শেষ_পর্যন্ত পার্ট: ১৬

0
125

শেষ_পর্যন্ত

পার্ট: ১৬

লেখিকা: সুলতানা তমা

আলিফার দিকে তাকিয়ে দেখি ঘুমিয়ে পড়েছে, ওর কপালে আলতো করে একটা চুমু দিয়ে বললাম “তোমাকে কখনো হারাতে দিবো না রাগিণী, অনেক ভালবাসবো তোমায়”

হঠাৎ আলিফার গোঙানিতে ঘুম ভেঙে গেলো। কখন যে আলিফার পাশেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বুঝতেই পারিনি। আলিফার দিকে তাকিয়ে দেখি ও কেমন যেন করছে, তাড়াতাড়ি ওর কাছে গিয়ে কপালে হাত দিলাম, জ্বরে তো ওর শরীর পুরে যাচ্ছে। রাত প্রায় তিনটা বাজে এতো রাতে আব্বুকে ডাকা ঠিক হবে না এখন আমি কি করি। মনে পড়েছে সেদিন আমার জ্বর হওয়াতে আলিফা আমার কপালে জলপট্টি দিয়েছিল।

বসে বসে আলিফার কপালে জলপট্টি দিচ্ছি, এখন কিছুটা কমেছে। ওর পাশে গিয়ে চুলে হাত বুলাতে লাগলাম, আলিফা পাশ ফিরে আমাকে জরিয়ে ধরলো।
আলিফা: রিফাত আমি না আর পারছি না আমি দুটানায় পড়ে গেছি। আমি কি করবো বুঝতে পারছি না। (আরে এসব কি বলছে ও, চোখ বন্ধ রেখেই আমাকে জরিয়ে ধরে একমনে এসব বলে যাচ্ছে)
আলিফা: রাতুল আমাকে ভালোবাসে আমিও বাসতাম কিন্তু এখন আমি কাকে ভালোবাসি নিজেই বুঝতেছি না, রাতুলকে ছেড়ে দিলে ও অনেক কষ্ট পাবে আমাকে খারাপ ভাববে। এদিকে রিফাত আমাকে পাগলের মতো ভালোবাসে ওকে কি করে আমি কষ্ট দেই। রিফাতকে ছেড়ে যেতেও পারবো না আমি ওর প্রতি আমার মায়া জমে গেছে, এই মায়া কাটিয়ে আমি যেতে পারবো না। আমি এখন কি করবো সত্যি বুঝতে পারছি না, কিচ্ছু বুঝতে পারছি না….
বলতে বলতে ঘুমিয়ে পড়লো তারমানে এতোক্ষণ ও জ্বরের ঘোরে এসব বলেছে। এতো জ্বর ওকে এখানে রেখে সোফায় গিয়ে ঘুমানো ঠিক হবে না তাই ওর পাশে শুয়ে পড়লাম, সাথে সাথে আলিফা এসে আমার বুকে মাথা রাখলো। জ্বরের ঘোরে জরিয়ে ধরেছে বুকে মাথা রেখেছে সকালে যখন এই অবস্থা দেখবে তখন তো রেগে যাবে, আলিফাকে সরিয়ে দিতে চাইলাম কিন্তু ও আমাকে আরো শক্ত করে জরিয়ে ধরলো। কি আর করার সকালে যা হবার হবে আমিও আলিফাকে জরিয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়লাম।

সকালে ঘুম ভাঙতেই তাকিয়ে দেখি আলিফা আমার মাথার পাশে বসে আছে আর একমনে আমাকে দেখছে।
আমি: কি দেখছ এভাবে
আলিফা: একটা মানুষ এতোটা ভালোবাসতে পারে কিভাবে
আমি: হঠাৎ এমন কথা
আলিফা: রাতে আমি তোমার বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়েছিলাম তাই না
আমি: না মানে তোমার খুব বেশি জ্বর ছিল তাই জ্বরের ঘোরে আমাকে জরিয়ে ধরেছিলে, আমি সরে যেতে চেয়েছিলাম কিন্তু তুমি ছাড়ো নি। আর তোমাকে এই অবস্থায় একা রেখে যাওয়া ঠিক হবে না তাই আর কি… সরি
আলিফা: এমন আমতা আমতা করছ কেন আমি কি তোমায় বকা দিয়েছি (অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি ওর দিকে আজব তো ও রাগ করলো না কেন)
আলিফা: কি দেখছ
আমি: জ্বর কমেছে
আলিফা: হ্যাঁ অনেকটা কমেছে
আমি: ওকে।

আলিফার জন্য নাশতা রুমে নিয়ে আসলাম আবার রাগ করবে কিনা কে জানে, এই রাগিণীকে খুব ভয় লাগে।
আলিফা: এসব কি
আমি: নাশতা
আলিফা: তাতো দেখতেই পারছি কিন্তু রুমে নিয়ে এসেছ কেন
আমি: এই শরীর নিয়ে আবার নিচে যাবে তাই রুমে নিয়ে আসলাম। এতো কথা না বলে তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও তো ওষুধ খেতে হবে
আলিফা: কষ্ট করে এনেছ যখন আর একটু কষ্ট করে খাইয়ে দাও (খাইয়ে দিতে বললো আমি তো নিজের কান কে বিশ্বাস করতে পারছি না)
আমি: তুমি বললে তো আমি সারাজীবন তোমাকে খাইয়ে দিতে রাজি আছি (আস্তে বললাম)
আলিফা: কিছু বললে
আমি: নাতো
আলিফা: বলেছ তো, আস্তে বলেছ আমি শুনতে পাইনি
আমি: খেয়ে নাও।

আলিফাকে নিজের হাতে খাইয়ে দিয়ে ওষুধ খাইয়ে দিলাম। আলিফাকে শুয়ে দিয়ে নিচে যাবার জন্য পা বাড়ালাম তখন আবার আলিফা ডাক দিলো।
আলিফা: রিফাত
আমি: কি আর কিছু লাগবে
আলিফা: আমার ফোনটা দিয়ে যাও তো
আমি: তোমার ফোন আমার কাছে নাতো কোথায় রেখেছিলে
আলিফা: ফোন ফোন….
আমি: কি হয়েছে এমন করছ কেন
আলিফা: ফোনটা বোধহয় হারিয়ে ফেলেছি
আমি: মানে
আলিফা: কাল যখন গাড়ির জানালার কাছে গিয়েছিলাম কথা বলতে তখন হঠাৎ করে মাথা ঘুরায় আর কিছু মনে নেই….
আমি: হ্যাঁ তখন তুমি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলে
আলিফা: তখনি হয়তো ফোনটা হাত থেকে পড়ে গিয়েছিল
আমি: আচ্ছা আমি দেখে আসছি গাড়িতে পড়েছে কিনা
আলিফা: এখন কি হবে
আমি: আমি দেখে আসছি দাঁড়াও।

গাড়িতে অনেক খুঁজলাম কিন্তু গাড়ির কোথাও তো ফোন পেলাম না তাহলে কি….
আলিফা: পেয়েছ
আমি: না গাড়িতে অনেক খুঁজলাম নেই, মনে হয় জানালা দিয়ে বাইরে পরে গিয়েছিল
আলিফা: এখন কি হবে
আমি: আরে এই পাগলী কাঁদছ কেন একটা ফোনই তো আমি আজকেই তোমাকে নতুন ফোন কিনে দিবো
আলিফা: তুমি বুঝতে পারছ না রিফাত এই ফোনে রাতুল ফোন দিবে, ও বন্ধ ফেলে ভাববে আমি ইচ্ছে করে ওর সাথে যোগাযোগ করা বন্ধ করে দিয়েছি। আর এইটা ভাবা মানে ও আমাকে খারাপ মেয়ে ভাববে, রিফাত আমি এতোটা খারাপ মেয়ে নই। হ্যাঁ আমি হয়তো রাতুলকে আস্তে আস্তে ভুলে যাচ্ছি কিন্তু সেটা ওর সাথে ভালোভাবে কথা বলে মিটিয়ে নিতাম এভাবে হুট করে যোগাযোগ বন্ধ….
আমি: এক মিনিট তুমি একটু আগে কি বললে, রাতুলকে আস্তে আস্তে ভুলে যাচ্ছ
আলিফা: না মানে (তারমানে কি আলিফা আমাকে ভালোবাসতে শুরু করেছে)
আলিফা: রিফাত তোমার ফোনটা দিবে
আমি: হুম।

আলিফা বার বার ফোন করে যাচ্ছে কাকে জানিনা হয়তো রাতুল।
আলিফা: দূর ওর ফোনটা কেন বন্ধ
আমি: কে রাতুল
আলিফা: হুম
আমি: হয়তো ফোনে চার্জ নেই বা অন্য কোনো সমস্যা একটু পর আবার দিয়ে দেখো
আলিফা: হুম।

নাশতা করে ড্রয়িংরুমে বসে আছি রুমে যেতে ইচ্ছে করছেনা, আলিফা হয়তো রাতুলের সাথে কথা বলছে মাঝখানে গিয়ে আমার ডিস্টার্ব করা ঠিক হবে না। তাছাড়া আজকাল আলিফার রাতুলের সাথে কথা বলাটা সহ্য করতে পারি না, বুকের কোথাও যেন চাপা কষ্ট অনুভব হয়।
রিয়ান: ভাইয়া একা একা বসে কি ভাবছ
আমি: কিছু নাতো
রিয়ান: তোমার মুখ দেখলেই বুঝা যায়
আমি: হুম
রিয়ান: ভাবি রুমে একা আর তুমি এখানে বসে আছ
আমি: ও মনে হয় রাতুলের সাথে কথা বলছে তাই ডিস্টার্ব করতে ইচ্ছে করছে না
রিয়ান: ভাইয়া এখন কি করবে
আমি: জানিনা মাথায় কিছু আসছে না, আগে তো একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম কিন্তু এখন সব এলোমেলো হয়ে গেলো। আলিফা কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না আর এখন ওর মনের যা অবস্থা তাই চাপ দিচ্ছি না কিন্তু এভাবে আর কতোদিন। আমি আর পারছি না।
রিয়ান: ভাইয়া আমি বলি কি ভাবিকে তুমি স্বাভাবিক হতে আর কিছুদিন সময় দাও। হঠাৎ করে ভাবির বাবা মারা গেছেন বুঝতেই তো পারছ মনের অবস্থা ঠিক নেই, আর কিছুদিন সময় দিলে হয়তো ভাবি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে
আমি: সাত মাসে যখন পারেনি ও আর পারবেও না
রিয়ান: বলছে তোমাকে, সবকিছুতে তাড়াহুড়া করলে হয় না ভাইয়া। তুমি যে হুটহাট রেগে যাচ্ছ একবার ভেবে দেখতো তুমি আজো নিলা আপুকে ভুলতে পারোনি তাহলে ভাবি এতো তাড়াতাড়ি ভালোবাসা ভুলে যাবে কিভাবে। ভাবির কি ভালোবাসা ভুলার কথা ছিল তুমি হুট করে বিয়ে করাতেই তো ভাবি এখন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।
আমি: কিন্তু আমিও তো একটা মানুষ আমারো কষ্ট হয় এসব আর নিতে পারছি না, আমি ওকে সময় দেইনি এমন তো না অনেক সময় দিয়েছি….
রিয়ান: হ্যাঁ আর কিছুদিন সময় দাও দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে। ভাইয়া ভালোবাসা ভুলা এতো সহজ না।
আমি: হুম
রিয়ান: ভাবির কাছে যাও উনি অসুস্থ
আমি: ওকে

রুমে এসে দেখি আলিফা বসে বসে কাঁদছে।
আমি: এই কি হয়েছে কাঁদছ কেন
আলিফা: (নিশ্চুপ)
আমি: রাতুলের ফোন কি এখনো বন্ধ
আলিফা: হুম
আমি: তাই বলে কাঁদবে, কিছুক্ষণ পর আবার ট্রাই করে দেখবে। এখন কেঁদো না প্লিজ এমনি অসুস্থ তুমি আরো অসুস্থ হয়ে পড়বে।
আলিফা: আমি বলেছি তোমাকে এজন্য কাঁদছি আর আমি অসুস্থ হলে কার কি
আমি: মানে আর এতো রেগে যাচ্ছ কেন
আলিফা: কিছুনা (গাল ফুলিয়ে বসে আছে এখন ওকে দেখতে একদম বাচ্চা মেয়েদের মতো লাগছে)
আমি: আপনি অসুস্থ হওয়াতে কারো কিছু না হলে কেউ রাত জেগে আপনার কপালে জলপট্টি দিতো না বুঝেছেন
আলিফা: হুহ জলপট্টি দিলেই রোগীর সেবা করা হয়ে যায় নাকি
আমি: তো আর কি করতে হবে বলে দাও আমি তো জানিনা
আলিফা: জানতে হবেও না, আমি অসুস্থ জেনেও তো এতোক্ষণ বাইরে ছিলে
আমি: হুম এতোক্ষণে বুঝলাম রাগিণী রাগ করেছে কেন
আলিফা: রাগ কি
আমি: হাহাহা রাগিণী নাকি জানেনা রাগ কি
আলিফা: জানিই না তো
আমি: শিখাতে হবে নাকি (ওর একদম কাছে গিয়ে বললাম, ও আমার দিকে তাকিয়ে আছে)
ভাইয়া একটু নিচে আসতো (হঠাৎ রিয়ানের ডাক শুনে তাড়াতাড়ি সরে গেলাম)
আলিফা: রিয়ান ডাকছে যাও
আমি: ওকে।

ড্রয়িংরুমে এসে দেখি রিয়ান অফিসে যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আমি: রিয়ান কিছু বলবি
রিয়ান: অফিসে যাবা কিনা জিজ্ঞেস করার জন্য ডেকেছি
আমি: কিভাবে যাবো একটু সময় তোর কাছে বসে ছিলাম তাতেই আলিফা রেগে আছে অফিসে গেলে তো আমাকে মেরেই ফেলবে
রিয়ান: তাহলে থাকুক ভাবি সুস্থ হলে পরেই যেও
আমি: ওকে সাবধানে যাস
রিয়ান: ভাইয়া তুমি যাই বলো ভাবি কিন্তু তোমাকে ভালোবাসতে শুরু করেছে
আমি: তোর কথাটা সত্যি হলে তো ভালোই হতো
রিয়ান: সত্যি তো আস্তে আস্তে হয়েই যাচ্ছে। ভাইয়া একটা কথা বলবো
আমি: বল
রিয়ান: আমার না চাচ্চু ডাক শুনতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে
আমি: দাঁড়া ফাজিল।
রিয়ান হাসতে হাসতে দৌড়ে চলে গেলো, যে মেয়ে আমাকে সোফায় ঘুমুতে দেয় আবার বাচ্চা।

রুমে আসতেই দেখি আলিফা নিলার ছবির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আর কি যেন ভাবছে।
আমি: আলিফা
আলিফা: হুম
আমি: ছবির দিকে তাকিয়ে কি ভাবছ
আলিফা: ভাবছি মেয়েটা খুব ভাগ্যবতী
আমি: কিভাবে
আলিফা: এইযে তোমার মতো একজনের ভালোবাসা পেয়েছে
আমি: এদিক থেকে ভাবলে তো তুমিও ভাগ্যবতী কারণ আমি নিলাকে যতোটুকু ভালোবাসতাম তোমাকেও ততোটুকু ভালোবাসি
আলিফা: তাই বুঝি
আমি: সন্দেহ আছে বুঝি
আলিফা: একটু আছে
আমি: দাঁড়াও তোমার সন্দেহ দুর করছি
আলিফা: এই কি করছ এভাবে এগুচ্ছ কেন।
কোনো কথা না বলে আস্তে আস্তে আলিফার দিকে এগুতে থাকলাম আলিফা পিছাতে পিছাতে গিয়ে দেয়ালে ঠেকলো। ওর একদম কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম।
আমি: এখন কোথায় যাবে
আলিফা: কি করছ
আমি: তোমার সন্দেহ দুর করছি
আলিফা: রিফা….
আলিফাকে আর কিছু বলতে না দিয়ে ওর ঠোঁটে আমার ঠোঁট ডুবিয়ে দিলাম। আলিফা আজ কোনো রাগ দেখাচ্ছে না বাধাও দিচ্ছে না চোখ দুটু বন্ধ করে নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে….

চলবে😍

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here