প্রেমের_পরশ পার্ট_18

প্রেমের_পরশ
পার্ট_18
জামিয়া_পারভীন

শুভর ঘুম ভাঙতে আজ একটু দেরি হয়ে গেলো, ঘুম থেকে উঠে আগে ফ্রেশ হয়ে আসে। নিরু তখন ও ঘুমাচ্ছে। জানালার পর্দা সরিয়ে দেয় শুভ , বাইরের সূর্যের আলো নিরুর মুখে এসে পড়ছে! এতে নিরুর সৌন্দর্য আরো অনেক বেড়ে যায়। ফর্সা গালে হালকা হ্লুদ ছটা পড়ে নিরুর চেহেরা আরোও মায়াবী করে তুলেছে। শুভ নিরুর পাশে গিয়ে বসে! কানের পিছনে আলতো ছোঁয়া দেয়। নিরুর সুড়সুড়ি লাগাতে উঠে যায়,
• “ এমন করো কেনো, একটু ঘুমাই প্লিজ! ” ঘুমে জড়ানো কণ্ঠে বলে।
• “ বাসায় গিয়ে ঘুমাবে, আজ দুইটা জায়গা ঘুরবো, এরপর আজই ফিরে যেতে হবে। ”
• “ হুমম উঠছি! ”

ফ্রেশ হয়ে ব্রেকফাস্ট করে দুজনেই রেডি হয়ে নেয়। প্রথমে ওরা কাছের বৌদ্ধ মন্দির দেখে, আসলে কিভাবে বানিয়েছে এটাই দেখার উদ্দেশ্য দুজনের। সেখানে তিন তলা সমপরিমাণ উঁচু মুর্তি আছে। ওরা ওখানে বেশিক্ষণ না থেকে পাশের রাখাইন মার্কেট এ যায়। সেখানে থেকে পছন্দ মতো তাঁতের কাপড় কিনে সবার জন্য। গরমকালের সময়! তাঁতের কাপড় পড়ে অনেক আরাম। কেনাকাটা করে হোটেলে ফিরে আসতে প্রায়ই ১২ টা বেজে গেলো। ওরা লাঞ্চ সেরেই অল্প কিছুক্ষণের জন্য মিউজিয়াম “ ফার্মস এন্ড ফার্মস ” যায়। এটা ব্যক্তিগত ভাবে তৈরি হয়েছে। এখানে অনেকগুলো পিকনিক স্পট ও আছে। অনেক নারিকেল গাছ আর ফুলের বাগানের মাঝে নির্মল পরিবেশ এ দুজনে বেশ কিছুক্ষণ ঘুরে আবার গাড়িতে গিয়ে উঠে।

গাড়িতে করে পটুয়াখালী পর্যন্ত এসে শুভ নিরুকে নেমে যেতে বলে। গাড়িতে ব্যাগ রেখে দেয়,
• “ গাড়িতে ব্যাগ রেখে আমরা কোথায় যাচ্ছি? ” নিরু জিজ্ঞেস করে শুভকে।
• “ আমরা এখান থেকে লঞ্চে করে ঢাকা যাবো। ” কেমন হবে বলোতো ?
• “ আমার ও না পানি পথে জার্নির খুব ইচ্ছে ছিলো। ”
• “ চলো! বেশি দেরি করলে লঞ্চ ছেড়ে দিবে। ”
• “ আর গাড়ির কি হবে? ”

তখন এক ব্যক্তি এসে শুভকে সালাম দেয়, শুভ সেই ব্যক্তির কাছে গাড়ির চাবি হস্তান্তর করে। লোকটা গাড়িতে বসলে শুভ নিরুকে বলে,
• “ আমার অফিসের একজন ব্যক্তি, চিনবে না! এখন চলো যাওয়া যাক। ”

ওরা তাড়াতাড়ি করে লঞ্চ ঘাটে গিয়ে লঞ্চে উঠে, আর অল্প দেরি হলেই লঞ্চ মিস করতো। ওরা ডবল কেবিনে গিয়ে উঠে! লঞ্চ ছেড়ে যায়। দুজনে বেশ কিছুক্ষণ উপভোগ করে, লঞ্চ চলছে আপন গতিতে।
…….

এদিকে রিমি সুযোগ বুঝে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়, তিনদিন অনেক চেষ্টা করে আজ সফল হয়েছে বাসা থেকে বের হতে। বাইরে বের হয়ে রিকশা নেয়! রাকিব কে ফোন করে জানায়, সে আসছে।
কিছুদূর যেতেই কয়েকজন যুবক রিমির পথ আগলিয়ে ধরে,

• “ গাড়িতে উঠে বসুন ম্যাম। ”
• “ আপনারা কে? কি চান আমার কাছে?”
• “ আমরা আপনার বডি গার্ড ! বাসায় ফিরে চলুন। সবাই চিন্তা করছে। ”
• “ আপনারা মিথ্যে বলছেন, আমার কোন বডি গার্ড নেই। ”
লোকগুলো রিকশা আটকিয়ে রেখে কাকে যেন ফোন করে, এরপর ও রিমি চিল্লাচিল্লি করে লোক জড় করে ফেলেছে। কিছুক্ষণ পর একটা গাড়ি এসে থামে, গাড়ি থেকে যিনি নামে তার ধমকে এলাকার পরিবেশ শান্ত হয়ে যায়।। লোকটাকে দেখে রিমি বাধ্য মেয়ের মতো লোকটার সামনে গিয়ে বলে,
• “ সরি ভাইয়া! আমি একটু কাজে বাইরে এসেছিলাম। কিন্তু এরা পথ আগলিয়ে ধরে। ভয় পেয়ে চিল্লাচিল্লি করেছি। ”

সাগর রিমির হাত ধরে টেনে নিজের গাড়িতে বসায়, এরপর বলে,

• “ তুই আমার একমাত্র বোন, তুই জীবন ঝুঁকি নিয়ে বাইরে যেন না বের হোস তাই বডি গার্ড ফিক্সড করে রেখেছি আমরা দুই ভাই মিলে। ভালো করে ওদের চিনে রাখ, কাজে দিবে। নেক্সট টাইম এই ভুল আর করবি না আশা করি। ”

রিমি আর কথা না বলে ফিচফিচ করে কাঁদা শুরু করে। তখন সাগর আবার বলে,

• “ তুই যাকে পছন্দ করেছিস সে তোকে ভালোবাসে না , তোর বয়স কম বলেই ভুল পথে পা বাড়িয়েছিস। আজ যদি আমরা না পেতাম, তোর ক্ষতি যদি করতো তাহলে তুই কিভাবে সোসাইটি তে মুখ দেখাবি, আর আমাদের ই বা কি হবে? কখনো চিন্তা করে দেখেছিস এইসব। আমি তোর রাকিবের মুখোশ সবার সামনে টেনে খুলে দিবো। তখন বুঝবি, তোর ভাই তোর আপন নাকি পর। কখনো তোর খারাপ চাইওনি, চাইবোও না। আর শুন ঘরে গিয়ে কিছু উল্টো পালটা কাজ করবি না। কারণ তোর ঘর কেনো? পুরো বাড়িটাই সিসি টিভির আওতাভুক্ত করা আছে। আর সব সময় ফুটেজ খেয়াল করার জন্য ফিমেল স্টাফ নিয়োগ করা আছে। ”

সাগরের কথায় রিমি অবাক হয়ে যায়, মনে মনে ভাবে, “ এইজন্য বুঝি ওরা সব টের পেয়ে যায়। ” কিন্তু রাকিব যদি খারাপ ও হয়! প্রথম প্রেম কিভাবে ভুলবে সে! মন খারাপ হয় সেইজন্য।
……..

শুভ ডেকে বসে ছিলো, নিরু গিয়ে তার পাশে বসে!
• “ আচ্ছা শুভ! এখন কয়টা বাজে? ”
• শুভ ফোন দেখে বলে, বিকাল ৪:১৫ বাজছে। ”
• “ সেই তুলনায় কি বেশি অন্ধকার লাগছেনা ?”
• “ হুমম সেটাই মনে হচ্ছে, মনে হচ্ছে ঝড়ের পূর্বাভাস। ”
• “ কি বলো! যদি ঝড় শুরু হয়! লঞ্চ যদি ডুবে যায়! ”

একের পর এক কু ডাক মনের মাঝে সৃষ্টি হয় নিরুর।
• “ আচ্ছা নিরু এতো চিন্তা করো না। ” বলে শুভ ফোন দেয় যাকে গাড়ি দিয়েছে তাকে। ফোনের নেটওয়ার্ক নেই। বলে ফোন টা রেখে দেয়।
• নিরু বলে উঠে, “ এখন কি হবে? যদি ঝড় শুরু হয় তাহলে। ”

কিছুক্ষণের মাঝে ই আকাশ বেশি মেঘলা হয়ে যায়। দুজনে কেবিনে চলে আসে। প্রচন্ড বাতাশ ও শুরু হয়, ঢেউ গুলো খুব উঁচু উঁচু হয়ে যায়। লঞ্চ দুলছে। কেবিনের জিনিস পত্র গুলো এলোমেলো হয়ে পড়ে যাচ্ছে। নিরু ভয়ে শুভ কে জড়িয়ে ধরে মনে মনে দোয়া করতে থাকে। বৃষ্টি ও শুরু হয় সাথে ঝড়, লঞ্চের সবাই ভীত হয়ে চিল্লাচিল্লি শুরু করে। লঞ্চ তখন মাঝনদী তে আছে । ক্যাপ্টেন হয়তো লঞ্চ তীরে নেওয়ার চেষ্টা করছে। কোনরকম তীরে ভিড়তে পারলেই যেন বেঁচে যায় সবাই। বৃষ্টি আর নদীর পানি অনেকটা লঞ্চে প্রবেশ করা শুরু করেছে । নিরু এসব দেখে ভয়েই জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। শুভ নিরুকে পিঠের সাথে শক্ত করে বেঁধে নেয়। যেন খারাপ কিছু হলে দুজনেই সেফ থাকতে পারে। শুভ মনে মনে বলে,

• “ লঞ্চে চড়ার শখ টা যদি আজ না কর‍তাম! যদি তোমায় নিয়ে গাড়িতেই রওনা দিতাম তাহলে হয়তো এমন সিচুয়েশান এ পড়তে হতো না। আজ যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে তোমার কাছে পরকালে অপরাধী হয়ে থেকে যাবো । ক্ষমা করে দিও আমায় নিরু। ”

লঞ্চের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যাচ্ছে, ক্যাপ্টেন লঞ্চ কে যতো দ্রুত সম্ভব তীরে নেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু ঝড়ের কারণে লঞ্চের দিক বারবার পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছিলো। বিপদে সবার মুখেই দোয়া উচ্চারিত হচ্ছিলো, এদিকে শুভর টেনশন নিরুকে নিয়ে, ভয়েই যে মেয়েটার জ্ঞান নেই। চলার পথে হটাৎ যে বিপদ এভাবে আসতে পারে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ বলতে পারে না। লঞ্চে অনেকটা পানি উঠে যাচ্ছে, সবাই পানি ছাঁকতেই ব্যস্ত হয়ে যায়। শুভ কেবিনের বাইরে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, যদি সত্যিই লঞ্চ ডুবে যায়, তাহলে যেন ওরা নদীতে ঝাঁপ দিতে পারে।

চলবে……… .

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here