তিনি এবং ও ! ৩৫ . (শেষ পর্ব)

0
239

তিনি এবং ও !

৩৫ .
(শেষ পর্ব)

বিছানার উপর ফেলে রাখা মোবাইল থেকে সুফি সাহেবের কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে । রেকর্ড করে রাখা প্রত্যেকটি কথা তার ভিতরে নতুন ভাবে আগুনের সৃষ্টি করছে।
২ বছর যাবত সে যে পাপের জন্য নিজেকে দোষী ভেবেছে ,দিনের পর দিন সে শুধু নিজেকে সব হাসি আনন্দ থেকে নিজেকে দূরে রেখেছে ; সে পাপ সে করেই নি।রেকর্ড গুলো সে বারবার শুনছে কোথাও যদি একটু মিথ্যে সে খুঁজে পায় ,তাহলে নিজের সাথে করা অন্যায়কে সে ক্ষমা করতে পারতো ।
না কোনো মিথ্যে সে খুঁজে পাচ্ছেনা।
অদ্রি চায়ের ট্রে নিয়ে যখন রুমে আসলো তখন নিদ্রকে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছিল। কারণ টা অদ্রি কিছুটা অনুমান করতে পারছিলো কিন্তু কীভাবে কী শুরু করবে অথবা প্রশ্ন করবে ভেবে পাচ্ছিলো না।
নিদ্র তার শব্দ গুলোকে একত্রিত করতে পারছিলো না।
একজন মেয়ে ৩ বছর ধরে জানে তার স্বামী একজন ফেরেস্তা সমতুল্য মানুষ। নিদ্র জানেনা অদ্রি আসলে জানে কি জানেনা। তারপরও এরকম তিতা সত্যি সরাসরি কাউকে বলে দেয়াটা সহজ না। মিথ্যে বলাটাই সহজ। সত্যি বলাটাই কঠিন।
কীভাবে কী বলবে ভাবতে ভাবতেই অদ্রি চায়ের ট্রে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলো। ২২ বছরের যুবতীর মাঝে সে অন্য এক নতুন সত্ত্বা দেখতে পাচ্ছে। এতদিন যার অস্তিত্ব অদ্রির মধ্যে ছিলোনা! হয়তোবা ছিলো সুপ্ত অবস্থায়। বসন্তের হাওয়ায় সে তার সুপ্ত অবস্থার খোলস ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে।
বসন্ত টা কি সে? এই প্রশ্নের উত্তর তার জানা নেই। জানে অদ্রি, জানে তার নতুন সত্ত্বা। চায়ের মগে চুমুক দিয়ে নিদ্র বলল
– আপনি কোথাও বেড়াতে যান না?
– নাহ।
অদ্রি চায়ে চুমুক দিয়ে জানালার ধার ঘেঁষে দাঁড়াল। নিদ্র , অদ্রির বিপরীতে দাঁড়াল।
নিদ্র হাসিহাসি মুখে বলল
– চলুন দূরে কোথাও ঘুরে আসা যাক।
– আপনি কি পাগল হয়ে গেলেন নাকি?
– কেনো? আপনার কি বাসার বাহিরে যাওয়া নিষেধ?
– বিধবা আমি। অনেক বড় পাপী আমি।পাপ আর এ জন্মে পিছু ছাড়বেনা।
নিদ্রের হঠাৎ করেই মেজাজ বিগড়ে গেলো। পাপী কী কারণে? ওরকম নরপিশাচ এর জন্য ?
নিদ্র বলল
– সুফি সাহেবের বাগান আসলেই সুন্দর।
অদ্রি কেমন যেন মুশরে গেলো। তারপরও সে ক্ষীণ স্বরে বলল
– হ্যা, তার পরম ভালবাসা।
– সুফি সাহেব বিয়ে করেছেন, ছোট্ট একটা ছেলেও আছে।আচ্ছা অদ্রি আপনার বাচ্চাকাচ্চা ভালো লাগেনা? ১ বছরের দম্পতি জীবনে একটা ছোট্ট প্রাণের ছোঁয়া পেতে ইচ্ছে করেনি?
অদ্রি গলা জড়ায় আসছে এই প্রশ্নের উত্তর সে কখনও দিতে পারবেনা। এর আগে নিদ্রকে পরোক্ষভাবে বলেছে কিন্তু ……
নিদ্র অদ্রির মুখের উপর তাকিয়ে বলতে শুরু করলো
– সে আপনাকে কখ‌নো ভালবাসেনি আর আপনাকে বিয়ে করেছিলেন সমাজের প্রশ্নোত্তর দেয়ার জন্য। হয়তোবা শেষ বয়সের ভরসার কারণে।
আপনাকে আমি বলে বুঝাতে পারবোনা। আমি রেকর্ড করে এনেছি।
প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইল বের করে রেকর্ড অন করে দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেলো।
এতদিন একটা বিশ্বাস নিয়ে সে ছিলো আর কিছু সময়ের ব্যবধানে সেটাও ভেঙে গেলো।
বেঁচে থাকতে হলে মানুষকে কাউকে না কাউকে বিশ্বাস করতেই হয়।
স্বামীর প্রতি যে শ্রদ্ধাবোধ ছিলো এখন সেটা আর নেই। কর্পূর এর মতো উড়ে গেছে। প্রতিনিয়ত সে ঠকে এসেছে !
লিলিকে দিয়ে মোবাইল নিদ্রের কাছে পাঠিয়ে দিয়ে সে দরজা ভালো করে লাগিয়ে দিলো।
একা থাকার খুব প্রয়োজন তার।
রাতে নিদ্র আর লিলি খাবার খেলো। অদ্রিকে শত চেষ্টা করেও খাবার টেবিল পর্যন্ত আনতে পারলোনা।
অদ্রি সারারাত ধরে শুধু চিন্তাভাবনা করেই কাটালো। আফসোস করা ছাড়া উপায় নেই। সেদিন সুফি সাহেবকে যদি সে কথা বলতে দিতো তাহ‌লে এরকম বিশ্রী জীবন তাকে যাপন করতে হতোনা।
মা বাবা তাকে কতোটা ভুল বুঝেছে, কতোটা খারাপ ভেবে এসেছে।
তার স্বামী অন্য নারীর প্রতি আকৃষ্ট ছিলো। ড্রাগ এডিক্টেড, নিষিদ্ধ পল্লী …….
আর তার জন্য সে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে, বাসার বাহিরে কখনো পা রাখেনি।
সে বেঁচে থাকতেও শান্তি দেয়নি এবং মরার পরও চায়নি আমি শান্তিতে থাকি।
লিলি সকাল ৯ টায় ঘুম থেকে উঠে চায়ের পানি চুলায় দিয়ে নিদ্রের ঘরের দিকে গেলো।
সকালে কী নাস্তা করবে না জানলে সে বানাবে কীভাবে? অদ্রিকে তো এখন কোনোভাবেই ডেকে পাওয়া যাবেনা।
নিদ্রের ঘরের সামনে এসে লিলি অবাক হয়ে গেলো। দরজা হা করে খোলা, ব্যাগপত্র কিছুই নেই। সে ঘরের মধ্যে ঢুকে বিছানার উপর পরে থাকা চিরকুট খুঁজে পেলো।
কয়েকটা লাইন লেখা আর নিচে বামপাশে ছোট্ট করে নিদ্র লেখা।

সেই ভোরবেলা সে বের হয়েছে কিন্তু এখনো ঢাকা বিমানবন্দরে পৌঁছাতে পারলো না।
রশিদ সাহেবকে না জানিয়ে আসাটা ঠিক হয়নি।
১১ টায় প্লেন আকাশে উড়াল দিবে আর এখন ১০ টা বাজে। ট্রাফিক জ্যামের কারণে তার এই অবস্থা।
বাংলাদেশের প্রথমদিনেও তাকে জ্যামে পরতে হয়েছিল।
নাজমুল সাহেব বেশ অবাক হচ্ছেন তার ছেলে এতো তাড়াতাড়ি ফিরে আসছে কেনো?
এদিকে রশিদ সাহেবের মোবাইল সুইচ অফ বলছে।
নিদ্রকে বিভিন্ন ভাবে আসার কারণ টা জানতে চেয়েছে। কিন্তু নিদ্র তার প্রত্যেকটি উত্তরে একই কথা বলেছে
– সে তার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায়।

লিলি চায়ের পানি ফেলে দিলো। ফ্রীজে রাখা বাসি খাবার গরম করে খেয়ে নিলো। চিঠিটা সে যত্ন করেই রেখে দিয়েছে। আপামনি যখন বের হবেন তখন তাকে দিয়ে দিবে।

৪ মাস পর …….

নিদ্রের দাদী চিঠি হাতে বসে আছেন বিছানার উপর।তার পাশে নিদ্র গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
চিঠিটা নিদ্রের নামে এসেছে বাংলাদেশ থেকে। তাও একজন মেয়ের চিঠি। নামটাও নিদ্রের সাথে মিলে যায়। কিন্তুটা মেয়েটা সম্পর্কে না জেনে তার অস্থিরতা কমছেনা।
অনেক ডাকাডাকির পর নিদ্র ঘুম থেকে উঠে বসলো। কিছু বলার আগেই চিঠিটা তার হাতে দিয়ে বলল
– মেয়েটা কে রে? এরকম নিমন্ত্রণ করেছে তোকে।
চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করলো। মাত্র দুটো লাইন লিখা।
” বাসায় নতুন বাবুর্চি রেখেছি, চা টা দারুণ বানায় সে। একদিন আসবেন, চায়ের দাওয়াত রইলো। ”
ইতি
অদ্রি।
বিঃ দ্রঃ বর্ষাকাল চলে এসেছে তার কালো মেঘের ভেলা নিয়ে।

নিদ্র মুচকি হেসে চিঠিটা ভাজ করে বালিশের নিচে রেখে দিলো।
তার লিখা ছোট্ট চিরকুট লিখে রেখে এসেছিল। কয়টা লাইন তার জানা নেই কিন্তু শব্দগুলো তার স্পষ্টভাবে মনে আছে।

অদ্রি,
বৃষ্টির সেই রাতে আপনার স্পর্শ আমার ঠান্ডায় জমে যাওয়া মন টাকে উষ্ণ ভাবে ছুঁয়ে দিয়েছিল। মন বারংবার সেই উষ্ণ ছোঁয়ায় মেতে থাকতে চায়। প্রিয় সেই ……

নিদ্র, ভালো থাকবেন।

সমাপ্তি 😌🙃🤓

© Maria Kabir