হৃদয়ের_আয়না পার্ট০৫ (শেষপার্ট)

0
161

হৃদয়ের_আয়না
পার্ট০৫ (শেষপার্ট)
#লিখা জান্নাতুল ফেরদৌস
“মিস্টার আকাশ আপনার এই রোগের কথা জানার ১৫দিন পর আপনার স্ত্রী আমাদের এখানে আসে।ওনার নিজের হার্ট দিয়ে আপনাকে বাঁচানোর জন্য অনেক অনুরোধ করে আমাকে।কিন্তু আমি তাতে রাজি হয়নি।মানুষকে বাঁচানো আমাদের দায়িত্ব আর কর্তব্য।১জনকে বাঁচাতে গিয়ে আমরা আরেকজনকে মেরে ফেলব সে ধর্ম আমাদের ডাক্তারদের বিধানে নেই।আমি আপনার স্ত্রীকে না করে দেই।কিন্তু সেও নাছোড়বান্দা।প্রতিদিন এখানে এসে অনেক অনুরোধ করে,কান্নাকাটি করে।কিন্তু তারপরও আমি তার পাগলামোকে পাত্তা দেয় নি।এর কিছুদিন পর তিনি আমার বাসায় আসেন।আমার আর আমার স্ত্রীর পা ধরে অনেক কান্নাকাটি করেন।আর তখনি আমি নিরুপায় হয়ে উনার এই অনুরোধ মেনে নিতে বাধ্য হয়”
“কিন্তু আমাকে এই মিথ্যা কথাটা কেন বললেন?”
“কারণ আপনার স্ত্রীই আমাকে এই মিথ্যা কথা বলতে বাধ্য করেছেন তাই।উনি আমাকে বলেছেন যে আপনাকে হার্ট দিচ্ছে তার সম্পর্কে আপনি যদি কিছু জিজ্ঞাস করেন তাহলে আমি যেন এইরকম মিথ্যা গল্প আপনাকে শুনিয়ে দেই”
.
.
এ তুই কি করলি মেঘ!কেন এইসব করলি?নিজের জীবনটা এইভাবে তুচ্ছ করে কেন আমাকে বাঁচানোর জন্য তুই তোর হার্ট দিয়ে দিয়েছিস।কেন করতে গেলি এইসব!কেন(কেঁদে)
আমি চাইলেও নিজেকে ক্ষমা করতে পারবো না।সেদিন মেঘের দান করা হৃদয়টা আমার বুকে স্থান পেল।এখন আমার হৃদয়ে ওর অস্তিত্ব,ও হচ্ছে আমার হৃদয়ের আয়না।আমার হৃদয়ের আয়নায় আমি শুধু ওকে দেখি আর ওকে ভালবাসি।আমার এই বুকে অন্য কেউ নেই।
.
.
এরপরে আমি কোনরকম করে দিন কাটাতে লাগলাম।মেঘের হৃদয় আমার বুকে আছে ঠিকই কিন্তু আমি চাইলেও মেঘকে ছুতে পারি না।খুব কষ্ট হত ওকে ছাড়া থাকতে।তুলির সাথে রিলেশন হওয়ার পর ও যখন ভার্সিটি ছেড়ে চলে যায় ১টা বছর ও যখন আমার চোখের সামনে ছিলনা তখন খুব অস্থির লাগত এই বুকে।আল্লাহর রহমতে আমি ওকে ফিরে পেয়েছিলাম।এরপরে ওকে বিয়ের পর বুঝতে পেরেছি ওর মতন করে আমাকে কেউ ভালবাসতে পারবে না।তখন থেকেই তোকে খুব ভালবেসে ফেলেছি যেখানে যাই আমার হৃদয়ের আয়নার শুধু তোর ছবি ফুটে উঠে তাইতো তোর নাম দিয়েছি হৃদয়ের আয়না।কিন্তু এরপরে তুই যে চিরদিনের জন্য আমাকে ফেলে চলে যাবি তা আমি কল্পনাও করতে পারি নি।তখন ১টা বছর তোকে ছাড়া থাকতে কষ্ট হত আর এখন তুই সারাজীবনের জন্য আমাকে ফেলে চলে গেলি এখন আমি কি নিয়ে বাঁচব, কাকে নিয়ে আমি ঘর বাধাঁর স্বপ্ন দেখবো।তোর জায়গা আমি কাউকে দিতে পারবনা, কাউকে না।তোর মতন করে আমাকে কেউ ভালবাসতে পারবে না।
.
.
আমার এই উদাসীন জীবন দেখে মা বাবা আবারও আমার বিয়ে দেয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগে।মা বাবা ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে আমাকে বাবার বন্ধুর মেয়ে বৃষ্টির সাথে বিয়ে দিয়ে দিল।আর আমাকে এই বলে দিল আমি যাতে আমার আগের বিয়ের কথ বৃষ্টিকে না জানাই।খুব কষ্ট পেয়েছিলাম মা বাবার এই কথায়।মেঘ আমার জন্য নিজের জীবনটা শেষ করে দিল।ও আমার স্ত্রী আর এই কথা আমি কাউকে বলতে পারবো এর থেকে বেশি কষ্ট আর কি হতে পারে?তাই আমার সব রাগ আমি বৃষ্টির উপর ঝাড়তাম।পড়ে ভেবে দেখলাম ওরই বা কি দোষ ওতো এইসবের কিছু জানে না।তাই এরপর থেকে ওর সাথে আর রাগ করে কথা বলতাম না।
.
.
আর পড়তে পারছিনা।এতকিছু ওর জীবনে ঘটে গেল আর ও আমাকে কিছুই বলে নি।ডায়েরির শেষপাতায় ২টা ছবি পেলাম।মেঘে আপুর ছবি!একটা মোটা ফ্রেমের চশমা আর কোকড়ানো চুলের ছবি আর আরকেটা লম্বা কেশবতী,কাজল কালো চোখের ছবি মেঘ আপুর।আকাশের জন্য মেঘ আপু নিজেকে চেঞ্জ করেছে।একটু আগে আমি নিজের রুপের বড়াই করছিলাম কিন্তু সত্যি বলতে আপুর চেহারা আমার থেকে অনেক বেশি লাবণ্যময়ী,আর মায়াবতী।উনার পাশে দাঁড়ালে আমাকে অনেক বেমানান লাগবে।একটু আগে আমি নিজের গুণের প্রশংসা করছিলাম কিন্তু এখন বুঝতে পারছি আমার থেকে অনেক বেশি গুণবতী ছিলেন মেঘ আপু।আমি নিজের কথায় এখন নিজে লজ্জা পাচ্ছি।নিজের চোখের সাথে চোখ মিলাতে খুব লজ্জা লাগছে।এই মানুষটার সম্পর্কে ভালোভাবে কিছু না জেনে আমি কত কিনা বলে ফেলেছি।মেঘ আপু প্লিজ ছোট বোন হিসেবে আমাকে মাফ করে দেন।এরপরে আমার হাত ধরে আমার গালে জোরে কেউ থাপ্পড় মারল।চেয়ে দেখি আকাশ।
.
.
তোমাকে বলেছিলাম না এই রুমে না আসার জন্য তাহলে কেন এসেছ এইখানে।আর আমার ডায়েরি তোমার হাতে কি করছে?তোমাকে বলেছিলাম না আমার কোন জিনিসের উপর অধিকার ফলাবে না তাহলে কেন করলে এইসব?কেন আমার কথা শুনলেনা?যাও এখনি এইরুম থেকে আমার জীবন থেকে চলে যাও।Get out from here
অনেকক্ষণ পর আকাশের রাগ কমল।আমি ওর কাছে গিয়ে বললাম আকাশ আমি জানি আমি আজকে আপনার মনে অনেক বড় কষ্ট দিয়েছি কিন্তু আজকে আমি ওইরুমে না গেলে সত্যিটা আমার কাছে আজীবন অজানা থেকে যেত।চেয়ে দেখি আকাশ কেঁদে চলছে।
.
.
আমি জানি আপনি মেঘ আপুকে খুব ভালবাসেন।মেঘ আপুর কোন তুলনা হয় না,ওনার মতন করে আপনাকে কেউ কোনদিন ভালবাসতে পারবে না। এমনকি আমি নিজেও না।ওনি নিজের গুণে আপনার এই হৃদয়ে বেঁচে আছে।যে নিজের মূল্যবান হৃদয়টা আপনাকে দিয়ে আপনার হৃদয়ে চিরঅমর হয়ে বেঁচে আছে তার ভালবাসা অনেক পবিত্র।কোনকিছু না জেনে একটু আগে আমি উনার সাথে নিজের তুলনা করেছিলাম।এখন সবকিছু জেনে আমার নিজের থেকে লজ্জা লাগছে।
মেঘ আপু আপনার জন্য এতকিছু কেন করেছেন জানেন?কারণ তিনি আপনাকে সবসময় ভালো আর হাসিখুশি দেখতে চেয়েছেন।কিন্তু আপনি এইভাবে জীবন্তলাশের মত বেঁচে থেকে শুধু নিজেকে কষ্ট দিচ্ছেন না উনাকেও কষ্ট দিচ্ছেন।যে উদ্দেশ্য উনি প্রাণ দিয়েছেন সে উদ্দশ্য উনার কোনদিন পূরণ হলনা।এইভাবে বেঁচে থাকাকে জীবন বলে না।জীবনে বাঁচতে হলে ১জন জীবনসঙ্গীর প্রয়োজন আর আমি আপনার সেই জীবনসঙ্গী হতে চাই।বিশ্বাস করুন মেঘ আপুর জায়গাটা আমার চাই না,আমি নিজের গুণে আপনার এই হৃদয়ে সামান্য একটু জায়গা চাই।আমি জানি আপনার হৃদয়ের আয়নায় আপনি মেঘ আপুকে দেখেন,আমি আপনার হৃদয়ের আয়নায় মেঘ আপুর ছবি মুছে আমাকে দেখতে বলছি না শুধু একটাই মিনতি আমি আপনার সেই হৃদয়ের আয়নায় মেঘ আপুর প্রতিচ্ছবি হয়ে থাকতে চায়।আমি উনার ছায়া হয়ে আপনার সাথে আমার বাকি জীবন কাটাতে চাই।আপনি খুব ভাগ্যবান আপনি যাকে ভালবাসেন তার হৃদয়টা আপনার কাছে আছে,মেঘ আপুর হৃদয়টা এখন আপনার।একে কেন্দ্র করে আপনি বেঁচে থাকতে পারবেন।কিন্তু দেখুন না আমি কি হতভাগা যাকে ভালবাসি তার কোনকিছু আমার কাছে নেই।আপনি যদি মনে করেন আপনি আমাকে আপনার জীবনে আর রাখবেন না তাহলে আপনি চাইলে আমাকে ডির্ভোস দিয়ে দিতে পারেন। আমি আজকে বাবার বাড়ি চলে যাচ্ছি। যখন মন চাইবে ডির্ভোস পেপারটা সেখানে পাঠিয়ে দিবেন।আপনার মা বাবার টেনশন করবেন না আমি সব সামলে নিব। ভালো থাকবেন চলি।
.
.
২মাস হয়ে গেছে আকাশের কোন খবর নেই। আমি এখনো বাবার বাড়িতে।ওনি এখনো আমার কাছে ডির্ভাস পেপার পাঠান নি।আজ না হয় কাল উনি ঠিকি পাঠিয়ে দিবেন।আমিতো ভুলে গেছি আকাশের বুকে শুধু মেঘের অস্তিত্ব থেকে।আর আকাশের বুকে বৃষ্টি থাকতে পারেনা,সে আকাশের বুক থেকে ঝরে মাটিতে পড়ে।আমার অবস্থাও তেমন আমি বৃষ্টি,আকাশের বুকে সামান্যতম জায়গাটাও পাবোনা কারণ ওইটা শুধু মেঘের জায়গা,বৃষ্টির নয়,
.
.
“আপনি এখানে”
“হ্যা আমি”
“ও এত কষ্ট করে এখানে এলেন কেন?কাউকে দিয়ে ডির্ভোস পেপার পাঠিয়ে দিলে হত”
“আমি আপনাকে ডির্ভোস পেপার দিতে এখানে আসি নি।আপনাকে আপনার সংসারে নিয়ে যেতে এসেছি”
“কি!”
“হ্যা”
“আপনি ঠিক আছেনতো কি বলছেন এইসব”
“হ্যা আমি ঠিকাছি”
“কিন্তু আপনার এই মত কেমন করে চেঞ্জ হল”
“মেঘ আমাকে ওইদিন যে চিঠি দিয়েছিল সেখানে আরও কিছু কথা লিখা ছিল সেটা কি জানেন”
“না কি লিখা ছিল তাতে?”
“এই লিখা ছিল ওর মতন করে আমাকে যদি কেউ কখনো ভালবাসে,আমার হৃদয়ের আয়নায় আমি যদি ওর প্রতিবিম্ব অন্য কারো মধ্যে দেখি তাহলে তাকে যেন বিয়ে করি।আর ওর মতন করেই যেন আমি আমার স্ত্রীকে ভালবাসি,তাকে আমার স্ত্রী হওয়ার প্রাপ্য মর্যাদা দিই।শুধু ওর ১টাই অনুরোধ আমার হৃদয়ের আয়নায় যাতে শুধু ওই থাকে,ওই জায়গার ভাগ ও কাউকে দিতে চাইনা।”
আর আমি আমার হৃদয়ের আয়নায় মেঘের সেই প্রতিবিম্ব সেই ছায়া পেয়ে গেছি আর সে ছায়া হচ্ছ তুমি”
.
.
অনেক খুশি হয়েছিলাম অন্তত আকাশ আমাকে মেনে নিয়েছ।মেঘ আপু আপনি সত্যিই মহান।দুনিয়াতে যখন ছিলেন তখন আকাশের জন্য নিজের জীবন দিয়ে দিলেন আর স্বার্থহীনভাবে আকাশকে বলে গেলেন ওর স্ত্রীকে ওর প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়া হয়।উনি আকাশের জন্য আমার জন্য যা করেছেন তা ১মাত্র ১জন প্রকৃত প্রেমিক করতে পারে।উনার কারণে আকাশ আমাকে মেনে নিয়েছে তাই আমিও চাই উনার জন্য কিছু করতে।মা বাবাকে ডেকে মেঘ আপুর সম্পর্কে সব কিছু খুলে বললাম আর এইও বললাম যে উনি আকাশের ১ম স্ত্রী।যে মানুষ অন্যের জন্য এতবড় ত্যাগ স্বীকার করল সে সবার অজান্তে আর আড়ালে লুকিয়ে থাকবে তা আমার জন্য মেনে নেওয়া সম্ভব না।মা বাবা আকাশের ১ম বিয়ে নিয়ে আকাশকে আর আমার শশুড়বাড়ির লোকদের কিছু বলেনি।তারা সব মেনে নিয়েছি।আমার শশুড়-শাশুড়িকে ও বললাম আমার কাছে কোন কিছু লুকিয়ে না রেখে সব সত্যি কথা বললে আমি সব স্বীকার করে নিতাম।তারাও তাদের এই কাজের জন্য সেদিন অনেক অনুতপ্ত হলেন।আমি মেঘ আপুর ছবিসহ তার সবকিছু আবার তার রুমে নিয়ে আসি।উনার জায়গা স্টোররুমে না,উনার জায়গা এইরুমে যেখানে তিনি তার স্বপ্নের সংসার সাজাবেন বলে ঠিক করেছেন।
.
.
কয়েকবছর পর আমার কোল আলো করে আমাদের মেয়ে আসে।আকাশের কাছ থেকে শুনেছি মেঘ আপু প্রায়ই বলত যদি উনার মেয়ে হত তাহলে ওর নাম মায়া রাখত।তাই আমি মেঘ আপুর ইচ্ছা অনুযায়ী আমাদের মেয়ের নাম মায়া রাখি।মায়ার বয়স এখন ৯বছর।ওর কোকড়ানো চুল,চোখের চশমা দেখে মনে হয় আমাদের মেয়েটা মেঘ আপুর প্রতিচ্ছবি।আমি আমার বিবাহিত জীবনে আকাশ আর আমার মেয়েকে নিয়ে অনেক সুখি।তবে আমি এটা জানি আকাশ এখনো মেঘ আপুকে ঠিক আগের মতনই ভালবাসে।মেঘ আপু এখনও আকশের হৃদয়ের আয়না হয়ে আছে।আর আমিও চায় না মেঘ আপু আকাশের হৃদয়ে যে জায়গা দখল করে আছে,আকাশ যে হৃদয়ের আয়না দিয়ে মেঘ আপুকে দেখে সেখানে ভাগ বসাতে।আকাশের হৃদয়ের আয়নায় থাকার অধিকার শুধু মেঘ আপুর।উনিই আকাশের হৃদয়ের আয়না

End

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here