প্রত্যাখান_পর্ব(১৫)

প্রত্যাখান_পর্ব(১৫)

প্রত্যাখান_পর্ব(১৫)

লেখা- অনামিকা ইসলাম ‘অন্তরা’

রাত্রি দশটা বেজে পয়তাল্লিশ মিনিট।

পিয়াদের বাসার গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে আছি মিনিট পাঁচেক হয়ে গেছে।

কল দিয়েছিলাম পিয়ার বাবা জনাব সিদ্দিক সাহেবের ফোনে।

রিসিভ করে বলছে আসতেছে কিন্তু পাঁচ মিনিট অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পরও ওনার খবর নেই কোন।

পুনঃবার কল দিলাম।

রিংটোনের আওয়াজ বলে দিচ্ছে, মানুষটা সিড়ি পেরিয়ে গেইটের অনেকটা কাছে চলে এসেছে।

কল কেটে গেইটের ভেতরে দৃষ্টি নিয়ে গেলাম।

বলতে বলতেই সিদ্দিক কাকা গেইটের একদম সন্নিকটে চলে আসে। আমাকে দেখে দুর থেকেই বলতে শুরু করেন তিনি,

‘বাপরে! বয়সের সাথে সাথে মাথাও কিছুটা নষ্টের পথে।

গেইট খুলার চাবি না এনে চলে আসছি ঔষধের বক্স নিয়ে।

তিনতলা পেরিয়ে দুতলায় আসতেই খেয়াল করি সেটা।’ কাকাকে সালাম দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলাম।

কুশলাদি বিনিময় করতে করতে কাকার সাথে তিনতলায় বাসায় ঢুকলাম। তিনকক্ষ বিশিষ্ট ছোট্ট একটা বাসা।

অনেকটা ছিমছাম এবং গুছানো।

একরুমে কাকা কাকি থাকেন, আরেক রুমে তাদের একমাত্র মেয়ে পিয়া এবং অন্য রুমে আগত অতিথিরা থাকেন।

যথারীতি কুশলাদি বিনিময়ের পর পিয়ার মা এবং পিয়া আমায় বসতে অনুরোধ করেন।

আমি বসার আগেই এদিক ওদিক তাকিয়ে পিয়ার দিকে দৃষ্টি নিলাম। প্রশ্ন করলাম,

‘পিয়া, কোথায় লাবণ্য?

ও’কে দেখছি না যে?’ চায়ের কাপটা পিয়ার মা আমার হাতে এগিয়ে দিতে দিতে জানান দেয়,

‘ঘুমুচ্ছে। আহারে বেচারী! পুরো দুপুর পথভুলে ঘুরে বেরিয়েছে রাস্তায়।

তারপর যাও মানুষের মাধ্যমে একটু রাস্তাটা ধরতে পারলো, ওমনি বৃষ্টি শুরু হলো।

সেকি বৃষ্টি! একদম মুশলধার।

ব্যাটা! ব্যবসা নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে? ঘরের দিকেও তো একটু নজর দিতে হবে, তাই না?

এক কাজ করো। একদিন ব্যবসা কার্য থেকে দুইদিনের জন্য বিরতি নিয়ে ঢাকা শহরটা ঘুরে দেখাও মেয়েটাকে।

যাতে ভবিষ্যতে পথভুলে হারিয়ে না যায়।’ পিয়ার মায়ের কথার প্রতিউত্তরে কিছুই বলতে পারিনি।

তার আগেই ওনি আবারও বলতে শুরু করেন,

‘আহারে বেচারী! সারাটা দিন অসহায়ের মতো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে শেষমেশ বৃষ্টির জন্য টং দোকানে আশ্রয় নেয়।

পরে বৃষ্টি থামলে পাশের ফ্ল্যাক্সির দোকান থেকে শাশুড়ীকে কল দিয়েছে।

তারপর তোমার মা কল দিয়ে ওর বর্তমান অবস্থানটা আমাদের জানালে তোমার আঙ্কেল গিয়ে ওকে নিয়ে আসে।

ঐতো! লাবণ্য আসছে। ঘুম হলো মা?’ আন্টির দৃষ্টিকে অনুসরণ করে পেছনে ফিরে তাকালাম আমি।

ঘুমজড়ানো চোখে ছোট বাচ্চাদের ন্যায় আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে লাবণ্য।

চায়ের কাপে শেষ চুমুকটা দিয়ে কাপটা একপাশে রেখে ওঠে দাঁড়ালাম সোফা থেকে।

‘আন্টি! আজ তাহলে আমরা আসি।

লাবণ্য চলো।’ লাবণ্যর দিকে তাকিয়ে আচমকাই বলে ওঠলাম কথাটা।

‘কি বলছো তুমি বাবা? আসছো মানে?

আজ কোথাও যাওয়া হবে না। আজ তোমরা আমাদের এখানে থাকবে।’

সোফা থেকে ওঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে পিয়ার মা কথাটা বলে।

‘ না আন্টি, আজ নয়৷ অন্য আরেকদিন। আর তুমি দাঁড়িয়ে আছো কেন?

যাও, কলেজ ব্যাগ নিয়ে আসো।’

অনেকটা অধিকার খাটানোর ন্যায় লাবণ্যর দিকে তাকিয়ে কথাটা বললাম।

জবাবে আন্টির দিকে ফিরে তাকায় লাবণ্য।

ভাবমূর্তিখানা এমন যে, আমার কথায় যেন ভিষণ রকম বিরক্ত ‘ও’।

এতরাতে বাসা থেকে বের হওয়ার কোন ইচ্ছেই যেন ওর নেই।

ওর সেই মুখভঙ্গিকে কাজে লাগিয়ে আরো জোর গলায় জানান দেয় আন্টি, ‘না, বাবা!

এই প্রথম মেয়েটা এসেছে। আজ যাওয়া যাবে না।

এতরাত্রিতে তো কোনভাবে নয়। তুমি বরং সকালে এসো।

‘ কেন জানি আন্টির সাধারণ কথায়ও সেদিন আমার মেজাজ চরমে ওঠে গিয়েছিলো।

লাবণ্যর দিকে না তাকিয়েই বললাম, আচ্ছা!

ও থাকুক তবে। আসি আন্টি। আঙ্কেল আসসালামু আলাইকুম।

বাসা থেকে বের হয়ে নিজের ওপর চরম রাগ ওঠে যায়।

এ আমি কি করলাম?

রাগের জন্য ওকে রেখেই চলে আসলাম? না এটা ঠিক হয়নি আমার। ভালো লাগছিলো না কিছুই।

বাসায় না গিয়ে ঘুরঘুর করতে লাগলাম রাস্তায়।

আর মনে মনে লাবণ্যর সাথে কথা বলতে লাগলাম,

‘না হয় আমি বলেছিই থাকতে, তাই বলে তুমি এমন করতে পারলে?

আমাকে একবার থামিয়ে বলতে পারলে না, আমিও যাবো আপনার সাথে?

কি এমন ক্ষতি হতো এটা করলে?’ মুশলধারে বৃষ্টি শুরু হলো।

রাস্তায় দাঁড়িয়ে তিনতলার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আমি।

নাহ! কেউ দাঁড়ায়নি আমার পথপানে তাকিয়ে।

একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পেছনের দিকে তাকাতেই ভূত দেখার ন্যায় চমকে ওঠলাম আমি।

ছাতা হাতে স্বয়ং লাবণ্য দাঁড়িয়ে।

তারপাশেই আরো একটি ছাতা হাতে সিদ্দিক কাকা দাঁড়িয়ে।

আসলে হচ্ছেটা কি? বুঝতে পারছিলাম না কিছুই।

স্তব্ধ দৃষ্টিতে তাই তাকিয়ে আছি ওদের পানে।

সিদ্দিক কাকা দুষ্টুমির হাসি হেসে আমার দিকে তাকিয়ে।

তুই তো পুরো বাপের মতো হয়েছিস।

তোর বাপও এমন করত।

অকারণে ভাবির(তোর মা) সাথে ঝগড়া করতো।

তারপর তোর মা বাপের বাড়ি চলে গেলে রাত্রি আধারে তোর বাপ শ্বশুরের ফ্ল্যাটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতো।

কাকার কথায় লজ্জা পেলাম ভিষণ।

কাকা আবারো বলতে শুরু করেন, রাগ করে চলে আসছে লাবণ্য,

এটা আমায় আগে বলিসনি কেন?

আগে বললে তো তোকে এত কষ্ট করতে হতো না৷

ভাগ্যিস, বারান্দার গ্লাসগুলো মিলিয়ে দেয়ার সময় নিচে দৃষ্টি আসে আমার।

কাকা, আমি আসলে….

পুরো কথা বলতে পারিনি। তার আগেই কাকা লাবণ্যর দিকে ফিরে তাকায়।

‘শুনো মা, বর ঝগড়া করলে,

তাদের ঘাড়ের রগ বাকা থাকলে সেগুলো টেনে সোজা বানানোর দায়িত্ব তোমাদের।

রাগ করে এভাবে হুটহাট বাপের বাড়ি/অন্য কোথাও যাওয়ার আগে নেক্সট টাইম একলা ঘরে বসে এটাই ভাববা,

কিভাবে টাইট দিলে বর সোজা থাকে।

কি মনে থাকবে?’

মাথা ঝাকিয়ে হ্যাঁ-বোধক জবাব দেয় লাবণ্য।

হাসি এসেও আসলো না আমার। কাকার থেকে বিদায় নিয়ে পায়ে হেঁটে দুজন চললাম সামনের দিকে।

খানেকদুর যেতেই মাথায় দুষ্ট বুদ্ধির উদয় হয়।

ওর কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওর হাতের ছাতাটা ছেড়ে দিলাম ওপরে শূন্যের দিকে।

মুহূর্তেই দমকা হাওয়া এসে সেটা উড়িয়ে নিয়ে যায় দুরে। চলবে….

প্রত্যাখান_পর্ব(১৪)

#প্রত্যাখান_পর্ব(১৪)
লেখা- অনামিকা ইসলাম ‘অন্তরা’

‘এত যে কষ্ট মনের ভেতরে, তবুও মেয়েটির বিন্দু মাত্র ক্ষোভ নেই বাবা-মায়ের প্রতি। সবসময় মুখে হাসির রেখা ঝুলেই থাকবে। প্রকাশ করে না ঠিক’ই। কিন্তু বুঝি তো, সব বুঝি,’ জানালেন ভাবি। অনেকটা হাহাকার মিশ্রিত ছিল সে কথা।

খানেক থেমে তিনি আবারও বলতে শুরু করে, ‘জানেন, সেবার যখন আপনার মা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলো, তখন ওর কি আহাজারি! কিছুতেই আপনাকে বিয়ে করবে না। করতেই যদি হয় তবে আপনাকে বিষয়টা জানিয়েই করবে।’
এ কথা শুনে আপনার মা খানেক হাসলেন৷ তারপর লাবণ্যর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেছিলেন তিনি, ‘বোকা মেয়ে! বিয়েই তো হয়েছে। অন্যায় তো কিছু করো নি। নিজেকে এত ছোট কেন ভাবছো? ছোট তো হওয়া উচিৎ ঐ মুখোশদারী মানুষটির, যে তোমাকে প্রতি পদে পদে ঠকিয়েছে।’
তারপর আর আন্টির মুখের উপর কথা বলেতে পারেনি সে। সব ঠিকঠাক ছিলো। বিপত্তিটা ঘটল সেদিন, ‘যেদিন লাবণ্য ফেসবুকে আপনার স্ট্যাটাসের মাধ্যমে জানতে পারলো মিথ্যে কথা একদম বরদাস্ত করেন না আপনি। হোক তা মজা করেও।’
আর সেদিনই সে আংকেলকে ডেকে প্রত্যাখান করে দেয় বিয়ের প্রস্তাব।
সত্যি বলতে প্রথম দেখাতেই(ছবি দেখে) ও আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছিল। জায়গা দিয়ে ফেলেছিলো মনের ছোট্ট কুঠুরিতে। কিন্তু প্রকাশ করতে পারেনি।
‘একটা বিয়ে হয়েছে, স্বামী সংসারে থাকতে পারেনি তিনমাসও, চলে আসতে হয়েছে। এসব নানাবিধ কারণে ও হীনমন্যতায় ভুগতো। নিজেকে ভিষণ ছোট ভাবতো। মানুষের ভালোবাসার অযোগ্য মনে করতো নিজেকে।’

লাবণ্যর ভাবির কথাগুলো শুনছিলাম আর দু’চোখ দিয়ে অকাল শ্রাবণ ঝরছিল আমার। মনে মনে শুধু এটাই ভাবছিলাম, ‘এ আমি কি করলাম! কেন করলাম? কোন কিছু না জেনে বুঝে কেন এমনটি করলাম?’
‘শুভ্র ভাই! বেলা বয়ে গেল বলে। আপনি কি আজ রাতটা আমাদের ছোট্ট কুটিরে থেকে যাবেন?’ অনেকটা অনুনয়ের স্বরে ছিল সে প্রশ্ন।
সম্বিত ফিরে আমার। ঠোঁটের কোণে মেকি হাসির দেখা ফুটিয়ে তুলি। ‘না, না, ভাবি! আমার এখন যেতে হবে। আসি।’

হেনা ভাবির থেকে বিদায় নিয়ে আমি যখন নরসিংদী থেকে রওয়ানা দেই, তখন বিকেল ৫টা বেজে ১৩ কি ১৪মিনিট। বাসায় যখন ফিরি তখন রাত্রি সাড়ে ৯টা বাজে।
দরজায় নক করতেই ‘আশা’ এসে দরজাটা খুলে দেয়। যদিও প্রতিটা দিন ড্রয়িং রুমে বসে আমার জন্য প্রতীক্ষার প্রহর গুনতো লাবণ্য।
ভেতরে প্রবেশ করেই আমার আকুল নয়ন খুঁজতে থাকে লাবণ্যকে। এদিকে বোন যে আমার প্রশ্ন করেছে, ‘কিরে ভাইয়া! এরকম দেখাচ্ছে কেন তোকে?’ সেদিকে একটুও মন নেই আমার।
বোনের প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই দ্রুতপায়ে এগিয়ে যাই নিজ রুমের দিকে, খুঁজতে থাকি লাবণ্যকে।
কিন্তু নাহ! পাইনি ও’কে। ভেতরটা আমার হাহাকার দিয়ে ওঠে। দ্রুত পায়ে মায়ের রুমে গেলাম। মায়ের রুম থেকে গোসলখানা, কিচেন, এরুম-ওরুম সবখানেই খুঁজলাম ও’কে মনে মনে, ভিষণ সংগোপন।

আমার এরকম হন্তদন্ত হয়ে ছুটাছুটিতে কিছুটা অবাক হয় মা। প্রশ্ন করে, ‘কিরে! কি হয়েছে তোর? কি খুঁজছিস এভাবে?’
হতাশ চোখে মায়ের দিকে তাকালাম আমি। তারপর অনেকটা ভেঁজা গলায় প্রশ্ন করলাম, ‘কোথায় লাবণ্য? ও’কে কোথাও পাচ্ছি না?’
বিয়ের পর এই প্রথম নিজ থেকে লাবণ্যর খোঁজ নিয়েছি৷ ব্যাপার’টাতে অবাক হয় মা। কিন্তু অস্বাভাবিক হয়নি। মনে হচ্ছে যেন এরকম কিছু ঘটবে সেটা ওনি আগে থেকেই জানতেন।
কিছুটা উত্তেজিত কন্ঠে প্রশ্ন করলাম আবারও, ‘কি হলো? কিছু বলছো না যে? কোথায় লাবণ্য?’
মায়ের জবাব, ‘বৃষ্টির জন্য আটকে গিয়েছিলো রাস্তায়। পরে পথভুলে আশ্রয় নেয় বান্ধবীর বাসায়। এখন পিয়াদের বাসায় আছে। কাল সকালে চলে আসবে।’
কেন জানি না, সেদিন আমার ভিষণ রাগ হয় লাবণ্যর প্রতি। ‘না হয় পথভুলে কিছু টা সময় নষ্টই হলো, তাই হলে এভাবে অন্যের বাসায় রাত কাটাবে?’
ঘড়িতে ১০টা বাজার শব্দ হলো তখনই। ঝুলে যাওয়া টা-ই’টা ভালো ভাবে বেধে মায়ের দিকে ফিরে তাকালাম, ‘আমি আসছি পিয়াদের বাসা থেকে। গেইটটা লাগিয়ে দাও।’
পিছু ডাকছে আশা। ‘ভাইয়া! শুন। বাইরে বৃষ্টি পরছে। যাসনে। এই ভাইয়া! ছাতাটা তো নিয়ে যা। এইরে! চলে গেলো। মা, তুমি এভাবে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছো, কিছু বললে না কেন ভাইয়াকে?
জবাবে একটা রহস্যজনক হাসি দিয়ে আমার মা সেদিন নিজ রুমে চলে গিয়েছিল….

চলবে….

 প্রত্যাখান_পর্ব(১৩)

 প্রত্যাখান_পর্ব(১৩)

প্রত্যাখান_পর্ব(১৩)

লেখা- অনামিকা ইসলাম ‘অন্তরা’

লাবণ্যকে নিয়ে যখন বাড়ি পৌঁছালাম তখন রাত্রি সাড়ে দশটার মতো বাজে।

রুমে প্রবেশ করেই আমার চক্ষু চড়কগাছ।

ফুলে ফুলে সজ্জিত রুমটির চতুর্দিকে গোলাপের পাপড়ি ছড়ানো।

বিছানায়ও একই রকম ভাবে লাল টকটকে গোলাপের পাপড়িগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

কে বা কারা এই কাজ করেছে জানি না আমি।

রাত্রে খাওয়া-দাওয়ার পর্ব শেষে মামাতো বোন কনা এবং চাচাতো লিমা এসেছিলো লাবণ্যকে নিয়ে।

সাথে ছিলো কাজীনের বউ লিপি ভাবি।

লাবণ্যকে খাটের একপাশে বসিয়ে ভাবি ওর কানে কানে কিছু একটা বলে।

মুহূর্তেই লজ্জায় রাঙা হয়ে যায় লাবণ্যর পুরো মুখ।

তারপর আমার দিকে তাকিয়ে একটা রহস্যজনক হাসি দিয়ে ননদদের সাথে নিয়ে চলে যান ওনি বাহিরে।

ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ালাম আমি।

যখন ফিরলাম তখনো লাবণ্য পূর্বের ন্যায় পা দুলিয়ে বিছানার একপাশে বসে।

প্রশ্ন করলাম, ‘কি ব্যাপার? সারারাত কি এভাবে বসে থাকার পন করে এসেছো নাকি?’

অনেকটা ঝাঁঝালো গলার প্রশ্নটা ছিলো। চটজলদি ছুটে আসলো সে আমার দিকে।

পা ছুঁয়ে সালাম করে নিলো। তারপর দুজনে মিলে একসাথে নামাজটা আদায় করে নিলাম।

বিয়ের মতো পবিত্র রাত্রিতেও অনেকগুলো তিক্ত কথা শুনিয়েছিলাম আমি লাবণ্যকে।

নিশ্চুপ লাবণ্য মাথা নিচু করে বসেছিলো শুধু।

নেহাৎ’ই পুরুষত্বের ডাকে সাড়া দিতে সে রাতে ওর সাথে মিলিত হই আমি।

স্থাপন করি শারীরিক সম্পর্ক।

‘দিনে পড়াশোনা+বাবা মায়ের দেখাশোনা,

একটুখানি গল্প গুজব,

কাজের বুয়ার সাথে হাতে হাতে রান্নার কাজে সাহায্য করা আর রাতে আলো নেভালে আমার শারীরিক চাহিদা মেটাতে ব্যস্ত হয়ে পড়া,

এগুলোই ছিলো ওর দৈনন্দিন রুটিনের তালিকায়।

‘ এর বাইরেও যে আলাদা একটা জীবন আছে, সেটা আমি ভাবতাম না। ভাবতে চাইতামও না।

আমি প্রায়ই লক্ষ্য করতাম, ‘মা আমায় কিছু একটা বলার জন্য আমার কাছে ছুটে আসতো, সময় চাইতো।

আমি মা’কে কোন পাত্তায় দিতাম না৷ এড়িয়ে যেতাম।

এমন ভাব করতাম যেন আমার কোন সময়ই নেই অফিসের কাজ ছাড়া অন্য কোথাও মন দেয়া।

ব্যর্থ মনোরথ নিয়ে মা আমার ফিরে যেতো নিজ রুমে।’

এভাবেই চলে যায় অনেকগুলো দিন, মাস, বছর।

ফোর্থ ইয়ারে উত্তীর্ণ হয় লাবণ্য। স্যারদের কঠোর নির্দেশ,

‘প্রথমদিকে নিয়মিতই ক্লাস করা চাই।’ লাবণ্যকেও তাই প্রত্যেহ ভার্সিটিতে যেতে হতো।

যথারীতি সেদিনও লাবণ্য ভার্সিটিতে যায়। ব্যবসায়ের কাজে আমাকে যেতে হয়েছিলো নরসিংদী।

ফেরার পথে একটা অদৃশ্য টানে লাবণ্যদের বাসায় গেলাম সবার সাথে দেখা করে আসার জন্য।

বিদায় নিয়ে চলে আসছিলাম। পথবেধে দাঁড়ায় লাবণ্যর ভাবি ‘হেনা’।

অনেকটা ভেঁজা গলায় বিশেষ দরকারের কথা বলে আমার কাছে তিনি একটু সময় চাইলেন।

সময় দিলাম। আমার ভাবনার আকাশে কালো মেঘ জমে সেদিনই হেনা ভাবির কথা শুনে।

ভেতরটা আমার ডুকরে কেঁদে ওঠে।

চোখে নামে অকাল শ্রাবণ।

আমার বিরুদ্ধে, লাবণ্যর সাথে এতকাল করে আসা অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে আমার মন।

আমি জানতাম না ঘটনার পরও ঘটনা থাকে, থাকে নাটকের ওপর নাটকীয়তা।

যেই লাবণ্যকে লোভী,

স্বস্তা অপবাদে এতকাল নিজের মনের থেকে দুরে সরে রেখেছিলাম,

সেই লাবণ্য যে এভাবে আমাকে আমার বিবেকের কাছে অপরাধী বানিয়ে দিবে,

কখনো ভাবিনি আমি।

চিৎকার করতে চেয়েও আমি পারছিলাম না। গলার ভেতর দলার ন্যায় কিছু একটা কুন্ডলী পাকিয়ে ছিলো।

তা সত্ত্বেও কান্না জড়ানো গলায় অনেকটা উঁচু স্বরে প্রশ্ন করি ভাবিকে, ‘

এতবড় সত্যিটা কেন আপনারা আমার থেকে গোপন রেখেছিলেন?

কেন আগে জানাননি? কেন? কেন? কেন?’ চলবে….

প্রত্যাখান_পর্ব(১২)

  1. #প্রত্যাখান_পর্ব(১২)
    লেখা- অনামিকা ইসলাম ‘অন্তরা’

বাব্বাহ! জামাই তো দেখি একদম তৈরি…
দাদার কন্ঠকে অনুসরণ করে পিছু ফিরলাম আমি।
কিন্তু একি! দাদার সাথে সাথে যে আরো কয়েক জোড়া চোখ পলকহীন দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে।
প্রশ্ন করলাম। বাবা-মা, কাকা-কাকীমা কিছু বলবে তোমরা?
জবাবে কারো মুখ থেকে কোন শব্দ বের হয়নি। তবে আমার মা এগিয়ে আসে রুমে আমার দিকে।
তারপর তিনি যেটা বলেন সেটা শুনে আমার পুরো শরীর শিহরণ দিয়ে ওঠে। সে স্থানেই থমকে দাঁড়ায় আমি। বাকরুদ্ধ হয়ে যাই। কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে ফেলি কথা বলার শক্তি। মা যেটা বললো সেটা ছিল আমার ভাবনারও অতীত।
অত্যন্ত ধীর এবং স্বাভাবিক গলায় আমার মা সেদিন আমায় জানিয়েছিলো, শুভ্র! এটা বিয়ে বাড়ি। বিয়ে বাড়িতে গ্রামের দূর দূরান্ত থেকে আগত মুরুব্বীয়ান থাকবে। তাই দয়া করে এখানে এমন কিছু করিস না যেটা দেখে লোকে আমাদের দিকে আঙ্গুল তুলতে পারে। আমাদের সম্মানহানি হয়।
লাবণ্যকে আমাদের অনেক পছন্দ। ওর শান্তশিষ্ট বিনয়ী স্বভাবের জন্য সুমনরাও অকে বেশ পছন্দ করেছে। প্রচন্ড চুপচাপ স্বভাবের সে। বয়স কম হলেও যেকোন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার বিশেষ ক্ষমতা আছে ও’র। সে গুনেই তোর দাদাও মুগ্ধ।
এমন মেয়েকে বিনা দ্বিধায় চোখ বোজে বিয়ে করা যায়। যেটা তুইও পারিস।

মায়ের শেষ কথা’য় আমার হৃদপিণ্ড কেঁপে ওঠল। স্নায়ুক্ষয়ী উত্তেজনায় ঘামতে লাগলাম আমি। কাঁপা স্বরে প্রশ্ন করলাম মা’কে, মাম্মমানে?
পুনঃবার স্বাভাবিক গলায় মায়ের জবাব, মানে লাবণ্যর বিয়েটা তোর সাথে হচ্ছে। মায়ের কথা শেষ হতে না হতেই পাশে রাখা চেয়ারে বসে পড়লাম আমি।
বাবা-দাদা, কাকা-কাকীমা, কাজিন এবং একমাত্র ছোটবোন আশা সবাই আমাকে বোঝাতে ব্যস্ত।
ওরা ঠিক কি বলেছে? কি বলে আমাকে শান্ত করার চেষ্টা করেছে? সেটা আমি জানি না। আমি জানি, আমার মাথাটা কেবল ঘুরছিল।
পরে যখন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরি তখন নিজেকে বিছানায় আবিষ্কার করি। যেখানে আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিলো অনেকগুলো মানুষ।
‘কেমন বোধ করছি?’ কোনরকমে এটা জেনেই ওরা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে আমাকে বিয়ের আসরে নেয়ার জন্য।
মা’কে বারংবার একটা কথা বলতে চেয়েও পারিনি বলতে। বিয়ের আসরে গিয়ে চেষ্টার কোন ভ্রুটি করিনি।
কিন্তু আমার মা! আমার কোন কথা শুনার আগ্রহ দেখাননি। ওনার একটাই কথা ছিলো, কথা যা বলার বাড়িতে গিয়ে বলিস। শুনবো আমি।

বুঝাতে ব্যর্থ আমি একটা সময় চুপ হয়ে যাই।
বিয়ে পরানো শেষ হয়। সামাজিক নানা রীতিনীতি শেষে বউ নিয়ে গাড়িতে গিয়ে বসি।
পাশাপাশি বসে দু’জন। কারো মুখেই কোন কথা নেই। অথচ ভেতরে আমাদের অজস্র কথাদের ভীড় জমেছিল।
গাড়ি চলছে তার আপন গতিতে। এসিযুক্ত গাড়িতে বসেও ঘামছি আমি ভিষণ।
দু’কান দিয়ে অগ্নির ন্যায় গরম হাওয়া বের হচ্ছিলো আমার। অনাকাঙ্খিত কিছু ঘটলে এরকমই হয় বুঝি….!

চলবে….

প্রত্যাখান_পর্ব(১১)

প্রত্যাখান_পর্ব(১১)

প্রত্যাখান_পর্ব(১১)

লেখা- অনামিকা ইসলাম ‘অন্তরা’

সে রাতে অজানা কারণে ঘুম চোখে আসেনি আমার। অবশ্য খাতির যত্নের কোন অন্ত ছিল না ওদের।

অনেকটা জামাই আদর বলা চলে। সকালে মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙ্গে।

হাতে একটা লুঙ্গি ধরিয়ে দিয়ে জানান দেন,

দ্রুত গোসল সেরে নাস্তার টেবিলে আয়।

মায়ের কথামতো সুবোধ বালকের ন্যায় চুপটি করে গোসলখানায় চলে গেলাম।

গোসলখানা থেকে ফিরে সোজা নাস্তার টেবিলে।

সকালেও আমাকে ঘিরে ওদের আপ্যায়নের শেষ ছিলো না।

এমনভাবে দৌঁড়াদৌঁড়ি করে আমাকে খাওয়াচ্ছিলো যেন আমি তাদের নতুন জামাই আর এটা আমার শ্বশুরবাড়ি।

কোথাও একটু কম পড়লেই বদনাম রটে যাবে।

ব্রেকফাস্ট শেষে যাচ্ছিলাম রুমের দিকে।

সম্মুখে এসে দাঁড়ায় বাবা।

হাতে ৩০হাজার টাকার মতো ধরিয়ে দিয়ে ধীর গলায় জানান,

সুমনরা মার্কেটে যাচ্ছে। তুমিও যাও। আর হ্যাঁ! আঁখিকেও সাথে করে নিও।

কিন্তু বাবা আমি….

পুরো কথা বলতে পারিনি। চটজলদি বাবার জবাব,

একে তো বিয়ে বাড়ি।

তারউপর তোমার এই বেশভূষা।

কিরকম দেখা যায় না ব্যাপারটা? বাবার কথায় লজ্জা পেলাম ভিষণ।

সত্যিই তো! আমি তো এখনো লুঙ্গি পরেই হাঁটাচলা করছি।

কথা বাড়ালাম না আর।

লুঙ্গি পাল্টে বাসা থেকে নিয়ে আসা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে নিলাম।

কাজিনদের সাথে নিয়ে বেরিয়ে পরলাম কেনাকাটার উদ্দেশ্যে…

. — সুমন! এসব কি কিনেছিস তুই? —

কি কিনলাম? — মায়ের জন্য শাড়ি ঠিক আছে।

কিন্তু এ লাল লেহেঙ্গা, চুড়ি কার জন্য কিনলি? —

সে তুই বুঝবি না। চুপ থাক। — ওহ, আচ্ছা! –(নিশ্চুপ সুমন) —

আতিক দেখি! তোর হাতে এসব কি? কিসব বক্সটক্স কিনে আনছিস!

— এগুলোতে কিছু স্বর্ণালংকার আছে। — মানে???

— মানে সুবর্ণ নাকি প্রফুল্ল! কি যেন নাম মেয়েটির?

ঐ যে কাকিমার বান্ধবীর মেয়ে হয়… — লাবণ্য!!!

— হ্যাঁ, লাবণ্য! কাকিমা এগুলো লাবণ্যর জন্য কিনেছে।

— উপহার? — কিছুটা সেরকমই।

— ওহ, আচ্ছা! গাড়ি থেকে নেমে বাড়িতে ঢুকতে না ঢুকতেই ঘটে যায় অনাকাঙ্খিত ঘটনা।

লাবণ্যকে গোসল করানো হচ্ছিলো উঠোনে। আমরা বাড়িতে ঢুকতেই শুরু হয়ে যায় পানি ছুড়াছুঁড়ি।

আমার কিছু বুঝে উঠার আগেই আমার হাত থেকে শপিং ব্যাপটা টান দিয়ে নিয়ে কাজিনরা দেয় ভোঁ দৌঁড়।

সে যাত্রায় ওরা রক্ষা পেলেও আমি পাইনি। কোথা থেকে যেন দু’তিনজন মহিলা বদনা ভর্তি পানি নিয়ে এসে ভিঁজিয়ে দেয় আমাকে।

একজন তো পুরো বালতি ভর্তি পানি এনে আমার মাথায় ঢেলে দেয়।

ভাগ্যিস! হাতে শপিং ব্যাগ ছিলো না।

থাকলে নির্ঘাত আমার সাথে সাথে সেগুলোরও নাজেহাল দশা হতো।

কাকভেঁজা আমি যখন রুমে প্রবেশ করি তখন আমাকে দেখে কাজিনরা হাসাহাসিতে মেতে ওঠে।

এ হাসি সে হাসি নয়। হাসতে হাসতে মাটিতে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয় ওদের।

কিচ্ছু বলিনি আমি। সদ্য কিনে আনা তোয়ালে এবং পাজামা-পাঞ্জাবি হাতে চলে যাই গোসলখানার দিকে।

ফিরে আসি মিনিট দশেক পর’ই।

সবাই কিরকম ‘থ’ হয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।

ওদের তাকানোর ধরন দেখে মনে হচ্ছিল আমি কোন ভিন গ্রহের প্রাণী ভুল করে ওদের গ্রহে চলে আসছি।

কিছু একটা বলতে যাবো তখনই পেছন থেকে বুড়ো দাদুর গলা ভেসে আসে।

বাব্বাহ! জামাই তো দেখি একদম তৈরি…

চলবে…

প্রত্যাখান_পর্ব(১০)

প্রত্যাখান_পর্ব(১০)

প্রত্যাখান_পর্ব(১০)

লেখা- অনামিকা ইসলাম ‘অন্তরা’

ঘোরের মধ্যে ডুবে গিয়েছিলাম আমি। ঘোর কাটে মহিলাদের হাসির আওয়াজে। আমাকে দেখে লাবণ্যর ভেঁজা শরীরটা হলুদের শাড়ি দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। প্রচন্ড এক লজ্জায় সে স্থান ছেড়ে চলে আসার সময় ধাক্কা খাই পিচ্চি এক মেয়ের সাথে। আমার দিকে শরবতের গ্লাস এগিয়ে দেয় সে। নিঃশব্দেে এক নিশ্বাসে গ্লাস পানিশূন্য করে ফেলি। আমাকে ঘিরে আবারো হাসিতে মেতে ওঠে কাজিন’রা। ওদের কর্মকাণ্ড যতই দেখছিলাম বেশ অবাক হচ্ছিলাম আমি। বুঝতে কষ্ট হচ্ছিল এত হাসির কারণ কি? সে স্থান ছেড়ে দ্রুত চলে যাওয়ার সময় দূর্ঘটনাবশত পা পিছলে পড়ে যাই মাটিতে। কিছুক্ষণ আগেই ঠিক এ স্থান থেকে লাবণ্যকে গোসল করে রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। শরীর কাদামাটিতে ভরে যায় আমার। এ এক বিশ্রী অবস্থা। খবর শুনে ছুটে আসে মা। জানান দেন, ‘দ্যাখ! বাড়ির উঠোনেই তেতুল গাছ। তার উপর আজ শনিবার। বিয়ে বাড়ি এটা। কি হতে কি হয়ে যায় তার কোন ইয়ত্তা নেই। তাই বলি কি গোসলটা করে নে বাবা! মায়ের অন্ধবিশ্বাস এবং সারা গায়ে লেপ্টে থাকা কাদা মাটির দরুন অগত্যা সে রাতে আমায় গোসলটা করতে হয়েছিল। গোসল করে পড়লাম আরেক মহা ঝামেলায়। আমার সাথে কোন জামা কাপড় ছিলো না গোসল শেষে যেটা পরে নিবো। এদিকে কেউ একজন আমায় কোথা থেকে জানি একটা লুঙ্গি, গামছা দিয়ে দৌঁড়ে পালিয়ে যায়। আল্লাহ! শেষে কি না আমায় লুঙ্গি পরে ঘুরতে হবে বিয়ে বাড়িতে! কি করবো! এ ছাড়া বিকল্প কোন রাস্তাও দেখতে পাচ্ছিলাম না কোন। একপ্রকার বাধ্য হয়ে লুঙ্গিটা তাই পরে নিতে হলো আমায়। পরনে লুঙ্গি আর শরীরে গামছা জড়িয়ে আমি যখন রুমে যাই তখন হাসাহাসির একটা রোল পড়ে যায় কাজিনদের মধ্যে। তাদের কথোকপথনগুলো এমন ছিল- রুবেলঃ- হাউ ফানি! আমাগো শুভ্র লুঙ্গি পড়েছে। আতিকঃ- কি কিউট লাগছেরে ভাই তোকে। একদম ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখার মতই… লিমাঃ- আতিক্যা দ্যাখ! শুভ্র’রে ট্যাগ কইরা ওর লুঙ্গি পরনে অবস্থায় ছবি দিয়েছিলাম। ৪মিনিটে ৩৯৮ রিয়েক্ট…. সুমনঃ- ভাই তুই লুঙ্গি পরছোস ভালা কথা৷ নিচে হাফপ্যান্ট পরছোস তো…! মানে বুঝস তো! একটা দূর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না। চেঁচিয়ে ওঠি আমি। চুপ হয়ে যায় সবাই। এরকম সময়ই দরজায় কড়া নাড়ে কেউ। লজ্জায় দ্রুত বারান্দার দিকে চলে যাই আমি। সোফা ওঠে দাঁড়ায় লিমা। এগিয়ে যায় দরজা’র দিকে। — আপু তুমি? (অবাক লিমা) — জ্বী, (লাজুক লাবণ্য) — আসো। রুমে আসো। — না মানে এ শার্ট আর প্যান্ট’টা দেয়ার ছিল ওনাকে। — শুভ্র বারান্দায়। তুমি যাও দিয়ে আসো… — আআআমি? — হ্যাঁ, যাও…. ভীরু পায়ে লাবণ্য এগিয়ে আসে বারান্দায় দাঁড়ানো আমার দিকে। পেছন থেকে ধীর গলায় ডেকে ওঠে আমায়, শুনছেন? একে তো লুঙ্গি পরনে তার উপর খালি গা। লজ্জায় প্রায় মরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। তথাপি তাকাতে হলো পেছনে। নিঃশব্দে হাতে রাখা প্যান্ট-শার্ট’টা আমার দিকে এগিয়ে দেয় লাবণ্য। মাথা নিচু রাখা অবস্থায় সেটা গ্রহন করে ‘জ্বী, আচ্ছা’ বললাম আমি। গা থেকে গামছা খুলে রাখলাম বারান্দায় রাখা চেয়ারে। শার্ট গায়ে দিতে যাবো ওমনি পিছু ফিরে তাকায় লাবণ্য। এগিয়ে আসে আমার দিকে। এবারো লজ্জায় মাটিতে মিশে যাওয়ার উপক্রম আমার। তা সত্ত্বেও প্রশ্ন করলাম, Any problem? লাবণ্য আমার দিকে গোসলখানায় ফেলে আসা মোবাইলটা এগিয়ে দেয়…. চলবে….

প্রত্যাখান_পর্ব(০৯)

প্রত্যাখান_পর্ব(০৯)

প্রত্যাখান_পর্ব(০৯)

লেখা- অনামিকা ইসলাম ‘অন্তরা

পরদিন মলিন মুখে বাবা আমার রুমে আমার পাশে এসে দাঁড়ায়। বিছানা থেকে ওঠে বসলাম আমি। উৎকন্ঠার সহিত প্রশ্ন করলাম, বাবা কিছু বলবে? পাশে বসে বাবা। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত স্বরে বলেন, তোর মা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে নরসিংদী। তৈরি হো। আমাদের এখনই একবার নরসিংদী যেতে হবে। বাবার কথা শুনে আমার অন্তরাত্মা শুকিয়ে এতটুকু হয়ে যায়। ওলট-পালট হয়ে যায় সবকিছু। ল্যাপটপে কাজ করছিলাম। সেটা রেখে দ্রুত ওঠে দাঁড়াই। বাবা তুমি কি বলছো এসব? মা অসুস্থ? আমি তো একটু আগেও মায়ের সাথে কথা বলেছি। তখন তো…. ‘শুভ্র! কথা না বাড়িয়ে দ্রুত তৈরি হয়ে নে। আমি আসছি।’ আমাকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বাবা রুম থেকে বের হয়ে যায়।

ফ্রেশ হয়ে দ্রুত ছুটলাম আলমারির দিকে। হাতের নাগালে পেলাম একটা পাঞ্জাবি। পরে নিলাম সেটাই। বাবা আমায় দেখে বিষম খায়। টিপ্পনী কাটে। ‘বাব্বাহ! একেবারে দেখছি নতুন জামাই সেজেছে আমার বাবা’টা!’
মেজাজ এমনিতেই চরমে। ঝাঁঝালো কন্ঠে জবাব দিলাম, বাবা! এটাও তোমার টিপ্পনী কাটার সময়? মা না অসুস্থ…. অসুস্থ….. ক্ষাণেক থেমে বাবা বলল, চল, চল। ওদেরকে নিয়ে আসি। বাবার পিছুপিছু বাবাকে অনুসরণ করে গাড়িতে গিয়ে বসলাম। কিন্তু একি! চাচা-চাচী, ফুপ্পি, দাদা আর কাজিনরা কি করছে এখানে? আমার কিছু বুঝে ওঠার আগেই লিমা, সুমন, রুবেল, আতিক চেপে বসলো আমার পাশে, আমার গাড়িতে। মিলিত স্বরে ওদের উচ্ছ্বাস, আমরাও যাচ্ছি প্রাণের নরসিংদী প্রাণের মানুষদের আনতে। ভেতরে ছ্যাৎ করে ওঠে আমার। তবে কি মা খুব বেশীই অসুস্থ? হে আল্লাহ!

একি হলো? কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম গাড়িতে বসেই।





গাড়ি স্টার্ট দেয় আতিক। এদিকে লিমা, সুমন, রুবেল আমায় বুঝাতে ব্যর্থ। সন্ধ্যার দিকে ও বাড়িতে গিয়ে পৌঁছলাম আমরা৷ কিন্তু একি!

এ বাড়িতে এত সাজসাজ আয়োজন কেন? অবশেষে মা’কে দেখেই কলিজা জুড়ালো আমার৷ কাজিনরা আমার মা’কে এমন আনন্দের সহিত এমনভাবে জড়িয়ে ধরেছে যেন ওরা অসুস্থ রোগী দেখতে নন, কোনো উৎসবে বেড়াতে এসেছে। চোখের জল মুছে মায়ের কাছে গেলাম আমি। সালাম দিয়ে কুশল বিনিময় করলাম।

কেমন আছো মা? কপালে চুমুর পরশ এঁকে দিয়ে হাসোজ্জল মুখে জানান দেয় মা, একটু আগেও ভালো ছিলাম না বাবা। আলহামদুলিল্লাহ! এখন খুব ভালো আছি। তোর বাবা আসেনি? আর ভাইয়া-ভাবি ওনারা আসেনি? পেছন থেকে বাবার জবাব- এইতো! আমরা এখানে, শুভ্র’র মা৷ পরে মায়ের থেকে জানতে পারলাম, বিয়ে ভেঙ্গে যাওয়ার পর পুরো পরিবার মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলো। ওদের সেই মানসিক অবস্থা থেকে উত্তরণে সাহায্য করে আমার মা৷ মা তাঁর উপস্থিত বুদ্ধির জুড়ে ওনার পরিচিত এক যুবকের সহিত লাবন্যর অন্যত্র বিয়ের ব্যবস্থা করে রাতেই৷ আমাদের সে বিয়ে খাওয়ার জন্যই এভাবে নিয়ে আসা। মায়ের প্রতি প্রচন্ড রাগ হচ্ছিল আমার। মানলাম স্বাভাবিক ভাবে বললে ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে আসতে চাইতাম না৷ তাই বলে এভাবে…..! বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের সাথে আমার মা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। ওদের সাথে এমনভাবে দৌঁড়ে দৌঁড়ে কাজ করছে যেন তিনি এ বাড়ির’ই পুরনো সদস্য। লক্ষ্য করলাম, বোন আমার লাবণ্যর কাজিনদের সাথে হৈ-হুল্লোড় আর আনন্দ উল্লাসে মেতে ওঠেছে। আরো লক্ষ্যনীয় যে, ওদের সমস্ত আনন্দ আর উল্লাস সবই যেন আমাকে ঘিরে। কতেক মেয়েরা তো আড়চোখে আমাকে দেখছে আর হাসছে। আমার কাজিনদের অবস্থা তো আরো খারাপ৷ হাসতে হাসতে লাবণ্যর কাজিনদের ওপর পড়ে যাওয়ার অবস্থা। বাড়ির বয়স্ক মহিলাদের খাতিরের অন্ত নেই আমাকে ঘিরে। লাবণ্যদের সদ্য নির্মিত বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। কোথা থেকে যেন একটা মহিলা এসে আমার গালে হলুদ মাখিয়ে দৌঁড় দেয়। মহিলাকে অনুসরণ করে পেছনের দিকে তাকাতেই আমার চোখ স্থির হয়ে যায় একদিকে। কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে ফেলি নিজের বোধ শক্তিকে…… চলবে…

প্রত্যাখান_পর্ব(০৮)

প্রত্যাখান_পর্ব(০৮)

প্রত্যাখান_পর্ব(০৮)

লেখা- অনামিকা ইসলাম ‘অন্তরা

লাবণ্যর সাথে আমার সমস্ত বাঁধন ছিন্ন হয়ে যায়। ভেবেছিলাম ব্যাপারটা এখানেই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু নাহ! ঘটনার ওপর ঘটনা থাকে৷ থাকে নাটকের ওপর নাটকীয়তা। লাবণ্যর বিয়ে ঠিক হয় জনৈক ভদ্রলোক তথা ঐ দুই সন্তানের জনকের সাথে। বিয়ের দাওয়াত দিতে আসে স্বয়ং লাবণ্যর বাবা। লাবণ্যকে ভিষণ ভালোবাসতো মা। তারউপর মায়ের দূরসম্পর্কের বোন ছিলো লাবণ্যর মা। আর সে টানেই হয়তো বা বিয়ের দাওয়াতটা সানন্দে গ্রহন করে নেন তিনি। লাবণ্যকে পুত্রবধূ করে আনার প্রবল ইচ্ছেটা ভেতরে ধামাচাপা দিয়ে আশা বোনটিকে সাথে নিয়ে নির্ধারিত দিনের দু’দিন আগেই মা নরসিংদী পৌঁছে। ঘনিয়ে আসে কাঙ্খিত দিন। নির্ধারিত দিনের চেয়ে একটু দেরীতে বরপক্ষ আসে। যেখানে মেহমান আসার কথা ছিল একশো, সেখানে হাতা গুনা মাত্র ১৫,২০জন লোক নিয়ে ওরা হাজির হয়। পাত্রের মুখখানা অমাবস্যার অন্ধকারের ন্যায় কালো ছিল। দেখে মনে হচ্ছিলো, কেউ যেন তাকে বন্দুকের মুখে বিয়ে পরানোর জন্য নিয়ে এসেছে। বিয়ে পরানোর তাড়াটা ওদের এতটাই জরুরী ছিলো যে, প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে, মুখে কিছু না দিয়ে বিয়ে পরাতে মরিয়া হয়ে ওঠে ওরা। এ নিয়ে কানাঘুষা শুরু হয় এলাকার মানুষজনদের মধ্যে। সেটা দেখে স্বয়ং লাবণ্যর চাচা ঘোষনা দেন, আপনারা আগে কিছু মুখে দিবেন তারপর বিয়ে। ওরা সে বুঝ মানতে নারাজ। ভাবখানা এমন যেন পারলে মেয়েকে ধরে নিয়ে যায়। কনে পক্ষের মেয়েদের তীব্র প্রতিবাদ, আমাদের মেয়েদের সাজ এখনো কমপ্লিট হয়নি। আর সে সাজ কমপ্লিট হওয়ার আগে কোন বিয়ে নয়। দাঁতে দাঁত চেপে মিনিট ত্রিশেক অপেক্ষা করে বরপক্ষ। রুমাল দিয়ে মুখ ঢেকে বসে থাকা স্বয়ং বর মশাই এবার ওঠে দাঁড়ায় চরম উত্তেজিত অবস্থায়। সু্যোগের আশায় ঘাপটি মেরে বসে থাকা লাবণ্যর ভাবি পর্দার আড়াল থেকে মুখ বের করে জানান দেয়, কোথায় এরকম নয়তো ওনারা ফেসে যাচ্ছেন কোথাও? হেনার কথায় গর্জে ওঠে বর। উত্তেজিত গলায় জানায়, হ্যাঁ, ফেসে গেছি আমরা। প্রথম বিয়ে ছাড়াও আমি আরো একটা বিয়ে করেছিলাম। ডিভোর্স হয়নি আমাদের। ঐ পক্ষেরও ২মেয়ে আছে আমার। বিয়ে করার আগে প্রথমা স্ত্রীর যে অনুমতিটা নিতে হয় সেটা নেয়ার প্রয়োজন মনে করিনি আমি। আমার নামে তাই থানায় মামলা দায়ের করেছে আমার স্ত্রী। বিষয়টা এখানে আসার মিনিট ত্রিশেক আগেই আমরা পাই। তা সত্ত্বেও আপনাদের মেয়ের কথা ভেবে আমি বিয়ে করতে এসেছি। তবে আর নয়৷ এই মুহূর্তে আমার নিজের জীবন বাঁচানোটাই শ্রেয়। কেননা, আমরা খবর পেয়েছি যেকোন মুহূর্তে আইনের লোক এখানে চলে আসতে পারে। ঘটনার আকস্মিকতায় চমকে যায় সবাই। বসা থেকে ওঠে দাঁড়ায় আগত মুরুব্বীয়ান। হৈ-হুল্লোড় পড়ে যায় এলাকায়। অফিসে বসে বোর হচ্ছিলাম আমি। ভালো লাগছিলো না একদম৷ অস্থির অস্থির লাগছিলো ভেতরে। কল দিলাম বোন আশাকে। জানি না বোন আমার সে কল সজ্ঞানে রিসিভ করেছে কি না। করলেও কথা কেন বলছিলো না। লাউডস্পিকার বাড়াতে গিয়ে টের পাই ওপাশে বিশাল হট্টগোল চলছে। মিনিট খানেকের জন্য সাক্ষী হই একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতির। পরে কলটা কেটে যায়। এদিকে অস্থিরতায় আমার পুরো শরীর ঘামছিল। কলের ওপর কল দিতে থাকি। ঘন্টা খানেক পর বোন আমার কল রিসিভ করে জানায়, লাবণ্যর বিয়েটা ভেঙ্গে গেছে। বিয়ের আসর থেকে পুলিশ পাত্র এবং তার তিন বাবা চাচাকে সাথে ঐ জনৈকা ভদ্রমহিলা তথা ফুপ্পিকে ধরে নিয়ে যায় থানায়। কিছু সময়ের ব্যাপারে প্রাণচঞ্চল বাড়িটা নিরব, নিস্তব্ধ পরিবেশে রূপ নেয়। লাবণ্যর মা ঘন ঘন মূর্ছা যাচ্ছিল। অসুস্থ ভাই আরো অসুস্থ হয়ে পড়ে। বাবা করে স্ট্রোক। চলবে….

প্রত্যাখান_পর্ব(০৭)

প্রত্যাখান_পর্ব(০৭)

প্রত্যাখান_পর্ব(০৭)

লেখা- অনামিকা ইসলাম ‘অন্তরা

কৌতূহলী মন বারংবার জানতে চাচ্ছিলো ভদ্রমহিলা কোন সে বিয়ের ইঙ্গিত দিলো? সত্যিই কি তাহলে আগে লাবণ্যর বিয়ে হয়েছিলো? কিংবা বিয়েটা যদি হয়েও থাকে তাহলে সেটা তো আমাদের জানার কথা। বিশেষ করে আমার মায়ের তো এ বিষয়ে জানাটা জরুরী ছিল। তবে কি ওরা বিষয়টাকে ধামাচাপা দিয়ে মেয়ের বিয়ে দিতে চেয়েছিলো? উফ, নাহ! আর ভাবতে পারছি না৷ এরকমভাবে ওরা আমাদের ঠকাতে চাইবে এটা যে কল্পনারও অতীত। মনের অদম্য কৌতূহল মেটাতে লাবণ্যদের সদ্য নির্মিত রুমটাতে ঢুকলাম। লাবণ্য তখন চুপটি করে জানালার গ্রিল ধরে বাহিরের পানে তাকিয়ে। আমার আওয়াজে ওর সে দৃষ্টির ব্যাঘাত ঘটে৷ পিছু ফিরে তাকায় লাবণ্য। অতঃপর পুনঃবার দৃষ্টি নিয়ে যায় বাহিরে। নিঃশব্দে লাবন্যর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম আমি। প্রশ্নটা করার কথা ভাবতেই ভেতরে কম্পনের সৃষ্টি হয় আমার। তথাপি মিটিয়েই ফেললাম অদম্য সে কৌতূহল। প্রশ্ন করলাম, লাবণ্য তুমি বিবাহিতা? লাবণ্যর ছোট্ট জবাব, হ্যাঁ! ডিভোর্সি। আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ার উপক্রম৷ উলট-পালট হয়ে যায় ভেতরে। দৃষ্টি ক্ষীণ হয়ে আসে। চোখে ঝাপসা দেখা শুরু করি। চোখ থেকে অনবরত অশ্রুজল গড়িয়ে পড়তে থাকে নিচে। চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ হয়ে এলে জীবনের রঙ জলের মতোই হয় বুঝি? জানি না এরপর লাবণ্য আর কোন কথা বলেছিলো কি না! আর বললেও ঠিক কি বলেছিলো?! শুধু এটুকু জানি- ঝাপসা দৃষ্টি নিয়ে আমি তখনই সেখান থেকে বেরিয়ে আসি। লাবণ্যর বাবা-মা, ভাই-ভাবির থেকে বিদায় নিয়ে ঢাকায় নিজ বাসায় চলে আসি। রাতে ঘুম হচ্ছিলো না। অচেনা এক কষ্ট ভেতরটাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিলো। আমি সইতেও পারছিলাম না, কারো সাথে শেয়ার করতেও পারছিলাম না। সেদিনের পর থেকে কেন জানি না নিজেকে, নিজের অনুভূতিগুলোকে অসুস্থ মনে হতে লাগলো। ঘৃণা হচ্ছিলো, বড্ড ঘৃণা হচ্ছিলো নিজের প্রতি। প্রতিবারই মানুষ চিনতে ভুল করি আমি। মিতুর থেকে ঠক-প্রবঞ্চনায় কোন অংশে কম ছিল না লাবণ্য। বরং একটু বেশীই এগিয়ে ছিলো সে। এমনভাবে কেউ কাউকে ঠকাতে পারে সেটা লাবণ্যর সাথে পরিচয় না হলে আমি বোধ হয় জানতেই পারতাম না। দিন দিন অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছিলাম আমি। প্রথম প্রেমের দুঃখজনক পরিণতির পরও ভালোবেসেছিলাম লাবণ্যকে। কষ্ট হচ্ছিল যার মায়ায় জড়িয়ে নিজেকে পুনঃবার গুছিয়ে নিতে চেয়েছিলাম সেই লাবণ্য আমায় চরমভাবে ফাঁকি দিলো! হে বিধাতা! বলে দাও তুমি। আমি কাকে বিশ্বাস করবো? চার দেয়ালের ভেতরের ঐ চিৎকার আমার কাছেই ফিরে আসে প্রতিধ্বনিত হয়ে। নিজেকে বড্ড অসহায় মনে হচ্ছিলো। এরকমই মুহূর্তে এক বিকেলে কল করে লাবণ্য। নাম্বারটা খেয়াল না করেই রিসিভ করি কল। ওপাশ থেকে ভেসে আসে সুমিষ্ট কন্ঠস্বর, আসসালামু আলাইকুম। শরীরে আগুন ধরে যায় আমার। প্রচন্ড এক অভিমানে সালাম না দিয়েই কলটা কেটে দেই। শুরু হয় লাবণ্যর একের পর এক কল দেয়া৷ এক সন্ধ্যায় বিরক্ত হয়ে লাবণ্যর কলটা রিসিভ করেই বসি। সালাম দেয় লাবণ্য। জবাব না দিয়ে অনর্গল কথা বলা শুরু করি। এক নিশ্বাসে অনেকগুলো তিক্ত কথা শুনিয়ে দেই লাবণ্যকে। কথাগুলো শুনার পরও ফোনের ওপাশে মিনিট পাঁচেক চুপ করে ছিলো লাবণ্য। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কলটা কেটে দেয়। চলবে…

প্রত্যাখান_পর্ব(০৬)

প্রত্যাখান_পর্ব(০৬)

প্রত্যাখান_পর্ব(০৬)

লেখা- অনামিকা ইসলাম ‘অন্তরা

লাবণ্যদের পরিবারে লাবণ্যর বাবা ছাড়াও ছিল ওর একমাত্র ভাই লাবিব। বয়সে লাবিব লাবণ্যর থেকে বছর সাতেকের বড়। একটা সময় এই লাবিবই ছিল লাবণ্যদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বছর চারেক আগে হুট করে লাবিব পঙ্গু হয়ে যায়। সেই থেকে সে বিছানায় পড়ে। লাবণ্যর বাবার অনুরোধে আমাকে তাই সেদিন থেকে যেতে হলো। বাজার সওদা থেকে শুরু করে পরদিন পাত্রপক্ষের সামনে খাবার উপস্থাপন। সমস্তই আমাকে করতে হয়েছে। অবশ্য আমাকে হাতে হাতে সাহায্য করার জন্য পাশে ছিল লাবণ্যর সমবয়সী ২কাজিন। পরদিন যথাসময়ে লাবণ্যর ডাক পড়ল। অতিকায় সাধারণ বেশভূষায় লাবণ্য হাজির হয় পাত্রপক্ষের সামনে। ঘোমটার আড়ালের ঐ মায়াবী মুখটা দেখে জানি না কেন সেদিন আমার ভেতরটা কেঁপে ওঠেছিল। নামাজ সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রশ্ন করে, হেঁটে হাঁটিয়ে বিভিন্ন কায়দায় মুরুব্বীরা লাবণ্যকে দেখে নেয়। লাবণ্যও কিরকম বাধ্য বালিকার ন্যায় নিরবে ওদের সব প্রশ্নের যথাযথ সম্মান প্রদর্শন পূর্বক উত্তর দিয়ে যায়। সবশেষে লাবণ্যকে পছন্দের কথা জানান দিয়ে ওরা বিদায় নেয়। পাত্রপক্ষ চলে গেলে উঠোনে পুরো বাড়ির মানুষজন জড়ো হয়। সবার মুখেই এক কথা। ‘ছেলে দেখতে শুনতে ভালো। অর্থ সম্পদও ঢেড় আছে। আর কি লাগে? দিয়ে দেন বিয়ে।’ বাধ সাধল লাবণ্যর ভাবি হেনা। ‘নাহ! একটা বিবাহিত পুরুষের কাছে আমরা আমাদের মেয়ে বিয়ে দেবো না। আর যায় হোক এত বড় অন্যায়টা আমরা ওর সাথে করতে পারি না। হেনা তথা লাবণ্যর ভাবির সাথে তাল মেলায় লাবণ্যর মা৷ হ্যাঁ, হেনা ঠিকই বলেছে। এ বিয়েতে আমারও মত নেই। লাবণ্যর ভাবির কথা শুনে চমকিত নয়নে ফিরে তাকালাম আমি লাবণ্যর বাবার দিকে। আমার শুনা যদি ভুল না হয় তবে ছেলে বিবাহিত। একটা বিবাহিত ছেলের সাথে জেনে শুনে ওরা কেন ওদের অবিবাহিতা মেয়ের বিয়ে দিবে! প্রশ্নটা করেছিলাম আমি। উত্তরটা পাইনি তার আগেই ভেসে আসে হেনা ভাবির উত্তেজিত গলা, শুধু বিবাহিত নন, দুই বাচ্চার বাবাও। ‘কিহ? দুই বাচ্চার বাবা?’ এবার আমি অবাকের চূড়ান্ত সীমায়। একটা অল্পবয়স্কা বাচ্চা মেয়ে, যাকে দেখলে সবাই নবম দশম শ্রেণীর ছাত্রী মনে করে ভুল করবে, তাকে কি না একটা বয়স্ক বিবাহিত পুরুষের সাথে বিয়ে দেয়া হচ্ছে! তাও দু’সন্তানের জনকের সাথে!!! ব্যাপারটা হজম করতে কষ্ট হচ্ছিল আমার। সর্বসম্মুখেই তাই উঁচু গলায় বলে ওঠি, এ আপনারা কি করছেন? ফুলের মতো নিষ্পাপ মেয়ের জীবনটা আপনারা নিজ হাতে ধরে এভাবে শেষ করে…. পুরো কথা বলতে পারিনি আমি৷ তার আগেই অপরিচিত মহিলাটি তিরস্কারের ছলে বলে ওঠে, হাঃ হাঃ! বিয়ে দিবে না!! কি আমার দুধে ধুয়া তুলসি পাতা। পালঙ্কে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াবে তাকে লোকে!!! লাবণ্যর ভাবির মুখোমুখি প্রতিবাদ, আন্টি! পালঙ্কে নাকি সোফায় বসে খাওয়াবো সেটা একান্তই আমাদের ব্যাপার। আর কি যেন বলছেন? দুধে ধুয়া তুলসি পাতা৷ যেটা একবারও দাবি করিনি আমি যদিও আপনি কয়েক ঘন্টায় আপনার ভাইপোর শতেকটা সুনাম করে ফেলেছেন যেটা আদৌ ওনার পক্ষে যায় কি না সন্দেহ। আমি শুধু এটাই বলেছি, এটা হয় না। হতে পারে না। এ ঘোর অন্যায়। আর তুমি সেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে এসেছ, তাই না? হাঃ হাঃ। মেয়ে বিবাহিত সেটা জানা সত্ত্বেও আমি আমার ভাইপোকে নিয়ে আসছিলাম। কোথায় তোমরা নত হয়ে মেয়ে বিয়ে দিবে, তা নয়। তা না করে বিয়ে ভাঙার জন্য কোমড় বেধে লেগেছ। শুনো তবে! আজ যদি তোমরা বিয়ে হবে না বলে জানিয়ে দাও, আগামীকাল ঠিক এসময় আমি আমার ভাইপোর বউ নিয়ে বাড়ি যাবো। ‘কিহ! লাবণ্যর আগে বিয়ে হয়েছে?’ আনমনে নিজে নিজেকে প্রশ্নটা করে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ফিরে তাকালাম মধ্যবয়স্কা মহিলার দিকে। মহিলা তখনো হেনা ভাবির সাথে তর্কে লিপ্ত। ভিড় ঠেলে সেখানে উপস্থিত হয় স্বয়ং লাবণ্য। আন্টি! আপনি চুপ করুন। আর ভাবি?!!! তুমি এ শরীর নিয়ে এখানে কেন আসছো? যাও, রুমে যাও। মা! চিন্তা করো না। আমি ঠিক মানিয়ে নিতে পারবো। বাবা! আপনি ওদের জানিয়ে দিন আমি রাজি। কথাগুলো বলে দ্রুতপায়ে রুমে চলে যায় লাবণ্য। আলোচনা তখনকার মতো সমাপ্তি ঘোষনা করা হয়। সবাই যে যার মতো চলে যায়। নির্বাক আমি হা করে তখনো সে স্থানে দাঁড়িয়ে…. চলবে…