মন ফড়িং ♥ ৮

0
335
মন ফড়িং ♥ ৮
মন ফড়িং ♥ ৮
মন ফড়িং ♥
৮.
অদ্রি রীতাকে উদ্দেশ্য করে বলল
– খালা, রশীদ চাচা দুপুরে খাননি। আপনি তার খাবার ব্যবস্থা করুন। পারলে আবার রান্না করুন।
রীতা বললেন
– কিন্তু তিনি তো বললেন খেয়ে এসেছেন!
– মিথ্যা বলেছেন। আর দেখুন তো উনি চলে গেছেন কিনা? জরুরি কথা ছিলো।
– খাবার টা শেষ হোক।
– উনি চলে যাবেন ততক্ষণে।
রীতা বাধ্য হয়ে খাবারের প্লেট রেখে রশীদ সাহেবের খোঁজে বের হলেন।
দোতলার সিড়ি অবদি এসে দেখলেন রশীদ সাহেব সোফায় পা দুলিয়ে বসে খবরের কাগজ পড়ছেন।
ফিরে এসে অদ্রিকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখে কিছুটা বিরক্ত হলেন। মেয়েটা এমন কেনো? খাবেনা, ঘুমাবেনা ঠিক মতো আর অসুস্থ হবেন।
প্লেটে এখনো খাবার পরে আছে। ম্যাডামের সমস্যাটা কী তার জানা হলো না। হবেও কিনা সেটাও তার জানা নেই।
রান্নাঘরে যাওয়ার সময় রশীদ সাহেবকে রীতা বলে গেলেন
– ম্যাডাম আপনাকে দুপুরে খেয়ে যেতে বলেছেন। তিনি আপনার সাথে জরুরি কিছু কথা বলবেন।
রশীদ সাহেব খবরের কাগজ টিটেবিলে রেখে বললেন
– দোতলায় গিয়ে কথা বলে আসবো?
রীতা বললেন
– না, তিনি ঘুমাচ্ছেন।
– আপনার সমস্যা না হলে একটা কথা বলি। আপনি কোনো একটা ঘরে গিয়ে শুয়ে থাকুন। রান্না হলে ডাক দিবো।
রশীদ সাহেব খবরের কাগজ নিয়ে নিচতলার  ডানের শেষের ঘরটায় গিয়ে শুয়ে পড়লেন।
অদ্রি মেয়েটা সত্যি তাকে খুব ভালো জানে। তা না হলে সে যে না খেয়ে আছেন সেটা বুঝতে পারতেন না।
নিদ্র বেশ মনোযোগ দিয়েই ফুলটায় লাল রঙের আঁচড় দিচ্ছিলো। পেছন থেকে মিস্টার ব্রন্ড বললেন
– নিড্রো, সুন্দর হওয়া চাই। আমার স্ত্রীকে খুশি করতে হবে।
নিদ্র বেশ গম্ভীর স্বরে বলল
– চেষ্টা করছি।
নিদ্রের কেনো যেন এসব কাজ করতেই ভালো লাগে। তার এই কাজের মাধ্যমে একজন দম্পতি তাদের নবজীবন শুরু করবে। বাচ্চাকাচ্চা হবে হয়তোবা না। হয়তোবা দেখা যাবে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে গেলো। এই দুজন একে অপরকে কতোটা ভালোবাসে এখন ! দেখা গেলো ভবিষ্যতে কোনো একটা কারণে তাদের মাঝে সম্পর্কে কিট জন্ম নিতে শুরু করবে। তারপর সেই কিট পুরো সম্পর্ক টাকে ধ্বংস করে দিবে। তারা একে অপরকে ছেড়ে দিয়ে নিজেদের মতো চলতে শুরু করবে। এক পর্যায়ে তারা নতুন কারো সাথে পুরাতন নিয়মে প্রেম শুরু করবে। প্রেম গভীর থেকে গভীর হলে তারা বিয়ে করবে।
এই নিয়মের পুনরাবৃত্তি হবে কি? নাকি হবে না? নিদ্রের ভেতর একটা ছোট্ট যুদ্ধ চলছে। যদি এরকম সম্পর্ক গুলো এতো সহজে ভেঙে যায় তবে তার সম্পর্ক কেনো ভাঙছে না? তাদের মধ্যে তো কোনো সম্পর্কই তৈরি হয়নি কখনও তাহলে ভাঙবে কীভাবে? কিন্তু অদ্রির প্রতি তার টান কাটছে না কেনো? নাকি এটা শুধু মোহ না, অন্যকিছু।
এই মেয়েটা আমাকে শান্তি দিলো না। নিদ্র নিজের উপরই বিরক্ত লাগছে।
সন্ধ্যার দিকে এক পৃথিবী সমান খুদা নিয়ে বাসায় ঢুকলো নিদ্র। পেটের মধ্যে ইঁদুর দৌড়ে চলছে। দাদী কি তার জন্য খাবার নিয়ে বসে আছেন? নাও হতে পারে। বয়স হয়েছে তার। দেশের বাড়ি যাওয়ার জন্য তার নিজের মন উতলা হয়ে আছে। টাকা না জমিয়ে তো যাওয়াটাও ঠিক হবেনা। ওখানে কে তাকে টাকা ধার দিবে? বাবা তো একদমই পছন্দ করছেন না বাংলাদেশে যাওয়ার বিষয়টা।
রান্নাঘরে ঢুকে পাউরুটি আর ডিম ভেজে কোনোমতে খেয়ে পেট ঠান্ডা করে দাদীর রুমের দিকে গেলো।
দাদী ঘুমে তলিয়ে আছেন। এখন ডাক দেয়া ঠিক হবেনা।
নিজের রুমে গিয়ে ফ্রেশ হবার জন্য বাথরুমে গিয়ে ঝর্ণা ছেড়ে তার নিচে দাঁড়িয়ে রইলো নিদ্র।
দিনটা মনে নেই, খুব বৃষ্টি হচ্ছিলো। ছাদে ভিজতে ইচ্ছে করছিলো। নিজেকে আটকে রাখতে না পেরে ছাদে গিয়ে বৃষ্টির ভিজতে শুরু করেছিলো। বেশ ঠান্ডা ছিলো ওইদিন রাতে।
অদ্রিও এসে দাঁড়ালেন ওই সময় বৃষ্টির মধ্যে। আবছায়া আলোতে অদ্রির ভেজা শরীর তার আজ অবদি ধরে রাখা নিয়ন্ত্রণ কে ভেঙে দিয়ে তাকে উন্মুক্ত পাগল বানিয়ে দিয়েছিলো! অদ্রিকে জড়িয়ে ধরে যেন কিছুটা শান্তি পেয়েছিলো সে! তার শরীরের মধ্যে বারবার কেঁপে ওঠা শরীর টার হৃদস্পন্দন তার ভেতরটাকে পুড়িয়ে দিচ্ছিলো। ইচ্ছে করছিলো ভেজা শরীরের সুখ টা নিজের করে নিতে! কিন্তু তা আর হয়নি!
এতো সহজে কোনো কিছু পাওয়াতে হয়তোবা সুখ নেই। একটু ধীরে ধীরে পাওয়ার মাঝে পৃথিবী সমান সুখ লুকিয়ে থাকে।
ওই ভেজা শরীরের গন্ধ একদিন সে নিবে তবে সেদিন কোনো ভয়, লজ্জা, সংকোচ থাকবেনা।
অদ্রিও কি এভাবে তার মতো করে ভাবে আমাকে? নিদ্র নিজেকেই প্রশ্নটা করলো! না, মেয়েরা কোনো ছেলেকে এভাবে ভাবেনা। তাদের ভাবনা অন্যদিকে প্রবাহিত হয়।
ওদের ভাবনায় পবিত্রতা থাকে। আমি।যাবো তার কাছে যাবো। যেভাবেই হোক অদ্রিকে আমার পাওয়া চাই! সত্যি তাকে ভালোবাসি তা না হলে এতো দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও তার প্রতি টান কাটছেই না বরং আরো বাড়ছে! হ্যাঁ তাকেই আমি ভালোবাসি!
নিদ্র যেন পণ করছে নিজের কাছেই।গোসল সেরে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো! অনেকটা শান্তির ঘুম।
অদ্রির ঘুম ভাঙলো তখন বিকাল বেলা। রশীদ সাহেব দুপুরে খেয়ে দেয়ে নিচের বসার ঘরে সোফায় বসে খবরের কাগজ পড়ছেন। যদিও এটা একবার পড়েছেন। কিন্তু কী আর করার। কিছু তো করার দরকার। অদ্রি তার সাথে জরুরি কী কথা যেন বলবে কিন্তু ও এখনো ঘুমাচ্ছে।
অদ্রি বিছানা ছেড়ে উঠে একটা চিঠি লিখতে বসলো। মাত্র ৫ মিনিটে চিঠিটা লিখা শেষ করে নিজেই নিচে নেমে আসলো। আগে থেকেই ভেবে রেখেছিলো কী লিখবে!
অদ্রিকে দেখে রীতা বললেন
– আপনি অসুস্থ, আমাকে ডেকে পাঠালেই তো পারতেন।
অদ্রি মুচকি হাসার চেষ্টা করে বললো
– এখন একটু ভালো লাগছে।
রশীদ সাহেবের হাতে চিঠিটা হাতে দিয়ে বললো
– খামে নাম ঠিকানা লিখে দিয়েছি। আপনি শুধু স্ট্যাম্প লাগিয়ে চিঠিটা পাঠিয়ে দিবেন।
রশীদ সাহেব চিঠিটা হাতে নিয়ে ঠিকানা পড়ে বুঝতে পারলেন, চিঠিটা কার উদ্দেশ্যে লেখা।
রীতা, অদ্রির মুচকি হাসি দেখে বেশ অবাক হলেন। এই মেয়ের মুচকি হাসিতে যে কেউ প্রেমে পড়ে যাবে। আজ অবদি কেউ পড়েছে কি প্রেমে?
অদ্রি রশীদ সাহেবকে জিজ্ঞেস করলেন
– দুপুরে খেয়েছেন?
– জি মা। তুমি তো খাও নাই। খেয়ে নাও মা।
রীতা বললেন
– অদ্রি আপনি আপনার রুমে যান। আমি খাবার নিয়ে আসছি।
– একটু পরে খাই। এখন ভালো লাগছে না।
– না, আপনাকে এখনই খেতে হবে। এরকম অনিয়ম করতে করতে আপনার অবস্থা কী খারাপ হয়েছে বুঝতে পারছেন আপনি?
অদ্রি মাথা নিচু করে বললো
– আচ্ছা আপনি খাবার নিয়ে আসুন।
অদ্রি চলে যাচ্ছিলো পিছনে ফিরে রীতাকে বললেন
– লিলিকে দেখছিনা। ও কই?
রীতা বিরক্ত হয়ে বললেন
– তার খোঁজ পাওয়া যায় নাকি? সে তো নিজের মতোই স্বাধীন।
– ওকে পেলে বলবেন, আমি তাকে ডেকেছি।
বিছানার উপর বসে বসে ভাবছে অদ্রি, চিঠিটা দেয়া কি ঠিক হলো? তার আগের চিঠিরও উত্তর আজও পায়নি সে। বেহায়া হয়ে গেলো শেষ পর্যন্ত?
এবারই শেষ আর কোনো চেষ্টা সে করবেনা। একা একাই তো কতোটা বছর কাটিয়ে দিয়েছে সে! আর কয়টা দিনই সে বাঁচবে? শরীরের যে অবস্থা তাতে হায়েস্ট ১০ বছর বা তার কমও হতে পারে, তারপর শান্তির ঘুম। চোখ ভিজে উঠেছে অদ্রির। মানুষ কখনো তার সব স্বপ্ন পূরণ করতে পারেনা কিন্তু তার কোনো স্বপ্নই তো পূরণ হলোনা। একটা স্বপ্ন অন্ততপক্ষে যদি পূরণ হতো।
নিদ্রের চেহারাটাও সে,পুরোপুরি মনে করতে পারেনা। কেমন আবছা আবছা লাগে।
চলবে……!
© Maria Kabir