নীরবে_ভালোবাসি পার্ট: ৩০/অন্তিমপর্ব

নীরবে_ভালোবাসি

পার্ট: ৩০/অন্তিমপর্ব

লেখিকা: সুলতানা তমা

কয়েক মাস পর…

মেঘের ছবিটার দিকে তাকিয়ে আছি অপলক দৃষ্টিতে। মধ্যে কেটে গেছে কয়েকটা মাস, মেঘ হয়তো নিজেকে বদলে নিয়েছে অনেক। জানিনা মেঘ কোথায় আছে আমাকে এখনো ভালোবাসে কিনা। আজ তোহাকে খুব মনে পড়ছে একটাবার ওকে বুকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে হচ্ছে খুব। মেঘ’কে খুব দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে, জানতে ইচ্ছে হচ্ছে ও কি আমাকে এখনো ভালোবাসে নাকি চোখের আড়াল হতেই ভুলে গেছে কণা নামের এই পাগলীটাকে। মেঘ হয়তো ভাবছে আমি কানাডায় আছি আর নতুন কাউকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছি, মেঘ তো আর জানেনা আমি যে আজ ওর সন্তানের মা হতে যাচ্ছি। আজ আমার ডেলিভারির ডেইট সন্ধ্যায় সিজার করা হবে, এইতো আর দু একঘণ্টা পর হসপিটালে এডমিট হয়ে যাবো। আজ আমার বড্ড ভয় হচ্ছে শুধু মনে হচ্ছে আমার যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে আমার বেবির কি হবে। আজ মেঘ’কে পাশে পেতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে, মনে হচ্ছে আজ মেঘ আমার পাশে থাকলে আমার হাতটা ওর দুহাতের মুঠোয় পুরে রাখলে বুঝি আমি অনেক বেশি সাহস পেতাম, প্রত্যেকটা নারীই বোধহয় এই সময় নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে পাশে পেতে চায়। মেঘ আসবে কিভাবে ও যে জানেই না আমি ওর সন্তানের মা হবো আজ। ইচ্ছে হচ্ছে আম্মুকে একবার বলি মেঘ’কে জানাতে কিন্তু ভয়ও হচ্ছে কারণ আজ চাচ্চু আর চাঁচিআম্মা আসছেন। চাচ্চু যদি রেগে যান তা…
জোহা: আপু এই আপু.. (জোহা আসছে শুনে তাড়াতাড়ি চোখের পানি মুছে নিলাম, মেঘের ছবির সামনে থেকে সরে এসে বিছানায় বসলাম)
জোহা: আব্বুরা চলে এসেছেন নিচে যাবে?
আমি: নারে ভালো লাগছে না।
জোহা: আপু তুমি কাঁদছিলে?
আমি: কই নাতো।
জোহা: তোমাকে কতোবার বলবো এই অবস্থায় হাসিখুশি থাকবে একদম মন খারাপ করবে না। (মৃদু হাসলাম, কিভাবে বুঝাই ওদের আজ যে মেঘ’কে খুব দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে)
জোহা: আসছি আমি, একা একা একদম সিঁড়ি বেয়ে নিচে আসতে যেওনা কিছু প্রয়োজন হলে আমাকে ডেকো।
আমি: ঠিক আছে।
জোহা চলে গেল। এই কয়েকমাস জোহা আর আম্মু আমাকে আগলে রেখেছেন। জোহা তো আমাকে একদম মন খারাপ করতে দেয়নি সারাক্ষণ এইটা ওইটা করে আমাকে হাসিখুশিতে মাতিয়ে রেখেছে। আর আম্মু তো সারাক্ষণ আমি কি খেলে ভালো হবে কোন খাবারটা খেলে বেবি ভালো থাকবে এসব নিয়েই পরে থাকতো। সত্যি এমন পরিবার পাওয়া সবার ভাগ্যে জোটে না, আমি সত্যিই খুব ভাগ্যবতী।

জানালার কাছে দাঁড়িয়ে আনমনে হয়ে বিকেলের আকাশ দেখছি, আর মাত্র কয়েক ঘন্টা বাকি একটু পর হসপিটালে চলে যেতে হবে। কেন যেন মনে হচ্ছে আজ আমার কিছু একটা হয়ে যেতে পারে, প্রত্যেক মেয়েরই বোধহয় এই সময় এমনটা মনে হয়। আচ্ছা সত্যি যদি আজ আমার কিছু হয়ে যায় তাহলে তো মেঘ’কে শেষ দেখাটুকুও দেখতে পারবো না, তোহাকে শেষবারের মতো বুকে জড়িয়ে নিতে পারবো না, তোহার মুখে নতুন আম্মু ডাকটাও আর শুনা হবেনা।
আস্তে আস্তে টেবিলের পাশে এসে চেয়ারটা টেনে বসলাম। ডায়েরীর একটা পাতা ছিঁড়ে ছোট একটা চিরকুট লিখতে বসলাম। “মেঘ তুমি হয়তো ভাবছ আমি কানাডা গিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করেছি কিন্তু না মেঘ তুমি তো জানোনা আজ আমি তোমার সন্তানের মা হতে যাচ্ছি। কোথায় যেন শুনেছিলাম প্রেগন্যান্ট অবস্থায় সবসময় যাকে দেখবে বেবি ঠিক তারমতো হবে, জানো মেঘ আমি সবসময় তোমার ছবিটার দিকে তাকিয়ে তাকতাম যেন বেবিটা দেখতে ঠিক তোমার মতো হয়। জানিনা এসব কথা সত্যি কিনা তবুও নিজের অজান্তেই এমন পাগলামি করতাম। সবসময় চেয়েছি আমার যেন আরেকটা তোহা হয় মানে মেয়ে বেবি যেন হয়। আজ সেই খুশির দিন যে দিনটার জন্য প্রত্যেক নারী অপেক্ষা করে। আজ খুব ভয় হচ্ছে মেঘ তোমাকে পাশে পেতে ইচ্ছে হচ্ছে কিন্তু তাতো সম্ভব নয়, আমার যদি কিছু হয়ে যায় আমার তোহা আর দোহা’কে তুমি দেখে রেখো। ওহ হ্যাঁ বলতে ভুলে গেছি আমার মেয়ে বেবি হলে দোহা নাম রেখো তোহার বোন তো নাম মিলিয়ে না রাখলে হয় বলো? আম্মুকে বলে যাবো আমার কিছু হলে যেন এই চিঠিটা আর বেবি তোমাকে দিয়ে দেয়। আমায় ক্ষমা করে দিও মেঘ তোমার থেকে দূরে থাকতে চাইনি পরিস্থিতি আমাকে বাধ্য করেছিল। ভেবো না দূরে আছি বলে তোমায় ভুলে গেছি, ভুলিনি মেঘ তোমায় এক মুহূর্তের জন্যও। যেমনটা আগে ভালোবাসতাম তোমায় এখনো ঠিক তেমনি ভালোবাসি শুধু এখন আর আগের মতো প্রকাশ করতে পারিনা নীরবে ভালোবাসি তোমায়”

চাঁচি: জোহা কণাকে সাবধানে নিয়ে আয়।
আমি: আরে আমি একাই যেতে পারবো।
চাঁচি: একদম চুপ বোকা মেয়ে এসময় কেউ একা চলাফেরা করে? (ওদের পাগলামি দেখে খুব হাসি পাচ্ছে বাসা থেকে বের হয়ে একা নাকি গাড়িতে উঠতে পারবো না)
আম্মু: কণা সাবধানে।
আমি: হুম।
চাচ্চু: কিরে কণা তুই কি আমার উপর রেগে আছিস? (গাড়িতে উঠে বসতেই চাচ্চুর এমন প্রশ্ন শুনে বোকা হয়ে গেলাম)
আমি: কেন চাচ্চু রাগ করবো কেন?
চাচ্চু: আমার সাথে কথা বলছিস না যে।
চাঁচি: এখন কি মেয়ের বকবক করতে ইচ্ছে হবে তুমিও না।
চাচ্চু: মা আমি যা করেছিলাম তোর ভালোর জন্যই করেছিলাম।
আমি: জানি চাচ্চু, আর তোমাদের কারো উপর আমার কোনো রাগ নেই। তোমরাই তো আমার সবকিছু আপন মানুষের উপর কি রাগ করা যায়?
চাচ্চু: এইতো লক্ষী মেয়ে।

গাড়ির গ্লাস নামিয়ে দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি, গাড়ি চলছে হসপিটালের দিকে। যদিও জানি এই রাস্তা দিয়ে মেঘ কখনো আসবে না তবুও অবচেতন মন রাস্তার চারপাশে শুধু মেঘ’কে খুঁজছে। শুধু একটা বার আজ মেঘ’কে খুব দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে। আজ সবাই যেভাবে আমাকে নিয়ে পাগলামি করছে ভাবছে কিসে ভালো হবে আমার, মেঘ পাশে থাকলে হয়তো এভাবেই পাগলামি করতো।

একটু পর নাকি আমাকে অটি’তে নেওয়া হবে, চুপচাপ বসে চাচ্চুর এইটার জন্য ওইটার জন্য দৌড়াদৌড়ি দেখছি আর ভাবছি সবাই আমাকে কতো ভালোবাসে।
আম্মু: কিরে মন খারাপ কেন?
আমি: নাতো আম্মু।
আম্মু: ভয় পাচ্ছিস তোর চোখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে, পাগলী মেয়ে ভয় কিসের আমরা সবাই আছিতো তোর পাশে।
আমি: একজন মানুষের শূন্যতা সবার পাশে থাকার আনন্দটাকে ফিকে করে দিচ্ছে।
আম্মু: কার? (আনমনে কি বলে ফেললাম আম্মুতো আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে)
আমি: কিছুনাতো আম্মু। এক গ্লাস পানি দিবে বড্ড তৃষ্ণা পেয়েছে।
আম্মু: দাঁড়া নিয়ে আসছি।

দুজন নার্স এসেছে আমাকে অটি’তে নিয়ে যাওয়ার জন্য, এটাই সুযোগ আম্মুর হাতে চিঠিটা দেওয়ার। আম্মু আমার পাশেই দাঁড়ানো, আম্মুর হাতে চিঠিটা গুঁজে দিলাম। আম্মু আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন দেখে মৃদু হাসলাম।
আমি: জানো আম্মু প্রত্যেক নারী এই সময়টায় নিজের স্বামীকে পাশে পেতে চায় আমারো ইচ্ছে হচ্ছে মেঘ’কে একবার দেখতে কিন্তু কি করবো বলো আমার যে এই ভাগ্য নেই। আজ মেঘ এখানে থাকলে হয়তো আমার হাতে চুমু খেয়ে বলতো “ভয় পেয়ো না পাগলী আমি আছিতো” জানো আম্মু এই একটা কথা আজ খুব মিস করছি, হয়তো এই কথাটা আমার মনে অনেক বেশি সাহস যুগিয়ে দিতো। চিঠিটা তুমি খুলো না, যদি আমার কিছু হয়ে যায় আর বেবিটা বেঁচে থাকে তাহলে এই চিঠি আর বেবি মেঘ’কে দিয়ে দিও। তোহা সবসময় আমার কাছে একটা পুঁচকে পুতুল চাইতো, মায়ের ভালোবাসা তো দিতে পারিনি মেয়েটাকে পুঁচকে পুতুলটাই নাহয় দিয়ে দিও ওকে। (আম্মুর দুচোখ বেয়ে পানি ঝরছে, এখনো আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। নার্সরা আমাকে নিয়ে যাচ্ছে আর আমি আম্মুর মায়াবী মুখটার দিকে তাকিয়ে আছি)

দুচোখ মেলে যখন তাকালাম চারপাশ কেমন যেন ঝাপসা ঝাপসা লাগলো, অক্সিজেন মাস্ক মুখে লাগানো হাতে কিসব লাগানো সাথে পেটে খুব ব্যথা অনুভব হচ্ছে। সামনের দেয়ালে রাখা দেয়াল ঘড়ির দিকে চোখ পড়লো বারোটা পঁয়তাল্লিশ মিনিট বাজে। সন্ধ্যায় সিজার হবার কথা ছিল তারমানে মধ্যে কেটে গেছে কয়েক ঘন্টা, আমি খুব ভয় পাচ্ছিলাম বলে ডক্টর আমার শরীরে একটা ইনজেকশন পোষ করেছিল ব্যাস আর কিছু মনে নেই। মিটমিট করে রুমের চারদিকে চোখ বোলাচ্ছি হঠাৎ রুমের এক কোণে আমার চোখ আটকে গেল, মেঘ মোনাজাতে দুহাত বাড়িয়ে পাগলের মতো কাঁদছে। মেঘের পাশেই তোহা বসে আছে তোহার কোলে ছোট বেবি, তোহা আর বেবিকে পপি দুহাত দিয়ে আগলে রেখেছে। জ্ঞান ফেরার পর এমন সারপ্রাইজ পাবো আমিতো ভাবিইনি। হুট করে জোহা রুমে এসে ঢুকলো হাতে কিছু ওষুধ আর ইনজেকশন, আমাকে মেঘের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে জোহা দৌড়ে আমার দিকে এগিয়ে আসলো।
জোহা: আপু তোমার জ্ঞান ফিরেছে তুমি ঠিক আছ তো? (জোহার চেঁচামেচি শুনে মেঘ ঘুরে আমার দিকে তাকালো)
জোহা: আপু কষ্ট হচ্ছে তোমার? কোথায় কষ্ট হচ্ছে ডক্টর ডাকবো? (জোহা তাড়াতাড়ি কেবিনের বাইরে চলে গেল। মেঘ এসে আমার পাশে ফ্লোরেই হাটু গেড়ে বসে পড়লো, মেঘের দিকে তাকিয়ে আছি এক দৃষ্টিতে)
আম্মু: কোথায় কণা জ্ঞান ফিরেছে আমার মেয়ের? (আম্মুকে দেখে চমকে উঠলাম কি অবস্থা হয়েছে আম্মুর, সবাই এতো অস্থির হচ্ছে কেন বুঝতে পারছি না)
ডক্টর: সবাই এভাবে চেঁচামেচি করলে কিন্তু প্যাসেন্টের অবস্থা আরো খারাপ হয়ে যাবে। (জোহা ডক্টরকে ডেকে নিয়ে এসেছে, ডক্টর এসেই আমার অক্সিজেন মাস্ক খুলে দিলো)
ডক্টর: এখন আর ভয়ের কোনো কারণ নেই।
আম্মু: কিরে কষ্ট হচ্ছে?
আমি: না আম্মু আমি ঠিক আছি, তোমরা এতো অস্থির হচ্ছ কেন?
আম্মু: অস্থির হবো না কতো ঘন্টা পর তোর জ্ঞান ফিরেছে জানিস তুই? ডক্টর তো সোজা বলে দিয়েছিল আল্লাহ্‌ কে ডাকতে। আমার মনে হয় মেঘের ভালোবাসার জোড়েই আল্লাহ্‌ তোকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছেন। জানিস মেঘ নামাজ পড়ে পাগলের মতো কেঁদেছে, এক মুহূর্তের জন্য জায়নামাজ ছেড়ে উঠেনি। (মেঘের দিকে তাকালাম আমার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে)
চাচ্চু: পরে এসব বলো এখন ওদের একটু একা থাকতে দাও। (চাচ্চুর কথা শুনে সবাই কেবিনের বাইরে চলে গেল)

মেঘ আমার পাশে বসে আমার দুগালে আলতো করে ধরলো, আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আছি দেখে আমার কপালে ওর কপাল ঠেকিয়ে হুহু করে কেঁদে উঠলো।
আমি: কাঁদছ কেন এভাবে?
মেঘ: (নিশ্চুপে কেঁদেই যাচ্ছে)
আমি: মেঘ আমার দিকে তাকাও। (মেঘ এখনো কাঁদছে দেখে ওর একটা হাত ধরলাম এবার মেঘ আমার দিকে তাকালো)
আমি: কি হয়েছে কাঁদছ কেন?
মেঘ: এমনি, আমাদের দোহা হয়েছে দেখবে না? (মেঘ চোখের পানি মুছে নিয়ে তোহার দিকে এগিয়ে গেল, তোহার কোল থেকে বেবিকে এনে আমার পাশে শুয়ে দিলো)
মেঘ: আল্লাহ্‌ তোমার কথা শুনেছেন এইযে দেখো আমাদের মেয়ে বেবি হয়েছে। (আমি দোহার কপালে চুমু দিতেই মেঘ আমার কপালে ওর ঠোঁট ছুঁয়ালো)
তোহা: এইযে নতুন আম্মু শুনো আমি কিন্তু ওকে পুঁচকে পুতুল বলেই ডাকবো। (তোহার কথা শুনে মেঘ আমি দুজনেই হেসে দিলাম)
আমি: আচ্ছা ঠিক আছে এবার তুমি আমার এ পাশে এসে বসো। (তোহাকে হাত বাড়িয়ে ডাকতেই তোহা বেডে উঠে আমার বুকে মাথা রাখলো, তোহাকে একহাতে জড়িয়ে ধরে ওর মাথায় আলতো করে চুমু খেলাম)
পপি: বাব্বাহ্ তুমি তো দুই মেয়ের মা হয়ে গেছ।
আমি: হ্যাঁ এখন থেকে আমার দুটু মেয়ে।
পপি: হয়েছে এবার একটু রেস্ট নাও, তোহা চলো আমরা বাইরে যাই সবাই আছে তো ওখানে।
তোহা: চলো।

পপি তোহাকে নিয়ে চলে যেতেই মেঘ আমার একটা হাত ওর হাতের মুঠোয় নিয়ে চুমু খেলো।
মেঘ: কষ্ট হচ্ছে?
আমি: তোমাকে আর তোহাকে ফিরে পেয়ে সব কষ্ট ভুলে গেছি।
মেঘ: আমাদের নতুন মেহমানের জন্যই তো আমাদের তুমি ফিরে ফেলে।
আমি: আচ্ছা তুমি জানলে কিভাবে আমি হসপিটালে?
মেঘ: চাচ্চু বাসায় গিয়েছিলেন, সবকিছু বলার পর আমরা সবাই হসপিটালে চলে এসেছি।
আমি: তুমি হয়তো ভেবেছিলে আমি… (মেঘ আমার ঠোঁটে আঙ্গুল রেখে আটকে দিলো)
মেঘ: চিঠিতে এসব কি লিখেছিলে? কণা আমি একবার ভুল করেছিলাম তারমানে এই নয় যে আমি বারবার তোমাকে অবিশ্বাস করবো। জানো আমি রোজ তোমার ফোনের অপেক্ষায় থাকতাম, আমার মন বলতো তুমি ঠিক আমার কাছে ফিরে আসবে।
আমি: চাচ্চু নিষেধ করেছিল আর তোমার প্রতি অনেক অভিমান ছিল তাই ফোন করিনি।
মেঘ: অভিমান হওয়াটা তো স্বাভাবিক। তবে তোমার অভিমানের পাহাড় এতো বেশি হবে ভাবিনি, আমি বাবা হবো অথচ আমাকে জানাওনি। তোমার এমন অবস্থায় আমি তোমার পাশে থাকতে পারিনি।
আমি: এসব নিয়ে আর মন খারাপ করো না।
দাদী: এইযে আসবো? (দাদীর কন্ঠ শুনে দরজায় তাকালাম দাদী আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসছেন)
মেঘ: এসো।
দাদী: আমার দাদু ভাইকে তো শাস্তিটা ভালো ভাবেই দিলি।
আমি: ও বুঝি একা কষ্ট পেয়েছে আমার কষ্ট হয়নি?
দাদী: কষ্ট তো পেয়েছিস দুজনেই, এখন আর কোনো কষ্ট নয় দুই মেয়েকে নিয়ে নতুন করে সবকিছু শুরু করো।
আম্মু: নতুন করে তো শুরু করতেই হবে আমাদের সবার রাগ যে কমে গেছে মেঘের উপর থেকে।
চাচ্চু: মেঘ’কে এতোটা ভালোবাসিস অথচ আমাদের সামনে প্রকাশ করিসনি, আজ তোর লেখা চিঠি না পড়লে তো আমাদের রাগ কমতো না।
আমি: চিঠি তোমরা পড়েছ?
আম্মু: হ্যাঁ তোর কান্না দেখে চিঠিটা প্রথম আমি পড়েছিলাম তারপর তোর চাচ্চুর হাতে দেই। তোর চিঠি পড়েই আমাদের রাগ কমে যায়, তোর চাচ্চু গিয়ে মেঘদের নিয়ে এসেছে।
বাবা: তবে আপনারা কিন্তু কণাকে দূরে নিয়ে ভুল করেননি, কণা দূরে ছিল বলেই মেঘ নিজের ভুল বুঝতে পেরে নিজেকে শোধরে নিতে পেরেছে। এখন মেঘ আর আগের মতো নেই অনেক বদলে গেছে। মেঘ প্রতি মুহূর্তে কণার জন্য অপেক্ষা করেছে, ওর এই অপেক্ষার ফল যে নতুন মেহমান হবে আমরা তো ভাবতেই পারিনি। (মেঘের দিকে তাকালাম ও আমার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, আমিতো ভেবেছিলাম মেঘ আমাকে ভুল বুঝবে কিন্তু না মেঘ আমার জন্য প্রতি মুহূর্তে অপেক্ষা করেছে)
ভাবি: আমিও চলে এসেছি নতুন মেহমানকে দেখতে।
আম্মু: খুব ভালো করেছ। (ভাবি এসে দোহা’কে কোলে তুলে নিলো, আজ মনে হচ্ছে সবকিছু একদম ঠিক নিজেকে খুব সুখী মনে হচ্ছে)
জোহা: ডক্টর এর সাথে কথা বলেছি এক সপ্তাহ হসপিটালে থাকতে হবে।
আমি: এক সপ্তাহ?
মেঘ: সমস্যা নেই আমি আছি কণার পাশে। (খুব ভয় পেয়েছিলাম কিন্তু মেঘের এই কথায় সব ভয় কেটে গেল, সত্যি প্রিয়জনের ছোট ছোট কথায় অনেক বেশি ভরসা পাওয়া যায়)

এক সপ্তাহ পর…

বাসায় চলে আসলাম, আজ হসপিটাল থেকে আমাকে রিলিজ করে দেওয়া হয়েছে। এই এক সপ্তাহ মেঘ আমাকে ছেড়ে এক মুহূর্তের জন্য দূরে যায়নি এমনকি বাসায় পর্যন্ত আসেনি। সবসময় মেঘ আমার পাশে থেকেছে, মেঘের বদলে যাওয়া, আমার প্রতি ওর ভালোবাসা বিশ্বাস আর কেয়ার সবকিছু দেখে নতুন করে মেঘের প্রেমে পড়ে যাচ্ছি বারবার।
মেঘ: এইযে মেডাম একা একা দাঁড়িয়ে কি ভাবছ? (জানালার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলাম মেঘ এসে আমাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো)
আমি: কি হচ্ছে তোহা আছে তো রুমে।
মেঘ: তোহা তো ওর পুঁচকে পুতুল নিয়ে ব্যস্ত আছে।
তোহা: এইযে পুঁচকে পুতুল ওদিকে তাকাস না, দেখতে পাচ্ছিস না আব্বু আর নতুন আম্মু রোমান্স করছে। (তোহার কথা শুনে মেঘ আমি দুজনে হেসে উঠলাম)
মেঘ: মাঝে মাঝে প্রিয় মানুষ গুলোর থেকে কিছুটা দূরে যাওয়া প্রয়োজন। তুমি আমার থেকে দূরে গিয়েছিলে বলেই আমি তোমার শূন্যতা অনুভব করতে পেরেছি। আর তাইতো নিজেকে শোধরে নিতে পেরেছি।
আমি: কষ্ট যে হয়েছে দুজনেরই।
মেঘ: সারাজীবনের সুখের জন্য একটু কষ্ট করলে মন্দ কিসের?
আমি: (মৃদু হাসলাম)
মেঘ: এই কয়েক মাস শুধু তুমি আমাকে নীরবে ভালোবাসনি আমিও তোমায় নীরবে ভালোবেসে গেছি।
মেঘ আমার কোমর জড়িয়ে ধরে আমাকে ওর কাছে টেনে নিলো, আমার কপালে আলতো করে ওর ঠোঁট ছুঁয়ালো। একটা সস্থীর নিঃশ্বাস ফেলে মেঘের বুকে মাথা রাখলাম, মেঘ আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। আজ আর কোনো ভয় নেই, নেই আমার প্রতি মেঘের অবিশ্বাস। এই বুকে মাথা রেখে অনায়াসে কাটিয়ে দিতে চাই হাজারটা শতাব্দী।

সমাপ্ত😍

(বেঁচে থাকুক প্রতিটি ভালোবাসার বন্ধন। ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। ধন্যবাদ সবাইকে ধৈর্য নিয়ে গল্পটি পড়ার জন্য। নতুন গল্প নিয়ে খুব শীঘ্রই ফিরে আসবো টাটা😘)

নীরবে_ভালোবাসি পার্ট: ২৯

নীরবে_ভালোবাসি

পার্ট: ২৯

লেখিকা: সুলতানা তমা

নিশ্চুপ হয়ে বসে আছি কেউ আমার সাথে কোনো কথা বলছে না। মেঘ বারবার আমাকে ডেকে উত্তেজিত হয়ে পড়ছিল বলে ডক্টর ওকে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে, জানিনা মেঘের ঘুম কখন ভাঙবে ওদিকে ফ্লাইটের সময় হয়ে যাচ্ছে। চাচ্চু তো আমাকে রেখে যাবে না, মেঘের ঘুম না ভাঙলে হয়তো মেঘের সাথে শেষ কথাটুকুও হবেনা।
তোহা: নতুন আম্মু ও নতুন আম্মু… (তোহার ধাক্কায় যেন ঘোর কাটলো)
আমি: হুম মামুনি বলো।
তোহা: আব্বুর কি হয়েছে?
আমি: কিছু হয়নি মামুনি তোমার আব্বু তো একটু পরই ভালো হয়ে যাবে।
বাবা: ডক্টর তো বললো অবস্থা খুব খারাপ এতো তাড়াতাড়ি ভালো হবে না। (বাবার কথা শুনে মেঘের দিকে তাকালাম হাতে ব্যান্ডেজ, মাথায় ব্যান্ডেজ, পায়ের গোড়ালিটা বোধহয় ভেঙ্গে গেছে)
বাবা: দোষ তো আমার ছেলের তাই তোমার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি এবার আমার ছেলেটাকে ক্ষমা করে দাও মা।
চাচ্চু: এখন এসব ব্যাপারে কথা না বলাই ভালো। আর হ্যাঁ একটু পর আমাদের ফ্লাইট আমরা কণাকে নিয়ে কানাডা চলে যাচ্ছি।
মা: আমার ছেলেকে এই অবস্থায় রেখে তুমি যেতে পারবে বৌমা?
চাচ্চু: কণা আমি আবারো বলছি তুই আমার কথা না শুনলে আমি তোদের সাথে সব সম্পর্ক শেষ করে দিবো।
আমি: শেষ করতে হবে না চাচ্চু আমি কানাডা যাবো।
চাচ্চু: হুম এটাই ভালো হবে, এমন ছেলের সাথে সংসার করার কোনো মানে হয়না। এক্সিডেন্ট করেছে বলে যে মেঘ শোধরে যাবে তাতো নয়।
রুহান: চলে যাবে যখন এখনি চলে যাও কেন বসে আছ এখানে?
চাঁচি: বৌমা আমি জানি তুমি আমাকে কখনো ক্ষমা করবে না তাও বলছি মেঘকে ছেড়ে যেওনা। (চাঁচির কথা শুনে এতোক্ষণে চাঁচির দিকে নজর পড়লো, যাবার আগে তো রুহান আর চাঁচিকে এক করে দিতে পেরেছি)
আমি: ক্ষমা না করলে কি আপনি বাসায় ফিরে আসতে পারতেন? আমার কারো উপর কোনো রাগ নেই আ…
পপি: তাহলে চলে যেতে চাইছ কেন?
চাচ্চু: মেঘ এতোকিছু করার পর এই প্রশ্নটা করা তোমাদের মানায় না।
চাচ্চুর কথা শুনে সবাই চুপ হয়ে গেল। চাচ্চুর রাগ এখনো কমেনি তাই কানাডা যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই আমার কাছে। তাছাড়া আমারো এখন কানাডা চলে যেতে মন চাইছে, অনেক তো অপেক্ষা করেছি মেঘ ভুল বুঝতে পারবে এই ভেবে কিন্তু মেঘ তো শোধরায়নি উল্টো এখনো আমাকে অবিশ্বাস করে।

মেঘের ঘুম তো ভাঙ্গছে না ওদিকে ফ্লাইটের সময় হয়ে যাচ্ছে। মেঘের সাথে শেষ কথাটুকুও মনে হয় হবেনা।
ভাবি: কণা.. (কাঁধে কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে পাশ ফিরে তাকালাম, ভাবি দাঁড়িয়ে আছে)
আমি: কেন এসেছ?
ভাবি: তুমি এমন পরিস্থিতিতে আছ আমি না এসে পারি?
আমি: আজ মেঘ এক্সিডেন্ট করেছে তাই এসেছ সেদিন তো আমাকে ফেলে রেখে ঠিকি চলে গিয়েছিলে। হ্যাঁ সেদিন আমি এক্সিডেন্ট করিনি ঠিকি কিন্তু মেঘের থেকে দূরে থেকে আমি কেমন পাগলের মতো ছিলাম তুমি তো দেখেছিলে তারপরও…
ভাবি: কণা তুমি অজতা আমার উপর রেগে আছ। তুমি সারাক্ষণ মেঘের জন্য কাঁদতে আর তোমার এই অবস্থা দেখে নিজেকে অপরাধী মনে হতো কারণ তোমাদের দুজনের আলাদা হওয়ার জন্য আমিতো কম দায়ী নই, আর তাই আমি তোমার সামনে থাকতে পারিনি…
আমি: এজন্য অন্য বাসায় চলে গিয়েছিলে। কি পেয়েছ অন্য বাসায় গিয়ে? একা একাই তো থাকতে হয়েছে, আমাদের সাথে থাকলে কি হতো? ভাইয়া তো তোমাকে আম্মুর কাছে দিয়ে গিয়েছিল আর তুমি…
ভাবি: তোমার প্রতি করা অন্যায় গুলো আমাকে রোজ কষ্ট দেয় কণা আর সেটা অনেক বেশি বেড়ে যায় যখন তোমাকে মেঘের জন্য কাঁদতে দেখি।
আমি: আরে আমিতো তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি এসবে তো তোমার কোনো দোষ ছিল না।
পপি: ভাইয়া.. (পপির ডাকে মেঘের দিকে তাকালাম, ও আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে)
মেঘ: কণা..
মা: কথা বলিস না বাবা তোর কষ্ট হবে।
মেঘ: ওর সাথে যে আমার কথা বলতে হবে আম্মু।
আমি: কিছু বলতে হবে না তুমি রেস্ট নাও।
মেঘ: তুমি আমার পাশে বসে থাকবে তো?
আমি: (নিশ্চুপ)
আম্মু: না ও বসে থাকবে না তোমার পাশে কারণ আমাদের ফ্লাইটের সময় হয়ে গেছে।
মেঘ: কণা যেওনা প্লিজ!
আম্মু: কণা তুই কিন্তু বলেছিলি এখানে তোকে আসতে দিলে তুই আমার সব কথা শুনবি, চল এবার।
মেঘ: কণা প্লিজ যেওনা। (মেঘ আমার হাত ধরে ফেললো, ওর হাতটা আস্তে আস্তে সরিয়ে দিয়ে দৌড়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে আসলাম)

জোহা: আপু আর কেঁদো না এখন তো আর কিছু করার নেই।
চাচ্চু: চল মা।
ভাবি: দাঁড়াও কণা। (ভাবির ডাকে পিছনে তাকালাম, পপি আর ভাবি আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে)
ভাবি: মেঘের এই অবস্থা দেখেও চলে যাচ্ছ এই তোমার ভালোবাসা?
পপি: কাকে কি বলছ ও তো আমার ভাইকে ভালোবাসে না, বাসলে হসপিটালের বেডে ফেলে রেখে চলে যেতে পারতো না।
ভাবি: তোমার কাছে তোমার রাগটা বড় হয়ে গেল মেঘের অসুস্থতা কিছুই না?
পপি: তোহা? তোহার জন্য তো থাকতে পারো, তোহা তো তোমার মেয়ে। ওহ এখন হয়তো তোহাও তোমার কেউ না, যদি সত্যি তোহা তোমার মেয়ে হতো তাহলে নিজের সন্তানকে ফেলে রেখে কখনো কানাডা চলে যেতে পারতে না।
আমি: চুপ করো তোমরা।
জোহা: আপু.. (একটা চেয়ারে বসে পড়লাম, আর এসব কথা শুনতে ইচ্ছে হচ্ছে না মাথা ঘুরছে)
জোহা: তোমরা আপুকে কেন এসব কথা শুনাচ্ছ? আব্বু আর চাঁচি যদি আপুকে জোড় করে কানাডা নিয়ে যায় তাতে আপুর দোষ কোথায়? আপু কানাডা চলে যাচ্ছে এইটা তোমাদের চোখে পড়ছে আর ভাইয়া যে বারবার আপুকে অবিশ্বাস করছে সবার সামনে ছোট করছে এইটা চোখে পড়ছে না?
চাচ্চু: জোহা আস্তে কথা বল ভুলে যাসনা এইটা হসপিটাল।
আম্মু: কোনো মা সন্তানকে অসুখী দেখতে চায় না। আমিও চেয়েছিলাম আমার মেয়েটা সবার সাথে মিলেমিশে সুখে সংসার করুক। কিন্তু মেঘ বারবার আমার মেয়েকে কষ্ট দিয়েছে এবার তোমরা বলো আমি মা হয়ে কিভাবে আমার মেয়েকে এমন ছেলের কাছে রাখি। (আম্মুর কথা শুনে পপি ভাবি দুজনেই চুপ হয়ে আছে)
আম্মু: মেঘের সাথে আমার মেয়ের কোনো বন্ধন থাকুক তা আমি চাই না তাই আমি ঠিক করেছি কানাডা গিয়ে কণার আবার বিয়ে দিবো। তোমরা এবার আসতে পারো আমাদের যেতে হবে নাহলে ফ্লাইট মিস হয়ে যাবে। (ভাবি আর পপি মাথা নিচু করে চলে গেল। আমি বসা থেকে উঠতে চাইলাম কিন্তু সবকিছু ঝাপসা লাগছে মনে হচ্ছে এখনি পরে যাবো)
জোহা: আপু কি হয়েছে এমন করছ কেন?
আম্মু: কণা… (চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে আসলো আস্তে আস্তে লুটিয়ে পড়লাম)

চোখ খুলে নিজেকে হসপিটালের বেডে দেখতে পেলাম, জোহা পাশের চেয়ারে বসে আছে। আম্মু আর চাচ্চু দূরে দাঁড়িয়ে ডক্টর এর সাথে কথা বলছেন।
নার্স: মেডাম প্যাসেন্টের জ্ঞান ফিরেছে। (নার্সের কথা শুনে ডক্টর আমার দিকে এগিয়ে আসলো, সাথে আম্মু আর চাচ্চুও এগিয়ে আসলো)
আম্মু: কিরে মা এখন কেমন লাগছে?
ডক্টর: এই অবস্থায় কেউ এতোটা কেয়ারলেস হয়ে থাকে হুম? তোমার শরীর তো খুব দূর্বল, এভাবে চললে বেবির খুব বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। (ডক্টর এর কথা শুনে চোখ বড় বড় করে তাকালাম কি বলছে ডক্টর এসব)
ডক্টর: অবশ্য এখনো বেবির অবস্থা খুব বেশি ভালো না এভাবে চললে বেবির কন্ডিশন আরো খারাপ হয়ে যাবে তখন কিন্তু বাচ্চাটা বাঁচানো সম্ভব হবেনা।
আমি: আম্মু ডক্টর এসব কি বলছে?
ডক্টর: তোমার আম্মুকে জিজ্ঞেস করে লাভ কি উনি নিজেই তো বুঝতে পারননি তুমি যে প্রেগন্যান্ট। দেখো তোমার শরীরের এখন যা অবস্থা তোমাকে কিছুদিন বেডরেস্টে থাকতে হবে। আর হ্যাঁ অবশ্যই ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করতে হবে নিজের খেয়াল রাখতে হবে, তুমি সুস্থ থাকলেই তো বাচ্চা সুস্থ থাকবে। তুমি কি চাওনা তোমার বাচ্চা সুস্থ থাকুক। (ডক্টর এর কথা গুলো শুনে সব কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে কি বলছে এসব? আমি মা হবো অথচ আমিই বুঝতে পারিনি)
চাচ্চু: ডক্টর ওকে কি এখানে রাখতে হবে নাকি…
ডক্টর: আপনারা চাইলে বাসায় নিয়ে যেতে পারেন তবে অবশ্যই মেয়ের খেয়াল রাখতে হবে।
আম্মু: ঠিক আছে। (ডক্টর চলে যেতেই আম্মু এসে আমার পাশে বসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন)
চাচ্চু: বাসায় চলে যাই কণাকে এই হসপিটালে না রাখাটাই ভালো হবে, যদি প্রয়োজন হয় একজন নার্স বাসায় নিয়ে যাবো ওর দেখাশোনা করার জন্য।
জোহা: তার আর প্রয়োজন হবে না আমিই আপুকে দেখে রাখতে পারবো।
আম্মু: ঠিক আছে চলো।
জোহা: একটা কথা বলবো আব্বু?
চাচ্চু: হুম বল।
জোহা: যদিও এমন পরিস্থিতিতে এই খুশির খবরটা আমরা শুনেছি তাও আমার মনে হয় ও বাড়ির সবাইকে বিশেষ করে ভাইয়াকে জানানো প্রয়োজন। আর ওরা তো সবাই এই হসপিটালেই আছে।
চাচ্চু: না কাউকে জানানোর প্রয়োজন নেই। মেঘের সন্তান হলেও মেঘের মতো ছেলের ছায়া বেবির উপর পরুক আমি চাইনা। আর হ্যাঁ তোরা জোড় করলে আমি কণাকে এই অবস্থাতেই কানাডা নিয়ে যেতে বাধ্য হবো।
আমি: না চাচ্চু এমন করো না আমি মেঘের সাথে কোনো যোগাযোগ রাখবো না তাও কানাডা নিয়ে যেওনা প্লিজ!
চাচ্চু: ঠিক আছে আপাতত বাসায় চল। নতুন বাসা কিনে ওখানে তোদের রেখে আমি কানাডা যাবো আর মেঘ জানবে তুই কানাডা আছিস।
আমি: হুম।

বাসায় এসে ড্রয়িংরুমে দাঁড়ালাম না সোজা রুমে চলে আসলাম, ইচ্ছে হচ্ছে চিৎকার করে কাঁদি। তোহা সবসময় বলতো নতুন আম্মু একটা পুঁচকে পুতুল এনে দাও আর তোহার এই কথা নিয়ে মেঘ কতো দুষ্টুমি করতো, আজ এতো বড় খুশির সংবাদটা না মেঘকে জানাতে পারছি না তোহাকে।
আম্মু: কণা.. (আম্মু আসছে শুনে তাড়াতাড়ি চোখের পানি মুছে নিলাম। আম্মু এসে আমার পাশে বসলেন)
আম্মু: কাঁদছিস কেন? বুঝতে পারছি তোর কষ্ট হচ্ছে মেঘকে খবরটা জানাতে পারবি না ভেবে কিন্তু তুই বল যে তোকে এতো কষ্ট দেয় তার সাথে তোকে আমরা কিভাবে থাকতে দেই।
আমি: আম্মু বাদ দাও এসব।
আম্মু: দেখ আগে আমরা ভেবেছিলাম তোর বিয়ে দিবো আবার কিন্তু এখন তো তা সম্ভব নয়। তুই মেঘের জন্য অপেক্ষা কর আমি মানা করছি না, মেঘ যদি ভালো হয়ে ফিরে আসে তাহলে আমরা তোদের আর আলাদা রাখবো না কিন্তু মেঘ ভালো না হলে আমাদের কিছু করার নেই।
আমি: না আম্মু আমি কারো জন্য অপেক্ষা করছি না আর করবোও না। আমার সন্তানকে আমি নিজেই লালনপালন করতে পারবো।
আম্মু: রাগ করিস না দেখ মেঘ তোকে এতো কষ্ট দেয় এখন যদি তুই সবকিছু ভুলে ওর কাছে ফিরে যাস তাহলে ও তোকে আরো বেশি কষ্ট দিতে দিদ্ধাবোধ করবে না। তারচেয়ে ভালো হবে তুই ওর চোখের আড়ালে থাক তোর শূন্যতা অনুভব করে হয়তো ছেলেটা ভালো হয়ে যাবে, আর মেঘ যদি সত্যি তোকে ভালোবেসে থাকে তাহলে একদিন ঠিক ফিরে আসবে।
আমি: হুম।
আম্মু: তোর আব্বু নেই এই সময় যদি তোর চাচ্চু আমাদের উপর রাগ করে কানাডা চলে যায় তাহলে আমাদের কি হবে বল, তাছাড়া তোর চাচ্চু তো তোর ভালোর জন্যই তোকে মেঘের থেকে দূরে রাখতে চাইছে। আপাতত মেঘের সাথে কোনো যোগাযোগ রাখার প্রয়োজন নেই।
আমি: হুম।
আম্মু: আর কান্নাকাটি করিস না নিজের প্রতি যত্নবান হ, তুই ভালো থাকলে তবেই তো বেবি ভালো থাকবে। আর এখন তো বেবিটাই তোর সবকিছু তাইনা? আসছি আমি তোর জন্য খাবার রেডি করি তুই ফ্রেশ হয়ে নিচে আয়।
আমি: ঠিক আছে।
আম্মু চলে যেতেই উঠে ফ্রেশ হতে চলে গেলাম।

ফ্রেশ হয়ে তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে রুমে ঢুকলাম তখনি আয়নার দিকে নজর পড়লো, আস্তে আস্তে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ালাম। সত্যি অনেক রোগা হয়ে গেছি এভাবে চললে আমার বেবির ক্ষতি হয়ে যাবে। পেটে হাত রেখে আয়নায় তাকালাম, আম্মু ঠিকি বলেছেন এই বেবিটাই এখন আমার সবকিছু। মেঘকে ভুলে গিয়ে এখন আমার বেবির কথা ভাবতে হবে, ও ছাড়া তো এখন আমার কেউ নেই ওর কিছু হলে আমি কি নিয়ে বাঁচবো?
জোহা: আপু খাবে এসো।
আমি: আসছি।

আমি: চাচ্চু কোথায়রে? (চাচ্চুকে কোথাও দেখতে না পেয়ে চেয়ার টেনে বসতে বসতে জোহাকে প্রশ্ন করলাম)
জোহা: বাইরে গেছেন।
আমি: এই সন্ধ্যাবেলায় বাইরে কেন?
জোহা: আব্বুকে কাল চলে যেতে হবে তাই আমাদের জন্য বাসা খুঁজতে গেছেন।
আমি: বাসা এতো তাড়াতাড়ি কিভাবে সম্ভব?
আম্মু: টাকা হলে সব সম্ভব তুই এসব নিয়ে টেনশন করিস নাতো। খেয়ে নে আর এবার একটু নিজের খেয়াল রাখতে শিখ, এখন তো মা হবি নিজের সাথে সাথে সন্তানের যত্নও নিতে হবে। পাগলামি ছেড়ে বেবিটার কথা ভাব।
আমি: এতো জ্ঞান দিওনা তো আর এসব কি দিয়েছ আমি এসব ফলমূল খাই নাকি? আমার নোডলস দাও।
জোহা: নাশতায় এখন থেকে ফলই খেতে হবে ভাজাভুজি একদম খাওয়া যাবে না।
আমি: ডক্টর হলি কবে?
জোহা: যখন শুনেছি আমি খালামণি হবো তখন থেকে।
চাচ্চু: জোহা দেখছি খালামণি হবে শুনে খুব খুশি। (চাচ্চুর কথা শুনে দরজার দিকে তাকালাম, বাসা হয়তো পেয়ে গেছেন তাই চলে এসেছেন)
জোহা: হ্যাঁ আমিতো অনেক খুশি, তোমরা বুঝি খুশি নও?
চাচ্ছ: খুশি হবো না আবার নানা হবো যে হাহাহা।
আম্মু: বাসা পেয়েছ?
চাচ্চু: হ্যাঁ, সকালে তোমাদের নতুন বাসায় নামিয়ে দিয়ে আমি চলে যাবো।
আম্মু: ঠিক আছে।
চাচ্চু: জোহা তুই কি সিদ্ধান্ত নিলি এখানেই থাকবি নাকি?
জোহা: হ্যাঁ আমি আপুকে রেখে কোথাও যাচ্ছি না, ভাবছি এখানেই ভালো কোনো ইউনিভারসিটিতে ভর্তি হয়ে যাবো।
চাচ্চু: ঠিক আছে যা ভালো মনে হয় কর। আমি কাল চলে যাচ্ছি কয়েক মাসের মধ্যে আর আসা হবে না।
জোহা: ঠিক আছে।
চাচ্চু: আর কণা মেঘের সাথে কোনো যোগাযোগ করার চেষ্টা করবি না একদম।
আমি: হুম।

জোহা: আপু হলো তোমার তাড়াতাড়ি এসো।
আমি: আসছি। (নতুন বাসায় চলে যাচ্ছি মেঘের সাথে তো আর দেখা হবেনা ওর ছবিটা লুকিয়ে সাথে নিলাম)
জোহা: এতো দেরী করলে হবে আব্বু আর চাঁচি গাড়িতে বসে ওয়েট করছেন।
আমি: এইতো শেষ চল।
জোহা: চলো।

চাচ্চু আমাদের নতুন বাসায় নামিয়ে দিয়ে এয়ারপোর্ট চলে গেলেন। একই শহরে হলেও আগের বাসা থেকে এই বাসা অনেক দূরে মেঘ চাইলেও আমাকে খুঁজে পাবে নাহ।
আম্মু: কিরে বাসা পছন্দ হয়েছে তোদের?
জোহা: হুম অনেক।
আম্মু: নিজেদের রুম গিয়ে গুছিয়ে নে।
জোহা: ওকে।

রুমে এসে চারপাশটা ভালোভাবে দেখে নিলাম, এই চার দেয়ালের মধ্যেই তো এখন জীবন কাটাতে হবে। বিছানার সামনের দেয়ালে মেঘের ছবিটা রাখলাম যেন ঘুমানোর সময় দেখতে পারি। মেঘের ছবির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি আর ভাবছি সামান্য একটা অবিশ্বাস আজ আমাদের দুজনকে কতোটা দূরে নিয়ে গেল। একই শহরে থাকবো অথচ মেঘের সাথে কোনো যোগাযোগ করতে পারবো না, দেখা হবে না কখনো দুজনের। এজন্যই লোকে বলে অবিশ্বাস করে পস্তানোর চেয়ে বিশ্বাস করে ঠকে যাওয়া অনেক ভালো।

চলবে😍

নীরবে_ভালোবাসি পার্ট: ২৮

নীরবে_ভালোবাসি

পার্ট: ২৮

লেখিকা: সুলতানা তমা

বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছি, মেঘ বারান্দার এদিক থেকে ওদিকে পায়চারী করছে। অনেক গুলো প্রশ্ন করে একটা উত্তরও পায়নি আমার কাছ থেকে তাইতো মেঘ অস্থির হয়ে এভাবে পায়চারী করছে। মেঘ অধৈর্য হয়ে আমার পাশে এসে দাঁড়ালো, আমার হাতের উপর ওর একটা হাত রাখলো।
মেঘ: কণা আর কতক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবো? (ঝটকা দিয়ে হাতটা সরিয়ে আনলাম)
আমি: তোমাকে কি আমি আটকে রেখেছি?
মেঘ: তা রাখোনি কিন্তু আমার কোনো প্রশ্নের উত্তরও তো দিচ্ছ না যে আমি..
আমি: কোনো উত্তর নেই তুমি আসতে পারো।
মেঘ: প্লিজ লক্ষীটি এমন করো না।
আমি: নষ্টা থেকে লক্ষী? তুমি তো খুব ভালো রূপ বদলাতে পারো।
মেঘ: সবকিছুর জন্য সরি তো, দেখো সেদিন আমি তোমাকে ভুল বুঝেছিলাম ঠিকি কিন্তু পরে তো আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি। হ্যাঁ এতোদিন লজ্জায় তোমার সামনে আসতে পারিনি কিন্তু এখন না এসে আর থাকতে পারছিলাম না তাইতো..
আমি: মেঘ বলতো ভালোবাসতে হলে কোনটা প্রথমে প্রয়োজন।
মেঘ: বিশ্বাস।
আমি: শুধু বিশ্বাস নয়, বিশ্বাস এবং সম্মান দুটুই সবার আগে প্রয়োজন। এই দুটুর মধ্যে কোনোটাই তো তুমি আমাকে করো না।
মেঘ: (নিশ্চুপ)
আমি: তুমি আমাকে না বিশ্বাস করো না সম্মান করো, তাহলে আমি কিভাবে তোমার কাছে ফিরে যাবো বলো।
মেঘ: এখন তো আমি তোমাকে বিশ্বাস করি, আগেও করতাম শুধু…
আমি: মেঘ বিশ্বাস করি বলাটা যতো সহজ তারচেয়ে অনেক বেশি কঠিন বিশ্বাস করাটা।
মেঘ: কণা আমিতো আমার ভুল স্বীকার করছি যে সেদিন আমি তোমাকে ভুল বুঝেছিলাম।
আমি: সেদিন লোকটা আমার হাত ধরেছিল দেখে তুমি বলেছিলে আমি নষ্টামি করতে গিয়ে তোহার এই অবস্থা করেছি, মানছি সেদিন তোমার দেখায় ভুল ছিল। কিন্তু সেদিন তো তুমি আমাকে অসম্মান করতেও দুবার ভাবোনি, সবার সামনে তুমি আমার ভালোবাসাকে বারবার ছোট করেছ। আরে তোমার থেকে তো রাহুল আমাকে বেশি সম্মান করে।
মেঘ: রাহুল কে?
আমি: (নিশ্চুপ)
মেঘ: বলো বলছি রাহুল কে?
আমি: ওইযে নীল রঙের দুতলা বাড়িটা দেখছ ওই বাসার ছেলে। (মেঘ হা হয়ে আমাদের পাশের বাসার দিকে তাকিয়ে আছে)
মেঘ: এই ছেলের সাথে তোমার কি সম্পর্ক?
আমি: তোমার কি মনে হয় এই দুমাস আমি তোমার জন্য কেঁদে কেঁদে কাটিয়েছি? না মেঘ আমি রাহুলের সাথে প্রেম করেছি আর এই বারান্দাতে দাঁড়িয়েই। জানো তো রাহুল এখন… (আমার পুরো কথা শেষ হবার আগেই মেঘ আমার গালে থাপ্পড় বসিয়ে দিলো। মেঘ রাগি চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে, গালে হাত রেখে মেঘের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলাম)
মেঘ: তুমি আসলেই আমার ভালোবাসার যোগ্য নও। (আবারো হাসলাম)
আমি: বলেছিলাম না মেঘ বিশ্বাস করি বলা সহজ কিন্তু বিশ্বাস করাটা খুব কঠিন।
মেঘ: মানে?
আমি: তুমি আমাকে কতোটা বিশ্বাস করো পরীক্ষা করে নিলাম। ওই বাসায় কেউ থাকে না মেঘ সবাই বাহিরে থাকে আর ওদের পরিবারে ওরা দুবোন শুধু কোনো ছেলে নেই।
মেঘ: তারমানে..
আমি: মিথ্যে বলেছি তোমাকে পরীক্ষা করার জন্য যদিও ভালোবাসায় কোনো পরীক্ষা চলে না তাও করতে হলো শুধুমাত্র তোমার…
মেঘ: কণা আমি সরি..
আমি: থাপ্পড়টা খুব জোড়েই দিয়েছ হয়তো তোমার হাতের আঙ্গুলের দাগ বসে গেছে।
মেঘ: বিশ্বাস করো তোমার মুখে অন্য ছেলের নাম শুনে আমার মাথা ঠিক ছিল না, আমি তোমাকে থাপ্পড় দিতে চাইনি কিন্তু.. (মেঘ আমার গালে স্পর্শ করতে চাইলো পিছিয়ে আসলাম)
আমি: এবার বুঝতে পেরেছ তো তুমি যে আমাকে বিশ্বাস করো না? যে নিজের ভালোবাসাকে বিশ্বাস করেনা সম্মান করেনা তার সাথে সারাজীবন না কাটানোটাই মঙ্গল।
মেঘ: কণা আমার কথা শুনো।
আমি: চলে যাও মেঘ।
মেঘ: শুনো প্লিজ!
আমি: তুমি কি চাইছ আমি কাল কানাডা চলে যাই?
মেঘ: না না তুমি কানাডা চলে গেলে আমি..
আমি: তাহলে আমার চোখের সামনে থেকে চলে যাও নাহলে আমি কাল সত্যি কানাডা চলে যাবো।
মেঘ: কণা আমি সত্যি তোমাকে ভালোবাসি।
মেঘের দিকে না তাকিয়ে রুমে এসে বারান্দার দরজা লাগিয়ে দিলাম। খুব কষ্ট হচ্ছে যাকে আমি এতো ভালোবাসি সে কিনা আমাকে এতোটুকু বিশ্বাস করেনা। যে মেঘের জন্য আমি অপেক্ষা করছি সে কিনা আমার ভালোবাসাকেই বিশ্বাস করেনা। আমিতো ভেবেছিলাম মেঘ নিজের ভুল বুঝতে পেরে ফিরে আসবে কিন্তু এভাবে মনের মধ্যে অবিশ্বাসের বীজ রেখে ফিরে আসবে ভাবিনি।

জোহা: আপু এই আপু..
আমি: হুম।
জোহা: সোফায় ঘুমিয়ে আছ কেন? (জোহার কথায় চোখ খুলে তাকালাম, রাতে কাঁদতে কাঁদতে সোফাতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম)
জোহা: আপু কি হয়েছে? রাতে অনেক কেঁদেছ তাই না?
আমি: মেঘকে সবকিছু কেন বলেছিলি?
জোহা: এভাবে দুইটা ভালোবাসার মানুষ আলাদা হয়ে যাক তা আমি চাই না।
আমি: বারান্দার দরজা কে খুলা রেখেছিল?
জোহা: আমিই।
আমি: খুব বড় হয়ে গেছিস তাই না?
জোহা: আপু ভাইয়ার কাছে ফিরে যাও প্লিজ।
আমি: কার কাছে যাবো হ্যাঁ যে আমাকে বিশ্বাসই করেনা।
জোহা: আরে আস্তে চেঁচাও ড্রয়িংরুমে আব্বু আছে সাথে রুহান ভাইয়া।
আমি: রুহান কেন এসেছে?
জোহা: তোমার সাথে নাকি দেখা করবে তাইতো তোমাকে ডাকতে আসলাম।
আমি: গিয়ে বল আমি ওই বাড়ির কারো সামনে যাবো না।
জোহা: রুহান ভাইয়া কি দোষ করলো?
আমি: (নিশ্চুপ)
জোহা: নিচে চলো।
আমি: গিয়ে বল রুমে আসতে।
জোহা: ঠিক আছে।

চুপচাপ বিছানায় বসে আছি, রুহান কেন এসেছে কিছুতেই ভেবে পাচ্ছি না। মেঘ পাঠিয়েছে? নাকি অন্য কোনো কারণ?
রুহান: আসতে পারি?
আমি: হ্যাঁ এসো।
রুহান: বিরক্ত হচ্ছ মনে হচ্ছে। (সোফায় বসতে বসতে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, আসলে তো বিরক্ত হচ্ছি না কেন জানি ওই বাড়ির কাউকে দেখলেই রাগ হচ্ছে)
আমি: বিরক্ত হবো কেন?
রুহান: এইযে গতকাল আমাদের তাড়িয়ে দেওয়ার পর আজ আবার আসলাম। (রুহানের কথায় এবার নিজেই লজ্জা পেলাম, কাল ওদের সাথে এমন ব্যবহার করা ঠিক হয়নি। কিন্তু আমি কি করবো আমিও তো একটা মানুষ আর যে এসব সহ্য হচ্ছে না)
রুহান: আজ কিন্তু আমি অন্য প্রয়োজনে এসেছি।
আমি: কি প্রয়োজন বলো।
রুহান: কাল তো কিছু বলার সুযোগই দাওনি কিন্তু আজ না বললে আর হয়তো আম্মুকে ফিরে পাবো না, তোমরা তো কানাডা চলে যাচ্ছ আজ।
আমি: চাঁচিকে ফিরে পাবেনা মানে?
রুহান: দুদিন আগে আম্মুর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। আম্মু তোমার কাছে ক্ষমা চাইতে চান আর মুক্তি চান। (রুহানের কথা শুনে চোখ বড় বড় করে তাকালাম, এই মহিলা এতো তাড়াতাড়ি শোধরে গেল)
রুহান: আজ যদি তোমরা কানাডা চলে যাও তাহলে তো…
আমি: কানাডা কে যাবে? আমিতো কানাডা যাচ্ছি না।
রুহান: আমি জানতাম তুমি রাজি হবেনা কারণ তুমি তো ভাইয়াকে ভালোবাস, ভাইয়াকে ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার কথা তুমি ভাবতেই পারো না।
আমি: আমি কাউকে ভালোবাসি না।
রুহান: হুম তাতো তোমার চোখই বলে দিচ্ছে।
আমি: যে কাজে এসেছ সেটা নিয়ে কথা বলো।
রুহান: একবার যদি থানায় যেতে আর আম্মুকে..
আমি: উনি সত্যি শোধরে গেছেন তো?
রুহান: হুম।
আমি: ঠিক আছে তুমি ড্রয়িংরুমে গিয়ে বসো আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।
রুহান: হুম।

ফ্রেশ হয়ে ড্রয়িংরুমে আসতেই দেখি আম্মু আর জোহা সবকিছু গুছিয়ে নিচ্ছে। আমাকে দেখেই চাচ্চু হাসলেন।
চাচ্চু: রেডি হয়ে নে দুঘণ্টা পর আমাদের ফ্লাইট।
আমি: একটু থানা থেকে আসছি তাড়াতাড়ি চলে আসবো।
আম্মু: কি বলছিস দুঘণ্টা পর তো..
আমি: ফ্লাইট মিস হবেনা তাড়াতাড়ি চলে আসবো আমি।
চাচ্চু: ও এসব বলে বেরুচ্ছে আসবে না দুঘন্টার মধ্যে।
আম্মু: কোথাও যাওয়া হবেনা চুপচাপ বাসায় বসে থাক।
আমি: আম্মু বলছি তো আমি চলে আসবো।
চাচ্চু: একদম চুপ তোর চালাকি আমরা বুঝিনা মনে করেছিস, রুমে যা। (দ্যাত বেরুতে না পারলে তো চাচ্চু জোড় করে আমাকে নিয়ে যাবে আর একবার কানাডা নিয়ে যেতে পারলে বিয়ে দিয়ে দিবে)
আমি: চাচ্চু..
চাচ্চু: তুই কি চাচ্ছিস আমি তোদের ফেলে রেখে চলে যাই? তুই এমন করলে আমি চলে যাবো তোদের সাথে কোনো যোগাযোগ রাখবো না।
আম্মু: কণা খুব খারাপ হচ্ছে কিন্তু।
আমি: রুহান তুমি থানায় যাও আমি পুলিশ আঙ্কেলের সাথে ফোনে কথা বলবো।
রুহান: ঠিক আছে।

পুলিশ আঙ্কেলের সাথে কথা বলা শেষ করে রুমে এসে দরজা বন্ধ করে দিলাম। আম্মুর সাথে কানাডা চলে যাবো নাকি একা থাকবো সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। কানাডা যাওয়া মানে মেঘকে সারাজীবনের জন্য হারানো আর না যাওয়া মানে চাচ্চুকে হারানো, এখন আমি কোনটা বেছে নিবো?
আম্মু: কণা দরজা খুল মা।
আমি: (নিশ্চুপ)
আম্মু: তুই এমন করলে তোর চাচ্চু আমাদের ছেড়ে চলে যাবে তুই কি তা চাস? তোর চাচ্চু তো তোর ভালোর জন্যই সবকিছু করছে।
আমি: আম্মু আমি মেঘকে ভালোবাসি আমি ওকে ছেড়ে কানাডা যেতে পারবো না।
আম্মু: ঠিক আছে আমি চলে যাচ্ছি তুই আমাকে কখনো ফোন করবি না থাক তুই মেঘের অপেক্ষায়। (আম্মু কাঁদছেন শুনে তাড়াতাড়ি দরজা খুললাম, ততক্ষণে আম্মু চলে গেছেন। দৌড়ে আম্মুর রুমে আসলাম)

আম্মু বিছানায় বসে কাঁদছেন, চুপচাপ আম্মুর পাশে এসে বসে আম্মুকে জড়িয়ে ধরলাম।
আম্মু: কেন এসেছিস আমার কাছে আমি তোর কে? মেঘ তো তোর সবকিছু মেঘের কাছে ফিরে যা।
আমি: এই একটা মানুষ আর এই বিয়েটা আমাদের সবকিছু উলটপালট করে দিয়েছে তাই না আম্মু?
আম্মু: কাঁদছিস কেন বোকা মেয়ে? বুঝার চেষ্টা কর মেঘ তোকে ভালোবাসে না আর সে জন্যই আমরা তোর আবার বিয়ে দিতে চাইছি।
আমি: কিন্তু আমিতো মেঘকে ভালোবাসি আম্মু।
আম্মু: (নিশ্চুপ)
আমি: মেঘকে আমি সত্যি ভালোবাসি আম্মু আর সারাজীবন বাসতে চাই। আমি কানাডা যাবো কিন্তু বিয়ের জন্য তোমরা আমাকে জোড় করতে পারবে না, যদি করো তাহলে আমি সুইসাইড করবো।
আম্মু: কণা আমার কথা শুন।
আম্মুর ডাকে না দাঁড়িয়ে রুমে চলে আসলাম।

সবকিছু গুছিয়ে নিচ্ছি, কানাডা যাওয়া ছাড়া আর কোনো রাস্তা নেই আমার কাছে। মেঘের জন্য তো আমি আম্মুকে কষ্ট দিতে পারিনা।
জোহা: আপু..
আমি: হুম।
জোহা: নাও। (জোহার দিকে তাকালাম আমার দিকে ফোন এগিয়ে দিলো)
আমি: কে?
জোহা: ভাইয়া।
আমি: (নিশ্চুপ)
জোহা: চলেই তো যাচ্ছ শেষবার কথা বলে নাও। (ফোনটা হাতে নিয়ে বারান্দায় চলে আসলাম)

ফোনের দুপাশে দুজন চুপচাপ হয়ে আছি কেউ কোনো কথা বলছি না। মেঘ কাঁদছে বুঝতে পারছি কিন্তু এখন আর কিছু করার নেই। শুধুমাত্র মেঘের একটা ভুলের জন্য আজ সবকিছু উলটপালট হয়ে গেল। একটা মাত্র অবিশ্বাস সবকিছু কেড়ে নিলো।
মেঘ: চলেই তো যাচ্ছ একটু কথা বলো প্লিজ!
আমি: (নিশ্চুপ)
মেঘ: একটা ভুলের শাস্তি এভাবে দিচ্ছ? আরে ভুল তো সবারই হয় তাই বলে ক্ষমা করা যায়না?
আমি: রাখছি বেরুতে হবে।
মেঘ: শুনোনা কণা তুমি যেওনা প্লিজ! আমি তোমার চাচ্চুর কাছে ক্ষমা চাইবো।
আমি: এই কাজটা আগে করলে হয়তো লাভ হতো এখন অনেক দেরী হয়ে গেছে। সব শেষ হয়ে গেছে মেঘ।
মেঘ: কিচ্ছু শেষ হয়নি আমি আসছি।
আমি: মেঘ শুনো..
মেঘ তো ফোন কেটে দিলো, মেঘ বাসায় আসবে নাতো?
আম্মু: কণা তাড়াতাড়ি আয়।
জোহা: আপু চাঁচি ডাকছে।
আমি: হুম।
জোহা: আপু সব কেমন যেন আস্তে আস্তে শেষ হয়ে যাচ্ছে তাই না?
আমি: যে সম্পর্কে বিশ্বাস থাকেনা সে সম্পর্ক একদিন এভাবেই শেষ হয়ে যায়। (চুপচাপ বেরিয়ে আসলাম)

এয়ারপোর্টে বসে আছি আর চারদিকে চোখ বুলাচ্ছি, কেন যেন মনে হচ্ছে মেঘ এখানে আসবে। আর তো কিছুক্ষণ একবার চলে গেলে আর ফিরে আসতে পারবো না চাচ্চু আসতে দিবে না।
জোহা: আপু তোমার দুচোখ এভাবে কাকে খুঁজছে?
আমি: ককই কাকাউকে নাতো।
জোহা: ভালোই যখন বাসো তাহলে ছেড়ে চলে যাচ্ছ কেন?
আমি: সে যে ভালোবাসে না। (জোহার ফোন বেজে উঠলো, ফোন হাতে নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে)
আমি: কি?
জোহা: পপি আপু, নাও তুমিই কথা বলো।
আমি: হুম। (ফোন রিসিভ করে আমি কিছু বলার আগেই পপি কেঁদে উঠলো)
পপি: ভাবি ভাইয়া এক্সিডেন্ট করেছে।
আমি: কি?
পপি: হসপিটালে আছে খুব খারাপ অবস্থা তোমাকে দেখতে চাইছে তুমি একবার আসবে প্লিজ!
আমি: আসছি। (ফোন রেখে বসা থেকে উঠে দাঁড়াতেই আম্মু আমার হাত ধরে ফেললো)
আম্মু: কোথায় যাচ্ছিস?
আমি: আম্মু মেঘ হসপিটালে আমাকে যেতে দাও প্লিজ!
আম্মু: কোথাও যেতে হবেনা।
আমি: আম্মু আমি তোমার সব কথা শুনবো একবার যেতে দাও শুধু।
জোহা: কেন তোমরা এমন করছ? ওরা তো প্রেম করছে না যে তোমরা আলাদা করে দিবে, ওদের বন্ধন তো আল্লাহ্‌ দিয়েছেন তাহলে তোমরা আলাদা করতে চাইছ কেন? ছাড়ো বলছি আপুর হাত। (জোহা আম্মুর হাত সরিয়ে নিতেই দৌড়ে চলে আসলাম)

রাস্তা যেন আজ শেষ হচ্ছে না গাড়ি যেন খুব আস্তে চলছে, জানিনা মেঘের এখন কি অবস্থা। খুব অস্থির লাগছে সবকিছুর জন্য আমি দায়ী, আমার কাছে আসতে গিয়েই তো মেঘের এক্সিডেন্ট হলো।

অক্সিজেন মাস্ক লাগানো অবস্থায় বেডে শুয়ে আছে মেঘ, মা পাশে বসে কাঁদছেন। তোহা একটু দূরে ছিল আমাকে দেখে দৌড়ে এসে জাপটে ধরলো আমাকে। তোহার হাতটা ধরে এক পা দুপা করে এগিয়ে যাচ্ছি মেঘের কাছে…

চলবে😍

নীরবে ভালোবাসি পার্ট: ২৭

নীরবে_ভালোবাসি

পার্ট: ২৭

লেখিকা: সুলতানা তমা

দু মাস পর…

সকালের মৃদু বাতাস সাথে মিষ্টি রোদের লুকোচুরি খেলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে উপভোগ করছি। ইদানীং নিজেকে বেশ অন্যরকম লাগে, কেমন যেন নিজেকে গুছিয়ে নিতে পেরেছি। এখন আর মেঘের কথা ভেবে রোজ রাতে চোখের নোনাজলে বালিশ ভিজাই না। হ্যাঁ মাঝে মাঝে কষ্ট হয় মেঘের সাথে কাটানো স্মৃতি গুলো ভেবে, আবার তোহার কথা ভেবেও কষ্ট হয়। মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় লুকিয়ে গিয়ে একবার তোহাকে দেখে আসি, একবার কোলে নিয়ে জড়িয়ে ধরে ওর মুখে নতুন আম্মু ডাক শুনি। কিন্তু এসব কিছুই করতে পারিনা মেঘের প্রতি একটু একটু করে জমা হওয়া অভিমান গুলো আমাকে এসব করতে দেয় না। এখন নিজেকে বেশ গুছিয়ে নিয়েছি মেঘের কাছে এখন আর ছুটে যেতে ইচ্ছে করে না। সেদিনের পর আর কখনো মেঘের সাথে যোগাযোগ করিনি, অবশ্য করবোই বা কিভাবে সেদিন রাতেই তো আমার ফোনটা ভেঙে ফেলেছিলাম। মাঝে মাঝে আমার অজান্তেই আমার অবচেতন মন মেঘের জন্য অপেক্ষা করতো, মনে হতো এই বুঝি মেঘ এসে বলবে কণা ফিরে চলো। কিন্তু মেঘ আসেনি, এখন আমার অবচেতন মনটাও বুঝে ফেলেছে তাই এখন আর অপেক্ষাও করে না। দু মাসের মধ্যে মেঘ আমার সাথে কখনো যোগাযোগ করার চেষ্টা করেনি, হ্যাঁ মাঝে মাঝে ওই বাসা থেকে ফোন আসতো মা বাবা অথবা দাদী কেউনাকেউ ফোন করতো কিন্তু আমি কথা বলতাম না আজো বলিনা আর হয়তো বলা হবেও না।
জোহা: আপু আপু… (জোহার ডাকে ভাবনা জগৎ থেকে বেরিয়ে আসলাম, নিজেকে স্বাভাবিক করে পিছন ফিরে তাকালাম)
আমি: কিরে কিছু বলবি?
জোহা: নিচে চলো দেখো কারা এসেছে।
আমি: কে এসেছে?
জোহা: নিচে চলো তাহলেই দেখতে পাবে।
জোহা চলে গেল, পিছু পিছু আমিও চলে আসলাম।

দুমাস পর প্রিয় মানুষ গুলোকে আবারো দেখতে পাবো ভাবিনি। মা, বাবা, দাদী আর রুহানকে ড্রয়িংরুমে বসে থাকতে দেখে নিজের অজান্তেই কেঁদে ফেললাম, এ কান্না তো কোনো কষ্টের কান্না নয় প্রিয় মানুষ গুলোকে আবারো একনজর দেখার আনন্দের কান্না।
আম্মু: কণা দেখ কারা এসেছে। (ওদের সবার দিকে তাকিয়েই এক পা দুপা করে সিঁড়ি দিয়ে নামছি)
বাবা: বৌমা সাবধানে পরে যাবে তো। (বাবার কথায় যেন ঘোর কাটলো, মৃদু হাসলাম মানুষ গুলো আমাকে নিয়ে এখনো এতো ভাবে)
মা: কেমন আছ মা? (মায়ের প্রশ্নে কোনো জবাব দিতে পারলাম না চুপচাপ একপাশে দাঁড়িয়ে রইলাম)
দাদী: অনেক রোগা হয়ে গেছিস।
আমি: কেন এসেছেন আপনারা? (হুট করে আমার এমন প্রশ্ন করা বোধহয় ঠিক হয়নি সবাই হা হয়ে তাকিয়ে আছে)
রুহান: এইটা কেমন প্রশ্ন কণা?
বাবা: রুহান থাম, মা তোমার এমন প্রশ্ন করা স্বাভাবিক। আমিও সহজভাবেই উত্তর দিচ্ছি, আমরা এসেছি তোমাকে ফিরিয়ে নিতে।
আম্মু: মানে?
চাচ্চু: ভাবি আজ সবকিছু কণাকে বলতে দাও, ওর সিদ্ধান্তের উপর আজ অনেক কিছু নির্ভর করছে।
আম্মু: হুম।
দাদী: কিরে ফিরে যাবিনা আমাদের সাথে?
আমি: কেন যাবো কার কাছে যাবো?
মা: মেঘ ওর নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে তাইতো…
আমি: (মৃদু হাসলাম)
মা: হাসছ যে?
আমি: এমনি। (আমিতো জানতামই মেঘ একদিন ওর নিজের ভুল ঠিক বুঝতে পারবে আর ভুল বুঝতে পেরে অনুশোচনায় ভোগবে)
বাবা: মা অনেক হয়েছে এবার ফিরে চলো।
আমি: না ওই বাড়িতে ফিরে যাওয়ার মতো কোনো পিছুটান আমার নেই।
রুহান: তোহা? তোহার জন্যও ফিরে যাবে না?
আমি: তোহার মা হবার অধিকার মেঘ আমার থেকে কেড়ে নিয়েছে।
দাদী: কিন্তু দাদুভাই তো এখন নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে।
আমি: তাতে আমার কিছু করার নেই আমি ফিরে যাবো না।
বাবা: যে নিজের ভুল বুঝতে পেরে অনুশোচনায় ভোগে তাকে একটা সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন বৌমা।
আমি: সেদিন আমার কোনো ভুল ছিল না তাও বারবার ভিখারির মতো মেঘের হাত ধরেছিলাম পা ধরেছিলাম একবার আমাকে বুঝার জন্য অনুরোধ করেছিলাম কিন্তু মেঘ আমাকে কোনো সুযোগ দেয়নি সেদিন।
মা: তাই বলে তুমিও…
আমি: হ্যাঁ আমিও মেঘকে কোনো সুযোগ দেবো না। আপনারা আসতে পারেন।
দাদী: আরে কণা আমার কথা তো শুন।
রুহান: কণা শুনো..
কারো ডাকে না দাঁড়িয়ে রুমের দিকে দৌড়ে চলে আসলাম।

রুমের দরজা লাগিয়ে চুপচাপ ফ্লোরেই বসে পড়লাম। কেন এসেছে ওরা? আমিতো সব ভুলেই গিয়েছিলাম নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছিলাম তাহলে কেন ওরা আবার এসে নতুন করে যন্ত্রণা দিচ্ছে আমাকে?

জোহা: আপু চলো বাইরে থেকে ঘুরে আসি। (চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিলাম জোহার কথায় চোখ খুলে তাকালাম ওর দিকে)
আমি: হঠাৎ বাইরে কেন?
জোহা: আঙ্কেল আন্টি চলে যাওয়ার পর থেকে তো এই বিছানাতেই শুয়ে আছ, সকাল গড়িয়ে বিকেল হলো এখনো শুয়েই আছ। বাইরে থেকে ঘুরে আসলে তোমার মন ভালো হবে।
আমি: আমার আবার মন, চাচ্চু বকা দিবে।
জোহা: আব্বু আর চাঁচি তো বাসায় নেই তাইতো যেতে চাচ্ছি।
আমি: বাসায় নেই? কোথায় গেছে?
জোহা: তাতো জানিনা দুজন একসাথেই বেরিয়েছে।
আমি: হুম।
জোহা: চলোনা আপু প্লিজ! এইতো আশেপাশেই ঘুরবো একটু।
আমি: হুম চল।

জোহাকে নিয়ে বাসার থেকে কিছু দূরে একটা পার্কে আসলাম, জোহা আর আমি পাশাপাশি হাটছি। জোহা বারবার আমার দিকে তাকাচ্ছে শুধু।
আমি: কিরে কিছু বলবি?
জোহা: হ্যাঁ যদি বকা না দাও।
আমি: বল।
জোহা: তুমি কিন্তু চাইলে ফিরে যেতে পারতে।
আমি: তুই বলছিস এই কথা?
জোহা: হ্যাঁ। আগে আমি ভাইয়াকে ভুলে যেতে বলেছি কারণ ভাইয়া তখন ভুল করেছিল কিন্তু এখন তো ভাইয়া নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে…
আমি: তুই জানিস মেঘ..
জোহা: আসলে আপু ভাইয়া আমাকে ফোন করেছিল।
আমি: (নিশ্চুপ)
জোহা: ভাইয়া খুব কাঁদছিল প্লিজ আপু তুমি…
আমি: বাসায় চল।
জোহা: আপু শুনোনা..
আমি: বাসায় যাবি কিনা?
জোহা: ভাইয়া আসছে এখানে তোমাকে দেখার জন্য। (কথাটা বলে জোহা মাথা নিচু করে ফেললো, আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি ওর দিকে)
আমি: এসবের মানে কি জোহা?
জোহা: ভাইয়া খুব রিকুয়েস্ট করছিল তা…
আমি: তাই তুই আমাকে এখানে নিয়ে এসেছিস? ওর সাথে আমি কেন দেখা করবো ও কে আমার?
জোহা: আপু শুনো প্লিজ যেও না।

পার্ক থেকে বেরুতেই সামনে মেঘকে দেখে থমকে দাঁড়ালাম, মেঘের কোলে তোহা। মেঘ এসে আমার সামনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো।
তোহা: নতুন আম্মু। (নিজেকে সামলে নিয়ে তোহাকে মেঘের কোল থেকে আমার কোলে নিয়ে আসলাম)
তোহা: তুমি কোথায় ছিলে নতুন আম্মু?
আমি: কোথাও না মামুনি এইতো আমি।
মেঘ: কণা.. (মেঘের ডাকে ওর দিকে তাকালাম, মেঘ শান্ত হয়ে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ সরিয়ে ফেললাম মেঘের দিক থেকে)
মেঘ: কথা বলবে না আমার সাথে?
তোহা: তুমি কি আবার হারিয়ে যাবে?
জোহা: না মামুনি তোমার আম্মু আজ থেকে তোমার সাথেই থাকবে।
তোহা: সত্যি?
আমি: না আম্মু আমি আবার হারিয়ে যাবো তবে চিরত… (মেঘ আমার মুখ চেপে ধরলো, ওর দিকে তাকালাম নিশ্চুপে কাঁদছে মেঘ)
মেঘ: প্লিজ এসব বলো না, তুমি হারিয়ে গেলে…
আমি: আমি হারিয়ে গেলে কারো কিচ্ছু না। (ধাক্কা দিয়ে মেঘ’কে সরিয়ে দিলাম। তোহার কপালে একটা চুমু খেয়ে হনহন করে চলে আসলাম ওদের সামনে থেকে)

জোহা: আপু শুনো প্লিজ।
আমি: হাত ছাড় আমার।
জোহা: আমার কথা তো শুনো প্লিজ।
আমি: বল কি বলবি। (জোহার দিকে ঘুরে তাকালাম, আমার রাগি চোখ দেখে জোহা ভয়ে চুপসে গেল)
আমি: মেঘ’কে ক্ষমা করে ওর কাছে ফিরে যেতে বলবি তো? কেন ফিরে যাবো? তুই তো বলতি এমন ছেলের সাথে সারাজীবন কাটানো যায় না তাহলে এখন কে…
জোহা: আপু ভাইয়া নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে আমাকে সব বলেছে।
আমি: ও কেঁদে কেঁদে বললো আর এমনি তুই সব বিশ্বাস করে নিলি? শুন জোহা বিশ্বাস করি বলা সহজ কিন্তু বিশ্বাস করাটা খুব কঠিন। মেঘ তো খুব বলছে নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে কিন্তু কাল যদি আবারো আগের মতো কিছু ঘটে তাহলে মেঘ আমাকে আবারো অবিশ্বাস করতে দুবার ভাববে না। যে একবার বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে সে বারবার অবিশ্বাস করবে এটাই স্বাভাবিক।
জোহা: হুম বুঝতে পারছি তোমার ভয় হচ্ছে ভাইয়া আবারো এমন করতে পারে এইটা ভেবে কিন্তু আপু আমার মনে হয় ভাইয়াকে একটা সুযোগ দেওয়া উচিত।
আমি: পুরো দু সপ্তাহ আমার মেয়েটা হসপিটালের বেডে শুয়ে ছিল কিন্তু আমি একবারো ওর কাছে যেতে পারিনি ওর মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিতে পারিনি। আর এসব হয়েছে শুধুমাত্র মেঘের জন্য। প্রতিদিন রাতের আধারে লুকিয়ে তোহাকে দেখতে গিয়েছি এজন্য চাচ্চুর কাছে আম্মুর কাছে কতো বকা শুনেছি তুই তো সব জানিস। এতো কষ্ট করে তোহাকে দেখতে যেতাম, মেয়েটা নতুন আম্মু বলে বারবার ডাকতো দূর থেকে শুনতে পেতাম কিন্তু একবারো ওর কাছে গিয়ে ওকে বুকে জড়িয়ে নিতে পারিনি শুধুমাত্র মেঘের জন্য। সেদিন তো মেঘ আমাকে দয়া করেনি একবার তোহার কাছে আমাকে যেতে দেয়নি তাহলে আজ কেন আমি ওকে দয়া করবো?
জোহা: আপু শু…
আমি: চুপচাপ বাসায় চল আর হ্যাঁ মেঘের সাথে আর কোনো যোগাযোগ রাখবি না।
জোহা: হুম।

আম্মু: কিরে কোথায় গিয়েছিলি তোরা? (বাসায় এসে ঢুকতেই আম্মু প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, পাশ ফিরে তাকিয়ে দেখি আম্মু আর চাচ্চু সোফায় বসে আছেন সাথে উকিল। আশ্চর্য হলাম বাসায় হঠাৎ উকিলকে দেখে)
জোহা: এইতো চাঁচি কাছেই একটু হাটতে গিয়েছিলাম।
চাচ্চু: এবার বস এখানে কথা আছে।
আমি: বাসায় হঠাৎ উকিল..
চাচ্চু: এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। অনেকদিন ধরে এই কাজটা করবো ভাবছিলাম কিন্তু সাহস করে উঠতে পারছিলাম না, তবে আজ যখন তুই ও বাড়ির সবাইকে ফিরিয়ে দিলি তখন আমি সাহস পেয়ে গেছি।
আমি: তোমার কথার কোনো কিছুই আমি বুঝতে পারছি না চাচ্চু।
চাচ্চু: এইনে। (চাচ্চু আমার দিকে চারটা টিকেট এগিয়ে দিলেন, টিকেট গুলো হাতে নিয়ে হা হয়ে তাকিয়ে আছি)
আমি: টিকেট কেন চাচ্চু?
আম্মু: আমরা সবাই কানাডা চলে যাচ্ছি।
আমি: মানে?
চাচ্চু: তুই যেভাবে বেঁচে আছিস সেভাবে সারাজীবন কাটানো সম্ভব নয়, তাই আমরা ঠিক করেছি তোর আর মেঘের ডিভোর্স দিয়ে তোকে কানাডা নিয়ে যাবো। আর হ্যাঁ শুধু তাই নয় কানাডা গিয়ে ভালো ছেলে দেখে তোর আবার বিয়ে দিবো আমরা।
আমি: মানে কি চাচ্চু? আমার আর মেঘের ডিভোর্স? আবার অন্যকারো সাথে বিয়ে? কি বলছ এসব চাচ্চু তোমাদের মাথা ঠিক আছে তো?
আম্মু: আমাদের মাথা ঠিক আছে, ঠিক নেই তো তোর মাথা। একটা মরীচিকার জন্য তুই দিনের পর দিন অপেক্ষা করছিস। এভাবে জীবন চলে না কণা, এভাবে দুমাস কাটিয়েছিস হয়তো আরো কয়েক মাস কাটাতে পারবি কিন্তু সারাটা জীবন? কণা তোর সারাটা জীবন পরে আছে সামনে, তুই এভাবে থাকতে চাইলেও আমরা তোকে এভাবে থাকতে দিতে পারিনা।
আমি: কিন্তু কেন আম্মু?
চাচ্চু: কারণ আমরা তোর ভালো চাই।
আমি: আমি ভালো আছি চাচ্চু আর এভাবেই থাকতে চাই।
চাচ্চু: একদম চুপ। তোর কথামতো সবকিছু হবে না শুনেছিস তুই? এইযে ডিভোর্স পেপার সাইনটা করে দে আর আগামীকাল আমাদের ফ্লাইট।
আমি: মেঘকে ভালোবাসি আমি, কোথাও যাবো না আমি এইদেশ ছেড়ে। মেঘ আমাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে তো কি হয়েছে আমি ওকে ভালোবাসি আর সারাজীবন বাসবো শুনেছ তোমরা? আমাকে জোর করো না তাহলে কিন্তু…
চিৎকার করে কথাগুলো বলে দৌড়ে রুমে চলে আসলাম।

বিছানায় শুয়ে মেঘের ছবিটা দেখছি আর কাঁদছি। কেন করলো মেঘ এমন? ভালোই তো ছিলাম দুজন একসাথে, মেঘ আমাকে অবিশ্বাস করে সবকিছু কেন উলটপালট করে দিলো? এখন আমি কি করবো আম্মু আর চাচ্চু তো সবকিছু ঠিক করে ফেলেছে। ইচ্ছে হচ্ছে চিৎকার করে কান্না করি আর সবাইকে বলি “আমি মেঘকে ভালোবাসি আর সারাজীবন ভালোবাসতে চাই, মেঘ আমাকে ভালো বাসুক বা না বাসুক আমি ওকে এভাবেই নীরবে ভালোবেসে যেতে চাই”

জোহা: আপু উঠনা খাবে না অনেক রাত হয়েছে তো।
আমি: (নিশ্চুপ)
জোহা: আর কতক্ষণ এভাবে অন্ধকার রুমে শুয়ে থাকবে? কিছু খেয়ে নাও প্লিজ।
আমি: খাবো না যা তুই।
জোহা: আমিও কিন্তু খাইনি, প্লিজ চলো তুমি না খেলে খাবো না।
আমি: কেন জেদ করছিস?
জোহা: চলো না লক্ষী আপু। (জোহা কাঁদছে দেখে আর শুয়ে থাকতে পারলাম না উঠে খাবার খাওয়ার জন্য চলে আসলাম)

আমি: সবাই খেয়েছে?
জোহা: উঁহু কেউ খায়নি তোমার জন্য।
আমি: আমার জন্য কারো এতো ভাবতে হবে না।
জোহা: হুম তুমি খেয়ে নাও।
চাচ্চু: পছন্দ হয় কিনা দেখতো। (খাবার মুখে দিতে যাবো তখনি চাচ্চু একটা ছবি টেবিলে ছুড়ে দিলেন)
আমি: এইটা কি চাচ্চু?
চাচ্চু: একটা ছেলের ছবি।
আমি: তাতো আমিও দেখতে পারছি কিন্তু ছেলেটা কে?
চাচ্চু: কানাডাতেই থাকে ওর সাথে তোর বিয়ে ঠিক করছি। (চাচ্চুর কথা শুনে রাগ উঠে গেল একবারো আমাকে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন মনে করলো না)
চাচ্চু: ছেলে খুব ভালো অনেক সুখে থাকবি তুই।
আম্মু: কণা রাগ করিস না তোর ভালোর জন্যই…
আমি: আমার ভালো ভাবতে কে বলেছে তোমাদের?
চাচ্চু: ভাইয়ার অবর্তমানে আমিই তোর…
আমি: বিয়ে করবো না আমি শুনেছ তোমরা? আর হ্যাঁ মেঘ’কেও আমি ডিভোর্স দিবো না।
চাচ্চু: তুই মেঘকে ডিভোর্স দিলেও মেঘের কাছে আর ফিরে যেতে পারবি না, ডিভোর্স না দিলেও আর ফিরে যেতে পারবি না।
জোহা: মানে কি আব্বু?
আম্মু: আগামীকাল আমরা কানাডা চলে যাচ্ছি এটাই ফাইনাল।
আমি: যাবো না আমি।
আম্মু: তুই যা বলবি তাইতো আমরা শুনবো না, আমরা ঠিক করেছি মেঘের কাছে আর তোকে ফিরিয়ে দিবো না। আর হ্যাঁ এই ছেলের সাথেই তোর বিয়ে হবে।
আমি: করবো না বিয়ে আর কানাডাও যাবো না। (টেবিলের সব খাবার ছুড়ে ফেলে দিয়ে রুমে চলে আসলাম)

ঘড়ির কাটায় রাত বারোটা পনেরো মিনিট, ঘুম আসছে না কিছুতেই। জানালার কাছে দাঁড়িয়ে রাতের আকাশ দেখছি আর নিশ্চুপে কাঁদছি। বড্ড ভয় হচ্ছে সত্যি যদি কাল চাচ্চু আর আম্মু কানাডা নিয়ে যায় আমাকে তখন আমি কি করবো?
হঠাৎ বারান্দায় কি যেন শব্দ হলো কেঁপে উঠে আস্তে আস্তে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেলাম। বারান্দার দরজা খুলা দেখে বেশ অবাক হলাম, দরজা খুললো কে? দরজায় হাত রাখতেই আচমকা কে যেন আমার হাত ধরে টান দিয়ে আমাকে বারান্দায় নিয়ে আসলো, ভয়ে চিৎকার দিতে যাবো তখনি আমার মুখ চেপে ধরলো। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছি মেঘের দিকে, একহাতে আমার কোমর জড়িয়ে ধরে রেখেছে অন্যহাতে মুখ চেপে ধরে রেখেছে। ওর হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতেই আমার মুখ থেকে হাত সরিয়ে নিলো তারপর কোমরে টান দিয়ে আমাকে ওর কাছে নিয়ে গেল।
আমি: তুতুমমি এএতো রাতে?
মেঘ: কেন ভয় পাচ্ছ?
আমি: কেন এসেছ?
মেঘ: পরে বলছি। (মেঘ আমাকে ওর বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলো, চুপচাপ ওর বুকের সাথে লেপ্টে রইলাম)
মেঘ: আম্মু আর চাচ্চু আমার উপর রেগে আছে দেখে ভয় পাচ্ছ?
আমি: তুমি এসব জানলে কিভাবে?
মেঘ: জোহা বলেছে সবকিছু।
আমি: কাল আমরা কানাডা চলে যাচ্ছি। (মেঘকে ছেড়ে দিয়ে দূরে এসে দাঁড়ালাম। মেঘ এক পা দুপা করে এগিয়ে আসছে আমার দিকে। আমি দেয়ালে আটকে যেতেই মেঘ আমার সামনে এসে দাঁড়ালো)
মেঘ: আমি তোমাকে যেতে দিলে তো তুমি যাবে।
আমার কপালে আসা চুল গুলো কানের পাশে গুঁজে দিয়ে আমার কপালে আলতো করে ওর ঠোঁট ছুঁয়ালো, আমি চোখদুটো বন্ধ করে নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছি…

চলবে😍

নীরবে_ভালোবাসি পার্ট: ২৬

ভালোবাসি

নীরবে_ভালোবাসি

পার্ট: ২৬

লেখিকা: সুলতানা তমা

আম্মু: কণা আর কতক্ষণ এখানে পাগলের মতো বসে কাঁদবি?
আমি: তোহা সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত।
আম্মু: এসব পাগলামি কেন করছিস?
জোহা: ভাইয়া তোমাকে কেবিনের ভিতর যেতে দিচ্ছে না আর তুমি বারান্দায় বসে এমন পাগলামি করছ এসবের কোনো মানে হয় আপু?
আমি: তুই তো জানিস আমি তোহাকে কতোটা ভালোবাসি?
চাচ্চু: কিন্তু মেঘ তো সেটা বুঝতে চাইছে না। রাত এগারোটা বাজে আর কতক্ষণ এখানে বসে থাকবি এবার বাসায় চল মা।
আমি: ওই তো ভাবি আসছে। (ভাবিকে রুম থেকে বেরুতে দেখে দৌড়ে ওর কাছে আসলাম)
আমি: তোহা কেমন আছে?
ভাবি: ভালো আছে এখন, তুমি বাসায় চলে যাও অনেক রাত হয়েছে।
আমি: তোহাকে একবার দেখতে চাই আমি।
ভাবি: কিন্তু কিভাবে সম্ভব মেঘ তো তোহার পাশে বসে আছে।
আমি: আচ্ছা তোহা আমাকে দেখতে চাইছে না?
ভাবি: হুম অনেক বার নতুন আম্মু বলে ডেকেছে কিন্তু মেঘ তোহাকে বলেছে ওর নতুন আম্মু মারা গেছে।
আমি: ওহ আমি মারা গেছি ওর কাছে।
ভাবি: তুমি বাসায় গিয়ে রেস্ট নাও তোমার শরীর একদম ভালো নেই।
আমি: আর ভালো হয়ে কি হবে সব তো হারিয়ে ফেললাম।
ভাবি: আরে কোথায় যাচ্ছ দৌড়ে? (ভাবির ডাকে সাড়া না দিয়ে দৌড়ে হসপিটালের বাইরে চলে আসলাম। আমাদের গাড়ি পার্ক করা দেখেই গাড়িতে উঠে বসলাম, পিছু পিছু আম্মু জোহা আর চাচ্চু আসলেন)
চাচ্চু: কণা তুই পিছনে যা আমি ড্রাইভ করছি।
আমি: (নিশ্চুপ)
চাচ্চু: আরে এক্সিডেন্ট করে ফেলবি তো।
আমি: এটাই তো চাই আমি, কেন এসেছ তোমরা?
আম্মু: এটাই চাস মানে? পাগল হয়ে গেছিস নাকি এমন একটা ছেলের জন্য মরতে চাইছিস যে তোকে বিশ্বাসই করে না।
আমি: ওর কাছে নাকি আমি মৃত…
জোহা: তাই বলে মরে যেতে হবে? জীবন থাকলে এমন দুটাকার ছেলে অনেক আসবে।
আমি: জোহা..
জোহা: চিৎকার করো না, তুমি ওর জন্য কাঁদছ আবার? আমি হলে তো ডিভোর্স পেপারটা ওর মুখে ছুড়ে দিয়ে আসতাম। যে আমাকে বিশ্বাস করে না সবার সামনে আমার ভালোবাসাকে ছোট করে তার জন্য কেন কাঁদবো আমি? এসব আবেগ ছাড়ো আপু আর ওকে ভুলে যাও।
চাচ্চু: জোহা একদম ঠিক বলেছে, এবার বাসায় চল আর পাগলামি করিস না। (চুপচাপ পিছনে এসে বসে পড়লাম। সত্যিই তো মেঘ আমার ভালোবাসাকে সবার সামনে ছোট করেছে। হ্যাঁ ওর থেকে দূরে থাকতে পারবো যতো কষ্টই হউক। কিন্তু ভুলতে পারবো না ওকে, কারণ মেঘকে যে আমি বড্ড বেশি ভালোবাসি)

ঘড়ির কাটায় রাত তিনটা বাজে, বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাতের আকাশ দেখছি। দুচোখের পাতা কিছুতেই এক হচ্ছে না, জানিনা আমার তোহা এখন কি করছে। মেঘকে ফোন করলে তো রেগে যাবে কিযে করি। আচ্ছা ভাবিকে তো ফোন করতে পারি? ভাবির কথা মনে পড়তেই সাথে সাথে ফোন দিলাম।
ভাবি: কণা..
আমি: ভাবি তোহা কি করছে কেমন আছে ও?
ভাবি: শান্ত হও বলছি, তোহা ভালো আছে ঘুমুচ্ছে তুমি টেনশন করো না।
মেঘ: শায়লা কার সাথে কথা বলছ?
ভাবি: না মামানে…
মেঘ: তুমি কি চাইছ আমি তোমাকেও তোহার কাছে আসতে না দেই?
ভাবি: না না…
মেঘ: তাহলে ফোনটা রেখে দাও কাউকে আমার মেয়ের খবর দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
ভাবি: হুম। (ভাবি ফোনটা কেটে দিলো। বিশ্বাসই করতে পারছি না মেঘ আমার সাথে এমন করছে)

বারান্দায় রেলিং এ হেলান দিয়ে ফ্লোরে বসে আছি আর মেঘের সাথে কাটানো সুন্দর মুহূর্ত গুলোর কথা ভাবছি, হঠাৎ ফোন বেজে উঠলো রাত সাড়ে তিনটার দিকে কে ফোন দিলো ভাবতে ভাবতে রিসিভ করলাম।
আমি: হ্যাল…
মামা: মামুনি রাতের ঘুম কেড়ে নিলাম তো?
আমি: (নিশ্চুপ)
মামা: আরো করবো মেঘ আর তোমাকে পুরোপুরি আলাদা করে তবেই আমার শান্তি হবে।
আমি: মানুষ এতোটাও খারাপ হয় মামা?
মামা: আমি খারাপ আর আমার খারাপি আরো দেখবে জাস্ট ওয়েট করো।
আমি: আর কি করার বাকি আছে তোমার?
মামা: অনেক কিছু বাকি আছে এখনো তো কিছুই করিনি, তোর আম্মু আমাকে যতটা যন্ত্রণা দিয়েছে তারচেয়ে বেশি যন্ত্রণা আমি তোকে দিবো।
আমি: তুমি অন্যায় করেছিলে আম্মু তো মামিকে মেনে নিয়েছিল এমনকি সবাইকে বুঝিয়েছিল তাহলে আম্মুর দোষ কোথায় আম্মুর উপর প্রতিশোধ নিতে চাইছ কেন?
মামা: সম্পত্তি পাওয়ার জন্য তোর আম্মু বাবা মা’কে বলে আমাকে পুলিশে দিয়েছিল..
আমি: ভুল ভাবছ মামা, আম্মুর যদি সম্পত্তির লোভ থাকতো তাহলে সবকিছু নিজের নামে করে নিতো ডোনেট করতো না।
মামা: সব মিথ্যে নাটক আমি জানি এখন তোদের যা কিছু আছে স…
আমি: সব আব্বুর গড়ে তুলা তুমি আম্মুকে ভুল ভাবছ।
মামা: আমি ভুল নই তোর আম্মুর শাস্তি আমি তোকে দিবো। মেঘ আর তোকে তো আলাদা করেছি শুধু এখন তোদের ডিভোর্স হবে।
আমি: সে সুযোগটা আমি তোমাকে দেবো না মামা, অনেক পাপ করেছ এবার তো আমি তোমাকে শাস্তি দিবোই।
মামা: ট্রাই করতে পারো মামুনি।
ফোন কেটে দিলাম, এবার সব আমাকেই করতে হবে।

চাচ্চু: আমি যখন বলেছি তাহলে আজকের মধ্যেই ওকে এরেস্ট করতে হবে নাহলে…(সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে ড্রয়িংরুমে আসতেই দেখি চাচ্চু কার সাথে যেন ফোনে কথা বলছেন, পাশে আম্মু বসে কাঁদতেছেন। কিছু না বুঝে আম্মুর পাশে এসে বসলাম)
চাচ্চু: হ্যাঁ আজকেই আর কয়েক ঘন্টার মধ্যে। (চাচ্চু ফোন রাখতেই চাচ্চুর দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম)
চাচ্চু: ওহ তুই উঠে পড়েছিস?
আমি: কার সাথে কথা বলছিলে চাচ্চু?
চাচ্চু: পুলিশের সাথে।
আমি: কাকে এরেস্ট করার কথা বললে?
চাচ্চু: কাকে আবার সামাদ কে, অনেক জ্বালিয়েছে আর সেটা পুলিশের বোকামির জন্য। এতোদিন হয়ে গেল এখনো এরেস্ট করতে পারছে না…
জোহা: আব্বু চা, আপু নাও..
আমি: ভালো লাগছে না খাবো না।
জোহা: এমন করলে হবে নাকি?
আম্মু: রাতে তো ঘুমাসনি ভোরবেলায় ঘুমিয়ে এখনি উঠে পড়েছিস চা’টা খেয়ে গিয়ে রেস্ট নে।
আমি: একটু হসপিটালে যা…
চাচ্চু: আর একবার যদি তোর মুখে এই কথা শুনেছি তাহলে…
আম্মু: আহ বকো না ওকে, বুঝিয়ে বলো।
জোহা: আপু পিচ্ছি নাকি যে বুঝাতে হবে? গতকাল ভাইয়া আপুকে সবার সামনে এতো অপমান করলো আপু ভাইয়ার পা ধরলো আর ভাইয়া কি করলো আপুকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো, এতোকিছুর পরও আপুকে নতুন করে বুঝাতে হবে?
আমি: আমিতো গিয়েই চলে আস…
চাচ্চু: যেতে হবে না চুপচাপ রুমে যা।
আমি: হুম।

হাটুতে মাথা নিচু করে রেখে রুমের এক কোণে ফ্লোরে বসে আছি কিছু ভালো লাগছে না, তোহাকে একটাবার দেখার জন্য মন চটপট করছে। মেঘের এমন ব্যবহারের পর চাচ্চু বা আম্মু কেউই আমাকে হসপিটালে যেতে দিবে না সেটা ভালো ভাবেই বুঝতে পারছি। কিন্তু মন যে মানছে না তোহাকে একবার দেখার জন্য মন পাগল হয়ে আছে। ভাবিকেও ফোন দিতে পারছি না মেঘ যদি রেগে গিয়ে ভাবিকে তোহার থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। মেঘ এমন কিভাবে করতে পারলো ভাবতেই পারছি না, এতগুলো মাস মেঘের সাথে ছিলাম কিন্তু মেঘ আমাকে এতটুকুও বিশ্বাস করতে পারেনি উল্টো কিসব বাজে বাজে কথা বলেছে আমাকে সবার সামনে।
জোহা: আপু.. (জোহার ডাকে তাড়াতাড়ি চোখের পানি মুছে নিলাম)
জোহা: জানালা গুলো বন্ধ করে রুম এতো অন্ধকার করে রেখেছ কেন?
আমি: (নিশ্চুপ)
জোহা: আপু আমি বুঝতে পারছি তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে কিন্তু তুমিই বলো যে তোমাকে সম্মান করেনা বিশ্বাস করেনা তোমার ভালোবাসাকে সম্মান করেনা তার সাথে কি তোমার সারাজীবন কাটানো সম্ভব? (জোহা জানালা গুলো খুলে দিয়ে এসে আমার পাশে বসে চুলে হাত বুলিয়ে দিলো, ওর দিকে অসহায়ের মতো তাকিয়ে আছি)
জোহা: এভাবে অন্ধকার রুমের এক কোণে পরে থাকলে হবে না আপু নিজেকে শক্ত করো।
আমি: হুম।
জোহা: আচ্ছা তুমি কয়েকটা দিন ভাইয়ার থেকে দূরে থাকো তারপর দেখো ভাইয়া তোমার কাছে ফিরে আসে কিনা, কি এইটুকু তো পারবে নাকি?
আমি: হুম পারবো কিন্তু তোহার থেকে দূরে থাকতে পারবো না।
জোহা: আরে কেঁদো না, দেখো ভাইয়া যদি তোমাকে তোহার কাছে যেতে না দেয় তাহলে তো আমাদের কিছু করার নেই, নিজেকে শক্ত করো দেখো সব ঠিক হয়ে যাবে।
আমি: (নিশ্চুপ)
জোহা: এবার উঠে খাবারটা খেয়ে নাও আমি টেবিলের উপর রেখে গেলাম।
জোহা খাবার রেখে চলে গেল। পাশে রাখা ফোনের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি আর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি মেঘের ফোনের, হয়তো মেঘ ফোন করবে না কিন্তু মন চাইছে ওর ফোনের অপেক্ষা করতে।

সকাল পেরিয়ে বিকেল নেমে আসলো কিন্তু মেঘ একটা ফোনও করলো না, হয়তো আর কখনো করবেও না কারণ আমাদের পথ যে এখন আলাদা।
চাচ্চু: কণা মা একটা গুড নিউজ আছে। (জানালার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলাম চাচ্চুর কথা শুনে পিছন ফিরে তাকালাম, চাচ্চু হাসি হাসি মুখে দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন)
আমি: কি বলো।
চাচ্চু: সামাদ এরেস্ট হয়েছে আ..
আমি: অহ!
চাচ্চু: কিরে তুই খুশি হসনি?
আমি: আমার যা ক্ষতি হবার তাতো হয়েই গেছে এখন আর খুশি হয়ে কি লাভ।
চাচ্চু: দেখিস সব ঠিক হয়ে যাবে, এখন চল তো খুনিটাকে একবার দেখে আসি।
আমি: না চাচ্চু আমার ভালো লাগছে না তুমি গিয়ে দেখে এসো।
চাচ্চু: আমিতো ভেবে ছিলাম তুই গিয়ে ওকে কয়েকটা থাপ্পড় দিয়ে আসবি।
আমি: (মৃদু হাসলাম)
চাচ্চু: আসছি তাহলে।
চাচ্চু চলে গেলেন, এখন আর ওকে থাপ্পড় দিয়ে কি হবে মেঘ তো আর আমার জীবনে ফিরে আসবে না।

সন্ধ্যা নেমে এসেছে একটু পর চারদিক অন্ধকার হয়ে আসবে, ফ্লোরে বসে মেঘের ফোনের অপেক্ষা করছি আর ভাবছি মেঘ ফোন না করলে এই অন্ধকারে লুকিয়ে একবার তোহাকে দেখতে যাবো। হঠাৎ ফোনের রিংটোন বেজে উঠলো, মেঘ নয় ভাবি ফোন করেছে হয়তো তোহার কোনো খবর দিবে তাড়াতাড়ি রিসিভ করলাম।
আমি: হ্য..
ভাবি: তুমি তাড়াতাড়ি হসপিটালে চলে এসো।
আমি: কেন?
ভাবি: মেঘ বাসায় গেছে ঘণ্টা দুয়েক এর মধ্যে আসার সম্ভাবনা নেই। এখানে আমি আর পপি ছাড়া আর কেউ নেই তোহাকে দেখার জন্য তাড়াতাড়ি চলে আসো।
আমি: ঠিক আছে আমি এক্ষণি আসছি।
ফোন রেখে বেরিয়ে পড়লাম চাচ্চু থানায় গেছে এটাই সুযোগ।

আমি: আমার তোহা কোথায়? (দৌড়ে এসে কেবিনের ভিতর ঢুকলাম, আমার কন্ঠ শুনেই তোহা চোখ খুলে তাকিয়ে মিষ্টি একটা হাসি দিলো)
তোহা: নতুন আম্মু তুমি এসেছ?
আমি: হ্যাঁ আম্মু এসেছি। (তোহার পাশে বসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম, তোহা আমার হাত ওর একটা হাত দিয়ে ধরে আমার দিকে তাকালো)
আমি: কি মামুনি?
তোহা: তুমি তো বলেছিলে কেউ আকাশের তারা হয়ে গেলে আর ফিরে আসতে পারে না তাহলে তুমি ফিরে আসলে কিভাবে? আব্বু তো বলেছে তুমি আকাশের তারা হয়ে গেছ।
আমি: (নিশ্চুপ)
পপি: তোমার আব্বু তো পঁচা তাই তোমাকে মিথ্যে বলেছে।
মেঘ: বাহ্ অসাধারণ… (মেঘের কন্ঠ শুনে কেঁপে উঠে পিছনে তাকালাম, মেঘ রাগি চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে)
পপি: ভাইয়া প্লিজ আমার কথা শুনো।
মেঘ: আমি বেরিয়ে যেতেই ওকে খবর দিয়ে আনা হয়েছে? তারমানে আমার আন্দাজ ঠিক ছিল..
ভাবি: আন্দাজ?
মেঘ: কিছুটা রাস্তা যাওয়ার পর আমার মনে হলো আমি নেই এই সুযোগে তোমরা ওকে ফোন করে আসতে বলতে পারো তাইতো ফিরে আসলাম আর এসেই…
আমি: মেঘ আমার কথা শুনো ওদের কোনো দোষ নেই আমি নিজে থেকেই এসেছি।
মেঘ: একদম চুপ আমি তোমার সাথে একটা কথাও বলতে চাই না।
তোহা: আব্বু নতুন আম্মুকে বকো না থাকুক না আম্মু আমার কাছে।
মেঘ: ওর হাতটা ছেড়ে দাও তোহা, এমন খারাপ কোনো মেয়ের সাথে আমি তোমাকে…
পপি: কাকে খারাপ বলছ তুমি ভাইয়া?
মেঘ: যার নষ্টামির জন্য আমার মেয়ে হসপিটালের বেডে শুয়ে আছে।
আমি: মেঘ ওই লোকটা আমাকে আটকে রেখেছিল তোহাকে যেন আটকাতে না পারি আর তুমি কিনা এসব খারাপ কথা ভাবছ ছিঃ।
মেঘ: আটকে রেখেছিল? আচ্ছা মানলাম আটকে রেখেছিল কিন্তু কাজটা তো তোমার মামা করেছে আমার মামা নয়।
ভাবি: আজ যদি এই একি কাজ কণার মামা না করে তোমার মামা করতো তাহলে কি করতে মেঘ?
মেঘ: আর যাই করতাম নষ্টামি… (ঠাস করে মেঘের গালে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিলাম)
আমি: দুদিন ধরে তোমার মুখে এসব খারাপ কথা শুনছি কিন্তু আর নয়, আর শুনবো না। কেন শুনবো আমি খারাপ নাকি? তোমাকে যখন বারবার ফাঁসানো হয়েছিল তখন তোমাকে আমি বুঝার চেষ্টা করেছি দুজন মিলে সবটা সামলে নিয়েছি কিন্তু তুমি? সবার সামনে আমাকে অসম্মান করছ, আমাকে বিশ্বাস করছ না উল্টো খারাপ কথা বলে আমার ভালোবাসাকে ছোট করছ…
মেঘ: বেশ করেছি আরো করব, তুমি কারো ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য নও।
আমি: ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য তো তুমি না, যে মনের দিক থেকে এতো ছোট তাকে আর যাই হউক ভালোবাসা যায় না।
মেঘ: বেসো না কে বলেছে ভালোবাসতে? আ…
আমি: বাসি না তোমার মতো ছোট মনের মানুষকে আমি ঘৃণা করি। আজ থেকে তোমার আর আমার পথচলা আলাদা। তোহাকে আমার থেকে কেড়ে নিয়েছ তো? আর কখনো আমাকে ফিরে পাবে না। যখন নিজের ভুল বুঝতে পেরে হাউমাউ করে কাঁদবে তখন আর আমি ফিরে আসবো না।
তোহার কপালে একটা চুমু দিয়ে বেরিয়ে আসলাম।

এলোপাথাড়ি ভাবে গাড়ি চালাচ্ছি ইচ্ছে হচ্ছে এক্সিডেন্ট করে মরে যাই, এমন অপমান অবহেলার চাইতে মরে যাওয়া অনেক ভালো। কিন্তু নিজের মনকে শক্ত করে নিলাম আমাকে বাঁচতে হবে, মেঘের অনুশোচনায় ভোগা আর হাউমাউ করে কান্না দেখার জন্য আমি বেঁচে থাকবো। কিন্তু সেদিন আর মেঘের কাছে ফিরে যাবো না। মেঘকে সেদিন বুঝাবো অবহেলার যন্ত্রণা কতটুকু।

রাতের আধারে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বারবার চোখের পানি মুছে ফেলার বৃথা চেষ্টা করছি। মেঘকে তো খুব করে বলে আসলাম ওর মতো ছোট মনের মানুষকে আমি ঘৃণা করি কিন্তু সত্যি তো এটাই আমি মেঘকে আগের মতোই ভালোবাসি আর সারাজীবন বাসবো। চাইলে তো আমি মেঘকে ডিভোর্স দিয়ে কানাডা চলে যেতে পারি কিন্তু আমি এসব করতে পারবো না কারণ মেঘকে যে আমি বড্ড বেশি ভালোবাসি। কিন্তু মেঘ? মেঘ আমাকে ভালোবাসে না ভাবতেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসলো… “আমাকে তুমি যতো দূরেই ঠেলে দাওনা কেন মেঘ তোমাকে আমি সারাজীবন এভাবেই নীরবে ভালোবেসে যাবো”

চলবে😍

নীরবে_ভালোবাসি পার্ট: ২৫

নীরবে_ভালোবাসি

পার্ট: ২৫

লেখিকা: সুলতানা তমা

আয়নার সামনে বসে চুল আছড়াচ্ছি আর ভাবছি ঘুরতে না গেলেই ভালো হতো। যে আমাকে এতো সন্দেহ করে তার সাথে ঘুরতে যাবো কেন? কিন্তু উপায় নেই তোহার জন্য যেতেই হবে।
এসব ভাবতে ভাবতে আনমনে হয়ে চুলে খোঁপা করছিলাম হুট করে মেঘ এসে পিছনে দাঁড়ালো, দেখেও না দেখার ভাণ করে খোঁপা ঠিক করতে মন দিলাম। উঠতে চাইলাম তখনি মেঘ পিছন থেকে আমার গলা জড়িয়ে ধরলো, বসতেই ও বেলী ফুলের মালা দুটু চুলের খোঁপায় পেঁচিয়ে দিলো। আয়নায় মেঘের দিকে হা করে তাকিয়ে আছি, মেঘ মুচকি হেসে সরে গেল। আমি উঠে শাড়ি ঠিক করছি কুচিগুলো সব এলোমেলো হয়ে গেছে, হুট করে মেঘ এসে আমার পায়ের কাছে বসে পড়লো।
মেঘ: দাও আমি ঠিক করে দিচ্ছি। (কিছুনা বলে সরে আসলাম, মেঘ আবারো আমার কাছে আসলো)
মেঘ: সব গুলো কুচি এলোমেলো হয়ে গেছে দাও ঠিক করে দিচ্ছি।
আমি: লাগবে না আমি একাই পারবো।
মেঘ: কণা এবার কিন্তু বেশি হয়ে যাচ্ছে। আমিতো সব ভুলে রাতে তোমার রাগ ভাঙাতে চেয়েছিলাম কিন্তু তুমি কি করলে? তোহা আর আমাকে রেখে সোফায় গিয়ে ঘুমালে।
আমি: বেশ করেছি সোফায় ঘুমিয়েছি বেশি কথা বললে ঘুরতে যাবো না।
মেঘ: কণা আর কতোবার সরি বলবো?
আমি: যে মনের মধ্যে সন্দেহ পুষে রেখে উপরে সরি বলে তার সাথে আমার কোনো কথা নেই সরো এখান থেকে।
মেঘ: এতো পাগলামি করো কেন? (চলে আসছিলাম মেঘ পিছন থেকে আমার হাত টেনে ধরলো)
আমি: ছাড়ো তো!
মেঘ: ঘুরতে যাচ্ছি কোথায় হাসি মুখে থাকবে তা না প্যাচির মতো মুখ করে রেখেছ।
আমি: প্যাচিই ভালো, হয়েছে?
মেঘ: না হয়নি তোমাকে হাসি মুখে যেতে হবে। (আমাকে টেনে ওর কাছে নিয়ে গেল, আমার দুগালে ধরে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে)
আমি: তুমি বুঝনা কেন তোমাকে যেমন বারবার ফাঁসানো হয়েছিল আমাকেও সেভাবে ফাঁসানো হচ্ছে। আচ্ছা তুমি ভাবলে কিভাবে আমি তোমাকে এতো ভালোবাসি তারপরও অন্য কারো সাথে.. ছিঃ এসব ভাবতেই তো রাগ হচ্ছে।
মেঘ: বললাম তো সরি।
আমি: লাগবে না। (মেঘ আমাকে টেনে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলো, ইচ্ছে হচ্ছে কান্না করি কিন্তু বেরুনোর সময় কাঁদলে মেঘ রেগে যাবে)
মেঘ: তোমাকে আজ খুব সুন্দর লাগছে। (মেঘ আমার নাকে গালে ঠোঁটে ওর ঠোঁট ঘষছে, চোখ দুটু বুজে ফেললাম। মেঘ আলতো করে ঠোঁট দুটু ওর ঠোঁটের ভিতরে নিয়ে গেল)
পপি: এএএ আমি কিছু দেখিনি। (পপির কন্ঠ শুনে মেঘ আমাকে ছেড়ে দূরে সরে গেল, ইসস কি লজ্জাটাই না পেলাম মেঘটা যে কি হুটহাট এসব শুরু করে)
রুহান: আমরা রেডি চলো। (রুহান শার্টের হাত ঠিক করতে করতে রুমে এসে ঢুকলো, আমার আর পপির দিকে তাকিয়ে আছে)
রুহান: কি ব্যাপার দুজনেই নীরব কেন?
পপি: সেদিনেরটা শোধ হয়ে গেছে।
রুহান: মানে?
আমি: দাঁড়াও ফাজি মেয়ে।
তোহা: আমি রেডি।
রুহান: তোহাকে তো আজ একদম পরীর মতো লাগছে।
তোহা: আমিতো পরীই আমার আব্বু আম্মুর পরী।
আমি: চলো মামুনি।
রুহান: ভাইয়া এসো।

ড্রয়িংরুমে আসতেই দেখি বাবা মা আর দাদী বসে গল্প করছেন।
মেঘ: আম্মু যাচ্ছি।
মা: সাবধানে..
আমি: আপনারা গেলে ভালো হতো।
পপি: হ্যাঁ আম্মু তোমরা না করলে কেন?
বাবা: বুড়ো বয়সে ঘুরাফেরা ভালো লাগেনা তোরা ঘুরে আয়।
রুহান: ঠিক আছে।
মেঘ আমি তোহা আর রুহান পপি সবাই বেরিয়ে পড়লাম, উদ্দেশ্য তোহাকে নিয়ে শিশু পার্কে যাওয়া।

রিক্সায় বসে আছি আর বারবার মেঘের দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছি, সন্দেহ করে আবার ভালোও বাসে। একহাতে তোহাকে ধরে আছে অন্যহাতে আমার কোমর জড়িয়ে ধরে আছে, মনে হচ্ছে আমি তোহার মতো ছোট বাচ্চা যেকোনো সময় রিক্সা থেকে পড়ে যেতে পারি তাই ও এভাবে আগলে রেখেছে।
মেঘ: এভাবে বারবার দেখোনা তো নজর লেগে যাবে। (মেঘের কথা শুনে ফিক করে হেসে দিলাম, ও অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে)
মেঘ: পপির কথামতো রিক্সায় করে না আসলে এতো সুন্দর মুহূর্তটা মিস করে ফেলতাম।
তোহা: হ্যাঁ ফুফিই তো আমাকে বলেছিল ঘুরতে যাওয়ার কথা তোমাদের বলার জন্য।
মেঘ: ওরে ফাজি মেয়ে এখন নাম বলা হচ্ছে?
তোহা: ফুফি নিষেধ করেছিল। (তোহা ওর ছোট ছোট কোমল হাত দুইটা মুখে চেপে ধরে হাসছে মনে হচ্ছে ও সব বুঝে, মুগ্ধ হয়ে ওর এই হাসি দেখছি আমি)
মেঘ: কণা সরি।
আমি: কেন?
মেঘ: আসলে এসব পিক দেখে মাথা ঠিক ছিল না…
আমি: এসব ওরা ইচ্ছে করেই করেছে আমাদের আলাদা করার জন্য।
মেঘ: হুহ বললেই হলো নাকি? আমাদের দুজনকে কেউ আলাদা করতে পারবে না।
আমি: (নিশ্চুপ)
মেঘ: কণা ভালোবাসি তোমায়।
তোহা: আমি শুনে ফেলেছি। (কণা হাত তালি দিচ্ছে দেখে ওর দুহাত মুঠো করে ধরলাম)
আমি: মামুনি চুপ।
তোহা: হিহিহি..
আমি: মেঘ তুমিও না।
মেঘ: আমি কি করে জানবো এই পুঁচকে মেয়ে যে বুঝে ফেলবে।
তোহা: আমি সব বুঝি আমাকে ফুফি সব শিখিয়েছে।
মেঘ: আজ পপির খবর আছে এই মেয়েকে ফাজি পপিই বানাচ্ছে।
তোহা: ফুফিকে কিছু বললে তোমার কান মলে দিবো হুম।
আমি: মামুনি চুপ করো তোমার আব্বু রেগে গেলে কিন্তু ঘুরতে নিয়ে যাবে না।
তোহা: ওকে চুপ। (তোহা একটা হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেললো আসলেই ফাজি মেয়ে একটা)

পার্কে আসতেই তোহা ছুটাছুটি শুরু করে দিলো। পপি আর রুহান আলাদা গিয়ে বসলো, মেয়েকে এভাবে একা ছাড়া ঠিক হবে না তাই আমি তোহার কাছে চলে আসলাম।
তোহা: নতুন আম্মু চলো খেলবো। (তোহা আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল)

তোহার সাথে আমিও ছুটাছুটি করছি, মনে হচ্ছে অনেক দিন পর একটু শান্তি পাচ্ছি। হঠাৎ মেঘের দিকে চোখ পড়লো একটু দূরে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টিতে। মেঘের দিকে এগিয়ে আসলাম।
আমি: থ্যাংকস!
মেঘ: কেন?
আমি: এইযে এমন একটা জায়গায় নিয়ে আসলে, মনে হচ্ছে সব বাচ্চাদের মতো আমিও বাচ্চা হয়ে যাই।
মেঘ: তুমি তো বাচ্চাই যেভাবে ছুটাছুটি করছিলে মনে হচ্ছিল কোনো বাচ্চা মেয়ে অনেকদিন পর তার স্বাধীনতা ফিরে পেয়েছে। অবশ্য তুমি তো স্বাধীনতা পেয়েই বড় হয়েছ, শুধু বিয়ের পর আমি তোমার সবকিছু কেড়ে নিয়েছি।
আমি: মানে কি?
মেঘ: এইযে তোমার কতো সুন্দর একটা জীবন ছিল, হুট করে আমাদের বিয়ে হলো তারপর একটার পর একটা ঝামেলা লেগেই আছে।
আমি: তাতে তো তোমার দোষ নেই এসব তো আমারই মামা করেছে।
মেঘ: হুম তবুও…
আমি: ঘুরতে এসেছ কি এসব শুনানোর জন্য?
মেঘ: এই রাগ করনা প্লিজ তোহার কাছে যাও আমি মা মেয়ে দুজনকে মুগ্ধ হয়ে দেখি। (মেঘের কথা শুনে মুচকি হেসে তোহার দিকে এগিয়ে গেলাম)

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে এসেছে আর কিছুক্ষণ এখানে থাকলে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে আসবে এবার যাওয়া প্রয়োজন। মেঘের দিকে এগিয়ে গেলাম।
আমি: বিকেল হয়ে এসেছে বাসায় চলো।
মেঘ: রুহান আর পপিকে ডাক দাও আমি তোহাকে নিয়ে আসছি। (রুহানদের হাত দিয়ে ইশারা দিতেই ওরা উঠে চলে আসলো)
তোহা: আমি যাবো না আমি এখানে আরো কিছুক্ষণ থাকবো। (তোহা মেঘের কোল থেকে জোড় করে নেমে যাচ্ছে দেখে এগিয়ে গিয়ে ওকে আমার কোলে আনলাম)
আমি: মামুনি সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে তো আর এখানে থাকা যাবে না আমরা আর একদিন আসবো কেমন?
তোহা: সত্যি আসবে তো?
আমি: হ্যাঁ আসবো।
তোহা: তাহলে বাসায় চলো।

পার্ক থেকে বেরিয়ে রিক্সার জন্য দাঁড়িয়ে আছি, রুহান রিক্সা ডাকতে গেল। পপির ফোন বাজছে ফোন নিয়ে পপি কিছুটা দূরে চলে গেল।
তোহা: আব্বু ওইযে বেলুন। (তোহা আঙ্গুল দিয়ে রাস্তার অপর পাশে বেলুন দেখাচ্ছে)
মেঘ: তোমার আম্মুর কাছে দাঁড়াও আমি নিয়ে আসছি।
তোহা: ঠিক আছে। (মেঘ চলে যেতেই তোহা আমার আঙ্গুল ধরে আমার দিকে তাকালো)
আমি: কি মামুনি?
তোহা: কিছুনা। (তোহা আমার মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে)
তোহা: তোমার মতো আম্মু যেন সবার হয়। (তোহা মুচকি হাসলো আমিও হেসে তোহার নাক টেনে দিলাম)
–এইযে (পিছন থেকে কেউ ডাকছে শুনে পিছন ফিরে তাকালাম, তাকাতেই দেখি সেই লোকটা। আতকে উঠে মেঘের দিকে তাকালাম ও বেলুন কিনছে এদিকে তাকাচ্ছেই না)
আমি: আপনি?
তোহা: নতুন আম্মু এই পঁচা লোকটা কে? (তোহার কথা শুনে ওর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলাম)
–বলেছিলাম তো আমি সবসময় তোমাকে ফলো করি। পিক দিয়ে কোনো কাজ হয়নি কিন্তু আজ হবে, আমি তোদের আলাদা করব আজ। (লোকটা জোড় করে আমার হাত দুটু চেপে ধরলো, তোহার হাত আমার হাত থেকে ছুটে গেল। তোহার দিকে তাকালাম ভয়ে চুপসে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটার হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করছি কিন্তু পারছি না)
আমি: মেঘ.. (মেঘকে ডাক দিতে গিয়ে মাঝ রাস্তায় নজর পড়লো তোহা মাঝ রাস্তায় চলে গেছে, মেঘ আমার হাত লোকটার হাতের মুঠোয় দেখে দাঁড়িয়ে আছে)
আমি: মেঘ তোহা..(মেঘ তো আমার ডাক শুনছেই না রাস্তার দিকেও তাকাচ্ছে না যে তোহাকে দেখবে)
আমি: পপি তোহা মাঝ রাস্তায় চলে গেছে। (পপি পিছন ফিরে তাকিয়েই তোহার দিকে দৌড় দিল, পপির দৌড়ানো দেখে মেঘও তোহার দিকে তাকালো। দুজনেই দৌড়ে আসছে কখন জানি গাড়ি চলে আসে)
আমি: ছাড় বলছি আমার মেয়ে…
–তোর মামার গাড়ি এসে তোর মেয়েকে পিষে ফেলবে তারপর ছাড়বো। (ওর কথা শুনে তোহার দিকে তাকালাম একটা প্রাইভেট কার একদম তোহার কাছে, চিৎকার দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললাম। লোকটা আমার হাত ছেড়ে দিলো সব কেমন যেন নীরব লাগছে, চোখ খুলে তোহার দিকে তাকালাম রক্তে লাল হয়ে নিথর হয়ে পরে আছে তোহা। দৌড়ে তোহার দিকে এগিয়ে আসলাম)

মেঘ বোবার মতো বসে আছে রুহান কোথা থেকে যেন দৌড়ে আসলো চারপাশে শুধু মানুষ, তোহার মাথাটা আমার কোলের উপর রাখলাম।
পপি: তোহা কথা বল মামুনি।
আমি: তোহা…(তোহা তো নিথর হয়ে পরে আছে চোখ খুলছে না)
রুহান: ছাড়ো ওকে হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে। (রুহান আমার থেকে তোহাকে নিয়ে একটা গাড়িতে উঠে বসলো, সবকিছু কেমন যেন ঝাপসা লাগছে। পপি আমার হাত ধরে টান দিয়ে গাড়িতে বসিয়ে দিলো। গাড়ি হসপিটালের দিকে ছুটছে, এক মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু কেমন যেন উলটপালট হয়ে গেল)

তোহাকে নার্সরা অপারেশন থিয়েটারের দিকে নিয়ে যাচ্ছে আমি দূরে দাঁড়িয়ে আছি। যতক্ষণ তোহাকে দেখা যায় তাকিয়ে রইলাম, হুট করে মাথাটা ঘুরে উঠলো দফ করে পড়ে গেলাম।

চোখ খুলে তাকিয়ে দেখি হসপিটালের বেডে শুয়ে আছি পাশে আম্মু জোহা আর চাচ্চু। তোহার কথা মনে পড়তেই লাফ দিয়ে উঠলাম।
আম্মু: উঠিস না তোর শরীর ভালো নেই।
আমি: আম্মু আমার তোহা..
আম্মু: ও ভালো হয়ে যাবে মা।
আমি: ছাড়ো আমি ওর কাছে যাবো।
জোহা: তোহা তো অপারেশন থিয়েটারে গিয়ে কি করবে?
আমি: মেঘ কোথায়?
চাচ্চু: বাইরেই আছে। (জোহার হাত ছাড়িয়ে উঠে দৌড়ে বাইরে চলে আসলাম)

অপারেশন থিয়েটারের সামনে মেঘ আর ওদের পরিবারের সবাই বসে আছে। আস্তে আস্তে মেঘের দিকে এগিয়ে গেলাম।
আমি: মেঘ..
পপি: এদিকে এসো। (পপি আমাকে একটু দূরে নিয়ে আসলো)
পপি: ভাইয়া তোমার উপর রেগে আছে এখন ভাইয়ার সাথে কথা বলতে যেও না। এখানে বসো তোমার শরীর ঠিক নেই। (চুপচাপ চেয়ারে বসে পড়লাম, চোখ থেকে অঝরে পানি পড়ছে। কি থেকে কি হয়ে গেল এক মুহূর্তের মধ্যে)
ভাবি: আমার মেয়েটাকে তোমরা আগলে রাখতে পারলে না? (ভাবির চিৎকার শুনে সামনে তাকালাম তোহাকে রক্ত দিয়ে এসেছে হয়তো। নার্স ভাবিকে এনে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিলো)
এখন তো সবাই আমাকে ভুল বুঝবে বলবে আমার মামা করেছে এসব, কি জবাব দিবো আমি মেঘকে? কি জবাব দিবো আমি ভাবিকে?

চারদিকে শুধু কান্নার আওয়াজ সবাই কাঁদছে তোহার জন্য, শুধু আমিই শব্দ করে কাঁদতে পারছি না। হঠাৎ অটি থেকে ডক্টর বেরিয়ে আসলো দৌড়ে ডক্টর এর কাছে গেলাম।
আমি: ডক্টর আমার মেয়ে…
ডক্টর: কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান ফিরে আসবে কিন্তু ওর একটা পা ভেঙ্গে গেছে একটু বেশিই ভেঙ্গেছে, পা’টা ভালো হবে তবে অনেক দেরিতে।
আমি: তোহার কাছে যাবো আমি…
ডক্টর: কিছুক্ষণ পর আপনারা দেখা করতে পারবেন। (ডক্টর চলে গেল ফ্লোরেই বসে পড়লাম)
মা: বৌমা উঠো।
দাদী: তুই এভাবে ভেঙে পড়লে হবে? মেঘকে সামলাবে কে?
মেঘ: ওকে আমার প্রয়োজন নেই দাদী। (মেঘের কথা শুনে সবাই কান্না থামিয়ে ওর দিকে হা হয়ে তাকিয়ে রইলো)
বাবা: কি বলছিস এসব?
মেঘ: ঠিক কথা বলছি আব্বু, আমার জীবনে ওর আর কোনো প্রয়োজন নেই।
মা: মেঘ বুঝেশুনে কথা বল।
মেঘ: আমি সবদিক ভেবেই বলছি আম্মু।
আম্মু: হঠাৎ এই কথা কেন বলছ বাবা?
মেঘ: হঠাৎ নয় দুদিন ধরে ওর নষ্টামি আমি দেখছি ও বলেছিল এসব ওকে ফাঁসানোর জন্য করা হচ্ছে, বিশ্বাস করে নিয়েছিলাম কিন্তু আজ তো ওর নষ্টামি নিজের চোখেই দেখেছি)
আমি: মেঘ এসব তুমি কি বলছ?
মেঘ: অস্বীকার করতে পারবে আজ তোমার জন্য তোহার এই অবস্থা হয়নি? তোমার কাছে তোহাকে রেখে বেলুন আনতে গিয়েছিলাম আর তুমি তোহার হাত ছেড়ে দিয়ে অন্য পুরুষের হাত ধরে নষ্টামি করছিলে, ভেবেছিলে আমি রাস্তার অন্যপাশ থেকে তোমার নষ্টামি দেখতে পাবো না।
চাচ্চু: মেঘ মুখ সামলে কথা বলো, তোমার সাহস কি করে হয় আমার মেয়েকে এমন নোংরা কথা বলার?
মেঘ: আপনার মেয়ে নোংরামি করলে দোষ নেই আর আমি বললে দোষ?
বাবা: মেঘ..(বাবা এসে মেঘের গালে থাপ্পড় বসিয়ে দিলেন)
বাবা: বাবার বয়সি লোকের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় এইটাও শিখিসনি?
আমি: ওকে বকছ কেন তোমরা? বলতে দাও ওকে, ওর মাথা ঠিক নেই। তোহাকে খুব ভালোবাসে তো তা…
মেঘ: আমার মাথা ঠিক আছে কণা।
আমি: না ঠিক নেই তোমার মাথা, ঠিক থাকলে তুমি এসব বলতে পারতে না।
নার্স: আপনারা চাইলে বাচ্চাটির সাথে দেখা করতে পারেন। (নার্সের কথা শুনে কেবিনের দিকে পা বাড়ালাম কিন্তু মেঘ আমার হাত ধরে ফেললো)
মেঘ: কোথায় যাচ্ছ?
আমি: আমার মেয়ের কাছে।
মেঘ: তোহা তোমার মেয়ে নয়, যদি মেয়ে হতো তাহলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে তোহার হাত ছেড়ে অন্য পুরুষের হাত ধরতে না।
আমি: প্লিজ আমাকে তোহার কাছে যেতে দাও।
মেঘ: বললাম তো না। শায়লা তুমি যাও তোহার কাছে।
আমি: ছাড়ো আমাকে। (ঝটকা দিয়ে মেঘের থেকে আমার হাত ছাড়িয়ে আনলাম)
আমি: দাদী, বাবা আপনারা মেঘকে বলুন না আমাকে একবার তোহার কাছে যেতে দিতে, আমি তোহাকে একনজর দেখবো শুধু।
বাবা: মেঘ…
মেঘ: আমি কারো কথা শুনতে চাই না।
আমি: মেঘ আমি তোমার পায়ে পড়ছি আমাকে একটাবার তোহার কাছে যেতে দাও।
মেঘ: বললাম তো না, আমার মেয়ের কাছে যাওয়ার ওকে স্পর্শ করার কোনো অধিকার নেই তোমার। (মেঘের পা থেকে আমার হাত সরিয়ে আমাকে তুলে ধাক্কা দিয়ে আম্মুর দিকে ফেলে দিলো। আম্মু আমাকে জড়িয়ে ধরে মেঘকে রাগ দেখালেন)
আম্মু: মেঘ তুমি কিন্তু সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছ।
মেঘ: আজ থেকে কণার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমার মেয়ের ধারেকাছে যেন ওকে না দেখি, আমার চোখের সামনে যেন আর ওকে না দেখি।
মেঘের কথাগুলো শুনে ফ্লোরে বসে পড়লাম, কি বলছে মেঘ এসব? মেঘের কথা গুলো বারবার কানে বাজছে, বুঝতে পারছি আমি মেঘ আর তোহাকে হারিয়ে ফেলেছি চিরদিনের জন্য…

চলবে😍

নীরবে_ভালোবাসি পার্ট: ২৪

নীরবে_ভালোবাসি

পার্ট: ২৪

লেখিকা: সুলতানা তমা

ঘড়ির কাটায় রাত বারোটা পঁয়তাল্লিশ মিনিট বাজে, চুপচাপ বিছানায় শুয়ে আছি মেঘ সোফায় বসে ল্যাপটপে কি যেন কাজ করছে। মেঘের দিকে বারবার তাকাচ্ছি সন্ধ্যার পর থেকে মেঘ কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে আছে, আমার সাথে তেমন কথা বলছে না কি যেন শুধু ভাবে। সন্ধ্যায় কার আর কি মেসেজ এসেছিল জানিনা তবে এইটুকু বুঝতে পারছি এই মেসেজের কারণেই মেঘ এতো অন্যমনস্ক হয়ে আছে। মেঘের ফোন আমি অনেক সময় ঘাটাঘাটি করেছি কিন্তু মেসেজটা পাইনি, মেঘ হয়তো ডিলিট করে ফেলেছে। মেসেজটা কি ছিল আর কার ছিল জানতে পারলে ভালো হত।
মেঘ: ঘুমাচ্ছ না কেন? (মেঘের কথায় ভাবনায় ছ্যাদ পড়লো, পাশ ফিরে ওর দিকে তাকালাম)
আমি: তুমি ঘুমাবে না?
মেঘ: হু পরে তুমি ঘুমিয়ে পড়ো।
আমি: (নিশ্চুপ)
মেঘ: রাগ করছ কেন ঘুমিয়ে পড়ো আমার কিছু কাজ আছে দেরি হবে।
কিছুনা বলে চুপচাপ পাশ ফিরে শুয়ে রইলাম। মেঘ যখন লুকাতে চাইছে তাহলে আমি কেন জানতে চাইবো? যতো খুশি লুকিয়ে রাখুক।

মেঘ: কণা এই কণা উঠো। (মেঘের ডাকে ঘুম ভাঙ্গলো, চোখ খুলে আস্তে আস্তে ওর দিকে তাকালাম)
মেঘ: গুড মর্নিং।
আমি: হু!
মেঘ: অবাক হচ্ছ যে?
আমি: না দেখছি।
মেঘ: কি দেখছ? (অবাক হয়ে মেঘকে দেখছি রাতের মেঘ আর এখনের মেঘের মধ্যে এতো পার্থক্য। রাতে মুখ গোমরা করে ছিল অন্যমনস্ক ছিল আর এখন পুরো স্বাভাবিক)
মেঘ: কথা বলছ না কেন?
আমি: এখন তো তুমি স্বাভাবিক বলবে কাল কি হয়েছিল?
মেঘ: অফিসে যাবো মিটিং আছে পারলে সবকিছু একটু গুছিয়ে দাও।
আমি: এড়িয়ে যাচ্ছ?
মেঘ: (নিশ্চুপ)
আমি: কিসের মিটিং?
মেঘ: তোমার চাচ্চু জানেন। (চুপচাপ উঠে ফ্রেশ হতে ওয়াশরুমে চলে গেলাম)

ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে মেঘের দিকে তাকালাম, মেঘ আমার ফোন টিপছে আবার সেই কালকের চিন্তিত মুখ।
আমি: আমার ফোনে কি দেখছ?
মেঘ: কিছুনা তো।
আমি: দ্যাত সবসময় শুধু কথা লুকায়। (রাগে গজগজ করতে করতে ওর ঘড়ি ফাইল শার্ট প্যান্ট সবকিছু বিছানায় ছুড়ে দিয়ে বারান্দায় চলে আসলাম)

বেশ বুঝতে পারছি মেঘ আমাকে এড়িয়ে চলছে, মেঘ এইটা কেন বুঝতে পারছে না এভাবে এড়িয়ে চললে আমাদের সম্পর্কে ভাঙ্গন ধরবে। আর আমিতো ওর বউ তাহলে আমার কাছে কোনো কিছু লুকিয়ে রাখবে কেন আমাকে এড়িয়ে চলবে কেন?
মেঘ: কাঁদছ কেন তুমি? (মেঘ এসে আমার পাশে দাঁড়ালো, কিছুনা বলে চোখের পানি মুছে নিলাম)
মেঘ: বলনা কাঁদছ কেন?
আমি: তাতে তোমার কি?
মেঘ: আমারই তো সবকিছু আমার পাগলী কাঁদবে কেন? (মেঘ আমার দুগালে ধরে আমার কপালে ওর কপাল ঠেকালো)
আমি: ইদানীং তুমি আমাকে এড়িয়ে চলছ।
মেঘ: কখন এড়িয়ে চললাম?
আমি: এইযে এখন নিজেই টাই বেঁধে নিলে।
মেঘ: তুমিই তো বলো রোজরোজ টাই বেঁধে দিতে পারবে না।
আমি: এসব তো এমনি বলি।
মেঘ: ওকে.. (মেঘ আমাকে ছেড়ে টাই খুলে নিলো)
মেঘ: নাও এবার বেঁধে দাও।
আমি: পারবো না। (একটানে আমাকে ওর কাছে নিয়ে গেল, আমার ঠোঁটের একদম কাছে ওর ঠোঁট দুটু আনলো)
মেঘ: অফিসে যাবো প্লিজ মুখ গোমড়া করে থেকো না, একটা মিষ্টি হাসি দাও।
মৃদু হেসে ওর টাই বেঁধে দিলাম, আমার কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে মেঘ বেরিয়ে গেল।

ফোনের কোনো কিছু বাকি রাখিনি মেসেজ, মেসেঞ্জার, হোয়াটএ্যাপস সবকিছু দেখলাম কিন্তু কিছুই পেলাম না, আশ্চর্য মেঘ তাহলে সকালে আমার ফোনে কি দেখছিল? নাকি ও দেখে ডিলিট করে ফেলেছে?
রুহান: কণা আসবো? (রুহানের ডাকে ভাবনায় ছ্যাদ পড়লো, রুহান দরজায় দাঁড়িয়ে আছে)
আমি: হ্যাঁ এসো। (রুহান এসে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো)
আমি: কিছু বলবে?
রুহান: আম্মুর ব্যাপারে একটু কথা বলতে চাইছিলাম।
আমি: গতকাল থানায় গিয়েছিলাম চাঁচিকে দেখে এসেছি।
রুহান: আম্মু…
আমি: শুধরাননি উনি।
রুহান: (নিশ্চুপ)
আমি: আমি কিন্তু ভেবে রেখেছিলাম উনি নিজেকে কিছুটা শুধরিয়ে নিলে আমি উনাকে ছাড়িয়ে বাসায় নিয়ে আসবো কিন্তু…
রুহান: আমি আম্মুর সাথে একবার কথা বলতে চাই।
আমি: চাইলে বলতেই পারো কিন্তু আমার মনে হয় না কোনো লাভ হবে। কাল উনি আমার সাথে যেভাবে কথা বলেছেন তাতে বুঝতে পেরেছি উনি এতটুকুও নিজেকে বদলাননি আগের মতোই আছেন।
রুহান: একটু চেষ্টা করে দেখি।
আমি: হুম আজ থানায় চলে যাও।
রুহান: আমি আম্মুকে বুঝাতে পারলে তুমি…
আমি: হুম ছাড়িয়ে আনবো।
রুহান: ঠিক আছে আসছি।
রুহান বেরিয়ে যেতেই পিছু পিছু আমিও বেরিয়ে আসলাম।

পপি: ভাবি তুমি নাশতা করবে না?
মা: মেঘ তোমাকে জাগাতে মানা করলো তাই সবাই তোমাকে রেখেই নাশতা করে নিলাম।
আমি: এখন কিছু খাবো না মা পরে খেয়ে নিবো।
মা: খেয়ে নিও কিন্তু।
দাদী: এই এদিকে আয় তো। (দাদী আমার হাত ধরে টেনে এনে সোফায় বসালেন)
আমি: কি হয়েছে দাদী?
দাদী: তুই আর মেঘ কি বুঝেছিস বলতো?
আমি: মানে?
দাদী: বিয়ে হয়েছে এতোদিন হয়ে গেল অথচ কোনো খুশির সংবাদ শুনতে পাচ্ছি না কেন?
আমি: দাদী…
দাদী: আরে বাবা লজ্জা কিসের? তোহার একটা ভাই লাগবে না?
আমি: দ্যাত আপনি থাকুন আমি চলে যাচ্ছি।
দাদী: আমি কিন্তু মেঘকে বলবো খুব শীঘ্রই খুশির সংবাদ চাই। (দাদী জোরে জোরে কথাটা বললেন মা আর পপি হাসছে দেখে দৌড়ে উপরে চলে আসলাম)

তোহা: নতুন আম্মু চলনা আমার সাথে। (রুমের দিকে যাচ্ছিলাম হঠাৎ তোহা পিছন থেকে আচলে ধরলো)
আমি: কোথায় মামুনি?
তোহা: বাগানে যাবো।
আমি: কেন?
তোহা: চলই না।
তোহা আমার হাত ধরে টেনে বাগানের দিকে এগিয়ে গেল।

আমাকে দাঁড় করিয়ে রেখে তোহা ফুল গাছের দিকে এগিয়ে গেল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মেয়ের কান্ড দেখছি। তোহা একটা একটা করে বেলী ফুল গাছ থেকে নিচ্ছে দেখে আমিও এগিয়ে আসলাম।
আমি: ফুল দিয়ে কি করবে তোহা?
তোহা: উফফ মেয়েটা বড্ড বেশি কথা বলে, এতো কথা না বলে কিছু ফুল তুলে দাওতো। (মেয়ের কথা শুনে না হেসে পারলাম না)
তোহা: এই দেখো এখনো বসে আছে আরে কিছু ফুল তুলে দাও আমার অনেক ফুল লাগবে।
আমি: কিন্তু মামুনি গাছ থেকে ফুল ছেঁড়া তো ঠিক না গাছ কষ্ট পায়।
তোহা: আম্মু আব্বুর জন্য একটু ছেঁড়া যা… (তোহা জিহ্বায় কামর দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে)
তোহা: এই যাহ্‌ বলে দিলাম।
আমি: গণ্ডগোল আছে মনে হচ্ছে? আমার আম্মুর মাথায় কি ঘুরপাক খাচ্ছে?
তোহা: বলা যাবে না।
আমি: খুব পেকে গেছ আম্মুর থেকে কথা লুকানো হচ্ছে?
তোহা: উঁহু আমি পঁচা মেয়ে নই কথা লুকাবো কেন?
আমি: তাহলে বলো ফুল দিয়ে কি করবে?
তোহা: পরে বলবো সারপ্রাইজ।
আমি: ওলে বাবা আমার আম্মু সারপ্রাইজ দিতে শিখে গেছে?
তোহা: হ্যাঁ ফুফি শিখিয়েছে। আর কথা নয় এখন ঝটপট ফুল তুলে দাওতো।
আমি: দিচ্ছি দিচ্ছি।
ঝুড়ি ভরে ফুল তুলে দিলাম। ফুলের ঝুড়িটা হাতে নিয়ে তোহা লাফ দিয়ে আমার কোলে উঠে গেল, মেয়েটাই জানে এতো বেলী ফুল দিয়ে কি করবে।

তোহা ফুল নিয়ে পপির রুমের দিকে চলে গেল, আমি রুমের দিকে পা বাড়ালাম।
রুমে আসতেই শুনতে পেলাম আমার ফোন বাজছে হাতে নিয়ে দেখি আম্মু।
আমি: হ্যালো আম্মু।
আম্মু: একটু বেরুতে পারবি?
আমি: কেন আম্মু?
আম্মু: একটু উকিলের কাছে যেতাম।
আমি: হঠাৎ উকিলের কাছে কেন?
আম্মু: ইকবালকে নিয়ে একটু কথা বলে দেখতাম। আসলে শায়লার মুখের দিকে তাকানো যায়না মেয়েটা শুধু কাঁদে।
আমি: ঠিক আছে তুমি আবার কেঁদো না তো।
আম্মু: ঠিক আছে চলে আসিস।
আমি: আচ্ছা।
ফোন রেখে ভাবছি মেঘকে ফোন করবো কিনা। মেঘকে তো বলে যাওয়া প্রয়োজন, কিন্তু মেঘ তো এখন মিটিং এ ফোন দিলে তো রেগে যাবে। থাকুক আম্মুর সাথেই তো যাচ্ছি এসে বলে দিবো।

রেডি হয়ে দাদী আর মা’কে বলে বেরিয়ে পড়লাম। উকিলের কাছে তো যাচ্ছি অযতা, কোনো লাভ হবে না। শুধু আম্মুর মনের অশান্তিটা দূর করার জন্য যাচ্ছি। পুলিশ আঙ্কেল তো বলেছেন তিন-চার বছরের আগে সম্ভব না কিন্তু এ কথা আম্মুকে বুঝাই কি করে?

বাসায় এসে কলিংবেল বাজাতেই ভাবি এসে দরজা খুলে দিলো।
আমি: ভালো আছ?
ভাবি: হ্যাঁ তুমি?
আমি: ভালো, আম্মু কোথায় রেডি হয়েছে?
ভাবি: হ্যাঁ।
আম্মু: কিরে চলে এসেছিস?
আমি: হ্যাঁ চলো।
আম্মু: ভিতরে এসে কিছু খেয়ে যা।
আমি: খিদে তো আছে কিন্তু সম্ভব না সন্ধ্যার আগে বাসায় পৌঁছাতে হবে।
আম্মু: ঠিক আছে চল।
আম্মুকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

উকিল: দেখুন আপনারা যা যা বলেছেন সে অনুযায়ী মনে হচ্ছেনা কাজটা এতো সহজ হবে, চার- পাঁচবছর এর আগে তো কোনোভাবেই সম্ভব না। (উকিলের কথা শুনে আম্মু কেঁদে ফেললেন, আগেই বলেছিলাম কিন্তু আম্মু শুনেনি)
আম্মু: কোনো ভাবেই কি সম্ভব না?
আমি: আম্মু তুমি কথা বলো আমি একটু আসছি।
রুম থেকে বেরিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম, আম্মুর কান্নাকাটি দেখতে ভালো লাগেনা। আমিও তো চেয়েছিলাম ভাইয়াকে ছাড়িয়ে নিতে কিন্তু পাপ যে বেশি করে ফেলেছে তাতে আমাদের কি করার আছে, পাপ করলে শাস্তি পেতে হবে এটাই স্বাভাবিক। আমিতো ভাবছি আমার শ্রদ্ধেয় মামা কবে এরেস্ট হবেন, উনি এরেস্ট হলেই আমি চিন্তা মুক্ত হবো। আচ্ছা পুলিশ আঙ্কেল কে একটা ফোন করবো? করেই দেখি কি বলে।

আঙ্কেল: হ্যাঁ কণা মা…
আমি: কিছু করতে পারলেন?
আঙ্কেল: না তবে ইকবাল একটা জায়গার নাম বলছিল যেখানে ওর বাবা সবসময় থাকে আগামীকাল আমরা সেখানেই যাবো।
আমি: যতো দ্রুত সম্ভব ওকে ধরার চেষ্টা করুন।
আঙ্কেল: ঠিক আছে।
আমি: রাখছি।
আম্মু: কণা চল। (ফোন রাখতেই আম্মু এসে পিছন থেকে ডাক দিলেন)
আমি: কথা বলা শেষ?
আম্মু: হুম।
আমি: হবে না বললো তো? আমিতো তোমাকে আগেই বলেছিলাম শুননি আমার কথা।
আম্মু: মেয়েটার কথা ভেবে এসেছিলাম কিযে হবে মেয়েটার।
আমি: কেন তোমার কাছে থাকবে।
আম্মু: তাতো থাকবেই চল বাসায় ফিরে যাই।
আমি: আম্মু আমার খুব খিদে লেগেছে কিছু না খেলে আমি আর থাকতে পারবো না।
আম্মু: ঠিক সময় না খেয়ে অসময়ে খাওয়ার অভ্যাসটা ছাড়িসনি দেখছি। চল রাস্তায় কোনো রেস্টুরেন্টে কিছু খেয়ে নিবি।
আমি: ঠিক আছে।

পাশের একটা রেস্টুরেন্টে খেতে আসলাম। যদিও আমি বাইরের খাবার অপছন্দ করি পেটের জন্য আসতে হলো, কেন যে সকালে কিছু খেলাম না, এখন তো দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চলেছে খিদে তো লাগবেই।
আম্মু: তুই খাবার অর্ডার কর আমি ওয়াশরুম থেকে আসছি।
আমি: ঠিক আছে। (পা নাচাচ্ছি আর খাবারের মেনু দেখছি হুট করে কে যেন আমার সামনে এসে বসলো। সামনে তাকিয়ে দেখি কালকের সেই লোকটা যে আমার হাত ধরেছিল। চোখ বড়বড় করে তাকালাম ওর দিকে)
আমি: কি ব্যাপার আপনি?
–চিনতে পেরেছ তাহলে?
আমি: চিনবো না কেন? কিন্তু আপনি এখানে কি করছেন?
–আসলে আমি তোমাকে ফলো করছিলাম। দেখলাম তুমি রেস্টুরেন্টে ঢুকেছ তাও আবার তোমার আম্মু পাশে নেই তাই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে এখানে এসে বসলাম।
আমি: ফলো করছিলেন মানে? আপনি কি আমাকে চিনেন? তারমানে গতকাল ভুল করে নয় আপনি ইচ্ছে করেই আমার হাত ধরেছিলেন।
–বোকা মেয়ে এতোক্ষণে বুঝতে পেরেছ?
আমি: কি চান আপনি?
–আসলে তোমাকে ফাঁসানো হচ্ছে আমিতো তোমাকে হেল্প করতে এসেছি। (লোকটা ফিসফিসিয়ে কথাটা বললো, আমি হা হয়ে তাকিয়ে আছি)
–জায়গাটা নিরাপদ নয় তাই এখানে সবকিছু বুঝিয়ে বলা সম্ভব না, এইযে চিঠিটা নাও এখানে সবকিছু লেখা আছে। (লোকটা আমার দিকে একটা কাগজ এগিয়ে দিলো, ভাবছি নিবো কিনা)
–আরে নাও আমি বেশি সময় তোমার কাছে থাকতে পারবো না। (কাগজটা আনার জন্য হাত বাড়াতেই কাগজ দিতে দিতে লোকটা আমার হাত ধরে ফেললো)
আমি: একি করছেন হাত ছাড়ুন।
–না ছাড়লে?
আমি: না ছাড়লে? দাঁড়া দেখাচ্ছি। (আমি পায়ের জুতা খুলছি দেখে লোকটা আমার হাত ছেড়ে দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল)
আম্মু: কণা কি হয়েছে কাকে দৌড়াচ্ছিস?
ওয়েটার: মেডাম কোনো সমস্যা?
আমি: না। আম্মু চলো জায়গাটা আমাদের জন্য সেইফ না।
আম্মু: ঠিক আছে চল।

গাড়িতে বসে ভাবছি লোকটা কে ছিল আর কেনই বা এমন করছিল? লোকটা দুদিন আমার হাত ধরলো কিন্তু কেন? আচ্ছা এমন নয়তো মেঘকে যেভাবে বারবার ফাঁসানো হয়েছিল সেভাবে আমাকে এখন ফাঁসানো হচ্ছে? হয়তো লোকটা আমার হাত ধরার সময় আড়াল থেকে কেউ ছবি তুলেছিল আর সেটা গতকাল মেঘকে পাঠিয়েছিল যার কারণে মেঘ আমার সাথে এমন করেছে। যদি আমার ধারণা ঠিক হয় তাহলে তো আজও ছবি তুলেছে আর সে ছবি অবশ্যই মেঘকে দিবে। যে এই কাজ করছে তার আসল উদ্দ্যেশ্য মেঘ আর আমাকে আলাদা করে ফেলা। কিন্তু কে সে মামা নয়তো?
আম্মু: কণা কি ভাবছিস? আমরা তো চলে এসেছি নেমে আয়। (হঠাৎ আম্মুর ডাকে হকচকিয়ে উঠলাম, তাকিয়ে দেখি বাসার সামনে চলে এসেছি)
আমি: না আম্মু ভিতরে যাবো না বাসায় চলে যাবো। বিকেল হয়ে এসেছে তোহা আমাকে খুঁজবে।
আম্মু: ঠিক আছে সাবধানে যাস।
আমি: আচ্ছা।
আম্মুর থেকে বিদায় নিয়ে বাসার দিকে রওনা দিলাম।

দাদী: কিরে চলে এসেছিস? তোর মা কেমন আছে? (ড্রয়িংরুমে আসতেই দাদী বসা থেকে উঠে আমার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে প্রশ্ন করলেন)
আমি: ভালো দাদী।
দাদী: আচ্ছা তোর আর মেঘের মধ্যে কি ঝগড়া হয়েছে?
আমি: নাতো কেন?
দাদী: এই অসময়ে অফিস থেকে ফিরে আসলো মুখটা দেখলাম গম্ভীর।
আমি: কি মেঘ চলে এসেছে?
দাদী: হ্যাঁ এইমাত্র আসলো।
আমি: ঠিক আছে আমি আসছি।
দাদী: যা গিয়ে দেখ কি হয়েছে।
দৌড়ে রুমের দিকে আসলাম।

মেঘ দরজা খুলা রেখেই বেডে বসে আছে, মাথায় হাত দিয়ে মাথাটা নিচু করে রেখেছে।
আমি: মেঘ.. (আমার ডাকে মাথা তুলে সামনে তাকালো)
মেঘ: কোথায় গিয়েছিলে?
আমি: আম্মুর সাথে উকিলের কাছে।
মেঘ: সত্যি নাকি অন্য কোথাও গিয়েছিলে? আমাকে বলে যাওনি কেন? (আমার সন্দেহটাই ঠিক, মেঘকে আজকের ছবি দেওয়া হয়েছে আর মেঘ এসব দেখে বাসায় চলে এসেছে)
আমি: তুমি মিটিং এ ছিলে তাই ফোন করে বিরক্ত করিনি।
মেঘ: আমি যদি বলি তুমি অন্য কোথাও গিয়েছিলে?
আমি: আমাকে বিশ্বাস না করাটা তোমার ব্যর্থতা তবে আম্মুর থেকে জেনে নিতে পারো।
মেঘ: (নিশ্চুপ)
আমি: আমাকে সন্দেহ করার আগে তোমার আমাকে একবার সবকিছু জানানোর প্রয়োজন ছিল, এসব সত্যি কিনা জানতে চাওয়া উচিত ছিল।
মেঘ: তারমানে তুমি…
আমি: জানিনা তবে আন্দাজ করে নিয়েছি।
মেঘ: আমি তোমাকে সন্দেহ করছি না তবে এটাও সত্যি রোজ রোজ একি জিনিস দেখলে…
আমি: বউকে অবিশ্বাস করা যায় তাইতো?
মেঘ: (নিশ্চুপ)
আমি: তুমি আমাকে কিছু জানাওনি তাই শুধু এইটুকু বলে রাখছি তোমাকে যেমন বারবার ফাঁসানো হয়েছিল ঠিক সেভাবে আমাকে ফাঁসানো হচ্ছে।
তোহা: এই তোমরা এতো দুষ্টু কেন সবসময় শুধু ঝগড়া করো। (মেঘ কিছু বলার জন্য আমার দিকে এগিয়ে আসছিল তোহা মাঝখানে চলে আসাতে মেঘ থেমে গেল)
আমি: তোমার হাত পিছনে কেন আম্মু হাতে কি আছে?
তোহা: বলেছিলাম না সারপ্রাইজ। (তোহা হাসতে হাসতে হাত দুটু সামনে নিয়ে আসলো, দু হাতে দুটু বেলী ফুলের মালা)
আমি: এই মালা কে বানিয়ে দিলো?
তোহা: ফুফি।
মেঘ: খুব সুন্দর হয়েছে মামুনি এবার তুমি খেলতে যাও।
তোহা: না আমিতো মালাগুলো তোমাদের দেওয়ার জন্য এসেছি। তোমরা মালা গুলো নিয়ে একে অপরকে পড়িয়ে দিবে আর বিনিময়ে আমাকে কিছু দিবে।
মেঘ: কি চাও তুমি?
তোহা: আমরা সবাই মিলে ঘুরতে যাবো।
মেঘ: কিন্তু..
আমি: থাকুক না মেয়েটা চাইছে যখন তখন নাহয় যাবো।
মেঘ: তোহা এসব তোমাকে কে শিখিয়ে দিয়েছে?
তোহা: নাম বলা যাবে না তুমি বলো যাবে কিনা?
মেঘ: ঠিক আছে আগামীকাল যাবো।
তোহা: এবার মালাটা নাও আর নতুন আম্মুকে পড়িয়ে দাও।
মেঘ: পরে পড়িয়ে দিবো তুমি যাও। (মেঘ তোহার থেকে মালা আনতেই তোহা দৌড়ে চলে গেল)
মেঘ: বয়েই গেছে তোমাকে মালা পড়াতে। এসব যদি সত্যি হয়…(মেঘ আঙ্গুল তুলে আমাকে শাসাচ্ছিল ওর আঙ্গুলটা নামিয়ে দিলাম)
আমি: ওইযে ওয়াশরুমটা ওইদিকে মাথায় পানি ঢেলে আসো তাহলে হয়তো মাথায় ঢুকবে যে এসব আমাকে ফাঁসানোর জন্য করা হচ্ছে।

মেঘ দাঁড়িয়ে আছে এখনো আমি বারান্দায় চলে এসেছি। যে বুঝেও না বুঝে তাকে কি বুঝানো যায়? আমাদের সাথে বারবার এমন হচ্ছে তাও মেঘ কিভাবে আমাকে সন্দেহ করতে পারলো? আমাকে সন্দেহ করার আগে তো ওর একবার ভাবা উচিত ছিল এসব পিক শুধু ওকে দেওয়া হয় কেন আর আমাকেও তো জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল। এসব না ভেবে আমাকে জিজ্ঞেস না করে মেঘ নিজে নিজে ভেবে আমাকে সন্দেহ করে বসে আছে। থাকুক আমিও কোনো কিছু বুঝাতে বা বিশ্বাস করাতে যাবো না। সন্দেহ খুব খারাপ জিনিস যখন এই সন্দেহের কারণে আমাকে হারাবে তখন বুঝবে। আমি বুঝাতে যাবো কেন ও যদি আমাকে সন্দেহ করতে পারে তাহলে আমিও অভিমান করতে জানি…

চলবে😍

নীরবে_ভালোবাসি পার্ট: ২৩

নীরবে_ভালোবাসি

পার্ট: ২৩

লেখিকা: সুলতানা তমা

ভোরবেলা কলিংবেল এর শব্দে ঘুম ভাঙ্গলো, এতো ভোরে কে আসলো? উঠতে চাইলাম মেঘ আমাকে জড়িয়ে ধরে আছে, ওর হাত দুটু সরিয়ে দিতে চাইলাম কিন্তু ও আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।
আমি: মেঘ হচ্ছে কি ছাড়ো কে যেন এসেছে।
মেঘ: হু..
আমি: দ্যাত কাকে কি বলছি ও তো পুরো ঘুমে।
মেঘ: ঘুমে না আমি তোমাকে যেতে হবে না অন্যকেউ ঠিক দরজা খুলে দিবে।
আমি: আর কারো ঘুম ভেঙ্গেছে কিনা কে জানে কলিংবেল তো সমানে বেজেই চলেছে।
মেঘ: ওইযে শুনো কলিংবেল বাজা বন্ধ হয়ে গেছে এবার শান্তু হয়ে ঘুমাও তো।
মেঘ আমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়লো, ওর ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। এই মায়া ভরা মুখটা যেন সারাজীবন দেখতে পারি মেঘ, কখনো যেন কোনো কিছু আমাদের আলাদা করতে না পারে। মেঘকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে রইলাম।

আম্মু: সব তো শুনলে এখন বলো কণাকে এমন পরিস্থিতিতে একা রেখে আমি কিভাবে কানাডা থাকি। (ঘুম থেকে উঠে নিচে আসতেই দেখি আম্মু আর চাচ্চু ড্রয়িংরুমে বসে কথা বলছেন)
আমি: চাচ্চু কখন এলে?
চাচ্চু: এইতো ভোরবেলা। এসে যা শুনছি ইচ্ছে হচ্ছে তোকে আর তোর আম্মুকে আমার সাথে নিয়ে যাই। কিন্তু তোকে নিয়ে যাওয়া তো সম্ভব না।
আমি: কানাডা গিয়েও তো আম্মু নিরাপদে থাকতে পারছে না।
শায়লা: আর তো মাত্র কয়টা দিন বদমাইশ লোকটা এরেস্ট হয়ে গেলেই সবাই শান্তিতে থাকতে পারবে। (শায়লা চা নিয়ে এসে টেবিলে চায়ের কাপ রাখতে রাখতে বললো। সত্যি মেয়েটাকে যত দেখছি ততোই অবাক হচ্ছি)
চাচ্চু: সামাদ এরেস্ট না হওয়া পর্যন্ত আমি আছি তোমাদের সাথে ভয় নেই।
আমি: কিন্তু চাচ্চু ওদিকে তোমার ব্যবসা…
চাচ্চু: ওসব তোর চাঁচি সামলে নিবে।
জোহা: আব্বু আমি কবে যাচ্ছি?
আমি: তুই কোথায় যাবি?
জোহা: কোথায় আবার কানাডা।
আম্মু: আপাতত তুই আমার কাছে থাক পরে যাবি। (শায়লার দিকে চোখ পড়লো সমানে কাজ করে যাচ্ছে। উঠে ওর দিকে এগিয়ে গেলাম)
আমি: তুমি এতো কাজ করছ কেন কাজের লোক আছে তো।
শায়লা: একটু করি সমস্যা কোথায়?
আমি: না চলো আমাদের সাথে বসে গল্প করবে। (শায়লাকে টেনে এনে আম্মুর পাশে বসিয়ে দিলাম)
শায়লা: একটু কাজ করলে কি এমন হতো?
আম্মু: তুমি তো এ বাড়ির বউ তুমি কাজ করবে কেন? (শায়লা মুখ গোমরা করে ফেললো, হয়তো ভাইয়ার কথা মনে পড়ছে। সত্যি মেয়েটা ভাইয়াকে অনেক ভালোবাসে)
আম্মু: কি হলো আবার মুখ গোমরা করলে কেন?
আমি: এই চলো তো তুমি আমার সাথে। (শায়লাকে নিয়ে বাগানের দিকে চলে আসলাম)

শায়লা বাগানে এসে দোলনায় বসে ঢুকরে কেঁদে উঠলো।
আমি: আরে কি হলো?
শায়লা: তোমরা কতো ভালো আর আমি তোমাদের সাথে এতো খারাপ ব্যবহার করেছি।
আমি: আমিও তো তোমার সাথে অনেক খারাপ ব্যবহার করেছি আর তুমি তো এসব পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে করেছ।
শায়লা: তুমি তো জানতে না আমি অভিনয় করছিলাম কিন্তু আমিতো জানতাম তোমরা খুব ভালো। তাছাড়া মেঘকে তো আমি ছিনতাম ওর সাথেও তো খারাপ ব্যবহার করেছি বারবার ওকে ফাঁসানোর চেষ্টা করেছি।
আমি: বাদ দাওনা এসব। (শায়লা সমানে কেঁদেই চলেছে কি যে করি)
আমি: আমার মিষ্টি ভাবির মুখে কান্না নয় মিষ্টি হাসি মানায়। (শায়লার গাল টেনে দিলাম ও ফিক করে হেসে দিলো)
আমি: হাসছ কেন?
শায়লা: শত্রু থেকে ভাবি?
আমি: হ্যাঁ আজ থেকে তুমি আমার ভাবি আর আমি তোমার ননদিনী। আজ থেকে কোনো শত্রুতা নয়। (বারবার ওকে শায়লা ডাকতে এখন নিজের মুখেই বাঁধছে, আগে যাই করে থাকুক এখন তো ও আমার ভাইয়ের স্ত্রী)
ভাবি: ঠিক আছে ননদিনী।
মেঘ: এইযে মেডাম ভাবির সাথে আড্ডা দিলে হবে রুমে যে নিজের স্বামীকে রেখে গেছ সে খেয়াল আছে? (মেঘের কথা শুনে ছাদের দিকে তাকালাম, ছাদে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসছে)
আমি: আসছি।
ভাবি: আমি এখানে একটু সময় বসি তুমি রুমে যাও।
আমি: আচ্ছা তুমি তো মেঘের সাথে দুবছর সংসার করেছ মেঘের পছন্দ অপছন্দ কি একটু বলবে আমাকে? (ভাবি আমার কথা শুনে মৃদু হাসলো)
আমি: হাসছ যে..
ভাবি: একজন কে ভালোবেসে অন্য জনের সাথে সংসার করার মতো কষ্ট যন্ত্রণা আর কিছুতে নেই অথচ এই কষ্টটাকেই পরিস্থিতির চাপে পরে আমাদের মেনে নিতে হয়। দুবছর অনেক সময় কিন্তু এতোটা সময়ের মধ্যেও মেঘের সাথে আমার তেমন কোনো বন্ধুত্ব গড়ে উঠেনি, ওর পছন্দ অপছন্দ কখনো জানতে চাইনি। মেঘকে ইকবালের কথা বলতে পারিনি আর মেঘের মায়ের কথায় বেবি নিতে হয়েছিল। আসলে তো মেঘ আর আমার মধ্যে প্রয়োজন ছাড়া তেমন কোনো কথাই হতো না। বুঝতাম মেঘ আমাকে ভালোবাসতো কিন্তু কিছু করার ছিল না কারণ আমি যে ইকবালকে ভালোবাসি।
আমি: (নিশ্চুপ)
ভাবি: জানো তো ভালোবাসা এমন এক জিনিস যার জন্য মানুষ সব করতে পারে যেমনটা আমি করেছি। ইকবাল আমাকে প্রথমেই তোমার কথা বলেছিল মানতে কষ্ট হলেও মেনে নিয়েছিলাম আর বলেছিলাম আমি ওর ঘরের এক কোণে পরে থাকবো তোমাকে বিয়ে করার পরও, ইকবাল আমাকে ভালোবাসে তো তাই তোমাকে বিয়ে করতে চাইতো না কিন্তু ওর আব্বু সবসময় আমাদের আলাদা করে দেয়ার ভয় দেখাতো। ইকবালের বাবার অমতে আমরা বিয়ে করেছিলাম তাইতো উনি যা বলতেন তাই করতে হতো আমাকে। মেঘ আর তোমাকে আলাদা করার জন্য উনি ডিভোর্স পেপার মেঘের ফাইলের ভিতর রেখেছিলেন মেয়েটিকে দিয়ে, আর ফোনে সব কথা আমাকে দিয়ে বলিয়েছেন। তোমাদের আমি অনেক কষ্ট দিয়েছি আ…
আমি: ইচ্ছে করে তো আর দাওনি বাদ দাও এসব। বিকেলে ভাইয়ার সাথে দেখা করতে যাবো তোমাকে নিয়ে কেমন?
ভাবি: সত্যি?
ওর মুখে হাসির ছলক দেখে মৃদু হেসে চলে আসলাম।

মেঘ: এই আমাকে একা রেখে বাগানে কি করছিলে? (রুমে আসতেই মেঘ আমার দুগালে ধরে আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো)
আমি: কি হয়েছে এমন করছ কেন?
মেঘ: তুমি জানোনা তোমাকে ছাড়া এক মুহূর্তও একা থাকতে পারিনা। (মেঘের কথা শুনে ফিক করে হেসে দিলাম)
মেঘ: হাসছ যে?
আমি: সত্যি আমাকে ছাড়া এক মুহূর্তও একা থাকতে পারোনা?
মেঘ: বললাম তো পারিনা।
আমি: যদি কখনো দুজন আলাদা হয়ে যাই তখন?
মেঘ: আলাদা হয়ে যাবো মানে?
আমি: না মানে যদি কখনো এমন কোনো পরিস্থিতির স্বীকার হতে হয় আমাদের যে দুজন আলাদা হয়ে যেতে হবে তখন কিভাবে থাকবে?
মেঘ: পারবো না আর এমন পরিস্থিতি আমি আমাদের জীবনে আসতে দিবো না। (মেঘ আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিলো)
আমি: আরে পাগল কাঁদছ কেন আমিতো কথাটা এমনি বলেছি।
মেঘ: (নিশ্চুপ)
আমি: আমি কিন্তু রুম থেকে বেরিয়ে যাবো।
মেঘ: আমি যেতে দিলে তো। (মেঘ আমাকে ছেড়ে দিয়ে আমার কপালে চুমু দিলো)
আমি: এতো ভালোবাস আমায় এতো সুখ সইবে তো আমার কপালে?
মেঘ: যতদিন আমি তোমার পাশে আছি ততদিন দুঃখ তোমাকে স্পর্শ করতে পারবে না। (মৃদু হেসে মেঘের বুকে মাথা রাখলাম)
আমি: বিকেলে একবার থানায় যাবো ভাইয়া আর চাঁচির সাথে দেখা করবো।
মেঘ: বাসায় যাবে না?
আমি: হ্যাঁ যাবো থানা থেকে সোজা বাসায়।
মেঘ: আমাকে তো অফিসে যেতে হবে।
আমি: হুম যাও কাল থেকে চাচ্চু সবকিছুর দায়িত্ব নিবে তোমার আর এতো টেনশন করতে হবে না শুধু চাচ্চুর সাথে সাথে থাকলেই হবে।
মেঘ: ঠিক আছে।
আমি: রেডি হয়ে এসো আমি নাশতা দিচ্ছি।
মেঘ: ওকে মহারাণী।

মেঘকে অফিসে পাঠিয়ে জোহা আর ভাবির সাথে কিছুক্ষণ আড্ডা দিলাম। আজ মনে হচ্ছে সত্যি সব ঠিক হয়ে গেছে। এতোদিন পর আবার সেই হাসি আড্ডা। এখন শুধু মামা এরেস্ট হবার অপেক্ষা, থানায় গিয়ে পুলিশ আঙ্গেলের থেকে জানতে হবে কবে এরেস্ট করতে পারবে ওরা মামাকে।
আম্মু: কণা তুই কি থানায় যাবি?
আমি: হ্যাঁ আম্মু।
আম্মু: একটু কথা বলে দেখিস তো ইকবালে…
আমি: আম্মু কেঁদো না আমি কথা বলে দেখবো।
আম্মু: ঠিক আছে একটু তাড়াতাড়ি চলে যা।
আমি: আচ্ছা।

জোহা আর আমি কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছি ভাবি ভাইয়ার হাত ধরে পাগলের মতো কাঁদতেছে। ভালোই হয়েছে ভাবিকে নিয়ে থানায় এসেছি, অন্তত ওদের দুজনের দেখা তো হলো। ভাইয়াকে যে কবে বাসায় ফিরিয়ে নিতে পারবো, ভাবির কান্না সত্যি এখন অনেক কষ্ট দেয়।
আমি: জোহা তুই এখানে দাঁড়া আমি আসছি।
জোহা: ঠিক আছে।

আমি: আঙ্গেল কোনো ভাবেই কি সম্ভব না?
আঙ্গেল: না যদিও ইকবাল আত্মসমর্পণ করেছে তারপরও তিন-চার বছরের কমে সম্ভব না। আর ওর নিজের দেওয়া জবানবন্দীই তো সবচেয়ে বড় প্রমাণ। (আঙ্গেল এর কথা শুনে মন খারাপ হয়ে গেল, তিন-চার বছরের কমে ভাইয়াকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব না এই কথা ভাবিকে বলবো কিভাবে? ভাবি তো এই কথা শুনে আরো ভেঙ্গে পড়বে)
আঙ্গেল: আর হ্যাঁ ইকবাল ওর বাবার সম্পর্কে সবকিছু বলেছে আমরা খুব তাড়াতাড়ি ওকে এরেস্ট করার চেষ্টা করবো।
আমি: ঠিক আছে আমি চাঁচির সাথে দেখা করতে চাই।
আঙ্গেল: কি করবে দেখা করে? এই বজ্জাত মহিলা এতটুকুও শুধরায়নি।
আমি: একবার দেখা করেই যাই এসেছি যখন।
আঙ্গেল: ঠিক আছে।

চাঁচির সামনে আসতেই উনি আমাকে দেখে চেঁচিয়ে উঠলেন।
চাঁচি: বজ্জাত মেয়ে এখানে কেন এসেছ?
আমি: দেখতে এসেছিলাম আপনি কিছুটা শুধরিয়েছেন কিনা। আসলে আমি ভুলেই গিয়েছিলাম কুকুরের লেজ কখনো সোজা হয় না।
চাঁচি: এই মেয়ে মুখ সামলে কথা বল।
আমি: সামলেই তো বলতে এসেছিলাম আপনিই তো বজ্জাত মেয়ে বলে আমার মাথাটা গরম করে দিলেন।
চাঁচি: বজ্জাত মেয়েকে বজ্জাত বলবো নাতো কি বলবো?
আমি: যদি নিজেকে কিছুটা শুধরে নিতেন তাহলে এখান থেকে আপনাকে নিয়ে যেতাম কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আপনাকে এখানেই থাকাটা মানায়।
চাঁচি: চলে যা আমার চোখের সামনে থেকে।
আমি: রুহানের জন্য এসেছিলাম নাহলে.. দ্যাত আপনার সাথে কথা বলে শুধু শুধু আমার সময় নষ্ট হচ্ছে।

ভাবির কাছে চলে আসলাম, মেয়েটা এখনো কেঁদেই যাচ্ছে।
আমি: অনেক কেঁদেছ এখন থামো তোমরা।
ভাইয়া: কণা ওকে বাসায় নিয়ে যা।
আমি: হুম নিয়ে যাচ্ছি আর তোমাকেও খুব তাড়াতাড়ি বাসায় নিয়ে যাবো। (ভাইয়া মুচকি হাসলো তাহলে কি ভাইয়া জানে এতো তাড়াতাড়ি সম্ভব না)
ভাইয়া: বাসায় যা।
আমি: হুম।

গাড়িতে সবাই চুপচাপ বসে আছি, বুঝতে পারছি না ভাবিকে কিভাবে সত্যিটা বলবো আর আম্মুকেই বা কি বলবো। ভেবেছিলাম সব ঠিক হয়ে গেছে এখন দেখছি আমার জীবনের সবকিছু ঠিক করতে গিয়ে ভাইয়া আর ভাবির জীবনের সবকিছু উলটপালট হয়ে গেছে।
জোহা: আপু দেখো পুতুল গুলো কি সুন্দর। (জোহার কথা শুনে গাড়ির গ্লাস দিয়ে বাইরে তাকালাম, দোকানে পুতুল রাখা এখান থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে)
আমি: গাড়িতে বস আমি আসছি।

জোহা আর তোহা দুজনের জন্য দুটু পুতুল কিনলাম।
আমি: আরে আপনি আমার হাত ধরেছেন কেন? (টাকা দিতে যাবো তখনি অচেনা একটি লোক আমার হাত ধরে ফেললো, লোকটার দিকে রাগি চোখে তাকিয়ে আছি)
–আসলে আমার স্ত্রী ঠিক এমনি একটা শাড়ি পড়েছে তাই ভুল করে আমার স্ত্রী মনে করে আপনার হাত ধরে ফেলেছি। (লোকটা চলে গেল আমি বোকার মতো তাকিয়ে আছি। লোকটার কথা কেন যেন বিশ্বাস হচ্ছে না লোকটা মিথ্যে বললো নাকি সত্যি)
জোহা: আপু কি হয়েছে?
আমি: আর বলিস না লোকটা নাকি ভুল করে ওর স্ত্রী ভেবে আমার হাত ধরে ফেলেছে।
জোহা: ভুল করে…
আমি: ঠিক এমন শাড়িই নাকি ওর স্ত্রী পড়েছে তাই ভুল হয়ে গেছে নাকি।
জোহা: হতেই তো পারে।
আমি: আমার কেন যেন বিশ্বাস হচ্ছে না লোকটার কথা।
জোহা: এতো ভেবো নাতো চলো।
আমি: হুম।

জোহা আর ভাবিকে আমাদের বাসায় পৌঁছে দিয়ে আমি বাসায় ফিরে আসলাম। সন্ধ্যা হয়ে গেছে মেঘ হয়তো অফিস থেকে চলে এসেছে। কলিংবেল চাপতেই মা এসে দরজা খুলে দিলেন।
আমি: মা তোহা কোথায়?
মা: রুহানের কাছে দেখেছিলাম।
আমি: ঠিক আছে।
দাদী: এসেই মেয়ের দিকে ছুটছিস আমরা বুঝি কেউ না?
আমি: দুদিন হলো মেয়েটাকে দেখিনা পরে আসছি আপনাদের কাছে। (দৌড়ে রুহানের রুমে আসলাম, রুহান আর পপিকে রোমান্টিক অবস্থায় দেখে ফেললাম)
আমি: এই সরি সরি ভুল হয়ে গেছে।
রুহান: সমস্যা নেই।
আমি: দরজা খুলে রোমান্স মুটেও ঠিক না, আমার ননদিনী তো লজ্জায় লাল হয়ে গেছে।
পপি: ভাবি তুমি না..
আমি: চলে যাচ্ছি ডিস্টার্ব করবো না আমার মেয়ে কোথায়?
রুহান: ভাইয়া নিয়ে গেছে রুমেই হয়তো।
আমি: ঠিক আছে ছুটিয়ে রোমান্স করো হিহিহি।

রুমে এসে দেখি তোহা বেডে বসে বসে খেলছে আর মেঘ জুতো খুলছে। পুতুলটা মুখের সামনে ধরে তোহার দিকে এগিয়ে গেলাম।
তোহা: নতুন আম্মু এসেছে। (তোহা খুশিতে হাত তালি দিচ্ছে। মেয়ের কথা শুনে হা হয়ে তাকিয়ে আছি, পুতুলটা তো অনেক বড় মুখের সামনে ধরলে চেনার কথা না কে এসেছে অথচ তোহা কিভাবে যেন আমাকে ছিনে ফেললো)
মেঘ: তুমি তোহার আত্মার সাথে মিশে গেছ বুঝতে পেরেছ আর হা হয়ে তাকিয়ে থেকো না। (মেঘ হাসছে দেখে ওকে ভেংচি দিয়ে তোহাকে কোলে তুলে নিলাম)
তোহা: এতো বড় পুতুল আমার জন্য?
আমি: হ্যাঁ আমার মামুনিটার জন্য।
তোহা: কিন্তু আমার তো এত্তো বড় পুতুল চাই না আমার তো পুঁচকে পুতুল চাই।
মেঘ: তোহা কোন পুতুলের কথা বলছে বুঝতে পেরেছ?
আমি: এই হাসবা নাতো বাপ মেয়ে দুটু এক রকম। (মেঘ হাসতে হাসতে ওয়াশরুমের দিকে চলে যাচ্ছিল হঠাৎ ওর ফোনের মেসেজ টোন বেজে উঠতেই থেমে গেল)
মেঘ: কণা দেখো তো।
আমি: আমার মেয়েকে নিয়ে বিজি আছি দেখতে থাকো। (মেঘ নিজেই এসে ফোন হাতে নিলো। কিছুক্ষণ ফোন ঘাটাঘাটি করার পর আমার দিকে তাকালো)
আমি: কি হয়েছে?
মেঘ: কিছুনা।
আমি: চলে যাচ্ছ যে কি হয়েছে বলবে তো, তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন?
মেঘ: বললাম তো কিছু হয়নি।
আমি: বলো প্লিজ কি হয়েছে। (মেঘের কাছে এসে ওর হাত ধরে ফেললাম। মেঘ আমার হাত ছাড়িয়ে দিয়ে আমার দুগালে ধরলো)
মেঘ: এসব নিয়ে কথা বলে তোমাকে আমি হারাতে চাই না।
আমি: মানে?
মেঘ: তোমার প্রতি আমার বিশ্বাস আছে।
মেঘ মৃদু হেসে ফ্রেশ হতে চলে গেল, আমি হা হয়ে ওর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছি। কি বলে গেল মেঘ এসব আমিতো কিছুই বুঝতে পারছি না…

চলবে😍

নীরবে_ভালোবাসি পার্ট: ২২

নীরবে_ভালোবাসি

পার্ট: ২২

লেখিকা: সুলতানা তমা

মামা এসে বাসায় ঢুকতেই পিছু পিছু শায়লা আর ইকবাল এসে ঢুকলো। আম্মু ভয়ে একটু দূরে সরে দাঁড়ালেন।
মামা: ভয় নেই বোন আমি এখানে খুন করতে আসিনি সবকিছু মিটমাট করতে এসেছি।
আমি: কিসের মিটমাট?
মামা: বোন তুই বল কণা মামুনিটা ক্লান্ত হয়ে গেছে এসব জামেলা পোহাতে গিয়ে।
আম্মু: আমিতো ভেবেছিলাম তুমি…
মামা: মারা গেছি? নারে মরিনি প্রতিশোধ না নিয়ে মরি কিভাবে বল।
আম্মু: কিসের প্রতিশোধ?
ইকবাল: আমার আম্মুকে খুন করার।
আম্মু: ভাবিকে খুন? আমাদের উপর প্রতিশোধ নিতে চাইছ কেন?
ইকবাল: কারণ তোমরা সবাই মিলে আম্মুকে খুন করেছিলে মা হারা করেছিলে আমাকে।
আম্মু: তোকে এসব এই লোকটা বলেছে তাই না? আরে এই লোক তোকে মিথ্যে বলেছে আমরা কেন ভাবিকে মারতে যাবো মেরেছে তো এই লোকটা নিজেই।
ইকবাল: কি?
মামা: ইকবাল ও তোকে ভুল বোঝাচ্ছে।
আম্মু: না বাবা আমি কেন তোকে ভুল বুঝাতে যাবো? যা সত্যি তাই বলছি।
আমি: সত্যিটা কি স্পষ্ট করে বলে দাও আম্মু।
আম্মু: সত্যি এটাই ভাইজান নিজে ভাবিকে খুন করেছিল আর সেজন্য আব্বু ওকে জেলে দিয়েছিল কিন্তু ও কয়েকমাস পরেই পালিয়ে যায়। (আমি এসব কথার কিছুই বুঝতে পারছি না, ইকবাল উঠে আম্মুর কাছে গেল)
ইকবাল: ফুফু সবকিছু খুলে বলো প্লিজ।
মামা: শারমিন ভালো হবে না আর একটাও মিথ্যে বললে কিন্তু…
আম্মু: এতো বছর পর যখন তুমি তোমার পাপ নিজেই টেনে সামনে এনেছ তাহলে আজ আমি বলবই।
ইকবাল: বল ফুফু প্লিজ!
আম্মু: তখন আমার বিয়ে হয়নি। হুট করে একদিন ভাইজান একটি মেয়েকে বিয়ে করে নিয়ে আসে। মেয়েটি বড়লোক শুনেই আমরা বুঝে ফেলি ভাইজান ওকে ফাঁসিয়ে নিয়ে এসেছে কারণ উনার স্বভাবই এরকম। ছোট বেলা থেকেই যতো ধরনের খারাপ কাজ আছে সব ভাইজান করে, বাবা মা অনেক চেষ্টা করেছেন উনাকে সঠিক পথে আনার কিন্তু বারবার ব্যর্থ হয়েছেন। সেদিন তোর আম্মুকে কেউ মেনে নেয়নি কিন্তু আমি মেনে নিয়েছিলাম, পরবর্তীতে সবাইকে বুঝিয়ে সবটা মানিয়ে নিয়েছিলাম।
ইকবাল: তাহলে আম্মু খুন হলো কিভাবে?
আম্মু: একটা বছর কেটে যায় এভাবেই। এই লোকটা বরাবরই সম্পত্তির লোভী ছিল তাই তোর আম্মুকে সবসময় বলতো সবকিছু উনার নামে লিখে দিতে কিন্তু ভাবির ভয় হতো সবকিছু দেওয়ার পর যদি ভাবিকে ভুলে যায়। এর মধ্যে ভাবির কোল আলো করে তুই আসলি, ভাবি সবকিছু তোর নামে করে দিলো। আর এই রাগে এই লোকটা ভাবিকে খুন করে পেলে। বাবা নিজের হাতে উনাকে পুলিশে তুলে দেন। তুই আমার কাছেই থাকতি কিন্তু কয়েকমাস পর উনি পুলিশের থেকে পালিয়ে যান তারপর বাড়িতে এসে জোড় করে তোকে নিয়ে যান। অনেক খুঁজেছি তোকে কিন্তু পাইনি। বাবা বলেছিলেন তোদের ভুলে যেতে কখনো যেন তোর জন্য না কাঁদি কিন্তু কয়েকমাস তোকে নিজে আগলে রেখেছি তো তাই লুকিয়ে কাঁদতাম। সময় সব গাঁ শুকিয়ে দেয় তেমনি তোর কষ্টটা ভুলে গেলাম যখন কণা আসলো আমার কোল জোড়ে। তোকে হারানোর কষ্টটা কখনো প্রকাশ করতাম না তাই কণা কখনো জানতে পারেনি ওর মামা আছে মামাতো ভাই আছে। (আম্মু ইকবাল দুজনেই কাঁদছে, কতো বছর পর ওদের দেখা হলো)
ইকবাল: ফুফু আমি সারাটা জীবন তোমাকে নানা নানুকে ঘৃণা করে এসেছি কারণ এই লোকটা বলেছিল তোমরা আম্মুকে খুন করিয়েছ। আর এজন্য আমি প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য এতোকিছু করেছি।
মামা: অনেক হয়েছে শারমিন মিথ্যে বলা আমি যে কারণে এসেছি তা আমাকে বুঝিয়ে দে আমি চলে যাচ্ছি।
আম্মু: কিসের জন্য এসেছ সম্পত্তি?
মামা: হ্যাঁ।
আম্মু: কিন্তু কোন সম্পত্তি? এখানে যা দেখছ সব কণার আব্বুর গড়ে তোলা।
মামা: আমার ভাগের সম্পত্তি কোথায়?
আম্মু: বাবা মা মারা যাওয়ার পর আমি সবকিছু বৃদ্ধাশ্রম আর এতিমখানায় ডোনেট করে দিয়েছি।
মামা: এসব তো আমি বুঝবো না আমার সম্পত্তি চাই।
ইকবাক: সম্পত্তি চাই সম্পত্তি চাই সম্পত্তি চাই, ছোটবেলা থেকে এই একটা শব্দই শুনে এসেছি তোমার মুখ থেকে। এতো লোভ তোমার যে আমার আম্মুকে মেরে ফেললে?
মামা: ইকবাল শারমিন তোকে মিথ্যে বলেছে।
ইকবাল: কোনো মা মিথ্যে বলতে পারেনা আর ফুফুর কান্নাই বলে দিচ্ছে ফুফু মিথ্যে বলছে না। মিথ্যে তো তুমি বলেছ আমাকে সারাজীবন। তোমাকে আমি ছাড়বো না।
মামা: ইকবাল তুই কিন্তু ভুল করছিস।
ইকবাল: হ্যাঁ ভুল করছি কি করবে আমাকেও মেরে ফেলবে তাই তো? মেরে ফেলো তোমার মতো বাবার সন্তান হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াই ভালো।
মামা: ইকবাল..
ইকবাল: একদম চিৎকার করো না, ভুলে যেওনা তোমার সব খারাপ কাজের সাক্ষী আমি।
মামা: কি করবি তুই?
ইকবাল: আম্মুর খুনের প্রতিশোধ নিবো।
আম্মু: ইকবাল থাম এই মানুষটার সাথে কথা বাড়াস না।
আমি: আম্মু কি হয়েছে তোমার।
মেঘ: আম্মু.. (আম্মু টেবিলের একটা চেয়ার টেনে বসে পড়লেন, আম্মুকে খুব অস্থির দেখাচ্ছে)
ইকবাল: ফুফু কি হয়েছে?
আমি: পানি দাও আম্মুকে।
শায়লা: এইযে পানি। (শায়লার হাত থেকে পানি এনে আম্মুকে খাওয়ালাম)
ইকবাল: সব হচ্ছে এই লোকটার জন্য… আব্বু কোথায়? (পিছনে তাকিয়ে দেখি মামা নেই তারমানে পালিয়ে গেছে)
ইকবাল: ভয়ে পালিয়ে গেল।
মেঘ: কণা আম্মুকে রুমে নিয়ে শুয়ে দাও।
আমি: ঠিক আছে।

আম্মুকে রুমে এনে শুয়ে দিতেই ইকবাল আম্মুর পায়ের কাছে বসে আম্মুর পা জড়িয়ে ধরলো।
ইকবাল: ফুফু আমাকে ক্ষমা করে দাও আমি এসব আব্বুর কথায় করেছি। লোকটা আমাকে সবসময় বলেছে আম্মুকে তোমরা মেনে নেওনি তোমরা খুন করিয়েছ তাই প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আমি এমন করেছি। তবে ফুফাকে আমি খুন করিনি আব্বু করিয়েছে আমি আর শায়লা তো আব্বুর কথামতো চলেছি শুধু।
আম্মু: পা ছেড়ে এদিকে আয়। (ইকবাল গিয়ে আম্মুর পাশে বসলো, আম্মু একটা হাত ওর মুখে বুলিয়ে দিলেন। কি করবো বুঝতে পারছি না ক্ষমা করে দিবো ওকে কিন্তু পরে যদি আবার কোনো ক্ষতি করে)
ইকবাল: বিশ্বাস করো ফুফু আব্বু সবসময় বলেছে তুমি আমাদের শত্রু, আগে যদি জানতাম আব্বু আম্মুকে খুন করেছে তাহলে আমি তোমার কাছেই থাকতাম অন্তত একজন মা তো পেতাম।
আম্মু: কাঁদিস না।
ইকবাল: আমি সত্যি একটা অপদার্থ, প্রতিটা মুহূর্তে আমি তোমাদের উপর নজর রেখেছি অথচ একবারের জন্য মনে হয়নি আমার ফুফু খারাপ কাজ করতে পারেনা।
আম্মু: এখন তো নিজের ভুল বুঝতে পেরেছিস তাতেই আমি খুশি।
ইকবাল: কিন্তু অনেক দেরি যে হয়ে গেছে ফুফু। খারাপ লোকটার কথায় আমি অনেক খারাপ কাজ করেছি এবার এসব প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে।
শায়লা: মানে কি করবে তুমি?
ইকবাল: আত্মসমর্পণ করবো আব্বুর সব খারাপ কাজের হিসেব দিবো আর আব্বুকে ধরিয়ে দিবো।
শায়লা: কি বলছ এসব? (শায়লা ইকবালের থেকে সরে আসতে আসতে ফ্লোরে এসে বসে পড়লো, পাগলের মতো কাঁদছে শায়লা। কি যে হচ্ছে সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে)
ইকবাল: আমি আত্মসমর্পণ করবো তবে তোমরা আমার শায়লাকে কোনো শাস্তি দিওনা। মেয়েটা বড্ড ভালো শুধুমাত্র আমাকে হারানোর ভয়ে আব্বুর কথামতো সব করে গেছে, তবে ও শুধু কণাকে ফোনে ভয় দেখিয়েছে আর কোনো খারাপ কাজ করেনি। (ইকবাল কথাগুলো বলতে বলতে আমার দিকে তাকালো, উঠে আমার দিকে এসেই আমার পায়ের কাছে বসে পড়লো)
আমি: আরে কি করছ?
ইকবাল: ভাইকে ক্ষমা করে দে বোন। আমি কথা দিচ্ছি আমি আত্মসমর্পণ করবো আর আব্বুকে ধরার জন্য পুলিশকে সব রকম সাহায্য করবো। (কি করবো বুঝতে পারছি না মেঘের দিকে তাকালাম ও বোকার মতো দাঁড়িয়ে আছে। ইকবালের নজর মেঘের দিকে পড়তেই উঠে মেঘের কাছে গেল)
ইকবাল: শায়লা একটা অন্যায় করেছে শুধু আর সেটা তোমার আর তোহার সাথে। তবে জানো তো পাগলীটা রোজ রাতে তোহার জন্য কাঁদে আমি বলেছিলাম তোহাকে নিয়ে আসতে কিন্তু ও তোমার কথা ভেবে তোহাকে আনতে চায় না। তুমি তোহাকে ছাড়া থাকতে পারবে না তাই। এতোদিন ও যা যা করেছে সব অভিনয় ছিল। মেয়েটাকে উপর থেকে যতোটা খারাপ মনে হয় ভিতর থেকে ঠিক ততোটাই ভালো। কণা আর তোমাকে কষ্ট দিয়ে ও নিজে কান্নায় ভেঙ্গে পড়তো। আব্বু সবসময় ওকে ভয় দেখাতো আব্বুর কথামতো না চললে ওর থেকে আমাকে আলাদা করে নিবে আর ও আমাকে হারানোর ভয়ে সব খারাপ কাজ মুখ বুজে করে যেতো কারণ পাগলীটা যে আমাকে বড্ড বেশি ভালোবাসে। (ইকবাল শায়লা দুজনেই কাঁদছে, মেঘ এগিয়ে গেলো ইকবালের দিকে)
মেঘ: যদি তোমাকেই ভালোবাসতো তাহলে আমাকে বিয়ে করেছিল কেন?
ইকবাল: ওর পরিবারের জন্য। আমি তো খারাপ তাই ওর পরিবার মেনে নেয়নি, জোড় করে ওকে বিয়ে দিয়ে দেয়। তোমাকে কিছু বলতে পারতো না আবার আমাকে ভুলতে পারছিল না এভাবে দুবছর কেটে যায়। শায়লার বাবার মৃত্যুর পর ও আমার কাছে ফিরে আসতে চায়, আমিও খুব করে চাইছিলাম ও যেন আমার জীবনে ফিরে আসে। কি জানো তো যতোই খারাপ হই শায়লার প্রতি আমার ভালোবাসা সত্যি ছিল। আমি শায়লাকে বলেছিলাম তোহাকে নিয়ে আসতে আমি তোহাকে মেনে নিবো কিন্তু শায়লা বলেছিল তোহা মেঘের প্রাণ, তোহাকে নিয়ে আসলে মেঘ বেশি কষ্ট পাবে।
মেঘ: ভালোই হয়েছে শায়লা আমার জীবন থেকে না গেলে তো আমি কণাকে পেতাম না। শুধু আমার তোহা মা হারিয়েছে আ…
আমি: মেঘ তুমি আজো আমাকে তোহার মা ভাবতে পারনি?
মেঘ: সে কথা নয় কণা আ…
ইকবাল: আমি জানি কণা তুই তোহাকে খুব ভালোবাসিস তোর উপর নজর রাখতে গিয়ে বুঝেছি।
আম্মু: থামবি তোরা?
ইকবাল: ফুফু বলনা আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছ। আর শায়লা, ওকে কোনো শাস্তি দিওনা ও সত্যি খুব ভালো মেয়ে। আমাকে ভালোবাসে তো তাই হারানোর ভয়ে আব্বুর কথামতো কণাকে ফোন দিয়ে ভয় দেখাতো।
আম্মু: হুম বুঝতে পেরেছি।
শায়লা: তুমি আত্মসমর্পণ করলে আমার কি হবে?
আম্মু: তুমি আমার কাছে থাকবে বৌমা।
আমি: আম্মু কি বলছ…
আম্মু: তুই থাম। ইকবাল কম হউক বেশি হউক পাপ করেছে তাই ওর শাস্তি প্রয়োজন, তবে আমি খুব তাড়াতাড়ি ওকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করবো।
আমি: আম্মু হুট করে সিদ্বান্ত নেওয়া কি ঠিক হচ্ছে? আর পাপ তো শায়লাও করেছে।
আম্মু: মানুষ চিনতে আমি ভুল করিনা আর শায়লার পাপের শাস্তি তো ও পাচ্ছে তোহার জন্য কেঁদে।
আমি: আম্মু…
মেঘ: কণা আপাতত আম্মুর কথা শুনো আর ইকবাল আত্মসমর্পণ করে কিনা দেখো তাহলেই সব প্রমাণ হয়ে যাবে ওরা সত্যি ভালো হয়ে গেছে নাকি অভিনয় করছে। (মেঘ আস্তে আস্তে বললো, কি করবো সত্যি বুঝতে পারছি না)
ইকবাল: ফুফু আমি আসছি আমার শায়লাকে তুমি দেখে রেখো। আর কণা ভয় পাবি না একদম আব্বু তোদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না আমি খুব শীঘ্রই আব্বুকে এরেস্ট করাবো।
ইকবাল চলে গেল, শায়লা খুব কাঁদছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে সব কেমন যেন গুলিয়ে গেল। শায়লা কি সত্যি ভালো এতোদিন কি সত্যি মামার কথায় আমাদের সাথে অভিনয় করেছিল? হতেও পারে প্রিয়জনকে হারানোর ভয়ে তো মানুষ সব করতে পারে।

রুমে এসে জানালার কাছে দাঁড়িয়ে রইলাম, বাইরে তাকিয়ে আছি আর ভাবছি সত্যি কি সবকিছু ঠিক হয়ে গেল? এভাবে হুট করে সব পাল্টে যাবে আমিতো কল্পনাও করতে পারিনি। শুধুমাত্র একটা সত্যি সব পাল্টে দিলো। এতোদিন ইকবাল জানতো মামিকে আম্মুরা খুন করেছে আর আজ জানলো মামা নিজেই খুন করেছে আর এই একটামাত্র সত্যি সব পাল্টে দিলো।
মেঘ: কণা বাসায় কখন যাবো?
আমি: আজকে এখানে থাকি প্লিজ।
মেঘ: কিন্তু তোহা?
আমি: তুমি চলে যাও।
মেঘ: অসম্ভব আমি তোমাকে রেখে যাচ্ছি না, যেতে হয় দুজন একসাথে যাবো।
আমি: এমন করোনা প্লিজ আজ আম্মুর কাছে থাকি?
মেঘ: আমারো তো আমার বউয়ের কাছে থাকতে ইচ্ছে হচ্ছে। আচ্ছা দাঁড়াও তোহাকে ফোন করি।
আমি: ঠিক আছে। (মেঘ আমাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে পপির কাছে ফোন করলো)
পপি: হ্যাঁ ভাইয়া বলো।
মেঘ: আজ আসতে পারবো না তোহাকে রাখতে পারবি?
পপি: তোহা থাকলে আমি রাখতে পারবো না কেন?
মেঘ: তোহার কাছে ফোনটা দে।
পপি: দাঁড়াও।
তোহা: আব্বু…
মেঘ: মামুনি আমরা তো আজ আসতে পারবো না তুমি একা থাকতে পারবে?
তোহা: হ্যাঁ পারবো আমি ফুফির কাছে থাকবো। (ওদের কথার মাঝখানে পুলিশ আঙ্গেল এর কল এসে ঢুকলো)
আমি: মেঘ ফোনটা রাখো আঙ্গেল ফোন দিচ্ছেন। (মেঘ ফোন রাখতেই মোবাইল নিয়ে বারান্দায় চলে আসলাম)

আমি: হ্যাঁ আঙ্গেল..
আঙ্গেল: ইকবাল আত্মসমর্পণ করেছে।
আমি: কি? (আমি যেন বিশ্বাসই করতে পারছি না, তারমানে ওরা সত্যি ভালো হয়ে গেছে)
আঙ্গেল: শুধু তাই নয় ওর বাবার সমস্ত খারাপ কাজের প্রমাণ দিবে বলেছে যেন আমরা খুব তাড়াতাড়ি ওর বাবাকে এরেস্ট করতে পারি।
আমি: আমি ঠিক শুনছি তো?
আঙ্গেল: হ্যাঁ মা ইকবাল ওর সমস্ত অন্যায় স্বীকার করেছে।
আমি: ঠিক আছে ওর বাবাকে এরেস্ট করার ব্যবস্থা করুন খুব শীগ্রই।
আঙ্গেল: ঠিক আছে। (ফোন রেখে একটা সস্থির নিঃশ্বাস ফেললাম যাক এতোদিনে সব ঠিক হতে যাচ্ছে)
মেঘ: আমার মনে হচ্ছে সব ঠিক হয়ে গেছে এখন তোমার মামা এরেস্ট হলেই তোমরা বিপদমুক্ত।
আমি: হুম।

রাতের আধারে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি আর দুপর থেকে এখন পর্যন্ত দেখা শায়লাকে নিয়ে ভাবছি। কেমন যেন দুটানায় পরে গেছি আমি। ইকবাল আত্মসমর্পণ করলো, সারাটা বিকেল শায়লার সাথে কাটালাম একবারের জন্যও মনে হয়নি মেয়েটা খারাপ অথচ ওরাই এতোদিন আমার বাঁচা অসম্ভব করে তুলেছিল। শায়লা নিজের হাতে রান্নাবান্না করেছে সবার সাথে ভালো ব্যবহার করছে একবারও আমার মনে হয়নি এই মেয়েটা এখন আমাদের সাথে অভিনয় করছে বরং মনে হচ্ছে শায়লা ভালো শুধুমাত্র ভালোবাসার মানুষকে হারানোর ভয়ে খারাপ হওয়ার অভিনয় করেছিল।
মেঘ: অনেক রাত হয়েছে তো ঘুমাবে না?
আমি: শায়লার ব্যবহারে তোমার কি মনে হচ্ছে?
মেঘ: হয়তো তুমি রাগ করতে পারো তবে সত্যি এটাই শায়লা সবসময় এমন শান্তশিষ্ট ছিল। তোহা হবার পর থেকে ও আমার সাথে খারাপ ব্যবহার শুরু করে তারপর তো ডিভোর্স দিয়ে চলে গেল। শায়লার আগের রূপ আমি আজ দেখতে পাচ্ছি কাজেই বলতে হচ্ছে শায়লা ভালো হয়ে গেছে। অবশ্য ও তো ভালোই ছিল শুধু ইকবালকে হারানোর ভয়ে খারাপ হবার অভিনয় করেছিল। আর আমার মনে হয় প্রত্যেকটা মানুষ এই ভয় পায় যেমনটা আমি পাই তোমাকে হারানোর। (মেঘ আমাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো)
আমি: আচ্ছা শায়লা তোহাকে নিয়ে যাবে নাতো?
মেঘ: না কারণ শায়লা বুঝতে পেরেছে আমি তোহাকে কতোটা ভালোবাসি তাছাড়া এখন তো এইটাও জানে তুমি তোহার আরেক মা।
আমি: হুম।
মেঘ: অনেকদিন পর তোমাকে টেনশন মুক্ত লাগছে তাই…
আমি: তো?
মেঘ: কিছুই না।
আমি: কি করছ?
মেঘ: আমিতো কিছুই করছি না যা করার আমার হাত করছে। (মেঘ আমার শাড়ির নিচ দিয়ে হাত ঢুকিয়ে পেটে হাত বুলাচ্ছিল জোড় করে ওর হাত সরিয়ে দিলাম)
মেঘ: এখন? (মেঘ আমাকে কোলে তোলে নিয়ে ভ্রু কুঁচকিয়ে মুচকি হাসলো)
আমি: ছাড়ো না প্লিজ!

মেঘ: ছেড়ে দিলাম।
আমি: কোমরটা বোধয় ভেঙ্গেই গেছে। (মেঘ আমাকে বিছানায় এনে দফ করে ছেড়ে দিয়েছে ইচ্ছে হচ্ছে ওকে..)
মেঘ: আমি আদর করে দিচ্ছি ব্যথা কমে যাবে।
আমি: দুষ্টুমি করবে না একদম।
মেঘ: আমিতো আজ দুষ্টুমি করবোই পারলে আটকিয়ে দেখাও।
মেঘ আমার উপরে শুয়ে আমার দুহাতের আঙ্গুলের ভাজেভাজে ওর আঙ্গুল গুলো আটকে দিলো। আমার চোখের দিকে শান্তভাবে তাকিয়ে আছে, আমি জানি ও কেন এভাবে তাকিয়ে আছে। মেঘ ভালো করে জানে আমি ওর চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারিনা আর ও এভাবে তাকিয়ে থাকলে ওকে আমি আটকাতেও পারিনা, তাইতো ও এভাবে তাকিয়ে আছে। চুপচাপ চোখ দুটু বন্ধ করে নিলাম, মেঘ আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বললো “কি মেডাম আটকাবে না”
উত্তরে শুধু মৃদু হাসলাম। মেঘ আমার কপালে আলতো করে ওর ঠোঁট ছুঁয়ে দিলো…

চলবে😍

নীরবে_ভালোবাসি পার্ট: ২১

নীরবে_ভালোবাসি

পার্ট: ২১

লেখিকা: সুলতানা তমা

আম্মুকে সেই কখন থেকে ফোন দিয়ে যাচ্ছি কিন্তু আম্মু ফোন রিসিভই করছে না। শপিংমলে আছে নাকি বাসায় পৌঁছেছে কিছুই বুঝতে পারছি না। কিযে করবো এখন…
মেঘ: একটু স্থির হয়ে বসো প্লিজ।
আমি: আমার আম্মু মৃত্যুর মুখে আর তুমি…
মেঘ: না মানে অস্থিরতার সময়… (রাগি চোখে তাকালাম মেঘের দিকে, চুপ হয়ে গেল একদম)

ফোন হাতে নিয়ে রুমে পায়চারী করছি আর আম্মুর ফোনের অপেক্ষা করছি। হঠাৎ ফোন বেজে উঠলো তাড়াতাড়ি রিসিভ করলাম।
আমি: আম্মু কোথায় ছিলে?
আম্মু: কেন কি হয়েছে?
আমি: তুমি বাসায় আছ তো?
আম্মু: হ্যাঁ একটু শপিং এ গিয়েছিলাম বাসায় আসছি মাত্র।
আমি: যাক নিশ্চিন্ত হলাম।
আম্মু: হয়েছে কি বলবি তো?
আমি: সব বলবো আগে তুমি দেশে আসো।
আম্মু: দেশে?
আমি: হ্যাঁ আজ বিকেলের ফ্লাইটেই চলে আসো। কোনো প্রশ্ন করবা না, আমি এয়ারপোর্টে তোমাকে রিসিভ করার জন্য থাকবো।
আম্মু: তোর চাচ্চুকে জিজ্ঞেস করে নেই?
আমি: জিজ্ঞেস করতে হবে না শুধু বলো তুমি দেশে আসছ আমার কাছে।
আম্মু: কখন যে কি তোর মাথায় ঘুরপাক খায় কিছুই বুঝিনা।
আমি: তাড়াতাড়ি সব গুছিয়ে নাও।
আম্মু: ঠিক আছে রাখছি।

ফোনটা বিছানার উপর রেখে একটা সস্থীর নিঃশ্বাস ফেলে বিছানায় বসলাম। আম্মুকে কোনোভাবে আমার কাছে নিয়ে আসতে পারলে শায়লা আর ইকবালকে ছাড়ে কে। একবার শুধু আম্মুকে এয়ারপোর্ট থেকে ভালোভাবে বাসায় নিয়ে আসি তারপর শায়লার শশুড়কে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরাবো আমি।
মেঘ: আম্মু বিকেলের ফ্লাইটে আসলে তো রাত হয়ে যাবে।
আমি: হ্যাঁ এগারোটা বাজবে।
মেঘ: এয়ারপোর্ট থেকে এতো রাতে নিয়ে আসাটা রিস্ক হয়ে যাবে না?
আমি: তাইতো।
মেঘ: কি করবে?
আমি: সমস্যা নেই পুলিশ আঙ্গেলকে বলে সঙ্গে করে দুজন পুলিশ নিয়ে যাবো।
মেঘ: ঠিক আছে।

মা রান্না করছেন আমি হাতে হাতে সবকিছু এগিয়ে দিচ্ছি কিন্তু কোনো কাজে মন বসাতে পারছি না। আব্বুকে হারিয়েছি এখন যদি আম্মুর কিছু হয়ে যায় আমিতো শেষ হয়ে যাবো। আম্মুর কিছু হবার কথা ভাবতেই ভিতরে ছ্যাঁত করে উঠে।
মা: বৌমা তোমার কি হয়েছে বলতো তোমাকে এতো অস্থির অস্থির লাগছে কেন?
আমি: কিছু হয়নি তো মা।
মা: কিছু নিয়ে টেনশনে আছ?
আমি: আসলে আজ আম্মু আসছেন তাই একটু টেনশন হচ্ছে।
মা: তোমার মায়ের তো আর কোনো বিপদ হবে না শায়লা তো জেলে তাহলে এতো ভয় পাচ্ছ কেন?
আমি: ভয়টা তো শায়লার শশুড়কে নিয়ে মা কখন কি করে বসবে বুঝতেই পারছি না।
মা: কলিংবেল বাজছে দেখতো কে এসেছে।
আমি: দেখছি।

দরজা খুলে বাবাকে দেখে থমথম খেয়ে গেলাম, জানিনা বাবাকে বুঝিয়ে সবকিছু ঠিক করবো কিভাবে।
বাবা: কেমন আছ মা? বাসার সবাই কোথায় ডাকো সবাইকে, পাক্কা তিনদিন পর বাসায় আসলাম সবাইকে দেখি একটু।
আমি: ডাকছি বাবা।
বাবা: আমার তোহা দাদুভাই কোথায়?
তোহা: এইতো আমি। (পপির হাতের আঙ্গুল ধরে হাটছিল তোহা, বাবাকে দেখে দৌড়ে এসে কোলে উঠে বসলো। বাবার কন্ঠ শুনে সবাই একে একে ড্রয়িংরুমে আসতে শুরু করলো)
বাবা: পপি তোর হাতে কি হয়েছে?
পপি: আসলে বাবা…
বাবা: রুহান তোর আবার কি হলো মুখটা এমন শুকনো শুকনো লাগছে কেন?
দাদী: আমি বলছি তোকে সবকিছু তবে আগে বল তুই টেনশন করবি না হুট করে রেগে যাবি না।
বাবা: ঠিক আছে বলো আগে কি হয়েছে।
দাদী বাবাকে প্রথম থেকে সবকিছু বলতে শুরু করলেন। জানিনা বাবা কেমন রিয়াক্ট করবেন, ভয় হচ্ছে আমিতো বাবাকে কথা দিয়েছিলাম। বাবার চোখের সামনে থেকে রান্নাঘরে চলে আসলাম মায়ের কাছে।

মা: মানুষটার আবার না কিছু হয়ে যায় এসব শুনে।
আমি: কিছু হবে না মা একটু ধৈর্য ধরুন।
বাবা: এতোগুলো বছর ধরে আমি কাকে ছোট বোনের মতো ভালোবাসলাম? হ্যাঁ সেদিন একটা এক্সিডেন্ট ঘটেছিল কিন্তু আমিতো ওদের আপন করে নিয়েছিলাম আর ও কিনা আমাকে শত্রু ভেবে এসেছে সবসময়? (বাবার কথা গুলো শুনে খুব কষ্ট হচ্ছে। সত্যিই তো যাকে এতো ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখলেন সে কিনা এমন করলো। আপন মানুষ গুলো আঘাত করলে সত্যি খুব কষ্ট হয়)
মেঘ: আব্বু এসব নিয়ে টেনশন করোনা তো রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে একটু রেস্ট নাও। (বাবার দিকে একবার তাকালাম মাথা নিচু করে রুমের দিকে চলে গেলেন)

আর কিছুক্ষণ পর আম্মুর ফ্লাইট এখন পর্যন্ত তো সব ভালোই চলছে বাকি সময়.. হুট করে ফোন বেজে উঠলো, কেঁপে উঠলাম ফোনের শব্দে। আগের সেই লোকটির নাম্বার দেখে ভয়ে ভয়ে রিসিভ করলাম।
–কণা মামুনি বয়সে তো একটা পিচ্ছি মেয়ে তুমি আমাকে টপকে যাওয়ার কথা ভাবছ কিভাবে?
আমি: মানে?
–ভেবেছিলে আমার ছেলে আর বৌমাকে না ছেড়েই তোমার আম্মুকে তোমার কাছে নিয়ে যাবে। কিন্তু আমিতো তোমার আম্মুর ঠিক পিছনের সিটে বসে আছি, আমাদের ফ্লাইট একসাথেই। (ভেবেছিলাম লোকটা জানতে পারবে না কিন্তু ও তো আম্মুকে ফলো করছে, এখন কি করবো)
–কি হলো মামুনি চুপ হয়ে আছ যে? দেখবে তোমার আম্মুকে ভিডিও করে পাঠাবো?
আম: কি চান আপনি?
–ওই এটাই আমার ছেলে আর বৌমাকে ছেড়ে দাও।
আমি: ওদের ছেড়ে দিলে পর যে আপনি আম্মুর ক্ষতি করবেন না তার কি নিশ্চয়তা আছে?
–বললাম তো আপনজনদের মারতে আমার আবার একটু কষ্ট হয়।
আমি: কে আপনি? আমাদের কে হন?
–জানতে চাও তাহলে তোমার আম্মুকে জিজ্ঞেস করো সামাদ কে?
আমি: সামাদ?
–হ্যাঁ আমি সামাদ বাকিটা তোমার আম্মুর থেকে জেনে নিও রাখছি এখন। তবে পাঁচ মিনিটের মধ্যে যেন ইকবাল আমাকে ফোন করে নাহলে তোমার আম্মু…
আমি: না না আমি ফোন করে বলছি ছেড়ে দিতে।
–লক্ষী মামুনি।
লোকটা ফোন রেখে দিলো। পুলিশ আঙ্গেলকে ফোন দিতে খুব কষ্ট হচ্ছে এতো কষ্টের পর ওদের ধরা গেল আর এখন কিনা ছেড়ে দিতে হবে।

ফোনটা সমানে বেজেই চলেছে ইচ্ছে করেই রিসিভ করছি না। মাত্র পাঁচ মিনিট আগে পুলিশ আঙ্গেলকে ফোন করে বলেছি ওদের ছেড়ে দিতে আর গুনে গুনে পাঁচ মিনিট পরেই শায়লা ফোন করলো। এখন ফোন রিসিভ করলেই শায়লা হাসবে আর আমার বোকা হয়ে থাকা ছাড়া কিছু করার থাকবে না।
মেঘ: কি হলো ফোন রিসিভ করছ না কেন?
আমি: থাকুক না শায়লার তাচ্ছিল্যের হাসিটা শুনতে চাই না।
মেঘ: (নিশ্চুপ)
আমি: আমি হেরে গেছি মেঘ।
মেঘ: দূর পাগলী কাঁদছ কেন আর হেরে যাবে কেন? ওরা তো আর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাবে না, তুমি আম্মুকে আগে তোমার কাছে নিয়ে এসো তারপর আবার ওদের শাস্তি দিবে।
আমি: সে সুযোগটা কি ওরা আমাকে দিবে?
মেঘ: দেখো সব কিছুর মূলে তোমাদের সম্পত্তি আর এই সম্পত্তি পাওয়ার জন্যই ওরা এতোকিছু করছে, ওরা এই সম্পত্তি না নিয়ে দেশ ছেড়ে কোথাও যাবে না। আবার ফিরে আসবে ওরা আর তখন আম্মুও তোমার কাছে থাকবে তখন ওদের আবার এরেস্ট করাতে পারবে।
আমি: পারবো তো নাকি ওরা এভাবে অন্যায় করেও খুলা আকাশের নিচে ঘুরে বেড়াবে?
মেঘ: নিজের উপর ভরসা রাখো কণা, তুমি ঠিক পারবে।
আমি: হুম

এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে আছি আম্মুকে রিসিভ করার জন্য। সঙ্গে করে দুজন পুলিশ এনেছি ভয় হচ্ছে সামাদ এর লোকজন হয়তো আমাদের আশে পাশেই আছে।
মেঘ: ওইতো আম্মু। (মেঘের কথা শুনে সামনে তাকালাম, আম্মু আমাদের দিকে এগিয়ে আসছেন। আমার দুচোখ সামাদ নামের লোকটাকে খুঁজছে কিন্তু সন্দেহজনক কাউকে তো দেখছি না। তবে কি সামাদ আমাকে বোকা বানালো? না না বোকা বানাবে কি করে ও তো বলেছিল এয়ারপোর্টে আম্মুর পিছনের সিটে বসা, যদি না আসবে তাহলে জানবে কিভাবে)
আম্মু: কণা কাকে খুঁজছিস আমিতো তোর সামনে।
আমি: কাউকে না আম্মু গাড়িতে চলো।
আম্মু: আচ্ছা তুই আমাকে এভাবে এতো তাড়াতাড়ি আসতে বললি কেন?
আমি: সব বলবো বাসায় চলো।
আম্মু: ঠিক আছে।

বাসায় আসতে আসতে রাত সাড়ে বারোটা বেজে গেল, সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।
আমি: আম্মু তুমি ফ্রেশ হয়ে এসো আমি টেবিলে খাবার দিচ্ছি।
আম্মু: ঠিক আছে।
আমি: মেঘ তুমিও ফ্রেশ হয়ে এসো।
মেঘ: ওকে।

টেবিলে খাবার এনে সাজাচ্ছি আর ভাবছি ভালোয় ভালোয় তো আম্মুকে বাসায় নিয়ে আসলাম কিন্তু ওই লোকটা কি আমাদের পিছু ছাড়বে? সম্পত্তি চাইছে তারমানে সবকিছু নিজের নামে না নেয়া পর্যন্ত সে আমাদের পিছু ছাড়বে না। আব্বুর এতো কষ্টের সম্পত্তি ওই খারাপ লোকটাকে দিয়ে দিতে হবে নাকি? ফোনের স্কিনে চাচ্চুর নাম্বার ভেসে উঠলো, ফোনটা রিসিভ করলেই চাচ্চু নানা প্রশ্ন করবেন তাও রিসিভ করলাম।
আমি: চাচ্চু…
চাচ্চু: কি হয়েছে কণা তোর মা’কে এভাবে হুট করে দেশে যেতে বললি? ভাবি ঠিকমতো পৌঁছেছে তো?
আমি: হ্যাঁ চাচ্চু আম্মুকে নিয়ে বাসায় চলে এসেছি।
চাচ্চু: এখন বলতো কি হয়েছে তোর কন্ঠটাও আমার ঠিক লাগছে না। (কি করে বলি চাচ্চু আমার সন্দেহের তালিকায় তুমি ছিলে তাই তোমাকে কিছু জানাইনি। কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে এসবের পিছনে তুমি নেই)
চাচ্চু: কি হলো বল।
আমি: আসলে চাচ্চু আব্বুকে যারা খুন করেছিল তারা আম্মুকেও মেরে ফেলার ভয় দেখাচ্ছিল আমাকে তাই আমার কাছে নিয়ে এসেছি।
চাচ্চু: আমার কাছে কি তোর আম্মু সেইফ থাকতো না?
আমি: ছিল না চাচ্চু, ওখানে আম্মুকে ফলো করা হচ্ছিল তাইতো ভয় পেয়ে…
চাচ্চু: আমাকে একবার বলতে পারতি।
আমি: আসলে বলিনি…
চাচ্চু: আমি আগামীকাল আসছি।
আমি: চাচ্চু শুনো…
চাচ্চু তো রেগে গিয়ে ফোন রেখে দিলেন। আমাদের আপন কেউ বলাতে ভেবেছিলাম সবকিছু চাচ্চু করছেন কারণ চাচ্চু ছাড়া আমাদের আপন কেউ নেই। কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে চাচ্চু এমন করতেই পারেনা। তাহলে কে করছে এসব আমাদের আপন আর কে আছে?

মেঘ: কণা তুমি খাবে না?
আমি: হুম তোমরা খাও আমি একটু ফ্রেশ হয়ে আসছি।
আম্মু: এতো কিসের টেনশন করছিস?
আমি: কিছুনা আম্মু ফ্রেশ হয়ে আসছি আমি।

রুমে এসে লোকটার নাম্বারে ফোন দিলাম, রিং হয়েই যাচ্ছে কিন্তু রিসিভ করছে না। কয়েকবার ফোন দেওয়ার পর রিসিভ করলো।
–মামুনি তোমার দেখছি বড্ড কৌতূহল।
আমি: কে আপনি পরিচয় দিন।
–এতো তাড়া কিসের আস্তে আস্তে পরিচয় দিবো…
আমি: কি চান আপনি?
–সবকিছু।
আমি: মানে?
–আসলও চাই শোধও চাই এক কথায় সবকিছু চাই।
আমি: আপনার কি মনে হয় আমার আব্বুর এতো কষ্ট করে গড়ে তোলা সবকিছু আপনাকে আমি দিয়ে দিবো?
–আগে বোকা ছিলাম তাই জোড় করিনি কিন্তু এখন জোড় করবো প্রয়োজন হলে তোমাকে আর তোমার আম্মুকে খুন করবো।
আমি: আগে মানে?
–বহু বছর আগে।
মেঘ: কণা কি হলো এতো দেরি হচ্ছে কেন? (দ্যাত মেঘ ডাকছে)
আমি: আসছি।
–এতো কৌতূহল ভালো না মামুনি। সময় হলে আমিই তোমার সামনে আসবো এয়ারপোর্টে দুচোখ দিয়ে আমাকে তোমার খুঁজে বেড়াতে হবে না। (তারমানে লোকটা আমাকে এয়ারপোর্টে দেখেছে কিন্তু আমিতো দেখিনি। অবশ্য দেখলে তো চেনারও কথা না, জন্মের পর ওকে দেখেছি বলেতো মনে হয় না)
–আচ্ছা মামুনি এক কাজ করলে কেমন হয় একসাথে বসে সবকিছু যদি মিটমাট করে নেই? দেখো আমাকে সবকিছু দিয়ে দিলে কিন্তু আমি আর তোমাদের জ্বালাবো না।
আমি: একটা কানাকড়িও দিবো না আমি আপনাকে।
ফোন কেটে দিলাম। লোকটা তো কোনো ভাবেই পরিচয় দিচ্ছে না, আম্মুকে কি জিজ্ঞেস করবো?

ফ্রেশ হয়ে নিচে আসতেই আম্মু আর মেঘ আমার দিকে রাগি চোখে তাকিয়ে রইলো।
আমি: কি হয়েছে?
আম্মু: ফ্রেশ হতে এতো সময় লাগে?
মেঘ: আমাদের খাওয়া তো শেষ।
আমি: সমস্যা নেই আমি একা খেতে পারবো।
আম্মু: হ্যাঁ সেটা আমিও জানি এবার বল কি বলবি।
আমি: আম্মু খেতে দাও সারাদিন খাওয়া হয়নি তাছাড়া আমি খুব ক্লান্ত ঘুম পাচ্ছে, এসব নিয়ে সকালে কথা বলবো। তুমি যাও ঘুমিয়ে পড়ো।
আম্মু: তোর মতিগতি বুঝার সাধ্য কারো নেই। (আম্মু রুমের দিকে চলে গেলেন)
মেঘ: কি হলো আম্মুকে এসব বললে না কেন?
আমি: লোকটার কথায় যা বুঝতে পেরেছি লোকটা আমাদের আপন কেউ আর আম্মু ওকে চিনেন। যেহেতু লোকটা এমন করছে তারমানে ও আমাদের শত্রু। আম্মু এতোটা জার্নি করে এসেছেন এখন এসব বলে আম্মুকে টেনশন দেওয়া ঠিক হবে না আম্মুর ঘুম প্রয়োজন।
মেঘ: ঘুম তো তোমারও প্রয়োজন কণা, একবার নিজের দিকে তাকিয়ে দেখেছ এসব টেনশনে নিজের কি অবস্থা করেছ?
আমি: (মৃদু হাসলাম)

সকালে ঘুম ভাঙ্গতেই ফ্রেশ হয়ে আম্মুর রুমে আসলাম, এখন আম্মুকে জিজ্ঞেস করা প্রয়োজন কে এই সামাদ। কিন্তু আম্মু আর জোহা সবকিছু গুছগাছ করছে কেন?
আমি: আম্মু কি করছ?
আম্মু: জোহার জিনিসপত্র গুছিয়ে নিচ্ছি।
আমি: কেন?
আম্মু: আমি দেশে চলে এসেছি জোহা আর এখানে থাকবে কেন?
আমি: তারমানে তোমরা বাসায় চলে যাচ্ছ?
আম্মু: হ্যাঁ, মেয়ের শশুড় বাড়িতে থাকা যায় নাকি? তুই ঘুমুচ্ছিলি তাই ডাকিনি সব গুছিয়ে নিয়ে তোকে ডাক দিতাম।
আমি: কিন্তু আম্মু তোমরা একা ওই বাসায়…
জোহা: আব্বু আসছেন তো আজ।
আম্মু: হ্যাঁ তোর চাচ্চু আসছে কিছুদিন আমাদের সাথে থাকবে।
আমি: ঠিক আছে চলো আমিও যাবো তোমাদের সাথে।
আমি: তুই?
আমি: বিকেলে চলে আসবো।
আমি: ঠিক আছে।

আম্মু আর জোহাকে নিয়ে আমাদের বাসায় চলে আসলাম সাথে মেঘও এসেছে। যদিও চাচ্চু আসছেন তারপরও খুব ভয় হচ্ছে আম্মুকে এই বাসায় রাখতে।
জোহা: আমি সবকিছু গুছিয়ে নিচ্ছি।
আম্মু: ঠিক আছে।
আমি: আম্মু বসো এখানে তোমার সাথে আমার কথা আছে।
আম্মু: বল কি কথা? (সোফায় বসতে বসতে বললেন আম্মু, আমিও বসলাম)
আমি: আম্মু যারা আব্বুকে খুন করেছিল তাদের আমি জেলে দিয়েছিলাম কিন্তু তোমার জন্য ওদের আবার ছেড়ে দিতে হয়েছে।
আম্মু: আমার জন্য…
আমি: যে সবকিছু করছে সে তোমাকে মেরে ফেলার ভয় দেখিয়েছিল আমাকে তাই ছাড়তে হয়েছে।
আম্মু: এজন্যই তুই আমাকে তোর কাছে নিয়ে আসলি? কিন্তু লোকটা কে?
আমি: তোমাকে চিনে আম্মু তুমিও হয়তো চিনো, লোকটা তো বলছে আমাদের আপন কেউ।
আম্মু: আপন…
আমি: সামাদ নামে কাউকে চিনো আম্মু?
আম্মু: সামাদ? (আম্মু চমকে গিয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালেন)
আমি: চিনো তুমি? উনার ছেলের নাম ইকবাল।
আম্মু: সামাদ, ইকবাল? হ্যাঁ চিনি তো।
আমি: কে উনি?
আম্মু: তোর মামা। (এবার আমার চমকে যাওয়ার পালা, এতো বড় হয়েছি কখনো শুনিনি আমার কোনো মামা আছে। সবসময় শুনে এসেছি আম্মু একা, আর কয়েক বছর আগে তো নানা নানু দুজনই মারা গেছেন)
আমি: আম্মু কখনো তো বলনি আমার কোনো মামা আছে, সবসময় তো বলেছ তুমি একা তোমার কোনো ভাইবোন নেই।
আম্মু: বলবো কিভাবে সামাদ তো… (কলিংবেল বেজে উঠলো, এই সময় কে আসলো)
আম্মু: আমি দেখছি।

আম্মু দরজা খুলতে গেলেন, কে এসেছে দেখার জন্য আমিও দরজার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আম্মু দরজা খুলে আচমকা পিছিয়ে আসলেন, একজন লোক এসেছে। আম্মু ভাইজান বলেই আচল দিয়ে মুখ চেপে ধরলেন। দাঁড়িয়ে পড়লাম, তারমানে এই লোকই সামাদ মানে আমার মামা? কিন্তু কেন এসেছে এই লোক? আম্মুর কোনো ক্ষতি করবে নাতো…

চলবে😍