মন ফড়িং ❤ পর্ব – ১০ 

0
399
মন ফড়িং ❤
পর্ব – ১০
মানব হৃদয় কখন কী ভাবে বোঝা মুশকিল। আসমা জামান তার ছেলের মনের অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করছেন এই মূহুর্তে। কিন্তু পারছেন না। হতে পারে নিদ্রের মায়ের কথা মনে পড়েছে! আবার নাও হতে পারে।
– নাজমুল শোন তো।
নাজমুল সাহেব দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বললেন
– কিছু বলবা?
– চল একসাথে বাংলাদেশে ঘুরে আসি।
নাজমুল সাহেব মুচকি হেসে বললেন
– না, তোমরা যাও।
৭ টা ৫৫ মিনিটে নিদ্র, মিস্টার ব্রন্ডের বাসায় হাজির। মিস্টার ব্রন্ড দরজার সামনে নিদ্রকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললেন
– বাইরে কেনো দাঁড়িয়ে ভেতরে আসুন। মনে হচ্ছে রাতে ঘুম কম হয়েছে?
– একটু বেশিই ঘুম হয়েছে আরকি!
মিস্টার ব্রন্ড হাসতে হাসতে বললেন
– টেবিলের উপর গরম কফি রাখা আছে। খেয়ে কাজে লেগে পড়ুন।
– আপনি কোথাও যাচ্ছেন?
– হ্যাঁ, আমার স্ত্রীকে আনতে যাচ্ছি। ১০ টার দিকে চলে আসবো।
মিস্টার ব্রন্ড চলে যাবার পর নিদ্র কফি হাতে নিয়ে বাকি কাজে মন দিলো।কফিটা খারাপ না খেতে।
১০ টার দিকে মিস্টার ব্রন্ড ফিরে এলেন। হুইলচেয়ারে করে ২৫ – ২৮ বছরের একজন নারীকে নিয়ে। মহিলা প্যারালাইজড, পুরোপুরিভাবে! হাত পা কিছুই নাড়াতে পারেনা।মহিলা তেমন সুন্দরী না আবার অসুন্দরী নন। অদ্রির মতো!  মিস্টার ব্রন্ড আর এই মহিলা একা নন। একজন নার্স আছেন, মধ্যবয়সী!
ঘরে ঢুকেই মিস্টার ব্রন্ড, নিদ্রকে উদ্দেশ্য করে বললেন
– নিড্র, আমার প্রিয়তমা স্ত্রী ম্যান্ডি!
মিস্টার ব্রন্ড তার স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলতে শুরু করলেন
– ম্যান্ডি, কেমন লেগেছে বলোতো? অল্পবয়সী ছেলেটাকে দেখছো না, ওইযে দাঁড়িয়ে আছে? ও ডেকোরেশন করেছে। দারুণ না? ওকে গিফট দেয়া উচিৎ না আমাদের?
নিদ্র বেশ অবাক হয়ে শুনছিলো ব্রন্ডের কথাগুলো।
মিস্টার ব্রন্ড তার ওয়ালেট থেকে ৫০০ ডলার এর তিনটি নোট নিদ্রের হাতে গুজে দিয়ে বললেন
– ম্যান্ডির, খুব ভালো লেগেছে তোমার ডেকোরেশন টা। ও  আমাকে বলেছে তোমাকে গিফট দিতে। গিফট তো আর এখন কিনে আনা সম্ভব না। তাই তোমাকে এক্সট্রা কিছু ডলার দিলাম। পছন্দমতো কিছু কিনে নিও।
নিদ্র বেশ স্বাভাবিকভাবেই বলল
– আপনি বলেছেন এতেই হবে। এক্সট্রা ডলার লাগবেনা।
– নিতেই হবে। তা না হলে ম্যান্ডি খুব কষ্ট পাবে। ওই দেখো ও তাকিয়ে দেখছে আর শুনছে কী বলি! যদি বুঝতে পারে তুমি নাও নি তাহলে তো কষ্ট পাবে।
নিদ্র তার ব্যাগ গুছিয়ে নিচ্ছিলো বাসায় ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। মিস্টার ব্রন্ড তার স্ত্রীকে নিয়ে ব্যস্ত আছেন। এই মুহূর্তে তাকে বিরক্ত করাটা ঠিক হবেনা কিন্তু তার স্ত্রীর এই অবস্থার পিছনে কারণটা জানতে ইচ্ছে করছে।
মিস্টার ব্রন্ড তার স্ত্রীর বিছানার পাশে বসে আছেন। স্ত্রী ঘুমুচ্ছেন, সে যদি একটা রাত এভাবে ঘুমাতে পারতেন।
স্ত্রীর পাশ থেকে উঠে চলে এলেন বসার ঘরে। নিদ্রকে ব্যাগ গুছাতে দেখে বললেন
– আপনার জরুরি কাজ আছে নাকি?
নিদ্র বলল
– না, তেমন নেই। তবে খুব খিদে পেয়েছে, বাসায় না গিয়ে উপায় নাই।
– একটা মিনি বার্গারে হবে আপাতত?
– না সমস্যা নেই। আমি বাসায় গিয়ে খেয়ে নিবো।
– আমি চাচ্ছিলাম তোমার সাথে কিছুক্ষণ গল্প করবো।
বসার ঘরে ছোটো টেবিল এনে মিস্টার ব্রন্ড নিদ্রকে চেয়ার টেনে বসতে বললেন।
হাফ প্লেটে বার্গার আর টমেটো সস এনে টেবিলে রেখে, নিদ্রকে জিজ্ঞেস করলেন
– বেয়ার নাকি রেড ওয়াইন?
নিদ্র বলল
– ওসব আমার ঠিক সহ্য হয়না। ঠান্ডা পানি হলে হবে।
পানির বোতল টেবিলে রেখে মিস্টার ব্রন্ড নিদ্রের সামনে চেয়ার টেনে বসে বললেন
– আমার মনে হচ্ছে তোমার জানতে ইচ্ছা করছে আমার স্ত্রীর এই অবস্থা কেনো?
নিদ্র খেতে খেতে বললো
– তা ঠিক কিন্তু আপনি জানলেন কীভাবে?
– আমার স্ত্রীর অবস্থা কীভাবে এমন হলো।সবাই জানতে চায়। আর তোমার হাবভাব দেখে বুঝেছি কিছুটা।
– আপনি বলেন আমি শুনছি। আমার জানতে খুব ইচ্ছে করছিলো।
– আমার স্ত্রী একটা স্কুলের টিচার ছিলো আর আমি একটা ফ্যাক্টরি তে ম্যানেজার পদে আছি। বিয়ের প্রথম দিকে বেশ সময় দিতাম ওকে কিন্তু ফ্যাক্টরির অবস্থা খুব একটা ভালো না চলাতে আমার ব্যস্ততা আরও বাড়লো। ফ্যাক্টরির মালিকের সাথে আমার বেশ ভালো সম্পর্ক হওয়াতে দায়িত্বটাও বেড়েছিলো। এমনও রাত যেতো যে আমি বাসায় আসার সময় পেতাম না। মাথায় শুধু একটাই চিন্তা থাকতো কীভাবে, কোন উপায়ে পরিবর্তন আনা যায়। ওর প্রতি অবহেলাটা আমার অনিচ্ছাকৃত ভাবেই বাড়তে থাকে। প্রায় ১ বছরের মতো এভাবেই চলছিলো। ও যে প্রচুর ড্রিংক করতো আমি বুঝতে পারছিলাম। কিন্তু কিছুই করার ছিলো না। ক্যারিয়ার আর ক্যারিয়ার!
ঠিক ৬ মাস আগে আমার স্ত্রী সুইসাইড নোট লিখে বাসার ছাদ থেকে লাফ দিয়ে সুইসাইড করার চেষ্টা করে। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায়!
আমাদের লাভ ম্যারেজ ছিলো! এই ক্যারিয়ার আর ফ্যাক্টরি করে করে ওর সাথে আমি অন্যায় করেছি। আমাদের কালচার নিড্র তোমার দেশের মতো না। আমাদের এখানে বিয়ে, ডিভোর্স, সেক্স পার্টনার এসব কোনো ব্যাপারই না। কিন্তু ভালোবাসাটা বোধহয় কালচার ভেদে পরিবর্তন হয়না।
আমার মনে হয় ও ভাবতো – আমি আর তাকে ভালোবাসিনা। অন্য কোনো মেয়ে পেয়ে গেছি। অন্য কারো সাথে সেক্সুয়াল সম্পর্ক রেখেছি এসব। কিন্তু ওর ভাবনাটা ভুল ছিলো। তবে এই ভুল ভাবার পিছনে আমি দায়ী ছিলাম। আমার এখনো মনে পড়ে অচেনা নাম্বার থেকে কেউ একজন বলছে – আপনার স্ত্রী সুইসাইড করেছে!
আমার বিশ্বাসই হচ্ছিলো না যে, ও আমাকে ছেড়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
ডাক্তার বলেছেন – সুস্থ না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। যদি কোনো মিরাকেল না হয়!
আমি প্রায়শই ভাবি, একটা মিরাকেল ঘটে গেছে। ও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে আমার জন্য স্পেশাল বার্গার তৈরি করছে!
আমার ওর স্পেশাল বার্গারটা খুব পছন্দ! ও সুস্থ হলে, আপনাকে একদিন খাওয়াবো।
চলবে…..!
© Maria Kabir