সত্যিকারের ভালোবাসা

সত্যিকারের ভালোবাসা

লাইব্রেরিতে প্রয়োজনীয় কিছু বই কিনতে গিয়েছিল অন্তরা,সঙ্গে বান্ধবি মিতু। কিন্তু স্বস্তি পাচ্ছিলনা। অদূরে দাঁড়িয়ে এক জোড়া চোখ অপলক ভাবে যে তাকেই অনুসরণ করছে বেশ বুঝতে পারছে সে। অন্তরা আদর্শ রূপবতী বলতে যেমনটি বোঝায় ঠিক তেমন। গায়ের রং কাঁচা হলুদের মতই, উচ্চতা ৫ফিট ৩। কোমর ছাড়ানো চুলে ঢাকা পিঠ। অসম্ভব সুন্দর শারীরিক গড়ন যে কোন মেয়ের হিংসার কারণ। এমনকি তার হেঁটে চলার ধরণটাও দৃঢ় অথচ নমনীয়। এমন মেয়েকে কার না পছন্দ?!!!
কোনরকমে কাজ মিটিয়ে বাসায় ফিরে এলো দু’বান্ধবি।
পরদিন কলেজে যাওয়ার সময় বাস থেকে নেমে চোখ আটকে গেলো অন্তরার। হ্যাঁ, গত কালকের সেই ছেলেটাই তো দাঁড়িয়ে।
দেখে তো মনে হচ্ছে আমার দিকেই এগিয়ে আসছে। কিন্তু আমি যদি ওকে কিছু বলতেও যায় আর সেটা যদি ঐ জল্লাদ স্যারটার কানে যায় তাহলে কপালে নির্ঘাত শনি আছে।
না, না! এখানে এক মুহূর্তও দাঁড়ানো যাবে না। ছেলেটাকে কথা বলার কোনো সুযোগ না দিয়ে অন্তরা দৌঁড়ে সে স্থান ছেড়ে পালায়। কলেজ ছুটির পর বান্ধবি মিতুর অনুরোধে নাইনটি নাইনে গিয়েছিল অন্তরা।
দোকানের কাচের গ্লাসের দিকে চোখ যায় অন্তরার। মনে হচ্ছে সানগ্লাসের আড়ালে একজোড়া চোখ যেন ওর দিকেই মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। বান্ধবীকে একা রেখেই চটজলদি সে স্থান ত্যাগ করতে চাচ্ছিল অন্তরা, কিন্তু পারে নি।
ছেলেটি সামনে এসে দাঁড়ালো-
“একটি মাত্র কথা বলবো প্লিজ….”

অন্তরা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই বললো, ভালোবাসি…..
– এত সহজে? কতটা চেনেন আমাকে??? —–জবাব আসে, ঘুম হয়নি সারারাত।
– এটা জবাব হলো?
——অপছন্দের অধিকার আপনার আছে। তবে না করবেন না প্লিজ, যদি না অন্য কোথাও এনগেজড থাকেন। খুব ভালোবাসবো ,বললো বাঁধন।
কিন্তু অন্তরা চায়না প্রেম করতে। সৌন্দর্য দেখে তার ভালবাসা, সান্নিধ্য পেতে চায় হাজারো যুবক। এটা তার পছন্দ না, তাকে জেনে বুঝে কেউ ভালবাসুক সেটাই চায় সে।
ছেলেটার একটাই প্রশ্ন ছিলো, “আপনি কি কোথাও এনগেজড?”
জবাবে অন্তরা বিরক্তিভাব নিয়ে ‘না’ বলে চলে গেলো। কিন্তু ভেবে পেলনা, ছেলেটি তার কলেজ চিনলো কি করে?
পরদিন ভয়ে ভয়ে কলেজ গেলো, না সে আসেনি। খুশী হলো অন্তরা।
সন্ধ্যায় মা এলো দু’মগ কফি নিয়ে। কফিতে চুমুক দিতে দিতে একটি বায়োডাটা হাতে দিয়ে বললো, দেখতো ছেলেটা কেমন??? কথা বলা যাবে? তোর বাবার বেশ পছন্দ হয়েছে।
– পর করে দিতে চাও?
—– নারে পাগলী তুই তো নিজে পছন্দ করবিনা পণ করে বসে আছিস। তাই তো আমাদের ভাবতে হচ্ছে।
– আমাকে কেন বলছো মা? তোমরা যেটা ভালো বুঝবে। তবে পরীক্ষার আগে এ বিষয়ে কিছু ভেবো না। ছয় মাস পর ।
কথা এগুলো দুই পরিবারের মধ্যে। ছেলে ইঞ্জিনিয়ার ভাল জব করে, ফ্যামিলিও ভালো। যদি উভয় পক্ষের পছন্দ হয় তবে অন্তরার পরীক্ষার পর বিয়ে। এখন এনগেজমেন্ট করে রাখা হবে। দেখাদেখির দিন নির্ধারণ হলো। অন্তরা গোলাপী শাঁড়িতে হালকা সেজে সামনে এলো। কিন্তু একি?!
এ যে সেই ছেলে যাকে দেখেছিল সে বাসস্টপের সামনে কলেজ গেটে।
ছেলে মেয়েকে কথা বলবার সুযোগ করে দিয়ে অন্যরা পাশের ঘরে যেতেই অন্তরা বললো, আপনি???
—- হ্যাঁ, আমি বাঁধন। জানি প্রশ্ন করবেন , আমার কলেজ চিনলেন কি করে ???
ফলো করে। লাইব্রেরি থেকে বাসা, পরদিন বাসা থেকে কলেজ। সেখান থেকে বাসায় ফিরে মাকে বলা। এরপর সব ব্যবস্থা মা’ই করছেন।

সকলের সম্মতিতে বিয়ে ঠিক হলো,
পরের সপ্তাহে এনগেজমেন্টও হয়ে গেলো। শুরু হলো ফোনালাপ, মাঝে মাঝে কফিসপে দেখা। বাঁধন ভীষণ ভালো ছেলে, ভীষণ কেয়ার করে। অন্তরা খুশী হলো। বাঁধন তো হাতে চাঁদ পাওয়ার মত খুশী।
পরীক্ষা শেষ।
বিয়ের কেনাকাটা শুরু।
এলো হলুদ লগ্ন।
একদিন পর বিয়ে।
সন্ধ্যায় অন্তরার ফোন-
“মিতুদের বাসাতে একবার আসবে?”
অন্তরার গলাটা কাঁপছে কেন?
বাঁধন ধরে নিলো বিয়ের উত্তেজনাতে হয়তো। কিন্তু আজ দেখা কেন করতে চাইলো অন্তরা? বাঁধন ভাবে মনে হয়,
বিয়ের আগে শেষ বারের মত দেখা করতে । খুশী মনে অন্তরার প্রিয় চিপস ও একটা বেলির মালা নিয়ে বাঁধন হাজির হলো মিতুদের বাসায়। মিতু তাকে ছাদে নিয়ে গেলো, আঙুল ইশারা দিয়ে অন্তরাকে দেখিয়ে দিয়ে নীচে নেমে গেলো মিতু।
অন্তরা ছাদের গ্রিল ধরে বাঁধনের বিপরীতমুখী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। বাঁধন কাছে গিয়ে ঘাড়ে হাত দিয়ে বলে, লক্ষ্মী! বাঁধন অন্তরাকে লক্ষ্মী বলেই ডাকে। দু’হাত দিয়ে ধরে অন্তরাকে সামনে ফেরাতে ফেরাতে ভাবে আজ অন্তরাকে সে প্রথমবার ভালোবাসার উষ্ণ আদরে অধর ছুঁয়ে বুকে টেনে নিবে। ভাবতে গিয়ে প্রবল উত্তেজনায় কাঁপতে থাকে বাঁধন। মনে মনে ভাবে অন্তরা কিছু ভাববে নাতো? কিন্তু অন্তরা মুখ ফেরাতেই চমকে ওঠে বাঁধন।
একি???
অন্তরার পুরো মুখ কেটে ছিড়ে একাকার। মুখের এক দিকে ব্যান্ডেজ করা।
কি করে হলো?
অন্তরার শান্ত জবাব এক্সিডেন্ট…..
প্রায় বিশটার মত সেলাই লেগেছে।
বাঁধন শোকে যেন পাথর, চোখ জ্বালা করছে ওর। কখন হলো?
জবাব না দিয়ে অন্তরা বললো বিয়েটা ভেঙে দিন, যে অন্তরাকে আপনি পছন্দ করেছিলেন সে তো অন্যকেউ। আমার এ দাগ চিরদিনের। বাঁধন আঙুল দিয়ে অন্তরার ঠোঁট চেপে ধরে বলে, তুমি একথা বলতে পারোনা লক্ষ্মী। আমার কিছু হলে তুমি কি ছেড়ে যেতে বা যদি বিয়ের পর হতো??? বিয়ে হবে এবং তা কালই কথাটা বলেই অন্তরাকে দু’হাতে বুকে জড়িয়ে নেয় বাঁধন। অন্তরার তখন চোখে জল।
ইয়া বড় ঘোমটা পরে বিয়ের আসরে আসে বৌ বেশে অন্তরা। বিয়ের আচার অনুযায়ী আসে আয়নাতে মুখ দেখা পর্ব। মিতু বলে, দেখুন কে বেশী সুন্দরী? আমার বান্ধবী না চাঁদ? বাঁধন আয়নাতে তাকিয়ে পাগলের মত চিৎকার দিয়ে ওঠে,
এ আমি কি দেখছি? আমাকে…..(…..)…??আর বলতে দেয় না অন্তরা। আচলের নীচ দিয়ে বাঁধনের হাত চেপে ধরে ফিসফিসিয়ে বলে, যা বলার পরে বলো। সুসম্পন্ন হলো শুভ কাজ। পুণ্য চোখের জলে বিদায় নিলো অন্তরা। এলো বাসর লগ্ন।
— তুমি এমন কেন করলে???
এত পরীক্ষা নিতে হয়? আমার ভালবাসার উপর বিশ্বাস ছিল না বৌ?
আমি শুধুই দেখতে চেয়েছিলাম, আমার রূপকে না আমাকে ভালোবাসো তুমি? ক্ষমা করে দাও, তুমি জিতে গেছো।
মেকাপটা কেমন ছিল বলো তো???
বাঁধন বললো, নিখুঁত। কে সাজিয়েছিল?
মিতুদের ভাড়াটিয়া, টিভির মেকআপ আর্টিস্ট। হাসতে হাসতে বাঁধন বললো, তার তো এ্যওয়ার্ড পাওয়া উচিত।

অন্তরার মুখ এতক্ষণে বাঁধনের হাতের তালুতে বন্দী। অন্তরার কপাল ভিঁজে যাচ্ছে আনন্দ অশ্রুতে বাঁধনের অপলক চাহনির সামনে। অন্তরার কথা বলবার ক্ষমতা চুষে নিলো বাঁধন। অন্তরা এখন বাকরুদ্ধ ।।

লেখা- অনামিকা ইসলাম।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here