এক অভিমানীর গল্প পর্ব- ১২

এক অভিমানীর গল্প
পর্ব- ১২

লেখা- অনামিকা ইসলাম।

বাঁধন কাঠের পুতুলের মত দাঁড়িয়ে থাকল। ওর কাছে মনে হচ্ছিল, ঘটনাটা একটা স্বপ্ন ছাড়া আর কিছু নয়।
একসময় বাঁধনও হাত বাড়িয়ে মায়াকে নিবিড় করে জড়িয়ে ধরলো।
ঠিক তখনই মায়া বাঁধনকে ছেড়ে দিয়ে দৌঁড়ে বাহিরে চলে গেল। বাঁধন নির্বাক হয়ে আগের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে থাকল। মনে মনে ভাবল, আজই ওকে স্যরি বলব। তারপর যা হয় হবে।
এরই মাঝে বৃষ্টি থেমে গেল। ক্ষাণিক বাদেই মায়া ফিরে এলো। বাঁধন মায়ার ভয়ে তাকাতে পারছিল না। না জানি কি শাস্তি জারি করে এভাবে নিবিড় করে জড়িয়ে ধরা’য়। মায়া সামনে এসে দাঁড়িয়ে কঠিন স্বরে বলল, এদিকে তাকান।
বাঁধন অনেক কষ্টে মায়ার দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল। মায়ার চোখে মুখে কোনো লজ্জা বা সংকোচ ছিল না। ছিল প্রতিশোধের চিহ্ন। মায়া দ্বিধা- সংকোচ ছাড়াই বলল, আপনি কি আমাকে ভালোবাসতেন?
আচমকা এ ধরনের প্রশ্নে ভড়কে যায় বাঁধন।
আবারো মায়ার তাড়া, চুপ করে রইলেন কেন? জবাব দিন।
মায়ার ঝাঝাল কন্ঠে বাঁধন স্তম্ভিত। তবুও সাহস করে বলল, হ্যাঁ, আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি লক্ষ্মী।
ভালোবাসার পূর্বশর্ত বিশ্বাস, সেটা কখনো শুনেননি আপনি? উত্তেজিত হয়ে বলল মায়া।
লক্ষ্মী প্লিজ আমায়, সব কথা শেষ করার আগেই মায়া একটা চিরকুট বের করে বাঁধনের হাতে দিল। বাঁধন চিরকুট’টি হাতে নিয়ে বলল, কি এটা?
ব্রেকআপ লেটার। আপনার সাথে আমার ব্রেকআপ হয়ে গেছে। আজ থেকে আমরা কেউ কাউকে চিনি না, জানি না। এমনকি আজকের পর থেকে আমরা একে অপরের সাথে কোনো প্রকার যোগাযোগ রাখব না। প্রমাণ সরূপ জটপট এখানে একটা সাক্ষর করেন তো। আমার আবার হসপিটালে চাকরী হয়েছে। জিনিস পত্র সব গুছিয়ে রাখতে হবে। কাল থেকে ওখানে চলে যাব।
বাঁধনের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। হাসবে নাকি কাঁদবে কিছুই বুঝতে পারছিল না। মুখ দিয়েও কোনো কথা বের হচ্ছিল না। মায়া বলতে লাগল, ঢাকায় আপনি যে হসপিটালে বসেন, সেই হসপিটালেই আমি জয়েন করব। স্যালারী খুব বেশি না, তবে চলে যাবে আমার। কাজ খুব সহজ, ইসিজি করা। যা আমি মাস ছয়েক আগে শিখেছিলাম।
আর হ্যাঁ, আজ যে ঘটনাটা ঘটল সেটা স্মৃতি চিহ্ন হয়ে থাকবে।
বাঁধন অবাক হলো।

এরপর মায়া স্বাভাবিকভাবে বলল, আজ যেটা করেছি, সেটা না করলে আপনি কোনো দিন বুঝতেন না আমি আপনাকে সত্যি’ই ভালোবেসেছিলাম। পরবর্তী জীবনে কতটা অসুখী হবো এখন নিশ্চয় তা বুঝবেন। তাড়াতাড়ি সাক্ষরটা দিয়ে দিন।
বাঁধন হা করে মায়ার দিকে তাকিয়ে আছে।
কি হলো! কথা কানে যাচ্ছে না? নিন, সাক্ষর’টা করে আমাকে উদ্ধার করেন।
বাঁধন কোনো কথা না বলে, চিরকুটের নিচে ছোট্ট করে লিখল- ভালোবাসি….. তারপর ভাঁজ করে মায়ার হাতে চিরকুটটা ধরিয়ে দিল।
এভাবে ফ্যালফ্যাল করে তাকানোর কিছুই হয়নি। আর শুনুন, আজকের পর থেকে যাতে আপনাকে আমার বাড়িতে না দেখি। আপনি আর এ বাড়িতে আসবেন না। এ বাড়িতে আপনার কেউ নেই। এখনই এখান থেকে চলে যান।
হনহনিয়ে মায়া রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
বাঁধন কিছুক্ষণ হাবার মত দাঁড়িয়ে থেকে, মায়ার পিছু নেয়।

শ্বশুরবাড়িতে শ্যালিকা যে রুমে বসে পড়ছে,
সেই রুমে গিয়ে বাস ধপাস করে খাটে শুয়ে পরল বাঁধন। শ্যালিকা চোখ বড় বড় করে প্রশ্ন করে, কি হলো ভাইয়া? শরীর খারাপ???
শুভ্র মাথা ঝাকিয়ে জবাব দেয়- শরীর নয়, মন খারাপ, মন। শ্যালিকা হিয়ার পাল্টা প্রশ্ন- আপু কিছু বলেছে? বাঁধন মুখে কিছু না বলে শুধু মাথা ঝাকায়। উত্তর হ্যাঁ বোধক শুনে হিয়াতো চটে গেছে। সেকি! আসতে না আসতে ঝগড়া করে ফেলেছে?
হিয়া প্রশ্ন করে দুলাভাইকে-
ভাইয়া কি করেছে ও???
গম্ভীর কন্ঠে বাঁধনের জবাব, ব্রেকআপ!
—— কিহ???
– জি….!!!
—— মাথাটা বোধ হয় এবার গেছে। হিয়া দৌঁড়ে গেল দুলাভাইয়ার জন্য শরবত বানিয়ে আনতে।
আপু, এক জগ শরবত বানিয়ে দাও তো!
বোনের প্রশ্নে অবাক হয় মায়া। চোখ বড় বড় করে প্রশ্ন করে বোনকে, এই! তুই এই বৃষ্টির দিনে শরবত দিয়ে কি করবি? মাথাটা কি একেবারে গেছে?
দাঁতে দাঁত চেপে হিয়ার জবাব, ঠিক ধরেছ। মাথাটা গেছে। তবে সেটা আমার নয়, তোমার ডাক্তারবাবুর।
হিয়ার কথা শুনে কিছুটা রেগে গেল মায়া। রাগান্বিত দৃষ্টিতে বোনের দিকে তাকিয়ে বলল, খবরদার! উল্টাপাল্টা কথা বলবি না।
উল্টাপালটা কথা আমি নয়, তোমার জামাই বলছে, এখনো বলেই চলেছে। কিসব অদ্ভুত কথা, আমার ব্রেকআপ হয়ে গেছে, আমার ব্রেকআপ হয়ে গেছে। কি পাগলের সাথে আমি যে দিন কাটাই সেটা ঐ আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না, এখন ওরে বিয়ে দিলাম ডাক্তারের সাথে। ভেবেছিলাম এবার বুঝি মুক্তি পাব। এখন দেখি, মুক্তি?!!!
সে গুড়েবালি। তার সাথে বিয়ে দিয়েছি সে আরো বড় পাগল।
মায়া কিছুটা ঘাবড়ে যায়, তবে আন্দাজ করতে পারছে কি হয়েছে। তাই হিয়াকে ঠেলে পড়তে পাঠিয়ে নিজেই টিউবওয়েল থেকে ঠান্ডা পানি এনে তার সাথে লবন আর লেবুর রস মিশালো। গুড় খুঁজতে গিয়ে না গিয়ে চিনি আবিষ্কার করল। কিন্তু চিনি তো ওনি খায় না। কি আর করার? অগত্যা চিনি ছাড়া শরবত বানিয়ে মায়া হিয়ার পড়ার রুমে যায়।
– নিন! গুড় নেই, চিনিও দেইনি। মিষ্টি ছাড়াই খেয়ে নিন।
—— বাঁধন এক নিঃশ্বাসে গ্লাসের সবটুকু পানি খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বলে, আহ!
মিষ্টি……এমন মিষ্টি জীবনেও খাইনি।
হিয়া পড়া রেখে চোখ বড় বড় করে দুলাভাইয়ের দিকে তাকায়। “আপনি আবার মিষ্টি পেলেন কোথায় থেকে? কে দিয়েছে মিষ্টি?”
বাঁধন মায়ার দিকে তাকিয়ে দুষ্টু হাসি দিয়ে বলে, তোমার আপুর থেকে পেয়েছি, তোমার আপু খাইয়ে দিয়েছে। আহ! কি মিষ্টি…. এখনো স্বাদ লেগে আছে ঠোঁটে।
রাগী চোখে মায়া বাঁধনের দিকে তাকাতেই বাঁধন চোখ মেরে দেই। চতুর হিয়া বোনের লাল হয়ে যাওয়া মুখের অবস্থা দেখেই বুঝে গেছে তার বোনের জামাই কোন সে মিষ্টির কথা বলছে।
তাই সে আর কথা না বাড়িয়ে গোসল করার অজুহাতে ভদ্র বালিকার মতো রুম থেকে বের হয়ে যায়।

অঝোর ধারায় বৃষ্টি পরছিল। বাঁধন তখন চেয়ারে বসে বাহির পানে তাকিয়ে ছিল। অনেকটা আফসোসের স্বরে বাঁধন আনমনেই বলে ফেলল- ইস, থাকলে লুডু খেলাটা জমত বেশ!
রুমে বসা ছিল হিয়াসহ মায়ার ২টা কাজিন। হিয়া আত্মহারা হয়ে বলে, মানা করছে কে? চলেন? শুরু করা যাক। কথাটা বলেই বিছানার নিচ থেকে কাগজে মুড়ানো লুডু বাঁধনের হাতে তুলে দেয়।
লুডু হাতে মুখটা কালো করে বাঁধন বলে উঠে, তোমার বোন থাকলে জমতো বেশ!
কিন্তু আপুতো বৃষ্টির দিনে কাথা নিয়ে, বালিশ জড়িয়ে শুয়ে থাকতে পছন্দ করে। ও কি আসবে?
বাঁধন হিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে, গিয়ে বলো আগে। না আসলে দেখা যাবে কি করা যায়।
ঠিক আছে, আমি যাচ্ছি। তবে মনে হয় না কোনো কাজ হবে।
হিয়া, মায়াকে ডাকতে মায়ার রুমে যায়। মায়া তখন রুমের বাহিরেই বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। হিয়া গিয়ে লুডু খেলার কথা বলতেই একটা ধমক দিয়ে দেয়। ব্যর্থ হিয়া মন খারাপ করে রুমে ফিরে। মুখ গুমড়া করে বাঁধনকে জানায়, এখনো কাথা নিয়ে, বিছানায় যায়নি। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। তাই খুশি মনে কথাটা বলছিলাম। একটা ধমক দিয়ে কান ফাটিয়ে দিয়েছে। আপনাকে আগেই বলছিলাম কাজ হবে না।
বাঁধন হিয়াকে সান্ত্বনা দিয়ে চুপ করায়। তারপর উচ্চস্বরে বলতে থাকে, আরে হিয়া বুঝো না কেন? মানুষ পারলে তো খেলবে? আমার মতো খেলেয়ারের সাথে খেলা এত সহজ না। এর জন্য সাগস লাগে, সাহস!
কথাটা মায়ার কানে পৌঁছতে দেরি হয়নি। ছুটে আসে রুমে। অগ্নিচোখে বাঁধনের দিকে একবার তাকিয়ে, লুডু নিয়ে বসে পরে। খেলা শুরু হয় বাঁধন-হিয়া বনাম মায়া- হৃদয়। ফ্লোরে বসে এরা পুরোদমে খেলে চলছে, অন্যদিকে মায়ার এক কাজিন চিরকুট হাতে নিয়ে চেয়ারে বসে আছে বিচারকের ভঙ্গিতে। হাতে দুইটা ছোট্ট ছোট্ট কাগজ। একটা বাঁধনের দেয়া, আরেকটা মায়ার। এখন শুধু হার জিত দেখার পালা। যেই হারবে, সে-ই অপরপক্ষের লিডারের দেয়া চিরকুটে উল্লেখিত যেকোনো আবদার পূরণে সচেষ্ট থাকতে হবে।

বহু চড়াই উতরাই পেরিয়ে খেলায় জয়ী হলো। জিতে গেল বাঁধন, হেরে গেল মায়া। লজ্জায়, রাগে, দুঃখে মরে যেতে ইচ্ছে মায়ার। কিন্তু কোনো রাগ দেখাল না। রাগ না দেখিয়ে চুপসে মাথা নিচু করে আগের স্থানেই বসে রইল। ঠিক তখনি মায়ার কাজিনটা বাঁধনের দেয়া চিরকুট’টা মায়ার হাতে ধরিয়ে দেয়। চিরকুট হাতে নিয়ে ভাঁজ খুলে লেখাটা পড়ে বাঁধনের দিকে একবার ভ্রু কুঁচকে তাকায় মায়া। বাঁধনের মুখে বিশ্বজয়ের হাসি। চোখ ফিরিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়ায় মায়া। কাউকে কিচ্ছু না বলে রুমে গিয়ে শুয়ে পরে মায়া। মিনিট পাঁচেক পর রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয় বাঁধন।

চলবে…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here