মন ফড়িং ❤১২.

মন ফড়িং ❤

১২.

আসমা জামান রান্নাঘরে নিদ্রের জন্য খাবার তৈরি করছেন। প্রায় ১ সপ্তাহের মতো হয়েছে ছেলেটা কোনোরকমে খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। তারপরও সে মুখ ফুটে কিছু বলছেনা। নিজের কষ্ট হবে তারপরও তাকে কষ্ট দিবেনা। নাজমুলের তো খোঁজ পাওয়াই দায়। এতো ড্রিংক করতে শুরু করেছে যে কোনো হুশ থাকেনা। সারাদিন বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়ায় আর রাতে নিজের ঘরে বসে এলকোহল গিলবে!
নিদ্র বেশ ক্লান্ত হয়ে বাসায় পৌঁছে দেখলো দাদী রান্নাঘরে! মনে মনে খুব খুশি হলেও ভাবভঙ্গিতে প্রকাশ না করে বললো
– দাদী এসবের কি দরকার ছিলো?
আসমা জামান ভেংচি কেটে বললেন
– আমি না করলে করবে টা কে?
– তা অবশ্য ঠিক! তা কী কী রান্না হচ্ছে?
– চিকেন স্যুপ, চিকেন ব্রোস্ট আর আপনার পছন্দের সালাদ।
নিদ্র তৃপ্তির হাসি দিয়ে বললো
– তাহলে আমি দ্রুত ফ্রেশ হয়ে আসি?
– অবশ্যই। আর তোর বাবাকে ডেকে আন।
নিদ্র বেশ ক্লান্ত স্বরে বললো
– আপনার ছেলে আপনিই ডেকে আনুন।
– আমি তো ডেকেছিলাম, আমার কথা কে শোনে!
– আমি দেখছি।

গোসল সেরে চুল মুছতে মুছতে নাজমুল সাহেবের রুমের দিকে এগিয়ে গেলো। রুমের দরজা বন্ধ ভেতর থেকে। এর অর্থ বাবা ভেতরে!
– বাবা, চলো একসাথে খেতে বসি।
দরজায় টোকা দিয়ে কথাটা বেশ কয়েকবার বললো। কোনো।সাড়াশব্দ না পেয়ে দরজায় বেশ জোরে টোকা দিতে লাগলো। বাবার কিছু হলো না তো? দিনের এই সময়টাতো সে বাসায় থাকেনা। আজকে এইসময় বাসায় তার উপর কোনো সাড়াশব্দ নেই।
নিদ্রের খুব চিন্তা হচ্ছে।
রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে দাদীকে জিজ্ঞেস করলো
– দাদী, বাবা কখন থেকে দরজা লক করে এভাবে আছে?
– সেই ১২ টা থেকে।
– আমাকে বলবে না?
– আরে ও তো এমন প্রায়ই করে।
– কিন্তু তার রুমে সাড়াশব্দ পাওয়া যায় কিন্তু আজকে একেবারেই নিখোঁজ অবস্থায় আছেন।
– সব রুমেরই তো এক্সট্রা চাবি আছে। সেটা দিয়ে খুলতেই পারিস।
– বাবার রুমের এক্সট্রা চাবি তার কাছেই রাখেন।
– তাহলে লক খোলার মিস্ত্রী নিয়ে আয়। আমি ততক্ষণে ডাকাডাকি করে দেখি।
নিদ্র দ্রুত মিস্ত্রীর খোঁজে বের হলো। আসমা জামান ছেলের চিন্তায় রান্নাবান্না বন্ধ করে তার রুমের দরজায় টোকা দিলেন। নরম স্বরে বললেন
– বাবা নাজমুল শোন তো!বাবা আয় একসাথে খেয়ে নেই। বাবা, এমন করিস না।
আসমা জামান কাঁদতে শুরু করলেন। ছেলে মরে গেছে নাকি কে জানে?
নিদ্র পাগলের মতো লোক খুঁজছে। প্রায় ১ ঘণ্টা হতে চললো কিন্তু একজন মানুষ সে পেলো না।
একজনকে বেশ চড়া ভাড়ায় পেলো। নিদ্রের জমানো ডলারের বেশ খানিকটা খরচ হয়ে গেলো। কিছুই করার নেই তার।
বাসায় এসে দাদীকে বাবার রুমের দরজার সামনে বসে কাঁদতে দেখে নিদ্র হকচকিয়ে গেলো।
আধা ঘণ্টা চেষ্টা করার পর লক খুলতে সক্ষম হলো।
দরজা খুলে নিদ্র তার বাবাকে দেখে অবাক! নাজমুল সাহেব তার রকিং চেয়ারে হাতে বই পড়ার মতো করে নিয়ে বসে আছেন। বেশ মনযোগ দিয়েই বই পড়ছেন। নিদ্র তার বাবার দিকে এগিয়ে গিয়ে পাশে দাঁড়ালো। নাজমুল সাহেব ছেলের দিকে না তাকিয়ে বললেন
– আমার বই পড়ায় বিরক্ত কেনো করছো তোমরা?
নিদ্র ঠান্ডা স্বরে বললো
– তুমি উল্টো করে বই কেনো পড়ছো কেনো বাবা?
নাজমুল সাহেব ইতস্ততভাবে বললেন
– সে তুমি বুঝবেনা। now get lost my dear son!
নাজমুল সাহেব পুরোপুরি নেশা অবস্থায় আছেন সেটা নিদ্র বুঝতে পেরে চুপচাপ রুম ছেড়ে বের হয়ে আসলো।
মিস্ত্রীকে তার ডলার বুঝিয়ে দিয়ে দাদীকে বললো
– খাবার দাও তো দাদী!
আসমা জামান রান্নাঘরে ফিরে এসে স্যুপের বাটি খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।

রিতা ছাদে পাটি বিছিয়ে বসে আছেন। অদ্রি ঘুমুচ্ছে আর লিলি কী করছে তার জানা নেই। মেয়েটাকে তার চোখে চোখে রাখা উচিৎ। এটা ঠিক খুব বেয়াদব মেয়েটা। কিন্তু মেয়েটার ক্ষতি হলে তার খারাপ লাগবে,খুব খারাপ লাগবে!

রশিদ সাহেব তার স্ত্রীকে বললেন
– একটা মতামত দাও তাও।
– বলো।
– নাজমুলকে দাওয়াত করলে কেমন হয়? বড়লোক মানুষ দাওয়াতে না আসলেও গিফট পাঠাবে এটা আমি শিওর।
– দাওয়াতে আসবেনা তাহলে গিফট কেনো নিবা? লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে পড়বা!
– ছোটো মেয়েটার শ্বশুরবাড়ি তো দামী গিফট দেয়া দরকার। খোঁটা শুনতে হবে ওর। আমরা না হয় লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে পড়লাম কিন্তু ও তো ভালো থাকুক।
– মেয়েটাও আছে এতো বড়লোক ছেলের সাথে প্রেম কেনো করতে হবে?
– প্রেম কি বলে কয়ে হয় নাকি? আর আমাদের চাওয়া তো একটাই ছেলে মেয়ে ভালো থাকুক। আর ছোটো হচ্ছি নিজেদের লোকের কাছেই। অন্ততপক্ষে ওর শ্বশুরবাড়ির লোকজনের কাছে তো হেয় হতে হবেনা।
– তাহলে করো দাওয়াত আর অদ্রির বাসায় কবে উঠবো আমরা?
– ওই বাড়ি রঙ করাতে হবে তারপর আমরা উঠবো।
– মেয়েটাকে বিয়ে দেয়া দরকার।
– তা দরকার কিন্তু আমি তো ওকে এসব বলতে পারছিনা। তুমি একটা কাজ করতে পারবা?
– বলো!
– ওকে একটু বিয়ের কথা বলে দেইখো তো কী বলে?
– আমার সাথে তো তেমন চেনাজানা নাই। ও আমার কথায় বিরক্ত হবে।
– বিরক্ত হলেও প্রকাশ করবেনা।

অদ্রির ঘুম ভেঙে গেলো। ঘড়িতে রাত ২ টা বেজে ৪৫ মিনিট। পানির পিপাসায় গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। টেবিলে আজকে পানি রাখা নেই। লাইট জ্বালিয়ে খুঁজে নিজের রুমে পানি না পেয়ে নিচে নামার উদ্দেশ্যে রুম থেকে বের হলো।
অদ্রির মনে হচ্ছে নিদ্রের ঘরের দরজার সামনে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। ওইদিকটার লাইটটা বেশ কয়েকদিন ধরে জ্বালানো হচ্ছেনা। লিলিটার যে কী হয়েছে আল্লাহ জানে!

চলবে……!

© Maria Kabir

মন ফড়িং পর্ব – ১১

মন ফড়িং ❤
পর্ব – ১১
আপনাদের একটা বিয়ের ছবি আমাকে দেয়া যাবে? – নিদ্র নিজের অজান্তেই বলে ফেললো। অচেনা কারো কাছ থেকে বিয়ের ছবি চাওয়াটা মনে হয় ঠিক হয়নি।
মিস্টার ব্রন্ড কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন
– অবশ্যই, কেনো নয়?
চেয়ার ছেড়ে উঠে ভেতরের দিকে চলে গেলেন। নিদ্র একটু স্বস্তি বোধ করলো।
কিছুক্ষণ পর মিস্টার ব্রন্ড ছোট্ট একটা ছবি এনে নিদ্রের হাতে দিয়ে বললেন
– এটাতে হবে?
নিদ্র ছবিটা দেখে বললো
– অবশ্যই!
মিস্টার ব্রন্ড মুচকি হেসে বললেন
– নিশ্চয়ই স্পেশাল কাউকে ছবিটি দেখাতে চাচ্ছো?
– হ্যাঁ, যদি সুযোগ হয়।
– অবশ্যই সুযোগ হবে।
নিদ্র বিড়বিড় করে বললো
– প্রিয় মানুষের দেখা সবাই পেলেও, স্পর্শ করার ক্ষমতা সবার মাঝে থাকেনা!
অদ্রির সামনে লিলি বেশ চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। অদ্রি তাকে কী বলার জন্য ডেকেছে সেটা বুঝতে পারছেনা লিলি। অদ্রি আপা কি জেনে গেছে, তার নদীর পাড়ে বসে থাকার কথা? অদ্রি আপা তো এই বাড়ির উঠানে পর্যন্ত নামেন না। তার কাছে অন্য এলাকার মানুষ তো দূরে থাক এই এলাকার মানুষই আসেনা। কে বলবে? রীতা বলেছে নাকি? না, সে নিজেও তো বাসার বাইরে বের হননা।
অদ্রি চায়ের শূন্য কাপ বিছানার পাশের ছোট্ট টেবিলে রেখে ভারি কণ্ঠে বললো
– কোথাও যাওয়া হয় আজকাল?
লিলি স্বাভাবিক ভাবেই বললো
– আপনার মতো বাসায় বসে থাকতে আমার ভালো লাগেনা!
অদ্রি এরকম উত্তর পাবে আশা করেনি। একটু অবাকই হলো।
– তাহলে কী ভালো লাগে? বেহায়াপনা করতে ভালো লাগে?
– ঘুরে বেড়নো কি বেহায়াপনা?
– গায়ের জামাকাপড় কিছু ঠিক থাকে নাকি তোমার? মুখে মুখে কথা তো বলতে খুব ভালো জানো
অদ্রি রেগে বললো
– তোমাকে কীভাবে সোজা করতে হয় আমার জানা আছে। ফের যদি দেখি বাসার বাইরে বের হয়েছো তাহলে আমার অন্যদিকের ব্যবহার দেখতে পারবে! খুব ভালো ব্যবহার করেছি। যাও এখান থেকে।
লিলি রাগে ফুসছিলো।  অদ্রির কঠোর ব্যবহার তার আত্মসম্মানে আঘাত করেছে। লিলি তার রুমের দিকে পা বাড়ালো। অদ্রির কোনো কথাই সে শুনবেনা।
রশীদ সাহেব চিঠিটা পোস্টঅফিসে পোস্ট করে বাসায় ফিরছিলেন। নাজমুল কে দাওয়াত দেয়া কি ঠিক হবে? ও আসবেনা এটা সে শিওর। না আসলেও নিদ্রকে পাঠিয়ে দিবে। তাতেও লাভ আছে রশীদ সাহেবের। মেয়ের বিয়ের কথা শুনে কিছু টাকা বা গিফট পাঠাবে। টাকাপয়সার অভাবে আতিথ্য কর‍তে তার যে কী পরিমাণ কষ্ট হবে, তা বোঝার ক্ষমতা একমাত্র তার মতো বাবারাই জানে। অদ্রি তাকে একটা টেনশন থেকে মুক্তি দিয়েছে। সে কি এর বিনিময়ে কিছু কর‍তে পারবে?
অদ্রির টাকাপয়সার অভাব নেই। যা যা দরকার সবই তার আছে। না, কিছুই দেয়ার ক্ষমতা তার নেই। নামাজে বসে মোনাজাতে প্রাণভরে দোয়া করতে পারবে – আর কিছুই করার ক্ষমতা তার নেই।
অদ্রি রিতাকে বললো
– আচ্ছা ২০ জনের মতো মানুষকে ৭/১০ দিন তিন বেলা খাওয়াতে কী পরিমাণ খরচ হতে পারে?
রিতা পান মুখে দিয়ে বললো
– চাল, ডালের হিসাব বলতে পারবো কিন্তু টাকার পরিমাণ টা আমি ঠিক বলতে পারবো না।
– রশীদ চাচার ছোটো মেয়ের বিয়ে এই বাড়িতে হবে। আমি চাচ্ছিলাম খাওয়া খরচ, বর যাত্রীর আপ্যায়ন সব আমি দিবো।
– তাহলে তো বেশ খরচের বিষয় অদ্রি। আমি একা এতো জনের রান্না করতে পারবো না। যদি একজন মানুষ সহকারী হয় তবে সহজ হবে।
– রশীদ চাচাকে আমি দুইজন লোক আনতে বলবো। আর বাড়িটাও রঙ করতে হবে।
– অদ্রি তুমিও বিয়েটা করে ফেলো। আমি ঘটকালি করবো।
অদ্রি মুচকি হেসে বললো
– আমি বিধবা।
রিতা আজকেই প্রথম জানলেন, অদ্রি বিধবা! তার কেনো যেন বিশ্বাস হচ্ছেনা। এতো অল্পবয়সী মেয়ে বিধবা? মেয়েটার এতো ছন্নছড়া থাকার কি এটাই কারণ?
অদ্রি বললো
– রশীদ চাচা কখন বের হয়েছেন?
– ১ ঘণ্টার মতো!
– লিলি কি করছে?
– সে দরজা আটকে তার ঘরে আছে।
– মেয়েটার যে কি হয়েছে বুঝতে পারছিনা। আগে সারাদিন আমার পিছু পিছু আর এখন তাকে খুঁজে পাওয়া যায়না।
– নয়া যৌবন এসেছে বুঝতে হবে!
– ঠিক বুঝলাম না।
– নতুন যৌবনে পা দিলে প্রত্যেক ছেলে – মেয়ের মধ্যে কিছু পরিবর্তন আসে। এইসময় তাদের চোখে চোখে রাখতে হয়।
– আমি আগামীকাল থেকে চোখে চোখে রাখবো। আজকে নিচে নামতে ভালো লাগছেনা। আগে বাগানে বেশ সময় কাটাতাম এখন কিছুই ভালো লাগেনা।
– ছাদে যেতে না?
– না!
– চলো আজকে ছাদে যাই। ভালো লাগবে। এতো সুন্দর বাড়িটাকে সুন্দর করে ডেকোরেশন করা হলে আরো ভালো লাগবে। বিশেষ করে তোমার রুমটা। দেখে কে বলবে বলোতো এটা অল্পবয়সী মেয়ের রুম?
– অল্পবয়সী বিধবা! কি অদ্ভুত উপাধি তাই না?
– চিঠিটা কাকে পাঠানোর জন্য দিলে?
– নিদ্র, আমাকে বেশ সাহায্য করেছিলো ব্যক্তিগত বিষয়ে। আমার হাতের হাবিজাবি রান্না খেয়ে ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। বেচারা চা খেতে পছন্দ করতেন কিন্তু আমার হাতের চা খেয়ে তার এখানে থাকার সখ হাওয়া হয়ে গেছে। আপনি আসার পরে আমন্ত্রণ জানিয়ে ছিলাম। কিন্তু কোনো প্রতিউত্তর পাইনি তাই এবার লাস্ট চেষ্টা করলাম।
– রশীদ সাহেবের জন্য এতো কিছু কেনো করতে চাচ্ছেন?
– সে আমার জন্য যা করেছে তার কোনো বিকল্প আমি কখনো দিতে পারবো না। বিধবা হবার পরে যখন এখানে চলে আসলাম কেবলমাত্র রশীদ চাচাই আমাকে সাহায্য করেছে। এতো বড় বাড়িতে আমি আর লিলি ছিলাম কেউ জ্বালাতন করার সাহস পায়নি। একমাত্র ওনার কারণে। কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে আমি বাধ্য।
– রাতে কী খাবেন? দুপুরের খাবার গরম করে এনে দিবো নাকি থাই স্যুপ করে খাওয়াবো?
– আপনি পারেন?
– আমি অনেক ধরনের রান্না জানি।শুধু তুমি বলবে।
– আপনার ইচ্ছা হলে করবেন। আজকে থাক, দুপুরের খাবারেই হবে। কাল স্যুপ করে খাওয়াবেন।
রিতা খাবার গরম করার জন্য রান্নাঘরের উদ্দেশ্যে নিচে নেমে আসলেন।
বিয়েটা রশীদ চাচার ছোটো মেয়েটার বদলে তারও হতে পারতো। এই বাড়ির গণ্ডি পেরিয়ে গেলে হতে পারে কেউ জুটে যাবে কিন্তু নিদ্রকে তো পাওয়া যাবেনা।
তার মতো একজন বিধবাকে কেনইবা নিদ্র ভালোবাসবে?
তার এই শরীরে আজ অবদি নিদ্র ছাড়া কারও স্পর্শ পড়েনি। বিয়ে তার ঠিকই হয়েছিল তবে সেটা নামেমাত্র বিয়ে!
একজন মানুষ তাকে ভুলের মধ্যে রেখেছিলো। তার মা – বাবাকে দূরে সরিয়ে রেখেছে সেই মানুষ টা।
ভাবতেও ঘৃণা লাগে এরপর নিচু মানসিকতার কারো সাথে তার বিয়ে হয়েছিলো!
চলবে…..!
© Maria Kabir

মন ফড়িং ❤ পর্ব – ১০ 

মন ফড়িং ❤
পর্ব – ১০
মানব হৃদয় কখন কী ভাবে বোঝা মুশকিল। আসমা জামান তার ছেলের মনের অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করছেন এই মূহুর্তে। কিন্তু পারছেন না। হতে পারে নিদ্রের মায়ের কথা মনে পড়েছে! আবার নাও হতে পারে।
– নাজমুল শোন তো।
নাজমুল সাহেব দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বললেন
– কিছু বলবা?
– চল একসাথে বাংলাদেশে ঘুরে আসি।
নাজমুল সাহেব মুচকি হেসে বললেন
– না, তোমরা যাও।
৭ টা ৫৫ মিনিটে নিদ্র, মিস্টার ব্রন্ডের বাসায় হাজির। মিস্টার ব্রন্ড দরজার সামনে নিদ্রকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললেন
– বাইরে কেনো দাঁড়িয়ে ভেতরে আসুন। মনে হচ্ছে রাতে ঘুম কম হয়েছে?
– একটু বেশিই ঘুম হয়েছে আরকি!
মিস্টার ব্রন্ড হাসতে হাসতে বললেন
– টেবিলের উপর গরম কফি রাখা আছে। খেয়ে কাজে লেগে পড়ুন।
– আপনি কোথাও যাচ্ছেন?
– হ্যাঁ, আমার স্ত্রীকে আনতে যাচ্ছি। ১০ টার দিকে চলে আসবো।
মিস্টার ব্রন্ড চলে যাবার পর নিদ্র কফি হাতে নিয়ে বাকি কাজে মন দিলো।কফিটা খারাপ না খেতে।
১০ টার দিকে মিস্টার ব্রন্ড ফিরে এলেন। হুইলচেয়ারে করে ২৫ – ২৮ বছরের একজন নারীকে নিয়ে। মহিলা প্যারালাইজড, পুরোপুরিভাবে! হাত পা কিছুই নাড়াতে পারেনা।মহিলা তেমন সুন্দরী না আবার অসুন্দরী নন। অদ্রির মতো!  মিস্টার ব্রন্ড আর এই মহিলা একা নন। একজন নার্স আছেন, মধ্যবয়সী!
ঘরে ঢুকেই মিস্টার ব্রন্ড, নিদ্রকে উদ্দেশ্য করে বললেন
– নিড্র, আমার প্রিয়তমা স্ত্রী ম্যান্ডি!
মিস্টার ব্রন্ড তার স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলতে শুরু করলেন
– ম্যান্ডি, কেমন লেগেছে বলোতো? অল্পবয়সী ছেলেটাকে দেখছো না, ওইযে দাঁড়িয়ে আছে? ও ডেকোরেশন করেছে। দারুণ না? ওকে গিফট দেয়া উচিৎ না আমাদের?
নিদ্র বেশ অবাক হয়ে শুনছিলো ব্রন্ডের কথাগুলো।
মিস্টার ব্রন্ড তার ওয়ালেট থেকে ৫০০ ডলার এর তিনটি নোট নিদ্রের হাতে গুজে দিয়ে বললেন
– ম্যান্ডির, খুব ভালো লেগেছে তোমার ডেকোরেশন টা। ও  আমাকে বলেছে তোমাকে গিফট দিতে। গিফট তো আর এখন কিনে আনা সম্ভব না। তাই তোমাকে এক্সট্রা কিছু ডলার দিলাম। পছন্দমতো কিছু কিনে নিও।
নিদ্র বেশ স্বাভাবিকভাবেই বলল
– আপনি বলেছেন এতেই হবে। এক্সট্রা ডলার লাগবেনা।
– নিতেই হবে। তা না হলে ম্যান্ডি খুব কষ্ট পাবে। ওই দেখো ও তাকিয়ে দেখছে আর শুনছে কী বলি! যদি বুঝতে পারে তুমি নাও নি তাহলে তো কষ্ট পাবে।
নিদ্র তার ব্যাগ গুছিয়ে নিচ্ছিলো বাসায় ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। মিস্টার ব্রন্ড তার স্ত্রীকে নিয়ে ব্যস্ত আছেন। এই মুহূর্তে তাকে বিরক্ত করাটা ঠিক হবেনা কিন্তু তার স্ত্রীর এই অবস্থার পিছনে কারণটা জানতে ইচ্ছে করছে।
মিস্টার ব্রন্ড তার স্ত্রীর বিছানার পাশে বসে আছেন। স্ত্রী ঘুমুচ্ছেন, সে যদি একটা রাত এভাবে ঘুমাতে পারতেন।
স্ত্রীর পাশ থেকে উঠে চলে এলেন বসার ঘরে। নিদ্রকে ব্যাগ গুছাতে দেখে বললেন
– আপনার জরুরি কাজ আছে নাকি?
নিদ্র বলল
– না, তেমন নেই। তবে খুব খিদে পেয়েছে, বাসায় না গিয়ে উপায় নাই।
– একটা মিনি বার্গারে হবে আপাতত?
– না সমস্যা নেই। আমি বাসায় গিয়ে খেয়ে নিবো।
– আমি চাচ্ছিলাম তোমার সাথে কিছুক্ষণ গল্প করবো।
বসার ঘরে ছোটো টেবিল এনে মিস্টার ব্রন্ড নিদ্রকে চেয়ার টেনে বসতে বললেন।
হাফ প্লেটে বার্গার আর টমেটো সস এনে টেবিলে রেখে, নিদ্রকে জিজ্ঞেস করলেন
– বেয়ার নাকি রেড ওয়াইন?
নিদ্র বলল
– ওসব আমার ঠিক সহ্য হয়না। ঠান্ডা পানি হলে হবে।
পানির বোতল টেবিলে রেখে মিস্টার ব্রন্ড নিদ্রের সামনে চেয়ার টেনে বসে বললেন
– আমার মনে হচ্ছে তোমার জানতে ইচ্ছা করছে আমার স্ত্রীর এই অবস্থা কেনো?
নিদ্র খেতে খেতে বললো
– তা ঠিক কিন্তু আপনি জানলেন কীভাবে?
– আমার স্ত্রীর অবস্থা কীভাবে এমন হলো।সবাই জানতে চায়। আর তোমার হাবভাব দেখে বুঝেছি কিছুটা।
– আপনি বলেন আমি শুনছি। আমার জানতে খুব ইচ্ছে করছিলো।
– আমার স্ত্রী একটা স্কুলের টিচার ছিলো আর আমি একটা ফ্যাক্টরি তে ম্যানেজার পদে আছি। বিয়ের প্রথম দিকে বেশ সময় দিতাম ওকে কিন্তু ফ্যাক্টরির অবস্থা খুব একটা ভালো না চলাতে আমার ব্যস্ততা আরও বাড়লো। ফ্যাক্টরির মালিকের সাথে আমার বেশ ভালো সম্পর্ক হওয়াতে দায়িত্বটাও বেড়েছিলো। এমনও রাত যেতো যে আমি বাসায় আসার সময় পেতাম না। মাথায় শুধু একটাই চিন্তা থাকতো কীভাবে, কোন উপায়ে পরিবর্তন আনা যায়। ওর প্রতি অবহেলাটা আমার অনিচ্ছাকৃত ভাবেই বাড়তে থাকে। প্রায় ১ বছরের মতো এভাবেই চলছিলো। ও যে প্রচুর ড্রিংক করতো আমি বুঝতে পারছিলাম। কিন্তু কিছুই করার ছিলো না। ক্যারিয়ার আর ক্যারিয়ার!
ঠিক ৬ মাস আগে আমার স্ত্রী সুইসাইড নোট লিখে বাসার ছাদ থেকে লাফ দিয়ে সুইসাইড করার চেষ্টা করে। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায়!
আমাদের লাভ ম্যারেজ ছিলো! এই ক্যারিয়ার আর ফ্যাক্টরি করে করে ওর সাথে আমি অন্যায় করেছি। আমাদের কালচার নিড্র তোমার দেশের মতো না। আমাদের এখানে বিয়ে, ডিভোর্স, সেক্স পার্টনার এসব কোনো ব্যাপারই না। কিন্তু ভালোবাসাটা বোধহয় কালচার ভেদে পরিবর্তন হয়না।
আমার মনে হয় ও ভাবতো – আমি আর তাকে ভালোবাসিনা। অন্য কোনো মেয়ে পেয়ে গেছি। অন্য কারো সাথে সেক্সুয়াল সম্পর্ক রেখেছি এসব। কিন্তু ওর ভাবনাটা ভুল ছিলো। তবে এই ভুল ভাবার পিছনে আমি দায়ী ছিলাম। আমার এখনো মনে পড়ে অচেনা নাম্বার থেকে কেউ একজন বলছে – আপনার স্ত্রী সুইসাইড করেছে!
আমার বিশ্বাসই হচ্ছিলো না যে, ও আমাকে ছেড়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
ডাক্তার বলেছেন – সুস্থ না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। যদি কোনো মিরাকেল না হয়!
আমি প্রায়শই ভাবি, একটা মিরাকেল ঘটে গেছে। ও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে আমার জন্য স্পেশাল বার্গার তৈরি করছে!
আমার ওর স্পেশাল বার্গারটা খুব পছন্দ! ও সুস্থ হলে, আপনাকে একদিন খাওয়াবো।
চলবে…..!
© Maria Kabir

মন ফড়িং ❤ পর্ব – ৯ 

মন ফড়িং ❤
পর্ব – ৯
প্রিয় মানুষের চেহারাটা হয়তোবা কখনো মনে রাখা যায়না। নিদ্রকে সে কোনো ভাবেই কল্পনায় আনতে পারেনা। কিন্তু তার স্বামীর চেহারা ভুলতে পারেনা। যতবার চেষ্টা করে ততবারই সেই চেহারা আরো বেশি স্পষ্ট হয়ে যায়। জীবন তাকে কিছুই দিবেনা। রশীদ চাচার মেয়েটার বিয়ে তার এই বাড়িতে হবে। চোখের সামনে তার মতোই একজন মেয়েকে নতুন জীবনে পা বাড়াতে দেখবে। স্বামীর ভালোবাসায় স্বপ্ন গুলো তার রঙিন হবে। তার সব স্বপ্ন একটি একটি করে পূর্ণতা পাবে। রীতাকে আসতে দেখে অদ্রি স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলো। রীতা নামে এই মায়ের বয়সী মহিলা তাকে খুব বেশি যত্ন করে। টাকা দিয়ে এরকম যত্ন কেনা যায়না। সে তো নিজে কখনো বেশি কথা বলেনি রীতার সাথে। তাহলে কীভাবে বা কী কারণে এতোটা যত্ন সে পায়? রান্নাবান্নার কাজের জন্য তাকে আনা কিন্তু সে ধীরে ধীরে সবকিছুতেই প্রভাব খাটাচ্ছে। অদ্রির রুটিন করা অনিয়মকে খুব সহজেই নিয়মে রূপ দিচ্ছে।
রীতা অদ্রিকে চুপচাপ দেখে বললেন
– আজকে একটু ছাদে যেতে ইচ্ছে করছে।
অদ্রি বললো
– আচ্ছা যাবেন। চাবি আমার কাছ থেকে নিয়ে নিবেন।
– আমার সাথে আপনিও যাবেন। ভালো লাগবে।
– আমার শরীর তেমন ভালো না। ভালো হলেই যাবো। আর আমাকে তুমি করে বলবেন।
– শরীর ভালো করার জন্যই তো বলছি ছাদে যাওয়ার কথা।
– অন্যদিন আমি যাবো।
রীতা বুঝতে পারলেন একে এভাবে বলে নিয়ে যাওয়া যাবেনা।
– আচ্ছা বাদ দাও। আগে খেয়ে নাও
– খাবার রেখে যান। আমি খেয়ে নিবো।
– ওই ভুল অনেক করেছি আর না। আমি এখন থেকে তোমাকে খাইয়ে দিবো।
– আপনাকে কষ্ট করতে হবেনা।
– কষ্ট না। রান্নাবান্না ছাড়া তো আর কোনো কাজই নেই। তোমার যত্নে না হয় কিছু সময় কাটুক। সুস্থ হলে না হয় আর করবোনা।
অদ্রি অনিচ্ছাসত্ত্বেও খেতে হলো। কোনো খাবারই তার ভালো লাগছেনা। কেমন যেন তিক্ত স্বাদের। কিন্তু খুদাও বেশ পেয়েছে। খুদার কারণে তিক্ত স্বাদের খাবার তাকে খেতে হচ্ছে।
রীতা বললেন – তিতা লাগতেছে তাই না?
– হ্যাঁ।
– বোধহয় হালকা জ্বর তোমার শরীরে। পেট ভরে খেয়ে আবার ঘুম দাও ঠিক হয়ে যাবে।
লিলি নদীর পাড়ে বসে আছে। আশেপাশের মানুষ এখন আর তাকে কোনো প্রশ্ন করে না। প্রথম দিকে এখানকার স্থানীয় মানুষের প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে সে রীতিমতো বিরক্ত ছিলো। এখন কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে সে উত্তর দেয়না। লিলির বাসায় থাকতে ভালো লাগেনা। তার যুবক ছেলেদের দেখতে ভালো লাগে। ইচ্ছা করে তাদের মধ্যেকার কেউ একজন তাকে সঙ্গ দিক। কেউ তাকে জিজ্ঞেস করুক
– এভাবে একা বসে থাকো কেনো? মন খারাপ?
না, তাকে কেউই জিজ্ঞেস করবেনা। কারণ সে তো কাজের মেয়ে। আজ পড়াশোনা করলে কোনো স্কুলে থাকলে এর বিপরীত ঘটনা ঘটতো।
তার বয়সী কতো মেয়েকে সে এখানকার ঝোড়ঝাপে লুকিয়ে প্রেম করতে দেখেছে।
শুধু কি এরা প্রেম করে? মনে পড়তেই লিলির পুরো শরীরে কেমন তড়িৎ বয়ে যায়!
নদীতে ঠিক এই সময় ৭-৮ জনের মতো যুবক ছেলেদের দল আসে গোসল করতে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর যে যুবক তাকে লিলির খুব ভালো লাগে। ক’দিন যাবত সেই ছেলেও কীভাবে যেন তাকায় ওর দিকে। ওকে দেখিয়ে দেখিয়ে হাসি ঠাট্টা করে। লিলির খুব ভালো লাগে! ছেলেটাও কি একইরকম ভাবে?
ইশ !
৭-৮ জনের দলটি ইতিমধ্যে এসে গোসলে নেমেছে।
সেই যুবকের দিকে তাকিয়ে আছে লিলি।
সন্ধ্যা হবার কিছুক্ষণ আগেই লিলি বাসায় ফিরেছে। রীতা বললেন
– অদ্রি তোমাকে ডেকেছে। তবে এখন যেয়ো না। ও ঘুমাচ্ছে।
লিলি বেশ বিরক্ত হয়ে বললো
– আমি সেটা বুঝবানি।
– কী বুঝবা না বুঝবা তোমার ব্যাপার কিন্তু অদ্রির ঘুমে যেন ব্যাঘাত না হয়। ও খুব অসুস্থ। বুঝতে পারছো কী বলেছি?
রীতার  কঠোর গলায় কথাটা শুনে লিলি কিছুটা ভয় পেলো। কোনো উত্তর না দিয়েই সে তার ঘরে চলে গেলো।
দরজা আটকে দিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখছে। সে কি সত্যি খুব সুন্দর? তাহলে ওই যুবক কেনো তার দিকে ওভাবে তাকিয়ে থাকে?
এই বয়সের মেয়েরা পুরুষের লোলুপ দৃষ্টি কে ভালোবাসা ভেবে নেয় বুঝি। তা না হলে লিলি ওই যুবকের তাকানোর অর্থ বুঝতে পারতো।
নিদ্রের ঘুম ভাঙলো তখন রাত ৩ টা বেজে ৪৫ মিনিট। অন্ধকারে ঘড়ির কাটা জ্বলজ্বল করছে।
সকাল ৮ তাকে যেতে বলেছে। রঙের কাজ এখনো কিছু বাকি আছে। তার স্ত্রী নাকি সকাল ১০ টার দিকে আসবেন। এতো সহজে কি সে পেয়েছে? তাকে জিজ্ঞেস করলে বলবে কিছু?
মিস্টার ব্রন্ড আবার তাকে খারাপ ভাব্বে না তো? ভাবলে ভাবুক।
ঘুম আসছে না নিদ্রের। কী করবে? নতুন কোনো নকশা তৈরি করার চেষ্টা করবে? নাকি তার কাজে কী কী পরিবর্তন করা যায় সেটা নিয়ে বসবে? দাদীর সাথেও তো আজ তেমন কথাই হয়নি। একটু দেখে আসা যাক কী করছেন আসমা জামান?
নিশ্চয়ই দাদার ছবি হাতে নিয়ে নীরবে চোখ ভেজাচ্ছেন। দেখে ফেললে, স্বীকার করতেই চাইবেনা।
নিদ্র দাদীর রুমের দরজার কাছে যেতেই বুঝতে পারলো, দাদী জেগে আছেন এবং দাদার ছবি হাতে নিয়ে নীরবে কাঁদছেন! নিদ্র দাদীর কাছে বিছানার উপর বসলো। আসমা জামান ছবিটা উপর করে রেখে চোখ মুছে বললেন
– ঘুম আসছে না?
– তা তো দেখতেই পাচ্ছো।
– মেয়েটাকে আমার খুব দেখতে ইচ্ছা করছে। ছবি আছে তোর কাছে?
– আছে। তবে আমি চাই তুমি সামনাসামনি ওকে দেখবে। ছবিতে তোমার ওকে একদমই ভালো লাগবেনা।
– কবে যাবি?
– টাকাই তো জোগাড় হচ্ছে না। আর দুই একটা কাজ করলে যাওয়ার মতো অবস্থা হবে।
– ওই মেয়ের যদি বিয়ে হয়ে যায় তখন?
– তখন আর কী? ভাবতে হবে আল্লাহ তায়ালা আমার ভাগ্যে ওর নামটা লিখে দেয়নি।
– জীবনটা এভাবেই কাটিয়ে দিবি?
– আসলে দাদী, আমি অনেক চেষ্টা করেছি ভুলে থাকার। বাংলাদেশ ছেড়ে চলে এসেছি ওকে না জানিয়ে। এখানে এসেও কোনো যোগাযোগ করিনি। ও চিঠি পাঠিয়েছে কিন্তু আমি তার প্রতিউত্তর দেইনি। তারপরও আমি পারছিনা। ক্লাবে, বারে গিয়ে কতো সুন্দরী মেয়েদের সাথে মেশার ঘনিষ্ট হওয়ার চেষ্টা করেছি কিন্তু পারিনি। তাই আমি চাচ্ছি একটা শেষ চেষ্টা করবো। মনে করো যদি একটু বুঝতে পারি, আমার জন্য অল্প একটু ফিলিংস আছে। তাহলেও আমি ওকে…..
নিদ্রের গলার কাছে কথাটা আটকে গেলো। বিছানা ছেড়ে উঠে নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালো নিদ্র।
আসমা জামান, নিদ্রের চলে যাওয়ার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।
নাজমুল সাহেব ডান হাতে দুটো টিকিট নিয়ে বসে আছেন। আরেক হাতে এলকোহলের বোতল। আজকে আর গ্লাসে নিয়ে খাচ্ছেন না। নাজমুল সাহেব বোতল রেখে তার মায়ের রুমের দিকে গেলেন। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অনুমতি চাইলেন। আসমা জামান বললেন
– আয়। ঘুমাস নাই?
– না, ঘুমাতে ইচ্ছা করছেনা।
– নাকি ঘুম আসছে না?
– ওই একই কথা?
ছেলের হাতের টিকিট দেখে জিজ্ঞেস করলেন
– কীসের টিকিট রে বাপ?
– তোমাদের বাংলাদেশ যাওয়ার টিকিট। আর যাওয়ার সময় মনে করো কিছু টাকা রেখেছি। তা না হলে ভুলে যাবো।
– বাপ তুই আরেকটা বিয়ে কর।
নাজমুল সাহেব হো হো হো করে হাসতে শুরু করলেন। হাসি থামিয়ে বললেন
– এখন ছেলের বিয়ের বয়স আর যদি আমি করি তাহলে ব্যাপারটা একটু কেমন হয়ে যায়না?
– বিয়ের কোনো বয়স নাই বাপ।
– তারপরও আমার আর ওতে মন নেই। মা, আমি যাই নেশাটা বেশি হয়ে গেছে মনে হয়। মাথাটা কেমন যেন লাগছে।
নাজমুল সাহেব টিকিট মায়ের হাতে দিয়ে বললেন
– মা, আমাকে পারলে মাফ কইরো। অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছি তোমাকে আর নিদ্রকে। বেচারাকে আমি মনে হয় কখনো ভালোবাসতে পারিনি।
বাবা হতে পারিনি আমি, মা। আমি পারিনি!
চলবে…..!
© Maria Kabir

মন ফড়িং ♥ ৮

মন ফড়িং ♥ ৮
মন ফড়িং ♥
৮.
অদ্রি রীতাকে উদ্দেশ্য করে বলল
– খালা, রশীদ চাচা দুপুরে খাননি। আপনি তার খাবার ব্যবস্থা করুন। পারলে আবার রান্না করুন।
রীতা বললেন
– কিন্তু তিনি তো বললেন খেয়ে এসেছেন!
– মিথ্যা বলেছেন। আর দেখুন তো উনি চলে গেছেন কিনা? জরুরি কথা ছিলো।
– খাবার টা শেষ হোক।
– উনি চলে যাবেন ততক্ষণে।
রীতা বাধ্য হয়ে খাবারের প্লেট রেখে রশীদ সাহেবের খোঁজে বের হলেন।
দোতলার সিড়ি অবদি এসে দেখলেন রশীদ সাহেব সোফায় পা দুলিয়ে বসে খবরের কাগজ পড়ছেন।
ফিরে এসে অদ্রিকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখে কিছুটা বিরক্ত হলেন। মেয়েটা এমন কেনো? খাবেনা, ঘুমাবেনা ঠিক মতো আর অসুস্থ হবেন।
প্লেটে এখনো খাবার পরে আছে। ম্যাডামের সমস্যাটা কী তার জানা হলো না। হবেও কিনা সেটাও তার জানা নেই।
রান্নাঘরে যাওয়ার সময় রশীদ সাহেবকে রীতা বলে গেলেন
– ম্যাডাম আপনাকে দুপুরে খেয়ে যেতে বলেছেন। তিনি আপনার সাথে জরুরি কিছু কথা বলবেন।
রশীদ সাহেব খবরের কাগজ টিটেবিলে রেখে বললেন
– দোতলায় গিয়ে কথা বলে আসবো?
রীতা বললেন
– না, তিনি ঘুমাচ্ছেন।
– আপনার সমস্যা না হলে একটা কথা বলি। আপনি কোনো একটা ঘরে গিয়ে শুয়ে থাকুন। রান্না হলে ডাক দিবো।
রশীদ সাহেব খবরের কাগজ নিয়ে নিচতলার  ডানের শেষের ঘরটায় গিয়ে শুয়ে পড়লেন।
অদ্রি মেয়েটা সত্যি তাকে খুব ভালো জানে। তা না হলে সে যে না খেয়ে আছেন সেটা বুঝতে পারতেন না।
নিদ্র বেশ মনোযোগ দিয়েই ফুলটায় লাল রঙের আঁচড় দিচ্ছিলো। পেছন থেকে মিস্টার ব্রন্ড বললেন
– নিড্রো, সুন্দর হওয়া চাই। আমার স্ত্রীকে খুশি করতে হবে।
নিদ্র বেশ গম্ভীর স্বরে বলল
– চেষ্টা করছি।
নিদ্রের কেনো যেন এসব কাজ করতেই ভালো লাগে। তার এই কাজের মাধ্যমে একজন দম্পতি তাদের নবজীবন শুরু করবে। বাচ্চাকাচ্চা হবে হয়তোবা না। হয়তোবা দেখা যাবে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে গেলো। এই দুজন একে অপরকে কতোটা ভালোবাসে এখন ! দেখা গেলো ভবিষ্যতে কোনো একটা কারণে তাদের মাঝে সম্পর্কে কিট জন্ম নিতে শুরু করবে। তারপর সেই কিট পুরো সম্পর্ক টাকে ধ্বংস করে দিবে। তারা একে অপরকে ছেড়ে দিয়ে নিজেদের মতো চলতে শুরু করবে। এক পর্যায়ে তারা নতুন কারো সাথে পুরাতন নিয়মে প্রেম শুরু করবে। প্রেম গভীর থেকে গভীর হলে তারা বিয়ে করবে।
এই নিয়মের পুনরাবৃত্তি হবে কি? নাকি হবে না? নিদ্রের ভেতর একটা ছোট্ট যুদ্ধ চলছে। যদি এরকম সম্পর্ক গুলো এতো সহজে ভেঙে যায় তবে তার সম্পর্ক কেনো ভাঙছে না? তাদের মধ্যে তো কোনো সম্পর্কই তৈরি হয়নি কখনও তাহলে ভাঙবে কীভাবে? কিন্তু অদ্রির প্রতি তার টান কাটছে না কেনো? নাকি এটা শুধু মোহ না, অন্যকিছু।
এই মেয়েটা আমাকে শান্তি দিলো না। নিদ্র নিজের উপরই বিরক্ত লাগছে।
সন্ধ্যার দিকে এক পৃথিবী সমান খুদা নিয়ে বাসায় ঢুকলো নিদ্র। পেটের মধ্যে ইঁদুর দৌড়ে চলছে। দাদী কি তার জন্য খাবার নিয়ে বসে আছেন? নাও হতে পারে। বয়স হয়েছে তার। দেশের বাড়ি যাওয়ার জন্য তার নিজের মন উতলা হয়ে আছে। টাকা না জমিয়ে তো যাওয়াটাও ঠিক হবেনা। ওখানে কে তাকে টাকা ধার দিবে? বাবা তো একদমই পছন্দ করছেন না বাংলাদেশে যাওয়ার বিষয়টা।
রান্নাঘরে ঢুকে পাউরুটি আর ডিম ভেজে কোনোমতে খেয়ে পেট ঠান্ডা করে দাদীর রুমের দিকে গেলো।
দাদী ঘুমে তলিয়ে আছেন। এখন ডাক দেয়া ঠিক হবেনা।
নিজের রুমে গিয়ে ফ্রেশ হবার জন্য বাথরুমে গিয়ে ঝর্ণা ছেড়ে তার নিচে দাঁড়িয়ে রইলো নিদ্র।
দিনটা মনে নেই, খুব বৃষ্টি হচ্ছিলো। ছাদে ভিজতে ইচ্ছে করছিলো। নিজেকে আটকে রাখতে না পেরে ছাদে গিয়ে বৃষ্টির ভিজতে শুরু করেছিলো। বেশ ঠান্ডা ছিলো ওইদিন রাতে।
অদ্রিও এসে দাঁড়ালেন ওই সময় বৃষ্টির মধ্যে। আবছায়া আলোতে অদ্রির ভেজা শরীর তার আজ অবদি ধরে রাখা নিয়ন্ত্রণ কে ভেঙে দিয়ে তাকে উন্মুক্ত পাগল বানিয়ে দিয়েছিলো! অদ্রিকে জড়িয়ে ধরে যেন কিছুটা শান্তি পেয়েছিলো সে! তার শরীরের মধ্যে বারবার কেঁপে ওঠা শরীর টার হৃদস্পন্দন তার ভেতরটাকে পুড়িয়ে দিচ্ছিলো। ইচ্ছে করছিলো ভেজা শরীরের সুখ টা নিজের করে নিতে! কিন্তু তা আর হয়নি!
এতো সহজে কোনো কিছু পাওয়াতে হয়তোবা সুখ নেই। একটু ধীরে ধীরে পাওয়ার মাঝে পৃথিবী সমান সুখ লুকিয়ে থাকে।
ওই ভেজা শরীরের গন্ধ একদিন সে নিবে তবে সেদিন কোনো ভয়, লজ্জা, সংকোচ থাকবেনা।
অদ্রিও কি এভাবে তার মতো করে ভাবে আমাকে? নিদ্র নিজেকেই প্রশ্নটা করলো! না, মেয়েরা কোনো ছেলেকে এভাবে ভাবেনা। তাদের ভাবনা অন্যদিকে প্রবাহিত হয়।
ওদের ভাবনায় পবিত্রতা থাকে। আমি।যাবো তার কাছে যাবো। যেভাবেই হোক অদ্রিকে আমার পাওয়া চাই! সত্যি তাকে ভালোবাসি তা না হলে এতো দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও তার প্রতি টান কাটছেই না বরং আরো বাড়ছে! হ্যাঁ তাকেই আমি ভালোবাসি!
নিদ্র যেন পণ করছে নিজের কাছেই।গোসল সেরে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো! অনেকটা শান্তির ঘুম।
অদ্রির ঘুম ভাঙলো তখন বিকাল বেলা। রশীদ সাহেব দুপুরে খেয়ে দেয়ে নিচের বসার ঘরে সোফায় বসে খবরের কাগজ পড়ছেন। যদিও এটা একবার পড়েছেন। কিন্তু কী আর করার। কিছু তো করার দরকার। অদ্রি তার সাথে জরুরি কী কথা যেন বলবে কিন্তু ও এখনো ঘুমাচ্ছে।
অদ্রি বিছানা ছেড়ে উঠে একটা চিঠি লিখতে বসলো। মাত্র ৫ মিনিটে চিঠিটা লিখা শেষ করে নিজেই নিচে নেমে আসলো। আগে থেকেই ভেবে রেখেছিলো কী লিখবে!
অদ্রিকে দেখে রীতা বললেন
– আপনি অসুস্থ, আমাকে ডেকে পাঠালেই তো পারতেন।
অদ্রি মুচকি হাসার চেষ্টা করে বললো
– এখন একটু ভালো লাগছে।
রশীদ সাহেবের হাতে চিঠিটা হাতে দিয়ে বললো
– খামে নাম ঠিকানা লিখে দিয়েছি। আপনি শুধু স্ট্যাম্প লাগিয়ে চিঠিটা পাঠিয়ে দিবেন।
রশীদ সাহেব চিঠিটা হাতে নিয়ে ঠিকানা পড়ে বুঝতে পারলেন, চিঠিটা কার উদ্দেশ্যে লেখা।
রীতা, অদ্রির মুচকি হাসি দেখে বেশ অবাক হলেন। এই মেয়ের মুচকি হাসিতে যে কেউ প্রেমে পড়ে যাবে। আজ অবদি কেউ পড়েছে কি প্রেমে?
অদ্রি রশীদ সাহেবকে জিজ্ঞেস করলেন
– দুপুরে খেয়েছেন?
– জি মা। তুমি তো খাও নাই। খেয়ে নাও মা।
রীতা বললেন
– অদ্রি আপনি আপনার রুমে যান। আমি খাবার নিয়ে আসছি।
– একটু পরে খাই। এখন ভালো লাগছে না।
– না, আপনাকে এখনই খেতে হবে। এরকম অনিয়ম করতে করতে আপনার অবস্থা কী খারাপ হয়েছে বুঝতে পারছেন আপনি?
অদ্রি মাথা নিচু করে বললো
– আচ্ছা আপনি খাবার নিয়ে আসুন।
অদ্রি চলে যাচ্ছিলো পিছনে ফিরে রীতাকে বললেন
– লিলিকে দেখছিনা। ও কই?
রীতা বিরক্ত হয়ে বললেন
– তার খোঁজ পাওয়া যায় নাকি? সে তো নিজের মতোই স্বাধীন।
– ওকে পেলে বলবেন, আমি তাকে ডেকেছি।
বিছানার উপর বসে বসে ভাবছে অদ্রি, চিঠিটা দেয়া কি ঠিক হলো? তার আগের চিঠিরও উত্তর আজও পায়নি সে। বেহায়া হয়ে গেলো শেষ পর্যন্ত?
এবারই শেষ আর কোনো চেষ্টা সে করবেনা। একা একাই তো কতোটা বছর কাটিয়ে দিয়েছে সে! আর কয়টা দিনই সে বাঁচবে? শরীরের যে অবস্থা তাতে হায়েস্ট ১০ বছর বা তার কমও হতে পারে, তারপর শান্তির ঘুম। চোখ ভিজে উঠেছে অদ্রির। মানুষ কখনো তার সব স্বপ্ন পূরণ করতে পারেনা কিন্তু তার কোনো স্বপ্নই তো পূরণ হলোনা। একটা স্বপ্ন অন্ততপক্ষে যদি পূরণ হতো।
নিদ্রের চেহারাটাও সে,পুরোপুরি মনে করতে পারেনা। কেমন আবছা আবছা লাগে।
চলবে……!
© Maria Kabir

মন ফড়িং ♥ ৭.

মন ফড়িং ♥ ৭.
মন ফড়িং ♥
৭.
নাজমুল সাহেব নিদ্রের দরজার সামনে পানির বোতল ডান হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। বাম হাতের দুই আঙ্গুল দিয়ে টোকা দিচ্ছেন।শব্দের ঊর্ধ্বক্রমে টোকা দিচ্ছেন দরজায়। কিন্তু ছেলের গলার স্বর বা দরজার দিকে এগিয়ে আসার শব্দ পাচ্ছেন না। ইখলাস সাহেব ভাবলেন
– বাম হাতের দুই আঙ্গুল দিয়ে যেরকম শব্দ হচ্ছে, ডান হাতেও কি একই রকম শব্দ হবে? নাকি কম বা বেশি?
তার একসময় মনে হলো একই রকম শব্দ হবে মানে শব্দের তীব্রতা একই হবে আবার মনে হলো না শব্দের তীব্রতা ভিন্ন হবে। প্রমাণ করার লক্ষ্যে পানির বোতল বাম হাতে নিয়ে ডান হাতে দরজায় টোকা দিলেন কয়েকবার।
এবার তীব্রতা পূর্বের তুলনায় বেশি, তবে বেশিটা কতোটা বেশি সেটা ধরতে পারছেন না।
কতোটা বেশি জানার জন্যে আবারো বাম হাত দিয়ে টোকা দিলেন বেশ কয়েকবার। না এবারও তিনি ধরতে পারছেন না।
” একবার না পারিলে, দেখো শত বার ” প্রবাদ বাক্য না কী যেন আজকে তিনি অক্ষরে অক্ষরে পালন করবেন। না করে তিনি এখান থেকে এক পাও নড়বেন না।
রশীদ সাহেব গভীর চিন্তায় ডুবে থাকেন প্রায়শই। কারণ তার স্ত্রী ভালো করেই জানেন। তারপরও তিনি স্বামীর কাছ থেকে প্রতিদিন শুনতে পছন্দ করেন। এমনকি চিন্তার সমাধানও জানেন এবং প্রতিদিনই বলেন খুব সুন্দর ভাবে গুছিয়ে কিন্তু তার স্বামী মানতে নারাজ। তার কথা, কখনো সে যাবে না।
সকালের নাস্তা দেয়ার সময় রশীদ সাহেবকে বললেন
– এতো কীসের চিন্তা শুনি?
– একটাই তো চিন্তা হোসনের মা। ভাবলাম অনেক বুঝছো?
– তা না হয় বুঝলাম। কী ভাবলে শুনি তো?
– তোমার সমাধানটাই মানতে হবে। তাছাড়া উপায় পাচ্ছিনা। ব্যাংকে যা আছে ওতে খরচ কুলোবে না।
– নাস্তাটা করে বের হয় সেই উদ্দেশ্যে!
রশীদ সাহেব কথার উত্তর না দিয়ে নাস্তায় দেয়া রুটি আর আলু ভাজি খেতে শুরু করলেন।
আর ভাবতে লাগলেন, আজ যদি নাজমুলের মতো ভাগ্য নিয়ে জন্ম নিতাম তাহলে কতোই না সুখী হতাম।
অদ্রির চোখ খুলতে ইচ্ছে করছেনা কিন্তু চোখ না খুলেও শান্তি পাচ্ছেনা।সে এখন কোথায় আছে? তার রুমেই নাকি অন্য কোথাও? তার মন বলছে সে কোনো লাশ কাটা ঘরে পরে আছে। ডোম এখনও আসেনি বিধায় তাকে নিচেই ফেলে রাখা হয়েছে। আর মস্তিষ্ক বলছে, তুই তোর বিছানায় শুয়ে আছিস।নিজের কর্ম দোষে তার এই অবস্থা।
মনের কথা মানবে নাকি মস্তিষ্কের? কে সঠিক বলছে? তার মনের কথা খুব কমই সঠিক হয়েছে। মস্তিষ্ক কখনো কিছু বলেছে কিনা মনে করতে পারছেনা। কখনো বলেনি তাহলে এখন কেনো বলছে?
আসলেই সে লাশ কাটা ঘরে পরে আছে। না তার মস্তিষ্ক কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেনা। মাথার বাম পাশে চিন চিন করে ব্যথা শুরু হয়েছে। কেমন একটা বিশ্রী গন্ধ তার নাকে আসছে। আর আবারও পেট গুলিয়ে আসছে। তার লাশের পাশে সাদা রঙের বড় বড় ইঁদুর গুলো হাঁটছে। লাশকাটা ঘরে নাকি এরকম ইঁদুর থাকাটা স্বাভাবিক। লাশ কেটে কুটে যেটুকু অংশ আশেপাশে পরে থাকে সেটুকু অংশ খেতেই নাকি তারা আসে।
কী আজব তাই না? এই মৃত দেহটাও কিছু ছোটো প্রাণীর আহার জোগায়। কবরে অণুজীব গুলো এই দেহের পচন ঘটাবে। মাটির দেহ মিশে যাবে মাটিতে।
মাথার ব্যথাটা বাড়ছে। আসলেই সে লাশকাটা ঘরে নাকি তার বিছানায় জানতে হবেই। জোড় করে চোখ খোলার চেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে পড়লো অদ্রি।
মাথার ব্যথাটা বাড়ছে আরো। সহ্য হবার মতন না।
চোখ খুলে মাথার উপরে ঘুরতে থাকা ফ্যান টাকে দেখতে পেলো অদ্রি। কেমন যেন আবছায়ার মতো। আশেপাশে তাকিয়ে নিজের চেনা রুমটাকে দেখে একটু ভালোলাগা কাজ করছে তার মধ্যে। মাথার সেই ব্যথাটা একটু কমেছে।
অদ্রির চোখ খোলা দেখে রীতা বললেন
– ম্যাডাম, খাবার আনবো?
অদ্রি চোখ বন্ধ করে বলল
– রান্না কী করেছেন?
রীতা ধীরে ধীরে বললেন
– আপনি অসুস্থ তাই ফ্যানা ভাত আর কাঁচা কলা ভর্তা করিয়েছি লিলিকে দিয়ে।
এখন আনি?
অদ্রি বলল
– এখন খেতে ইচ্ছে করছেনা।
– আপনি চোখ বুজে থাকবেন আমি চামচে করে খাইয়ে দেই?
অদ্রি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো।
রশীদ সাহেব বসার রুমে বসে আছেন। রীতা তাকে দেখে সালাম দিলেন৷ রশীদ সাহেব সালামের উত্তর দিলেন।
রীতা মুচকি হেসে বললেন
– আজকে খেতে বলবো না আপনাকে কারণ অসুস্থ মানুষের খাবার রান্না হয়েছে আজকে।
রশীদ সাহেব অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করলেন
-কার কী হয়েছে? অদ্রির কিছু হয়েছে?
– তা না হয়ে উপায় আছে? খাবেন না ঠিক মতো তারপর অসুস্থ হবেন।
– এখন কী অবস্থা? একটু জরুরি কথা ছিলো। কথা বলা যাবে?
– যাবে বৈকি। আপনি বসুন, আমি রান্নাঘর থেকে খাবার নিয়ে আসি তারপর একসাথে যাবো।
খাবারের ট্রে বিছানার পাশে ছোটো টেবিলে রেখে অদ্রির গায়ের কাথা ঠিক করে দিয়ে বললেন
– ম্যাডাম রশীদ চাচা আসছেন আপনার সাথে নাকি জরুরি কথা আছে। আসতে বলবো?
অদ্রি চোখ বোজা অবস্থায় বলল
– বলুন।
রশীদ সাহেবকে বিছানার পাশে চেয়ারে বসতে দিয়ে অদ্রিকে খাবার খাওয়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন রীতা।
রশীদ সাহেব কাশি দিয়ে গলা পরিষ্কার করে বললেন
– মা, এরকম আর কইরো না। নিজের খেয়াল রাখাটা দরকার মা।
অদ্রি মাথা নাড়ালো।
– মা, আমি একটা বড় সমস্যায় পড়েছি। সাহায্য করতে পারবা?
– বলুন।
– আমার ছোটো মেয়েটা প্রেম করেছে এক বড় ঘরের ছেলের সাথে। ছেলে আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা জানে। তার কোনো সমস্যা নাই কিন্তু তার পরিবার চায় তাদের বউকে কোনো বড় বাড়ি থেকে তুলে নিবে। আমাদের বাড়িটা তো দেখেছোই। বড় বাড়ি ভাড়া করার মতোন টাকা নাই। যদিও ভাড়া করি তাহলে মেয়েকে সাজিয়ে দিতে পারবোনা। আবার বর পক্ষকে তো হাবিজাবি খাওয়ানো যায়না। তুমি বিরক্ত হচ্ছো না তো?
অদ্রি বলল
– আমার এই বাড়িটা তো খালিই পরে আছে। কয়েকদিনের জন্য আপনারা এখানে আসুন। ছোটো মেয়েটার বিয়েটাই তো?
– জি মা।
– কবে বিয়ে?
– এই সামনের সপ্তাহের পরের সপ্তাহে।
– সমস্যা নাই চাচা। আপনি আর চিন্তা করবেন না। খেয়েছেন দুপুরে?
– জি৷ তুমি খাও মা, আমি আপাতত যাই।
– আচ্ছা।
রশীদ সাহেবের চিন্তা এখন দূর হলো কিছুটা। মেয়েটাকে জামাই এর হাতে তুলে দেয়ার পর পুরোপুরি চিন্তামুক্ত হওয়া যাবে।
চলবে……!
© Maria Kabir

মন ফড়িং ♥ ৬.

মন ফড়িং ♥ ৬.
মন ফড়িং ♥
৬.
ইখলাস সাহেব বিকট  শব্দে হাসতে শুরু করলেন।সেই শব্দ অদ্রির কানে অসহ্য লাগছে। হাসির শব্দ তীব্র থেকে তীব্র হচ্ছে। মানুষ কীভাবে এতো বিকট শব্দে হাসতে পারে? অদ্রি কী করবে ভেবে পাচ্ছেনা। বিছানা থেকে নেমে দরজার দিকে এগিয়ে যাবে ঠিক তখনই দেখলো ইখলাস সাহেব তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটা দড়ি ঝুলছে। দাঁত কিটমিট করে বলল
– খুব আনন্দে আছো তাই না?
অদ্রির গলা দড়ি দিয়ে পেঁচিয়ে হেচকা  টান দিলেন ইখলাস সাহেব।
দম বন্ধ হয়ে আসছে অদ্রির। দুহাত দিয়ে ছাড়ানোর চেষ্টা করেও লাভ হচ্ছেনা। ইখলাস সাহেবের হাত কোনোভাবেই ছাড়াতে পারছেনা। আস্তে আস্তে অদ্রির হাত অবশ হয়ে আসছে।নিশ্বাস নেয়ার ক্ষমতা সে হারিয়ে ফেলছে।
চোখে অন্ধকার শুধুই অন্ধকার, আলোর রেখার কোনো চিহ্ন নেই। গভীর অন্ধকারে ধীরে ধীরে সে তলিয়ে যাচ্ছে।এই গভীরতার কোনো পরিমাপ তার কাছে হয়তোবা নেই।
অদ্রির মনে হলো গলায় চেপে থাকা দড়িটা আস্তে আস্তে আলগা হচ্ছে।
অদ্রির বিছানার পাশে টুল নিয়ে রীতা বসে আছেন। অদ্রি ঘুমের ঘোরে আবোলতাবোল বকছে। একটু আগেই সে জোড়ে জোড়ে নিশ্বাস নিচ্ছিলো। হাত পা এমনভাবে নাড়াচাড়া করছিলো ; মুরগী জবাই করার পর যেমনটা করে। তার আগে বেশ হাসছিলো, শব্দ করে না মুচকি হাসি। অদ্রি ম্যাডামের হাসি এই প্রথম সে দেখেছে। মানুষটা যে এরকম কেনো? প্রশ্নের উত্তর তাকে খুব খোটায়। কিছু একটা বলছিলো, ঠোঁট নড়াচড়া করছিলো। হয়তোবা ভালো কোনো স্বপ্ন দেখছিলো।
এখন একটু স্বাভাবিক আছে।এঠো চায়ের কাপ নিতে এসেই রীতা দেখে যে, অদ্রি ম্যাডাম বমি করছে। ম্যাডামের এই অবস্থা দেখে রীতা দৌড়ে গিয়ে তাকে ধরে ফেলেন। তারপর বমি করা শেষ হবার পর তাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে খাবার পানি আনতে যায়। খাবার পানি নিয়ে এসে দেখেন অদ্রি গভীর ঘুমে নিমগ্ন। বমির জায়গাটা এখনও অপরিষ্কার। মোছার সময় পাইনি তা না, ম্যাডামের পাশ থেকে সরতেই তার ভালো লাগছেনা। এটা ঠিক যে ম্যাডামের সাথে তার কথাবার্তা খুব কম হয় কিন্তু রীতা তার প্রতি আলাদা স্নেহ অনুভব করে। ম্যাডাম তার মেয়ের বয়সে। একটা মাত্র ছেলেটা তার স্বামীর কাছে।
স্বামীর বাড়ি থেকে পালিয়েছেন কিন্তু ছেলেটার জন্য তার মনটা পোড়ে। এখানে তো সে বেশ আছে কিন্তু ছেলেটা?
ম্যাডাম পুরো রাত না খাওয়া, সকালেও কিছুই খাননি। ওই অবস্থায় লাল চা?
ম্যাডামের  ভাসা ভাসা চোখ দুখানা গর্তে চলে গেছে। মুখখানা শুকিয়ে ছোটো হয়ে গেছে।
নাজমুল সাহেব এলকোহলের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বেশ তৃপ্তি নিয়ে বলল
– তোর দাদীকে পারমিশন দিয়ে দিলাম বাংলাদেশে যাওয়ার জন্য।
নিদ্র হাত লেগে থাকা লাল রঙের দিকে তাকিয়ে থাকা অবস্থায় বলল
– পারমিশন দিয়ে দিলা?
– yes ! my dear son.
– তোর দাদী বলে সম্বোধন করলা ক্যান?
– কারণ সে আমার কথা শোনে নাই।
– তাই বলে মা বলবা না?
গ্লাসে এলকোহল ঢালতে ঢালতে বললেন
– না, বলবো না।
নিদ্র অনুভূতিহীন স্বরে বলল
– আচ্ছা মনে পড়ে, ফরেইনার বিয়ে করার কারণে দাদীকে তেজ্য করা হয়েছিলো?একমাত্র তোমার কারণে? তোমার এ ধরণের কাজে তার বাবা কসম দিয়েছিলেন যেন, মরা মুখও দেখতে না আসে। তোমার জন্য সে তার স্বপ্নের চাকরি ছেড়ে দিয়ে এখানে চলে আসেন।
– my dear son, ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করা বন্ধ করবি?
– আমি ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করছিনা।
– আমাকে শিখাতে আসছো তুমি?
– তোমাকে তো দাদীই কিছুই শিখাতে পারেনি। আমি তো কিছুই না।
– বেশ বড় বড় কথা বলছো, সাহস এতো কই থেকে আসে? আমার টা খাও আমার টায় পড়ো তার উপর বড় বড় কথা!
– আমি তোমার টা খাইও না পড়িও না। শুধু এখানে থাকি।
– থাকছো কেনো বাবা? চলে যাও।
– যাবো, একটা কথা ছিলো।
– যেহেতু চলে যাবি সেহেতু ডিসকাউন্ট হিসেবে একটা না অনেক গুলো কথা বলতে পারবি।
– দাদীর পা ধরে মাফ চেয়ে নিও।
নিদ্র কথাটা শেষ করেই বাবার সামনে থেকে উঠে চলে আসলো।
আজ দুদিন যাবত ঘুম ছাড়া কোনো প্রকার রেস্ট না নিয়েই কাজ করেছে নিদ্র। হাতের একপাশে লাল রঙ লেগে আছে। কোনোভাবেই উঠাতে পারছে। বেশ মোটা অংকের ডলার পেয়েছে, অবশ্য খাটাখাটুনি তো আর কম হয়নি। আগামীকালও কাজ আছে। একটানা কাজ করলে বাংলাদেশে যাওয়ার ডলার যোগাড় হয়ে যাবে। ব্যাংকে কিছু আছে। আর দাদীর খরচ নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই।
বিছানায় হাত পা ছড়িয়ে দিয়ে চোখ বুজে নতুন দম্পতির ফ্ল্যাট ডেকোরেশান কীভাবে করেছে ভাবছে। নতুন দম্পতির ঘনিষ্ট মূহুর্তের ছবি গুলো কোনো দ্বিধা ছাড়াই তাকে দেখতে দিয়ে দিলো। আর তার সামনেই চুম্বন করতেও দ্বিধাবোধ করেনি৷ এইখানকার কালচারই এরকম। নিদ্র এই কালচারের মধ্যেই বড় হয়েছে তারপরও তার কেনো যেন এসব ভালো লাগেনা। যদি তার মা সাথে থাকতো তাহলে হয়তোবা সে এদের মতোই হতো৷ রাস্তাঘাটে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করছে কিন্তু কোনো লাজ শরম নাই। তারও লজ্জাশরম থাকতো না। যার তার সাথে বেডে যেতো।
লাস্টের কথাটা মনে পড়াতে নিদ্রের নিজের কাছেই বিশ্রী লাগলো। হঠাৎ মৌরির কথা মনে পড়লো। মেয়েটার চরিত্র আর এদেশের মানুষের চরিত্র এক।
অদ্রির কাছে গিয়ে কি বলবে সে?
সরাসরি বলে দিবে, চলুন আমার সাথে?
আর বললেই কি আসবে? যদি তা না হয় তাহলে সে কী করবে?
আর ফিরবেই না এখানে।
একাকী এই সময় অদ্রি পাশে থাকলে ভালোই কাটতো। মাঝেমধ্যে তার মাঝেও একপ্রকার তৃষ্ণা জাগে। আসলে সেও রক্ত মাংসের মানুষ। আশেপাশে এরকম দেখে কেইবা এরকম একাকী জীবন কাটাতে চাইবে?
সে মিছে আশায় দিন কাটছে।
দরজায় টোকার শব্দে নিদ্রের চিন্তায় ছেদ পড়লো। নিদ্র চুপচাপ পরে রইলো বিছানায়। দরজায় টোকার শব্দটা তীব্র হচ্ছে। হতে থাক, তার বাবা পুরোপুরি মাতাল অবস্থায় এই কাজ করছেন। দরজা খোলা মানেই বিপদ, মহাবিপদ। সারারাত তাকে জাগিয়ে রেখে বাজে ভাষায় কখনো, কখনো সাধু ভাষায় লেকচার দিবে।
সকালে তার কাজ আছে এখন তাকে ঘুমাতে হবে।
চলবে…….!
© Maria Kabir

মন ফড়িং ♥ ৫.

মন ফড়িং ♥ ৫.
মন ফড়িং ♥
৫.
খোলা চুলে বিলি কাটতে কাটতে নিদ্র বলল
– না খেয়ে থাকতে খুব ভালো লাগে আপনার?
অদ্রি কোনো উত্তর না দিয়ে চোখ বুজে থাকে। নিদ্র, কপালে ডান হাতের উল্টো পাশ রেখে একটু চাপাস্বরে বলল
– ঘুমানোর অভিনয় করাটা ঠিক হচ্ছেনা। আপনি অভিনয়ে মোটেও পটু নন।
অদ্রি এখনও চুপ।
নিদ্র কানের কাছে ফিসফিস করে বলল
– আপনার চুলে বিলি কাটছি, আপনার বিরক্তিকর লাগছেনা?
অদ্রি একশব্দে বলল
– না।
– কেনো?
– কারণ শুনতে হবে না!
নিদ্র চুলের মাঝ থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে বলল
– তাহলে আমিও আর আপনার চুলে বিলি কাটবোনা।
অদ্রি চোখ খুলে নিদ্রের দিকে তাকিয়ে রইলো। ছেলেটা মিটিমিটি হাসছে। চোখের কোণে হাসি লেগেই আছে।নিদ্র দেখতে এতো সুন্দর কেনো? বেশিক্ষণ তাকাতেও ভয় লাগে। যদি নিজেরই নজর লেগে যায়?
– নিদ্র !
নিদ্র অন্যদিকে তাকিয়ে বলল
– বলুন।
– আপনাকে ছুঁয়ে দেখতে পারি?
নিদ্র বলল
– না।
– কেনো?
– কারণ শুনতে হবে না।
অদ্রি খুব জোড়ে হাসতে হাসতে শুরু করলো।
হাসি থামিয়ে বলল
– আপনি বাচ্চাদের মতো পুরোটাই। আসলে মাথাটা কেমন ভার হয়ে ছিলো। আপনার বিলি কাটাতে বেশ ভালো লাগছিলো।
– মাথাটা ভার কেনো হয়েছিল?
– বমি হয়েছিলো সকালের দিকে। তখন থেকে মাথাটা ভার।
– কারণ টা কি আমি বলবো?
– না, আমিই বলি। রাতে খাইনি, সকালেও বেশ দেরি করে চা খেয়েছি। তারপর হুট করে গা গুলিয়ে বমি….
– আমাকে ছুঁয়ে দেখতে চাইলেন?
নিদ্র, অদ্রির বিছানার বালিশের পাশে বসে আছে। অদ্রি বালিশে আধশোয়া অবস্থায় হেলান দিয়ে আছে। আধশোয়া অবস্থা ছেড়ে উঠে বসলো। কিন্তু নিদ্রের প্রশ্নের উত্তর দিলোনা।
নিদ্র বলল
– এতো অভিমান কি ভালো?
– আপনি অভিমানের কিছু বুঝেন?
– বুঝি কিনা জানিনা, তবে পাশের মেয়েটি যে অভিমানে জমে আছে সেটা বুঝি।
অদ্রি, I am very sorry! আর কখনোই এমন হবেনা। সত্যি বলছি আমি।
অদ্রির কাছে, খুব কাছে যাওয়ার সাহসটা এখনো জমাতে পারেনি। কাছে গিয়ে হুট করে জড়িয়ে ধরলে বা হাতটা চেপে ধরে চোখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলে বা দূরে কোথাও তাকে নিয়ে হারিয়ে যেতে পারলে অভিমানের কালো মেঘটা দূর হতো আমাদের মাঝের। তার সাথে প্রত্যেকটা মূহূর্ত্ব কে অনুভব করা যেতো। তার বিষন্নতার সেই চেহারা যদি সারাজীবনের জন্য মুছে দেয়া যেত তাহলে তার সাদামাটা মুখের চাহনিতে আর বিষন্নতা লুকিয়ে থাকতো না। তার চোখ দুটোতে আর কষ্টের জল থাকতোনা। তার চোখ দুটোতে আমার দেয়া স্বপ্নের রঙ থাকতো কানায় কানায় ভরে।
হ্যাঁ, ভালোবাসি কিন্তু তার অনুমতি ছাড়া তাকে ছুঁয়ে দেখার দুঃসাহস আমি করতে পারিনা।
অদ্রি আমাকে ছুঁয়ে দেখতে চায়, কতটুকুইবা ছোবে? হাতটাকে আলতো স্পর্শ করবে। বিদ্যুতের মতো একটা কঠিন শকও আমাদের লাগতে পারে। উষ্ণ স্পর্শ পাবার লোভ কে সামলাতে পারে? তাও ভালোবাসার সেই মানুষটির কাছ থেকে!
অদ্রি আস্তে আস্তে নিদ্রের কাছে এসে সত্যিই হাতটি আলতোভাবে  ছুঁয়ে দিলো।
কয়েক সেকেন্ডের মাথায় হাতটা সরিয়ে নিলো।
নিদ্র ঠাট্টার সুরে বলল
– ব্যস এটুকু? হাত কীভাবে ধরতে হয় জানেন না?
খপ করে অদ্রির হাত ধরে ফেলল নিদ্র। অদ্রি বিরোধিতা না করে চুপচাপ বসে বসে দেখতে লাগলো নিদ্রের চঞ্চলতা।
অদ্রির হাতের আঙ্গুলের ফাঁকে নিদ্র তার হাতের আঙ্গুলগুলো দিয়ে, হাতটাকে শক্ত করে চেপে ধরলো।
– দেখেছেন ম্যাডাম এভাবে হাত ধরতে হয়, যাতে ছেড়ে না যেতে পারে।
– হাতটাকে এখন ছাড়ুন, আমি ঘুমাবো।
– অনেক ঘুমিয়েছেন এখন গল্প হবে শুধু।
– কই অনেক ঘুমালাম? মাত্র একটু আগেই ঘুমিয়েছি।
নিদ্র অদ্রির খোলা এলোমেলো চুলে বিলি কেটে দিতে লাগলো।
– অদ্রি
– হুম
– আমার হবে?
– তাছাড়া কার আমি?
– খুব কাছের থেকে হবে? তোমার প্রত্যেকটা নিশ্বাসের সাক্ষী আমাকে করবে? তোমার প্রত্যেকটা চোখের পলকের সঙ্গী আমায় করবে? তোমার নিশ্বাসে আমার নিশ্বাস ভারী করতে দিবে?
তুমি বলছি রাগ হচ্ছেনা?
অদ্রি ভাবলো নিদ্রের চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলবে।
অদ্রি, নিদ্রের দিকে তাকাতেই খেয়াল করলো নিদ্রের চেহারা পরিবর্তন হচ্ছে। ধীরে ধীরে সেই চেহারা চেনা কারো রূপ নিচ্ছে।
অদ্রি চিৎকার করে হাতটা ছাড়িয়ে দূরে সরে গেলো। সামনে যে বসে আছে সে নিদ্র না তার মৃত স্বামী ইখলাস সাহেব।
ইখলাস সাহেব তার দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন।
চলবে……!
©  Maria Kabir

মন ফড়িং ♥ ৪.

মন ফড়িং ♥ ৪.
মন ফড়িং ♥
৪.
কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই, আজ আর নেই……
মোবাইলের স্পিকার মান্না দের বিখ্যাত গানে মুখরিত হচ্ছে। নাজমুল সাহেব বিছানায় টান টান হয়ে শুয়ে চোখ বন্ধ করে গান টা শুনছেন। মানুষ ভারী আজব স্বভাবের। কষ্টের সময়ে নিজেকে ভালো রাখার চেষ্টা না করে আরো বেশি কষ্ট পেতে চায়। ছ্যাকা খাওয়ার পর, স্যাড সং বেশি শুনে মানুষ। কলেজ জীবনের মূহুর্ত গুলো ভাবতে নাজমুল সাহেবের ভালো লাগে। ওই সময়টাতেই সে জীবনের শ্রেষ্ঠ মূহুর্ত গুলো কাটিয়েছেন। তাদের ফ্রেন্ড সার্কেলে ছিলো ৭ জন। তিন জন মেয়ে চার জন ছেলে। মেয়ে তিন জনের সাথে একেবারেই কোনো যোগাযোগ নেই। তবে তিন জনের মধ্যে রাশা আর নীপা নাকি বেশ ভালোই আছে কিন্তু মায়া মেয়েটা নাকি আত্মহত্যা করেছে।
আত্মহত্যার পেছনের কারণ নাকি পরোকীয়া! তবে সে পুরোপুরি সঠিক তথ্য জানেন না। পরোকীয়ার ব্যপারটা মিথ্যেও হতে পারে। মায়া ওইসময়ের কলেজে সবথেকে ভদ্র মেয়ে ছিলো। কোনোদিন কোনো ছেলে ওর ভদ্রতার জন্য একটা বাজে শব্দ ওকে বলার সাহস পায়নি। মাঝেমধ্যে তো আমি নিজেই ভয় পেতাম কথা বলার সময়। কোন সময় কী বলে বসবো বেচারি রাগ করে বসবে। ৬ জন খোলামেলা মনের মানুষের সাথে ১ জন বদ্ধ মনের মানুষের ফ্রেন্ডশিপটা উদ্ভট লাগলেও মোটেও উদ্ভট ছিলোনা। ও আমাদের সাথে আঠার মতো লেগে থাকতো আর আমরাও কখনো ওকে ছেড়ে দেয়ার কথা ভাবতামও না।
বাকি চারজনের তিনজন বাংলাদেশে আর চার নম্বর জন নাজমুল সাহেব তো প্রবাসে নিজেকে গুম করেছেন।
দেশে গিয়ে একবার সবার সাথে দেখা করার স্বাদ জাগে প্রায়ই কিন্তু স্বাদ পূরণ করা আর হয়না।
নিদ্রকে জোড় করে পাঠানোর পিছনের কারণ টা নিদ্র নিজেও জানে। রশিদের বাসায় বেশ ভালোই ছিলো তার ছেলে। খারাপ কিছু ঘটলে রশিদ নিজেই বলতো।তবে রশিদকে যে নিদ্র খুব জ্বালিয়েছে ব্যাপারটা রশিদ মুখে না বললেও কথাবার্তায় কিছুটা বুঝতে পেরেছেন।
গরম চায়ে চুমুক দেয়ার পর অদ্রির টক ঢেকুর ওঠা বন্ধ হলো। কাথা সেলাই বন্ধ রেখে চা শেষ করে বিছানা ছেড়ে নেমে জানালা খুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। জানালা খোলার সাথে সাথে এক ঝাপটা ঠান্ডা বাতাস রুমের ভিতর ঢুকে পরলো। হঠাৎ করে এরকম ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটায় অদ্রির ভালো লাগলেও হালকা শীত অনুভব হলো। বর্ষামৌসুম এখনো শেষ হয়নি শীতকাল আসার কথা নয়। বৃষ্টির কারণেও এরকম ঠান্ডা বাতাসের উদ্ভব হয়। জানালা খোলা রেখে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে খোলা আকাশের মেঘ জমাট বাধা  দেখলো অদ্রি। জমাট বাধছে আর ঘন কালো হচ্ছে। মেঘ গুলো যখন আলাদা ছিলো তখনও এতো কালো ছিলোনা। একটার সাথে একটা যুক্ত হচ্ছে আর কালো রঙের ঘনত্ব বাড়ছে। মেঘ জমাট  বাধার পরে কালো হতে থাকবে একসময় ভারী ঘন কালো মেঘ গুলো বৃষ্টি বর্ষণের মাধ্যমে হালকা হবে। খুব ছোটোবেলার বিজ্ঞান বইগুলোতে সে বৃষ্টি হওয়ার প্রক্রিয়া পড়েছিলো। পানিচক্র বলতে কী বুঝো? পানিচক্র কী? আলোচনা করো! এই প্রশ্নের উত্তর দিতে তার বেশ মজা লাগতো। খুব সম্ভব ৪র্থ বা  ৫ম শ্রেণীর বইতে পানিচক্র বিষয়ক চ্যাপ্টার আছে।
অদ্রির মনে হলো তার পেট ফুলে উঠছে। পেটের মধ্যে কেমন যেন শব্দও হচ্ছে। গা গুলিয়ে আসছে। কেমন বিশ্রী ঢেকুর তুলার পর অদ্রি বমি করতে শুরু করলো। অদ্রির মনে হচ্ছে তার নাভির কাছ থেকে একটা চিনচিন ব্যথা পাক খেয়ে ঠিক বুকের দিকে উঠে আসছে। বমির সাথে তার পাকস্থলীও মনে হয় বের হয়ে আসবে।
– হ্যালো নাম্মি?
ফোনের ওপাশ থেকে নাম্মি হাসি হাসি স্বরে বলল
– হ্যালো।
– কাজটা কি এখনো আছে?
নাম্মি হেসে বলল
– অবশ্যই মিস্টার নিড্র ফ্রেন্ড।
– আমি কীভাবে যোগাযোগ করবো?
– ঠিকানা ম্যাসেজ করে দিচ্ছি চলে যেও সকাল ১০ টার মধ্যে। আর আমার কথা বললেই হবে। দেনাপাওনা ঠিক করে নিও।
– থ্যাংকস।
নিম্মি হেসে বলল
– নো থ্যাংকস প্লিজ।তুমি আগামীকাল সকালে পৌঁছে যেও। এখন রাখি ব্যস্ত আছি।
নিদ্র ফোন টা বিছানার উপর ফেলে দিয়ে হেসে ফেললো। নিম্মি কখনোই ব্যস্ত থাকেনা তারপরও ফোনে কথা বলার ২-১ মিনিটের মাথায় বলবে
– এখন রাখি ব্যস্ত আছি।
বাবার সকল সম্পত্তি পেয়ে এখন বেশ আরামে দিন কাটায়। কিন্তু এক সময় ১ ডলারের জন্য সে রেস্টুরেন্টে গাধার মতো খেটেছে। নিজের বার্থডে তে পর্যন্ত এক পিচ কেক খাওয়ার ডলার জোগাড় করতে পারেনি। কিন্তু মেয়েটার ক্যারেক্টার অন্যসব মেয়েদের মতোনা। বাঙালি দের মতো ক্যারেক্টার। সতীত্ব নষ্ট হতে দেয়নি। দেখতে বেশ সুন্দর অফারও কম পায়নি। মোটা ডলারের লোভ খুদা পেটে কজন ব্রিটিশ সামলাতে পারে?
কে বলবে একসময় না খেয়ে থাকা মেয়েটা এখন পায়ের উপর পা রেখে পেট পুরে খাবার খায়? অতিত কজনই বা জানতে চায়?
অদ্রি কি ইচ্ছের বিরুদ্ধে আমাকে তার অতীত জানিয়েছে? যাতে আমি তার পিছু ছেড়ে দেই?
ধুর, সবকিছুতে এই মেয়েটা ভাগ বসায়। নিম্মির চিন্তার মাঝেও সে হাজির হয়। নিজের উপরই নিদ্রের বিরক্ত লাগলো।
তার বাবা কদিন ধরে এলকোহল খাচ্ছে। না করতে গেলে অভিমানের সুরে বলে
– তোর মাও শান্তি দিলোনা তুইও দিলি না। পড়াশোনা করতে বললাম করলি না। এখন কর রংমিস্ত্রীর কাজ, করবি মানুষের প্লেট ধোয়ার কাজ।
– নিজের প্লেট তো এমনিতেই ধোই। সেখানে প্লেট ধুয়ে কয়েকটা ডলার আসলে সমস্যা কী?
– তোর নজর আর চিন্তা নিচেই নামলো।
– নিচে নামাই ভালো, বেশি উপরে উঠলে ভেঙে পরার সম্ভাবনা থাকে।
– আমার ছেলে হয়ে তুই ওসব কাজ করবি? তবে আমি মোটেও আমার সম্পত্তির ভাগ দিবোনা।
– না দাও।
এই পর্যায়ে এসে তার বাবা বেশ উত্তেজিত হয়ে বোতল সুদ্ধ এলকোহল মানে বাঙালির ভাষায় মদ গিলে খায়। তারপর অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে। নিদ্র প্রথম যেদিন এরকম অকথ্য গালাগালি তার বাবার মুখ থেকে শুনেছিলো, সেদিন সে বিশ্বাসই করতে পারেনি, তার বাবা এরকম গালিও দিতে পারে!
এখন অবশ্য সহ্য হয়ে গেছে। বুড়ো বয়সে এরকম নাকি সবারই হয়, তার বাবারও হয়েছে।
চলবে…….!
© Maria Kabir

মন ফড়িং ♥ ৩.

মন ফড়িং ♥ ৩.
মন ফড়িং ♥
৩.
সেই সকাল থেকে খালি পেটে থাকায় অদ্রির টক ঢেকুর তুলছে। পেটও কেমন কেমন ফোলা ফোলা মনে হচ্ছে। ঢেকুর কয়েক প্রকারের আছে। কিছু প্রকার ঢেকুর মানুষের খুব পছন্দ। আবার কিছু ঢেকুর মানুষকে বেশ বিরক্ত করে। মিষ্টি ঢেকুর, টক ঢেকুর, ঝাল ঢেকুর, রসুনের ঢেকুর, মুলার ঢেকুর, বিরিয়ানির ঢেকুর…. আর মনে পড়ছে না অদ্রির। মিষ্টি ঢেকুর মিষ্টি যারা পছন্দ করে তাদের ভালো লাগে। সবথেকে বাজে ঢেকুর মুলার ঢেকুর। বেশ বাজে, এই কারণে মুলা তার অপছন্দের তালিকার শীর্ষে। বিরিয়ানীর পাগলদের আবার বিরিয়ানির ঢেকুর খুব পছন্দ করে। নিদ্রের মনে হয় এই ঢেকুর খুব পছন্দ করে। খাওয়ার পরও বিরিয়ানীর রেশ টা রয়ে যায়। তবে ঢেকুর সম্পর্কিত তার এই মতামত সঠিক কিনা তা জানা নেই তার। নিদ্রকে বা রশীদ সাহেবকে জিজ্ঞেস করতে হবে। কাথা সেলাই করা বন্ধ করে অদ্রি বালিশে হেলান দিয়ে ভাবতে লাগলো। রীতাকে জিজ্ঞেস করলে কেমন হয়?
রীতা হচ্ছে গল্পদারী মানুষ। এই ধরণের মানুষ গল্প করতে খুব পছন্দ করে। একটু সুযোগ পেলে রাজ্যের গল্প নিয়ে বসবে। এদের গল্পের ভাণ্ডার কখনও শূন্য হয়না। রীতা বলাটা ঠিক না অদ্রি নিজেকে শুধরানোর সুরে বলল। সে বয়সে অনেক বড়, মায়ের সমতুল্য। তাই তাকে রীতা খালা বা খালাম্মা বলাটাই ঠিক।
চায়ের কাপ নিয়ে খুব সাবধানে দোতলায় উঠে আসলেন রীতা।
দরজায় টোকা দিতেই অদ্রি বলল
– খোলা আছে।
চায়ের কাপ অদ্রির হাতে দিয়ে রীতা লিলির উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো। কী রান্না করতে হবে না জেনে তার মতো করে রান্না করলে লিলি বেশ ঝামেলা করবে।
টক ঢেকুর এখনও বন্ধ হয়নি। এই অবস্থায় চা খেলে সমস্যা বাড়বে? নাকি চায়ের স্বাদ আর টক ঢেকুর এর স্বাদ মিক্সড হয়ে নতুন কোনো স্বাদের ঢেকুর উঠবে?
বেশ ভাববার বিষয়!
সবকিছু ভুলে এরকম উদ্ভট চিন্তা করতেও শান্তি পাওয়া যায়। অন্ততপক্ষে তাজা ঘায়ের ব্যথা গুলোকে তখন ভুলে থাকা যায়।
নাজমুল সাহেব ছেলের রুমের দরজার সামনে ১৫ মিনিট যাবত দাঁড়িয়ে আছেন। দরজা অল্প একটু খোলা, সেই খোলা জায়গা দিয়ে নিদ্রকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ১৫ মিনিট ধরে ছেলে মোবাইল হাতে নিয়ে স্থির হয়ে বসেই আছে। শুধু নিশ্বাস আর চোখের পলক পরছে তাছাড়া আর কোনো মুভমেন্ট নেই। ১৬ মিনিটের মাথায় নাজমুল সাহেব নিদ্রের রুমে ঢুলে পরলো। নক না করেই। নিদ্র প্রায়ই লাফিয়ে উঠলো। তাড়াহুড়ো করে মোবাইল বিছানার উপর করে রেখে দিয়ে বলল
– তুমি??
নাজমুল সাহেব ভাবগাম্ভীর্য ধরে রাখার উদ্দেশ্যে গলা ভারী করে বলল
– কেনো আমি তোমার রুমে আসতে পারিনা?
– না, বাবা পারো কিন্তু তুমি তো এই সময় মানে ইয়ে তুমি তো কখনও আসোনা। আর নক না করেই?
– নিজের ছেলের রুমেও কি নক করে আমাকে ঢুকতে হবে? আমি তোর রুমে যখন ইচ্ছা আসতে পারি এটা আমার অধিকার। আজকে থেকে আমি তোর রুমেই থাকবো। ওকে?
নিদ্র বলল
– থাকবা।
নাজমুল সাহেব চেয়ার টেনে হেলান দিয়ে বসে বলল
– মোবাইলে কী দেখছিলি?
নিদ্র ভাবেনি তাকে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে!
– আমি কিন্তু তোর রুমের বাইরে থেকে দাঁড়িয়ে সব দেখেছি। আমাকে খুলে বল।
– না বাবা তেমন কিছু না। ইউটিউবে ভিডিও দেখছিলাম।
– তোকে বিষন্ন দেখছি? কী হয়েছে বলবি?
বুঝেছি আমার মতো হয়েছো।
নিদ্র মুচকি হাসি ছাড়া এই কথা বিপরীতে কী বলা যায় তার জানা নেই।
নাজমুল সাহেব পায়ের উপর পা রেখে নাচাতে নাচাতে বলল
– ছেলেদের বিষন্নতা ভোলার সবথেকে ভালো উপায় সিগারেটে টান দেয়া। নিকোটিনের ধোয়ায় মনের ধোয়াশা কেটে যায়। বাপ হয়ে ছেলেকে সিগারেট খেতে বলছি বলে আমাকে খারাপ ভাবিস না। আসলে তুই তো খোলামেলা ভাবে বলবিনা। তাহলে নির্দিষ্ট করে সমাধান দিতাম। মন খুলে তুই বলবিও না কারণ আমার ফটোকপি তুই।
তোর মা আমাকে রেখে চলে গেলো তখনও আমি আমার মনের কষ্ট, বেদনা সব লুকিয়ে রেখেছিলাম। কাউকে বলিনি। সব মানুষ স্বার্থপর, মন দিয়ে কষ্টের কথা শুনবে। পরে কোনো কারণে ঝগড়া লাগলে পিছনের কথা বলে খোটা দিবেই।
এই দুনিয়াতে কেউই কারো না। দ্যাখ না আমি শেষ মেশ একা।
নিদ্র কিছু একটা বলতে যাবে তখন নাজমুল সাহেব থামিয়ে দিয়ে বলল
– তুই এখন বলবি তুই আছিস সাথে? না রে বাপ তুইও থাকবি না। বিয়ে করবি বউকে পাবি। তারপর পোলাপান হবে। এই বুড়ো বাপকে একসময় ভুলে যাবি।
শোন বাপ, মন খারাপের কারণ টাকে ধ্বংস করে দে। দেখবি ভালো থাকতে পারবি।
তোর মাকে ছাড়া দ্যাখ আমি কিন্তু ভালোই আছি। তোর দাদী আসমা খাতুন বা বেগম তার স্বামীকে মানে আমার বাপকে ছাড়া থাকতেই পারতো না। দুই স্বামী স্ত্রীর মধ্যে এতো মিল মহব্বত ভাবত্রি অবাক লাগতো। বাবা হঠাৎ করে স্ট্রোক করে মারা গেলেন। মা কিন্তু এখন ভালোই আছেন। মানুষ আসলে ভাবে যে সে ভালো থাকতে পারবেনা। সময় কাটবে কীভাবে? কিন্তু বাস্তবতা হলো শেষ মেশ ভালো থাকতে পারে। শুধু ভালো না বেশ ভালো।
কী বলতে চাচ্ছি তুমি বুঝতে পেরেছো? My dear son?
নিদ্র বলল
– ভাবতে হবে।
নাজমুল সাহেব চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে বলল
– ওকে ভাবতে থাকো। উত্তর টা দিও। আর আপনার দাদীকে একটু বুঝাবেন যে, এই বয়সে এরকম ছেলেমি যেন বাদ দেয়।
আর ভালো লাগেনা।
নাজমুল সাহেব খুব দ্রুত তার রুমের দিকে পা বাড়ালো। অনেকক্ষণ যাবত তার বিছানায় শুয়ে মান্নাদের গান শোনা হয়নি।
একটু শান্তি না খুঁজে উপায় নেই, বাঁচতে হবে তাকে অনেকদিন, অনেক অনেক দিন।
এই পৃথিবীতে কেইবা মরতে চায়।
চলবে…….!
© Maria Kabir