প্রেমের_পরশ পার্ট_28

প্রেমের_পরশ
পার্ট_28
জামিয়া_পারভীন

সাগর নিরুর হাতে একটা ডায়েরি দেয়। কালো মলাটে বাধানো একটা ডায়েরি। নিরু কে ডায়েরি টা দিয়ে বলে,
__ “ এতে যা লিখা আছে সেটা শুধু পড়বে, এরপর যা মনে হবে আগে আমার সাথে শেয়ার করবে। তারপর তোমার ডিশিসন নিবে। এখন নিজের ঘরে যাও। ”

নিরু চুপচাপ কথা গুলো শুনে নিজের ঘরে চলে আসে। ডায়েরি টা খোলে নিরু, প্রথম পেজে লিখা আছে,

__ “ আমার কৈশোর শুরু ই হয় অন্ধকার দিয়ে, তাই কালো মলাটেই বেঁধে দিলাম ডায়েরি টা। ”

নিরু হোস্টেলে বা এতিমখানা তে থাকার জন্য কিছুই জানতে পারেনি। লিখাটা পড়ে বেশ হতাশ হয়ে মনে মনে বলে, “ কি এমন হয়েছিলো আপুর! এসব কি চিন্তা করছি! ডায়েরি টা পড়েই জেনে নিই। ”

পরের পেজ উল্টায় নিরু, সেখানে লিখা আছে,
“ ছোট বেলা থেকেই আমার একমাত্র খেলার সাথী ছিলো রাকিব, সব সময় দুজনে মিলে দুষ্টুমি তে মাতিয়ে রাখতাম পুরো বাড়ি। তখন কেবল ১৫ তে পা দিয়েছি, আর রাকিব এর ২০। একদিন রাকিব এসে বলে, সে নাকি আমার ভালোবেসে ফেলেছে। আমি বলি, ভালোবাসা আবার কি জিনিস!। এরপর একেক দিন একেক রকম করে বুঝাতো। একদিন একটা গোলাপ দেয়, আমি নিয়ে নিই। তখন সে বলে, অবশেষে আমার প্রপোজাল গ্রহণ করলে। আমি তখন ও বুঝিনি, এসবের মানে কি? তারপরও বেশ ভালোই কথা বলতাম ওর সাথে। জানিনা এটা প্রেম কিনা ওর সাথে রাগ করে থাকতে পারতাম না। সে যেনো আমার নেশার মতো হয়ে গিয়েছিলো। আম্মু ওকে খুব একটা পছন্দ করতো না, কেনো জানিনা। ”

নিরু খুব অবাক হয়ে যায়, পরের পেজে আবার লিখা আছে,

“ একদিন সন্ধ্যেবেলা টিভি দেখছিলাম পাশাপাশি বসে, মাঝে কিছুটা গ্যাপ ছিলো। আমার সিরিয়াল খুব ভালো লাগতো, সিরিয়ালে একটা সিন এ নায়ক হটাৎ করে নায়িকা কে কিস করে। এই সিন দেখে আমার যেনো একটু লজ্জা লাগে। পরে রাকিব হটাৎ করে আমার ঠোঁট যুগল তার আয়ত্ত্বে হয়ে নেয়। আমি প্রথমে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও পরে আর করিনি। অসম্ভব ভালোলাগা কাজ করছিলো আমার ভিতর। ”

ডায়েরি তে এমন কিছু লিখা থাকবে নিরু সত্যিই আশা করে নি। নিরুর দুই চোখ দিয়ে পানি পড়ছে । তাও পরে পেজ উল্টায় নিরু,

“ একই বাসায় থাকতাম বিধায় ওর সাথে প্রায়ই দেখা হতো, সে যখনই সুযোগ পেতো আমার শরীর স্পর্শ করতো। ধীরে ধীরে সে আমার কাছে অনেক কিছু চাইতে থাকে ।আমি তাকে দিতে নারাজ হই। আমি বুঝে গিয়েছিলাম সে আমার শরীর টা কেই চায় শুধু। সেদিন থেকে একটু দুরত্ব বজায় রেখে চলতাম। সে হয়তো বুঝে গিয়েছিলো আমি তাকে এভয়েড করছি। একদিন আমি আমার রুমে বসে ছিলাম, এস এস সি সামনে। খুব পড়াশোনা ছিলো। পড়ার মাঝে ব্রেক নিচ্ছিলাম। দরজায় নক করে কেও, বাসায় সবাই আছে তাই খুলে দিই৷ দরজা খুলেই রাকিব কে দেখে বলি, সে যেনো চলে যায়। কিন্তু না সে আমাকে জোর করে ভিতরে ঢুকিয়ে দেয়। দরজা লাগিয়ে দেয়! এরপর বলে, তোমাকে একটা জিনিস দেখিয়েই আমি চলে যাবো। আমি ওর সাথে আর ঝামেলা না করে ওর কাছে যা দেখাতে চাচ্ছে তা দেখতে চাই। ও ওর ল্যাপটপ অন করে, একটা ভিডিও প্লে করে। সেখানে আমার নগ্ন দেহ দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি। চিৎকার করতে গেলে সে আমার মুখ চেপে ধরে। এরপর বলে, যদি চিল্লাই তাহলে এগুলো ছবি সবাইকে দেখিয়ে দিবে। এরপর বলে, আমি যখন স্কুলে গিয়েছিলাম তখন সে আমার ওয়াশরুমে আর রুমে গোপন ক্যামেরা সেট করে এইসব ভিডিও করেছে। ওর গালে একটা চড় বসিয়ে দিই। ”

নিরুর চোখের পানি তে ডায়েরি অনেকটা ভিজে গেছে, কোনরকম চোখের পানি মুছে ফেলে।
পরের পেজে যায়,

__ “ রাকিব আমায় বলে, যদি চিললাই বা কাউকে বলি তাহলে এই সব ভিডিও ওর ফ্রেন্ড ফাঁস করে দিবে। এরপর আমি কুকড়িয়ে যায় ভয়ে, সে আমার সাথে ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করে। আমার জীবনের সব চেয়ে অন্ধকার ময় রাত ছিলো সেদিন। ওর অত্যাচার এ আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। এরপর থেকে প্রায়ই প্রতিদিন রাতে আমার উপর তার চাহিদা পূরন করতো । ২ মাস এভাবে চলার পর আমি প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে পড়ি। আমি এই যন্ত্রনা থেকে না পারছিলাম বাঁচতে না পারছিলাম মরতে। আমার অসুস্থতা নিয়ে আম্মু ডক্টর এর কাছে নিয়ে যায় ।অনেক গুলো পরীক্ষায় জানতে পারে আমি প্রেগন্যান্ট। সেদিন আম্মু আমায় অনেক মারে। আমার কাছে জানতেও চায়নি কি হয়েছিলো। ”

নিরু মনে মনে বলে, “এতো অন্যায় হয়েছে তোমার সাথে আপু। এই সব কিছুর বদলা আমি নিবো। ”
ডায়েরির কয়েক পেজ ফাঁকা, এরপর আবার লিখা,

“ আমি মার খেয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিলাম, পরে আম্মু আমায় জড়িয়ে ধরে কাঁদে অনেক। আমি রেপ এর কথা বলতে পারলেও রাকিবের ভয়ে ওর নাম নিতে পারিনি। পরের দিন সুযোগ পেয়ে রাকিবের কাছে ওর সন্তানের স্বীকৃতি চাই, তখন সে বলে, এই সন্তান তার হতেই পারেনা। আমি বাজে মেয়ে তাই এই সন্তান এসেছে। এই দুই মাসে কম পক্ষে ২০ টা ভিডিও সে করেছে, সব গুলো সব আত্মীয় স্বজনের কাছে পাঠিয়ে দেওয়ার ভয় দেখায়। আমি চুপসে যায়, খুব ইচ্ছে করছিলো আত্মহত্যা করতে। আম্মু এসে বাঁচিয়ে দেয়। একটা হসপিটাল এ নিয়ে যায়, শহরের বাইরের হসপিটাল। কারণ শহরের ভিতর আমাদের পরিচিতি আছে অনেক। এবোরশন করানোর সময় ডক্টর ভুল করে ফেলে। খোঁচা লাগে ইউটেরাস ওয়ালে । প্রচুর ব্লিডিং শুরু হয়, তখন আম্মুর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে ডক্টর আমার ইউটেরাস কেটে ফেলে। পরে ঘটনা আব্বু ও জেনে যায়। আমি পুরোপুরি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলি। দীর্ঘ ৬ মাস চিকিৎসার পর আমি সুস্থ হই। এরপর এক বছর ইয়ার লস দিয়ে এস এস সি দিই। আম্মুর অনুপ্রেরণা তে আমি আবারও হয়তো আরো সুস্থ হয়েছিলাম কিন্তু ইউটেরাস কেটে ফেলার ঘটনা জানতে পারিনি। ”

বোনের জীবনে এতো ঘটনা দেখে নিরু হতবাক হয়ে গেছে এক প্রকার, ডায়েরি অফ করে দিয়ে সাগরের ঘরে ছুটে আসে। মেঝেতে বসে পড়ে,

“ ভাইয়া,,,,,,,,” বলে সাউন্ড করে কাঁদতে শুরু করে। সাগর বলে নিরু কে,

__ “ তুমি প্লিজ শান্ত হও, ডায়েরি তে কতো টুকু পড়েছো আমি জানিনা, কিন্তু এখন তুমি বেশি কান্নাকাটি করলে নতুন অতিথি এর ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। ”

নিরু নিজেকে শান্ত করে প্রথমে, এরপর বলে,

__ “ তাহলে আপনি ওই খুনী কে শাস্তি দিবেন কথা দিন, তাহলেই শান্ত হতে পারবো আমি। ”

__ “ হুমম দিবো শাস্তি, ওর ঘটনা আমি কিছুদিন আগেই জেনেছি। কিন্তু কিছু করার আগেই মেয়েটা অভিমান করে আমায় ছেড়ে চলে গেল। আর চুপ করে থাকতে পারিনা আমি। সব কিছুর শাস্তি পাবে তোমার ফুপু আর তার ছেলে। ”

__ “ মানে, ফুপিও এর সাথে জড়িত! ”

__ “ হুমম”

এরপর সাগর বলে,

__ “ রুবি কে আমি কলেজে প্রথম দেখি, আমি ইন্টার সেকেন্ড ইয়ার আর সে ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়। খুব সুন্দরী, মায়াবতী ছিলো। কিন্তু সব সময় বিষন্ন থাকতো। এই বিষন্নতার কারণ জানার আগ্রহ আমার মাঝে চেপে বসেছিলো। সাহস পাইনি কিছু বলার, প্রতিদিন ওকে দেখার জন্যই শুধুমাত্র কলেজে যেতাম। এভাবে একটা বছর পেরিয়ে যায়, আমি এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে অই কলেজে অনার্স ভর্তি হয়ে যায় শুধুমাত্র রুবির টানে। লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতাম আর বাসায় এসে ওকে কল্পনা করে সুখের রাজ্যে ভাসতাম। একদিন কলেজে রুবি আমার সামনে এসে দাঁড়ায়,

এরপর বলে,

“ আপনি যা করছেন সেটা ভুলেও আর করবেন না, আমি জানি আপনি আমাকে অনেক পছন্দ করেন কিন্তু আমার অতীত খুব ভয়ংকর, তাই প্লিজ আমার পিছু ছেড়ে দিন। ” কথাটা বলেই চলে যায়।

মেয়েদের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তুখোড় হয় সেদিন বুঝেছিলাম, এরপরও রুবির পিছন আমি ছাড়িনি। সে খুব বিরক্ত হয়ে গেছিলো আমার প্রতি। একদিন একটা খাম আমার হাতে ধরিয়ে দেয়, এরপর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই চলে যায় আবারও। বাসায় এসে ওর চিঠি দেখি। ওর জীবনের করুণ কাহিনী বর্ননা করা। শুধুমাত্র ছেলেটার নাম উল্লেখ ছিলো না। আর ওর মা না হতে পারার কথা ও লিখা ছিলো না । সে অবশ্য তখন জানতো না । তার অতীত মেনে নিতে খুব কষ্ট হয়েছিলো, তাও আমার মনে তার জন্য ভালোবাসা কমে যায়নি। সে শতভাবে বুঝাতো আর আমি তার বিপরীতে যুক্তি দিতাম। পরে বুঝতাম আমার উপস্থিতি ওর জন্য বিরক্তিকর নয়। বুঝলাম সেও হয়তো ভালোবেসে ফেলেছে। ”

দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে সাগর, নিরু তখন বলে,

__ “ এরপর কি হয়েছিলো! ”

__ “ সেও ওই কলেজে ই অনার্স ভর্তি হয়ে যায়। দীর্ঘ তিন বছর পর সে আমার প্রেমে পড়ে। এরপর এক বছর চুটিয়ে প্রেম করে ওর বাসায় বিয়ের প্রস্তাব দিই। প্রথমে ওর মা রাজি না হলেও পরে রাজি হয়ে যায়। এরপর তো সব কিছুই জানো। ওর মা অসুস্থ হবার পর ওর মায়ের ঘরে ওর পুরনো রিপোর্ট গুলো দেখে, ওর সন্তান হবে না। এরপর যখন তোমার সুসংবাদ পায়। ও খুব ভেঙে পড়ে। এরপর রোজ কান্নাকাটি করতে থাকে। ওকে বুঝাতে বুঝাতে আমি ক্লান্ত হয়ে যায়, মাস খানেক আগে আবদার করে আরেকটি বিয়ে করার জন্য। আমি নারাজ হই। এরপর এই নিয়ে প্রতিদিন ঝগড়া করতো আমার সাথে। আর সেদিন ঝগড়া করে কথা বলিনি। পরে দেখি ও আর নেই।

খুব ভালোবাসতাম ওকে আমি, বাচ্চা হবেনা তো কি হয়েছে, তোমার তো আছে নিরু। তোমার সন্তান কেই না হয় আদর করতাম। পারিনি ওকে বুঝাতে আমি। নিজেকে শেষ করে দিলো। আমাকে একা কষ্টের সাগরে ডুবিয়ে দিয়ে চলে গেলো৷ ”

__ “ আসলে মেয়েদের জীবনের সুখ টা ই হয়তো মাতৃত্ব তে, আপু যখন জেনেছে তার অতীত তখন মেনে নিতে পারেনি। কিন্তু যা করেছে খুব ভুল করে ফেলেছে। আমি অই ভন্ড টাকে শাস্তি দিবোই। নইলে শান্তি পাবোনা কখনো। ”

চলবে……..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here