প্রেমের_পরশ পার্ট_7

প্রেমের_পরশ
পার্ট_7
#জামিয়া_পারভীন

নিরু একটু ভয় একটু লজ্জায় শুভর বুকে মারতে শুরু করে, শুভর হাত একটু হালকা হতেই নিরু শুভকে সরিয়ে দিয়ে দৌড় দিতে শুরু করে। নিরুর শাড়ির কিছু অংশ শুভর পায়ের নিচে ছিলো, হটাৎ দৌড়াতে গিয়ে টান লেগে শাড়ির কুচি খুলে যায়। নিরুর পেটের অনেকটা অংশ বের হয়ে যায়, কোনরকম কুচি গুলো হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে নিরু। শুভ অনেকটা রেগে গাল গুলো লাল হয়ে গেছে নিরুর এমন কাণ্ডে। রাগ করে বলে,
__ “ বেশ হয়েছে, এখন এইভাবেই দাঁড়িয়ে থাকো। ”

__ “ সরিইইই,” মাথা নিচু করে বলে নিরু।

__ “ এটাই তোমার শাস্তি আজ। ” বলে রুম থেকে বেরিয়ে যায় শুভ।

নিরু ওভাবে দাঁড়িয়ে না থেকে এলোমেলো শাড়ি নিয়ে বিছানার কম্বলের নিচে ঢুকে পড়ে, একে তো শাড়ি পড়তে পারেনা, যদি কেউ এসে দেখে ফেলে, কি লজ্জার ব্যাপার হবে তখন, মনে মনে ভাবছে আর লজ্জায় মুখ লাল হয়ে যাচ্ছে নিরুর। কিছুক্ষণ পর ফুপি শাশুড়ি ঘরে আসে,
__ “ কি ব্যাপার নতুন বউ, সারাদিন শ্বশুর , শাশুড়ি আর ননদকেই চিনলে আর আমরা বুঝি কেউউ না। ”

__ “ ভুল হয়ে গেছে ফুপি, মাফ করে দিবেন। ”

__ “ এই অবেলায় শুয়ে আছো কেনো, শরীর খারাপ করলো নাকি? ”

__ “ আমি আসলে শাড়ি পড়তে পারিনা, পায়ের সাথে লেগে শাড়ি খুলে গেছে তাই। ” মাথা নিচু করে বলছে।

__ “ ওহহহ এই ব্যাপার, আসো আমি শিখিয়ে দিচ্ছি। এর আগে কখনো পড়নি বুঝি। ”

__ “ না ফুপি, কখনো পড়িনি, কেউ ছিলেন না শিখিয়ে দেওয়ার মতো। ”

শুভর ফুপি স্টেপ বাই স্টেপ শাড়ি পড়ানো শিখিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ গল্প করে দেখে রাতের খাবার সময় হয়ে গেছে, দুজনেই তাড়াহুড়ো করে ডাইনিং এ যায়। দেরি হয়ে গেলে আবার বকা খেতে হবে। ডাইনিং টেবিলে শুভ নিরুকে দেখে চমকে উঠে। মনে মনে ভাবছে “ শাড়ি তো পড়তে পারেনা কিন্তু পড়লো কিভাবে ? ” শুভর মনের কথা মনেই থাকলো নিরু তার আগেই শুভর পাশে গিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে বসে পড়ে, আস্তে করে বলে “ অবাক হয়েছেন বুঝি, এভাবে তাকিয়ে থাকবেন না আমার লজ্জা করে ।” শুভ চোখ সরিয়ে নেয় নিরুর থেকে। সবাই ডিনার শেষে যে যার মতো রুমে চলে যায়। শুভ রাগ করে আর নিরুর দিকে তাকায়নি রাত্রে। একই ঘরে উল্টো দিক হয়ে রাত্রে ঘুমিয়ে পড়ে। নিরুও বেচারি শুভর পাশেই ঘুমিয়ে পড়ে, মাঝখানে কোলবালিশ দিয়ে।

পরদিন সকালে নিরুর ঘুম ভেঙে শুভকে দেখতে পায়নি, হয়তো আগেই উঠেছে তাই উঠে ফ্রেশ হয়ে রুমে আসতেই রিমি আসে রুমে। রিমির সাথে আগেই নাস্তা করে পার্লারে যায়, যেহুতু পার্লারে যেতে হবে তাই তিন জন তাড়াতাড়ি নাস্তা সারে। রিমি রুবি আর নিরু কে নিয়ে পার্লার এসে তিনজনের সাজতে প্রায়ই দুপুর হয়ে আসে। তিনজনই কারে করে করে আগের ঠিক করে রাখা কমিনিউটি সেন্টারে আসে।

স্টেজ সাজানো হয়েছে খুব সুন্দর করে, পিছনের দিকে তাজা ফুল রজনীগন্ধা, গোলার আর গন্ধরাজ ফুলের মিশ্রণে সাজানো হয়েছে। দুই জোড়া ডিজাইন করা সোফা রেখেছে , একটা সোফায় শুভ আরেকটাতে সাগর বসে আছে। পাশে রুবি আর নিরুর জন্য যায়গা রাখা আছে। নিরুকে আসতে দেখে শুভ আর চোখের পলক ফেলতে পারছেনা। রিমির পছন্দ করা নীল রঙের গাউনের সাথে ম্যাচিং ওড়না, ম্যাচিং গয়না পড়েছে নিরু। চুলগুলো সামনের দিকে একপাশে ডিজাইন করে ছাড়া আছে, মাথায় ফিরোজা আর মিষ্টি কালারের ফুল। হাত ভর্তি চুড়ি, পায়ে উঁচু হিল পড়েছে নিরু। শুভ শেরওয়ানী পড়েছে, ম্যাচিং পাজামা, আর জুতা। নিরুও শুভর দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে। শুভ তো চোখের পাতা ফেলতেই পারছেনা তার নীল পরীর দিক থেকে।

রুবি লাল বেনারসি পড়ে ম্যাচিং গয়না আর মাথায় ওড়না দিয়ে সেজেছে। রুবিকেও বেশ সুন্দরী লাগছে, সাগর কোর্ট পড়েছে আর সু। ওদের দুজনের জুটিকেও মানিয়েছে বেশ। রিমি পিংক কালার গাউনের সাথে সেজেছে, ওকেও বেশ সুন্দরী দেখাচ্ছে। রিমি নিরুকে শুভর পাশে বসিয়ে বলে,
__ “ ভাইয়া! একটু মুখ টা বন্ধ কর, এভাবে ভাবীর দিকে নজর দিস না, সবাই কিন্তু তোকে নিয়ে হাসবে। ” হিহিহি।

__ “ এই যা ভাগ, তোকেও বেশ সুন্দর লাগছে। ”

__ “ দেখতে হবেনা কার পছন্দ এইগুলি। ”

__ “ আমার পাগলী বোনের চয়েস আছে বলতে হয়। তোদের দু’জন কেই জোশ লাগছে। ”

__ “ আমাকে ওত টাও বললে না, যতটা ভাবী কে লাগছে। ”

দুই ভাই বোনের খুনসুঁটি তে নিরু মুচকি মুচকি হাসি দিচ্ছে। যেহুতু সম্মানের একটা ব্যাপার আছে তাই রুবির বাবা মাও এসেছে। রুবির মা নিরু কে দেখে জ্বলে যাচ্ছিলো কিন্তু কিছু বলতে পারছেনা। শুভর খালাতো বোন সামিহাও অনেক জ্বলছিলো। আর রুবি নিরুর ফুপু আর ফুপাত ভাই রাকিব ও এসেছে, রাকিব কে দেখে নিরু চমকিয়ে যায়, শুভকে ধরে ফেলে ভয়ে, শুভ বলে
__ “ এনি প্রব্লেম? ”

__ “ রাকিব এসেছে এখানে, ওকে আমার ভয় লাগে। ওদের কেনো ডেকেছেন? ” আস্তে আস্তে নিরু বলে।

__ “ আমি আছি তো, এতো ভয় কিসের তোমার। ”

__ “ ওরা খুব খারাপ, আপনার যদি ক্ষতি করে। ”

__ “ আরে ভয় পেওনা, কিছুই হবেনা শুভ বেঁচে থাকতে। যারা জ্বলার তাদের চিনে রেখেছি, সবাইকে দেখে নিবো আমি। ”

__ “ ভরসা করি। ”

__ “ পরে বুঝিয়ে দিচ্ছি তোমায়। ”

__ “ কি বোঝাবেন? ”

__ “ কিছুনা। ”

শুভ আর নিরু ফটো তুলার জন্য একটা পার্কে যায়, সেখানে ক্যামেরাম্যান সুন্দর সুন্দর ছবি তুলে দেয়। যখন নিরুকে শুভর কাঁধে হাত রাখতে বলে নিরু যেন লজ্জায় মরে যাচ্ছে, বিভিন্ন পোজ দিয়ে ছবি তুলতে গিয়ে শুভ নিরুর লজ্জা পাওয়া খুব কাছে থেকে উপভোগ করে। একটা ছবি তে নিরু শুভর ঘাড়ে হাত দিয়ে শুভর চোখে চোখ রেখে ছবি তুলতে গিয়ে নিরু বার বার লজ্জায় চোখ নিচু করে নিচ্ছিলো। অনেকগুলো সুন্দর সুন্দর ছবি তোলে নিরু আর শুভ। পার্ক থেকে বের হতে সন্ধ্যা হয়ে যায়, গাড়িতে করে দুইজন বাসায় ফিরছে। শুভ নিরুকে জিজ্ঞেস করে,
__ “ কেমন লাগলো আজকের ঘুরাঘুরি? ”

__ “ জানেন! আজ আমি খুউউউউউব হ্যাপি, জীবনে প্রথম আমি এতো আনন্দ করেছি। ”

__ “ আমার এই পার্কে অনেক আশা হলেও লজ্জাবতীর সাথে এই বার সব চেয়ে বেশি এনজয় করেছি। যখন তুমি লজ্জায় চোখ নামাচ্ছিলে তখন সব চেয়ে সুন্দর লাগছিলো তোমায়। ”

__ “ আপনি আমায় অনেক করুনা করেছেন, আমার এতো সুন্দর জীবন দান করার জন্য আমি কৃতজ্ঞ আপনার কাছে। ” ঘুম ঘুম ভাব চোখে নিরুর।

__ “ আর একদম আজেবাজে চিন্তা মাথায় আনবে না, আমি মোটেও করুনা করিনি। ভালোবেসে ফেলেছি তোমায়, নইলে শুভর রাগ সম্পর্কে তোমার আইডিয়া নাই। ” কথা শেষ করে শুভ খেয়াল করে নিরু কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে।
“ সারাদিন এতো ধকল বাচ্চা মেয়েটা সহ্য করতে পারছেনা। ” মনে মনে বলে শুভ।

বাসায় এসে গেছে কিন্তু নিরু ঘুমাচ্ছে তাই আস্তে করে নিরু কে কোলে তুলে নিয়ে বাসায় প্রবেশ করে শুভ। শুভর ফ্যামিলির লোক একটু অবাক হলেও কেউ কিছু বলেনা। শুভ নিরুকে রুমে শুইয়ে দেয়, ঘুমন্ত নিরুকে দেখতে নীলপরীর মতো লাগছে। অপলক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে রুম থেকে বের হয়। সবার সাথে আড্ডা দিয়ে রুমে আসার পথে সামিহার সাথে দেখা শুভর। খুব সুন্দর করে ইগনোর করে রুমে চলে আসে শুভ।

রুমে এসে দেখে নিরু এখনো ঘুমিয়ে আছে। শুভ নিরুকে ডাকতে থাকে,

__ “ এই নিরু, উঠো। ”
নিরু ঘুমের ঘোরে শব্দ করছে, শুভর বেশ মজা লাগছে। কিন্তু মেকআপ না তুলে ঘুমালে স্কিন নষ্ট হয়ে যাবে তাই শুভ নিরুর মুখে পানি ছিঁটা দিয়ে তুলে দেয়।

__ “ এমন কেনো করেন, আমি একটু ঘুমাই, প্লিজ। ”

__ “ পরে ঘুমিও, মেকআপ তুলে ঘুমিও, এখন উঠো ঘুম থেকে। ”

__ “ না তুললে কি হয় প্লিজ প্লিজ প্লিজ।”

__ “ ক্ষতি হবে, আমার সুন্দরী বউয়ের চেহেরা নষ্ট হয়ে যাবে। যাও মেকআপ তুলে ড্রেস চেঞ্জ করে এসে ঘুমাও। ”

নিরু ঢুলতে ঢুলতে ফ্রেশ হয়ে ড্রেস চেঞ্জ করে এসেই শুয়ে পড়ে। শুভ ও বাধ্য ছেলের মতো নিরুর পাশে ঘুমিয়ে পড়ে। সকালে নিরুর ঘুম ভাঙে আগে, ঘুম থেকে উঠে খেয়াল করে বেড ফুল দিয়ে সাজানো, বেলী ফুল, রজনীগন্ধা আর খয়েরী গোলাপ দিয়ে। “ যাহহ বাবা এটা কোথায় আমি, স্বপ্ন দেখছি নাকি। ” মনে মনে বলে নিরু। পাশে শুভ কে শুয়ে থাকতে দেখে বুঝতে পারে শুভর ঘরে আছে। এর মাঝে শুভর ঘুম ভাঙে, শুভ উঠে বসতেই নিরু জিজ্ঞেস করে,
__“ আচ্ছা কাল তো আমরা গাড়ি করে আসছিলাম, তারপর কিছুই মনে নাই। আমি এখানে আসলাম কিভাবে ? ”

__ “ কিভাবে আর আমি কোলে করে নিয়ে এসেছি। ”

__ নিজের শরীরের দিকে খেয়াল করে চিল্লিয়ে উঠে নিরু, “ হায় আল্লাহ, আমার ড্রেস কে চেঞ্জ করে দিলো? ”
__ “ আরে আরে কাঁদার কি হলো? কাল রাতের কথা ভুলে গেছো? তুমি তো নিজেই চেঞ্জ করেছো ঘুমের ঘোরে ছিলে কাল। ”

__ “ ওওও আমি চেঞ্জ করেছি তাইনা।? ”

__ “ কি ভেবেছিলে তুমি? ”

__ “ এই ঘরে এতো ফুল দিয়ে সাজানো কেনো? ”

__ “ গতরাতে তো তোমার আমার ফুলসজ্যা ছিলো। তুমিই তো ঘুমিয়ে গিয়ে সব নষ্ট করে দিলে। ”

__ “ ফুলসজ্যা তে কি হয়? ”

__ “ দেখবে ”

__ “ হু দেখান ”

শুভ নিরুকে টান দিয়ে বুকের সাথে জড়িয়ে নেয়, নিরুর পিঠে হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে।
__ “ এমন করছেন কেনো, ছাড়ুন না। ”

__ “ তুমিই তো দেখতে চাইলে। ”

__ “ এটা কি ফুলসজ্যা নাকি? ”

__ “ ফুলসজ্যা দেখানো যায় না করে দেখাতে হয়। ”

চলবে……….

প্রেমের_পরশ পার্ট_7

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here