একটি পানকৌড়ির গল্প ৮

0
135
একটি পানকৌড়ির গল্প......  ৮
একটি পানকৌড়ির গল্প......  ৮
একটি পানকৌড়ির গল্প…… ৮.
রাতের খাওয়াটা আজকে বেশ মজার হয়েছে। অনেক দিন পরে আফতাব হোসেন বেশ আরাম করে খেয়েছেন! মুগ ডালের স্বাদ অমায়িক হতে পারে তার জানা ছিলোনা। ঘরের খাবার খেতে খেতে জিহবাটাই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। রশীদ আলমের স্ত্রীর রান্না এতো ভালো কিন্তু তার স্ত্রীর রান্না দিন দিন খারাপ হচ্ছে। রাত ১০ টা বাজে একবারও রেহানা তাকে ফোন করেনি। অন্যদিন তো ৯ টা বাজার সাথে সাথেই ফোন করতে শুরু করে। যেন সে একজন অবুঝ শিশু! স্ত্রীর এরকম কাজ তিনি মোটেও পছন্দ করেননা। রাত ১০ টা বাজুক না ১২ টা বাজুক সে পুরুষ মানুষ বাহিরে থাকতেই পারেন। এতে এতো বিচলিত হবার কিছুই নেই। ফুটপাত দিয়ে হাঁটছিলেন আর ভাবছিলেন আফতাব হোসেন, আজকে বাড়ি না গেলে কেমন হয়? মেয়ে মানুষ দের একটু শিক্ষা দেয়ার প্রয়োজন আছে।
না, বাড়িতে যাওয়াই ভালো। একসময় এই স্ত্রীর জন্য তিনি পাগল ছিলেন। অনেকেই তাকে বউ পাগলা বলতেন। সেগুলো বিয়ের প্রথম প্রথমে রেহানা দেখতে অনেক আকর্ষণীয় ছিলো। এখন তো পেটে চর্বি জমেছে, গায়ের রঙটা নষ্ট হয়ে গেছে। চুলের অবস্থা তো খুবই বিশ্রী। এখন রেহানাকে তার ভালোই লাগেনা। আরেকটা বিয়ে করার চিন্তায় আছেন আফতাব হোসেন। যদি অল্পবয়সী কাউকে পেয়ে যান তাহলে রেহানাকে তালাক দিয়ে দিবেন। তালাক দেয়ার পর অবশ্য ওর যাওয়ার জায়গা নেই। না থাক, তার দেখার বিষয় না।
রেহানা রাত ৯ টা থেকে স্বামীর অপেক্ষা করছেন। আজ তার জন্মদিন, আফতাবের ভুলে যাওয়ার কথা না। ইচ্ছাকৃতভাবে আফতাব হোসেন দেরি করছেন। তাকে রাগানোর জন্য, কিন্তু সে রাগবে না। রেহানা শেষ কবে সেজেছিলো তার মনে পড়ছেনা। জন্মদিন উপলক্ষে সাজুগুজু করলেন। আফতাব হোসেন জাম রঙের একটা কাতান গিফট করেছিলেন বিয়ের দ্বিতীয় বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে। সেই জাম রঙের কাতান টাই পড়েছেন। ছেলেরা ঘুমিয়ে পড়েছে, ছেলেদের সামনে তার সাজতে লজ্জা লাগে।
অপেক্ষা করতে রেহানার খুব কষ্ট হচ্ছিলো।আফতাব মনে হয় ভুলে গেছে। আবার একটু পরেই ভাবছেন গতবারও মনে ছিলো, এবারও আছে। তার সাথে দুষ্টিমি করছে।
রেহানা কাঁদতে শুরু করলেন, এখন আফতাব আর তাকে আগের মতো ভালোবাসে না। কথাও বলতে চায়না, জোর করে কথা বলেন। ছেলেদের খোঁজও তেমন রাখেন না। রাত কতো হচ্ছে কিন্তু আফতাব আসছেনা। বাধ্য হয়ে রেহানা আফতাব হোসেন কে ফোন দিলেন। রিসিভ করে আফতাব হোসেন বললেন
– কী সমস্যা?
রেহানা কান্না অনেক কষ্টে থামিয়ে রেখেছিলেন। ডুকরে কেঁদে উঠলেন। আফতাব হোসেন চুপচাপ সেই কান্না শুনতে লাগলেন। তার ভেতরের সেই ভালোবাসাটা আবার জেগে উঠছে, যার উপর মরিচা ধরেছিলো। রেহানার কান্না মরিচা সরিয়ে ফেলছে। আফতাব হোসেন ফোন কেটে দিয়ে হোটেল রুম থেকে বের হয়ে ম্যানেজারের কাছে গেলেন।
ম্যানেজার বললেন
– কিছু লাগবে স্যার?
– আমি এখন চলে যাচ্ছি, রুমের চাবি রাখুন। আর টাকা তো আগেই দিয়েছি।
– কোনো সমস্যা হয়েছে আমাদের হোটেলে?
– না। আমার স্ত্রীর সাথে মান অভিমান টা বহুদিন পর ভাঙলো। আমি এখন বাসায় না গেলে ও খুব কষ্ট পাবে।
ম্যানেজার কী বলবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না।
আফতাব হোসেন রাস্তায় নেমে জোরে হাঁটতে শুরু করলেন। আশেপাশে কোনো বা কোথাও পেস্ট্রি শপ খোলা পেলে বেশ ভালো হতো। রাত তো অনেক হয়েছে এখন খোলা থাকার কথা না। রেহানার জন্মদিন টা এভাবে মাটি করে দেয়া যাবেনা। রেহানা খুব কষ্ট পাবে। এই মেয়ে তাকে খুব বেশি ভালোবাসে। আফতাব হোসেন নিজের চোখের কোণে ভিজে উঠেছে বুঝতে পেরেও হাত দিয়ে মুছলেন না। থাক, মানুষ দেখুক। এখন তার একটাই কাজ রেহানার জন্য কিছু একটা নিয়ে যাওয়া।
অঅল্পবয়সী, হুর-পরী, বিশ্বসুন্দরী যেই আসুক না কেন তিনি আর বিবাহ করবেন না। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন। রেহানা আধা পাগলী টাই থাকুক জীবনে! আর রেহানা খাঁটি ভালোবাসা দিয়ে তাকে মুড়িয়ে রাখুক শেষ নিশ্বাস অবদি।
রেহানা বসার ঘরে ঝিমুচ্ছেন আর কিছুক্ষণ পর পর ঘড়ির দিকে উদাসীন ভাবে তাকিয়ে সময় দেখছেন। এই মনে হচ্ছে আফতাব চলে আসবে কিন্তু না আসছেনা।
১১ টা ১৫ তে কলিং বেল টুং করে বেজে উঠলো! রেহানা প্রায় পাগলের মতো দরজা খুলে দিলো। আফতাব হোসেন স্মিত হেসে স্ত্রীকে বললেন
– My Dear পাগলা বউ, Happy birthday to you!
স্বামীর মুখে পুরোনো কথা শুনে আবারও কাঁদতে প্রস্তুত হচ্ছিলেন। আফতাব হোসেন বললেন
– কাঁদবেন না। আপনার জন্য কি এনেছি জানেন?
রেহানা ঘাড় নাড়িয়ে না বোঝালো। আফতাব হোসেন তার পিছনে লুকিয়ে রাখা পাখির খাঁচাটা বের করে স্ত্রীকে বললেন
– টিয়াপাখি এনেছি। সারাক্ষণ এ চিল্লাবে আর তুমি ভাববা আমি তোমাকে ভালোবাসি বলছি। বুঝতে পারছো?
– আস্তে বলো, ছেলেরা শুনবে তো।
– আগে আমাকে ঘরের মধ্যে ঢুকতে তো দিবা!
রাত ৩ টা রেহানার ছোট্ট বারান্দায় টিয়াপাখি টা তার খাঁচায় ঘুমানোর চেষ্টায় আছে। নতুন পরিবেশে সে ঠিক মানিয়ে নিতে পারছেনা। বারবার ভেতরের ঘর থেকে খিলখিল হাসির শব্দ আসছে। যাও একটু ঘুম আসছে তাও ওই মহিলার হাসিতে দফারফা হয়ে যাচ্ছে।
ফজরের আজান দিবে ঠিক তার আগে ফারিয়া আবারও সেই স্বপ্নটা দেখলো। ঠিক প্র‍থমদিন যেমন দেখেছিলো ঠিক তেমনই। কোনো পরিবর্তন আসেনা। ফারিয়ার ঘুম ভাঙলো ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে। পুরো শরীরে ব্যথা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। নাকের কাছের গন্ধটা গতকাল রাতেও তেমন ছিলোনা। ব্যথাটাও কম ছিলো। বেশ ভালো লাগছিলো ফারিয়ার। মায়ের টুকটাক কাজ করে দেয়াতে মা বেশ বিরক্ত হয়েছিলো। ফারিয়া বুঝতে পেরে বলেছিল
– আবারো তো অসুস্থ হয়ে যাবো। তখন তো আর পারবো না।
ডাক্তার লোকটার সাথে তার মায়ের খুব ইম্পরট্যান্ট কথা হয়েছে। তাকে শুনতে দেয়া হয়নি। মাকে জিজ্ঞেস করেও জানা সম্ভব হয়নি।
ফারিয়ার পেট গুলিয়ে বমি আসছে। অনেক কষ্টে বমি চাপিয়ে রেখেছে। স্বপ্নের ঘোর এখনো কাটেনি। এখনো ফারিয়ার মনে হচ্ছে তার মাথা ভারি গাড়ির চাক্কায় পিষে রাস্তার পিচের সাথে একদম মিশে গেছে! ভোর হচ্ছে, লোকজন আসছে তাকে মর্গে নেয়ার জন্য। না না, সে তো এক্সিডেন্টে মারা গেছে তাকে নিয়ে যাবে লাশ কাটা ঘরে। তারপর এই শরীর কে যাচ্ছেতাই ভাবে কাটা হবে। কী অসহ্য স্বপ্ন! ফারিয়ার ইচ্ছে করছে চিৎকার করে কাঁদতে! ভেতরের ফারিয়া প্রতিনিয়ত একটু একটু করে মারা যাচ্ছে। কেউই খেয়াল করছেনা। তার মাও বুঝতে পারছেনা। বুঝবেই বা কীভাবে ফারিয়া তো তাকে কিছুই জানতে দেয়নি।
আফতাব হোসেনের ঘুম ভাঙলো তার ছেলেদের ডাকে। চোখ মুছতে মুছতে মোবাইলে সময় দেখে প্রায় আঁতকে উঠলেন। ৯ টা বাজে কিন্তু এখনো তার ঘ ভাঙেনি কেনো? প্রতিদিন ঠিক ৬ টায় তার ঘুম ভেঙে যায়। তাহলে আজকে এমন কেনো হলো? রাতের কথা তার মনে পড়লো। রাত ৩ টা পর্যন্ত রেহানা আর সে গল্প করেছে। সে গল্প করেছে ব্যাপারটা ওরকম না। রেহানা গল্প করেছে আর সে আদর্শ লিসেনারের মতো শুনেছে। অন্যদিন রেহানার সাথে ২ মিনিট কথা বললেই মেজাজ খারাপ হয়ে যেতো। কিন্তু গতরাতে একটুও বিরক্ত আসেনি তার মধ্যে। বরং তার ইচ্ছা করছিলো রেহানা আরো গল্প করুক। গল্প গুলো যে খুব জরুরি কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে তা না। পাশের বাসার ভাবী শুকনা মরিচ ধার নিয়ে আর দেননি। চাল ধার নিয়েছিলো আগে তাও দেয়নি ফেরত। এবার কিছু চাইতে আসলে সে কিছুই দিবেনা।
মেয়ে জাত বড্ড অদ্ভুত। সামান্য ব্যাপার গুলোকে অসামান্য করে তুলতে এদের জুরি নেই। এসব বিষয় গুলো যে গল্প হতে পারে এটা নারী ছাড়া কারও বের করা সম্ভব না।
দেরি হওয়াতে মেজাজ খারাপ ছিলো কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন
– কী ব্যাপার বাপ জানেরা, আজকে আপনারা ডাকতে আসছেন?
ছোটো ছেলেটা চোখ বড় বড় করে বললো
– জানো বাবা, আম্মু আজকে খুব মজার খাবার রান্না করেছে। আর বলেছে আজকে সবাই সকালে একসাথে খাবো। তুমি তো উঠছো না আর এদিকে আমাদেরও খিদে পেয়েছে। উঠো না বাবা।
আফতাব হোসেন বললেন
– আচ্ছা আমি উঠছি। তোমাদের মাকে বলো খাবার টেবিলে দিতে।
ছেলেরা হুড়োহুড়ি করে ঘর থেকে বের হয়ে গেলো।
আফতাব হোসেন নিজের অজান্তেই হাসলেন। ছোটো ছেলেটা পুরো মায়ের ফটোকপি। মায়ের মতোই গল্প করতে পটু।
এতো সুন্দর সুখ থেকে তিনি নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। আহাম্মকের মতো কাজ করেছেন। এখন আর না।
চলবে……
© Maria Kabir

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here