প্রত্যাখান_পর্ব(০৯)

প্রত্যাখান_পর্ব(০৯)
প্রত্যাখান_পর্ব(০৯)

প্রত্যাখান_পর্ব(০৯)

লেখা- অনামিকা ইসলাম ‘অন্তরা

পরদিন মলিন মুখে বাবা আমার রুমে আমার পাশে এসে দাঁড়ায়। বিছানা থেকে ওঠে বসলাম আমি। উৎকন্ঠার সহিত প্রশ্ন করলাম, বাবা কিছু বলবে? পাশে বসে বাবা। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত স্বরে বলেন, তোর মা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে নরসিংদী। তৈরি হো। আমাদের এখনই একবার নরসিংদী যেতে হবে। বাবার কথা শুনে আমার অন্তরাত্মা শুকিয়ে এতটুকু হয়ে যায়। ওলট-পালট হয়ে যায় সবকিছু। ল্যাপটপে কাজ করছিলাম। সেটা রেখে দ্রুত ওঠে দাঁড়াই। বাবা তুমি কি বলছো এসব? মা অসুস্থ? আমি তো একটু আগেও মায়ের সাথে কথা বলেছি। তখন তো…. ‘শুভ্র! কথা না বাড়িয়ে দ্রুত তৈরি হয়ে নে। আমি আসছি।’ আমাকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বাবা রুম থেকে বের হয়ে যায়।

ফ্রেশ হয়ে দ্রুত ছুটলাম আলমারির দিকে। হাতের নাগালে পেলাম একটা পাঞ্জাবি। পরে নিলাম সেটাই। বাবা আমায় দেখে বিষম খায়। টিপ্পনী কাটে। ‘বাব্বাহ! একেবারে দেখছি নতুন জামাই সেজেছে আমার বাবা’টা!’
মেজাজ এমনিতেই চরমে। ঝাঁঝালো কন্ঠে জবাব দিলাম, বাবা! এটাও তোমার টিপ্পনী কাটার সময়? মা না অসুস্থ…. অসুস্থ….. ক্ষাণেক থেমে বাবা বলল, চল, চল। ওদেরকে নিয়ে আসি। বাবার পিছুপিছু বাবাকে অনুসরণ করে গাড়িতে গিয়ে বসলাম। কিন্তু একি! চাচা-চাচী, ফুপ্পি, দাদা আর কাজিনরা কি করছে এখানে? আমার কিছু বুঝে ওঠার আগেই লিমা, সুমন, রুবেল, আতিক চেপে বসলো আমার পাশে, আমার গাড়িতে। মিলিত স্বরে ওদের উচ্ছ্বাস, আমরাও যাচ্ছি প্রাণের নরসিংদী প্রাণের মানুষদের আনতে। ভেতরে ছ্যাৎ করে ওঠে আমার। তবে কি মা খুব বেশীই অসুস্থ? হে আল্লাহ!

একি হলো? কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম গাড়িতে বসেই।





গাড়ি স্টার্ট দেয় আতিক। এদিকে লিমা, সুমন, রুবেল আমায় বুঝাতে ব্যর্থ। সন্ধ্যার দিকে ও বাড়িতে গিয়ে পৌঁছলাম আমরা৷ কিন্তু একি!

এ বাড়িতে এত সাজসাজ আয়োজন কেন? অবশেষে মা’কে দেখেই কলিজা জুড়ালো আমার৷ কাজিনরা আমার মা’কে এমন আনন্দের সহিত এমনভাবে জড়িয়ে ধরেছে যেন ওরা অসুস্থ রোগী দেখতে নন, কোনো উৎসবে বেড়াতে এসেছে। চোখের জল মুছে মায়ের কাছে গেলাম আমি। সালাম দিয়ে কুশল বিনিময় করলাম।

কেমন আছো মা? কপালে চুমুর পরশ এঁকে দিয়ে হাসোজ্জল মুখে জানান দেয় মা, একটু আগেও ভালো ছিলাম না বাবা। আলহামদুলিল্লাহ! এখন খুব ভালো আছি। তোর বাবা আসেনি? আর ভাইয়া-ভাবি ওনারা আসেনি? পেছন থেকে বাবার জবাব- এইতো! আমরা এখানে, শুভ্র’র মা৷ পরে মায়ের থেকে জানতে পারলাম, বিয়ে ভেঙ্গে যাওয়ার পর পুরো পরিবার মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলো। ওদের সেই মানসিক অবস্থা থেকে উত্তরণে সাহায্য করে আমার মা৷ মা তাঁর উপস্থিত বুদ্ধির জুড়ে ওনার পরিচিত এক যুবকের সহিত লাবন্যর অন্যত্র বিয়ের ব্যবস্থা করে রাতেই৷ আমাদের সে বিয়ে খাওয়ার জন্যই এভাবে নিয়ে আসা। মায়ের প্রতি প্রচন্ড রাগ হচ্ছিল আমার। মানলাম স্বাভাবিক ভাবে বললে ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে আসতে চাইতাম না৷ তাই বলে এভাবে…..! বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের সাথে আমার মা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। ওদের সাথে এমনভাবে দৌঁড়ে দৌঁড়ে কাজ করছে যেন তিনি এ বাড়ির’ই পুরনো সদস্য। লক্ষ্য করলাম, বোন আমার লাবণ্যর কাজিনদের সাথে হৈ-হুল্লোড় আর আনন্দ উল্লাসে মেতে ওঠেছে। আরো লক্ষ্যনীয় যে, ওদের সমস্ত আনন্দ আর উল্লাস সবই যেন আমাকে ঘিরে। কতেক মেয়েরা তো আড়চোখে আমাকে দেখছে আর হাসছে। আমার কাজিনদের অবস্থা তো আরো খারাপ৷ হাসতে হাসতে লাবণ্যর কাজিনদের ওপর পড়ে যাওয়ার অবস্থা। বাড়ির বয়স্ক মহিলাদের খাতিরের অন্ত নেই আমাকে ঘিরে। লাবণ্যদের সদ্য নির্মিত বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। কোথা থেকে যেন একটা মহিলা এসে আমার গালে হলুদ মাখিয়ে দৌঁড় দেয়। মহিলাকে অনুসরণ করে পেছনের দিকে তাকাতেই আমার চোখ স্থির হয়ে যায় একদিকে। কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে ফেলি নিজের বোধ শক্তিকে…… চলবে…