প্রেমের_পরশ পার্ট_27

প্রেমের_পরশ
পার্ট_27
জামিয়া_পারভীন

নিরু বেডে শুয়ে আছে , তখন শুভ নিরুর পেটে কান পাতে, বেবির হাত পা ছোড়া গুলো অনুভব করে। এরপর নিরুকে বলে,
__ “ দেখিও মেয়ে বেবি হবে! হাত পা বেশি ছুড়ছে না , মেয়েরা খুব শান্ত হয় তো তাই। ”

__ “ দেখিও ছেলে বাবু হবে, আমার বেবি আমার মতোই শান্ত হবে। তাই জ্বালাচ্ছে কম, বুঝলে বুদ্ধু!! ”

__ “ মনে হচ্ছে আমি খুব জ্বালিয়েছি, আমি কি শান্ত নই!!”

__ “ তুমি তো রাগী, বদমেজাজি, দুষ্টু, ” এরপর খিলখিলিয়ে হাসে নিরু।

শুভ শুধু নিরুর মাথায় একটা টোকা দেয়, এরপর বলে,

__ “ পাজি মেয়ে, লক্ষ্মী বউ। ”
দুজনেই হেসে ঘুমিয়ে পড়ে।

সকালে ঘুম থেকে দেরি করে উঠে নিরু, ফ্রেশ হয়ে বাইরে যাবার সময় রুবির ঘর থেকে কান্নার আওয়াজ পায় নিরু। ঘরে উঁকি দিয়ে দেখে রুবি বেডে উল্টো দিকে শুয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে । শুভর ডাকে নিরু নিচে নেমে আসে, কারণ শুভ ব্রেকফাস্ট এর টেবিলে, নিরুকে ছাড়া খাবে না সেই জন্য। নিরু নিচে এসে নাস্তা করে নেয়, ঔষধ ঠিক মতো খাইয়ে শুভ অফিসে যায়। খুব যত্ন করে নিরুকে, যেনো নিরুর বা বেবির কোনরকম ক্ষতি না হয়।

শুভ অফিসে বেরিয়ে গেলে নিরু আবারও রুবির রুমের সামনে যায়, রুবি এখনও আগের মত করে কাঁদছে। নিরুর অবুঝমন রুবির জন্য কেঁদে উঠে। রুমে গিয়ে রুবির মাথায় হাত রাখতে রুবি চমকে উঠে। উঠে বসে বলে,

__ “ তুই কখন এলি হটাৎ!”
__ “ কাঁদছো কেনো? সাগর ভাই কিছু বলেছে নাকি? ”

__ “ তোকে বলতে পারবোনা এর কারণ, আমি কিছুতেই বলতে পারবোনা। তুই দয়া করে এখন যা, আমাকে একা থাকতে দে প্লিজ। ”

নিরু বুঝতে পারেনা কি হয়েছে, রুবি কে দেখতে কেমন যেনো লাগে ইদানিং। আগের মতো নেই, শুকিয়ে যাচ্ছে। ফেস খারাপ হয়ে যাচ্ছে, চোখের নিচে কালি পড়েছে। নিরু ঠিক করে এই ব্যাপারে সাগরের সাথে কথা বলবে।

নিরু সন্ধ্যা থেকেই সাগর কখন আসবে তার অপেক্ষা করছিলো, শুভ কয়েকবার জিজ্ঞেস করার পরও নিরু কিছুই বলেনি শুভ কে। নিরু প্রায়ই কয়েক মাস থেকে খেয়াল করেছে রুবির একা একা ফুঁপিয়ে কাঁদা কিন্তু কখনো কাউকে কিছুই বলেনি। আজ সাগর রাত প্রায়ই ১০ টাই বাসায় আসে। ইদানিং সাগর বেশ দেরি করে বাসায় আসে। কারণ নিরু জানে না, কেউই জানে না। সাগর রুমে আসতেই নিরু বলে,

__ “ ভাইয়া, যদি আপনার একটু সময় হতো! তাহলে কিছু কথা বলতাম। ”

__ “ হ্যাঁ বলো, তাড়াতাড়ি। ”

__ “ আসলে রুবি আপা…”

সাগর নিরুকে থামিয়ে দিয়ে বলে,

__ “ এই ব্যাপারে আমি তোমায় কিছুই বলতে চাচ্ছিনা, এখন তুমি আসতে পারো। ”

বলেই সাগর চলে যায় নিজের ঘরে। সাগর নিজের ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিচে এসে ডিনার সেরে নেয় প্রথমে। এরপর আবারও ঘরে যায়, গিয়ে দেখে রুবি শুয়ে আছে। বালিশ নিয়ে সোফায় গিয়ে শোয়। সকালে ঘুম থেকে উঠে রুবির একইভাবে শোয়া দেখে সন্দেহ হয়। গিয়ে ধাক্কা দিতেই রুবি গড়িয়ে পড়ে যায়। হাত শীতল হয়ে গেছে। সাগর কিছুক্ষণ রুবির দিকে তাকিয়ে থাকে, এরপর রুবির পাশে গিয়ে বসে শক্ত করে ধরে। বিকট চিৎকার দেয় সাগর।

সবাই হটাৎ চিৎকারে সাগরের ঘরে গিয়ে দেখে সাগর রুবি কে জড়িয়ে থ হয়ে বসে আছে। রুবির মুখ থেকে ফেনা বেরিয়ে এসেছে। নিরু কিছুক্ষণ রুবির দিকে তাকিয়ে থেকে রুবির পাশে গিয়ে বসে আপু বলে ডুকরে কেঁদে উঠে। বাসার সবাই এমন ঘটনায় হতবাক হয়ে গেছে।

শুভর মা সাগরের মাথায় হাত রেখে বলেন,
__ “ জানিনা বাবা কেনো এমন হলো, এবার উঠে আয়! ওভাবে ধরে রাখলে যে লাশ কষ্ট পাবে। ”

সাগর কোন কথা বলেনা আর, সবাইকে খবর দেয়া হয়। আত্মীয় স্বজনের উপস্থিতি তে বাসা ভরে যায়। আত্মহত্যা পুলিশ কেশ হলেও রুবির বাবা লাশ পুলিশের হাতে দেয় না। কোন কেশ না করেই দাফন করে দেয়া হয় রুবিকে সেদিন সন্ধ্যায়।

সাগর অনেকটা পাথর হয়ে যায়, রুবির সব কিছু জেনেই বিয়ে করেছিলো রুবি কে। তাও কেনো রুবি এমন করলো। রুবির ভয়ানক অতীত জেনেও রুবির সাথে খারাপ বিহেভ করা উচিৎ হয়নি সাগরের। অনুশোচনার দহনে সাগর জ্বলছে অনেক।
হারিয়ে বুঝেছি আমি কতো ভালোবাসি,
বুকের বাঁ পাশে বাজে বিশের বাঁশি।
প্রেমের দাবানলে জ্বলছি দিবারাতি,
কেনো চলে গেলে তুমি ওগো প্রিয় সাথী।

জামিয়া

সাগর ঘরের কোণে বসে বিড়বিড় করছিলো এগুলো বলে, ওর মা স্পষ্ট শুনতে পায়। সাগর হটাৎ মা কে দেখে থতমত খেয়ে পড়ে। মা কে জিজ্ঞেস করে,

__ “ ও কেনো এমন করলো আম্মু, আমাকে কি ক্ষমা করা যেতো না। আমি না হয় ভুল করেই ফেলেছি , তাই বলে এভাবে শাস্তি কেনো দিলো ও আমাকে বলোনা!”

সাগরের মা সাবিহা ছেলের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে ছেলের কাঁধে মাথা রেখে কেঁদেই ফেললেন।

__ “ আর কতো কষ্ট পাবি বাবা, তোর মানষিক অশান্তি যে আর সহ্য হয়না রে। অনেক হয়েছে, তুই আরেকটা বিয়ে কর। নিজের জীবন টা নতুন করে শুরু কর। ”

__ “ এমন মুহুর্তে এসব কথা কেমন করে বলছো আম্মু, প্লিজ এসব বলবে না। যদি বিয়ে করতে রাজি হতাম তাহলে রুবি সুইসাইড করতোনা। তাহলে তো বিয়েটা আগে করে নিলেই পারতাম, রুবিও বেঁচে থাকতো, আর আমিও। ”

__ “ কি বলতে চাস তুই? রুবি বেঁচে থাকতে তুই বিয়ে করতিস কেমন করে। ”

__ “ এসব থাক আম্মু, এখন প্লিজ একা ছেড়ে দাও। ”

ওর মা ঘরে থেকে বেরিয়ে যায়।

নিরু ঘরে বসে আছে, ওর বাবার কাঁধে মাথা রেখে। শুভও পাশে আছে, শুভ একটু বাইরে যেতেই নিরু ওর বাবা কে জিজ্ঞেস করে,

__ “ আব্বু, আপু কেনো এমন করলো, বলোনা প্লিজ। ”

__ “ আ আ আ মি কিছু জানি ই ই না আ আ। ” খানিকট তোতলিয়ে বলে নিরুর বাবা।

__ “ তুমি সব জানো, শুধু আমাকে লুকাতে চাচ্ছো এটাই। জানো, আপু আমাকে মেনে নেওয়ার পর থেকে আমরা তিনজন কতো আনন্দ করেছি। রিমি আমি আপু তিনজন এ এই বাসা টা কে মাতিয়ে রাখতাম সব সময়। অনাথ হয়ে বড় হলেও, আমি সবাই কে পেয়ে খুব আনন্দিত ছিলাম। কিন্তু আপুর এভাবে সুইসাইড করাটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিনা। ”

__ “ ভুলে যা মা, অতীত মনে করে কষ্ট পেতে হয়না। ভবিষ্যৎ যেনো তোর সুন্দর হয় এই কামনা করি সব সময়। ” নিরুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে নিরুর বাবা।

হটাৎ নিরুর মাথায় প্লান আসে, বলতে গেলে কোন রকম দৌড়ে সাগরের ঘরে যায় নিরু। এরপর সাগর তাকালেই নিরু বলে ওঠে,

__ “ ভাইয়া, আপনি না আপুকে ভালোবাসেন। কেমন ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন যে আপু মরে গেলো। মরেই যদি গেলো তার মৃত্যুর জন্য যে দায়ী তাকে শাস্তি দিবেন না। ”

সাগর একটু রেগে গেলো, রাগের বশে বললো

__ “ রুবির মৃত্যুর জন্য আমি দায়ী, যাও গিয়ে থানায় ডায়েরি করে আসো। আমি শাস্তি পেতে চাই। ”

__ “ কি বলছেন এসব, বিশ্বাস করিনা আমি। আমি চাই আপনি আসল খুনী কে শাস্তি দিবেন। আপু কষ্ট পেয়ে মরে গেলো, আপনি কষ্ট পাচ্ছেন আর আসল খুনী মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াবে। তার কি বিচার হবে না। ”

চলবে……..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here