ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

“লেখা- অনামিকা ইসলাম।

টানা তিনঘন্টা মিটিং শেষে ক্লান্ত দেহটাকে ইজি চেয়ারে এলিয়ে দিয়েছিলাম। চোখে তন্দ্রা ভাব এসেছিল। এমন সময় পাশে রাখা মোবাইল ফোন বেজে উঠল। মায়ার মায়ের নাম্বার। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে জিজ্ঞেস করল, শুভ্র?
কন্ঠ শুনে হবু শাশুড়িকে চিনতে খুব বেশী বেগ পেতে হয়নি। বিণয়ের সহিত সালাম দিতে গিয়ে টের পেলাম, ওপাশে যেন কান্নার রুল পড়ে গেছে।
তন্দ্রা ভাবটা চোখ থেকে চলে গেল। চমকে উঠে জিজ্ঞেস করলাম, কি হয়েছে আন্টি?
মায়া হসপিটালে, বলেই কান্নায় ভেঙে পরলেন।
ঠিকানা নিয়ে ছুটে গেলাম সিটি হসপিটালে। আমাকে দেখেই কান্না করে দিলেন মায়ার মা।
আমার মেয়েটা বোধ হয় বাঁচবে না আর।
কিছু না বলে ছুটে গেলাম হসপিটালের কেবিনে, যেখানে নিথর হয়ে পরে আছে আমার মায়া। আমাকে দেখে কিছুটা নড়ে উঠল সে। ভেঁজা গলায় বলল, আমাকে ভুলে যেও শুভ্র। আমাদের বিয়েটা আর হওয়ার নয়।
মুখের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলাম। মায়ার পুরো মুখ ঝলসে গেছে। প্রিয়তমার এ অবস্থা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছিল।
হাঁটুগেড়ে বসে পরলাম ফ্লোরে।

অতীতে ফিরে গেলাম আমি।
২০০৬ সালে মায়ার সাথে আমার প্রথম পরিচয়। সে আমার এক আত্মীয়ের দুর সম্পর্কের আত্মীয়। পরিচয় থেকে শুরু থেকে ওর পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা। মিতভাষী মায়া সেসময় আমার সঙ্গে তেমন কথা বলত না। খুব সংক্ষেপে ওর সঙ্গে আমার মাঝে মধ্যে কথা হতো। সে ছিল তখন আমার দৃষ্টিসীমার বাইরে।
প্রথম দেখাতেই মায়াকে আমার ভালো লেগেছিল। দেখতাম ও বান্ধবীদের সঙ্গে হাসছে। মজা করছে। সাহস পেতাম না তার কাছে গিয়ে মনের কথা খুলে বলতে। ভয় হতো, যদি ফিরিয়ে দেয়। মনের কথা মনেই চেপে রাখতাম। কিন্তু হৃদয় তরীরে যে ঢেউ শুরু হয়েছিল, তা তো শান্ত হচ্ছিল না।
একদিন বীরপুরুষের মতো সাহস দেখিয়ে বললাম, তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে। তুমি কি কাল একটু সময় দেবে?
মায়া কিছু বলল না। তবে ওর চোখে-মুখে সম্মতির ভাব দেখলাম।

মিয়াবাড়ির ভেতরের রাস্তা দিয়ে আমি আর মায়া হাটছিলাম।
চোখে- মুখে দ্বিধা- দ্বন্দ্বের স্পষ্ট ছাপ। ভালোবাসি কথাটা বলতে গিয়েও থেমে গেলাম অজানা ভয়ে। মায়া নিরবতা ভেঙে বলল, কি যেন বলতে চেয়েছিলেন, বললেন না তো।
থাক, আরেক দিন বলব। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বললাম কথাটি।
পড়ন্ত বিকেলের আলোয় ওর মুখটি বিষণ্ন লাগছিল। কিছু সময় নিরব থেকে বলল, আমি যাই। আপনাকে আর বলতে হবে না।
ওর চোখে মুখে হতাশার চিত্র ফুটে উঠল।
ও আমার উল্টো দিকে হাঁটা শুরু করল। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। বুকটা শূন্য শূন্য লাগছিল। আমিও একপা দু’পা করে সামনে এগুতে লাগলাম। চিৎকার করে বলতে চাইলাম, মায়া, আমি তোমাকে ভালোবাসি।
কিন্তু মুখ থেকে কোনো শব্দই বের হলো না।
বাসায় এসে দরজা বন্ধ করে কাঁদলাম। যে করেই হোক, মায়াকে ভালোবাসার কথা জানাতে হবে। আবার সাহস সঞ্চয় করলাম।

পরদিন সকাল বেলা লাল গোলাপ হাতে হাজির হলাম মায়ার সম্মুখে। লাল গোলাপ ধরে রাখা ক্রমেই শ্লথ হয়ে আসছিল। আমাকে পাশ কাটিয়ে মায়া চলে যাচ্ছিলো সুদূরের শহরে। সুযোগ হারিয়ে ফেলার আশঙ্কায় দ্রুত পথ আগলে দাঁড়ালাম ওর। চমকে গিয়েছিল মায়া। কিন্তু অস্বাভাবিক হয়নি। মনে হলো এমন পরিস্থিতির জন্য ও প্রস্তুত ছিলে। লাল গোলাপের কলিটি মায়ার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে নির্দ্বিধায় বলেছিলাম সেদিন আই লাভ ইউ মায়া।
সেই মুহূর্তটা কেমন কেটেছিল, মন দিয়ে অনুভব করা ছাড়া লিখে বুঝানো সম্ভব নয়। কিছুক্ষণ কারো মুখেই কোনো কথা সরছিল না। মন্ত্রমুগ্ধের মতো একে অপরের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম। মনে হয় দুজনের বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। যা ছিল একান্ত নিরব ও গোপন। আর সেটা প্রমাণ করছিল সেই শীতের সকালেও মায়ার নাকে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘামের কণাগুলো। ডান হাত দিয়ে মায়া গোলাপটি নিয়েছিল।
মৃদু কন্ঠে বলেছিল, এত দেরি করলে কেন তুমি? তুমি কি জানো না আমিও যে তোমাকে নিয়েই কল্পনার প্রাসাদ গড়েছি? কিন্তু আমি নারী। আমি লজ্জার দেয়ালে আবদ্ধ। এ কারণে তোমাকে বলতে পারিনি। কিন্তু তুমিও কি আমার মনের কথাটি বুঝতে পারো নি? কেন এত দেরি করলে তুমি? জানো না, অপেক্ষা করা কত কষ্টের?
আমাদের প্রেমের শুরুটা এখান থেকেই। তারপর বিরামহীনভাবে চলছিল দুজনের মন দেয়া-নেয়া। হাসি-ঠাট্টা আর মান-অভিমানে ভরপুর আমাদের সে সম্পর্কটা ছিল অনেকের চোখেই ইর্ষার।
মায়া ছিল পরিবারের বড় মেয়ে। ওর বাবা ছোট বেলায় মারা গেছেন। অনেক কষ্টে লেখাপড়া শেষ করে ঢাকায় একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরী নিয়েছে মায়া।
সেই চাকুরীর টাকা দিয়েই মায়া ওর গরীব মায়ের চিকিৎসা এবং ছোট ভাই বোনদের লেখাপড়া করায়।
এদিকে বয়স তো আর থেমে থাকে না। এত বয়স হয়ে গেছে, এখনো অমুকের মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না ব্যাপারটা মায়ার অসুস্থ মায়ের কানে যায়। ওনি মেয়ের বিয়ের জন্য উঠে পরে লাগেন। ঠিক সেই মুহূর্তে আমি মায়ার বাসায় খালাতো বোনকে পাঠাই। ত্রিভুবনে আমার কেউ ছিল না বিধায়, খালাতো বোনের মাধ্যমে মায়ার বাসায় বিয়ের পয়গাম পাঠাই। মায়ার মা, খালারা রাজি হয়ে যায়। আসছে নভেম্বরের ১৩তারিখ বিয়ে। হাতে আছে আরো অনেক সময়।

সেদিন রাত্রে অফিস থেকে ফিরছিল মায়া।
হঠাৎ একটা আর্তনাদ শুনে থমকে দাঁড়ায় সে। হ্যাঁ, আর্তনাদ’ই তো। একটা কিশোরীর আর্তনাদ। গলির মোড়ে উঁকি দিতেই দেখে স্কুল ড্রেস পরোয়া একটি মেয়েকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে দু’যুবক। একজন কিশোরীর জামা ছিড়ছে, আরেকজন মুখ চেপে ধরে আছে। ঘৃণায় পুরো শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যায়। এগিয়ে গিয়ে একটা যুবককে থাপ্পর দেয় মায়া। কিশোরীকে ছেড়ে দিয়ে ওরা মায়ার দিকে তেড়ে আছে। জামা ধরে টানাটানি করতে থাকতে। দিগ্বিদিক শূন্য মায়া আচমকা একজন বখাটের তলপেটে লাথি মারে। ‘উহ্’ স্বরে আর্তনাদ করতে করতে ওরা চলে যায়। যাওয়ার আগে শাসিয়ে যায়-
” দেখে নিব তোকে….”
ঐ কিশোরীর থেকে ঠিকানা নিয়ে ঠিক জায়গায় পৌঁছে দিয়ে বাসায় ফিরে মায়া।
পরের দিন এসব ঘটনা শুনে আমি রীতিমতো উদ্ভিগ্ন হয়ে উঠি। আমার চিন্তা বেড়ে গেল। মায়াকে চোখে চোখে রাখতাম। আজ জরুরী একটা মিটিংয়ে আটকা পরে যাওয়ার কারনে ওকে বাসায় পৌঁছে দিতে পারিনি। কে জানতে আজকেই এমন একটা ঘটনা ঘটবে?
সেদিন রাতে মায়া অফিস থেকে বাসায় ফিরছিল। তখনই ঘটে যায় মায়ার জীবনে সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি। বাইকে চড়ে আসা ৪জন ছেলে মায়ার দিকে বোতল থেকে পানি জাতীয় কিছু ছুঁড়ে মারে। মুহূর্তেই ঝলসে যায় মায়ার একটা চোখ সহ পুরো মুখ। একটা আর্তনাদ দিয়ে লুটিয়ে পড়ে রাস্তায়। মায়ার আর্তনাদে মানুষজন ছুটে আসে। কিন্তু সেটা সাহায্য করতে নয়। ওরা মায়ার দিকে এগিয়ে না গিয়ে মায়ার ঝলসে যাওয়া মুখের ছবি তুলতে, ভিডিও করতে ব্যস্ত হয়ে পরে। এক বয়স্ক দয়ালু লোক সেই সময় উপস্থিত হয়। এম্বুলেন্সে খবর দিলে সে রাতেই ভর্তি করে হসপিটালে।
মাসখানেক পর মায়ার মুখের ব্যান্ডেজ খুলে দেয়া হয়। হাসপাতালে মায়ার পাশে বসলে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়। ক্ষাণিক ক্ষণ চুপ থাকার পর বলে, আমি তোমাকে বিয়ে করতে পারব না। আমায় ক্ষমা করে দাও। কথাটা বলেই চোখের জল ছেড়ে দেয় মায়া।
ওর মুখটা ঘুরিয়ে জানতে চাই, কেন মায়া?
যে মায়াকে দেখে তুমি আমায় ভালোবেসেছিলে, আমি আর সে মায়া নেই।
আমি শেষ হয়ে গেছি। আমি চাই না আমায় বিয়ে করে তোমার জীবনটাও শেষ হয়ে যাক। লোকে সারাজীবন তোমায় নিয়ে হাসাহাসি করবে। একটা সুন্দরী মেয়ে খুঁজে নিও, ভুলে যেও আমায়। কান্না লুকাতে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয় মায়া।
চোখ থেকে অজান্তেই জল গড়িয়ে পরছিল। বহু কষ্টে নিজেকে সংবরন করে মায়ার হাতটা মুঠোয় পুরে বলি, “তুমি আমার সেই আগের মায়ায় আছো। সেই আগের মতই সুন্দরী। ওরা তোমার মুখ বিকৃত করলেও হাসিটা বিকৃত করতে পারেনি। এই হাসি দেখেই প্রেমে পরেছিলাম কি না।”
দুঃখের মধ্যেও মায়া হেসে দিল।

এসিড ছুঁড়ে মারা ছেলেগুলো ৬বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দন্ডিত হয়েছিল। অপরাধের তুলনায় শাস্তি অনেকটা কম হলেও আমি প্রতিশোধের বদলে মায়ার জীবন বদলে দিতে চেয়েছিলাম নতুন আঙ্গিকে। মায়ার মতো হাজারো মেয়ে প্রতিদিন প্রতিহিংসার এসিডে দগ্ধ হচ্ছে, বর্বাদ করে দিচ্ছে গোটা জীবন। আমি মায়াকে সুখী করে তাদেরকে বুঝাতে চেয়েছিলাম যে, প্রতিশোধ নয়, ভালোবাসা’ই পারে সবকিছু বদলে দিতে।

মায়াকে বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। হাতে সময় আছে ২মাস। এই ২মাসে মায়া অনেকটা সুস্থ হলেও স্বাভাবিক হতে পারেনি। অনেকবার চেষ্টা করেছে আত্মহননের কিন্তু প্রতিবার’ই কেউ না কেউ টের পেয়ে পাওয়াতে সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়। বিয়ের ৭দিন বাকি ছিল। একে তো খালা খালু এ বিয়ে হবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে, তারউপর মায়ার এমন মানসিক অবস্থা। রিস্ক নিতে পারিনি। রিলেটিভদের অমতে গিয়ে খুব সাদামাটাভাবেই আমি আমার মায়াকে আমার বউ করে আনি।
বিয়ের ১বছর অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পরও আমি আমার মায়াকে গুমড়ে কাঁদতে দেখতাম। মাঝরাত্রিতে আমার মায়া ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠত, কখনো বা বালিশ মুখ লুকিয়ে গুমড়ে কাঁদত।
প্রতিটা রাত আমি ওকে বুকে নিয়ে ঘুমাতাম কিন্তু সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রায়’ই আমি আমার মায়াকে আমার পা জড়িয়ে পায়ের নিচে পরে থাকতে দেখতাম। আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসত, মাঝে মাঝে খুব করে কাঁদতে ইচ্ছে হতো, কিন্তু কাঁদতাম না। কারণ, আমি কাঁদলে কে দিবে আমার মায়াকে শান্তনা।

বিয়ের ৫বছর অতিবাহিত হয়ে গেল। মায়া পেরেছে ওর ভয়ংকর অতীত ভুলে সম্মুখে এগিয়ে যেতে। আমি কখনো বুঝতে দেইনি ও সবার থেকে আলাদা। আমাদের ভালোবাসা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। আমাদের একটা ৪বছরের ছোট্ট মেয়ে আছে। লাবণ্য……
ওকে ঘিরেই আমাদের যত স্বপ্ন।
পড়ন্ত বিকেলে ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে আমরা দুজন বের হয়ে যায়, পাশাপাশি আঙ্গুল ধরে হাঁটা, একসাথে বৃষ্টিতে ভেঁজা, জোৎস্না বিলাস সব, সব পেরেছি আমরা। সর্বোপরি ঐ বখাটেগুলোর চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দিতে পেরেছি, তোরা ব্যর্থ হয়ে গেলি। আমরা সুখে আছি, অনেক সুখে। হেরে গেলি তোরা, ভিষণ রকম ভাবে হেরে গেলি।

তবে লাবণ্য একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, আব্বু! আম্মু সবার থেকে আলাদা কেন? আমি আমার মেয়েকে কোলে নিয়ে বুকে জড়িয়ে শুধু এটুকু বললাম, “তোমার মা সবার থেকে আলাদা, কারণ সবার মত তোমার মা অন্যায় মুখ বোজে সহ্য করে নি। প্রতিবাদ করেছিল।”

# ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প
লেখা- অনামিকা ইসলাম “অন্তরা”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here