একটি পানকৌড়ির গল্প ৭

0
147
একটি পানকৌড়ির গল্প....  ৭

 

একটি পানকৌড়ির গল্প

৭.

রশীদ আলমের বাড়ি খুঁজতে গিয়ে আফতাব হোসেনের দারুণ হয়রানি হয়েছে! এই লোক তো তার চেয়েও কিপটে মনে হচ্ছে। এতো ভিতরে কেউ বাড়ি করে! সে অবশ্য নিজেও তো বেশ ভিতরে বাসা ভাড়া করে থাকেন। কিন্তু রশীদ আলম সাহেব তাকেও হার মানিয়েছেন বটে! তবে মধ্যবিত্তরা ইচ্ছাকৃত ভাবে কিপটে হয়না। হাজারটা কারণ থাকে। কলিং বেলে চাপ দিয়ে বুঝতে পারলেন, কলিং বেল নষ্ট বা নেই। সুইচ আছে, এতে বোঝা যায় পূর্বে কলিং বেল ছিলো। রশীদ আলম সাহেব সত্যিই আর্থিক সংকটে থাকেন।

দরজায় টোকা দিলেন। তিন চার বার দেয়ার পরে দাঁড়িয়ে রইলেন। ভিতরে মানুষ থাকে কোনো হেলিকপ্টার না, যে উড়ে উড়ে আসবে। নিজেকেই বোঝাতে লাগলেন। কেনো যেন সবকিছুতেই অস্থিরতা কাজ করছে তার৷ কারণ টা খুঁজে পাচ্ছেন না।

১০ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকার পরে আবার টোকা দিলেন।
বাড়ির লোকজন কি ঘুমায় নাকি? আজব ব্যাপার তো! একজন মানুষ আসবে সেটা তো খেয়াল রাখতে পারে।
আফতাব হোসেন চলে যাবেন ভেবে পা বাড়ালেন তখনই দরজা খুললেন রশীদ আলম সাহেব।
তিনি লজ্জিত হয়ে বললেন
– কিছু মনে করবেন না, দরজা খুলতে দেরি হয়ে গেলো।
আফতাব হোসেন বললেন
– আজকে সব বিষয়ে আমার অস্থিরতা লাগছে। তাই কিছু মনে করতে বাধ্য হচ্ছি। ভেতরে আসা যাবে কি?
রশীদ আলম সাহেব দরজা ছেড়ে দাঁড়িয়ে বললেন
– অবশ্যই। আপনার জন্যই তো অপেক্ষা করছি!
– তাই নাকি? অপেক্ষা করছিলেন তাই দরজা খুলতে এতো দেরি। আর অপেক্ষা না করলে কী হতো কে জানে!
– আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত।
– মেনে নিলাম।ফারিয়াকে ডেকে আনুন আর তার মাকেও।
রশীদ আলম ভেতরের ঘরে চলে গেলেন। গেলেন তো গেলেনই আর খোঁজ নেই।
আফতাব হোসেন নিজেকেই গালি দিলেন। তার আসা যে ঠিক হয়নি বুঝতে পারছেন।
না এসেও উপায় ছিলো না। এইটুকুন একটা মেয়েকে এভাবে ফেলা যায়না।
প্রায় ১০ মিনিট পরে রশীদ আলম চা, বিস্কুট, চানাচুর নিয়ে এলেন। পিছনে গুটি গুটি পায়ে ফারিয়া এসে বাবার গা ঘেঁষে দাঁড়ালো।
আফতাব হোসেন বললেন
– এসবের প্রয়োজন ছিলো না। বেশি করে ফেলছেন।
– আপাতত নাস্তা করেন। রাতে খেয়ে যাবেন। ফারিয়ার আবদার!
ফারিয়া নিচু স্বরে বলল
– আপনি না খেয়ে যাবেন না।
বাসার ভেতর থেকে বৃদ্ধা নারী চেঁচিয়ে বললেন
– ঔ মাইয়ার কথায় মন গলতে দিয়েন না ডাক্তার সাহেব। ওর ঘাড়ে জ্বীন আছে জ্বীন। গঞ্জু ফকীর রে দেখাইছিলাম হে কইছে ঘাড়ে জ্বীনের মন্ত্রী বসেছেন। এই মেয়েকে ছাড়বেনা। আপনি ডাক্তার মানুষ আপনি জ্বীন-ভূত ছাড়াবেন ক্যামনে বলেন?
রশীদ আলম লজ্জায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারছেন না। তার মা যে এসব বাজে কথা বলে বসবেন বুঝতে পারেননি।
রশীদ আলম আমতা আমতা করে বললেন
– ওসব কথায় কান দিবেন না। মা তো বয়স হয়েছে তাই আরকি…..
বৃদ্ধা চেঁচামেচি শুরু করে দিলেন। আফতাব হোসেন একটি কথাও বুঝতে পারছেন না। এক নাগাড়ে বিরতিহীনভাবে কথা বললে, সেই কথার আগাগোড়া বোঝা মুশকিল। আফতাব হোসেন ব্যাপারটাকে অগ্রাহ্য করে চায়ের কাপে চুমুক দিলেন।
– আপনার নাকে চিল্লাতে দিন। একাই থেমে যাবে। আর আমাকে নিয়ে ভাববেন না। আমি আপনাদের পারিবারিক বিষয় টাকে অগ্রাহ্য করতে পারবো।
রশীদ আলম নীরবে কোনো প্রতিউত্তর না দিয়েই বসার ঘর ছেড়ে রান্নাঘরের দিকে গেলেন।
ফারিয়া, আফতাব হোসেনের সামনে চেয়ার নিয়ে বসলো।
– চা খাবে মামনী?
ফারিয়া মাথা নেড়ে অসম্মতি জানালো।
– আজকে মনে হচ্ছে বেশ সুস্থ আছো?
– জি, আজকে গন্ধটা নাকে কম আসছে। ব্যথাও কিছুটা কমেছে।
আফতাব হোসেনের মনে হলো মেয়েটি পুরোপুরি সুস্থ না। ভান করছে সুস্থ হওয়ার। যেমনটা মধ্যবিত্তরা সুখী হওয়ার ভান করে। মেয়েটার চোখ তীব্র কষ্ট ধরে আছে। গলার স্বরটাও সুস্থ দের মতো না। মেয়েটি এখন তাকে মিথ্যা বলেছে।
– স্বপ্নটা আবার বলোতো।
– অন্যদিন বলি? আজকে আমার কিছুটা সুস্থ লাগছে।
– তুমি মোটেও সুস্থ না। তোমার চোখ আর গলার স্বর প্রমাণ করে তুমি অসুস্থ। গন্ধটা কম লাগছে বিধায় নিজেকে সুস্থ মনে হচ্ছে।
– সুস্থ তো হতে পারছিনা।
– স্বপ্নটা আজ বলবা না বুঝলাম তবে আগামীকাল বলতেই হবে। আমি তোমার বাবাকে ফোন করবো তখন বলতে হবে।
– আচ্ছা।
– কিছু প্রশ্ন করবো সঠিক উত্তর দিবে। মিথ্যা হলে আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারবোনা।
– আমি যদি মিথ্যা বলি আপনি ধরতে পারবেন?
– মামনী, একটু আগেও তো ধরলাম!
ফারিয়া খিলখিল করে হাসতে শুরু করলো।
ভেতরের ঘরে বসে রশীদ আলমের মা ফারিয়ার এরকম হাসি শুনে বেশ বিরক্ত হলেন। কিছু বলতে চাচ্ছিলেন কিন্তু বললেন না। কারণ ডাক্তার তাকে একেবারেই পাত্তা দেননি।
– তোমার স্কুলে যেতে ইচ্ছা করেনা?
– করে।
– খেলতে?
– করে। আমাদের বাড়ির উত্তর পাশে একটা মাঠ আছে। এই এলাকার সবাই ওখানেই খেলে।
– তোমার বন্ধু বান্ধবী নেই? তোমাকে দেখতে আসেনা?
– স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেবার পরে ওরা আসতো। কিন্তু দাদী তাদের কে আসতে নিষেধ করেছেন। আমার ঘাড়ে নাকি জ্বীন  আছে। সেই জ্বীন ওদের ক্ষতি করবে।
– তুমি এইসব কথা বিশ্বাস করো?
– না, মোটেও না। আমার দাদী আমাকে পছন্দ করেন না।
বিস্কুটের বাটি এগিয়ে দিয়ে আফতাব হোসেন বললেন
– নাও, বিস্কুটা খাও। একা একা খেতে নিজেকে ছোঁচা মনে হয়।
লিমা দেশি মুরগীর ঝোলের লবণ স্বাদমতো হয়েছে কিনা দেখছিলেন। স্বামীকে লজ্জিত অবস্থায় রান্নাঘরে আসতে দেখে খুব একটা অবাক হলেন না। লিমা জানতেন তার শ্বাশুড়ি আম্মা আজকে বড় কিছু ঘটনা ঘটাবেন। বড় কিছুর তুলনায় এই ঘটনাটি খুব ছোট্ট। স্বামীকে বললেন
– শুকুর করুন যে অল্পের উপর দিয়েই গেছে। এর চেয়ে বাজে কিছু ঘটতে পারতো।
– রান্না হয়েছে?
– প্রায়ই শেষ। কেনো?
– ডাক্তার সাহেব তোমার সাথে কথা বলবেন।
– আমার সাথে আবার কীসের কথা!
– তোমার মেয়ের সম্পর্কেই জানতে চাইবে।
লিমা গুছিয়ে নিচ্ছে কী কী বলবে। আর কীভাবে কথা বলবে। একজন ডাক্তারের সাথে কথা বলবে সে। ভদ্রতা বজায় রাখতে হবে।
ডাক্তার সাহেবের সামনে লিমা একা বসে আছেন। ডাক্তার সাহেব তাকে ২০ মিনিট যাবত বসিয়ে রেখেছেন কিন্তু একটা প্রশ্ন পর্যন্ত করেননি। সে আগ বাড়িয়ে কিছু বলতেও পারছেন না।
আফতাব হোসেন লিমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন
– আমি দুঃখিত আপনাকে এভাবে বসিয়ে রাখার জন্য।
লিমা বললেন
– সমস্যা নেই।
– কী যে বলেন গৃহিণী দের আবার সমস্যা নেই। ৫ মিনিটও আপনাদের বসে থাকার উপায় নাই। সেখানে ২০ মিনিট, যাইহোক।আসল কথায় আসি।
– ফারিয়া তো আপনার সৎ মেয়ে, তাই না?
প্রশ্নটা করে আফতাব হোসেন লিমার দিকে তাকালেন। কষ্টের ছায়া পুরো চোখ মুখ জুড়ে খেলা করছে। মনে হচ্ছে একটু পরেই কেঁদে ফেলবে। ঠিক তাই হলো, চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি পড়তে শুরু হলো।
আফতাব হোসেন বললেন
– প্রথম যেদিন স্বপ্ন দেখেছিলো সেদিনের ঘটনা মানে স্বপ্ন দেখার আগে বা পরে কী কী করেছিলো ফারিয়া একটু বলবেন? আপনি তো ওর মা আপনি ভালো জানবেন।
চোখের পানি না মুছেই লিমা বলতে শুরু করলেন
– স্বাভাবিক কাজই তো করেছে। স্কুলে গিয়েছিল। তারপর এসে খেয়ে ঘুমালো। ঘুম থেকে উঠে গোসল করে পড়তে বসলো। বিকালে খেলতে গেলো। প্রতিদিনের মতো সন্ধ্যায় ফিরে আসলো। সন্ধ্যায় নাস্তা করে আবার পড়তে বসলো। তারপর রাতে খেয়ে ঘুম। কিন্তু ভোরের দিকে ওর বিকট চিৎকারে আমার ঘুম ভেঙে। প্রায় দৌঁড়ে আমি ওর ঘরে গেলাম। ফারিয়া ওর বিছানার উপর বসে ভয়ে কাঁপ ছিলো। আমি ওকে জড়িয়ে ধরলাম। ও চিৎকার দিয়ে বললো
– মা ব্যথা লাগে। মা পুরো শরীরে আমার ব্যথা।
আমার মেয়েটার কথা কেউ বিশ্বাস করলো না। সবাই ওকে মিথ্যাবাদী বলতে শুরু করলো। কিন্তু আস্তে আস্তে যখন অবস্থা খুব খারাপ হতে লাগলো তখন ওর বাবা বিশ্বাস করতে শুরু করলেন।
লিমা চুপ করে গেলেন।
আফতাব হোসেন কিছুক্ষণ ভেবে বললেন
– স্কুলে খারাপ কিছু হয়েছিল?
– না। ও আমাকে সবকিছু শেয়ার করতো। ভালো লাগা, খারাপ লাগা সব। স্কুলে কিছু হলে অবশ্যই আমাকে বলতো।
– বাসায় কিছু বা খেলতে গিয়ে?
– নাহ।
– আপনি ওকে জিজ্ঞেস করবেন অস্বাভাবিক কিছু ঘটেছে কিনা ওর সাথে। আমার জানা টা খুব দরকার। আচ্ছা ওর দাদীর কাছে গল্পটল্প শুনতো বা আপনার কাছে না কারো কাছে?
– ও ছোটো বেলা থেকেই দাদীর কাছ থেকে দূরে থাকতো। আসলেই আমিই দূরে রাখতাম। ওর দাদী ওকে ঠিক পছন্দ করেন না। আমি গল্প বলতাম।
– কীরকম গল্প? ভূতের?
– নাহ, রাজা রাণীর গল্প বা টোনাটুনির গল্প এসব। আমার বাবা নিষেধ করে দিয়েছিলেন বাচ্চাদের যেন ভূতের গল্প না শোনাই।
– কোনোদিন ওর মাঝে অস্বাভাবিক কিছু দেখেছেন বা অস্বাভাবিক কিছু করেছে?
– না।
– আমার ধারণা আপনি ওর সবচেয়ে কাছের, খুব কাছের। আপনাকে আমি ২ দিন সময় দিলাম, খুঁজে বের করুন পূর্ব স্মৃতি থেকে।
আমি আজ উঠি।
– না না খেয়ে যাবেন। যাই রান্না করেছি তাই খেয়ে যাবেন।
চলবে……..!
© Maria Kabir

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here