প্রত্যাখান_পর্ব(১৪)

#প্রত্যাখান_পর্ব(১৪)
লেখা- অনামিকা ইসলাম ‘অন্তরা’

‘এত যে কষ্ট মনের ভেতরে, তবুও মেয়েটির বিন্দু মাত্র ক্ষোভ নেই বাবা-মায়ের প্রতি। সবসময় মুখে হাসির রেখা ঝুলেই থাকবে। প্রকাশ করে না ঠিক’ই। কিন্তু বুঝি তো, সব বুঝি,’ জানালেন ভাবি। অনেকটা হাহাকার মিশ্রিত ছিল সে কথা।

খানেক থেমে তিনি আবারও বলতে শুরু করে, ‘জানেন, সেবার যখন আপনার মা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলো, তখন ওর কি আহাজারি! কিছুতেই আপনাকে বিয়ে করবে না। করতেই যদি হয় তবে আপনাকে বিষয়টা জানিয়েই করবে।’
এ কথা শুনে আপনার মা খানেক হাসলেন৷ তারপর লাবণ্যর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেছিলেন তিনি, ‘বোকা মেয়ে! বিয়েই তো হয়েছে। অন্যায় তো কিছু করো নি। নিজেকে এত ছোট কেন ভাবছো? ছোট তো হওয়া উচিৎ ঐ মুখোশদারী মানুষটির, যে তোমাকে প্রতি পদে পদে ঠকিয়েছে।’
তারপর আর আন্টির মুখের উপর কথা বলেতে পারেনি সে। সব ঠিকঠাক ছিলো। বিপত্তিটা ঘটল সেদিন, ‘যেদিন লাবণ্য ফেসবুকে আপনার স্ট্যাটাসের মাধ্যমে জানতে পারলো মিথ্যে কথা একদম বরদাস্ত করেন না আপনি। হোক তা মজা করেও।’
আর সেদিনই সে আংকেলকে ডেকে প্রত্যাখান করে দেয় বিয়ের প্রস্তাব।
সত্যি বলতে প্রথম দেখাতেই(ছবি দেখে) ও আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছিল। জায়গা দিয়ে ফেলেছিলো মনের ছোট্ট কুঠুরিতে। কিন্তু প্রকাশ করতে পারেনি।
‘একটা বিয়ে হয়েছে, স্বামী সংসারে থাকতে পারেনি তিনমাসও, চলে আসতে হয়েছে। এসব নানাবিধ কারণে ও হীনমন্যতায় ভুগতো। নিজেকে ভিষণ ছোট ভাবতো। মানুষের ভালোবাসার অযোগ্য মনে করতো নিজেকে।’

লাবণ্যর ভাবির কথাগুলো শুনছিলাম আর দু’চোখ দিয়ে অকাল শ্রাবণ ঝরছিল আমার। মনে মনে শুধু এটাই ভাবছিলাম, ‘এ আমি কি করলাম! কেন করলাম? কোন কিছু না জেনে বুঝে কেন এমনটি করলাম?’
‘শুভ্র ভাই! বেলা বয়ে গেল বলে। আপনি কি আজ রাতটা আমাদের ছোট্ট কুটিরে থেকে যাবেন?’ অনেকটা অনুনয়ের স্বরে ছিল সে প্রশ্ন।
সম্বিত ফিরে আমার। ঠোঁটের কোণে মেকি হাসির দেখা ফুটিয়ে তুলি। ‘না, না, ভাবি! আমার এখন যেতে হবে। আসি।’

হেনা ভাবির থেকে বিদায় নিয়ে আমি যখন নরসিংদী থেকে রওয়ানা দেই, তখন বিকেল ৫টা বেজে ১৩ কি ১৪মিনিট। বাসায় যখন ফিরি তখন রাত্রি সাড়ে ৯টা বাজে।
দরজায় নক করতেই ‘আশা’ এসে দরজাটা খুলে দেয়। যদিও প্রতিটা দিন ড্রয়িং রুমে বসে আমার জন্য প্রতীক্ষার প্রহর গুনতো লাবণ্য।
ভেতরে প্রবেশ করেই আমার আকুল নয়ন খুঁজতে থাকে লাবণ্যকে। এদিকে বোন যে আমার প্রশ্ন করেছে, ‘কিরে ভাইয়া! এরকম দেখাচ্ছে কেন তোকে?’ সেদিকে একটুও মন নেই আমার।
বোনের প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই দ্রুতপায়ে এগিয়ে যাই নিজ রুমের দিকে, খুঁজতে থাকি লাবণ্যকে।
কিন্তু নাহ! পাইনি ও’কে। ভেতরটা আমার হাহাকার দিয়ে ওঠে। দ্রুত পায়ে মায়ের রুমে গেলাম। মায়ের রুম থেকে গোসলখানা, কিচেন, এরুম-ওরুম সবখানেই খুঁজলাম ও’কে মনে মনে, ভিষণ সংগোপন।

আমার এরকম হন্তদন্ত হয়ে ছুটাছুটিতে কিছুটা অবাক হয় মা। প্রশ্ন করে, ‘কিরে! কি হয়েছে তোর? কি খুঁজছিস এভাবে?’
হতাশ চোখে মায়ের দিকে তাকালাম আমি। তারপর অনেকটা ভেঁজা গলায় প্রশ্ন করলাম, ‘কোথায় লাবণ্য? ও’কে কোথাও পাচ্ছি না?’
বিয়ের পর এই প্রথম নিজ থেকে লাবণ্যর খোঁজ নিয়েছি৷ ব্যাপার’টাতে অবাক হয় মা। কিন্তু অস্বাভাবিক হয়নি। মনে হচ্ছে যেন এরকম কিছু ঘটবে সেটা ওনি আগে থেকেই জানতেন।
কিছুটা উত্তেজিত কন্ঠে প্রশ্ন করলাম আবারও, ‘কি হলো? কিছু বলছো না যে? কোথায় লাবণ্য?’
মায়ের জবাব, ‘বৃষ্টির জন্য আটকে গিয়েছিলো রাস্তায়। পরে পথভুলে আশ্রয় নেয় বান্ধবীর বাসায়। এখন পিয়াদের বাসায় আছে। কাল সকালে চলে আসবে।’
কেন জানি না, সেদিন আমার ভিষণ রাগ হয় লাবণ্যর প্রতি। ‘না হয় পথভুলে কিছু টা সময় নষ্টই হলো, তাই হলে এভাবে অন্যের বাসায় রাত কাটাবে?’
ঘড়িতে ১০টা বাজার শব্দ হলো তখনই। ঝুলে যাওয়া টা-ই’টা ভালো ভাবে বেধে মায়ের দিকে ফিরে তাকালাম, ‘আমি আসছি পিয়াদের বাসা থেকে। গেইটটা লাগিয়ে দাও।’
পিছু ডাকছে আশা। ‘ভাইয়া! শুন। বাইরে বৃষ্টি পরছে। যাসনে। এই ভাইয়া! ছাতাটা তো নিয়ে যা। এইরে! চলে গেলো। মা, তুমি এভাবে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছো, কিছু বললে না কেন ভাইয়াকে?
জবাবে একটা রহস্যজনক হাসি দিয়ে আমার মা সেদিন নিজ রুমে চলে গিয়েছিল….

চলবে….