ঘুমন্ত রাজপরী_পর্ব(০২)

0
98
ঘুমন্ত রাজপরী
ঘুমন্ত রাজপরী_

ঘুমন্ত রাজপরী_পর্ব(০২)

এখন অবস্থা যা দাঁড়াচ্ছে, তাতে ফিরােজেরই চোখ ট্যারা হয়ে যাবার যােগাড়। বি: করিম লােকটি মহা তাড়। হয়তাে বলে বসবে, ফিরােজ সাহেব, এই ফার্মে আপনার কাজ ঠিক পােযাচ্ছে না। দু’দিন পর-পর ফার্মকে একটা ঝামেলায় জড়িয়ে ফেলছেন। আপনি ভাই অন্য পথ দেখুন। | করিম সাহেবের পক্ষে এটা বলা মােটেই অস্বাভাবিক নয়, বরং খুবই স্বাভাবিক। ব্যাটা অনেকদিন থেকেই সুযােগ খুজছে। মাঝে-মাঝে ইশারা-ইঙ্গিতও করছে। গত সপ্তাহে বেতনের দিন বলল, ‘খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি হয়ে গেছে। কাজের চেয়ে মানুষ বেশি। বার হাত কাঁকুড়ের আঠার হাত বিচি।
| ফিরােজ আধ-খাওয়া সিগারেট ফেলে দিয়ে অপালার দিকে তাকাল। অপালা এখনও দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখ হাসি-হাসি। মনে হচ্ছে কায়দা করে এই মেয়েটিকে রাজি করিয়ে ফেলা যাবে। উনিশ-কুড়ি বছর বয়সী মেয়েদের মন তরল অবস্থায় থাকে। দুঃখ-কষ্টের কথা বললে সহজেই কাবু হয়ে যায়। মুশকিল হচ্ছে বলাটাই। এই বয়সী। মেয়েদের সঙ্গে ভিখিরির গলার স্বরে কথা বলতে ইচ্ছা করে না। তাতে নিজেকে খুব তুচ্ছ মনে হয়।
‘আমি বরং কাজটা শেষ করি। আমার ধারণা, আপনার বাবা যখন দেখবেন একটা চমৎকার কাজ হয়েছে… মানে চমৎকার যে হবে এই সম্পর্কে…
অপালা হাসি মুখে বলল, ‘না।’ ফিরােজ স্তম্ভিত। হাসিমুখে কাউকে না বলা যায়।
এইভাবে আমি যদি চলে যাই তাহলে আমার নিজের খুব অসুবিধা হবে। চাকরিটা হয়তাে থাকবে না। আপনি আপনার বাবাকে বুঝিয়ে বলতে পারেন। আমার ধারণা, আপনার কথা উনি শুনবেন।
‘আপনার ধারণা ঠিক নয়।
এই বাজারে আমার চাকরি নিয়ে সমস্যা হলে কী যে অসুবিধায় পড়ব, আপনি বােধহয় বুঝতে পারছেন না। আপনাদের বােঝার কথাও নয়। নিজ থেকে বলতে আমার খুবই লজ্জা লাগছে…’
অপালা মৃদু স্বরে বলল, ‘যাবার আগে ঘরটা আগের মতাে করে যাবেন। এ-রকম এলােমেলাে ঘর দেখলে বাবা খুব রাগ করবেন।
ফিরােজ দ্বিতীয় সিগারেট ধরাল। তার সঙ্গের লােক দু’টি চিন্তিত মুখে ফিরােজের দিকে তাকাচ্ছে। ফিরােজ নিচু গলায় বলল, ‘যাও, ঘরটা গুছিয়ে ফেল। | অপালা চলে যাচ্ছে। ফিরােজের গা জ্বালা করছে, মেয়েটি এক বার বলল না— সরি। মানবিক ব্যাপারগুলি কি উঠেই যাচ্ছে? গল্প-উপন্যাস হলে এই জায়গায়
মেয়েটির চোখে পানি এসে যেত। সে ধরা গলায় বলত—আমার কিছু করার নেই ফিরােজ ভাই। আমার বাবাকে তাে আপনি চেনেন না—একটা অমানুষ।
ফিরােজ বলত, তুমি মন খারাপ করাে না? তােমার মন খারাপ হলে আমারও মন খারাপ হয়। এই বলে সে উদাস দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত।
কিন্তু জীবন গল্প-উপন্যাস নয়। জীবনে কুৎসিত সব ব্যাপারগুলি সহজভাবে ঘটে যায়। অপরূপ রূপবতী একটি মেয়ে হাসতে-হাসতে কঠিন-কঠিন কথা বলে।
‘চা নিন।
ফিরােজ দেখল, কাজের মেয়েটি ট্রেতে করে এক কাপ চা নিয়ে এসেছে। ফিরােজ ঠাণ্ডা গলায় বলল, ‘চা কেন?
‘আপা দিতে বললেন।
তার এক বার ইচ্ছা হল বলে—চা খাব না। কিন্তু এ-রকম বলার কোনাে মানে হয় না। শীতের সকালবেলা এক কাপ চা মন্দ লাগবে না। সে হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপ নিল। চা খাওয়া শেষ হলে আছাড় দিয়ে কাপটা ভেঙে ফেললেই হবে।
বি. করিম সাহেব বেশ কিছুক্ষণ মুখ ছুঁচালাে করে রাখলেন। | চেঁচামেচি হৈচৈ কিছুই করলেন না। করলে ভালাে হত। স্টীম বের হয়ে যেত। স্টীম বের হল না—এর ফল মারাত্মক হতে পারে। ফিরােজ ফলাফলের অপেক্ষা করছে। তার মুখ দার্শনিকের মতাে। যা হবার হবে এই রকম একটা ভাব।।
‘ফিরােজ সাহেব।
‘হাজার পাঁচেক টাকার ক্ষতি হয়ে গেল, কি বলেন? ‘ক্ষতি হবে কেন? মতিন এইগুলি দিয়েই কাজ করবে। ‘পাগল, মতিন এই সব ছোঁবে? সে সবকিছু আবার নতুন করে করাবে। ‘তা অবশ্যি ঠিক। ‘বেকায়দা অবস্থা হয়ে গেল ফিরােজ সাহেব। ‘তা খানিকটা হল।
‘আপনাকে আগেই বলেছিলাম, যাবেন না। কথা শুনলেন না। রক্ত গরম, কারাে কথা কানে নেন না।
‘রক্ত এক সময় গরম ছিল, এখন ঠাণ্ডা মেরে গেছে।
আমার যা সবচেয়ে খারাপ লাগছে তা হচ্ছে, আপনি আমার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলেছেন। আপনি বলেছিলেন, ফখরুদ্দিন সাহেবের মেয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। আপনার কথার উপর ভরসা করে……’
করিম সাহেব বাক্য শেষ করলেন না। পেনসিল চাঁছতে শুরু করলেন! এটি খুব অশুভ লক্ষণ। পেনসিল চাঁছা শেষ হওয়ামাত্র বুলেটের মতাে কিছু কঠিন বাক্য বের হবে। তার ফল সদূরপ্রসারী হতে পারে।
১৪
ফিরােজ সাহেব।
‘আপনি বরং সিনেমা লাইনে চলে যান। ‘অভিনয় করার কথা বলছেন?
“আরে না! অভিনয়ের কথা বলব কেন? সেট-টেট তৈরি করবেন। আপনি ক্রিয়েটিভ লােক, অল্প সময়েই নাম করবেন। জাতীয় পুরস্কার এক বার পেয়ে গেলে
দেখবেন কাঁচা পয়সা আসছে।
| ফিরােজ মনে-মনে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল। কাঁচা পয়সা জিনিসটা কী, কে জানে? পয়সার কাঁচা-পাকা নেই। পয়সা হচ্ছে পয়সা।
‘ফিরােজ সাহেব।
‘ঐ করুন। ‘সিনেমা লাইনে চলে যেতে বলছেন?
‘হ্যা। আমরা বড়-বড় কাজটাজ পেলে আপনাকে ডাকব তাে বটেই। আপনি হচ্ছেন খুবই ডিপেণ্ডেবল। এটা আমি সবসময় স্বীকার করি।’
‘শুনে অত্যন্ত খুশি হলাম। আগে জানতাম না। ‘সিনেমা লাইনের লােকজন আপনাকে লুফে নেবে।’ ‘কেন বলুন তাে?
‘সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে, আপনার আর্ট কলেজের ডিগ্রি নেই। ডিগ্রিধারী কাউকে এরা নিতে চায় না। ওদের তেল বেশি থাকে। ডিরেক্টারের উপর মারি করতে চায়। আপনি তা করবেন না।
| ‘ডিগ্রি না-থাকার তাে বিরাট সুবিধা দেখছি! এই ফার্মের চাকরি কি আমার
শেষ?
করিম সাহেব কথার উত্তর দিলেন না। তাঁর পেনসিল চাঁছা শেষ হয়েছে। তিনি সেই পেনসিলে কী যেন লিখতে শুরু করেছেন। ফিরােজ হাই তুলে বলল, আপনি কি আমাকে আরাে কিছু বলবেন, না আমি উঠব?’
| ‘আমার পরিচিত একজন ডিরেক্টর আছে। তার কাছে আমি একটা চিঠি লিখে দিচ্ছি। চিঠি নিয়ে দেখা করুন, একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
‘আপনি তাে দেখছি রীতিমতাে মহাপুরুষ ব্যক্তি। চিঠিটা পেনসিলে না লিখে দয়া করে কলম দিয়ে লিখুন।
‘ইচ্ছা করেই পেনসিল দিয়ে লিখছি। পেনসিলের চিঠিতে একটা পারসােনাল টাচ থাকে, যে-জিনিসটা টাইপ করা চিঠিতে বা কলমের লেখায় থাকে না।
‘গুড। এটা জানতাম না। এখন থেকে যাবতীয় প্রেমপত্র পেনসিলে লিখব।
ডিরেক্টর সাহেবের বাসা কল্যাণপুর। সারা দুপুর খুঁজে সেই বাড়ি বার করতে হল। ডিরেক্টর সাহেবকে পাওয়া গেল না। অত্যন্ত ক্রুদ্ধ বাড়িওয়ালার কাছে জানা গেল, ডিরেক্টর সাহেব ছ’ মাসের বাড়িভাড়া বাকি ফেলে চলে গেছেন। শুধু তাই নয়, যাবার সময় বাথরুমের দু’টি কমােড হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে ভেঙেছেন।’
১৫
ফিরােজ চোখ কপালে তুলে বলল, ‘বলেন কী! ‘ফিল্ম লাইনের পােক। বাড়িভাড়া দেয়াই উচিত হয় নি। আপনি তার কে হন? ‘আমি কেউ হই না। আমিও এক জন পাওনাদার।
কত টাকা গেছে? ‘প্রায় হাজার দশেক।’
‘ঐ টাকার আশা ছেড়ে দিন। ঐটা আর পাবেন? টাকা এবং স্ত্রী—এই দুই জিনিস হাতছাড়া হলে আর পাওয়া যায় না।’
ফিরােজ প্রায় বলেই বসছিল—আপনার স্ত্রীও কি তাঁর সাথে ভ্যানিশ হয়েছেন? শেষ মুহুর্তে নিজেকে সামলাল। এখন রসিকতা করতে ইচ্ছা করছে না। সে ক্লান্ত স্বরে বলল, ‘এক গ্লাস পানি খাওয়াতে পারেন ?
‘নিশ্চয়ই পারি। আসুন, ভেতরে এসে বসুন। এত মন-খারাপ করবেন না। কী। করবেন বলুন, দেশ ভরে গেছে জোচ্চোরে। আমার মতাে পুরনাে লােক মানুষ চিনতে পারে না, আর আপনি হচ্ছেন দুধের ছেলে!
| শুধু পানি নয়। পানির সঙ্গে সন্দেশ ও লুচি চলে এল। ভদ্রলােকের স্ত্রী পর্দার ও পাশ থেকে উকি দিচ্ছেন। দেখছেন। দেখছেন কৌতূহলী চোখে।
ভদ্রলােক ফুর্তির স্বরে বললেন, ‘এই ছেলের কথাই তােমাকে বলছিলাম। একে ফতুর করে দিয়ে গেছে। কীরকম অবস্থা একটু দেখ। হায়রে দুনিয়া! | দশ মিনিটের ভেতর এই পরিবারটির সঙ্গে ফিরােজের চূড়ান্ত খাতির হয়ে গেল। ভদ্রলােক এক পর্যায়ে বললেন, ‘দুপুরবেলা ঘােরাঘুরি করে লাভ নেই। হাত-মুখ ধুয়ে ভাত খেয়ে ফেল। বড়-বড় পাবদা মাছ আছে।’
| ফিরােজের চোখ প্রায় ভিজে উঠল। এই জীবনে সে অনেকবারই অযাচিত ভালবাসা পেয়েছে। এই জাতীয় ভালবাসা মন খারাপ করিয়ে দেয়।
অপালার মা হেলেনা প্রথমে লণ্ডনের সেন্ট লিউক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তাঁর হার্টের একটি ড্যামেজড় ভান্তু এখানেই রিপেয়ার করা হয়। রিপেয়ারের কাজটি তেমন ভালাে হয় নি। ডাক্তাররা এক মাস পর আর একটি অপারেশন করতে চাইলেন। তবে এও বললেন যে, অপারেশন নাও লাগতে পারে। তবে তা এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। এক মাস অবজারভেশনে রাখতেই হবে। | ফখরুদ্দিন সাহেব লণ্ডনের সাবাবে লাল ইটের ছােটখাটো একটি নার্সিং হােম খুঁজে বের করলেন। এই হাসপাতালটি ঘরােয়া ধরনের। সবার প্রাণপণ চেষ্টা, যেন কিছুতেই হাসপাতাল মনে না হয়। কিছু অংশে তারা সফল। চট করে এটাকে হাসপাতাল মনে হয় না। তবে তার জন্যে রুগীদের প্রচুর টাকা দিতে হয়। এখানে বড় হাসপাতালের খরচের দেড়গুণ বেশি খরচ হয়। টাকাটাও আগেভাগেই দিয়ে দিতে হয়। ফখরুদ্দিন সাহেবের জন্যে সেটা কোনাে সমস্যা হয় নি। টাকা খরচ করতে তাঁর ভালােই লাগে। ফখরুদ্দিন সাহেব নিজে যখন দরিদ্র ছিলেন, তখনাে তাঁর এই স্বভাব
ছিল। পড়াশােনার খরচ দিতেন বড়মামা। তাঁর অবস্থা নড়বড়ে ছিল, তবু তিনি মাসের তিন তারিখে একটা মানিঅর্ডার পাঠাতেন। প্রায়ই এমন হয়েছে, মাসের ছ’ তারিখেই সব শেষ। তখন ছােটাছুটি দৌড়াদৌড়ি। ফখরুদ্দিন সাহেবের জীবনের উদ্দেশ্য ছিল একটিই—প্রচুর টাকা রােজগার করা, যাতে দু’হাতে খরচ করেও শেষ করা না যায়। ফখরুদ্দিন সাহেবের মেধা ছিল। ভাগ্যও প্রসন্ন ছিল। মাত্র পয়ত্রিশ বছর বয়সে ব্যবসা জমিয়ে ফেললেন। চারদিক থেকে টাকা আসতে শুরু করল। বিয়ে করলেন সাঁইত্রিশ বছর বয়সে। বাসর রাতে স্ত্রীকে বললেল, টাকাপয়সা তােমার কাছে কেমন লাগে?
| হেলেনার বয়স তখন মাত্র সতের। আই এ পরীক্ষা দিয়ে বড় ফুপার বাড়ি বেড়াতে গিয়েছে। সেখানেই চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে বিয়ে। বাসর রাতে টাকা প্রসঙ্গে স্বামীর এই অদ্ভুত প্রশ্নের সে কোনাে আগামাথা পেল না। সে চুপ করে রইল। ফখরুদ্দিন সাহেব অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে বললেন, আমার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্যই হচ্ছে—টু বিকাম রিচ। ভেরি রিচ। টাটা-বিড়লাদের মতাে। তােমার কি ধারণা, আমি পারব?
হেলেনা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তার কেন জানি মনে হতে লাগল,এই লােকটি ঠিক সুস্থ নয়। সুস্থ মানুষ বিয়ের প্রথম রাতে স্ত্রীকে নিশ্চয়ই এই জাতীয় কথা বলে না।। | ‘বুঝলে হেলেনা, আমার মনে হয় আমি পারব। আমি খুব দ্রুত ভাবতে পারি। ভবিষ্যৎ চোখের সামনে দেখতে পাই। এটা একটা মেজর এ্যাডভানটেজ। অন্যারা যা আজ চিন্তা করে, আমি সেটা দু’বছর আগেই চিন্তা করে রেখেছি। | হেলেনার বিয়ে হয়েছিল শ্রাবণ মাসে। হুট করে বিয়ে। আত্মীয়স্বজন দূরের কথা, নিজের মা পর্যন্ত খবর জানেন না। টেলিগ্রাম করা হয়েছে, এখনাে হয়তাে পৌছে নি। ঘটনার আকস্মিকতা, বিয়ের উত্তেজনায় এমনিতেই হেলেনার মাথার ঠিক নেই, তার ওপর লােকটি ক্রমাগত কী-সব বলে যাচ্ছে।
‘হেলেনা।
‘আমি আজ কিঞ্চিৎ মদ্যপান করেছি, যেটা আমি কখনাে করি না। আজ বাধ্য হয়ে নার্ভ স্টেডি রাখার জন্যে করতে হল। তুমি সম্ভবত গন্ধ পাচ্ছ।
| হেলেনা কোনাে গন্ধটন্ধ পাচ্ছিল না। এখন পেতে শুরু করল। তার ইচ্ছে করল চেঁচিয়ে কেঁদে ওঠে।
এই পৃথিবীতে আমি মােটামুটিভাবে একা। মানুষ করেছেন বড়মামা। তাঁর সঙ্গে কিছুদিন আগে বিরাট একটা ঝগড়া হয়েছে। আজ তােমাকে বলব না, পরে বলব। আজ বরং আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাগুলি তােমাকে বলি। | ঝুমঝুম করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। খােলা জানালা দিয়ে বৃষ্টির ছাট আসছে। ফখরুদ্দিন সাহেব হাতে সিগারেট ধরিয়ে চক্রাকারে হাঁটছেন এবং কথা বলছেন। সিগারেটের ধোঁয়ায় হেলেনার দম বন্ধ হবার যােগাড়। লােকটি একটির পর একটি সিগারেট ধরাচ্ছে। পুরােটা টানছেনা, কয়েকটি টান দিয়েই ফেলে দিচ্ছে। হেলেনার ভয়
ভয় করতে লাগল। এ-কেমন ছেলে ! কার সঙ্গে তার বিয়ে হল ?
এখনকার ট্রেণ্ডটা হচ্ছে কি, জান ? চট করে ইণ্ডাসট্রি দিয়ে দেয়া। এতে সমাজে প্রেস্টিজ পাওয়া যায়। লােকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলেইণ্ডাষ্ট্রিয়ালিস্ট। কিন্তু এইসব
১৭
ইণ্ডাস্ট্রি শেষ পর্যন্ত হাতিপােষার মতাে হয়। হাতির খাবার যােগাতে গিয়ে প্রাণান্ত। বুঝতে পারছ, কী বলছি?
‘র মেটিরিঅ্যাল নিয়ে কেউ চিন্তা করে না। ইণ্ডাস্ট্রির খাবার হচ্ছে র মেটিরিঅ্যাল, যার প্রায় সবই আনতে হয় বাইরে থেকে। আমি তা করব না। আমি যখন কোনাে ইণ্ডাস্ট্রি দেব তার প্রতিটি র মেটিরিঅ্যাল তৈরি করব আমি নিজে।
| হেলেনা হাই তুলল। ফখরুদ্দিন সাহেব অবাক হয়ে বললেন, তােমার ঘুম পাচ্ছে নাকি?
‘না।” ‘শুধু ব্যবসা নিয়ে কথা বলছি বলে কি বিরক্তি লাগছে?
‘টাকা খুব ইম্পর্ট্যান্ট জিনিস, বুঝলে হেলেনা। যে-সােসাইটির দিকে আমরা যাচ্ছি, সেই সােসাইটির ঈশ্বর হচ্ছে টাকা। একটা সময় আসবে, যখন তুমি টাকা দিয়ে সব কিনতে পারবে। সুখ, শান্তি, ভালবাসা—সব।’
হেলেনা দ্বিতীয় বার হাই তুলল। ফখরুদ্দিন সেই হাই সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে বললেন, ‘খুব বেশি দূর তােমাকে যেতে হবে না। আজকের কথাই ধর। তােমার যদি প্রচুর টাকা থাকে, তাহলে তুমি সেই টাকায় বেহেশতে নিজের জন্যে একটা জায়গার ব্যবস্থা করতে পার।
কীভাবে? | ‘টাকা খরচ করে হাসপাতাল দেবে, স্কুল-কলেজ দেবে, এতিমখানা বানাবে, লঙ্গরখানা বসাবে। এতে পুণ্য হবে। সেই পুণ্যের বলে বেহেশত। কাজেই টাকা দিয়ে তুমি পরকালের জন্যে ব্যবস্থা করে ফেললে, যে-ব্যবস্থ্য এক জন ভিখিরি করতে পারবে না। ইহকালে সে ভিক্ষা করেছে, পরকালেও সে নরকে পচবে—কারণ তার টাকা নেই। হা হা হা।
তাঁর হাসি আর থামেই না। মাঝে-মাঝে একটু কমে, তার পরই আবার উদ্দাম গতিতে শুরু হয়। হেলেনা ভয় পেয়ে উঠে দাঁড়াল। বন্ধ দরজার পাশে বাড়ির মেয়েরা এসে দাঁড়িয়েছে। তাদের এক জন দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলল, ‘কী হয়েছে?
ফখরুদ্দিন সাহেব হাসতে-হাসতেই বললেন, ‘নাথিং। এ্যাবসলুটলি নাথিং। পানি খেলেই ঠিক হয়ে যাবে। ব্রিং মি সাম ওয়াটার।
হেলেনা হাসপাতালের বেডে শুয়ে পুরনাে কথা ভাবেন।
স্মৃতি রােমন্থনের জন্যে নয়, সময় কাটানাের জন্যে। বইপত্র ম্যাগাজিন স্কুপ হয়ে আছে। বেশিক্ষণ এ-সব দেখতে ভালাে লাগে না। টিভির অনুষ্ঠানও একনাগাড়ে দেখা যায় না। কথাবার্তা বােঝা যায় না। সবাই কেমন ধমক দেয়ার মতাে করে ইংরেজি বলে। পুরােটাও বলে না। অর্ধেক গলার মধ্যে আটকে রাখে। যেন কথাগুলি নিয়ে গার্গল করছে।
হেলেন। তিনি তাকালেন। সিস্টার মেরি এসে দাঁড়িয়েছে। এরা সবাই তাঁকে হেলেন ডাকে,
১৮
যদিও তিনি অনেক বার বলেছেন, তাঁর নাম হেলেনা—হেলেন নয়।
| ‘তােমার একটি টেলিফোন এসেছে। কানেকশন এ-ঘরে দেয়া যাচ্ছে না। টেলিফোন সেটটায় গণ্ডগােল আছে। তুমি কি কষ্ট করে একটু আসবে?
“নিশ্চয়ই আসব।’ | তিনি বিছানা থেকে নামলেন। এই হাসপাতালে সিস্টার মেরিই একমাত্র ব্যক্তি, যার প্রতিটি কথা তিনি বুঝতে পারেন। এই মহিলার গলার স্বরও সুন্দর। শুনতে ইচ্ছে করে। সে কথাও বলে একটু টেনে-টেনে।।
টেলিফোন ঢাকা থেকে এসেছে। অপালার গলা। ‘মা, কেমন আছ?” ‘ভালাে। ‘আমি কেমন আছি জিজ্ঞেস করলে না তাে?
কেমন আছিস? ‘ভালাে। আমার পরীক্ষা কেমন হচ্ছে জিজ্ঞেস কর।
পরীক্ষা কেমন হচ্ছে? ‘ভালাে না। মাঝারি ধরনের। ‘বলিস কি তুই এমন সিরিয়াস ছাত্রী, তাের পরীক্ষা মাঝারি ধরনের হবে কেন?
এখন হলে আমি কী করব? ‘তুই কি আমার কথা ভেবে-ভেবে পরীক্ষা খারাপ করলি ?
হতে পারে। তবে কনশাসলি ভাবি না। অবচেতন মনে হয়তাে ভাবি। সেটা বুঝলি কীভাবে?
‘প্রায়ই স্বপ্নে দেখি, তােমার অপারেশন হচ্ছে। অপারেশনের মাঝখানে ডাক্তাররা গণ্ডগােল করে ফেলল…… এইসব আর কি।
সেকেও অপারেশনটা আমার বােধহয় লাগবে না। ‘তাই নাকি। এতবড় একটা খবর তুমি এতক্ষণে দিলে? ‘এখনাে সিওর না। ডাক্তাররা আরাে কী-সব টেস্ট করবে।
কবে নাগাদ সিওর হবে? ‘এই সপ্তাহটা লাগবে। তাের বাবা কেমন আছে? ‘জানি না। ভালােই আছে বােধহয়। একটা ভালাে খবর দিতে পারি না।’ ‘দিতে পারলে দে।
এখন থেকে ঠিক আটচল্লিশ ঘন্টার মধ্যে বাবার সঙ্গে তােমার দেখা হবে। বাবা সিঙ্গাপুর থেকে ইংল্যাণ্ড যাচ্ছে।
‘ভালো ।’ ‘তুমি মনে হচ্ছে তেমন খুশি হও নি।

চলবে…