একটি পানকৌড়ির গল্প…..!   পর্ব –৩

0
315
একটি পানকৌড়ির গল্প…..!
আফতাব সাহেব বসার ঘরে পাটিতে আসন পেতে বসে আছেন। বসার ঘরে সোফার সেট থাকা সত্ত্বেও তিনি পাটিতে আসন পেতে বসতেই পছন্দ করেন। ছোটো বেলায় তার বাবা পাটিতে তিন ভাইবোন কে আসন পেতে বসে পড়াতেন।
তার বাবার তিন জনের জন্য পড়ার টেবিল চেয়ার কেনার সামর্থ্য ছিলো না।
আফতাব হোসেন বসার রুমের দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখলেন ৭ টা বেজে ১০ মিনিট। লোকটার ৭ টায় চলে আসার কথা কিন্তু আসছে না। বাড়ির ঠিকানা কি ভুল দিয়েছেন? তার যতটুকু মনে পড়ে বাড়ির ঠিকানা ঠিক লিখেছিলেন। তাহলে? এটা তো ঢাকা শহর না যে কোনো বাড়ি খুঁজে বের করতে ঘাম ছুটে যাবে। ফরিদপুর একটি মফস্বল, এখানে কোনো বাড়ি খুঁজে বের করা কঠিন বিষয় না।
তবে কি লোকটা অসুস্থ নাকি মেয়েটা অসুস্থ?
তার বাসায় আসতে বলাতে হয়তোবা লোকটার কাছে খারাপ লেগেছে। ফী টা নেয়া উচিৎ ছিলো।
আফতাব হোসেন নিজের উপরই বিরক্ত হলেন। আজকে তার দিনটাই বিরক্তিকর। শুধু এর উপর ওর উপর বিরক্ত হচ্ছেন। তার বন্ধু দিনু ঠিকই বলেছিলো।
– শোন আফতাব খবরদার তুই মনোবিজ্ঞান নিস না।
আফতাব অবাক হয়ে বলেছিলেন
– কেনো রে?
– তুই এমনিতেই পাগল আরো পাগল হয়ে যাবি।
কথাটা বলে দিনু উচ্চস্বরে হাসতে শুরু করেছিলেন। দীনু ছেলেটা এমনিতেই হাসে। কারণে অকারণে হাসে তার হাসির কোনো কারণ লাগে না তার হাসতে। আর যদি কারণ পেয়ে যায় তাহলে তো কথাই নেই। দীনু টার সাথে অনেক দিন কথা হয়না। যোগাযোগ কেন যেন বন্ধ হয়ে গেলো।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন ৭ টা বেজে ১৫ মিনিট। এতোক্ষণে মাত্র ৫ মিনিট পার হয়েছে? আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সূত্র কাজ করছে। সময় বিষয়ক একটা সূত্র। সূত্রটা যেন কী?
অলস মস্তিষ্ক শয়তানের বাসা – মা কথাটা ঠিকই বলতেন।
কোনো একটা কিছু করা দরকার। আফতাব হোসেন তার স্ত্রীকে ডেকে বললেন
– রেহানা আমার নতুন খাতাটা নিয়ে আসো তো।
রেহানা বেগম কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন
– কীভাবে বুঝবো কোনটা নতুন খাতা?
– আমার বিছানার উপর ইংরেজিতে ইউনিভার্সিটি লিখা একটা চকচকে ২৫০ পৃষ্ঠার নীল রঙের খাতা আছে। সাথে একটা পেন্সিল ও রাবার রাখা আছে। বুঝেছো রেহানা?
রেহানা বেগম কিছু না বলে শোবার ঘরে গিয়ে বিছানার উপর খাতা পেলেন সবই ঠিকঠাক কিন্তু রঙটা মিলেনি। খাতাটার রঙ লাল।
ছেলে দুটো এখনো পড়তে বসেনি। লুডু খেলছে। এই দাইন শেষ করে মা আমরা দুজনেই পড়তে বসবো। কিন্তু তাদের দাইন আর শেষ হচ্ছে না।
রেহানা বেগম খাতাটা স্বামীর হাতে দিয়ে বললেন
– নাস্তা তো বানানো শেষ তোমার সেই অতিথি কই?
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন ৭ টা বেজে ২০ মিনিট।
– আসবে হয়তোবা রাস্তা হারিয়ে ফেলেছেন।
কলিং বেল টুং করে বেজে উঠলো। আফতাব হোসেন হাসি মুখে বললেন
– এইযে এসে পড়েছেন। দরজা আমি খুলছি তুমি নাস্তা নিয়ে এসো।
রেহানা বেগম বসার ঘর ছেড়ে রান্নাঘরের দিকে এগোলেন।
দরজা খুলে ফারিয়ার বাবাকে দেখে হাসিমুখে বললেন
– ভিতরে আসুন।
ফারিয়ার বাবা ভিতরে ঢুকে দাঁড়িয়ে রইলেন। আফতাব হোসেন দরজা আটকে দিয়ে প্রসন্ন মুখে বললেন
– বসুন আপনি।
ফারিয়ার বাবা ডানদিকের সোফাটায় বেশ অস্বস্তি নিয়ে বসলেন। তার আসার কোনো ইচ্ছা ছিলো না। মেয়েটার জন্য এখানে আসা।
আফতাব হোসেন পাটির উপর ফারিয়ার বাবার মুখ বরাবর আসন পেতে বসলেন।
ফারিয়ার বাবা অবাক হলেন। ডাক্তার সাহেব এরকম কেনো করলেন? আমাকে সোফায় বসিয়ে নিজে পাটিতে বসলেন?
আফতাব হোসেন বিষয় টা কিছুটা আঁচ করতে পেরে বললেন
– আসলে আমার অভ্যাস এভাবে বসার। চেম্বারে ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে চেয়ারে বসে থাকতে হয়। আপনি কিছু মনে করবেন না।
ফারিয়ার বাবা বললেন
– আপনার সাথে বসলে কি রাগ করবেন?
– তা করবো না কিন্তু আপনি নিচে বসতে পারেন না। আপনি আমার অতিথি। হিন্দুরা অতিথি কে বলে লক্ষী আর নিজেদেরকে বলে প্যাঁচা! আর ইসলাম ধর্মে আল্লাহ তায়া’লা খুব খুশি হলে কোনো লোকের উপর তখন তাদের বাসায় অতিথি পাঠায়! আল্লাহ আমার উপর আজ অনেক খুশি।
– আমার একটু তাড়া আছে। মানে মেয়েটা……
আফতাব হোসেন লাল রঙের খাতার প্রথম পৃষ্ঠায় বড় করে ফারিয়া নাম টা লিখলেন।
– আপনার নাম?
ফারিয়ার বাবা প্রশ্নোত্তর পর্বের জন্য প্রস্তুত ছিলেন।
– রশীদ আলম।
– বয়স ৩৬
– বিয়ে করেছেন কতো বছর আগে?
– প্রায় ১৫ বছর।
– মাত্র ২১ বছর বয়সে বিয়ে করেছিলেন? আর ওই সময় বেকার ছিলেন?
– না বাবার মুদির দোকানে বাবার সাথেই থাকতাম।
– এখন কী করেন? পড়াশোনা মনে হয় তেমন করেননি?
– এখন ওই মুদির দোকানেই আছি। পড়াশোনা হয়নি।
– ফারিয়ার বয়স কতো?
– ১১ বছর।
– ওর জন্মের আগে বা সময় বা পরে ওর মায়ের কোনোরকম শারীরিক বা মানসিক সমস্যা হয়েছিল?
– বাচ্চা পেটে আসলে তো সব মেয়েরই শারীরিক সমস্যা হয়।
– না না সেরকম কিছু বুঝায়নি। ধরুন স্বাভাবিক সমস্যা গুলো বাদে অস্বাভাবিক কিছু?
– না।
আফতাব হোসেন খেয়াল করলেন রশীদ আলমের অস্বস্তি বোধ টা বেড়ে গেছে। কোনো প্রশ্নের উত্তরই তিনি সহজ ভাবে দিচ্ছেন না। কিছু প্রশ্নের উত্তরে মিথ্যা বলছেন।
আফতাব হোসেন গম্ভীরস্বরে বললেন
– দেখুন মানসিক রোগ গুলোর সমাধানের ক্ষেত্রে আমাদেরকে রোগীর পরিবার, কাছের লোক, আশেপাশের পরিবেশ, অতীতের ঘটনা সহ অনেক কিছুই জানতে হয়। তাছাড়া আমরা সঠিক সমাধান দিতে ব্যর্থ হই। আর আপনার মেয়ের অবস্থা খুব বেশি খারাপ। সে একটা স্বপ্ন আজ ৬ বছর যাবত দেখে যাচ্ছে। একই নিয়মে, একই স্বপ্ন।স্বপ্নটা তার বাস্তব জীবনেও প্রভাব ফেলেছে। এই বয়সে তার স্কুলে যাবার কথা কিন্তু সে যেতে পারছেনা। বুঝতে পারছেন কি বলেছি?
রশীদ আলম মাথা নিচু করে বললেন
– অল্পবয়সে প্রেম করে ধনীর দুলালীকে বিয়ে করেছিলাম। খুব ভালোবাসতাম সেও বাসতো। বিয়ের ৪ বছরে মেয়েটা জন্ম নেবার পর আমাদের সংসারে বেশ টানাটানি চলে আসে। বাবা অনেক দেনা ছিলেন। দেনা মেটানোর জন্য দোকান টা বিক্রি করে দিলেন। পুরো বেকার কিন্তু মাথার উপর ৫ জনের সংসার। বাচ্চা হওয়ার পর মেয়েদের অনেক যত্ন দরকার হয় কিন্তু আমি কিছুই করতে পারিনি। ফারিয়ার বয়স যখন ১ মাস তখন ওর মা চলে যায়। ফারিয়ার ছোট্ট বালিশের নিচে চিঠি লিখে রেখে চলে গিয়েছিল।
রশীদ আলম আর কিছুই বলতে পারলেন না।
আফতাব হোসেন জিজ্ঞেস করলেন
– কী লিখা ছিলো চিঠিতে?
– রশীদ,
     আমি চলে যাচ্ছি। ফারিয়াকে তোমার কাছে রেখে গেলাম। বাবা আমাকে গ্রহণ করলেও ফারিয়াকে করবে না। আমাকে ফেরানোর চেষ্টা করবেনা। তুমি আমাকে পারলে ক্ষমা করো!
– আপনি তাকে আনতে যাননি?
– গিয়েছিলাম। দারোয়ান আমাকে গেটের সামনেই দাঁড়িয়ে থাকতে দেয়নি। কয়েকবার ফারিয়ার মা বারান্দায় এসে আমাকে দেখে গিয়েছে কিন্তু……
রশীদ আলম নীরবে কাঁদতে লাগলেন মাথা নিচু করে। জীবন টা শুধুই বিষাক্ত স্মৃতি তে পরিপূর্ণ তার।
চলবে…….
© Maria Kabir

 

একটি পানকৌড়ির গল্প…..  পর্ব ২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here