দহন

দহন
dohon

দহন

লেখা- অনামিকা ইসলাম।

সেদিন খালার জ্ঞান ফিরার পর আমাকে দেখে খুশি হলেন। মায়ার ছোট ভাই বোনরা বাসায় ছিল। ওরা ভয় পাবে। তাই মায়াকে নিয়ে বাসায় যেতে বলল।
একটা রিক্সা ভাড়া করে রওয়ানা দিলাম। দুজন রিক্সার পাশাপাশি বসে। মনে মনে খুব খুশি হলাম। কিন্তু কারো মুখে কোনো কথা ছিল না।
এভাবে চলল প্রায় ১০মিনিট। হঠাৎ রিক্সা ব্রেক করায় প্রচন্ড ঝাকুনি খেলাম। মায়া পরে যাচ্ছিল বলে ওকে জাপটে ধরলাম। হয়তো রিক্সা থেকে পড়েই যেত। হঠাৎ প্রশ্ন, আমাকে জড়িয়ে ধরলে কেন?
প্রশ্নটা ছিল অনেকটা আবেগপ্রবণ।
বান্ধবীরা তোমাকে নিয়ে অনেক কথা বলে। কিন্তু তুমি তো আমাকে পছন্দ করো না।
হাসলাম, মুখে কিছু বলার সাহস পেলাম না। মনে মনে বললাম, সেটা হয়তো ওরা জানে না। আমি তোমাকে কতটা পছন্দ করি সেটা ঐ বিধাতা জানেন। ইচ্ছে হচ্ছে তোমার হাত ছুঁয়ে বলতে। কিন্তু পারছি না। খুব ভয় করছে। যে বিশ্বাস করে তোমার ভাই মানে আমার বন্ধু আমাকে তোমাদের বাসায় তোমাকে, তোমার ভাইকে পড়ানোর দায়িত্ব দিয়েছে, সে বিশ্বাস আমি কি করে ভাঙি?
মা বাবার আদর কি জিনিস সেটা কখনো বুঝতাম’ই না যদি না তোমাদের বাসায় আসতাম। কি করে সেই মানুষগুলোর সাথে প্রতারণা করি? আমি যে বড্ড নিরুপায় মায়া।
মায়া অনর্গল বলতে শুরু করে, ভাইয়া!
আজকাল আমার যেন কি হয়েছে? খাওয়া দাওয়া করতে পারি না। শুধু তোমার স্বপ্ন দেখে দিন কাটছে। বললে না, কেন?
এবারো হাসলাম।
মনে মনে বললাম, বোকা মেয়ে! তুমি পারবে আমাকে তোমার মাঝে ধরে রাখতে?
ততক্ষণে মায়ার হাতদুটো আমার হাতের উপর এসে ভর করল। ওর চোখের দিকে তাকালাম। কেমন জল ছলছল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে। মনে হচ্ছে অশ্রু ভেঁজা চোখ দুটো বলছে, অবশ্যই পারব। হয়তো মরতেও পারি তোমার জন্য।

সেদিন বাসায় ফিরতে রাত ১টা বেজে গেল। বাসায় এসে কারো খাওয়া দাওয়া হলো না। প্রিয়তমা কাছে থাকলে এমনই হয় বুঝি? সে আমার বেড যত্ন করে গুছিয়ে দিল। আমার পাশে এসে বসল। জানিনা কেন যেন ইচ্ছে হচ্ছিল, জড়িয়ে ধরে ঠোঁটে একটা কিস করি। জড়িয়েও ধরেছিলাম। কিন্তু পরমুহূর্তে ছেড়ে দিলাম।
নিজেকে নিজেই শান্তনা দিলাম, এগুলো কি না করলে কি হয় না? সে তো আমার’ই আছে।
মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, তাই হবে। আমাদের ভালোবাসা হবে একদম পবিত্র, পরিচ্ছন্ন। দুজনে জ্বলে জ্বলে দগ্ধ হব কিন্তু এতটা কাছে আসব না।

এভাবেই আমাদের চোখে চোখে প্রণয় চলছিল। পূর্ণ হলো আমাদের ভালোবাসার ৪বছর। ক্লাস নাইনের সেই ছোট্ট মেয়েটি কলেজের গন্ডি পেরিয়ে ভার্সিটিতে ভর্তি হলো। আমি তখন ঢাকায় মাস্টার্স ফাইনাল ইয়ারে। দুর থেকে আমার উৎসাহ পেয়ে মায়া মন দিয়ে লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছিল।
পরীক্ষার মাত্র ১মাস বাকি। বন্ধুকে দেখার ছলে মায়াকে দেখতে এলাম। এসেই প্রচন্ড জ্বরে আক্রান্ত হলাম। সাত দিন জ্বর ছিল। তার যে কি টেনশন। পাশে বসে মাথায় পানি দেয়া। ঔষধ খাওয়ানো। সব দায়িত্ব যেন তার। একদিন দোকান থেকে রেজার কিনে এনে শেভ পর্যন্ত করে দিল। নেইল কাটার দিয়ে নখগুলো কেটে দিত। এ কাজগুলো সবার সামনে করত। কাউকে ভয় পেত না।
সাত দিন পর গরম পানি দিয়ে গোসল করিয়ে দিল। নিজের ওড়না দিয়ে আমার শরীর মুছে দিল। তার সেবায় খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠলাম। আমার অসুস্থতায় আমি যেন তার আরো কাছে চলে গেলাম। একেই হয়তো বলে ভালোবাসার গভীরতা।

সেবার মায়া অনেক কথা বলল। যেমন, আচ্ছা, তুমি আমাকে বউ করে নিচ্ছ না কেন? আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছে তোমার বউ হতে। ভাইয়া, তুমি আমাকে কষ্ট দিও না। ভুলে যেও না।
বার বার এই প্রলাপগুলো শুনছিলাম আর হাসছিলাম।
এর ছাড়া যে আমি আর কিছুই বলতে পারছিলাম না। কারণ, আমার যে হাত পা বাঁধা। বন্ধুত্বের কাছে আমি যে নতজানু। আমি জানি, ওরা কখনো আমার সাথে মায়াকে বিয়ে দিবে না। উল্টো বন্ধুত্বটাকেও চিরকালের জন্য হারাতে হবে।
যে হারে লোক লেগেছে মায়ার বিয়ের জন্য, এবার মনে হয় বিয়েটা হয়েই যাবে। যায় হোক চেষ্টা তো করতে পারি?
খালা মানে মায়ার মায়ের সাথে বিষয়টা শেয়ার করলাম। জানালাম, মায়াকে বিয়ে করতে চাই। যে ভয়ের জন্য আমি আমার পাগলীটাকে কখনো চার অক্ষরের একটি ছোট্ট শব্দ বলতে পারিনি, সেটাই হলো।
আমার দুর্বলতার খবর প্রকাশ হওয়ায় সবাই গর্জে উঠল। জনমের মত বন্ধুত্ব হারালাম। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। হৃদয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হলো।
মাস্টার্স পাস করে একটা চাকরির চেষ্টা করতে লাগলাম। তাহলে কিছু একটা করা যাবে।
চেষ্টা চলছিল অবিরাম। মায়াকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে এসেও অপেক্ষা করতে বলেছিলাম। কিন্তু কতদিন অপেক্ষা করতে হবে তা বলিনি।

ঢাকায় চলে আসলাম। আমি ঢাকায় আসার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ফার্স্ট ক্লাস অফিসারের সঙ্গে একরকম জোর করেই মায়াকে বিয়ে দেয়া হলো।
বিয়ের খবর শুনার পর অনেক কেঁদেছিলাম। ৫ওয়াক্ত নামাজ পড়তাম। পড়তে গেলেই কান্না আসত। কেন এমন হলো? হযরত শাহজালাল (রহঃ) মাজারে গিয়েও ২দিন কান্নাকাটি করেছিলাম।
কাঁদতে কাঁদতে অসুস্থ হয়ে গেলাম। খাওয়া দাওয়া কেনোকিছুই ভালো লাগত না। বাড়িতে চলে এলাম। কাকিমা মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। কাকিমার আদরে খুব কান্না পেল।
আমার স্বাভাবিক হতে প্রায় চার মাস চলে গেল। এর মধ্যে চাকরি পেলাম। পোস্টিং নিয়ে সিরাজগঞ্জ চলে এলাম। বিয়েটা আর করা হলো না। ভাবলাম, এভাবেই না হয় বাকি দিনগুলো কাটিয়ে দেব।

জানতে পারলাম, স্বামীর সঙ্গে মায়ার সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিল না। স্বামীকে সহ্য করতে পারছিল না। বিয়ের প্রথম রাতেই স্বামীকে বলেছিল, আমার সবকিছুর মালিক আমার জান। তুমি আমাকে স্পর্শ করবে না।
বেচারা মায়ার মন পাওয়া অনেক চেষ্টা করেছিল, কিন্তু কিছুই হলো না।
ওদের বিবাহিত জীবনের পাঁচ বছর পার হলো। কিন্তু কোনো বাচ্চা- কাচ্চা হয়নি।
একদিন ব্যাংকের বার্ষিক বনভোজনে কক্সবাজার বেড়াতে গেলাম। সেখানে গিয়ে হঠাৎ ওর দেখা পেলাম। ওরা বেড়াতে এসেছিল। আমাকে দেখে মায়া দৌঁড়ে কাছে এলো। এসেই জড়িয়ে ধরে বলল, তুমি কেমন আছ? আমি কিন্তু একদম ভালো নেই। তুমি আমাকে কেন তোমার কাছে নিয়ে যাও না?
মায়া, তা কি হয়?
কিছুক্ষণ পর তার স্বামী এলো। বলল, এই দেখো, কাকে নিয়ে এসেছি। আমার বাঁধন ভাই।
স্বামী বলল, শুধু ভাইয়া নয়, তোমার জান। তোমরা কথা বলো, আমি ওদিকে যাচ্ছি।
বাঁধন ভাইয়া, সবাই বলেছে তোমার মনে খুব কষ্ট দিয়েছি। আমার বিয়ের পর তুমি খুব কেঁদেছ। এই জন্য আমি অসুখী। তোমার অভিশাপ আমার জীবনে জড়িয়ে আছে। তোমার কান্নার জন্যই আমি অসুখী। সবাই বলে, এটা ভালোবাসার অভিশাপ।

আমার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর থেকে মায়া মানসিক রোগী। একদিন খবর এলো, হসপিটালে দেখতে যাওয়ার জন্য। কিন্তু আমি গেলাম না। কাছে গেলে হয়তো আরো জ্বালা বাড়ত। নতুবা দুটি প্রাণীকে আজীবন জ্বলতে উঠো। কিন্তু সুখ তো হলো না কারো।
ভালোবাসার অভিশাপে মায়ার ক্ষতিটা বেশী হলো।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here