ভুলের মাসুল

ভুলের মাসুল

লেখা- অনামিকা ইসলাম।

২০০০-এর নভেম্বরে সড়ক দুর্ঘটনায় শুভ্রকে হারায়। চার দেয়ালের মধ্যে নিজেকে বন্দি করে কাটিয়ে দেই জীবনের ১১টি বছর। মানসিক আহত হয়ে আমি যখন চার দেয়ালের মধ্যে হতাশায় ঘুরপাক খাচ্ছিলাম তখনই আপনজনদের পাশাপাশি সবচেয়ে কাছে এসেছিল প্রতিবেশী মিলন।
আঠারো বছর বয়সী মিলন ছেলেটি চমৎকার বাঁশি বাজাত। কন্ঠ ছিল সুমধুর। শুধু আমি নই, এলাকার পরিচিত সবাইকে মিলনের সৌজন্যবোধ মুগ্ধ করেছিল।
মিলন বোধ হয় আমার হতাশাগ্রস্থ জীবনে হৃদয়ের আকুলতা উপলব্ধি করতে পারছিল। সে সময়ে-অসময়ে বাঁশি বাজিয়ে, গান শুনিয়ে, তার শিল্পী সত্ত্বার বিভিন্ন অভিজ্ঞতা বিনিময় করে আমার যন্ত্রণা লাঘবে সচেষ্ট ছিল। তবে মাঝেমধ্যেই সে তার বাউল গোষ্ঠীর সঙ্গে পালাগানের উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে কিছুদিন কাটিয়ে আসত।

মিলন হঠাৎ পনেরো বছরের এক কিশোরীকে বিয়ে করে সবাইকে অবাক করে দিল। ফুলের মতো মেয়েটার মধ্যে গ্রামের সবুজ সরলতার মুগ্ধতা আমাকে কৌতূহলী করল। কিছু মুখ আছে, তাদের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে পার করে দেয়া যায় সারাটা জীবন।
রুপা ছিল ওরকমই এক মেয়ে। মিলন পালাগান করতে একাধিকবার মাদারীপুর জেলার প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে গিয়ে মেয়েটির হৃদয় জয় করেছিল। গানের টানে, হৃদয়ের অনুভবে মেয়েটি চালচুলোহীন অজ্ঞাত উঠতি বয়সী যুবকের হাত ধরে আপনজনদের ছেড়ে চলে এসেছিল। অপটিপক্ব মিলন দম্পতিকে দেখে আমার অবিবাহিত বত্রিশ বছরের জীবনে নানা আগ্রহ সৃষ্টি হচ্ছিল। ওদের টুনাটুনির সংসার দেখে কেবলই মনে হচ্ছিল, ভালোবাসা ব্যাপারটি আসলে কি? ভালোবাসা কি অশান্ত-অবিবেচক কান্ডজ্ঞানহীন দুরন্ত পাগলা ঘোড়া? জীবন মানে না, সংসারের প্রতি তোয়াক্কা করে না, ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা খুঁজে দেখে না। কি রহস্য লুকিয়ে আছে এতে? কিসের আশায় ব্যাকুল হয়ে দেহ-মন চলে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পানে?
সত্য বলতে কি, ওদের নিত্যদিনের খুনসুটি দেখে সংসার বৈরাগী আমিও ক্ষাণিকটা প্রভাবিত হয়েছিলাম।
নানা প্রতিবন্ধকতা, অর্থনৈথিক টানাপোড়নের মধ্য দিয়েও উচ্ছ্বলতার সঙ্গে বেশ চলছিল দুজনের জীবন।
ওদের সংসারে ছিল অফুরন্ত অবসর। তাই অবসর সময়ে মেয়েটি আমার মাকে নানা কাজে সহযোগীতা করত। সে তার কর্মগুনে মায়ের আদর-স্নেহ লাভ করেছিল।
রুপা ছিল অজপাড়া- গায়ের সাধারণ ঘরের অসাধারণ রূপসী। সময়ের ধারাবাহিকতায় রূপার মধ্যে ক্রমেই শহুরে চাতুর্য, কূটকৌশল স্পর্শ করতে শুরু করেছিল। তার মধ্যে ক্রমেই ভোগ-বিলাসীতার প্রতি দুর্বলতা বাড়তে থাকল। অথচ ঢাকায় আসার প্রথম দিকে তার চাহিদা ছিল সীমিত। কিছু চাহিদা আমার মা মেটাতে চেষ্টা করতেন। কিন্তু রুপার ইচ্ছা ও ইচ্ছা পূরণের সাধ আর সাধ্য, পরিকল্পনা আর বাস্তবায়নের ছিল বিস্তর ফারাক। সে ক্রমেই গন্ডির বাহিরে চলে যাচ্ছিল।
একদিন রুপাকে অভিমানের সঙ্গে ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুনলাম, তার একজোড়া সোনার কানের দুলের খুব শখ। কিন্তু মিলন আর্থিক সংকটের অজুহাতে কিনে দিচ্ছে না। অথচ পাশের বাসার জেসমিনের স্বামী কি সুন্দর চেইন তার স্ত্রীকে দিয়েছে।

আমি চিকিৎসার কারণে বিদেশে অবস্থানকালে রুপার ব্যাপারটি প্রায় ভুলে গিয়েছিলাম। দেশে ফিরে মিলন দম্পতির ছন্দপতনের কাহিনী শুনে বিস্মিত হলাম।
গান শেখার জন্য শহরের এক ধনীর দুলাল মাঝেমধ্যে ওদের বাসায় প্রাইভেট কার হাকিয়ে আসা যাওয়া করত। ছেলেটি ওদেরকে আর্থিকভাবে সাহায্যও করে আসছিল। রুপা ছেলেটির হাতছানিতে লোভের কাছে পরাজিত হয়ে তার হাত ধরে বাউলের সংসার ছেড়েছিল।
রুপা মিলনকে ছেড়ে যাবার পর তার সুতোয় টান পড়ল। সে লজ্জা, সংকোচ এবং আপনজনকে হারানোর ব্যথায় কাউকে কিছু না বলে এলাকা ছেড়ে চলে গিয়েছিল।

শুভ্রর মৃত্যুবার্ষিকীতে শহরের দুস্থ ও অসহায় মানুষদের হাতে সাধ্যানুযায়ী দানসামগ্রী দিয়ে ফিরছিলাম। হঠাৎ’ই এই এলাকার শিমুল বলে ছোট্ট ছেলেটা আমার শাঁড়ির আঁচল টেনে ধরে। মিষ্টি হেসে তাকে কোলে নিয়ে কাছেই ফাস্ট ফুডের দোকানে গেলাম। কারণ, ওর রোজকার আবদার একটা চিপসের জন্য এই ফাস্ট ফুডের দোকানাটাই যথেষ্ট। চিপস কিনার সময় খেয়াল করলাম, এক মহিলা খদ্দের আমাকে কিছু বলতে চাচ্ছিল। কিন্তু দ্বিধায় পড়ে বলছে না। পরে একজনের থেকে আমার থেকে নিশ্চিত হয়ে আমার মুখোমুখি হলো। ওই মহিলা খদ্দেরটি ছিল রুপা।
রুপার সেদিনের আচার- আচরণে আধুনিকতার সুস্পষ্ট ছাপ ধরা পড়ছিল। অনেকক্ষণ খেয়াল করেই তাকে আমার চিনতে হলো। গুছিয়ে বেশ শুদ্ধ ভাষায় রুপা আমার সঙ্গে সেদিন কথা বলল। তবে বেশভূষা- আভিজাত্যের খোলসে রুপার চোখে- মুখে বিষাদের ছায়া লক্ষ্য করছিলাম। সেদিন সে আমার কাছে তার যাপিত জীবনের কিছু নেতিবাচক চিত্র তুলে ধরেছিল। যা তার প্রকৃত জীবনের সঙ্গে, বিশ্বাসের সঙ্গে বেমানান মনে হচ্ছিল।
সে ভুল মানুষের ফাঁদে পড়েছিল। হাসিফ ওকে ঠকিয়েছে। ওকে রেখে বিদেশ চলে গেছে। সেখানে স্ত্রী এবং দুই ছেলে মেয়ে নিয়ে হাসিফের সুখের সংসার।
রুপাকে বাউলের আর্থিক দৈন্যের চেয়ে তার সহজ- সরল মন বেশী স্পর্শ করছিল। আজো রুপা অত্যন্ত সংগোপনে আমাদের এলাকায় এসে তার বাউলকে খুঁজে বেড়ায়।

# ভুলের মাসুল
লেখা- অনামিকা ইসলাম ” অন্তরা”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here