গল্পটা নিশ্চুপ বালিকার(১১)

গল্পটা নিশ্চুপ বালিকার(১১)
গল্পটা নিশ্চুপ বালিকার(১১)

 

গল্পটা নিশ্চুপ বালিকার(১১)

রচনায়- অনামিকা ইসলাম ‘অন্তরা’

দু’দিন পর অচেনা নাম্বার থেকে ফোন আসে। রিংটনের আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায় শুভ্র’র। ঘুম জড়ানো চোখে শুভ্র ফোন রিসিভ করে কানে ধরে। অতঃপর ঘুম জড়ানো কন্ঠে’ই প্রশ্ন করে, কে? ফোনের ওপাশ থেকে একটা নারী কন্ঠ ভেসে আসে। ‘শুভ্র ভাইয়া বলছেন?’ — জ্বী, বলছি! আপনি কে? — আমি শাকিলা! নীলিমা’র সবচেয়ে কাছের বান্ধবী। আপনাকে একটু দরকার ছিল আমার। একটু আসবেন? গলির মোড়ে? — খুব কি বেশী দরকার! — হ্যাঁ, ভাইয়া খুব বড় একটা বিপদে পড়েছি। আপনার সাহায্য প্রয়োজন আমার। — ওকে, আপনি ওখানেই থাকেন। আমি আসছি। — ওকে, আমি অপেক্ষায় আছি। চটজলদি ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে গাড়ি নিয়ে দ্রুত গতিতে শুভ্র চলে গলি’র মোড়ের দিকে। গলি থেকে বেশ ক্ষাণিকটা দুরে গাড়ি থামায় শুভ্র। বেরিয়ে আসে গাড়ি থেকে। দুর থেকে দেখা যাচ্ছে একটি মেয়ে এদিকেই আসছে। হতে পারে এই মেয়েটাই নীলিমা’র ফ্রেন্ড। এই ভেবে সম্মুখ দিকে এগিয়ে যায় শুভ্র নিজেও। মিনিট দুয়েকের ভেতর মুখোমুখি দাঁড়ায় দু’জন দু’জনের। — আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া! — ওয়ালাইকুম আসসালাম। — (নিশ্চুপ) — আপনি’ই শাকিলা? — জ্বী, ভাইয়া! আমি’ই নীলিমা’র বান্ধবী শাকিলা। — বলুন আমি আপনার জন্য কি হেল্প করতে পারি? — ভাইয়া প্লিজ আপনি নীলিমা’কে আটকান। না হলে ও চলে যাবে। — মানে? কোথায় যাবে ও? — ওর গ্রামের বাড়ি চলে যাবে। আর আসবে না। ভাইয়া প্লিজ আপনি কিছু একটা করুন। — আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। কি হয়েছে? কি বলতেছ তুমি এসব? কোথায় যাবে ও? ” আমি বলছি….” পিছন থেকে তাসনিয়া’র জবাব। — তাসনিয়া তুই? শ্বশুর বাড়ি থেকে কখন এলি? রুবেল কেমন আছে? — গতকালকে সন্ধ্যায় এসেছি। আর সবাই ভালো আছে।(তাসনিয়া) — আচ্ছা, ওনাকে তুই চিনিস? — ও’কে? আপন বোনকে কেউ কি না চিনে পারে? — বোন? আপন??? — হ্যাঁ, ও আমার আপন বোন… — কিন্তু তোর বোনের নাম তো নু… — নুহা! ডাকনাম নুহা আর খাতা কলমে শাকিলা…. — তো বোন এসব কি বলতেছে? আমায় একটু বুঝিয়ে বলবি? — এখনো বুঝাপোড়া করবি? ঐদিকে যে তোর নিশ্চুপ বালিকা অভিমানে চুপটি করে তোর থেকে দুরে, বহুদুরে সরে যাচ্ছে সেটা কি তুই বুঝতে পারছিস না? — মানে কার কথা বলছিস তুই?! — নীলিমা! তোকে ভিষণ ভালোবাসে। আমার কথা নয় এটা। কথা বলছে ডায়েরী’র লেখাগুলো।(নুহা! সেদিন নীলিমা’র ফেলে যাওয়া ডায়েরীটা দে তো তোর ভাইয়া’র হাতে) শাকিলা(নুহা) শুভ্র’র দিকে ডায়েরীটা এগিয়ে দেয়। কিৎকর্তব্যবিমূঢ় শুভ্র সেখানে দাঁড়িয়ে পড়া শুরু করে ডায়েরী। প্রথম কয়েক পাতা শুভ্র’র মুখ যতটা না খুশিতে উজ্জ্বল হয়েছিল, সেই মুখটাই তার থেকে দ্বিগুন কালো যায় শেষের কয়েক পৃষ্টা পড়ে। ডায়েরী’টা বন্ধ করে শাকিলা’র দিকে ফিরে তাকায় শুভ্র। মুখ দিয়ে কোন কথা’য় বের হচ্ছে না ওর। মলিন হাসি হেসে শাকিলা’র জবাব, ওর অর্থনৈতিক এবং সামাজিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। ওর বাবার বাজে নেশা আছে। বাজে নেশা বলতে শুধু মধ্যপান আর জোয়ায় আসক্ত নয়। ওর বাবা বহু নারীতে আসক্ত। এজন্য ওর বাবাকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়েছে। ওর মা নেই। শুধু বাবা আর একটা ছোট বোন আছে। ও দেখতে যথেষ্ট সুন্দরী হলেও ওর বিয়ের জন্য কোন পয়গাম আসে না। আসলেও দুর থেকেই চলে যায় ওর বাবা’র খারাপ রেকর্ডের কথা শুনে। জন্ম থেকে ও এরকম নিশ্চুপ স্বভাবের ছিল না। ও ছিল ভিষণ হাসিখুশী আর প্রাণচঞ্চল একটা মেয়ে। একটু সুখের আশায় ও ভালোবেসে ছিল একজনকে। সেই ছেলেটাও ওকে ধোঁকা দেয়। ভিষণ রকম ধোঁকা। তারপর থেকেই ও এরকম হয়ে গেছে। তবে মন থেকে ভালোবাসা নামক বস্তুটি হারিয়ে যায়নি। তাইতো ও আবারো প্রেমে পড়ে। ভালোবেসে ফেলে আপনাকে। কিন্তু দেখুন না- আর্থ সামাজিক অবস্থার কথা ভেবে, পেয়েও হারানোর ভয়ে ও পারেনি মনের না বলা কথাটি আপনাকে জানাতে। পারেনি বলতে, ভালোবাসি… সবশুনে হতাশ দৃষ্টিতে শুভ্র তাকায় তাসনিয়া’র দিকে। দাঁতে দাঁত চেপে রাগান্বিত স্বরে তাসনিয়া’র জবাব, ‘ ওরে গাধা! আর কতো? এখনো সময় নষ্ট করবি? তোর নিশ্চুপ বালিকা যে তোকে ভুল বুঝে চলে যাচ্ছে। আটকা ওকে। যা…’ কোন কথা না বলে ডায়েরী হাতে দ্রুত গাড়ি’র দিকে এগিয়ে যায় শুভ্র। দ্রুতগতিতে গাড়ি চালিয়ে বাসায় পৌঁছে। নীলিমা, নীলিমা ডাকতে ডাকতে দৌঁড়ে উপরে উঠে। নীলিমা’র রুমে গিয়ে থমকে দাঁড়ায়। — মা তুমি? নীলিমা কোথায়? — বাবা এসেছো? দেখো না মেয়েটাও বের হলো টিভিতেও নিউজ দিলো। কোন জায়গা’য় নাকি বাস এক্সিডেন্ট হয়ে দু’জন মারা গেছে। — কখন বের হয়েছে? — তুমি বের হওয়ার একটু পরেই। — Oh god! — তোমার হাতে ঐটা কি? ডায়েরীটা মায়ের পাশে সোফায় ছুড়ে দিয়ে শুভ্র গাড়ি নিয়ে দ্রুত ছুটে চলে বাসস্টপের দিকে….

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here