মন ফড়িং ♥ ৩.

0
234
মন ফড়িং ♥ ৩.
মন ফড়িং ♥ ৩.
মন ফড়িং ♥
৩.
সেই সকাল থেকে খালি পেটে থাকায় অদ্রির টক ঢেকুর তুলছে। পেটও কেমন কেমন ফোলা ফোলা মনে হচ্ছে। ঢেকুর কয়েক প্রকারের আছে। কিছু প্রকার ঢেকুর মানুষের খুব পছন্দ। আবার কিছু ঢেকুর মানুষকে বেশ বিরক্ত করে। মিষ্টি ঢেকুর, টক ঢেকুর, ঝাল ঢেকুর, রসুনের ঢেকুর, মুলার ঢেকুর, বিরিয়ানির ঢেকুর…. আর মনে পড়ছে না অদ্রির। মিষ্টি ঢেকুর মিষ্টি যারা পছন্দ করে তাদের ভালো লাগে। সবথেকে বাজে ঢেকুর মুলার ঢেকুর। বেশ বাজে, এই কারণে মুলা তার অপছন্দের তালিকার শীর্ষে। বিরিয়ানীর পাগলদের আবার বিরিয়ানির ঢেকুর খুব পছন্দ করে। নিদ্রের মনে হয় এই ঢেকুর খুব পছন্দ করে। খাওয়ার পরও বিরিয়ানীর রেশ টা রয়ে যায়। তবে ঢেকুর সম্পর্কিত তার এই মতামত সঠিক কিনা তা জানা নেই তার। নিদ্রকে বা রশীদ সাহেবকে জিজ্ঞেস করতে হবে। কাথা সেলাই করা বন্ধ করে অদ্রি বালিশে হেলান দিয়ে ভাবতে লাগলো। রীতাকে জিজ্ঞেস করলে কেমন হয়?
রীতা হচ্ছে গল্পদারী মানুষ। এই ধরণের মানুষ গল্প করতে খুব পছন্দ করে। একটু সুযোগ পেলে রাজ্যের গল্প নিয়ে বসবে। এদের গল্পের ভাণ্ডার কখনও শূন্য হয়না। রীতা বলাটা ঠিক না অদ্রি নিজেকে শুধরানোর সুরে বলল। সে বয়সে অনেক বড়, মায়ের সমতুল্য। তাই তাকে রীতা খালা বা খালাম্মা বলাটাই ঠিক।
চায়ের কাপ নিয়ে খুব সাবধানে দোতলায় উঠে আসলেন রীতা।
দরজায় টোকা দিতেই অদ্রি বলল
– খোলা আছে।
চায়ের কাপ অদ্রির হাতে দিয়ে রীতা লিলির উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো। কী রান্না করতে হবে না জেনে তার মতো করে রান্না করলে লিলি বেশ ঝামেলা করবে।
টক ঢেকুর এখনও বন্ধ হয়নি। এই অবস্থায় চা খেলে সমস্যা বাড়বে? নাকি চায়ের স্বাদ আর টক ঢেকুর এর স্বাদ মিক্সড হয়ে নতুন কোনো স্বাদের ঢেকুর উঠবে?
বেশ ভাববার বিষয়!
সবকিছু ভুলে এরকম উদ্ভট চিন্তা করতেও শান্তি পাওয়া যায়। অন্ততপক্ষে তাজা ঘায়ের ব্যথা গুলোকে তখন ভুলে থাকা যায়।
নাজমুল সাহেব ছেলের রুমের দরজার সামনে ১৫ মিনিট যাবত দাঁড়িয়ে আছেন। দরজা অল্প একটু খোলা, সেই খোলা জায়গা দিয়ে নিদ্রকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ১৫ মিনিট ধরে ছেলে মোবাইল হাতে নিয়ে স্থির হয়ে বসেই আছে। শুধু নিশ্বাস আর চোখের পলক পরছে তাছাড়া আর কোনো মুভমেন্ট নেই। ১৬ মিনিটের মাথায় নাজমুল সাহেব নিদ্রের রুমে ঢুলে পরলো। নক না করেই। নিদ্র প্রায়ই লাফিয়ে উঠলো। তাড়াহুড়ো করে মোবাইল বিছানার উপর করে রেখে দিয়ে বলল
– তুমি??
নাজমুল সাহেব ভাবগাম্ভীর্য ধরে রাখার উদ্দেশ্যে গলা ভারী করে বলল
– কেনো আমি তোমার রুমে আসতে পারিনা?
– না, বাবা পারো কিন্তু তুমি তো এই সময় মানে ইয়ে তুমি তো কখনও আসোনা। আর নক না করেই?
– নিজের ছেলের রুমেও কি নক করে আমাকে ঢুকতে হবে? আমি তোর রুমে যখন ইচ্ছা আসতে পারি এটা আমার অধিকার। আজকে থেকে আমি তোর রুমেই থাকবো। ওকে?
নিদ্র বলল
– থাকবা।
নাজমুল সাহেব চেয়ার টেনে হেলান দিয়ে বসে বলল
– মোবাইলে কী দেখছিলি?
নিদ্র ভাবেনি তাকে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে!
– আমি কিন্তু তোর রুমের বাইরে থেকে দাঁড়িয়ে সব দেখেছি। আমাকে খুলে বল।
– না বাবা তেমন কিছু না। ইউটিউবে ভিডিও দেখছিলাম।
– তোকে বিষন্ন দেখছি? কী হয়েছে বলবি?
বুঝেছি আমার মতো হয়েছো।
নিদ্র মুচকি হাসি ছাড়া এই কথা বিপরীতে কী বলা যায় তার জানা নেই।
নাজমুল সাহেব পায়ের উপর পা রেখে নাচাতে নাচাতে বলল
– ছেলেদের বিষন্নতা ভোলার সবথেকে ভালো উপায় সিগারেটে টান দেয়া। নিকোটিনের ধোয়ায় মনের ধোয়াশা কেটে যায়। বাপ হয়ে ছেলেকে সিগারেট খেতে বলছি বলে আমাকে খারাপ ভাবিস না। আসলে তুই তো খোলামেলা ভাবে বলবিনা। তাহলে নির্দিষ্ট করে সমাধান দিতাম। মন খুলে তুই বলবিও না কারণ আমার ফটোকপি তুই।
তোর মা আমাকে রেখে চলে গেলো তখনও আমি আমার মনের কষ্ট, বেদনা সব লুকিয়ে রেখেছিলাম। কাউকে বলিনি। সব মানুষ স্বার্থপর, মন দিয়ে কষ্টের কথা শুনবে। পরে কোনো কারণে ঝগড়া লাগলে পিছনের কথা বলে খোটা দিবেই।
এই দুনিয়াতে কেউই কারো না। দ্যাখ না আমি শেষ মেশ একা।
নিদ্র কিছু একটা বলতে যাবে তখন নাজমুল সাহেব থামিয়ে দিয়ে বলল
– তুই এখন বলবি তুই আছিস সাথে? না রে বাপ তুইও থাকবি না। বিয়ে করবি বউকে পাবি। তারপর পোলাপান হবে। এই বুড়ো বাপকে একসময় ভুলে যাবি।
শোন বাপ, মন খারাপের কারণ টাকে ধ্বংস করে দে। দেখবি ভালো থাকতে পারবি।
তোর মাকে ছাড়া দ্যাখ আমি কিন্তু ভালোই আছি। তোর দাদী আসমা খাতুন বা বেগম তার স্বামীকে মানে আমার বাপকে ছাড়া থাকতেই পারতো না। দুই স্বামী স্ত্রীর মধ্যে এতো মিল মহব্বত ভাবত্রি অবাক লাগতো। বাবা হঠাৎ করে স্ট্রোক করে মারা গেলেন। মা কিন্তু এখন ভালোই আছেন। মানুষ আসলে ভাবে যে সে ভালো থাকতে পারবেনা। সময় কাটবে কীভাবে? কিন্তু বাস্তবতা হলো শেষ মেশ ভালো থাকতে পারে। শুধু ভালো না বেশ ভালো।
কী বলতে চাচ্ছি তুমি বুঝতে পেরেছো? My dear son?
নিদ্র বলল
– ভাবতে হবে।
নাজমুল সাহেব চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে বলল
– ওকে ভাবতে থাকো। উত্তর টা দিও। আর আপনার দাদীকে একটু বুঝাবেন যে, এই বয়সে এরকম ছেলেমি যেন বাদ দেয়।
আর ভালো লাগেনা।
নাজমুল সাহেব খুব দ্রুত তার রুমের দিকে পা বাড়ালো। অনেকক্ষণ যাবত তার বিছানায় শুয়ে মান্নাদের গান শোনা হয়নি।
একটু শান্তি না খুঁজে উপায় নেই, বাঁচতে হবে তাকে অনেকদিন, অনেক অনেক দিন।
এই পৃথিবীতে কেইবা মরতে চায়।
চলবে…….!
© Maria Kabir