অজানা_অনুভূতি শেষ তথা ৩৬ পর্ব

0
420

অজানা_অনুভূতি
শেষ তথা ৩৬ পর্ব

#Rabeya Sultana Nipa

_সবকিছুই ঠিকঠাক ভাবেই চলছে।ফারহানের ভালোবাসার কাছে হার মেনে নিয়েছে প্রাপ্তি।প্রাপ্তি প্রেগন্যান্ট হওয়ার পর থেকেই বাবার বাড়ীতেই বেশী থাকা হয়।এই নিয়ে ফারহানও কিছু বলেনা।প্রাপ্তি যেইখানে ভালোলাগবে সে সেখানেই থাকবে।অফিস থেকে এসেই ফারহানের মনটা আজ ভালো নেই। ফ্রেশ না হয়ে হাত পা ছেড়ে দিয়ে খাটের উপর শুয়ে আছে।প্রাপ্তি নীরার রুমেই বসে গল্প করছে।একা একা রুমে থাকতে ভালো লাগছেনা। তাই নীরার সাথে গল্প করছে।কাজের মেয়ে রিতা এসে দরজায় দাঁড়িয়ে বললো, আপু! আপু! প্রাপ্তি পিছনে ফিরে তেকিয়ে, রিতা তুমি আমায় ডাকছো?

রিতা -হ্যাঁ,আপু ভাইয়া অফিস থেকে আসছে। আমি যখন কফি দিতে গিয়েছিলাম হাত পা গুলো ছেড়ে দিয়ে শুয়ে আছে।মনে হচ্ছে ওনার কিছু হয়েছে।
রিতার কথা শুনে প্রাপ্তি বসে না থেকে উঠে নিজের রুমের দিকে গেলো।ফারহান সত্যিই চোখ দুটো বন্ধ করে হাত পা ছেড়ে দিয়ে শুয়ে আছে।রিতা দিয়ে যাওয়া পাশের কফিটা ও ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।প্রাপ্তি ফারহানের মাথার পাশে বসে মাথায় হাত দিয়ে বুলাইতে বুলাইতে বললো,কি হয়েছে তোমার? এইভাবে শুয়ে আছো কেন?
আমার মনে হচ্ছে আমি নতুন কোনো ফারহানকে দেখছি, আমার ফারহান তো যতো ঝড়ই আসুক না কেন এইভাবে ভেঙে পড়েনা।উল্টো আমাকেই বুঝায় কিন্তু আজ কি হলো তুমি এই রকম করছো কেন?
ফারহান কিছু না বলে প্রাপ্তির কোলে মাথা রেখে শুয়েছে।ফারহান কিছু বলছেনা দেখে প্রাপ্তি আবার বললো কি হয়েছে তোমার বলবেতো।

ফারহান -কিছু হয়নি।ভালো লাগছিলো না অফিসে তোমাকে ছাড়া তাই চলে আসলাম।
ফারহানের কথা শুনে প্রাপ্তি অট্ট হাঁসি দিয়ে,ফারহান তুমিও না,,,,,এক কাজ করো অফিসে যাওয়ার সময় আমাকে নিয়ে যেও তুমি কাজ করবে আমি তোমার সামনে বসে থাকবো।

ফারহান -ধুর পাগলি সবসময় উল্টাপাল্টা কথা বলবে।যাইহোক খাওয়াদাওয়া করে ঔষধ খাইছো?

প্রাপ্তি -হুম,,,এইবার যাও ফ্রেশ হয়ে আসো,এই কফিটা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে আমি আরেকটা নিয়ে আসি।
কথাটা বলেই প্রাপ্তি উঠতে যাবে তখনি ফারহান হাত ধরে টেনে বসিয়ে কফি আনতে হবে না তুমি আমার পাশেই বসো,আচ্ছা তুমি বসো আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।তোয়ালে টা হাতে নিয়ে একটু হেঁটে গিয়ে আবার দাঁড়িয়ে পড়লো ফারহান।

প্রাপ্তি -আবার কি মনে পড়লো? দাঁড়িয়ে পড়লে কেন?

ফারহান প্রাপ্তির দিকে তাকিয়ে,তুমিও রেডি হয়ে নাও।

প্রাপ্তি- কেন, এখন এইসময় কথায় যাবো?

ফারহান -নাদিয়া বলছে তোমাকে নিয়ে যেতে।দেখতে দেখতে ৭ মাস কাটিয়ে দিলে।নাদিয়া সকালে ফোন দিয়ে বলেছে আজ চেকাপ করানোর জন্য।আমি ছেলে বাবু না মেয়ে বাবুর বাবা হচ্ছি দেখতে হবেনা?
কথাটা শুনে প্রাপ্তি মুচকি একটা হাঁসি দিয়ে বললো আজ না গেলে হয় না?
ফারহান প্রাপ্তির পাশে এসে বসে, না হয় না।আজকে তো আজকেই।আমার মন পাগল হয়ে আছে জানার জন্য। যদি আমাদের একটা পরী আসে তাহলে তুমি যা চাইবে তাই দিবো আর যদি ছেলে হয় তাহলে ভেবে তারপর বলবো।এখন যাও রেডি হও।আমি ফ্রেশ হয়ে আসি।

হাসপাতালে গিয়ে নাদিয়া চেকাপ করিয়ে প্রাপ্তির দিকে তাকিয়ে মুচকি একটা হাঁসি দিয়ে বললো, প্রাপ্তি! তুমি কি হলে খুশী হবে?

প্রাপ্তি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নাদিয়াকে বললো আল্লাহ্‌ খুশী মনে যাই দেয় তাই।

নাদিয়া -ভেরি গুড, তোমাদের ছেলে বাবু আসছে।কথাটা শুনেই প্রাপ্তি চুপ হয়ে গেলো।

নাদিয়া প্রাপ্তির মুখের দিকে তাকিয়ে, প্রাপ্তি! মন খারাপ করলে নাকি?
প্রাপ্তি মাথা নাড়িয়ে না বলে চেকাপ শেষে ফারহানের পাশে এসে বসেছে।প্রাপ্তির মন খারাপ দেখে ফারহান বললো মন খারাপ করে আছো কেন? কি হয়েছে বলবে তো।

প্রাপ্তি মন খারাপ করে,!ফারহান! তোমার পরী আমি এনে দিতে পারবোনা আমাদের ছেলে বেবি হবে।প্রাপ্তির মুখে কথাটা শুনে ফারহান আলহামদুলিল্লাহ্‌ বলে প্রাপ্তিকে জড়িয়ে ধরে বললো তুমি মন খারাপ করে আসছো কেন?

প্রাপ্তি -তোমাকে পরী দিতে পারলাম না তাই।
ফারহান ধুর বকা আল্লাহ্‌ যা খুশী হয়ে দিয়েছেন তাতেই আলহামদুলিল্লাহ্‌।
কথাটা শুনার পর প্রাপ্তির ঠোঁটের কোনে হাঁসির ঝিলিক ফুঠেছে দেখে বললো এতো অল্প হাঁসলে হবে আরো জোরে হাঁসোতো।
প্রাপ্তি সত্যি সত্যিই না হেঁসে পারলোনা।

বাড়িতে এসে কলিংবেল চাপ দিতেই প্রাপ্তির মা দরজা খুলে দিলো। প্রাপ্তি ভিতরে এসে ড্রইংরুমে বসলো। সবাই একি কথা জিজ্ঞাস করছে নতুন সদস্য কি আসতে চলেছে?
ফারহানকে তো নীরা আর নাজিফা ভালো করে ছেপে বসেছে।তারপর প্রাপ্তি বললো আমি বলছি, এইদিকে আয় তোরা।নীরা আর নাজিফা এগিয়ে আসতেই প্রাপ্তি বললো তোরা ছেলে বাবুর খালামনি হচ্ছিস।কথাটা শুনে সবাই খুশীতে আত্যহারা।মেজো মা,মাজো কাকাইকে ফোন দিয়ে আসার সময় মিষ্ট নিয়ে আসবা। তুমি তো নাতিনের নানা হয়ে যাচ্ছো।
আজ এই বাড়ীতে সবাই খুশী, আবার আগের মতো সব কিছু ফিরে এসেছে।দিন মাস কখন যে চলে যায় কেউ টেরি পায়না।তেমনি প্রাপ্তির ও আজ ডেলিভারি সময় হয়ে আসছে।সবাই হাসপাতালে অপেক্ষা করছে।ফারহান তো বাচ্চাদের মতো কেঁদে কেঁদে চোখ গুলোকে ফুলিয়ে ফেলেছে।একটু পর বাবুকে নিয়ে দুইজন সিস্টার এসে বললো বাচ্চাকে কে কোলে নিবেন আসেন।সবার আগে মেজো কাকা আর নীরা গেলো।মেজো কাকা হাত পেতে কোলে নিতে যাবে তখনি সিস্টার বললো এইভাবে তো কোলে নাওয়া যাবেনা।

মাজো কাকা -তাহলে কি করতে হবে আগে বলে পেলুন আমার আর সহ্য হচ্ছে না।

সিস্টার -(মুচকি হাঁসি দিয়ে)দশ হাজার টাকা ছাড়ুন তারপর।আর না হলে আমাদের কাছেই থাকুক।

মেজো কাকা -আরে আপানারা কোথায় যাচ্ছেন।(পকেট থেকে পাঁচ হাজার টাকা বের করে)টাকাটা সিস্টারদের হাতে দিয়ে আপাদত আমার কাছে এটাই আছে। এইবার আমার কোলে দিন।

মেজো কাকার কাণ্ড দেখে সবাই না হেঁসে পারলোনা।কিন্তু বিষণ চিন্তাও হচ্ছে প্রাপ্তির জন্য।সবাই বাবুকে পেয়ে অনেক খুশী এই বলে আমার কাছে দাও, ওই আমার কাছে দাও।এইদিকে ফারহানতো বাবুর দিকে কোনো খেয়ালি নেই।বার বার অপারেশন রুমের দরজার দিকে তাকিয়ে আছে কখন প্রাপ্তিকে বের করবে।আচ্ছা প্রাপ্তি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে নাতো ।প্রাপ্তি এখন কি করছে।অনেক কষ্ট পেয়েছে মেয়েটা এতো অল্পবয়সেই সব কিছুর জন্য আমি দায়ী। ফারহানের মনের মধ্যে হাজারটা প্রশ্ন উকি মারছে।বড় ভাবী ফারহানকে নিছের দিকে তাকিয়ে বসে থাকতে দেখে বাবু কে কোলে নিয়ে ফারহানের সামনে এসে,

বড় ভাবী -ফারহান! দেখ তোর ছেলে ঠিক তোর আর প্রাপ্তির দুজনের চেহারাই পেয়েছে।
কথাটা বলা শেষ করতেই ফারহান নিছের দিক থেকে মাথাটা উঠিয়ে বড় ভাবীর দিকে চোখ গুলোকে বড় বড় করে তাকিয়ে আছে।এইভাবে তাকাতে দেখে বড় ভাবী একটু ভয় পেয়ে কিরে এইভাবে তাকিয়ে আছিস কেন আমার দিকে?তোর বাবু কোলে নিবিনা? তোর বাবুকে দেখ ঠিক তোদের মতোই হয়েছে।
ফারহান আর চুপ থাকতে না পেরে চিৎকার দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে তুমি কি আমার সাথে ফাইজলামি করতেছো।প্রাপ্তি ওইখানে একা একা অনেক কষ্ট করতেছে আর আমি বাচ্চা পেয়ে সব ভুলে যাবো? সবার দিকে তাকিয়ে আপনারা সবাই একটা কথা মনে রাখবেন আমার প্রাপ্তির যদি কিছু হয় না আমি এই বাচ্চার মুখ কখনোই দেখবোনা।
ফারহানকে কেউ এর আগে এতো রাগী ভাবে দেখেনি।ইমারান দৌঁড়ে এসে ফারহানকে জড়িয়ে ধরে প্লিজ তুই ঠাণ্ডা হও এতো উত্তেজিত হয়ে পড়িসনা সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে।

৪ বছর পর

বাবাই! বাবাই! তুমি এখনো ছাদে দাঁড়িয়ে আছো? জানো? তোমাকে আমি পুরো বাড়ী খুঁজেছি। ফারাবীর কথা শুনে ফারহান পিছনে ফিরে তাকালো।ফারাবীর কাছে এগিয়ে এসে তাকে আদর করে কোলে নিয়ে ফারহান বললো,
বাবা আমিতো প্রতিদিন বিকালেই ছাদে আসি তুমি জানো না?তুমি আমাকে পুরো বাড়ী না খুঁজে ছাদে চলে আসতে তাহলেই তো তোমার বাবাই কে পেয়ে যেতে।

ফারাবী -কুটকুটে হাঁসি দিয়ে আচ্ছা বাবাই তুমি প্রতিইইইইইই দিন ছাদে এসে ওই আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকো কেন? ওইখানে কি আমার আম্মু আছে?

ছেলের কথা শুনে ফারহান ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো।কি বলবে খুঁজে পাচ্ছিলোনা।
তাই ছেলেকে বললো নিছে চলো তারপর তোমাকে বলবো আমি কেন তাকিয়ে আকাশ দেখি।
ফারাবীকে কোলে করে এসে ড্রইংরুমে সোফায় ফারাবীকে বসিয়ে প্রজেক্টের কাগজ পত্র গুলো গুছিয়ে ফারাবীর পাশে বসে কাজ করছে।
বাবাকে কাজ করতে দেখে ফারাবী বললো কি হলো বাবাই বলো না কেন?
এমন সময় প্রাপ্তি দুই কাপ কফি নিয়ে আসতে আসতে বললো কী হয়েছে আমার লক্ষ্মী সোনাটার? ফারহান! ও কি জানতে চাইছে বলোনা কেন?

ফারহান হাতের কাজটা রেখে প্রাপ্তির থেকে কফি নিতে নিতে বললো, তোমার ছেলে জানতে চাইছে আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি কেন? ওই আকাশে কি ওর আম্মু আছে?কথাটা শুনে প্রাপ্তি একগাল অট্র হাঁসি দিয়ে ফারাবীকে কোলে নিয়ে বললো বাবা তোমার কেন এমন মনে হয়েছে আমি ওই আকাশেই থাকি?

ফারাবী -আম্মু তুমি বলো বাবাই যতোক্ষণ বাসায় থাকে তোমার দিকেই তো বেশীর ভাগ তাকিয়ে থাকে তাই আমি ভাবলাম তুমি ওই আকাশে আছো তাই বাবাই ওই আকাশ দেখে।ছেলের কথা শুনে এইবার প্রাপ্তিও ভ্যাবাচেকা খেয়ে বসে আছে।

(সারাজীবন সবার ভালোবাসায় কাটুক গভীর সুখের ও শান্তিতে।ছোট্র ছোট্র ভালোবাসা দিয়ে সুন্দর একটা সংসার গড়া যায়।সব ভুল গুলোকে শুধরে নিয়ে বেঁচে থাকুক সবার জীবনের ভালোবাসা।)

সমাপ্ত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here