বিশ্বাসঘাতকতা শেষ_পর্ব

0
191

বিশ্বাসঘাতকতা
শেষ_পর্ব
লিখা জান্নাতুল ফেরদৌস

-“আব্বা,”
-“এইদিকে আয়।”

আব্বার কাছে গেলাম।খুব ভালো করেই বুঝতে পারছি আমাকে কিছু বলার জন্য আব্বা ডেকেছেন।

-“তোর আম্মা তোর ব্যাপারে আমাকে ওইদিন যা যা বলল সব সত্যি!”
-“হ্যা…….এ…..।”

আব্বা অগ্নিমূর্তি হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন।এইদিকে ভয়ে আমার মনে হচ্ছে আমি এখনি আবারো অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাব।

-“ছেলেটা কোনখানের? নাম কি আর সে কি করে?”
-“আব্বা ওর নাম রেহান।আর সে………”

এরপর আর কিছু বলতে পারছিলাম না কারণ এরপর যা বলব তাতে আব্বা আমার কি অবস্থা করবে সেটা ভাবতেই……..
-“কিরে উত্তর দেস না কেন?বোবা হয়ে গেছস নাকি হারামী…।”
-“আব্বা ও চট্টগ্রামের ছেলে আর ও বেকার।”
-“কিহ!”
-“……………..”
-“তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে। তুই কি করে এইরকম একটা ছেলের সাথে রিলেশন করলি?তরে কলেজে ভর্তি করাইছি পড়ালেখা করার জন্য আর তুই…..! এমনিতেই তোর চেহেরার যে বাহার এরপর যদি চাকরি করতে না পারস তাহলে তোকে ভবিষ্যতে ভাত খাওয়াবে কে?তোর এইরকম অবস্থার কারণে যদি পরে তুই জামাইয়ের ভাত না খেতে পারস তখন করবিটা কি হ্যা?এইসব কি তোকে বারবার বুঝিয়ে দেওয়া লাগে বেয়াদব। তরে ভালো একটা জীবন দিতে চাইছি যদি তার মূল্য তুই না বুঝতে পারস তাহলে তোর এই মাগিরি বিয়ে দিয়ে আমি ছুটাইতাছি।এরপর বুঝবি কষ্ট কাকে বলে?বাপের হোটেলে খাও তো তাই ভালো লাগে না এরপর যখন নিজের কাধে সব কিছু আসবে তখন বুঝবা এইসব করে জীবনে কি ভুলটাই তুই করছস যা খান…..আমার সামনে থেকে যা…..।”
.
.
এইরকম কথা আর কানে নিতে পারছিলাম না। কি চাইলাম আর কি হয়ে গেল।আসলে আব্বা আম্মা প্রেম ভালোবাসা এইসব পছন্দ করে না।তাদের ইচ্ছা ছিল তারা নিজেরা আমার জন্য ছেলে দেখে পছন্দ করে আমার বিয়ে দিবে।তাই রেহানের সাথে আমার এই ভালোবাসার সম্পর্ক তারা মেনে নিতে পারছে না।
জীবনসঙ্গীকে ভালো বাসতে না পারলে জোর করে তাকে পরিবার থেকে সংসার করার জন্য বিয়ে দিলে শুধু দায়িত্ববোধের কারণে কোন ভালোবাসা ছাড়া বাকিটা জীবন পাড় করা একটা মানুষের জন্য কতটা কষ্টের তা আমি আমার আম্মাকে দেখে বুঝেছি।আব্বা আম্মার পছন্দ করা ছেলেকে যদি আমি কখনো ভালোবাসতে না পারি শুধু দায়িত্ববোধের কারণে সারাটাজীবন আবেগহীন ভাবে সংসার করা আমার পক্ষে সম্ভব না।আমি রেহানকে ভালোবাসি তাই রেহানকে বিয়ে করলে আমাদের সংসারটা ভালোবাসাময় সংসার হবে আব্বা আম্মার মতন সারাটাজীবন ঝগড়া করে পাড় করতে হবে না।তাই আমি বিয়ে করলে রেহানকেই করব।এখন আব্বা যদি সত্যি সত্যি আমার বিয়ে অন্য কারোর সাথে দেয় তাহলে আমার কি হবে?আর রেহান…..সেতো এই খবর শুনে মরেই যাবে।আমাকে যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে।
.
.
কয়েকদিন ধরেই দেখছি আব্বা আমার বিয়ে দেওয়ার জন্য একেবারে উঠেপড়ে লেগেছে।অথচ এখনো আমি রেহানের সাথে যোগাযোগ করতে পারি নি।হাতের মোবাইলটাও আম্মা কেড়ে নিয়েছি। কিভাবে ওর সাথে কথা বলতাম?অনেকদিন ধরে ওর সাথে কথা বলার জন্য সুযোগ খুঁজছিলাম আর অবশেষে একদিন সে সুযোগ আমার হাতে চলে আসল।আম্মা ঘরের টুকিটাকি বাজার করার জন্য বাসার গেইটের রাস্তায় যাওয়ার সাথেসাথে আমি আম্মার রুমে চলে গেলাম।অনেক খোঁজার পর মোবাইলটা পেলাম।এরপর রেহানকে ছোট করে একটা মেসেজ দিলাম আর এর কিছুক্ষণ পর রেহানের মেসেজের উত্তর আসলো।

-“রেহান এটা ছাড়া কি আর বিকল্প রাস্তা নেই?”
-“আপাতত এইটা ছাড়া এখন আর কিছু করার নেই।ভয় নেই।যা বললাম তা করবে। তোমার আব্বা আম্মা আমাদের পরে ঠিক মেনে নিবে।কালকে ঠিক টাইমে চলে আসিও।”
-“আচ্ছা।”

রেহানের কথামত কাজটা করলে আব্বা আম্মা কষ্ট পাবে আর যদি এই কাজটা না করি তাহলে আমি সারাজীবনের মত রেহানকে হারিয়ে ফেলব।এতদিন পর কাউকে পেলাম যে আমাকে অনেক ভালোবাসে ওর ভালোবাসা ছাড়া বাকিটা জীবন কিভাবে থাকব?আমার পক্ষে তা সম্ভব না।তাই নিজেকে সুখি করতে আমাকে এখন স্বার্থপর হতেই হবে।আমাকে পারতে হবে।
.
.
এতকিছু ভেবে রাখার পরও আব্বা আম্মার জন্য সত্যিই অনেক কষ্ট হচ্ছে আর তার সাথে এই বাড়িটা ছেড়ে চলে যাব ভাবতেই কষ্টটা আরো বেড়ে গেল।কালো হলেও ছোটকাল থেকে আমি ছিলাম দুরন্ত আর চঞ্চল।ছোট থেকে এই বাড়ির উঠান, বাগান সবকিছুর সাথে আমার এই চঞ্চলতা আর দুরন্তপনার অনেক স্মৃতি আমার মনে জড়িয়ে আছে। আর তাই বারবার এখন থেকেই একটা গানটা হৃদয় গহীনে বেজে উঠছে।

লুকোচুরি লুকোচুরি গল্প-
তারপর হাতছানি অল্প;
.
চায় চায় উড়তে উড়তে – মন চায় উড়তে উড়তে।
.
টুপটাপ টুপটাপ বৃষ্টি-
চেয়ে থাকে অপলক দৃষ্টি;
.
চায় চায় উড়তে উড়তে – মন চায় উড়তে উড়তে।
.
হাটি-হাটি পা-পা শুরু হয়–
ভয় হয় শুধু হয় ভয় হয়।

হাটি-হাটি পা-পা শুরু হয়–
ভয় হয় শুধু হয় ভয়-ভয়।।
.
চায় চায় উড়তে উড়তে – মন চায় উড়তে উড়তে।
.
আশা আশা চারপাশে কুয়াশা;
আয়নার কোল জুড়ে দুরাশা-
.
চায় চায় উড়তে
.
.
এরপরের দিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে বাসা থেকে পালিয়ে আসলাম।এরপর সোজা ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম।চট্টগ্রাম রেলস্টেশন এ ওর জন্য অপেক্ষা করছিলাম।

-“সালমা?”
আমার নাম একটা লোকের মুখ থেকে শুনে বুঝলাম ও আর কেউ নই রেহান।
-“রেহান!”
-“হুম।”
ওর চেহেরার দিকে তাকালাম।আমার কল্পনায় ওকে আমি যেমনটা ভেবেছিলাম ও ঠিক তেমনটা নই।আমার মতনই ওর গায়ের রং, আর হাইট আমার থেকে একটু কম।আমার কল্পনার সাথে ওর চেহেরার মিল না থাকলেও এতদিন একে ভালোবেসে এসেছি তাই ওর চেহেরা কেমন তা আমার কাছে মূল বিষয় হয়ে দাঁড়ায়নি।

-“রেহান তোমার কথামত এখানে আমি চলে আসছি এখন কি করব?”
-“কি আর করব এখন সোজা কাজী অফিসে চলে যাব আমরা।”
.
.
এরপর কাজী অফিসে গিয়ে আমরা বিয়ে করে সোজা রেহানের বাবার বাড়ি চলে গেলাম।প্রথমদিকে ওর আব্বা আম্মা আমাদের এই বিয়েটা মেনে না নিলেও এরপর ঠিক মেনে নেই।আর এইদিকে আমার আব্বা আম্মা আমাদের পালানো বিয়ের কথা জানতে পারে।আমিই আমাদের বিয়ের কথাটা আব্বা আম্মাকে জানাই।ওরাতো রাগে সিম খুলে রাখে কয়েকদিনের জন্য এরপর ঠিকই নিজেরাই আমার সাথে যোগাযোগ করে।একমাত্র মেয়ে বলে কথা তাই তারা আমাকে এত সহজে ফেলে দিতে পারেনি।পরে আবারো দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ের সব অনুষ্ঠান চট্টগ্রামের নিয়মে করানো হয় আর আমার বিয়ের উপহার হিসেবে আব্বা আম্মাকে আমার শুশুড়বাড়িতে ফুল ফার্নিচার দিতে হয়।
.
.
বিয়ে হওয়ার পরে আর পড়াশোনাটা চালু রাখতে পারেনি। যৌথ পরিবার হওয়ায় ঘরের বড় বউ হিসেবে একহাতে ঘরের সব কাজ করা লাগত আমার।তাই এরপর থেকে সংসারে কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে শুরু করি।সকালে ঘুম থেকে উঠে শুশুড় শাশুড়ি থেকে শুরু করে ঘরের সবার জন্য নাস্তা বানানো, সকাল ১০ টায় আবার সকলের জন্য চা নাস্তা বানানো, দুপুরের খাওয়া রেডি করা,এরপর বিকাল আর সন্ধ্যার জন্য হালকা নাস্তা সবার শেষে রাতের খাবার তৈরী করা।এইসব বাদে ঘরের টুকিটাকি কাজও আছে।সারাটাদিন রান্নাঘরেই দৌড়াদৌড়িই করা লাগত আমার।বলতে গেলে ঘরের জন্য একদম পাক্কা গৃহিণী হয়ে উঠলাম। আর রেহান ও তখনো কোন চাকরি করত না।বাবার ভাড়া দেওয়া ৫ তলা বিল্ডিং থেকে যা আসতো তা দিয়ে সে সংসারের খরচটা চালাত। বিয়ের একবছরের মাথায় আমার কোল জুড়ে আমাদের ছেলে সন্তান আসে।কি সুখের দিন কাটছিল আমাদের।কিন্তু আমাদের ছেলের বয়স যখন একবছরে পড়ে তখন কেন জানি আমার মনে হতে লাগল রেহান আর আমার সম্পর্কটা ঠিক আগের মতন নেই।ওর মধ্যে কেমন জানি একটা ছাড়াছাড়া ভাব দেখছিলাম।ও একটু একটু করে আমার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে যা ওর আচরণ দেখে বেশ বুঝতে পারছিলাম।ওর সাথে ঝগড়া করে সংসারটায় ঝামেলা বাধাতে চাচ্ছিলাম তাই চুপচাপ সব সয়ে যেতাম।তারপরো মাঝেমাঝে ছোটখাট ঝগড়া আমাদের মধ্যে হয়ে যেত আর তা আমাদের রুমের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।আস্তে আস্তে আমার ছেলেটা ৬ বছরের মাথায় পড়ে।আমার এতদিনের বলাতে ও চাকরি করেনি কিন্তু ছেলের বয়স যখন ছয়ে পড়ে তখন থেকেই ও চাকরি করা শুরু করে।বিষয়টা আশ্চর্যজনক হলেও মনে মনে খুব খুশি হয়েছিলাম যাক শেষ পর্যন্ত ওর মাথায় বুদ্ধি এসেছে।কিন্তু এত খুশির মাঝেও শুধু একটাই দুঃখ ছিল তার তা হল ওর আর আমার মাঝের সম্পর্কটার উন্নতি তখনো হয়ে উঠে নি।আমার প্রতি ওর উদাসীনতা,ওর চুপচাপ স্বভাবের আচরণটা আমাকে খুব ভয় পাইয়ে দিত।
.
.
ওর চাকরি করার সময়টাতে যখন রোজা আসে ওই সময়ে আমি ওর ফেসবুক একাউন্ট চেক মারতে গিয়ে দেখি ওর ভালোবাসামূলক পোস্টে একটা মেয়ের লাভ রিয়েক্ট।শুধু সেই পোস্ট না আরো অনেক পোস্টে ওই মেয়েটার লাভ রিয়েক্ট এবং কমেন্ট।মেয়েটা আমাদের আত্মীয়ের মধ্যেও কেউ ছিল না তাই বাইরের একটা মেয়ের একটা বিবাহিত পুরুষের পোস্টে এইরকম লাভ রিয়েক্ট এবং কমেন্ট দেখে আমার সন্দেহটা কেন জানি আরো বাড়তে লাগল।আগে এইরকম কিছু আমার চোখে পড়েনি কিন্তু হঠাৎ করে এইসব হওয়ার কারণটা চোখের সন্দেহ বাড়াবে এটাই স্বাভাবিক।

-“রেহান তোমার প্রতিটা পোস্টে এই মেয়েটা এত লাভ রিয়েক্ট কেন দিচ্ছে? সাথে কমেন্ট ও…। তুমি কি মেয়েটাকে চিন?”
-“আমি কিভাবে চিনব?আর না চিনলেই যে বাইরের কেউ এইরকম লাভ রিয়েক্ট কমেন্ট দিতে পারবে না এমন কোন বাধ্যবাধকতা আছে নাকি?”
-“বাধ্যবাধকতা নেই তা আমি জানি।কিন্তু তোমার কিছু কিছু কাজ আমাকে সন্দেহ করাতে বাধ্য করে তাই সন্দেহ আপনাআপনিই এসে যায়। আচ্ছা তুমি কি চুপচাপভাবে আড়লে থেকে আমাকে কিছু বুঝার ইঙ্গিত দিচ্ছ নাতো?”
-“সালমা তুমি পাগল হয়ে গেছ।পাগল মহিলা একটা…..।”

এই বিষয়টা নিয়েই আবার ঝগড়া বাধল।এ ঝগড়ার এক পর্যায়ে ও আমার গায়ে হাত তুলে।শুধু গায়েই হাতে তুলে নি সেদিন লাঠি দিয়ে ও আমাকে মেরেছিল তাও রোজা রাখা অবস্থায়।
.
.
এরপর ভাবলাম থাক বিষয়টা এইখানেই আটকে থাক।আর ঝগড়া করে ঘরে কোন অশান্তি আনবো না ঘরে ছোট ছেলে আছে এইরকমভাবে যদি সবসময় ঝগড়া চালিয়ে যেতে থাকি তাহলে তা আমার সন্তানের উপর খারাপ প্রভাব পড়বে।আব্বা আম্মার ঝগড়া দেখে যে কষ্ট আমি ছোটকাল থেকে পেয়ে এসেছি ঠিক সেরকম কষ্ট আমার ছেলেটাও পাক তা আমি চাইছিলাম না। এর চেয়ে চুপচাপ থাকায় ভালো। এতে সবারি মঙ্গল।ও আমাকে অবহেলা করলেও আমার ছেলেটাকে কখনো অবহেলা করেনি।ছেলে যখন যেটা চেত সাথেসাথে তা কিনে এনে দিত।এই ছেলের জন্য হলেও ও আমাকে কখনো ছেড়ে যাবে না আমার সাথে কখনো বিশ্বাসঘাতকতা করবে না মনে মনে এই বিশ্বাসটা সবসময় করতাম।
.
.
আমি আমার সংসার নিয়ে এখন প্রায় ব্যস্ত থাকি।ওর সাথের আমার মধ্যেকার দূরত্বের মনে হয় আর কোনদিন অবসান হবে না তাইতো অনেক চেষ্টা করা সত্ত্বেও আমি সফল হতে পারিনি।কুরবানির আগে ও ওর ছোট ভাইয়ের কাছে এক লাক্ষ টাকা চায় ব্যবসার নাম করে।ওর ভাই ওর বন্ধুদের থেকে টাকা যোগার করে এক লাক্ষ টাকা ওর হাতে তুলে দেয়।প্রতিদিনের মত সেদিনও রেহান চাকরির কাজের জন্য বাসা থেকে বের হয়।এরপরের দিন ও আর বাসায় আসেনি।
.
.
বাসার সবাই খুব টেনশনে পড়ে যায়। রেহান কোথায় গেল কি অবস্থায় আছে তা নিয়ে ভাবতে ভাবতে পুরা পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম আমি।

এরপর ও নিজেই আমার শশুরকে কল দিয়ে বলে সে তানহা নামের একটা মেয়েকে বিয়ে করেছে।এরপরে আরো জানতে পারি রেহান ব্যবসার নাম করে তার ভাইয়ের কাছ থেকে যে এক লাক্ষ টাকা নিয়েছিল তা নিয়ে সে পালিয়ে যায় মেয়েটার সাথে।এরপর ওরা বিয়ে করে।কেন জানি শশুড়ের এই কথাগুলো আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করছিল না।ভালোবেসে বিশ্বাস করে লোকটাকে বিয়ে করলাম আর সেই আমার সাথে এতবড় বিশ্বাসঘাতকতা করবে তা মন থেকে মেনে নিতে চাচ্ছিলাম না।ও এতদিন পালিয়ে কই থাকবে?বাঁচতে চাইলে আর টাকার জন্য বাবার বাড়িতেই ওর আসাই লাগবে। তখন ওর মুখ থেকে সবকিছু শুনে নিব।
.
.
এই ঘটনার দুইদিন পর ও বাসায় আসে।শুধু ও একাই আসেনি সাথে করে আরেকজনকেও নিয়ে এসেছিল।ওর সাথের মেয়েটা কে জানার জন্য ওকে প্রশ্ন করলে ও বলল,

-“ও হচ্ছে তানহা…. আমার স্ত্রী।আমরা একে অপরকে ভালোবাসি। কয়েকবছর রিলেশনের পর দুইদিন আগে ওকে বিয়ে করে আমি আমার বউ বানিয়েছি।”

ওর মুখের এই কথাটাও যে আমাকে এইবার বিশ্বাস করতে হবে তা কখনো ভাবতেই পারিনি।তারপরও নিজেকে শান্ত রেখে ওকে জিজ্ঞাস করলাম,

-” ও যদি তোমার স্ত্রী হয় তাহলে আমি কে রেহান!?”
-“আমি এখন তানহাকে ভালোবাসি, তোমাকে না।কয়েকদিন পরেই তোমাকে আমি ডির্ভোস দিয়ে দিব তাহলে এরপর থেকে তুমি আমার কেউ থাকবে না।”

শুশুড়-শাশুড়ি বাড়ির সবার সামনে ও আমাকে অস্বীকার করল।কিছুতেই তা মেনে নিতে পারছিলাম না।এতদিনের ভালোবাসা,সংসার আমাদের ছেলে কোনকিছুর মূল্যই এখন ওর কাছে নেই।তাইতো এত্ত বড় কথা ও ওই মেয়েটার সামনে আমাকে বলল।দোষটা এখন আমি কাকে দেব?নিজেকে না নিজের স্বামীকে নাকি তার নতুন বউকে।অনেক ভেবে দেখলাম ভুল তিনজনেরই ছিল।আমার ভুলটা ছিল ওকে বিশ্বাস করে ওর সাথে পালিয়ে সংসার করা,আমার স্বামীর ভুলটা ছিল ও একটা স্বার্থপর।ওর এখন আর আগের মতন আমাকে মন ধরে না তাই নিজের প্রয়োজন মিটানোর জন্য আরেক মেয়েকে বিয়ে করে এনেছে আর সেটাকেই সে ভালোবাসা বলে দাবি করে সবার সামনে প্রমাণ করছে এতদিন পর সে সত্যিকারের ভালোবাসা পেয়েছে।আর বাকি রইল ওর নতুন বউ ওকে দেখেই মনে হল ও সবকিছু জানে যে রেহান বিবাহিত,ওর ঘরে স্ত্রী আছে।সব জানা সত্ত্বেও এই মেয়েটা একটা বিবাহিত পুরুষের সাথে রিলেশন করে তাকে বিয়ে করে। আমার ছেলের বাবাকে মেয়েটা কি পরিমাণ ভালোবাসে তা ওর কাজ দ্বারা বুঝাই যাচ্ছে। তাইতো এক মেয়ে হয়ে আরেক মেয়ের সংসার ভাঙ্গল।বাসার কেউ ওদের এই বিয়ে মেনে নেই নি।রাতের বেলায় কোথাও যাওয়া সম্ভব না তাই তারা নিচ তলায় রাত কাটায়।
.
.
সেদিন রাতে অনেক কেঁদেছি। আমার কান্না দেখে আমার ছেলেটাও অবুঝের মত কেঁদেছে।শাশুড়ি মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আমাকে শান্তনা দিচ্ছিল।কিন্তু কিছুতেই শান্তি পাচ্ছিলাম না।রেহানকে ভালোবেসছিলাম নিঃস্বার্থভাবে কিন্তু তার বদলে ওর কাছ থেকে পেয়েছি শুধু বিশ্বাসঘাতকতা।পুরোটা রাত কান্না আর টেনশনে পাড় করেছি কি করে বাকি জীবনটা একা একলা মেয়ে হয়ে এই সমাজে পাড়ি দিব।অনেক ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি ছেলেকে নিয়ে ঢাকায় চলে যাব আর সেখানে গিয়ে চাকরির খুঁজ নিব।দেবরের সংসারে থেকে ওর টাকা দিয়ে চলে আর বোঝা হয়ে থাকব না।আমার আত্মসম্মানটা একটু বেশি তাই এইরকম সিদ্ধান্ত নিজে নিজে নিলাম।এত কষ্টের মাঝেও আল্লাহর কাছে একটা বিষয় নিয়ে লাক্ষ লাক্ষ শুকরিয়া যে তিনি আমাকে মেয়ে দেননি।মেয়ে হলে হয়ত আমার মতনই আমার মেয়েটা এইরকম কষ্টের শিকার হত।আর মা হয়ে তা আমি কিছুতেই দেখতে পারতাম না।
.
.
তাই এখন থেকে আমি আমার ছেলেকে নিয়ে বাঁচব আর ওকে এই শিক্ষা দিব যে একটা মেয়েকে কিভাবে সম্মান করতে হয়।আমার চোখের জল দিয়ে ওকে উপলব্ধি করাব একটা মেয়ের ভালোবাসা তার বিশ্বাস নিয়ে বিশ্বাসঘাতকতার খেলা খেললে মেয়েটার কষ্ট কতটুকু হয়। আমার নিজের শিক্ষা থেকে ওকে জ্ঞান দিব, নিজ হাতে ওকে একজন ভালো মানুষ বানাব।ওর বাবার খারাপ কোন অভ্যাস আমি আমার ছেলের গায়ে লাগতে দিব না।

এইখানে আমি যে কাহিনীটা লিখলাম তা সম্পূর্ণ বাস্তব ঘটনার ভিত্তিতে লিখলাম।প্রয়োজনের ভিত্তিতে গল্পে সালমা আর রেহান এই দুইটি ছন্মনাম আমি ব্যবহার করেছি।এই কাহিনীটার বাস্তব রুপ আমি নিজে দেখেছি আর সালমার ভবিষ্যৎটা আমি নিজ থেকে লিখলাম।যদি রেহান তার স্ত্রীর সাথে এইরকম বিশ্বাসঘাতকতা না করত তাহলে হয়ত এই কাহিনীটা অন্যরকম হত।কিন্তু সালমার ভাগ্য হয়ত তার জন্য অন্যকিছু লিখে রেখেছিল তাই তাকে এইরকম বাজে পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়েছে।

বি.দ্র.-আল্লাহ যদি আমাকে সুস্থ রাখেন তাহলে পরববর্তীতে আরেকটা বাস্তব কাহিনীর গল্প নিয়ে আমি জান্নাতুল ফেরদৌস আপনাদের সামনে হাজির হব।সেখানে আপনাদেরকে দেখাব কিভাবে একটা মেয়ের ভাগ্য তাকে কোথা কোথায় নিয়ে এসেছে।সেই নির্মম কাহিনী আমি আপনাদের কাছে তুলে ধরব।ততক্ষণ পর্যন্ত সবাই ভালো থাকুন আর আমিও যাতে ভালো থাকি সেই দুয়া করবেন।

সমাপ্ত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here