এক অভিমানীর গল্প পর্ব- ১১(মহাপর্ব)

এক অভিমানীর গল্প
পর্ব- ১১(মহাপর্ব)
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

সকালে ঘুম থেকে উঠে ভড়কে যায় মায়া। ঘড়িতে সময় তখন সকাল ০৭টা বেজে ৪৫মিনিট।
ছি, কি লজ্জা!!!
এতক্ষণ ধরে ঘুমাইলাম? তড়িগড়ি করে বিছানা থেকে উঠতে গিয়ে টের পায় মায়া, ওর চুলগুলো যেন কোথায় আটকে আছে। চুল ছাড়ানোর জন্য ফিরে তাকাতেই দেখতে পায় বাঁধনের শার্টের বোতামে চুলগুলো আটকে।
চুলগুলে বোতামের সাথে এমন ভাবে প্যাঁচিয়ে ছিল যে মায়া তা ছাড়াতে পারেনি। ছাড়াতে না পেরে শরীরের জোর দিয়ে চুল গুলো ধরে টানতে থাকে। এতেও কাজ হচ্ছে না।
ইস! এমনিতেই লেইট তারউপর এমন একটা পরিস্থিতি। আল্লাহ! আমারে বাঁচাও।
মায়ার কথায় বাঁধনের ঘুমের কিছুটা বিঘ্ন ঘটে। নড়েচড়ে উঠে বাঁধন। চুলে টান খেয়ে হুমড়ি খেয়ে বাঁধনের বুকে গিয়ে পরে মায়া। উঠতে গেলে জাপটে ধরে বাঁধন।
ঘুম ঘুম গলায়’ই বলে, উম্মমমমমমমম! কোথায় যাচ্ছ? আরেকটু থাকো না!
মায়া মনে মনে ভাবছে, দাঁড়া! তোর রোমাঞ্চ আমি বের করছি।
মায়া যে পাশে শুয়েছিল, তার ঠিক নিচেই বাঁধন বাজার থেকে ব্লেড কিনে এনে রেখেছিল কাজিনের ছেলের মাথা ন্যাড়া করার জন্য। মায়া সেই ব্লেডটাই কাজে লাগালো। চুল ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা না করে অনেকটা উপর থেকেই চুল’ই কেটে ফেলল।
আহ! মুক্তি….
রুম থেকে বেরিয়ে যায় মায়া। ততক্ষণে রান্না হয়ে গেছে বাসায়। খাবার টেবিলে অনেকে বসে ব্রেকফাস্ট করছে।
ইস! লজ্জায় মাথা কাটা গেল….
ফ্রেশ হয়ে মায়া দোতলায় দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিচে সবার খাওয়া দেখছে। নিচে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে না সে।
ব্যাপারটা বাঁধনের বাবার চোখ এড়ায় না। মায়া বলে এক আদুরে ডাক দেন। শ্বশুর মশাইয়ের আদুরে গলার ডাক শুনে লজ্জা ভুলে দৌঁড়ে নিচে নামে মায়া।
নিচে নামতেই শাশুড়ির প্রশ্ন, একা কেন তুই? গন্ডারটা উঠে নি?
আমতা আমতা স্বরে মায়ার উত্তর, ঘুমুচ্ছে গন্ডারের মত।
মায়ার কথায় সবাই ওর দিকে ফিরে তাকায়। মায়াতো নিজের বোকামির জন্য নিজেকেই গালাগাল দিচ্ছে।
ধূর! কি বলতে কি বলতে কি বলে ফেললাম? আমিও গন্ডার ডাকলাম?!।!
শাশুড়ি মুচকি হেসে বলে, বসছিস না কেন? নাকি গন্ডারের সাথেই খাইবি?
লজ্জায় মাথা নিচু করে তাড়াতাড়ি খেতে বসে পরে মায়া। খেতে বসে মায়ার এদিক ওদিক তাকানো দেখে শ্বশুরের প্রশ্ন- মা! কিছু লাগবে তোমার?
নিচু স্বরে মায়ার জবাব, রাকিব ভাই- ভাবি কোথায়? ওদের কে যে দেখছি না!
চলে গেছে ভোরের ট্রেনে, সামনে থেকে ফারজানার জবাব।
একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে মায়া।
আহ! যা বাঁচা বেঁচে গেলাম……

সকাল ১০টা বেজে ১২মিনিট__
বাঁধন একবারো রুমের বাইরে আসেনি। এখনো পরে পরে ঘুমুচ্ছে মনে হয়। একটা ডাক দিয়ে আসি।
নাহ! বাঁধন ঘুমুচ্ছে না। খাটে আধশোয়া অবস্থায় হেলান দিয়ে মুখ ভার করে ফোন টিপছে।
সেরেছে রে! ইনি মনে হয় চুল দেখে কষ্ট গেছেন। যে চুল ওনার এত প্রিয়, সেই চুল ছাড়ানোর চেষ্টা না করে কেটে ফেললাম। ওনি বোধ হয় তাই কষ্ট পেয়েছেন।
মায়া ধীর পায়ে বাঁধনের দিকে এগিয়ে যায়। মায়া কাছে যেতেই বাঁধন ফোনটা অফ করে বালিশের নিচে রেখে কপালে হাত দিয়ে শুয়ে পরে।
কাছে গিয়ে মায়া ডাক দেয়, শুনছেন!
বাঁধনের কোনো জবাব নেই দেখে আবারো ডাক দেয়- এই শুনছেন…..!!!
এবারো বাঁধনের কোনো সাড়া নেই। সাড়া না পেয়ে মায়া বাঁধনকে ধাক্কা দিয়ে বলে, এই শুনছেন….!!!
বাঁধন এবার রাগান্বিত দৃষ্টিতে মায়ার দিকে তাকায়। ভড়কে যায় মায়া। মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে আসে ওর। কিন্তু বাঁধন কিছু বলেনি। কিছু না বলে আবারো পূর্বের ন্যায় কপালে হাত দিয়ে শুয়ে পরে। মায়া আবারো কিছুটা ধাক্কা দিয়ে আদুরে গলায় ডাক দেয়-
এ্যাই…..!!!
বাঁধন এবার সোজা হয়ে বিছানায় উঠে।
মায়ার দিকে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন করে- কি? সমস্যা কি তোমার? এমন কেন করছ? শান্তিতে কি ঘুমোতেও দিবে না?
অনেকটা ধমকের স্বরে বাঁধন কথাগুলো বলে। ধমক শুনে মুখটা গুমড়া করে ফেলে মায়া। অন্যদিকে তাকিয়ে ভাবছে-
ওহ! কষ্ট পাননি তাহলে, রেগে গেছেন।
তাইলে কোনো সমস্যা নাই। রাগ দেখিয়ে চুপ করে রুমে বসে থাকেন, আমি ততক্ষণে একটা কবিতা লিখে আসি।

রুমে গিয়ে ফোনটা ওপেন করে নোটপ্যাডে লিখতে শুরু করে মায়া__

এতো আয়োজন করে
আমাকে কেউ কোনোদিন চায়নি।
মন খারাপের দিনে
আমার পাশে বসে গল্প শুনায়নি।

পড়ন্ত বিকেলে হাতটা ধরে
হাঁটার জন্য কেউ এতটুকুও
আবদার করেনি,
বৃষ্টিস্নাত বিকেল কিংবা সন্ধ্যায়
একসাথে বৃষ্টিতে ভিঁজার জন্যও
কেউ আমায় পাশে রাখেনি।
কখনো কাছে এসে বলেনি কেউ-
এগিয়ে দাও পা, নূপুর পরিয়ে দেই।

কাজ শেষে ঘরে ফেরার পর
কেউ কোনোদিন আমার কপালে ভালোবাসার উষ্ণ পরশ এঁকে দেয়নি,
গুজে দেয়নি খোপায় বেলির ফুল।
অভিমানে কেউ আজো আমার নামে
লেখেনি ভালোবাসার নামে অভিযোগ।

আমি চাই কেউ আমায়
খুব করে চেয়ে বসুক,
বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যায় কিংবা বিকেলে
হাতে হাত ধরে বৃষ্টিতে ভিঁজুক।
আমি চাই আমাকেও কেউ
অনেক কাছে রাখুক,
মন খারাপের গল্প শুনাক।

আমি চাই কেউ আমার কাছে আসুক,
হাতে হাত রেখে দুরের পথে হাটুক।
আমি চাই কেউ বলুক-
লক্ষ্মী পা টা দাও তো, নূপুর পরিয়ে দেই;

আমি চাই ঘরে ফিরে
কেউ আমার কপালে ভালোবাসার
এক উষ্ণ পরশ এঁকে দিক,
খোঁপায় বেলির মালা গুজে দিক।
আমি চাই আমার সাথে কেউ অভিমান করুক,
চোখের জলে মাঝেমধ্যে দু’একটা
অভিযোগ পত্র লিখুক।

কবিতা লিখে আবেগপ্রবণ হয়ে গেল মায়া,
যেটা সবসময় হয়।
দৌঁড়ে গেল বাঁধনের রুমে। বাঁধন আবারো তখন ফোন টিপায় ব্যস্ত। মুখ দেখে মনে হচ্ছে কোনো টেনশনে আসে।
আমি গিয়ে না হয় টেনশনটা দুর করে দেই। ওনাকে কবিতা আবৃত্তি করে শুনাই। আমার কবিতা আবৃত্তি শুনলে তো আবার ওনার মন ভালো হয়ে যায়। আজো কবিতা শুনে আমার সাথে রাগ করে থাকতে পারবে না। যেমন কথা, তেমন কাজ।
মায়া বাঁধনের পাশে চেয়ার টেনে বসে হৃদয়ের সবটুকু অনুভূতি মিশিয়ে দিয়ে আবৃত্তি করতে শুরু করে……..
আবৃত্তি করা শেষ। পুরো আবৃত্তি চলাকালীন সময় বাঁধন একটা কথাও বলেনি। কিন্তু এখন বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াচ্ছে। মায়া তো আনন্দে আত্মহারা এই ভেবে যে ওর আবৃত্তি কাজে দিয়েছে।
কিন্তু একি?!!! ওনি যে আমার কাছেই আসছেন। কি করতে চাচ্ছেন ওনি? কবিতার আবদার গুলো পূরণ করতে চাচ্ছেন না তো!!!
চেয়ারে বসে ছিল মায়া। বাঁধন মায়ার দু’বাহু ধরে চেয়ার থেকে ওকে দাঁড় করায়।
ইস! এমন ভাবে তাকিয়ে আছেন মনে তো হচ্ছে ওনি কল্পনায় ডুবে গেছেন। এখন হয়তো কপালে ভালোবাসার উষ্ণ পরশ এঁকে দিবে। সে জন্যই তো দাঁড় করালো। লজ্জায় চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলে মায়া।
চোখ খুলে বাঁধনের ধমক শুনে।
এখনো এখানে দাঁড়িয়ে আছ? বের হয়ে যাও রুম থেকে। মায়া নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছে না। বাঁধন ওর সাথে এভাবে কথা বলবে সেটা যে ও কল্পনাতেও ভাবতে পারেনি। চোখের জল টলটল করছে। আর কিছুই ভাবতে পারছে না। ভাবতে গেলেই কান্না করে দিবে। তাইতো অভিমানে দৌঁড়ে সে স্থান ত্যাগ করে মায়া।

পুরো দিনে একবারও মায়া বাঁধনের সামনে যায়নি, যদিও ওর দুটি চোখ চাতকের ন্যায় আশায় চেয়ে ছিল কখন আসবে বাঁধন, হাতটি ধরে পাশে বসবে। জল ছলছল দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে বলবে,
” ভালোবাসি তো লক্ষ্মী…..”
সব ভুলে মায়া বাঁধনের বাহুডোরে আটকা পরবে। এসব, এসবই ভাবতে ভাবতে মায়ার দিন কেটে গেল। রাত এলো।
চুপচাপ রাতের খাবার খেয়ে এলাকায় বন্ধুদের সাথে কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরি করে আসল। তারপর চুপটি করে এসে বিছানায় শুয়ে পরল।
এদিকে অনেকক্ষণ বিছানায় মরার মত শুয়ে থেকেও মায়া যখন দেখল প্রতিদিনের মত বাঁধন আজ আর ওকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করছে না তখন মায়া নিজেই বাঁধনের কাছে যায়। চুপটি করে বাঁধনের বুকে মাথা রাখে।
বাঁধন মায়ার মাথাটা ওর বুক থেকে সরিয়ে দিয়ে ঝাঁঝালো কন্ঠে বলে, দিনে তো অনেক করছ। এবার রাত্রেও কি আমায় ঘুমোতে দিবে না?
মায়া প্রায় কেঁদে দিবে দিবে অবস্থা, কিন্তু কাঁদেনি। করুণ দৃষ্টিতে মায়া বাঁধনের দিকে তাকায়, প্রশ্ন করে বাঁধনকে।
” এ্যাই! কি হয়ছে আপনার? এমন কেন করছেন?”
প্রশ্নটা মায়া বাঁধনের গালে হাত রেখে করে। বাঁধন হাতটা সরিয়ে অনেকটা বিরক্তির দৃষ্টিতে মায়ার দিকে তাকায়। ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করে-
” তুমি কি আমাকে আজকে ঘুমোতে দিবে না বলে স্থির করেছ?”

বাঁধনের এই একটি কথায় নিমিষেই মুখটা কালো হয়ে যায় মায়ার। কন্ঠ’টা কেমন যেন ভারি হয়ে আসে। তবুও প্রশ্ন করে-
” আপনি আমাকে এটা বলতে পারলেন?”
বাঁধন কিছুটা নরম স্বরে বলে, তা নয়তো কি?
জবাবে আর একটা কথাও বলেনি। বাঁধনের থেকে অনেকটা দুরে সরে গিয়ে ওর বিপরীতমুখী হয়ে শুয়ে পরে মায়া।
বাঁধনও ফোনটা রেখে লাইট’টা অফ করে কপালে হাত রেখে শুয়ে পরে।
পুরো রাত্রির ভেতর মায়া একটুও নড়েনি, তাই বাঁধন জানে না সে রাত্রে মায়া ঘুমিয়েছিল কি না। কিন্তু বাঁধন?!!! বাঁধন এক সেকেন্ডের জন্যও চোখের পাতা এক নড়তে পারে নি। একটা অজানা কষ্ট ওকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল ভেতরটা।
পরদিন সকালেও বাঁধনের ঘুম থেকে উঠতে একটু দেরী হয়। ফ্যানটা অফ করে বিছানা গুছাতে গিয়ে মায়া বাঁধনের ফোনটা নিচে পরে থাকতে দেখে। উঠাতে গিয়ে দেখে ফোনের স্ক্রিনে বার বার সবুজ বৃত্ত জ্বলে উঠছে। বোধ হয় কোনো কিছুর নটিফিকেশন আসছে।
লকটা খুলে নটিফিকেশন গুলো রিমোভ করার জন্য হাত বাড়াতেই মায়ার চক্ষু কপালে উঠে যায়। মনে হচ্ছে সবকিছু ঝাপসা দেখছে ও। নিজের চোখকেও কেন জানি বিশ্বাস করতে পারছিল না। আর পারার কথাও নয়।
মায়া বাঁধনের ইমুর চ্যাটলিস্টের প্রথমে ওর সাবেক প্রেমিক আরিফের নাম্বারটা দেখতে পায়। আরিফ!!!! যে একসময় মায়ার প্রাণ ছিল। যাকে ছাড়া মায়া একমুহূর্তও বেঁচে থাকার কল্পনা করতে পারত না। সেই আরিফ, যে মায়ার প্রথম ভালোবাসা ছিল।
ছেলেটা ভিষণ ভাবে কষ্ট দিয়েছে মায়াকে। দিনে দিনে আরিফের কষ্ট দেয়ার মাত্রাটা বেড়েই যাচ্ছিল। শেষের দিকে তো আরিফ ভিষণ ভাবে এড়িয়ে চলেছে মায়াকে। এতেও কাজ হয়নি। মায়া পাগলের মত আরিফকে কল দিত, আরিফের কাছে ছুটে যেত। বাধ্য হয়ে আরিফ সিম চেঞ্জ করে ফেলে। একদিন মায়াকে না জানিয়েই দেশের বাহিরে চলে যায়। চিরতরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় মায়ার সাথে আরিফের। মায়া নামাজে বসে খুব কাঁদত। আরিফকে হারিয়েছে এতে ওর কোনো কষ্ট নেই, ওর শুধু একটাই চাওয়া ওর আরিফ যেন দুর দেশে ভালো থাকে। যে সুখের জন্য আরিফ ওকে এতটা কষ্ট দিয়েছে, এড়িয়ে চলেছে, সে সুখ যেন ওর কাছে ধরা দেয়। মায়ার রোজকার প্রার্থনার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল আরিফের সুখ কামনা।
অভিশাপ মুখে দিতে হয় না। মনে কষ্ট পেলে অভিশাপ এমনিতেই লেগে যায়। আরিফেরও তাই হলো। মায়ার ভালোবাসার অভিশাপে সে সব হারালো। প্রথমে সেই মেয়েকে যার জন্য মায়াকে এতটা এড়িয়ে চলত, তারপর বাবাকে।
সব হারিয়ে নিঃস্ব আরিফ কল দেয় মায়াকে। কিন্তু ততদিনে অনেক বেশী দেরী হয়ে গেছে। ৪বছরে বদলে গেছে অনেক কিছুই। ঠিক যেমন বদলে গেছে মায়ার এলোমেলো জীবন বাঁধনের সান্নিধ্যে এসে।
বাঁধন মায়াকে নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখায়। নাহ….
বাঁধন ভালোবাসতে নয়, ভালো রাখতে এসেছিল। এক নিঃসঙ্গ লেখিকার প্রেমের সঙ্গী হতে নয়, মন খারাপের সঙ্গী হতে এসেছিল।
কেউ কাউকে কখনো বলেনি, ভালোবাসি। তবুও ভালোবাসা হয়ে গেল। সেই ভালোবাসা বিয়ে পর্যন্ত গড়ালো। আজ এতদিন পর আরিফের কল।
ভিতরটা অজানা আশঙ্কায় মুচড় দিয়ে উঠে। কলটা কেটে দেয় মায়া। কল কেটে বাঁধনের সাথে হওয়া প্রতিটি কথোপকথন মন দিয়ে পড়তে থাকে মায়া। যতই পড়ছিল, ততই কষ্টে ভিতরটা ফেটে যাচ্ছিল মায়ার।
আরিফ বাঁধনকে মায়ার সম্পর্কে এমন গুছিয়ে বলল যে, এটা দেখে যে কেউ বলে দিবে মায়া আরিফকে বড্ড বেশী ভালোবাসত। বাঁধনও সেটাই ভেবেছে।
আর তাইতো এইভেবে মায়ার আড়ালে কেঁদেছে-
এর অর্ধেকের অর্ধেকও তো আমায় ভালোবাসে না…..

ফোনটা বাঁধনের বালিশের পাশে রেখে রুম থেকে বেরিয়ে যায় মায়া। আজ খুব কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে ওর, কিন্তু পারছে না। কান্না’টা যেন কোথায় আটকে আছে।
সেদিন মায়া আর ইচ্ছে করেই বাঁধনের কাছে যায়নি, বাঁধনকে বিরক্ত করেনি। সারাদিন শুয়ে বসে কাটিয়ে রাত্রে ননদ ফারহানার সাথে ঘুমানোর বন্দোবস্ত করে।
এদিকে রাত্রি ১০টা বাজে, মায়ার রুমে আসতে দেরী থেকে বাঁধন কল করে বোনের ফোনে। জিজ্ঞেস করে-
” কিরে! তোর ভাবি কোথায়?”
ফারহানার জবাব, এইতো! আমার সাথে ঘুমোবে বলল…..
বাঁধন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কলটা কেটে দেয়। ঘুমিয়ে পরে বাঁধন।
ঘুম ভাঙে সকাল ৮টায়, বাচ্চা কাচ্চার শোরগোলের আওয়াজে। জানালা খুলে বোনের রুমের দিকে তাকায়। রুমে তো কেউ নেই। গেল কোথায় এরা….
বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়ে নিচে তাকায় বাঁধন।
কিরে! কি হয়ছে? এত হৈচৈ কিসের?
পিচ্চি বোন আফসানার জবাব, মায়া’পু চলে যাচ্ছে তো, আমরা রাস্তায় এগিয়ে দিয়ে আসছি।
কিহ?! চলে যাচ্ছে মানে???
বাঁধন জলদি ওর রুমের পিছনের জানালা খুলে। ওখান থেকে রাস্তা পুরোটা দেখা যায়।
বাঁধন সেই জানালা দিয়ে দেখতে পায় কেমন জল ছলছল চোখে মায়া জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে। বাঁধন তাকাতেই চোখটা ফিরিয়ে নেয় মায়া। তারপর সি.এন.জিতে উঠে পরে। তার একটু পরেই বাঁধনের বাবা উঠে সি.এন.জিতে। সি.এন.জি চলতে শুরু করে। একটু একটু করে দুরে চলে যায়।

মায়া চলে যাওয়ার ঘন্টা দুয়েক পর কল ফেবুতে নক করে ওর বান্ধবীকে।
বাঁধনকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে মেসেজের পর মেসেজ পাঠাতে থাকেন ওনি___
” শেষ পর্যন্ত একটা অচেনা ছেলের জন্য এভাবে দুরে সরিয়ে দিলেন নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে?”
” মায়ার অতীত সম্পর্কে সবকিছুই তো আপনি জানতেন, তারপরও ওকে এতটা কষ্ট দিলেন?”
” একটাবারের জন্যও ভাবলেন না যে কারণটার জন্য আপনি ওকে এড়িয়ে চলছেন, সেটা ও জানতে পারলে কতটা কষ্ট পাবে..”
” এই আপনার ভালোবাসার প্রতি বিশ্বাস?”
” শেষ পর্যন্ত কাঁদতে কাঁদতে মেয়েটা আপনার বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল।”
আশ্চর্য কি জানেন?
এই যে এতকিছু করলেন তারপরও মেয়েটির কোনো অভিযোগ নেই। ও বার বার শুধু একটা কথায় বলছিল, আমি মরে যাবো। ঐ ছেলের কারণে যদি আমাদের রিলেশনে ফাটল ধরে তাহলে আমি মরে যাবো।
” দেখে নিয়েন আপনি! সত্যি সত্যি ও একদিন মরে যাবে। যেদিন মরে যাবে, সেদিন বুঝবেন কি ছিল ও আপনার জীবনে….???”

বাঁধন দাঁড়ানো থেকে বসে পরল। চিৎকার করে কাঁদতে পারছে না ও কিন্তু চোখ থেকে ঠিক’ই জল গড়িয়ে পরছে।
এ আমি কি করলাম?! ওকে আমি কষ্ট দিলাম? এটা হওয়ার তো কথা ছিল না! আমি তো ওকে ভালোবাসতে নয়, ভালো রাখতে চেয়েছিলাম। ভালোবাসার সঙ্গী নয়, মন খারাপের সঙ্গী হতে চেয়েছিলাম।
সেই আমি আজ স্বার্থপর হয়ে গেলাম। নিজের কথা চিন্তা করে ওকে এতটা কষ্ট দিয়ে ফেললাম।

সেদিনটা কোনো রকম গেল, পরদিন সকাল সকাল হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে পরে বাঁধন। গন্তব্য শ্বশুরবাড়ি।
দুপুর ১টা কি দেড়টা বা’জে তখন। বাঁধন ওর শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হয়। শ্বশুর শাশুড়িকে সালাম এবং কুশল বিনিময়ের একপর্যায়ে বাঁধন ওর শ্যালিকা মারফত জানতে পারে বউটা ওর সকাল থেকে ওদের পুরনো বাড়িতে আছে।
বাহিরে বৃষ্টি পরছে। এখন গেলে কাকভেঁজা হয়েই যেতে হবে। কিন্তু না যেয়েও উপায় নেই। শ্যালিকার থেকে একটা ছাতা নিয়ে ও বাড়িতে চলে যায় বাঁধন। মায়াদের পুরনো টিনশেড বাড়ি। নতুন বাড়ি তৈরি করার পর এখান থেকে ওরা চলে গেছে। কিন্তু মায়া মাঝে মাঝে এখানে এসে শুয়ে থাকে।
ঘরের দরজাটা হালকা মিশানো ছিল। ছাতা বন্ধ করে দরজা ঠেলে রুমে প্রবেশ করতেই বাঁধনের মাথা ঘুরে যায়। একটা সবুজ পরি সবুজ লেহেঙ্গা পরনে খাটে বাচ্চাদের মত হাত পা ছড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে। ঘুমন্ত প্রিয়ার কাছাকাছি যেয়ে মুখ থেকে দৃষ্টি সরাতেই একটা জায়গায় চোখ আটকে যায় বাঁধনের। দু’হাত উপরের দিকে দিয়ে, টানটান হয়ে শুয়ে ছিল মায়া, যার কারণে ফতুয়াটা একটু উঠে পেটের খানিক জায়গা ফাঁকা হয়ে যায়। বাঁধনের দৃষ্টি ছিল মায়ার নাভির দিকে।
বাঁধনের কেমন যেন নেশা ধরে যায়। ইচ্ছে হচ্ছে ঘুমন্ত পরীটাকে একটু ছুঁয়ে দিতে, আদর করতে। পরমুহূর্তে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিছানায় পরে থাকা ওড়নাটা মায়ের পেটের উপর রাখে।
নড়ে উঠে মায়া। বাচ্চাদের মত পায়ে পা দিয়ে চুলকাতে থাকে। তারপর আবারো ঘুম।
মায়ার পা থেকে লেহেঙ্গাটা অনেকটা উপরে সরে যায়। বাহিরে বৃষ্টি, ভিতরে প্রিয়তমার এই রূপ, অনেকটা মাতাল হয়ে যায় বাঁধন।
কিন্তু দিশেহারা হয়নি। তাইতো ঘুমন্ত প্রিয়াকে স্পর্শের জন্য হাত বাড়িয়েও হাতটা ফিরিয়ে নিয়ে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।

ততক্ষণে জেগে যায় মায়া। ধীর পায়ে বাঁধনের দিকে এগুতে থাকে। বাঁধন বুকটা মৃদু কাঁপতে শুরু করল। কেন যেন ভয় ভয় করছিল। বুঝতে পারছিল না কে এরকম হচ্ছিল।
বাঁধন হঠাৎ মায়ার স্পর্শ পেল। বাঁধন স্থির দাঁড়িয়ে ছিল। মায়া বাঁধনের দুই কাধ খামচে ধরল। বাঁধনকে নিজের কাছে টেনে নিল। বাঁধন তখন ভয়ে কাঁপছিল। ঘটনাটা বিশ্বাস হচ্ছিল না। কিন্তু ঘটছিল। মায়ার নরম ঠোঁট বাঁধনের ঠোঁট দুটিকে তার ভিতরে নিয়ে গেল। হাত দিয়ে মায়া বাঁধন চুলগুলো খামচে ধরল। তারপর সজোরে তার ঠোঁট বাঁধনের ঠোঁটের উপর চেপে ধরল।

চলবে……

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here