প্রেমের_পরশ পার্ট_5

প্রেমের_পরশ
পার্ট_5
#জামিয়া_পারভীন

__ শুভ সোফায় বসে বই পড়ছিলো এই সময় নিরু বের হয়ে আসে। নিরুর মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখে শুভর মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। মাথার চুলগুলো টাওয়েল দিয়ে খোঁপার মতো করে বেধেছে, লাল ব্লাউজ আর পেটিকোট পড়ে শাড়ি কোন রকমে পেচিয়ে বের হয়ে এসেছে। শাড়ি ভালো করে না পড়তে পারায় নিজেকে ঢাকার বৃথা চেষ্টা করছে নিরু। ভেজা চুল, সিক্ত শরীরের নিরু শুভকে কাছে টানছে। শুভ উঠে ঘরের দরজা টা লাগিয়ে দেয়, নিরুর দিকে এগোতে থাকে।

__ “ দরজা কেনো লাগাচ্ছেন? ” কাঁপা কণ্ঠে বলে নিরু।

__ শুভ কোন কথা না বলেই এগিয়ে যায়, নিরু কিছুটা সংকোচ, কিছুটা ভয়ে পিছনে সরে আসে। শুভ নিরুকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে, নিরু কোন দিকেই যেতে পারছেনা, মাথা টা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে নিরু। শুভ নিজের গাল টা নিরুর গালে নিয়ে গিয়ে আলতো ছোঁয়া দেয়। নিরু কেঁপে উঠছে “ উঁ উঁ ” শব্দ করে মুখে। শুভ গাল সরিয়ে এনে শাড়ি টা খুলে সুন্দর করে পড়িয়ে দেয়, শাড়ির কুচি পেটের কাছে গুঁজে দেবার সময় শুভর হাতের স্পর্শে নিরু বারবার কেঁপে কেঁপে উঠছিলো। শুভ নিরুর হাত ধরে টেনে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড় করায় নিরুকে, প্রথমে চুল আঁচড়িয়ে দেয় শুভ, নিরুর হাত ধরে হাতে হালকা করে লোশন লাগিয়ে মুখে স্নো দিয়ে দেয় শুভ , এরপর পিছন থেকে এক হাত মুখে আরেক হাত পেটে রেখে আয়নায় নিরুকে দেখে বলে জাস্ট অপুর্ব, এতো রূপ এতক্ষণ কোথায় লুকিয়ে রেখেছিলে সুন্দরী। নিরু কিছুটা লজ্জায় সরে যেতে চাইলে শুভ এক ঝটকায় কাছে টেনে নেয়, মাথার পিছনে হাত দিয়ে নিরুর মুখ টাকে কাছে নিয়ে আসে গালে একটা চুমু দিতেই নিরু কাঁদতে শুরু করে। নিরুর নিঃশব্দে কান্নার চোখের পানি শুভর নাক স্পর্শ করে। নিরুকে ছেড়ে দিয়ে দূরে এসে দাঁড়ায়,

__ “যদি অন্যায় কিছু করে ফেলি তাহলে দূরে চলে যেতে পারো।” একটু রাগী গলায় বলে শুভ।

__ নিশ্চুপ ভাবে দাঁড়িয়ে আছে নিরু।

__ “ কি হলো? কথা বলছোনা কেনো? ”

__ নিশ্চুপ

__ এবার রাগী গলায় জোরে করে বলে ফেলে, “ যাও সামনে থেকে কখনো আর সামনে আসবেনা। ”
নিরু ভয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। দুপুর হয়ে এসেছিলো বিধায় সিড়ি বেয়ে নিচে নামতেই রিমি এসে ভাবী বলে জড়িয়ে ধরে।

__ “ ওয়াও, ভাবী তুমি এতো সুন্দরী, লাল শাড়ি তে তো তোমায় লাল পরী লাগছে গো, আমার ছোট ভাইয়া তো তোমার দিক থেকে মুখ ই ফেরাতে পারবেনা। ”

__ “ নাহহ, মানে, সবাইকে খেতে দিতে হবে তো, চলো যাই রান্নাঘর এ। ”

__ “ হু, শুনলাম, তুমি আজ রান্না করেছো, প্রথমদিন এসেই মায়ের মন যোগাতে শুরু করেছো। ভালো ভালো চালিয়ে যাও, জানি তুমি পারবে আমার রাগী ভাই টাকে প্রেমের ছোঁয়া তে স্বাভাবিক করে তুলতে। ”

__ “ আমি তো কিছুই করিনি তেমন, উনি খুব রেগে আমাকে বের করে দিয়েছে। ”

__ “ কেনো কি হয়েছে? ”

__ “ ভয় পেয়েছিলাম খুব তাই। ”

__ “ কিসের ভয়? ”

__ “ ও কিছুনা, পরে বলবো, চলো যাই। ”

__ “ ওকে চলো তাহলে। ”

রিমি আর নিরু সমবয়সী, দু’জনে ই একাদশ শ্রেণী তে পড়ে কিন্তু কলেজ ভিন্ন। তাই ওদের ননদ ভাবীর সম্পর্ক বেশ জমে উঠেছে।
,
দুপুরে যারা বাসায় আছে সবাই কে ডাক দিলো শুভর মা, বাসায় যতজন থাকবে সবাইকে এক সাথে খেতে বসতে হয়। ডাইনিং টেবিলের এক পাশে শুভর বাবা, পাশে মা, অপর পাশে সাগর, তার পাশে রুবি, শুভর মায়ের পাশে রিমি নিরুকে নিয়ে বসেছে, শুভ পরে এসে বাধ্য হয়ে নিরুর পাশে বসে। খাওয়ার সময় সবাই চুপচাপ খেয়ে নেয় কিন্তু আজ শুভর বাবা রান্নার প্রশংসা করে, এতে রুবির জ্বলে যাচ্ছে, রিমি তো খুব খুশি হয়েছে আর প্রশংসা করছে “ এমন খাবার কখনো খায়নি, ইয়াম্মি ”।
__ শুভর মা বলে “ দেখতে হবেনা রান্না টা কার। ”

__ “কে রান্না করেছে আম্মু? ” রিমি জেনেও বলে।

__ “ কে আবার? আমাদের লক্ষ্মী নতুন বউ। ” শুভর মা বলে।

__ “ বড় ভাবী নাকি? ” রিমি জিজ্ঞেস করে।

__ “ ওর মতো বড়লোক এর মেয়ে রান্না জানবে নাকি, যার তার কাছে রান্না জিনিস টা কখনো ভালো হয় না।
বুঝলি বোকা মেয়ে, এটা আমার ছোট বউমার রান্না ”

__ “ হুহহহ, রান্না করে মনে হচ্ছে বাড়ি কিনে নিয়েছে। ” মনে মনে রুবি বলছে।

__ “ আম্মু, রুবিও ভালো রান্না পারে। ” সাগর বলে উঠে।

__ “ কই ঘর থেকে তো একবার ও বের হলো না, বাসায় যে শ্বশুর শাশুড়ি আছে, কই দেখা ও তো করতে আসেনি। ভদ্রতা বলেও তো কোন কথা থাকে নাকি। বড় ঘরে জন্ম নিলেই বড় হওয়া যায় না, ওর বোন টা কে দেখেও ওর শিখার আছে। ” শুভর বাবা বলে।

নিরু চুপচাপ খাবার সামনে নিয়ে বসে সবার কথা শুনছিলো, শুভ এতক্ষণ নিরুর দিকে আড়চোখে দেখছিলো, নিজের বউয়ের প্রশংসা শুনে কোথায় খুশি হবে উল্টো মেজাজ গরম করে বললো

__ “ রান্না ভালো হয়েছে, সবাই খাবে, খাবার টেবিলে এতো কথা বলার কি আছে? এতো সুনাম করিও না, অহংকার বেড়ে যাবে। ” রাগ দেখিয়ে খাবার টেবিল ছেড়ে উঠে চলে যায় শুভ।

খাবার টেবিলে থাকা শুভর খালামণি বলে উঠে
__ “ তাই তো, এতো সুনাম করার কি আছে আপু, বউ বিগড়ে যেতে কতক্ষণ। আআপনাদের মন ভুলাচ্ছে বুঝছেন না কেনো? ”
__ “ আচ্ছা বাদ দে, এখন খেয়ে ঘরে যা। ” বোন কে বলে শুভর মা।

সবাই খাওয়া দাওয়া করে রুমে চলে যায়, বিয়ে বাড়ি বলে আত্নীয় সজন আছে কয়েকজন। নিরু রিমির সাথে রিমির রুমে গিয়ে বসে বসে কাঁদতে থাকে।
__ “ কি হয়েছে, কাঁদছো কেনো? ঘরে যাবে না? ” রিমি

__ “ নিষেধ করেছে উনার সামনে যেতে ”, বলেই কান্না শুরু করে।

,
শুভর খালা শুভকে ঘরে একা পেয়ে গল্প জমায়, গল্পের এক পর্যায়ে বলে

__ “ এই শুভ, আগে তো ভেবে দেখিনি, এখন তো চিন্তায় আমার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। ”

__ “ কি হয়েছে সেটা খুলে বলো। ”

__ “ তোর বউ মানে নিরু, কাল যে তোর উপরে পড়লো, কিভাবে পড়ে গেছে জিজ্ঞেস করেছিস কিছু? ”

__ “ না সেভাবে কিছুই বলেনি, ছোট মেয়ে পা পিছলে পড়ে যেতেই পারে। ”

__ “ না রে এতো সহজে নিস না ব্যাপার টা, নিশ্চিত ওই মেয়ে ছাদে কারো সাথে অকর্ম করতে গিয়েছিলো, নইলে বিয়ে বাড়ির এতো মানুষ রেখে ছাদে কেনো যাবে বল? ”

__ “ তুমি এসব কি বলছো? যা বলার ভেবে বলছো কি? ” একটু রেগে জিজ্ঞেস করে।

__ “ ওরে বাপরে! আমাকে রাগ দেখাচ্ছিস কেনো? বউকে ডেকে জিজ্ঞেস কর, যদি তোতলায় তাহলেই ধরে নিবি কোন অকর্ম করতে গিয়ে পড়ে গেছে। ”

__ শুভর মেজাজ চরম পর্যায়ে খারাপ হয়ে গেছে “ এখন যাও তো তুমি, পরে আসিও, ভালো লাগছেনা কিছুই।”

__ “ কথা গুলো ভেবে দেখিস বাবা ”।

__ “তুমি কি যাবে? ” চিৎকার করে উঠে শুভ

ভদ্রমহিলা আর কথা বলার সুযোগ না নিয়ে ভালোই ভালোই রুম থেকে কেটে পড়ে। এদিকে শুভর মাতগা গরম হয়ে গেছে। মাথা গরম করে নিরু বলে চিৎকার দেয়।

দুই ঘর পরে রিমির ঘর, ডাক শুনে ভয়ে ভয়ে নিরু এগিয়ে আসে।
শুভ নিরুকে দেখে দরজা লাগিয়ে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে, আরেক হাত দিয়ে থুতনিতে চেপে ধরে জিজ্ঞেস করে

__ “ কাল ছাদে কি করতে গিয়েছিলে? ”

__ “ কক ক খ ন ”

__ “ ন্যাকামি করো? ” থুতনি আরোও জোরে চাপ দিয়ে বলে “ যা জিজ্ঞেস করছি তার সোজা উত্তর দিবে বুঝলে? ”

__ “ লা আ আ আ গছে তো ”

__“ লাগুক, সত্যি কথা বলো বলছি। ”

__ “ আমি বলছি তো, ছাড়ুন বলছি। ”

__ “এভাবেই বলো। ”

__ “ কাল আপুর আম্মু আমাকে খুব বকে, গালি দেয়, আমার পরিচয় বিয়ে বাড়ির মানুষের সামনে কিভাবে দিবে তাই আমি ছাদে গিয়ে লুকিয়ে ছিলাম। ”

__ “ তাহলে পড়লে কিভাবে ? ”

__ “ ছাদে যখন একা ছিলাম, হাটতে হাটতে পা ফসকে পড়ে যায়। ”
শুভ নিরুকে চড় মেরে দেয়।
__ “ অসভ্য, চরিত্রহীনা, মিথ্যে বলতে লজ্জা করছে না। কাল পড়ে যাওয়ার সময় তোমার গায়ে ওড়না ছিলো না। যদি চরিত্রহীনা না হতে তো সকাল থেকে আমার আদর উপেক্ষা করতে না। ”

__ “ আপনি ভুল বুঝছেন। ”

__ “ তো সত্যিই টা কি? ”

__ “ আমি যখন ছাদে ছিলাম তখন, রাকিব এসেছিলো। বিয়ে বাড়ির চিৎকারে আমার সর্বনাশ করতে চেয়েছিলো, আমি পিছনে সরতে গিয়ে কখন ধারে চলে গেছিলাম খেয়াল করিনি, হটাৎ সে ওড়না ধরে টান দেয়, নিজেকে সামাল দেয়ার আগেই আমি পড়ে যায়। ভেবেছিলাম মরেই গেছি আমি। কিন্তু আপনি বাঁচাবেন বুঝতে পারিনি। আমি চরিত্রহীনা নই, প্লিজ বিশ্বাস করুন, তখন আপনাকে আমি ভয় পেয়ে দূরে সরে গিয়েছিলাম। আমার খুব ভয় করছিলো তাই , কাঁদতে শুরু করেছিলাম। সত্যিই আমি কোন দোষ করিনি প্লিজ বিশ্বাস করুন। ” খুব কান্না করতে থাকে নিরু।

শুভ আর কথা না বলে রুম থেকে বের হয়ে যায়। নিরু নিষ্পাপ সেও জানে কিন্তু ওকে বকাবকি করাতে এখন অপরাধ বোধে ভুগছে। সন্ধ্যা গড়িয়ে শুভ রুমে ফিরে আসে, নিরু তখন ও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে যেখানে রেখে গিয়েছিলো সেখানেই।

চলবে…..

প্রেমের_পরশ পার্ট_5

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here