প্রত্যাখান_পর্ব(০৬)

প্রত্যাখান_পর্ব(০৬)
প্রত্যাখান_পর্ব(০৬)

প্রত্যাখান_পর্ব(০৬)

লেখা- অনামিকা ইসলাম ‘অন্তরা

লাবণ্যদের পরিবারে লাবণ্যর বাবা ছাড়াও ছিল ওর একমাত্র ভাই লাবিব। বয়সে লাবিব লাবণ্যর থেকে বছর সাতেকের বড়। একটা সময় এই লাবিবই ছিল লাবণ্যদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বছর চারেক আগে হুট করে লাবিব পঙ্গু হয়ে যায়। সেই থেকে সে বিছানায় পড়ে। লাবণ্যর বাবার অনুরোধে আমাকে তাই সেদিন থেকে যেতে হলো। বাজার সওদা থেকে শুরু করে পরদিন পাত্রপক্ষের সামনে খাবার উপস্থাপন। সমস্তই আমাকে করতে হয়েছে। অবশ্য আমাকে হাতে হাতে সাহায্য করার জন্য পাশে ছিল লাবণ্যর সমবয়সী ২কাজিন। পরদিন যথাসময়ে লাবণ্যর ডাক পড়ল। অতিকায় সাধারণ বেশভূষায় লাবণ্য হাজির হয় পাত্রপক্ষের সামনে। ঘোমটার আড়ালের ঐ মায়াবী মুখটা দেখে জানি না কেন সেদিন আমার ভেতরটা কেঁপে ওঠেছিল। নামাজ সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রশ্ন করে, হেঁটে হাঁটিয়ে বিভিন্ন কায়দায় মুরুব্বীরা লাবণ্যকে দেখে নেয়। লাবণ্যও কিরকম বাধ্য বালিকার ন্যায় নিরবে ওদের সব প্রশ্নের যথাযথ সম্মান প্রদর্শন পূর্বক উত্তর দিয়ে যায়। সবশেষে লাবণ্যকে পছন্দের কথা জানান দিয়ে ওরা বিদায় নেয়। পাত্রপক্ষ চলে গেলে উঠোনে পুরো বাড়ির মানুষজন জড়ো হয়। সবার মুখেই এক কথা। ‘ছেলে দেখতে শুনতে ভালো। অর্থ সম্পদও ঢেড় আছে। আর কি লাগে? দিয়ে দেন বিয়ে।’ বাধ সাধল লাবণ্যর ভাবি হেনা। ‘নাহ! একটা বিবাহিত পুরুষের কাছে আমরা আমাদের মেয়ে বিয়ে দেবো না। আর যায় হোক এত বড় অন্যায়টা আমরা ওর সাথে করতে পারি না। হেনা তথা লাবণ্যর ভাবির সাথে তাল মেলায় লাবণ্যর মা৷ হ্যাঁ, হেনা ঠিকই বলেছে। এ বিয়েতে আমারও মত নেই। লাবণ্যর ভাবির কথা শুনে চমকিত নয়নে ফিরে তাকালাম আমি লাবণ্যর বাবার দিকে। আমার শুনা যদি ভুল না হয় তবে ছেলে বিবাহিত। একটা বিবাহিত ছেলের সাথে জেনে শুনে ওরা কেন ওদের অবিবাহিতা মেয়ের বিয়ে দিবে! প্রশ্নটা করেছিলাম আমি। উত্তরটা পাইনি তার আগেই ভেসে আসে হেনা ভাবির উত্তেজিত গলা, শুধু বিবাহিত নন, দুই বাচ্চার বাবাও। ‘কিহ? দুই বাচ্চার বাবা?’ এবার আমি অবাকের চূড়ান্ত সীমায়। একটা অল্পবয়স্কা বাচ্চা মেয়ে, যাকে দেখলে সবাই নবম দশম শ্রেণীর ছাত্রী মনে করে ভুল করবে, তাকে কি না একটা বয়স্ক বিবাহিত পুরুষের সাথে বিয়ে দেয়া হচ্ছে! তাও দু’সন্তানের জনকের সাথে!!! ব্যাপারটা হজম করতে কষ্ট হচ্ছিল আমার। সর্বসম্মুখেই তাই উঁচু গলায় বলে ওঠি, এ আপনারা কি করছেন? ফুলের মতো নিষ্পাপ মেয়ের জীবনটা আপনারা নিজ হাতে ধরে এভাবে শেষ করে…. পুরো কথা বলতে পারিনি আমি৷ তার আগেই অপরিচিত মহিলাটি তিরস্কারের ছলে বলে ওঠে, হাঃ হাঃ! বিয়ে দিবে না!! কি আমার দুধে ধুয়া তুলসি পাতা। পালঙ্কে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াবে তাকে লোকে!!! লাবণ্যর ভাবির মুখোমুখি প্রতিবাদ, আন্টি! পালঙ্কে নাকি সোফায় বসে খাওয়াবো সেটা একান্তই আমাদের ব্যাপার। আর কি যেন বলছেন? দুধে ধুয়া তুলসি পাতা৷ যেটা একবারও দাবি করিনি আমি যদিও আপনি কয়েক ঘন্টায় আপনার ভাইপোর শতেকটা সুনাম করে ফেলেছেন যেটা আদৌ ওনার পক্ষে যায় কি না সন্দেহ। আমি শুধু এটাই বলেছি, এটা হয় না। হতে পারে না। এ ঘোর অন্যায়। আর তুমি সেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে এসেছ, তাই না? হাঃ হাঃ। মেয়ে বিবাহিত সেটা জানা সত্ত্বেও আমি আমার ভাইপোকে নিয়ে আসছিলাম। কোথায় তোমরা নত হয়ে মেয়ে বিয়ে দিবে, তা নয়। তা না করে বিয়ে ভাঙার জন্য কোমড় বেধে লেগেছ। শুনো তবে! আজ যদি তোমরা বিয়ে হবে না বলে জানিয়ে দাও, আগামীকাল ঠিক এসময় আমি আমার ভাইপোর বউ নিয়ে বাড়ি যাবো। ‘কিহ! লাবণ্যর আগে বিয়ে হয়েছে?’ আনমনে নিজে নিজেকে প্রশ্নটা করে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ফিরে তাকালাম মধ্যবয়স্কা মহিলার দিকে। মহিলা তখনো হেনা ভাবির সাথে তর্কে লিপ্ত। ভিড় ঠেলে সেখানে উপস্থিত হয় স্বয়ং লাবণ্য। আন্টি! আপনি চুপ করুন। আর ভাবি?!!! তুমি এ শরীর নিয়ে এখানে কেন আসছো? যাও, রুমে যাও। মা! চিন্তা করো না। আমি ঠিক মানিয়ে নিতে পারবো। বাবা! আপনি ওদের জানিয়ে দিন আমি রাজি। কথাগুলো বলে দ্রুতপায়ে রুমে চলে যায় লাবণ্য। আলোচনা তখনকার মতো সমাপ্তি ঘোষনা করা হয়। সবাই যে যার মতো চলে যায়। নির্বাক আমি হা করে তখনো সে স্থানে দাঁড়িয়ে…. চলবে…