটাকে ছবিতে যে-রকম দেখাচ্ছে আসলেও কি সে-রকম
ফিরােজ ভাত মাখতে-মাখতে বলল, ‘তুই একটা মিসটেক করে ফেললি রে আপা। ছবির মেয়ে আর ঐ মেয়ে দুই ভিন্ন ব্যক্তিত্ব। তুই গুবলেট করে ফেলেছিস।
| তাজিন রাগ করতে গিয়েও করতে পারল না। তাদের পাঁচ বােনের পর এই এক ভাই। আদরে-আদরেই ওর মাথা নষ্ট হয়েছে। জীবনে কিছুই করল না। কোনাে দিন যে করতে পারবে তাও মনে হচ্ছে না।
‘ফিরােজ। ‘ব।’ ‘সবটাই কি তাের কাছে একটা খেলা?’ ‘খেলা হবে কেন?
তাজিন আর কিছু বলল না। ফিরােজের খাওয়া দেখতে লাগল। কেমন মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে খাচ্ছে। গালভর্তি দাড়ি। হঠাৎ দাড়ি রাখার শখ হল কি জন্যে কে বলবে? জিজ্ঞেস করলে অদ্ভুত কিছু বলে হাসাতে চেষ্টা করবে। ইদানীং আর ফিরােজের কথায়
তার হাসি আসে না, রাগ ধরে যায়। চড় মারতে ইচ্ছে করে।
‘দাড়িতে আমাকে কেমন লাগছে রে আপা? ‘ভালাে।’ ‘রবীন্দ্রনাথ-রবীন্দ্রনাথ ভাব চলে এসেছে না?
তাজিন কিছু বলল না। ‘রবীন্দ্রনাথের মুখের গঠনের সাথে আমার মুখের গঠনের অদ্ভুত মিল আছে।
২৬
চুলদাড়িগুলি আরেকটু লম্বা হােক, দেখবি।
‘তখন কী করবি? একটা আলখাল্লা কিনবি?’ | ‘এটা মন্দ বলিস নি আপা। একটা আলখাল্লা কিনলে হয়। রেডিমেড বােধহয় পাওয়া যায় না। অর্ডার দিয়ে বানাতে হবে। তারপর সেই আলখাল্লা পরে বাংলা একাডেমীর কোনাে একটা অনুষ্ঠানে গিয়ে সবাইকে ভড়কে দেব। চারদিকে ফিসফাস শুরু হবে—গুরুদেব এসে গেছেন।
চুপ কর দেখি!
‘সরি, আমার আবার মনেই থাকে না তুই বাংলার ছাত্রী। দে, একটা পান দে। চমনবাহার থাকলে চমনবাহার দিয়ে দে।’
অপালা যে-বার ক্লাস এইটে বৃত্তি পেল, সে-বার তার বাবা তাকে চমৎকার একটা উপহার দিয়েছিলেন। লিসবন থেকে কেনা মরক্কো চামড়ায় বাঁধাই-করা পাঁচ শ’ পাতার বিশাল একটা খাতা। মলাটে একটি স্প্যানিস নর্তকীর ছবি। চামড়ায় এত সুন্দর ছবি কী করে আকা হল কে জানে! দেখলে মনে হয় মেয়েটি চামড়া ফুড়ে বের হয়ে এসে নাচা শুরু করবে।
ভেতরের পাতাগুলির রঙ মাখনের মতাে। কী মসৃণ। প্রতিটি পাতায় অপূর্ব সব জলছাপ। গাছপালা, নদী, আকাশের মেঘ।
ফখরুদ্দিন সাহেব হাসতে-হাসতে বললেন, ‘উপহারটি মনে হয় খুব পছন্দ হয়েছে?
আনন্দে অপালার চোখে পানি এসে গিয়েছিল। সে নিজেকে সামলে গাঢ় গলায়। বলল, হ্যা।
এখন থেকে এই খাতায় গল্প, কবিতা, নাটক—এইসব লিখবে। এইসব তাে আমি লিখতে পারি না বাবা। ‘লিখতে-লিখতেই লেখা হয়। চেষ্টা করবে। ঐ সব না পার, জীবনের বিশেষ বিশেষ ঘটনা লিখে রাখবে। এই যে তুমি বৃত্তি পেলে, এটা তাে বেশ একটা বড় ঘটনা। সুন্দর করে এটা লিখবে। তারপর তােমার যখন অনেক বয়স হয়ে যাবে, চুল হবে সাদা, চোখে ছানি পড়বে—তখন ঐ খাতাটা বের করে পড়বে, দেখবে কত ভালাে লাগে।’
‘আমি কোনােদিন বুড়াে হব না বাবা। ‘তাই বুঝি? ফখরুদ্দিন সাহেব ঘর কাঁপিয়ে অনেকক্ষণ ধরে হাসলেন।
চমৎকার সেই খাতায় প্রথম এক বছর অপালা কিছুই লিখল না। তার অনেক বার লিখতে ইচ্ছে করল, কলম নিয়ে বসল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সুন্দর পাতাগুলি নষ্ট করতে ইচ্ছে করল না। সে খাতা খুলে রেখে মনে-মনে পাতার পর পাতা লিখে যেতে লাগল। অনেক লেখা পছন্দ হল না, সেগুলি মনে-মনেই কেটে নতুন করে লিখল।
১৭
ক্লাস নাইনে হাফ-ইয়ারলি পরীক্ষার শেষ দিনে সে প্রথম বারের মতাে লিখল। সাধু ভাষায় লেখা সেই অংশটিই এই
আজ আমার পরীক্ষা শেষ হইয়াছে। আমার মনে কোনাে আনন্দ হইতেছে না। পরীক্ষা বেশ ভালাে হইয়াছে। তবে কেন আমার আনন্দ হইতেছে না? আমি সঠিক জানি না। মাঝে-মাঝে খুব আনন্দের সময় আমার দুঃখ লাগে। আমি কাঁদিয়া ফেলি। গত বছর আমরা নেপালের পােখরা’ নামক একটি স্থানে গিয়াছিলাম। চারিদিকে বিশাল পাহাড়। কত সুন্দর দৃশ্য। বাবা এবং মা’র মনে কত আনন্দ হইল। বাবা ক্যামেরা দিয়া একের পর এক ছবি তুলিতে লাগিলেন। কিন্তু কোনাে কারণ ছাড়াই আমার মনে খুব দুঃখ হইল। গলা ভার-ভার হইল। চোখ দিয়া পানি আসিতে লাগিল। ভাগ্যিস কেহ দেখিতে পায় নাই।” | অপালার খাতাটি ক্রমে ভরে উঠতে লাগল। ক্লাস টেনে উঠে প্রথম গল্প লিখল। বয়সের সঙ্গে তার গল্পটি মিশ খায় না। গল্পের নাম রাজ-নর্তকী। গল্পের বিষয়বস্তু পনের বছরের মেয়ের কলমে ঠিক আসার কথা নয়। শুরুটা এ-রকম ?
রাজ-নর্তকী মহিমগড়ের রাজপ্রাসাদে থাকে এক নর্তকী। রাজসভাতে গান করে, নাচে। তার নাচ যে-ই দেখে সে-ই মুগ্ধ হয়। সেই রাজসভায় এক দিন এলেন ভিনদেশি এক কবি। তিনি নর্তকীর নাচ দেখে মুগ্ধ হলেন। হাত জোড় করে বললেন, ‘দেবী, আমি কি আপনার নাম জানতে পারি? নর্তকী হাসিমুখে বলল, আমার নাম অপালা। ‘দেবী, আমি কি নিভৃতে আপনার সঙ্গে কথা বলতে পারি?
হ্যা, পারেন। আসুন গােলাপ বাগানে।। তারা দু জন গােলাপ বাগানে গেল। ফুলে-ফুলে চারদিক আলাে হয়ে আছে। রাজ-নর্তকী অপালা বলল, ‘কী আপনার নিবেদন, কবি? আপনি আমার কাছে কী চান?
যা চাই তাই কি আমি পাব? এত বড় সৌভাগ্য সত্যিই কি আমার আছে? তা তো বলতে পারছি না। আগে আমাকে বলতে হবে, আপনি কী চান? ‘আমি আপনাকে নিয়ে একটি কবিতা লিখতে চাই।’ ‘বেশ তাে, লিখুন। ‘আপনার অপূর্ব দেহ-সুষমা নিয়ে একটি কবিতা লিখতে চাই।
বেশ তাে।’ কিন্তু দেবী, তার জন্যে আপনার দেহটিকে তাে আমার দেখতে হবে। দেখতেই তাে পাচ্ছেন। পাচ্ছেন না? ‘না, পাচ্ছি না। আপনার অপূর্ব দেহটি আড়াল করে রেখেছে কিছু অপ্রয়ােজীয়-পােশাক। এইগুলি। খুলে ফেলুন। পােশাক আপনার জন্যে বাহুল্য। এত সুন্দর একটি শরীরকে পােশাক ঢেকে রাখবে এটা কিছুতেই আমি মেনে নিতে পারি না। সে খানিকক্ষণ ভাবল, তারপর একে একে খুলে ফেলল সব। শুধু গলায় রইল একটি চন্দ্রহার। সে চলুহারও খুলে ফেলতে গেল। কিন্তু কবি চেচিয়ে উঠলেন, না না, চন্দ্রহার খােলার সরকার নেই। চন্দ্রহার সরিয়ে ফেললে দেহের সমস্ত সৌন্দর্য একসঙ্গে আমার চোখে এসে পড়বে। আমি তা সহ করতে পারব না। গলায় শুধুমাত্র চন্দ্রহার পরে সে বাগানে হাঁটতে লাগল। আর রাজকবি একটি গাছের ছায়ায় তাঁর কবিতার খাতা নিয়ে বসলেন। আকাশ ঘন নীল। সূর্য তার হলুদ ফুল ছুঁড়ে দিচ্ছে চারদিকে। বাতাসে সেই হলুদ ফুলের নেশা ধরানাে গন্ধ। গাছে-গাছে পাখি ডাকছে।
গল্পের শেষ অংশ বেশ নাটকীয়। হঠাৎ বাগানে প্রবেশ করলেন রাজা। এই অদ্ভুত দৃশ্য দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। রাজ-নর্তকী অপালার মৃত্যুদণ্ড ইল | কবির চোখ অন্ধ করে দেয়া হল। অন্ধ কবি পথে-পথে ঘুরে বেড়ান এবং নর্তকীকে নিয়ে গীত রচনা করেন। অপূর্ব সব গীত। তিনি নিজেই তাতে সুর দেন। নিজেই গান। বনের পশু পাখিরা পর্যন্ত সেই গান শুনে চোখের জল ফেলে।
পরবতী কয়েক পৃষ্ঠা জুড়ে কবির লেখা গীত। গীতগুলি গদ্যের মতাে সরল নয়। ছেলেমানুষি ছড়া।
| এই লেখার পর প্রায় দু বছর আর কিছু লেখা হয় নি। দু’ বছর পর হঠাৎ লেখা—আমার জীবন। গদ্য এখানে অনেক স্বচ্ছ, গতিময়। হাতের লেখাও বদলে গেছে। আগের গােটা-গােটা হরফ উধাও হয়েছে। এসেছে প্যাচানাে ধরনের অক্ষর। আগের কোনাে লেখায় কোনাে রকম কাটাকুটি নেই। মনে হয় আগে অন্য কোথাও লিখে পরে খাতায় তােলা হত। আমার জীবন লেখাটিতে প্রচুর কাটাকুটি।
T
আমার জীবন আমি কি খুব বুদ্ধিমতী ? মনে হয় না। কেউ কোনাে হাসির কথা বললে আমি বুঝতে পারি না। আজ বড় খালার বাসায় সবাই আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করছিল। এটা যে ঠাট্টা, আমি বুঝতে পারি নি। কী নিয়ে কথা হচ্ছে তাও বুঝতে পারছি না। অবাক হয়ে সবার মুখের দিকে তাকাচ্ছি। বড় খালার মেয়ে বিনু হেসে গড়িয়ে পড়ছে। আমি অবাক হয়ে বললাম, আমি তাে কিছু বুঝতে পারছি না। বড় খালা বললেন, কম বােঝাই তােমার জন্যে ভালাে। বেশি বুঝলে বা বুঝতে চাইলে ঝামেলায় পড়বে। আমি এই কথার মানে বুঝলাম না। মন-খারাপ করে বাসায় চলে এলাম। সারা দুপুর ডাবলাম। তখন একটা জিনিস আমার কাছে পরিষ্কার হল আমাকে বাবা এবং মা ছাড়া কেউ পছন্দ করেন না। যেমন বড় খালা, তিনি ছােট খালার ছেলেমেয়েকে তুই করে বলেন, মেজো খালার ছেলেমেয়েকে তুই করে বলেন; আমাকে বলেন তুমি করে।। সন্ধ্যাবেলা বাবাকে আমি এই কথাটা বললাম। বাবা চট করে খালাদের উপর রেগে গেলেন এবং বলতে লাগলেন—যা কেন তাদের বাসায় ? আর যাবে না। ‘ওঁরাও এ-বাড়িতে আসবে না। দারােয়ানকে বলে দেব এলে যেন গেট খােলা না হয়। বাবার রাগ যেমন চট করে ওঠে তেমনি চট করে নেমে যায়। এইবার তা হল না। কী লজ্জার কাণ্ড! পরদিন সকালবেলা বাবা বড় খালাকে টেলিফোন করে বললেন—আপনি সবাইকে তুই-তুই করে বলেন, আমার মেয়েটাকে তুমি বলেন কেন? ভাগ্যিস বাবার এসব কাণ্ডকারখানা মা জানতে পারেন নি। জানলে খুব মন খারাপ করতেন। মার হার্টের অসুখ খুব বেড়েছে। নড়াচড়াই করতে পারেন না। এই অবস্থায় মল-খারাপ করার মতো কোনাে ঘটনা ঘটতে দেয়া উচিত নয়। কিন্তু বাৰা এসব কিছু শুনবেন না। যা তাঁর মনে আসে, করবেন। আমার মাঝে-মাঝে মনে হয় মার এই অসুখের মূল কারণ হয়তাে-বা বাবা। কী লিখছি আবােল-তাবােল, হার্টের অসুখের কারণ বাবা হতে যাবেন কেন? তাঁর মতাে ভালাে মানুষ ক’জন আছে?
আজ অনেক দিন পর অপালা তার খাতা নিয়ে বসেছে। কোনাে কিছু লেখার উদ্দেশ্যে নয়। পুরনাে লেখায় চোখ বােলানাের জন্যে। রাজ-নর্তকী গল্পটি সে পড়ছিল। এ-রকম একটা অদ্ভুত গল্প এত অল্প বয়সে সে কেন লিখেছিল ভাবতে-ভাবতে লজ্জায় গাল লাল হয়ে উঠল। এই গল্পটি ছিড়ে ফেলতে হবে। কিন্তু খাতা থেকে পাতা ছিড়তে মায়া লাগে। এই গল্পটি এখন ভালাে লাগছে না, আজ থেকে কুড়ি বছর পর
হয়তাে-বা ভালাে লাগবে।
‘আফা।
অপালা চমকে তাকাল। রমিলা যে উঠে এসেছে, তার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে, সে লক্ষই করে নি।
‘আফনেরে নিচে ডাকে।
কে? ‘ঐ যে দাড়িওয়ালা লােকটা, ঘর ঠিক করে যে।
ও আচ্ছা। বসতে বল, আমি আসছি।’
রমিলা গেল না, দাঁড়িয়ে রইল। অপালা শান্ত স্বরে বলল, ‘দাঁড়িয়ে আছ কেন? কিছু বলবে?
‘আপনে দুপুরে কিছু খাইলেন না আফা। ‘খিদে ছিল না।” ‘অখন এটু নাস্তাপানি আনি?
‘আন। আর ঐ লােকটাকে আগামী কাল আসতে বল। আমার নিচে নামতে ইচ্ছা। করছে না।
‘জি আচ্ছা।
ফিরােজ ঘড়ি আনতে ভুলে গিয়েছে, কাজেই কতক্ষণ পার হয়েছে বলতে পারছে না। এই অতি আধুনিক বসার ঘরটিতে কোনাে ঘড়ি নেই। সাধারণত থাকে। কোকিল-ঘড়ি বা এই জাতীয় কিছু। এক ঘন্টা পার হলেই খুট করে দরজা খুলে একটা কোকিল বের হয়। কুকু করে মাথা ধরিয়ে দেয়। সময় পার হয়ে যাচ্ছে, ব্যাপাটাই যন্ত্রণাদায়ক। এর মধ্যে কু-কু করে কেউ যদি সেটা মনে করিয়ে দেয়, তাহলে আরাে খারাপ লাগার কথা। ঘড়ি চলবে নিঃশব্দে। কেউ জানতে চাইলে সময় দেখবে। যদি কেউ জানতে না চায়, তাকে জোর করে জানানাের দরকার কী?
অ্যাসট্রেতে চারটি সিগারেট পড়ে আছে। এই থেকে বলা যেতে পারে, পঞ্চাশ মিনিটের মতাে পার হয়েছে। পঞ্চাশ মিনিট অবশ্যি এক জন রাজকন্যার দর্শনলাভের জন্যে যথেষ্ট নয়। রাজকন্যাদের জন্যে পঞ্চাশ ঘন্টা বসে থাকা যায়।
পর্দা সরিয়ে রমিলা ঢুকল, দাঁত কেলিয়ে বলল, আফা আসতাছে। ফিরােজ মনে মনে বলল, ধন্য হলাম। রাজকন্যার আগমনবার্তা নকিব ঘোষণা করল। এখন সম্ভবত জাতীয় সঙ্গীত বাজবে—আমার সােনার বাংলা আমি তােমায় ভালবাসি।
‘ফিরােজ সাহেব, আপনি কি ভালাে আছেন? ‘জি, ভালাে।’ ‘আপনি ঐ দিন এসেছিলেন, আমার মনটা খুব খারাপ ছিল, নিচে নামতে ইচ্ছা ছিল না। আপনি কিছু মনে করেন নি তাে?’।
“না না, কিছু মনে করি নি। একা-একা বসে থাকতে আমার ভালােই লাগে।’
32
‘আপনার ঐ কাজের ব্যাপারটা নিয়ে বাবার সঙ্গে আলাপ করেছিলাম। তিনি ওকে বলেছেন।
প্রথমে তাে আপনি “নাে” বলে দিয়েছিলেন, আবার কেন…… ‘আপনার চাকরি চলে যাবে বলছিলেন যে, তাই। আপনি বসুন, দাঁড়িয়ে আছেন কেন?
ফিরােজ বসল। বসতে গিয়ে মনে হল, এই মেয়েটি বসবে না। কথা বলবে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে। যে-কোনােভাবেই হােক, বুঝিয়ে দেবে, তুমি আর আমি একই আসনে পাশাপাশি বসতে পারি না। সেটা শােভন নয়। কিন্তু অবাক কাণ্ড, মেয়েটি বসল। ফিরােজ বলল, আমি অবশ্যি খুব ভয়েভয়ে এসেছি। ভেবেছি আপনি গালাগালি করবার জন্যে আমাকে ডেকেছেন।
কী আশ্চর্য। গালাগালি করব কেন?
যেদিন আপনি আমার কাজ বন্ধ করে দিলেন, সেদিন রাগ করে আপনাদের একটা দামী কাপ ভেঙে ফেলেছিলাম। ‘তাই নাকি! বাহ, বেশ তাে!’
আপনি জানতেন না?’ অপালা অবাক হয়ে বলল, ‘সামান্য কাপ ভাঙার ব্যাপারে আমি জানব কেন? ‘ও, আচ্ছা।
‘আপনি যে-দিন ইচ্ছা কাজ শুরু করতে পারেন। যে-কোনাে প্রয়ােজনে আমাদের ম্যানেজারবাবুর সঙ্গে কথা বললেই হবে। আমি পড়াশােনা নিয়ে ব্যস্ত, নিচে সাধারণত নামি না।
কিসের এত পড়াশােনা? ‘অনার্স ফাইন্যাল।
‘ও, আচ্ছা। আপনাকে অবশ্যি অনার্স ফাইন্যালের ছাত্রী মনে হয় না। মনে হয় কলেজ-টলেজে পড়েন।
| অপালা কিছু বলল না। তার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হল। ফিরােজ সেটা লক্ষ করল না। ফুর্তির ভঙ্গিতে বলতে লাগল, পড়াশােনা করতে-করতে যদি ব্রেইন টায়ার্ড হয়ে যায়, তাহলে চলে আসবেন, আমি কাজ বন্ধ রেখে আপনার সঙ্গে গল্প-গুজব করব, ব্রেইন আবার ফ্রেশ হয়ে যাবে।’
তার মানে? আপনি কী বলতে চাচ্ছেন? | ফিরােজ অবাক হয়ে দেখল, মেয়েটির মুখ রাগে লাল হয়ে গেছে। ঠোট অল্প অল্প কাঁপছে। এতটা রেগে যাবার মতাে কিছু কি সে বলেছে?
| ‘আপনি হঠাৎ এমন রেগে গেলেন কেন? আমি অন্য কিছু ভেবে এটা বলি নি। আপনার চেয়ে অনেক-অনেক রূপবতী একটি মেয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে। সেই মেয়েটিকে আগামী সপ্তাহে আমি বিয়ে করছি। দেখুন, তার ছবি দেখুন। | ফিরােজ হাজি সাহেবের মেয়ের ছবিটি টেবিলে রাখল। ভাগ্যিস ছবিটি সঙ্গে ছিল! মেয়েটি একদৃষ্টিতে ছবিটির দিকে তাকিয়ে আছি। ফিরােজ সহজ স্বরে বলল, ‘আপনাকে গল্প করতে এখানে আসতে বলার পেছনে কোনাে উদ্দেশ্য ছিল না। আশা করি এটা আপনি বুঝতে পারছেন। আরেকটি কথা, যদি সেরকম কোনাে উদ্দেশ্য
আমার থাকে, তাহলে সেটা কি খুব দোষের কিছু? ভাগ্যগুণে বিরাট এক বড়লােকের ঘরে আপনার জন্ম হয়েছে, আমার ভাগ্য তেমন সুপ্রসন্ন ছিল না। তাই বলে আমার যদি আপনাকে ভালাে লাগে, সেটা আমি বলতে পারব না? যদি বলি সেটা দোষের হয়ে যাবে? | অপালা উঠে দাঁড়াল। ফিরােজ বলল, ‘কথার জবাব না-দিয়েই চলে যাচ্ছেন? আমি কাজ করব কি করব না, সেটা অন্তত বলে যান।
‘কাজ করবেন না কেন? অবশ্যি আপনার ইচ্ছা না-করলে ভিন্ন কথা।

চলবে….