গল্পটা নিশ্চুপ বালিকা’র(০৬)

golpota nishchop balikar
golpota nishchop balikar

গল্পটা নিশ্চুপ বালিকা’র(০৬)

রচনায়- অনামিকা ইসলাম ‘অন্তরা’

পরদিন জিনিসপত্র গুছিয়ে প্রস্তুত নীলিমা আন্টির সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। আন্টি’র কোলের ঐ ছোট্ট বাচ্চা’র কপালে চুমু খেয়ে পাঁচ বছরের ছোট্ট সিয়ামের গালটা টেনে দেয়। — তারপর! ভাইয়া মনে থাকবে তো কি বলেছি আমি? — কি বলেছো?(বোকার মতো) — মন দিয়ে পড়াশুনা করবা। খাওয়া দাওয়া ঠিকমতো করবা আর দুষ্টুমি করবা না, মনে থাকবে? — হ্যাঁ, মনে থাকবে। — এইতো গুড বয়! ঘড়িতে একনজর তাকিয়ে নীলিমা ফিরে তাকায় আন্টির দিকে। — আংকেল-আন্টি! মাগরিবের আজান দিয়ে দিবে। আমি আসি তাহলে। — আচ্ছা, মা যাও! ঐখানে পৌঁছে একটা কল দিও।(আন্টি) — আচ্ছা, সন্ধ্যা হয়ে গেছে। এখন আর ওকে(কোলের শিশু) নিয়ে বাহিরে এসো না তুমি। আমি এগুলো(জিনিসপত্র) গাড়িতে উঠিয়ে দিয়ে আসি।(আংকেল) — আচ্ছা, ঠিক আছে! নীলিমা মা! ভার্সিটি ছুটি দিলেই এসো কিন্তু… — ঠিক আছে, আসি! আসসালামু আলাইকুম।(নীলিমা) — ওয়ালাইকুম আসসালাম।(আন্টি) বইয়ের ব্যাগটা হাতে নিয়ে ধীর পায়ে সিড়ি বেয়ে নিচে নামে নীলিমা। আরো একটা বিশালাকার ব্যাগ কাঁধে নিয়ে নামে মন্তু আংকেল। রেখে আসে গাড়িতে। ছুটে এসে নীলিমা’র হাতের ব্যাগটাও নিয়ে যায়। গাড়িতে রাখে। ততক্ষণে নীলিমা সেখানে হাজির হয়। দোতলা’র জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকা আন্টি’র দিকে একবার তাকিয়ে আংকেলের দিকে ফিরে তাকায়। — আসি আংকেল। — ঠিক আছে। আর এটা রাখো। (১০০০টাকার নোট এগিয়ে দিয়ে) — আরে না! কি করছেন আংকেল! আমার টাকা লাগবে না। টাকা আছে! — তুমি না চিপস আর ঝালমুড়ি খুউব পছন্দ করো?! এটা তার’ই জন্য দিলাম। বিকেলে যখন ঝালমুড়ি ওয়ালা আসবে। তখন কিনে খেও। না চাইতেও টাকা’র নোট’টা হাতে ধরিয়ে দেয় মন্তু আংকেল। নীলিমা সালাম দিয়ে বিদায় নেয়। গাড়িয়ে গিয়ে বসে। ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দেয়। চেনা মানুষজন আর চেনা জায়গা রেখে নীলিমা যাচ্ছে অচেনা গন্তব্যে। আর তারই কল্পনা’য় কিছুক্ষণের জন্য বিভোড় হয়ে যায় নীলিমা। “মা জননী নামেন! আইয়্যা পরছি।” মধ্য বয়স্ক ড্রাইভারের ডাকে ঘোর কাটে নীলিমা’র! একপলক বাহিরে তাকিয়ে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয় ড্রাইভারের দিকে। জবাব দেয়, ‘জ্বী, আংকেল! নামছি…’ ব্যাগ হাতে নামতে যাচ্ছিল নীলিমা। পাশ থেকে ড্রাইভারের জবাব, ব্যাগ রাখেন মা! আপনি ভিতরে যান। এসব আমি নিয়া আইতাছি… হাসোজ্জ্বল মুখে নীলিমা’র জবাব, সমস্যা নেই আংকেল! আমি নিতে পারবো এটা। আপনি না হয় ঐ ব্যাগটা নেন। জবাব আসে, ঠিক আছে মা! নীলিমা বইয়ের ব্যাগ হাতে নেমে পরে। গেইট পেরিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। যতটা সহজ ভাবছিল আসলে ঠিক ততটা সহজ ছিল না কাজটা। বড্ড ভারী ছিল ব্যাগটা। দরজা অবধি পৌঁছতে নীলিমা রীতিমত হাফিয়ে গেছে। ততক্ষণে ড্রাইভার ব্যাগ নিয়ে ভেতরে ঢুকে গেছে। ‘যাই! এসেই তো পরেছি। আরেকটু…’ মনে মনে কথাটা বলে যেই না নীলিমা রুমের ভেতরের দিকে মোড় নিচ্ছিল ওমনি কারো সাথে ধাক্কা লাগে। নীলিমা হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল। ধরে ফেলে কেউ একজন। ‘ড্রাইভার আর দাড়োয়ান ছিল তো! আপনাকে এসব কে আনতে বলেছে?’ বন্ধ চোখ খুলে তাকায় নীলিমা! শুভ্র’কে দেখে চোখ দুটো গোল মার্বেলের মতো হয়ে যায় ও’র। বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছে শুভ্র’র দিকে। শুভ্র ছেড়ে দেয় নীলিমা’কে। পাশ দিয়ে চলে যাওয়া লোকটাকে ডাক দেয়। ‘চাচা! ব্যাগটা উপরে ওনার রুমে রেখে আসুন…’ জ্বী, বাবা! ব্যাগ হাতে বাড়ির কাজের লোকটা চলে যায় বিপরীত দিকে। ঘোর কাটে নীলিমা’র। আআআপনি প্রিন্সিপাল মেমের….(…)…??? পুরো কথা বলতে পারেনি নীলিমা। নিচে আসে স্বয়ং প্রিন্সিপাল মেম! “নীলিমা এসে গেছো?” — আসসালামু আলাইকুম মেম! — ওয়ালাইকুম আসসালাম। আসতে কোন অসুবিধে হয়নি তো?! — না, মেম! কোন অসুবিধে হয়নি। — আচ্ছা! ঠিক আছে। রুমে গিয়ে ফ্রেস হও। আর তুমি? তুমি দাঁড়িয়ে আছো যে? এই যে! কি বলছি কথা কি কানে যায় নি? — জ্বী, মেম! যাচ্ছি… নীলিমা’র দিকে তাকিয়ে মাথা চুলকাতে চুলকাতে সে স্থান পরিত্যাগ করে শুভ্র…. রাত্রে খাবার টেবিলে খাবার পরিবেশন করছিল কাজের মহিলাটি। চেয়ার টেনে পাশে এসে বসে প্রিন্সিপাল মেম। নীলিমা তখন উপরে দাঁড়িয়ে। মেম সেদিকে লক্ষ্য করে ডাক দেয় নীলিমা’কে। সে কি! দাঁড়িয়ে কেন তুমি? আসো… ভীরু পায়ে নিচে নেমে আসে নীলিমা। সামনের ঐ চেয়ার টেনে বসে। হাসোজ্জল মুখে মেম এর জবাব, ভয় পাচ্ছো? বোবা চাহনীতে মেম-এর দিকে তাকিয়ে নীলিমা। আবারো হাসোজ্জল মুখে মেম-এর জবাব, লজ্জা বলো আর ভয় বলো সবকিছুকে দুরে সরিয়ে রাখো। আমারো মেয়ে আছে। তোমার মতই। এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিবে। হোস্টেলে থেকে পড়াশুনা করছে। আর যেটা বলছিলাম! এটা তোমার নিজের বাড়ির মতই। যখন যা লাগবে নিঃসঙ্কোচে বলবে আমাকে। মনে থাকবে? নীলিমার ছোট্ট জবাব, ‘জ্বী, মেম!’ হাসিমুখে মেম-এর জবাব, ঠিক আছে! এবার খাওয়া শুরু করো… নীলিমা খাওয়া শুরু করতেই দ্রুতগতি’তে কোথা থেকে যেন ছুটে আসে শুভ্র। তারপর মেম এর পাশের চেয়ারটাই বসে। ইনি আবারো এখানে? তখন না মেম ডাকলো? তবে কি ওনিও এ বাসা’য়…(…)…??? কৌতূহলে নীলিমা কিছুক্ষণ শুভ্র’র দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর একসময় কৌতূহল মেটাতে খাবার খাওয়ার মাঝেই বলে ফেলে, মেম ওনি কি আমার মতই এ বাসায়…(….)…..??? পুরো কথা বলতে পারেনি নীলিমা। বিষম খায় শুভ্র। প্রিন্সিপাল মেম শুভ্র’র দিকে একগ্লাস পানি এগিয়ে দিয়ে নীলিমা’র দিকে ফিরে তাকায়। ‘ না নীলিমা! ও আমার ছেলে….!’ ‘ওহ, আচ্ছা ‘ বলে লজ্জানত মুখে নীলিমা ফিরে তাকায় শুভ্র’র দিকে। হুম! খাবারের সময় কথা বলতে হয় না। খাবার খাও এখন… দ্বিগুন লজ্জায় শুভ্র’র থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে নিজের মাথা নিচু করে তাকায় নীলিমা…

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here