জীবনের রঙ

0
181

জীবনের রঙ

লেখা –সুলতানা ইতি

মনিষাদের বাড়িতে সবাই খুশি,আত্মীয় স্বজন,পাড়া প্রতিবেশির হাসি ঠাট্টা ঘরটা পুরো মাতোয়ারা,
কাদছে মনিষা, এটি দুঃখের কান্না নাকি সুখের আদৌ কেউ আঁছ করতে পারছে না,

আজ মনিষার হলুদ ছোঁয়া, এমন না যে বর তার পছন্দ হয়নি,তবুও কাঁদছে মাকে ঝড়িয়ে ধরে

সবাই বলা বলি করছে মনিষা খুব লক্ষি নইলে ওমন ছেলের সাথে তার বিয়ে হয় কি করে,নম্র ভদ্র আদপ কায়দা, তা ছাড়া টাকা পয়সার ও অভাব নেই বলা যায় দেশের টপ বিজনেসম্যান দের মধ্য একজন,

মনিষার খুব পছন্দ হয়েছে মুহিব কে,
মুহিব ও মনিষাকে একবার দেখেই পছন্দ করেছে,তবু ও মনিষার কেনো কান্না আসছে তার জানা নেই,হয়তো মা বাবা কে ছেড়ে থাকতে হবে সেই ভয়,

যথা সময়ে বিয়ে সম্পূর্ণ হলো,
মনিষা বাবার রাজ্য ছেড়ে স্বামির রাজ্যে প্রবেশ করে,
ফুলসজ্জার খাটে বসে আছে মনিষা,কিছুক্ষন পর সেই ঘরে আগমন ঘটলো মুহিবের

মুহিব খাটের পাশে বসে মনিষা কে বল্লো,
– মনি আজ থেকে এ বাড়ি তোমার, আমার মা বাবা ভাই বোন সবাই তোমার,আমি চাই তুমি সবার মনজুগিয়ে চলবে,

মনিষা নিচু স্বরে বল্লো
– স্বামি যদি ভালোবেসে পাশে থাকে তা হলে একটা নারির এই সব কিছুর সাথে মানিয়ে নিতে কষ্ট হয় না,

খাটে পা জুলিয়ে বসে ছিলো মুহিব
মনিষা উঠে মুহিব কে পা ছুঁয়ে সালাম করে

মুহিব কিছুই বল্লো না,আসলে তখন মনিষার কথা শুনে মহিব মুগ্ধ, তাই মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছিলো না
মনিষা মুহিবের পাশে গিয়ে বসে

মনিষা মুহিব কে বল্লো
– আপনি কি চিন্তিত কোন বিষয় নিয়ে
মুহিব- না তো,

চলো ফ্রেশ হয়ে নিবে
মুহিব আগেই ফ্রেশ হয়ে কোথায় যেন গেছে

মনিষা ফ্রেশ হয়ে এসে বসে আছে
মুহিবের আগমন রুমে, হাতে এক কাপ কফি

মনিষা একটু অভাকই হলো,কফি যখন এনেছে তখন দু কাপ আনলে কি বা ক্ষতি হতো,

মুহিব মনে হয় মনিষার মনে কথা টা বুঝতে পারে, বল্লো
– আজ আমাদের নতুন জীবনে প্রথম রাত আজ থেকে আমাদের দুজনের হাতে হাত রেখে পথ চলা শুরু
তাই এ রাত টা আমি অন্যদের মতো করে নষ্ট করতে চাই না,চলো বেলকনিতে গিয়ে দুজনে কফি খেতে খেতে গল্প করি

মনিষা উঠে যাচ্ছিলো
মুহিব বল্লো
– কোথায় যাচ্ছো

– কেনো আপনি তো বললেন কফি খেতে খেতে গল্প করবেন তাই কফি আনতে যাচ্ছি

মুহিব মৃদু হাসলো,
-আমি কফি নিয়ে এসেছি দুজনে এক কাপে করে খেতে চাই তোমার কি কোন আপত্তি আছে?

মুহিবের কথা শুনে মনিষা মৃদু হাসলো তার পর বল্লো
– নাহ আমার কোন আপত্তি নেই

মুহিব- চলো তা হলে বেলকনিতে, যদি ও এখন তোমার আমার মুখের এঁটো খেতে অস্বস্তি লাগবে তবু ও খেতে হবে,আজ থেকে আমাদের দুজনের মানিয়ে নিয়ে পথ চলা শুরু

সেদিন মনিষা আর মুহিব সারা রাত বেলকনিতে বসে দুজনের ভালো লাগা খারাপ লাগা জেনে নেয়
স্বপ্নের মতো করে রাত টা পার হয়ে গেলো,

বিয়ের চারদিন পর বিজনেস এর জামেলার কারনে মুহিব চট্রগ্রাম যাবে
তাড়াহুড়া করে ফাইল গুলো গুছিয়ে নিচ্ছে

মনিষা ওয়ারড্রব থেজে শার্ট পেন্ট, টাই ওয়ালেট এনে বিছানায় রাখলো মুহিবের যেন যাওয়ার সময় দেরি না হয়

অবশ্যই এটা মুহিব বলে দিয়েছে এখন থেকে অফিসে যাওয়ার সময় সব কিছু মনিষার পছন্দ মতো পরে যাবে
যেমন- আজ কি শার্ট পরলে ভালো হবে,তার সাথে কেমন টাই লাগবে ইটস ইটস,

মুহিব যাওয়ার সময় মনিষা কে বল্লো
– নিজের খেয়াল রেখো, আমার মা বাবার দিকে ও খেয়াল রেখো

মনিষা- আপনি ও নিজের খেয়াল রাখবেন
বিয়ের চারদিন ফেরিয়ে গেলো এখন ও মনিষা মুহিব কে আপনি বলে

মুহিব অভাক হলো না বল্লো
– আমি তোমাকে জোর করবো না আমাকে তুমি বলে ডাকার জন্য, তুমি সময় নিতে পারো এক মাস দু মাস কিংবা এক বছর

যখন কেউ কাউকে মন থেকে ভালোবাসতে শুরু করে তখন আপনা আপনিতেই মুখ দিয়ে তুমি শব্দ টা বেরিয়ে যায়, অনুমতির প্রয়োজন হয় না,

মুহিব চলে যায় চট্টগ্রামে পরদিন ফেরার কথা কিন্তু সেদিন কল আসে যাওয়ার পথে বাসের সাথে মুহিবের কারটি খুব খারাপ ভাবে এক্সিডেন্ট করে

কথা টা শুনেই মনিষা জ্ঞান হারায়
যখন জ্ঞান ফিরে তখন জানতে পারলো হাসপাতালে নেয়ার পথেই মুহিব মারা যায়,

মনিষার শ্বাশুড়ি সে যে হুস হারিয়েছে এখন ও হুস ফেরার কোন লক্ষন নেই
মনিষার শ্বশুড় মৃত ছেলের পাশে শুন্যদৃষ্টিতে বসে আছে

পাড়াপড়শিরা বলা বলি করছে
_আহ হারে মেয়েটা কি অলক্ষি বিয়ে হয়ে স্বামির বাড়িতে আসতে না আসতে,অমঙ্গল শুরু হলো,
আরেক জন, বলছে অমঙ্গল কি গো,পুরো রাক্ষুসি মেয়ে স্বামিকেই খেয়ে ফেল্লো

খবর পেয়ে মনিষার বাবা মা আসলো
তাদের একমাত্র মেয়ের কপাল টা যে এমন হবে ভাবতেও পারেনি,কতো আদর দিয়ে মেয়ে কে বড় করেছে,
মনিষার মা কি বলে মেয়ে কে শান্তনা দিবে সে ভাষা নেই তার কাছে,তিনি ভেবে পান না এখন মেয়ের হাতের মেহেদী ও শুকাই নি,,

প্রতিবেশী দের সব কথা ই মনিষা শুনছে,শুধু মুখ দিয়ে কোন কথা বের হচ্ছে না, যেন সব অনুভূতি ভোতা হয়ে গেছে ,, সন্ধার আগে আগে মুহিবের দাপন করা শেষ,

এতোক্ষনে মনিষার শ্বাশুরি মুখ খুল্লো
-এই রাক্ষুসি স্বামি খেকো মেয়ে আমার বাড়িতে কি করছে, এখনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও, আমার ছেলেটাকেই খেয়ে পেল্লো

মনিষা শ্বাশুড়ির কথা শুনে নিজের রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো,মনস্তির করে নিয়েছে সুইসাইড করবে,ফ্যানের সাথে নিজের শাড়িটা ঝুলিয়ে দিলো সব ঠিক করেছে,শুধু ঝুলে পড়ার বাকি

গলায় পাসি দিতে গিয়ে মনিষা থেমে যায় চোখের পানি শুকিয়ে গেছে তার, না আমি মরবো না,
মুহিব চলে গেছে তাতে আমার কোন হাত নেই আমি কি করে স্বামিখেকো হতে পারি সবাই বললেই কি আমি মরে যাবো,

আমার জীবন টা তো তাদের দেয়া নয়,আমার জীবনের উপর অত্যাচার করার কোন অধিকার আমার নেই, মুহিবের জীবনের মালিক যিনি তিনি মুহিবের জীবনের সমাপ্ত ঘটিয়েছে,আমি কেনো নিজেই নিজের জীবন শেষ করে পাপী হতে যাবো,
আরেকবার মনিষা চোখের পানি মুছে নিলো,চোখ মুছতে গিয়ে হাতে নজর পড়লো হাতের মেহেদী এখনো উঠেনি,কিন্তু জীবনের রঙ উঠে গেছে তাই বলে কি আমি নিজেকে নিঃশ্বেষ করবো
বাছতে হবে আমাকে লড়াই করে বাছতে হবে,

সমাপ্ত

কিছু কিছু গল্পের সমাপ্তি হয় না,অসমাপ্ত থেকে যায়,মনিষার জীবন টা ও এমন,

উৎসর্গ- চকবাজার র্টাজেডির আফরুজা সুলতানা স্মৃতি,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here