প্রেমের_পরশ পার্ট_19

প্রেমের_পরশ
পার্ট_19
জামিয়া_পারভীন

এতো মানুষের আহাজারি তে আর দোয়া প্রার্থনা তে হয়তো ঝড়ের গতি একটু কমে আসলো, তাই লঞ্চ টা কোন ভাবে কিনারে নিয়ে এসে নোঙর ফেলতেই সবাই জীবনের ভয়ে লঞ্চ থেকে নামতে শুরু করে। বৃষ্টি তখনও হচ্ছিলো, তাও শুভ নিরুকে কোলে নিয়ে নেমে পড়ে। নিরুর জ্ঞান ফিরে আসে বৃষ্টির পানি গায়ে পড়াতে। বেশ কিছুটা এগিয়ে গিয়ে একটা হোটেল দেখতে পায় শুভ। নিরুর জ্ঞান ফিরলেও কোল থেকে না নামিয়ে ওভাবেই হোটেলে গিয়ে ঢুকে। একটা রুম বুকিং দিয়ে নিরুকে ভিতরে যেতে বলে, বাইরে চলে আসে শুভ । হোটেল ম্যানেজার এর কাছে গিয়ে বলে,
• “ একটা ফোন হবে, বাসায় ফোন করা লাগতো। আমার মোবাইল ফোন টা ভিজে গেছে, যদি এটা শুকানোর ব্যবস্থা আর ঠিক করার ব্যবস্থা করা যেতো। ”
• তখনি ম্যানেজার ফোন এগিয়ে দেয়, আর শুভর ফোন টা নেয় “ জ্বী স্যার অবশ্যই, আমরা এখনি চেক করে দেখছি। ”

শুভ প্রথমে বাসায় ফোন করে যাকে গাড়ি দিয়েছিলো তার নাম্বার নেয়। এরপর ওই ব্যক্তি কে ফোন দিয়ে শুভ নিজেদের অবস্থান জানায়, তখন অপরপাশ থেকে বলে,
• “ জ্বী স্যার হটাৎ ঝড় শুরু হওয়াতে আমিও আটকিয়ে গিয়েছিলাম , বেশি দূরে যেতে পারিনি। ” অতঃপর শুভদের অবস্থান জেনে নিয়ে বলে, “ ঝড় বৃষ্টি থামলে আসছি স্যার। ”

শুভ রুমে চলে আসে, নিরু ঠাণ্ডাতে জমে গেছে।
• “ সরি পাখি, আমার জন্যই তোমাকে এতো কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে, প্লিজ মাফ করে দিও। ”
• “ তোমার দেয়া সুখ যদি হাসিমুখে নিতে পারি তাহলে কষ্ট কেনো নিতে পারবোনা বলো । বিপদ তো বলে কয়ে আসেনা। আল্লাহ আমাদের পরীক্ষা করছিলেন বুঝলে । ”

শুভ অবাক হয়! নিরুর এতো সহ্য ক্ষমতা দেখে। ভীত হয়ে যে মেয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলো সেই মেয়ে বিপদে ধৈর্য ধরছে। তখন নিরু আবার বলে,
• “ আমার সাথে তুমিও বিপদে পড়েছিলে, আমার কিছুটা মনে আছে, তুমি আমাকে তোমার সাথে কিভাবে বেঁধে রেখেছিলে। আমি ভয় পেলেও, আমার পূর্ণ আস্থা আছে তোমার উপর। আল্লাহ তো আছেন ই, তোমার মতো স্বামী যার থাকে তার ভয় পাবার আসলেই কোন মানে হয়না। ”
• তখন শুভ বলে, “ তোমার তো ঠান্ডা লাগছে, কাপড় তো সব গাড়িতে আছে। ”

শুভ হোটেলের ওয়াশরুমে গিয়ে একটা টাওয়েল এনে দিয়ে মাথা মুছিয়ে দেয়। এরপর নিরুর ড্রেস গুলো একে একে কমাতে থাকে। টাওয়েল টা নিরুর গায়ে জড়িয়ে সব ড্রেস খুলে নেয়। যদিও শুভ কাছে সে নতুন না, তবুও নিরু লজ্জা পেতে শুরু করে। নিরু বিছানায় রাখা কাঁথা টা গায়ে জড়িয়ে নেয়।

শুভ নিরুর কাপড় গুলো ধুয়ে বারান্দায় শুকাতে দিয়ে আসে। শুভ নিজেও ভিজে আছে, তাই আরেকটা টাওয়েল নিয়ে নিজের ড্রেস গুলো ও চেঞ্জ করে নেয়। বেডের দিকে তাকালো শুভ, নিরু শুয়ে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়েছে। মৃদু হাসে শুভ, এরপর নিরুর পাশে গিয়ে শুয়ে নিরুকে জড়িয়ে ধরে। দুজনেই খুব ক্লান্ত ছিলো, ঘুম টা খুব সহজেই চলে আসে।

দরজা তে কেউ ডাকছে, শুভ ঘুম থেকে উঠে দরজা টা খুলে দেয়। অবশ্য নিরুকে পুরোপুরি ঢেকে দিয়েছিলো শুভ।
দরজা খুলতেই,
• “ স্যার, আমি চলে এসেছি। ” শুভর অফিসের কর্মচারী, যাকে গাড়ি দিয়েছিলো।
• “ তুমি আসাতে ভালোই হলো দীপ্ত, আমি তো বড়ই বিপদে পড়ে গেছিলাম। ”
• “ জ্বী স্যার! ঝড় যে কিভাবে আসলো টেরই পেলাম না। একেবারে যেন কালবৈশাখী ঝড়, রাস্তার অবস্থাও খুব একটা ভালো না। গাছপালা ভেঙে পড়েছে, আজ না যাওয়াই বেটার। তাই রুম বুক দিয়েই এসেছি। ”
• “ ভালো করেছো দীপ্ত, এখন প্লিজ গাড়ি থেকে কিছু ড্রেস আমার আর ম্যাডামের এনে দাও প্লিজ। সাথে নিরুর ফোন টাও নিয়ে আসিও। ”

উনি ড্রেস আর ফোন দিয়ে উনার রুমে চলে যায়। শুভ নিজের ড্রেস চেঞ্জ করে নিরুকে উঠায় দেয়, নিরু ড্রেস চেঞ্জ করে ফ্রেশ হয়ে আসে। এসেই শুভ কে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দেয় নিরু।

• “ কি হলো সোনামণি, কাঁদছো কেনো? ”
• “ ভয়ে, খুব ভয় পেয়েছি আজ। তোমার মতো হাজবেন্ড পেয়ে নিজেকে খুব ধন্য মনে হচ্ছে শুভ । ”

শুভ নিরুকে খুব জোরে চেপে ধরে। এরপর বলে,
• “ আমি তোমাকে ভালোবেসে বিয়ে না করলেও এখন অনেক ভালোবাসি। তুমি আমার জীবন, তুমি ছাড়া নিজেকে লাগে অস্তিত্ব হীন। এতো ভালোবাসি বলে বুঝাতে পারবোনা।
• “ আমিও তোমায় অনেক ভালোবাসি শুভ। ”

নিরু শুভর সাথে ডিনার করে আসে, রুমে এসে বসতেই শুভ কে বলে,

• “ একটা গান শুনাবে, প্লিজ না করো না । ”
• “ ট্রাই করতে পারি, তবে শর্ত আছে। ”
• “ কি গো!! ”
• “ দিতে হবে। ”
• “ বুঝতে পেরেছি, ন্যাকামি করতে চাচ্ছো, মাইর খাবে। ”
• “ সোহাগ খাবো ” নিরুর ঠোঁটে ঠোঁট দিয়ে অনেক্ষণ চুমু খায়।

নিরুকে ছেড়ে দিয়ে শুভ কবিতা বলে,

তোমার লাল ঠোঁট জ্বালাচ্ছে দারুণ
লাল ঠোঁটের ছোঁয়ায় নিবারণ করবে কি আমার শরীরের আগুন!
তোমার লাল ঠোঁট ডাকছে
তোমার কাছে যাওয়ার আহ্বান করছে?
.
যাব কি পরী তোমার কাছে
দিবে কি লাল ঠোঁটের উষ্ণ চুম,
কষ্ট পাচ্ছি বড্ড
তোমার ঠোঁটের উষ্ণ ছোঁয়ায়
ফুটাতে চাই এ মনে ভালবাসার পদ্ম।
.
তোমার লাল ঠোঁট ভয়াবহ
শরীরের সৃষ্টি করেছে তাপদাহ,
হে পরী তোমার লাল ঠোঁট ভীষণ দিচ্ছে যাতনা
তোমার লাল ঠোঁট ছুঁইতে চাই একটু ভালবাস না?

[ কবিতার টা ফাইয়াজ ইসলাম ফাহিমের কাছ থেকে নেয়া ]

নিরু তখন বলে,
• “ বলতে বললাম গান, বলতে কবিতা। তাও আমার ঠোঁট নিয়ে। মন চাচ্ছে ঠোঁট দুটি কেটে রেখে দিই। ”
• শুভ নিরুর কথা শুনে শুধু হাসতে থাকে।

……..

রাকিবের আম্মা সাবিহা খাতুন ভাইয়ের বাসাতেই থাকে। বিয়ের কিছুদিন পর রাকিব যখন গর্ভে আসে, তখন স্বামীর ঘর ত্যাগ করে ভাইয়ের কাছে উঠে। ভাইয়ের অবস্থা তখন ভালো ছিলো না। সাধারণ চাকুরী করেন উনার ভাই মানে নিরুর বাবা। পরবর্তীতে রাকিব ওদের আগের বাসা তেই ভুমিষ্ট হয়। ভাইয়ের হটাৎ বড়লোক হয়ে যাবার পিছনে দায়ী নিরুকেই ভাবে। সেইজন্যেই নিজ ছেলে রাকিব কে নিরুর পিছনে লেলিয়ে দিয়েছেন উনিই।

রাকিব রেগে গেছে প্রচন্ড ভাবে, না পাচ্ছে নিরুকে না পাচ্ছে রিমিকে। বাসায় এসেই বলা শুরু করে ওর মাকে,
• “ কতো সুন্দর প্লান করেছিলাম নিরুকে নষ্ট করে এরপর বিয়ে করে ফেলবো। কিন্তু সব কিছুই ভেস্তে দিলো ছাদ থেকে লাফ দিয়ে। সেদিন কতো কষ্টে বেঁচে গেছিলাম, আর একটুর জন্য ধরা পড়ে যেতাম। কতো কষ্টে বাসার পিছনের দেয়াল টপকিয়ে নিচে নেমে আসলাম। অবশেষে নিরুকে জিন্দা দেখে একটু হলেও শান্তি পেলাম। এরপর যখন বাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছিলো! সুযোগ পেয়েছিলাম। কিন্তু পাখি গিয়ে শুভর ডালে বসে পড়লো। নিরুকে যেন হাতছাড়া করতে না হয় সেজন্য ওর ননদ কে ব্যবহার করতে চাইলাম। কিন্তু ওর দুই ভাইয়ের অত্যাচার এ সেটাও হচ্ছেনা। ”
• “ মাথা ঠান্ডা করো বাবা, এক রাস্তায় হয়নি তো কি হয়েছে। সেকেন্ড অপশন ট্রাই করো। ” রাকিবের মায়ের শিখিয়ে দেয়া ভাষ্য অনুযায়ী রাকিব এবার কাজ করবে।

……

নিরু শুভর নাক চেপে ধরে, তখন শুভ নাকের স্বরে কথা বলে,
• “ এমন করে ধরলে তো শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে পাখি!”
• “ কেনো ! আমি না তোমার আত্মা, আমার নাক দিয়ে তো শ্বাস নিচ্ছিই!!! ওটাই তুমি পেয়ে যাবে। ” নিরু নাক ছেড়ে দেয়।
• শুভ বলে, “ একদিক দিয়ে ঠিক বলেছো!!! নাক চেপে রাখো, আর মুখ টা তোমার মুখে দিয়ে দিই। তোমার নিঃশ্বাস প্রশ্বাস গুলি তাহলে আমিও পেয়ে যাবো। ” এই কথা বলেই নিজের নাক নিজেই চেপে ধরে নিরু ঠোঁটে লিপ কিস করে।
বেশ কিছুক্ষণ পর শুভ নিরুকে ছেড়ে দেয়, নিরুও বেশ আকর্ষিত হয়ে যায় শুভর প্রতি। নিজেকে আর আটকিয়ে না রেখে শুভর সাথে মিশে যায়।
পরদিন সকালে নিরু ঘুম থেকে উঠে শুভকে খুব বিষন্ন দেখতে পায়, নিরু ফ্রেশ হয়ে শাওয়ার সেরে একেবারে রেডি হয়ে বের হয়। শুভকে গলা জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করে ,
• “ কি হয়েছে!! এমন লাগছে কেনো তোমাকে? ”

শুভ কিছুই না বলে নিরুকে চড় মেরে বসে,
• “ তোমাকে ভালোবেসে বড় ভুল হয়ে গেছে, আসলে তোমার মতো চরিত্রহীনার মুখ দেখতেও আমার ঘৃণা হচ্ছে। ”

চলবে…….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here