মাতৃত্ব পার্ট:২

0
105

মাতৃত্ব

পার্ট:২

#Rabeya Sultana Nipa

 

_আয়ান প্রাপ্তির কথা গুলো সহ্য করতে না পেরে প্রাপ্তির গালে এক থাপ্পড় দিলো।প্রাপ্তি কিছু বলছেনা শুধু চোখ দিয়ে পানি ঝরছে।

আয়ান -নিজের কাছে টেনে এনে। তোমাকে ছাড়া সুখে থাকার কথা আমি কখনোই কল্পনা করিনি।যেদিন তোমাকে বিয়ে করে এই বাড়িতে এনেছি সেইদিন নিজের কাছে নিজে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম তোমার সব দুঃখ গুলোকে নিজের করে নিয়েছি,তোমার চাওয়া পাওয়া গুলোকে নিজের করে নিয়েছি।ভেবেছি যদি বাঁচতে হয় তোমাকে নিয়েই বাঁচবো।আর সেই তুমি আমায় বাদ দিয়ে এতো কিছু ভেবে পেলেছো?

প্রাপ্তি -(চোখের পানি মুছে)এই বিয়ে তোমাকে করতেই হবে।আমি তোমার আর কোনো কথা শুনতে চাইনা।চলো মায়ের রুমে চলো।
প্রাপ্তি আয়ানের হাত ধরে টেনে আছমা বেগমের রুমে নিয়ে গেলো।

আছমা বেগম -আমাকে কথা শুনানো জন্য এইবার আমার ছেলেকে নিয়ে এসেছো? কিরে আয়ান বউয়ের হয়ে কি বলবি বল?

প্রাপ্তি -আপনার ছেলে আমার হয়ে কিছু বলতে আসিনি।শুধু বলতে এসেছে এই বিয়েতে সে রাজি।

আছমা বেগম-(আয়ানের দিকে তাকিয়ে)প্রাপ্তি যা বলছে তা কি সত্যি?

আয়ান প্রাপ্তির দিকে অনেকক্ষণ ছলছল চোখ নিয়ে তাকিয়ে হ্যাঁ বললো।
আয়ান মনে মনে ভাবছে,তুমি যখন তোমার স্বামীকে বিয়ে দেওয়ার এতো শখ জেগেছে দেখি এইবার সহ্য করো কিভাবে।আমি যতোটা না কষ্ট পাচ্ছি তার ছেয়েও দ্বিগুণ কষ্ট আমি তোমাকে দিবো।

প্রাপ্তি -মা! এইবার তো খেতে চলুন।আপনার ছেলেও কিছু খায়নি।

আছমা বেগম -ঠিক আছে চলো।

আছমা বেগমের খুশির শেষ নেই।ছেলেকে আবার নতুন করে বিয়ে দিবে। আত্মীয় স্বজন অনেককেই ফোন দিয়ে জানিয়েছে ছেলের বিয়ের কথা।কতো দিন পর মনে হচ্ছে এই ঘরে শান্তি পিরে এসেছে।
প্রাপ্তি ভাবছে আমি একজন কষ্ট পেয়েও যদি এই ঘরে শান্তি ফিরে আসে তাহলে এই কষ্ট আমি সারাজীবন পেতে রাজি।আয়ানের ও হয়তো বিয়ের পর পুরোনো সব ভুলে নতুন করে শুরু করবে।তখন হয়তো আয়ানের সুখটা নিজের চোখে দেখতে পাবোনা।কিন্তু এইটা তো জানোবো আমি চলে যাওয়াতে অনেকেই সুখে আছে।কথা গুলো ভাবতেই চোখের কোনে পানি চলে আসছে প্রাপ্তির।আয়ান দেখেও না দেখার ভাণ করে রুমে গিয়ে শুয়ে পড়লো।

প্রাপ্তি রুমে এসে আয়ানকে আর কিছু না বলে নিজেও শুয়ে পড়লো।কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসছে না প্রাপ্তির। বার বার আয়ানের দিকে তাকাচ্ছে।আর মাএ কয়টা দিন।হয়তো আর কখনো রাত জেগে এই মুখটা আর দেখা হবে না।মন কেন জানি বার বার বলছে প্রাপ্তি তুই ঠিক করিস নাই।এই মানুষটা তোকে অনেক ভালোবাসে।কিভাবে ছেড়ে থাকবি তাকে।
গভীর রাতে আয়ান উঠে দেখে প্রাপ্তি নিচে বসে তার দিকে তাকিয়ে আছে আর চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।

আয়ান -কি ব্যাপার ঘুমাওনি এখনো?
(কথাটা বলতে বলতে আয়ানও প্রাপ্তির পাশে এসে নিচে বসলো।)
এইভাবে নিচে বসে আছো কেন? নাকি আমার সাথে এখন এক সাথে ঘুমাতেও ইচ্ছা করেনা।

(প্রাপ্তি কিছু বলছে না চুপ করে বসেই আছে)
যখন এতোই ভালোবাসো আমাকে তাহলে চলে যেতে চাইছো কেন?

প্রাপ্তি -(কথা ঘুরানোর জন্য) এখনে বসে আছো কেন?যাও ঘুমাও।সকালে তোমার অফিস আছেতো।রাত জাগলে সকালে উঠতে পারবেনা।

আয়ান বুজেছে প্রাপ্তি কথা ঘুরাচ্ছে।প্রাপ্তিকে কিছু বলেও লাভ নাই।আয়ানের কথা প্রাপ্তি কিছুতেই শুনবে না।

দেখতে দেখতে বিয়ের দিন ঘনিয়ে এসেছে।বাড়িতে অনেক গেস্ট চলে এসেছে।আছমা বেগম এমন ভাবে সব সাজ্জাচ্ছে মনে হয় ছেলের এই প্রথম বিয়ে। আগের যে একটা বউ আছে এইটা তার মাথাতেও আসেনা।
সব কাজ নিখুঁত ভাবে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে করছেন।মেয়ে পক্ষের লোকেরা আছমা বেগমকে বলেছে আপনাদের ছেলের হয়তো দ্বিতীয় বিয়ে কিন্তু আমাদের মেয়ের তো এই প্রথম তাই সবকিছুর যেন কমতি না থাকে।আছমা বেগম তাদের কথা মতো সব করছেন।
এইদিকে প্রাপ্তির বাবা মাকেও আসতে বলেছেন।প্রাপ্তি আগেই তার বাবা মা কে বলে দিয়েছে যদি মেয়েকে সুখি দেখতে চায় তাহলে এখানে এসে যেন কোনো ঝামেলা না করে।মেয়ের অনুরধে তারা এসেছেন ঠিকি কিন্তু আগেই বলেছে যাওয়ার সময় প্রাপ্তিকে নিয়ে যাবে।
সকাল থেকে প্রাপ্তি রান্না করেই যাচ্ছে গেস্টদের জন্য।তার স্বামীর আজ গাঁয়ে হলুদ বলে কথা কিছু কম হলে তো চলবেনা।কার এমন ভাগ্যে আছে যে নিজের স্বামী কে বিয়ে দিচ্ছে অন্য মেয়ের সঙ্গে। কাজের চাপে আয়ানকে একবার ও দেখা হলো না আজ।সকাল থেকে সেও অভিমান করে আমার সামনে আসছে না।এতো অভিমান আমার উপর? ও জানেনা! আমি ওকে না দেখে থাকতে পারিনা।এই যাহঃ আমি এই গুলো কি ভাবছি আজ থেকেতো আমায় অভ্যাস করতে হবে।
আয়ান ভালো করেই জানে প্রাপ্তি তাকে না দেখে থাকতে পারবেনা।কিন্তু রাগ করেই সকাল থেকে তার সামনে যাচ্ছে না।দেখি কতো সহ্য করতে পারে।রুমে বসে বসে আয়ান পুরোনো এলবাম গুলো দেখতেছে।কতো স্মৃতি জড়িয়ে আছে প্রাপ্তির সাথে তার।এর কিছুই আমি ভুলতে পারবোনা।প্রাপ্তির মা এসে দেখে আয়ান এলবামের দিকে তাকিয়ে আছে আর চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে।

প্রাপ্তির মা-বাবা কেঁদে কি লাভ। তুমি আমার মেয়েকে ভালোবাসো আমরা সবাই জানি।আমার মেয়েটাও তোমাকে ভালোবাসে।হয়তো ওকে এইখান থেকে নিয়ে গেলে বাঁচবে কি না আল্লাহ ভালো জানে।

আয়ান -মা! আপনি ভালো করেই জানেন আমি এই বিয়ে করতে চাইনি।কিন্তু কি করবো বলেন? প্রাপ্তি আর মার চাপাচাপিতে বিয়েটা করতে হচ্ছে।প্রাপ্তি হয়তো আমার সুখের জন্য সব কিছু ছেড়ে যেতে ছাইছে কিন্তু বিশ্বাস করুন এই বিয়েতে আমি কখনোই সুখি হতে পারবো না।

রাতে সব কিছু শেষ করেই সবাই যেই যার মতো ঘুমাতে চলে গেলো ।আর আয়ান আছে প্রাপ্তি কখন তার রুমে আসবে।সন্ধ্যার পর থেকে দেখা হলেও তেমন কথা হয়নি প্রাপ্তির সাথে।অনেকক্ষন অপেক্ষা করার পর প্রাপ্তিকে না আসতে দেখে আয়ান নিজেই খুঁজতে গেলো।গিয়ে দেখে সে তার মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে। প্রাপ্তির চোখ দিয়ে পানি পড়ছে আর শাড়ীর আঁচল দিয়ে বার বার মুছছে। আয়ান অনেকক্ষন দরজায় দাঁড়িয়ে দেখছে।
আয়ানের দিকে হঠাৎ চোখ পড়াতেই তড়িঘড়ি করে উঠে বসলো।
কি ব্যাপার আয়ান তুমি এইখানে? ঘুমাওনি এখনো?

আয়ান এসে প্রাপ্তির পাশে বসলো।বিয়ের পর একটা রাতের জন্যও আমি তোমাকে রেখে ঘুমাইনি।চলো রুমে চলো।

প্রাপ্তি- আয়ান ! ওই রুমের প্রতি কাল থেকে আমার কোনো অধিকার থাকবেনা।তাই আজ থেকেই নিজেকে সরিয়ে নিলাম।আর আমাকে ছেড়ে থাকা আস্তে আস্তে তোমারও অভ্যাস হয়ে যাবে।আয়ান প্রাপ্তির কথায় কান না দিয়ে প্রাপ্তিকে কোলে উঠিয়ে নিলো।আয়ান প্রাপ্তির মায়ের দিকে তাকিয়ে মা আপনি কিছু মনে করবেন না।কি করবো বলেন? ভালো কথা ওর শুনতে ইচ্ছে করে না। তাই এইছাড়া আর কোনো উপায় দেখছিনা।

প্রাপ্তির মা -না বাবা আমি কিছু মনে করিনি।

প্রাপ্তি -আয়ান ভালো হচ্ছে না কিন্তু। নামাও আমাকে।
আয়ান প্রাপ্তির কোনো কথা না শুনেই প্রাপ্তিকে নিয়ে রুমে চলে এলো।
প্রাপ্তিকে দাঁড় করিয়ে কি বলবে এইবার বলো।সারাদিন তো দূরে দূরে ছিলে। এখন কথায় পালাবে?প্রাপ্তির! পালানো জায়গা এই আয়ানের বুকে আর কোথাও না।

প্রাপ্তি কিছু বলছে না।শুধু আয়ানের দিকে তাকিয়ে আছে।মন কেন জানি বলছে প্রাপ্তি এখোনো সময় আছে।আয়ানকে হারিয়ে যেতে দিওনা।

আয়ান – কি হলো কি ভাবছো?

প্রাপ্তি -কিছুনা।

আয়ান -কিছুনা হলে মুগ্ধ হয়ে আমাকে এইভাবে দেখছো কেন?

প্রাপ্তি -আজ শেষ বারের মতো তোমার কোলে মাথা রেখে ঘুমাতে দিবে? রাত প্রায় শেষ হয়ে এলো।একটু পর মা আবার ডাকাডাকি শুরু করবে।এই কিছুক্ষন না হয় তোমার কোলেই মাথা রেখে ঘুমালাম।

আয়ান ও কথা না বাড়ায়ে আচ্ছা চলো।

প্রাপ্তি আয়ানের কোলে মাথা রেখে চুপ করে করে শুয়ে আছে।সেই আর এই জগতে নেই।কোনো এক ভালোবাসায় সে হারিয়ে গেছে।
আয়ান প্রাপ্তিকে চুপ থাকতে দেখে,

আয়ান -প্রাপ্তি ! এই প্রাপ্তি ! ঘুমিয়ে গেছো?

প্রাপ্তি কোনো কথা বলছেনা।চুপ করে আয়ানকে আরও কাছে টেনে এনে আয়ানের ভালোবাসা অনুভব করছে।কথা বললেই কি যেন মিস হয়ে যাবে।কাল থেকে আয়ানকে তো আর এতোটা কাছে সে আর পাবেনা।
সকাল বেলা আয়ানকে ঘুমে রেখেই প্রাপ্তি উঠে চলে গেলো।বিয়ে বাড়ি বলে কথা বসে থাকলে চলবে না সব কিছু আমাকেই সামলাতে হবে।আজ এই জাগায় আমি আছি কাল থেকে অন্য কেউ এসে আমার নিজের হাতে সাজানো সংসারটা অন্য কারো হাতে থাকবে।
কথা গুলো ভাবতে ভাবতেই প্রাপ্তি সবার জন্য চা বানাতে গেলো ।
রান্নাঘরে গিয়ে দেখে আছমা বেগম নিজেই চা বানিয়ে পেলেছে।

প্রাপ্তি -আমি নিজেই এসে চা করতাম আপনি আমায় ডাকেননি কেন? শুধু শুধু আপনি কষ্ট করতে গেলেন।

আছমা বেগম-এতো কথা না বলে সবাইকে চা টা দিয়ে আসো।সবাইকে চা দিয়ে আয়ান কে উঠিয়ে দাও।

প্রাপ্তি সবাইকে চা দিয়ে আসার সময় দেখে আয়ানের ২ টা ফ্রেন্ড ড্রইংরুমে বসে আছে।
আরে ভাইয়া কখন এলেন আপনারা।কাল গাঁয়ে হলুদে আসেননি কেন?আয়ান কতো কষ্ট পেয়েছে বলুনতো।দেখেছেন? যার বিয়ে সে এখনো ঘুম থেকেই উঠিনি।কথায় আছে না যার বিয়ে তার খবর নেই পাড়াপড়শির ঘুম নেই।আমার হয়েছে সে এক জ্বালা।সব কিছু ওকে বলে বলে করাতে হয়।আর কাল থেকেতো আমি থাকবো না।হয়তো তার নতুন বউ এসে করবে।কথা গুলো অনবরতে বলে গেলো প্রাপ্তি ।
প্রাপ্তির এইরকম আচরণ দেখে আয়ানের ফ্রেন্ডেরা অবাক চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
রিমন -(আয়ানের ফ্রেন্ড) ভাবী! আপনি কিভাবে পারলেন নিজের স্বামীকে অন্য একটা মেয়ের হাতে তুলে দিতে।আমার জীবনে এই রকম মেয়ে আমি ফাস্ট টাইম দেখেছি।

নিহাদ-(আয়ানের ফ্রেন্ড) ভাবী এখনো সময় আছে।

প্রাপ্তি -না ভাইয়া! ওর সুখের জন্য আমাকে এইটুকু করতেই হবে।আচ্ছা এইগুলো বাদ দিন।আমি নাস্তা নিয়ে আসছি,আয়ান রুমেই আছে আপনারা ওর কাছেই যান।আবার ওই বাড়িতে যেতে হবে।দেরি হলে মা আবার বকাবকি করবে।

আয়ান ! আয়ান ! নিহাদ আর রিমনের ডাকে আয়ানে ঘুম থেকে উঠে বসলো।

আরে তোরা কখন এলি?

নিহাদ-অনেকক্ষণ। আচ্ছা তুই সত্যি এই বিয়েটা করছিস?

আয়ান -না করে আর উপায় কি।তোদের কে তো সব আগেই বলেছি।

চলবে,,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here