খেলাঘর পর্ব-৪

0
653
খেলাঘর পর্ব-৪
খেলাঘর পর্ব-৪

খেলাঘর পর্ব-৪
লেখা-সুলতানা ইতি

অরনি আর কিছু বল্লো না
ইহান ছাড়া বাকিরা সব বেরিয়ে গেছে
মিথিলা ইহানের দিকে তাকিয়ে বল্লো
– তুই দাঁড়িয়ে আছিস কেন, তোর ও তো রাগ করে চলে যাওয়ার কথা

ইহান শান্ত কন্ঠে বল্লো
– সবাই কি এক রকম,কেউ কেউ তো বন্ধুর সাথে অভিমান করে থাকতে পারে ,আর কেউ পারে না,ধরে নে আমি সেই না পারার দলেরই একজন

মিথিলা- ওহ আচ্ছা,
ইহান- একটা কথা বলবো

মিথিলা -জানতাম তুই প্রশ্ন করার জন্য ই রয়ে গেছিস কি বলবি হল

ইহান অনেক টা ইতস্তত ভাবেই জিজ্ঞাস করলো
– তুই কি আমার সামনে শাড়ি পরতে চাস না

মিথিলা ভ্রুকুচকে তাকালো ইহানের দিকে,তার পর স্বাভাবিক হয়ে বল্লো
– তোর এমন মনে হওয়ার কারন কি

ইহান- না এমনি মনে হলো
মিথিলা- তোর ধারনা ভুল আমি এমনি শাড়ি পরতে চাই না

ইহান আর কিছু বল্লো না
নির্বাক দৃষ্টিতে ছেয়ে আছে মিথিলার দিকে
ভাবছে মনে মনে
– এই মেয়ে এমন কেনো, কোন কিছুতেই ওর আগ্রহ নেই,মেয়েরা এমন হতে পারে? সাধারণত মেয়েরা শাড়ি পরা সাজগোজ নিয়ে বেশি এক্সাইটেড থাকে, আর এতো পুরো ভিন্ন

মিথিলা- দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভেবে লাভ নেই ইহান,আমি শাড়ি পরবো না

ভাবতে ভাবতে ইহান অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলো, মিথিলার কথায় চমকে উঠে বল্লো,তুই কি করে জানিস যে আমি এই কথা ভাবছি

মিথিলা- আমি বুঝতে পারি
এমন সময়,অরনি,সাম্মি রাহি, ওরা এসে যায় সবার পরনে শাড়ি অপরুপ লাগছে ওদের কে

মিথিলা-তোদের তিনজন কে ই অনেক সুন্দর লাগছে,,খোলা চুল, চোখে মোটা করে কাজল,সত্যি ই ধারুন

অরনি- হুম সুন্দর তো দেখাতেই হবে তাই না,এই সাম্মি তুই যা নির্ঝর কে খুজে নিয়ে আয়,একটু পরেই অনুষ্ঠান শুরু হবে
সাম্মি বেরিয়ে গেলো

রাহি- চল মিথিলা প্যান্ডেলে গিয়ে বসি
মিথিলা- হুম চল

অরনি এক মিনিট দাড়া
এই ইহান মিথিলা তো আমাদের অনেক প্রশংসা করলো, কিন্তু তুই তো কিছুই বললি না,বলতো কেমন লাগছে আমাকে

ইহান – ভালো

অরনি- শুধু ভালো?

ইহান – তুই যেমন তোকে তেমনি লাগছে, আর কি বলবো,চল চল বেরয়ে পড়ি

অরনি মন খারাপ করে হাটতে শুরু করলো,
মিথিলা আর ইহান ওদের পিছনে

ইহান ফিসফিস করে বল্লো
– মিথিলা একটা কথা বলবো

মিথিলা- আবার কি

ইহান-শুসসস,আস্তে বল,ওরা শুনবে তো,,

মিথিলা-তো

ইহান- আমার কথা টা শুন, তোকে না খুব সুন্দর লাগছে জানিনা তোকে শাড়িতে কেমন লাগতো,কিন্তু ন্যাচারাল ভাবে তুই অনেক সুন্দর

মিথিলা- বেশি বেশি বলছিস চুপ থাক
মিথিলা ইহান কে পিছনে পেলে আগে আগে হাটতে শুরু করলো

সবাই গিয়ে প্যান্ডেলে বসলো, এস এস সি পরিক্ষার্তিরা সামনের সারিতে,বাকিরা সবাই পিছনে যে যার আসনে বসলো

প্রথমে বক্তিতা নিয়ে গেলো ইহান, ইহানের বক্তিতা শেষে ,,

সাম্মি এনাউন্স করলো
– এখন আপনাদের সামনে কবিতা নিয়ে আসছে আপনাদের সবার প্রিয়ো বইপোকা মিথিলা,,মিথিলাকে স্টেজে আসতে অনুরোধ করছি

নির্ঝরিণী – আপি তুই কবিতা বলবি আর ভালো কিছু পাসনি নাকি

মিথিলা- চুপ থাক

অরনি- থাক নির্ঝরী কিছু বলো না,অনেক কষ্ট
করে কবিতার জন্য রাজি করিয়েছে ইহান

নির্ঝরিণী – কি বলছো আপু,মিথিলা আপু ইহান ভাইয়ার কথায় রাজি হয়েছে,আই কান্ট ভিলিব ইট

অরনি- হুম,সেটাই,,আমরা ও প্রথমে একটু অবাক হয়েছি

রাহি- এই চুপ করতো তোরা মিথিলার কবিতা আবৃতি অনেক সুন্দর হয় শুনতে দে,সবাই চুপ হয়ে গেলো

মিথিলা বলতে শুরু করলো
প্রথমে শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের সালাম জানাই,তার পর উপস্থিত ভাই বোনদের জানাই স্নেহ ও ভালোবাসা,,
আমার কবিতার নাম
‘ ভালোবাসা’
ভালোবাসি তোমায়
ওগো তুমি কেনো বুঝো না
মধুচন্দ্রিমাতে তোমায় নিয়ে,
জোনাক পোকার আলো দেখতে চাই
ভালোবাসি তোমায় কেনো বুঝো না
মনের মাধুরিতে তোমারি ছবি
তুমি তো দেখতে পাওনা
ভালোবাসি কেনো বুঝো না
চোখের ভাষা কি তুমি বুঝো না
মনের না বলা কাকুতি
তুমি শুনতে পাওনা
কান পেতে দেখো এই মন
বলছে ভালোবাসি তোমায় হৃদয়ে হৃদয়”

মিথিলার কবিতা আবৃতি শেষ হতেই, করতালিতে চারিদিকে মুখর হয়ে উঠলো

ইহান তনয় হয়ে মিথিলার কবিতা আবৃতি শুনছিলো,করতালি দিতে ভুলে গেছে সে,মনে হচ্ছে কবিতার প্রত্যেক লাইন আমাকে নিয়ে লিখা, সত্যি মিথিলা তুই সাধারনের মধ্যে অসাধারণ,

অরনি কনুই দিয়ে ইহান কে ধাক্কা দিয়ে বল্লো,কিরে কোথায় হারালি

ইহান সম্বিত ফিরে পেয়ে বল্লো
– না ভাবছিলাম,,মিথিলা সাধারনের মধ্যে অসাধারণ

অরনি- তুই শুধু মিথিলার মাঝে মুগ্ধতা খুঁজে পাস,আর কাউকে দেখিস না, নাকি মিথিলার মতো তুই ও কানা

ইহান হেসে বল্লো- তুই ও না অরু,মিথিলা বুঝি কানা,,আর তুই ভালো করেই জানিস সে ছোট্ট থেকে মিথিলার প্রতি আমার দূর্বলতা আছে,, যদি আর কাউকে দেখার হতো অনেক আগেই দেখতাম

ইহানের কথা শেষ না হতেই মিথিলা ফিরে এলো
মিথিলা- কিরে তোরা কি নিয়ে আলাপ করছিলি

অরনি- না এমনি

মিথিলা- কবিতা টা একদম ভালো হয়নিরে, তোদের মনের মতো হয়নি নিশ্চয়ই

ইহান- থাক যে সব সময় ভালো করে তার মুখে এমন কথাই শুনা যায়

অরনি- এই তো সার্টিফিকেট পেয়ে গেছিস আর কি

এহান উঠে গেলো ওদের মাঝে থেকে

ইহান- হ্যালো ভাই ও বোনেরা এখন আপনাদের মাঝে নাচ নিয়ে আসছে অরনি চৌধুরি
অরনি চলে গেলো
নাচ শুরু হলো, সবাই নাচ মনোযোগ দিয়ে উপভোগ করলো, এ ভাবে একে একে সবাই অংশ নিলো

ইহান এবার বিদায় নিতে এনান্স করতে এলো
ইহান- দেখতে দেখতে আমরা অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায় চলে এসেছি, কিন্তু আমার আরেকটি কথা থেকে যায়,, শুধু যে আমার তা নয় আমাদের এখানে প্রায় অর্ধেক ভাই বোনদের কথা এটা, আমি সবার পক্ষ থেকে বলছি
মিথিলা প্লিজ তুমি সবার জন্য একটি গান ধরো

কথাটা শুনেই মিথিলা লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে গেলো,রাগের গজ গজ করতে করতে বল্লো
– মানে কি এই সবের আমি গান গাইবো? নো য়ে,আমি গান একেবারেই পারি না,

অরনি- মিথিলা কথা টা শুধু আমাদের নয় স্কুলের অন্য ভাই বোনদের ও, তুই সবাইকে এ ভাবে চুপ করাতে পারবি না

মিথিলা- দেখ অরু আমি গান পারি না কোখনো গাইনি,তা ছাড়া আগে বললে প্রস্তুতি নিয়ে আসতাম,এখন?

রাহি- আগে বললে তুই কিছুতেই রাজি হতি না

ইহান আবার মিথিলার নাম এনাউন্স করলো
– আফরিনা মিথিলাকে স্টেজে আসার জন্য অনুরোধ করছি,প্লিজ কাম মিথিলা

সাম্মি- দেখ সবাই চায় তুই একটা গান করবি এভাবে সবার আনন্দ মাটি করতে পারিস না

অরনি- দেখ আজকে আমাদের স্কুল জীবনের এই শেষ অনুষ্ঠান, এই অনুষ্ঠানে তুই যদি বেসুরে গান করিস,সেটা ও আমাদের জন্য স্মৃতি হয়ে থাকবে প্লিজ

নির্ঝরিণী – আপি কিছু মনে করো না,এ ভাবে সবার কথা উপেক্ষা করা তোমার ঠিক হবে না, একটা গান ই তো বেশি কিছুতো নয়

মিথিলা- ওকে ফাইন যাচ্ছি

ইহান- এখন আপনাদের মাঝে গান নিয়ে আসছে আফরিনা মিথিলা

মিথিলা মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বল্লো
– হ্যালো বন্ধুরা আমি সত্যি কোন দিন গান করিনি তবু ও তোমরা শুনতে চাইছো,আমি অবশ্যই গাইবো,কিন্তু খারাপ হলে কেউ হাসবে না ওকে

মিথিলা একটুক্ষণ চুপ করলো
কি গাইবো বুঝতেই পারছি না, তার পর চোখ বন্ধ করে কিছু একটা মনে করে, চোখ বন্ধ রেখে গেয়ে উঠলো

“কথা হবে ফোনে ফোনে, হ্যাংগ আউট টা ফুডজোনে
সময়ের খেয়াল টা আর রবে না
সব নতুন বন্ধু হবে স্মৃতি সব পড়ে রবে মনে করতে কেউ তো আর চাইবে না
সব কিছু হবে রংগিন সামলানোটা বেশ কঠিন,কেউ তো আর পিছনে ফিরে চাইবে না
হুট করে কলেজ এসে লুট করে নিয়ে গেলো বেস্ট ফ্রেন্ড নাম সেই যন্ত্রনা
পুরোনো সেই স্মৃতি গুলো আর ফিরে পাবো না,পুরোনো লাস্ট ব্যাঞ্চ টা তেও আর বসা হবে না

আধুনিকা মেয়ে হবো সারাদিন ক্রাশ খাবো,পুরোনো গুলোর খোজ নিবো না
বয়ফ্রেন্ডের নাম্বার পেয়ে শুধু শুধু কল দিয়ে বিরক্ত করতে ভুল হবে না
যা ছিলো সবই ফাকি দিন শেষে এসে দেখি পড়া শুনা কিছু আর হলো না
দূর কিছু হলো নাকি জীবন আরও দেখা বাকি আগামি কাল পড়তে ভুল হবে না
এ জীবনে আগামিকাল কখনোই এলো না

যেই গেম খেলতে আসি আম্মু এলে পড়তে বসি,হোমওয়ার্ক টা আজ ও করা হলো না
যখন আমি স্কুলে ছিলাম ছেলেটিকে দেখেছিলাম
ভালোবাসি বলা আর হলো না
সেদিন ও দেখেছি তাকে অন্যকে কাছে ডাকে আমাকে সে যে আর চিনে না,,
তবু তাকে ভালোবাসি ডাকলে সে যে চলে আসি কিন্তু সে ডাকা আর হলো না
স্কুলের সে দিন গুলো ফিরে তো পাবো না
পুরোনো সে স্মৃতি গুলো আর দেখা হবে না”

মিথিলার গান গাওয়া শেষ কিন্তু চারি দিকে নিরাবতা,কারো মুখে কোন কথা নেই মনে হয় কেউ এ জগতে নেই,ইহান স্টাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দৃষ্টি মিথিলার দিকে,

ঠিক সে সময় শিক্ষক সারির মধ্যে থেকে একজন শিক্ষক উঠে এলো মিথিলার কাছে,,
মিথিলা পুরো সময় চোখ বন্ধ করেই ছিলো,গান শেষ হতেই চোখ খুল্লো কিন্তু সবার এমন নিরাবতা দেখে ও ভড়কে গেছে হয়তো গান ভালো হয়নি তাই সবাই এমন বসে আছে,
রহিম স্যার কে উঠে আসতে দেখে মিথিলা আর ও ভয় পেয়ে গেছে পুরো স্কুল জীবনে রহিম স্যারকে ভয় করে আসছে মিথিলা কি যে রাশ ভারি স্যারের কি বলবো,

রহিম স্যার মিথিলার কাছে এসে বল্লো
– মা আজ এই স্কুল থেকে তোদের বিদায় বেলা,তবে আজকের এই মুহুর্তটা সব সময় মনে থাকবে,,

স্যারের এমন মিষ্টি কথা শুনে মিথিলার গলা শুকিয়ে গেলো,স্যার এই সব কি বলছে এই প্রথম স্যারকে স্বাভাবিক ভাবে কথা বলতে দেখলাম

রহিম স্যারর- এই ইহান মাইক্রো ফোনটা দিয়ে যাও

স্যাররের ডাকে ইহানে তনয়তা ভাংলো,ইহান মাইক্রোফোন স্যার কে দিলো

রহিম স্যার-দর্শক সারিতে বসে থাকা ছাত্র ছাত্রী দের বলছি,তোমরা এতো নিরব কেনো,,আমাদে প্রিয়ো ছাত্রী, এন্ড তোমাদের প্রিয়ো বোন, সবার প্রিয়ো আফরিনা মিথিলা এতো সুন্দর একটা গান গেয়ে আজকের দিন টা কে স্বরনিয় করেছে,তার জন্য একটা হাত তালি তো চাই,কি হলো সবাই ঝোরে হাত তালি দাও

করতালিতে চারিদিকে মুখর হয়ে উঠলো,মিথিলা গিয়ে তার সিটে বসলো

নির্ঝরিণী -আপু দেখলে তো আমার গান একটু ধৈর্য্য ধরে শুনাতে আজ তোমার কতো লাভ হয়েছে

মিথিলা- হুম সেটাই,কোন গান মনে আসছিলো না,তার পর তোর কাছে থেকে শুনা এই গান টা মনে এসে গেলো

অরণি – হুম এই গান টা আমি ও আগে শুনেছি, কিন্তু তোর মতো করে এতো ভেবে গানের লাইন চেঞ্জ করার কথা মাথায় আসেনি

রাহি- হা মিথিলা খুব ভালো চেঞ্জ এনেছিস তুই গান টা তে,,

সাম্মি- তোর গান টা সবার মনে গেঁথে গেছে

মিথিলা- গান টা আমার নয়,তবে আমি যেহেতু গান টা নির্ঝরিণীর কাছে শুনেছি সেহেতু বলতে পারছি না গানটার লেখক এন্ড কণ্ঠশিল্পী কে,

ওদের কথার মাঝে যোগ দিলো ইহান
– আমি তো বাংলা গান শুনি না কিন্তু বাংলা গান যে এতো টা হৃদয় ছুঁয়ে যায় তা এই কিছুক্ষন আগে বুঝলাম

মিথিলা- ওকে এবার তা হলে বাড়ি যেতে হয়,

ইহান- আর একটু দাড়া একটা গ্রুপ ছবি তুলবো

নির্ঝরিণী – ছবি টা আমি শুট করবো,আমি
কিন্তু আপনাদের মাঝের নই
ইহান- ওকে

to be continue
ভুল ক্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন