প্রেমের_পরশ পার্ট_26

প্রেমের_পরশ
পার্ট_26
#জামিয়া_পারভীন

নিরু শুভ কে ছেড়ে দিয়ে পুলিশ অফিসার এর সামনে গিয়ে বলে,
• “ এক্সকিউজ মি অফিসার।”
অফিসার অবাক হয়ে তাকাতেই নিরু বলে,
• “ আমার হাজবেন্ড সম্পূর্ণ নির্দোষ, ওকে কেনো ধরে এনেছেন। ”
• “ আপনি আপনার হাজবেন্ড এর পক্ষ নিবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু উনি খুন করেছেন, আর মেয়েটা উনার অনাগত সন্তানের মা হতে চলেছিলো। ”
• “ কি প্রমাণ আছে যে ওই মেয়েটার গর্ভের সন্তান আমার হাজবেন্ড এর। ”
• “ একটা ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে,,, ”

নিরু অফিসার কে থামিয়ে দিয়ে বলে,

• “ সামান্য ধস্তাধস্তি, এতেই কি প্রমাণ হয়ে যায় শুভ খারাপ কাজ করেছে। ”
• “ দেখুন ম্যাডাম, আপনি যাই বলুন না কেনো! উনাকে লাশের সাথে পাওয়া গিয়েছে। আমরা কি করতে পারি বলুন। ”
• “ আমার কেনো জানি মনে হচ্ছে, মানবিকতা এখনো বেঁচে আছে। দয়া করে বিষয় টার সঠিক তদন্ত করুন। নইলে একজন নির্দোষ ব্যক্তির ফাঁসির আদেশ হয়ে যাবে। আমার অনাগত সন্তানের জন্য বলছি, প্লিজ আমার সন্তান কে এতিম করবেন না। ”
নিরুর খুব কষ্ট হচ্ছে, চোখ দিয়ে অঝোরে পানি ঝরছে। তখন পুলিশ অফিসার বলেন,

• “ আপনি শান্ত হন প্লিজ, আমরা সব কিছু তদন্ত করে দেখছি। ”

নিরু বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছে, রুবি নিরুকে ধরে বেঞ্চে বসিয়ে দেয় । নিরু রুবির কাঁধে মাথা রেখে বলে,

• “ আমি জন্ম থেকে কি এমন পাপ করেছিলাম আপু, সারাজীবন কি আমাকে কাঁদতেই হবে। আমি কি কখনো সুখ পাবোনা!
• “ শুভ এমন ছেলেই না! বিয়ের আগে থেকে চিনতাম। দেখিস সব ঠিক হয়ে যাবে, কাঁদিস না বোন আমার। ”

নিরুর পাশে সবাই এসে বসে। থানায় বেশিক্ষণ থাকার নিয়ম নেই, তাই শুভর বাবা মা কে পাঠিয়ে দেয় । রুবি সাগর আর নিরু থাকে শুধু।

নিরু আবারো শুভর কাছে গিয়ে প্রশ্ন করে,

• “ শুভ সত্যি করে বলো, তুবা কে কেমন করে চিনতে?”
• “ তুমি কি আমায় আবারোও সন্দেহ করছো!”
• “ নাহহহহ! জানলে তোমাকে মুক্ত করা সুবিধা হতো। ”

শুভ সবার উদ্দেশ্যে বলে,

• “ তুবা একজন অনাথ মেয়ে, জন্ম কোথায় জানেনা সে নিজেও। তিন মাস আগে, তুবার সাথে পরিচয় হয়। ”
কিছুটা দম নিয়ে আবার বলতে শুরু করে,
• “ তুবা আমাকে জানায়, সে একজন পতিতা! কোনভাবে খারাপ কাজ করতে চায় না সেইজন্যেই পালিয়ে আসে সুযোগ পেয়েই। নিরাশ্রয় মেয়ে আশ্রয় চাচ্ছিলো, তখন আমিও একজন মেয়ে খুঁজছিলাম জবের জন্য। অফিসে নিয়োগ দিই, কাজ টা খুব সাধারণ ছিলো। আমার নিরুকে বারবার হত্যা প্লান করা হতো, তাই ঘরে সিসি টিভি ফুটেজ দেখার জন্য কাউকে খুব প্রয়োজন ছিলো। তুবা এতো খারাপ মেয়ে ছিলো না। আর নিরু কে বলাই ছিলো, ঘরে ক্যামেরা আছে। সাবধানে চলতে। তারপরও আমি চাইনি আমার স্ত্রী কে পরপুরুষ দেখুক। তাই মেয়ে কেই কাজে লাগিয়েছিলাম। তার সুবাধার জন্য তাকে এক রুমের বাসা ভাড়া করে দিই। আর একটা ল্যাপটপ দিই। যেনো ঘরে বসেও দেখতে পারে। ”

অফিসার তখন জিজ্ঞেস করেন ,
• “ সবিই তো বুঝলাম, কিন্তু তুবা মারা গেলো কিভাবে? ”

নিরুর বাবা তখন আসেন, আর অফিসারের উদ্দেশ্যে বলেন,

• “ কিছু মনে করবেন না অফিসার, কথার মাঝে কথা বলছি! আসলে তুবা মেয়েটাকে আমিও চিনতাম। আমার মেয়ের নিরাপত্তার জন্যই আমি আর আমার জামাই সব কিছু করতে রাজি ছিলাম। কিন্তু বুঝতে পারিনি তুবা আমার জামাই কে ফাঁসিয়ে দিবে। ”

অফিসার তখন জিজ্ঞেস করেন,
• “ যা বলার স্পষ্ট করে বলুন! ”

নিরুর বাবা বলেন,

• “ আমার সন্দেহ হয় একজন কে, তাকে দয়া করে আটক করুন। ৷ সব কিছুই সে বলে দিতে পারবে। ”
• কাকে?
• “ আমার একমাত্র বোন আর তার ছেলে এই সব কিছুর পিছনে দায়ী। ”

এরপর নিরু বাবা, তার স্ত্রীর উপর হামলা সহ সব ঘটনা খুলে বলে।

সন্ধ্যার পর রিপোর্ট আসে মর্গ থেকে, তুবার হত্যার আগে তাকে রেপ করা হয়। আর স্যাম্পল এ অনেকজনের স্পার্ম পাওয়া গেছে। আর গর্ভের সন্তানের সাথে শুভর DNA টেস্ট নেগেটিভ। পুলিশ অফিসার শুভ কে ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। সঠিক তদন্ত করবেন বলে আশা দেখান।

নিরুর বাবার কথা অনুযায়ী রাকিব কে খুঁজতে গিয়ে পেরেশান হয়ে যাচ্ছে পুলিশ। রাকিব গাঁ ঢাকা দিয়েছে।

রাত্রে শুভ বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে ডিনার করে নেয়। খুব ক্লান্ত থাকায় খুব সহজেই ঘুমিয়ে পড়ে, নিরু শুভর বুকে মাথা দিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করছে। হটাৎ শুভ স্বপ্ন দেখে চিৎকার করে। নিরু দেখে শুভর চোখে পানি, তখন জিজ্ঞেস করে,

• “ কিসে এতো ভয় পেলে, আমি আছি তো। ভয় পেয়ো না! ”

শুভ নিরুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করে। পুরুষ মানুষ সহজে কাঁদে না, যখন সহ্য ক্ষমতা পার হয়ে যায়। তখন নিজেকে ধরে রাখতে পারেনা। নিরুর শান্তনা দেয়ার ভাষা যেনো হারিয়ে গেছে। শুভর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় নিরু, আর বলে,
• “ প্লিজ শান্তু হও! আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, আমি খুব বড় অন্যায় করে ফেলেছি। ”

শুভ তখন বলে,
• “ তুবার সাথে গত পরশুদিন আমার ঝামেলা হয়েছিলো, কেনো জানি মনে হচ্ছিলো তুবা আমার সাথে শত্রুতা করতে চাচ্ছে। সন্দেহ লাগাতে ওকে ফলো করি, সে সামিহার সাথে মিট করে। পরে সেখানে রাকিব ও আসে। আমি ওদের কাছে গিয়ে ওদের ধরতে চেয়েছিলাম কিন্তু তার আগেই তিনজন তিন দিকে আড়াল হয়ে পড়ে। চোখের পলকে আড়াল হয়ে যায়, সন্দেহ আরোও বেড়ে যায়। পরে তুবাকে দেয়া রুমের সামনে গিয়ে ওয়েট করছিলাম। তুবা এসেই যেনো ঘাবড়ে যায়। তুবা কে স্বাভাবিক করি, আমি তাকে বিশ্বাস করায় যেনো আমি কিছুই জানিনা। ”

শুভ থেমে যাওয়া তে নিরু বলে,

• “ এরপর…… ”
• “ তুবা রুমের দরজা খুলে ভিতরে যায়, আর তখন আমি ওর মুখ থেকে স্বীকারক্তি নেওয়ার জন্য ওর সাথে ধস্তাধস্তি হয়। তখনই হয়তো কেউ ভিডিও করে রাখে আমার অজান্তে। তুবা কিছুই স্বীকার করেনি, তাই বাধ্য হয়ে বাসায় ফিরে আসি। এসেই রিমি জানায় তোমার জন্মদিন এর সারপ্রাইজ প্লানের কথা। তুবার কথা বেমালুম ভুলে যাই। পরের দিন ব্যস্ততার মাঝে কিছুই মনে ছিলো না। আর ভিডিও টা তখনই দিলো কিন্তু তোমরা কিছুই শুনলে না, আমায় অবিশ্বাস করলে নিরু। জানো আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম তোমার ব্যবহার এ। কিন্তু পরোক্ষণে মনে হয় তুমি ঠিক ই করেছো। আমি প্রমাণ এর জন্য তুবার বাসায় যায়, আর গিয়েই ফেঁসে যায় তুবা হত্যার দায়ে। ”

নিরু শুভকে জড়িয়ে বলে,
• “ অনেক বড় ভুল হয়ে গেছে আমার শুভ, মাফ করে দিও। ”

দু’জন দুজনকে শান্তনা দেয়, একে অপরের কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে।

নিরুর প্রেগন্যান্সির আট মাস চলছে, কেটে গেছে অনেক গুলি মাস। না সুস্থ হয়েছে রুবির মা, না খুঁজে পাওয়া গেছে রাকিব কে। নিরু আর রিমির ইয়ার চেঞ্জ পরীক্ষাও হয়েছে এরমাঝে। শুভ দুজন কে নিজে সব সময় গাইড করে। সব অফিসের দেখাশোনা করার পাশাপাশি বউ আর বোনের নিরাপত্তার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে শুভ।

নিরুর পেট বেশ মোটা হয়েছে, নিরুর মাজা বাঁকা করে হাটা দেখে রিমি বলে,
• “ ভাবী তুমি এতো মটু হয়ে গেছো যে হাটতেই পারছো না ঠিক মতো। ”

নিরু খিলখিলিয়ে হাসে, তখন শুভ বলে,

• “ তোর যখন আসবে তখন নিরু ও তোকে নিয়ে মজা করবে। ”

রিমি লজ্জা পেয়ে পালিয়ে যায়, নিরু তখন আরোও জোরে হেসে উঠে। রাতে নিরু রেষ্ট নিচ্ছিলো তখন শুভ অফিস শেষে ফিরে ফ্রেশ হয়েই নিরু পেটে কান লাগিয়ে বলে,
• “ কি করছে আমার পিচ্চি বাবুটা? ”

নিরুর পেটের ভিতর থেকে জোরে করে পা নড়াচ্ছে, শুভ তখন নিরুকে বলছে,

• “ দেখেছো নিরু, জন্মের আগেই বাবা কে লাথি দিচ্ছে। ”

নিরু হাসছে, এরপর বললো,
• “ সহ্য করতে পারছো না এখুনি! ”
• “ আমার আদরে ভাগ নিয়ে নিচ্ছে যে। ”

নিরু আবারোও হেসে উঠে।
• “ শুভ! তুমি নিজ সন্তান কে হিংসা করছো দেখেছো। ”

চলবে…….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here