প্রত্যাখান_পর্ব(১৫)

প্রত্যাখান_পর্ব(১৫)
প্রত্যাখান_পর্ব(১৫)

প্রত্যাখান_পর্ব(১৫)

লেখা- অনামিকা ইসলাম ‘অন্তরা’

রাত্রি দশটা বেজে পয়তাল্লিশ মিনিট।

পিয়াদের বাসার গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে আছি মিনিট পাঁচেক হয়ে গেছে।

কল দিয়েছিলাম পিয়ার বাবা জনাব সিদ্দিক সাহেবের ফোনে।

রিসিভ করে বলছে আসতেছে কিন্তু পাঁচ মিনিট অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পরও ওনার খবর নেই কোন।

পুনঃবার কল দিলাম।

রিংটোনের আওয়াজ বলে দিচ্ছে, মানুষটা সিড়ি পেরিয়ে গেইটের অনেকটা কাছে চলে এসেছে।

কল কেটে গেইটের ভেতরে দৃষ্টি নিয়ে গেলাম।

বলতে বলতেই সিদ্দিক কাকা গেইটের একদম সন্নিকটে চলে আসে। আমাকে দেখে দুর থেকেই বলতে শুরু করেন তিনি,

‘বাপরে! বয়সের সাথে সাথে মাথাও কিছুটা নষ্টের পথে।

গেইট খুলার চাবি না এনে চলে আসছি ঔষধের বক্স নিয়ে।

তিনতলা পেরিয়ে দুতলায় আসতেই খেয়াল করি সেটা।’ কাকাকে সালাম দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলাম।

কুশলাদি বিনিময় করতে করতে কাকার সাথে তিনতলায় বাসায় ঢুকলাম। তিনকক্ষ বিশিষ্ট ছোট্ট একটা বাসা।

অনেকটা ছিমছাম এবং গুছানো।

একরুমে কাকা কাকি থাকেন, আরেক রুমে তাদের একমাত্র মেয়ে পিয়া এবং অন্য রুমে আগত অতিথিরা থাকেন।

যথারীতি কুশলাদি বিনিময়ের পর পিয়ার মা এবং পিয়া আমায় বসতে অনুরোধ করেন।

আমি বসার আগেই এদিক ওদিক তাকিয়ে পিয়ার দিকে দৃষ্টি নিলাম। প্রশ্ন করলাম,

‘পিয়া, কোথায় লাবণ্য?

ও’কে দেখছি না যে?’ চায়ের কাপটা পিয়ার মা আমার হাতে এগিয়ে দিতে দিতে জানান দেয়,

‘ঘুমুচ্ছে। আহারে বেচারী! পুরো দুপুর পথভুলে ঘুরে বেরিয়েছে রাস্তায়।

তারপর যাও মানুষের মাধ্যমে একটু রাস্তাটা ধরতে পারলো, ওমনি বৃষ্টি শুরু হলো।

সেকি বৃষ্টি! একদম মুশলধার।

ব্যাটা! ব্যবসা নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে? ঘরের দিকেও তো একটু নজর দিতে হবে, তাই না?

এক কাজ করো। একদিন ব্যবসা কার্য থেকে দুইদিনের জন্য বিরতি নিয়ে ঢাকা শহরটা ঘুরে দেখাও মেয়েটাকে।

যাতে ভবিষ্যতে পথভুলে হারিয়ে না যায়।’ পিয়ার মায়ের কথার প্রতিউত্তরে কিছুই বলতে পারিনি।

তার আগেই ওনি আবারও বলতে শুরু করেন,

‘আহারে বেচারী! সারাটা দিন অসহায়ের মতো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে শেষমেশ বৃষ্টির জন্য টং দোকানে আশ্রয় নেয়।

পরে বৃষ্টি থামলে পাশের ফ্ল্যাক্সির দোকান থেকে শাশুড়ীকে কল দিয়েছে।

তারপর তোমার মা কল দিয়ে ওর বর্তমান অবস্থানটা আমাদের জানালে তোমার আঙ্কেল গিয়ে ওকে নিয়ে আসে।

ঐতো! লাবণ্য আসছে। ঘুম হলো মা?’ আন্টির দৃষ্টিকে অনুসরণ করে পেছনে ফিরে তাকালাম আমি।

ঘুমজড়ানো চোখে ছোট বাচ্চাদের ন্যায় আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে লাবণ্য।

চায়ের কাপে শেষ চুমুকটা দিয়ে কাপটা একপাশে রেখে ওঠে দাঁড়ালাম সোফা থেকে।

‘আন্টি! আজ তাহলে আমরা আসি।

লাবণ্য চলো।’ লাবণ্যর দিকে তাকিয়ে আচমকাই বলে ওঠলাম কথাটা।

‘কি বলছো তুমি বাবা? আসছো মানে?

আজ কোথাও যাওয়া হবে না। আজ তোমরা আমাদের এখানে থাকবে।’

সোফা থেকে ওঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে পিয়ার মা কথাটা বলে।

‘ না আন্টি, আজ নয়৷ অন্য আরেকদিন। আর তুমি দাঁড়িয়ে আছো কেন?

যাও, কলেজ ব্যাগ নিয়ে আসো।’

অনেকটা অধিকার খাটানোর ন্যায় লাবণ্যর দিকে তাকিয়ে কথাটা বললাম।

জবাবে আন্টির দিকে ফিরে তাকায় লাবণ্য।

ভাবমূর্তিখানা এমন যে, আমার কথায় যেন ভিষণ রকম বিরক্ত ‘ও’।

এতরাতে বাসা থেকে বের হওয়ার কোন ইচ্ছেই যেন ওর নেই।

ওর সেই মুখভঙ্গিকে কাজে লাগিয়ে আরো জোর গলায় জানান দেয় আন্টি, ‘না, বাবা!

এই প্রথম মেয়েটা এসেছে। আজ যাওয়া যাবে না।

এতরাত্রিতে তো কোনভাবে নয়। তুমি বরং সকালে এসো।

‘ কেন জানি আন্টির সাধারণ কথায়ও সেদিন আমার মেজাজ চরমে ওঠে গিয়েছিলো।

লাবণ্যর দিকে না তাকিয়েই বললাম, আচ্ছা!

ও থাকুক তবে। আসি আন্টি। আঙ্কেল আসসালামু আলাইকুম।

বাসা থেকে বের হয়ে নিজের ওপর চরম রাগ ওঠে যায়।

এ আমি কি করলাম?

রাগের জন্য ওকে রেখেই চলে আসলাম? না এটা ঠিক হয়নি আমার। ভালো লাগছিলো না কিছুই।

বাসায় না গিয়ে ঘুরঘুর করতে লাগলাম রাস্তায়।

আর মনে মনে লাবণ্যর সাথে কথা বলতে লাগলাম,

‘না হয় আমি বলেছিই থাকতে, তাই বলে তুমি এমন করতে পারলে?

আমাকে একবার থামিয়ে বলতে পারলে না, আমিও যাবো আপনার সাথে?

কি এমন ক্ষতি হতো এটা করলে?’ মুশলধারে বৃষ্টি শুরু হলো।

রাস্তায় দাঁড়িয়ে তিনতলার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আমি।

নাহ! কেউ দাঁড়ায়নি আমার পথপানে তাকিয়ে।

একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পেছনের দিকে তাকাতেই ভূত দেখার ন্যায় চমকে ওঠলাম আমি।

ছাতা হাতে স্বয়ং লাবণ্য দাঁড়িয়ে।

তারপাশেই আরো একটি ছাতা হাতে সিদ্দিক কাকা দাঁড়িয়ে।

আসলে হচ্ছেটা কি? বুঝতে পারছিলাম না কিছুই।

স্তব্ধ দৃষ্টিতে তাই তাকিয়ে আছি ওদের পানে।

সিদ্দিক কাকা দুষ্টুমির হাসি হেসে আমার দিকে তাকিয়ে।

তুই তো পুরো বাপের মতো হয়েছিস।

তোর বাপও এমন করত।

অকারণে ভাবির(তোর মা) সাথে ঝগড়া করতো।

তারপর তোর মা বাপের বাড়ি চলে গেলে রাত্রি আধারে তোর বাপ শ্বশুরের ফ্ল্যাটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতো।

কাকার কথায় লজ্জা পেলাম ভিষণ।

কাকা আবারো বলতে শুরু করেন, রাগ করে চলে আসছে লাবণ্য,

এটা আমায় আগে বলিসনি কেন?

আগে বললে তো তোকে এত কষ্ট করতে হতো না৷

ভাগ্যিস, বারান্দার গ্লাসগুলো মিলিয়ে দেয়ার সময় নিচে দৃষ্টি আসে আমার।

কাকা, আমি আসলে….

পুরো কথা বলতে পারিনি। তার আগেই কাকা লাবণ্যর দিকে ফিরে তাকায়।

‘শুনো মা, বর ঝগড়া করলে,

তাদের ঘাড়ের রগ বাকা থাকলে সেগুলো টেনে সোজা বানানোর দায়িত্ব তোমাদের।

রাগ করে এভাবে হুটহাট বাপের বাড়ি/অন্য কোথাও যাওয়ার আগে নেক্সট টাইম একলা ঘরে বসে এটাই ভাববা,

কিভাবে টাইট দিলে বর সোজা থাকে।

কি মনে থাকবে?’

মাথা ঝাকিয়ে হ্যাঁ-বোধক জবাব দেয় লাবণ্য।

হাসি এসেও আসলো না আমার। কাকার থেকে বিদায় নিয়ে পায়ে হেঁটে দুজন চললাম সামনের দিকে।

খানেকদুর যেতেই মাথায় দুষ্ট বুদ্ধির উদয় হয়।

ওর কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওর হাতের ছাতাটা ছেড়ে দিলাম ওপরে শূন্যের দিকে।

মুহূর্তেই দমকা হাওয়া এসে সেটা উড়িয়ে নিয়ে যায় দুরে। চলবে….