এক অভিমানীর গল্প পর্ব- ০৯

এক অভিমানীর গল্প
পর্ব- ০৯
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

রাত্রি ৯টার দিকে মায়ার রান্নাবান্না শেষ হলো। ননদকে ড্রাইনিং টেবিলে খাবার পরিবেশন করতে বলে কিছু খাবার নিয়ে মায়া চলে যায় ওর দাদী শাশুড়ির রুমে।
বাঁধনের দাদীমা তখন শুয়ে শুয়ে তসবিহ জপছিল, মায়াকে দরজার সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তসবিহ হাত থেকে বিছানার একপাশে রাখলেন।
“ক্যা বউ নাকি? ঐখানে ক্যান, ভিতরে আসো।”
মায়া মিষ্টি হাসি দিয়ে ভিতরে গেল। হাতের ঐ খাবারের প্লেটটা বিছানার পাশের টেবিলটাই রেখে দাদী শাশুড়ির অনেকটা কাছে চলে যায় মায়া। তারপর মুখের কাছে গিয়ে কিছুটা জোর গলায় বলে উঠে, দাদীমা! খাওয়ার আগে ঔষধ আছে?
বাঁধনের দাদীমা কান খাড়া করে বলে, কি কস? বুঝি না তো….!
মায়া কাশি থামিয়ে আবারো জোর গলায় বলে উঠে- বলছি, রাতে খাবার আগে কোনো ঔষধ আছে?
দাদীমা আবারো কান খাড়া করে বলে, কি???
মায়া কিছুক্ষণ কাশি দিয়ে তারপর আবারো বলে উঠে, ঔষধ, ঔষধ খাবেন এখন? হসপিটাল থেকে যে ঔষধ দিয়ে দিয়েছে এবার সেগুলো কখন খাবেন?
বাঁধনের দাদীমা এবার বলে উঠে, আসছি তো একসপ্তাহ হয়ে গেল।
মায়া খুক খুক করে কিছুক্ষণ কাশি দিয়ে তারপর বলে, ওহ! দাদীমা…. আমি হসপিটাল থেকে কখন আসছেন এটা জিজ্ঞেস করিনি। বলছি রাত্রে খাবার আগে ঔষধ খেতে হয় কি না?!!!
উত্তরে বাঁধনের দাদীমার জবাব, না! রাত্রে খায়নি। মায়া এবার কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়। কারণ, ইতিমধ্যে দাদীমা তসবিহ হাতে তসবিহ জপা শুরু করে।

নিশ্চুপ মায়া ননদ ফারহানাকে ডেকে আনার জন্য পিছনে ঘুরে তাকাতেই দেখে দরজার সামনে মুচকি হেসে বাঁধন দাঁড়িয়ে।
মায়া কিছু বলার আগেই রুমে আসে বাঁধন। বালিশের নিচ থেকে কি যেন বের করে দাদীর কানে গুজে দেয় সে। তারপর ধীর গলায় বলে, দাদীমা! রাতের ঔষধ কি খেয়েছ?
সহজ গলায় দাদীমার জবাব, খাওয়ার আগেরটা খায়ছি। তোর বাবা এসে খাইয়ে দিয়ে গেছে।
বাঁধন মায়ার দিকে তাকালো। মায়া ঢ্যাবঢ্যাব করে বাঁধনের দিকে তাকিয়ে।
দাদীমার সাথে কথা বলার ক্ষমতা সবাই রাখে না। আর কথা বলার জন্যও কৌশল জানা চাই। এমন চিল্লানো শুরু করছিলে, কিছুক্ষণের ভিতর তো পুরো বাড়ির লোক জড়ো হয়ে যেত। ভাগ্যিস, আমি এসে গেছি। কথাটা বলেই ফিক করে হেসে দেয় বাঁধন।
দাদীমা তোমার খাবার। খাবার খেয়ে কিছুক্ষণ দেরী করে বাকি ঔষধগুলোও খেয়ে নিও। কথাটা বলেই বাঁধন চলে গেল।
মায়া ধীর পায়ে দাদীমার পাশে গিয়ে বসল। তারপর ওনাকে খাইয়ে দিয়ে নিচে চলে গেল।

রাত্রি ১০টা কি সাড়ে ১০টা বাজে_
চুপচাপ বাঁধন উপরের দিকে তাকিয়ে শুয়ে আছে। লাইটটা অফ করে ফুলস্পিডে ফ্যানটা ছেড়ে বিছানায় হাতড়াতে হাতড়াতে বাঁধনের বিপরীত পাশে যায় মায়া।
দু’জনেই চুপচাপ। কারো মুখেই কোনো কথা নেই।
কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর কম্বল গায়ে শুয়ে পরে মায়া।
মিনিট খানেক পর বাঁধন ফোনের আলোয় দেখে এরই মধ্যে নাকমুখ ঢেকে শুয়ে পরেছে অভিমানী। এই গরমে কম্বল, কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে যায় বাঁধন।
ড্রিম লাইটের আলো জ্বেলে দিয়ে মায়ার পাশ ফিরে হাতে ভর দিয়ে শুয়ে আছে বাঁধন।
ঘন্টাখানেক পর কি মনে করে যেন কম্বলটা ক্ষাণিকটা ফাঁক করে চোখ দুটো বের করে মায়া। বাঁধন তখনো ঐভাবেই হাতে ভর দিয়ে শুয়ে। ঘাবড়ে যায় মায়া। সেই সাথে কিছুটা লজ্জা পেয়ে তাড়াতাড়ি মুখটা ভিতরে নিয়ে যায়।
বাঁধন পূর্বের ন্যায় তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে।
নিশ্চুপ মায়া কম্বলের ভিতর আরো কিছুক্ষণ শুয়ে থেকে আবারো কম্বলের ভিতর থেকে চোখ দুটো বের করে উঁকি দেয়। পূর্বেকার মতই বাঁধন তখনও হাতে ভর দিয়ে শুয়েছিল। ড্রিম লাইটের মৃদু আলোয় মায়া স্পষ্ট দেখতে পায় ওর বাঁধনের চোখের কোণে জমে থাকা জলগুলো কেমন চিকচিক করছে।
এতদিন ধরে করে আসা অন্যায় অবিচারের জন্য মায়া আজ সত্যিই অনুতপ্ত। মায়ার ভিতরটা কেমন অনুশোচনার আগুনে দগ্ধ হচ্ছে।
মায়া স্থির করেছে বাঁধনের সাথে এতদিন ধরে করা প্রতিটি অন্যায় অবিচারের জন্য আজ ক্ষমা চেয়ে নিবে। যে করেই হোক বাঁধনের থেকে ওর ক্ষমা পেতেই হবে। না হলে যে ওর ইহকালটাই ব্যর্থ হয়ে যাবে। কেননা, যেভাবে আর যে করেই হোক মায়া জানে ও বাঁধনের বিবাহিতা স্ত্রী।

মায়া বাঁধনের দিকে তাকায়। বাঁধন কেবলি তখন বালিশে মাথা রেখে শুয়েছে।
ধীর গলায় মায়া বলে উঠে-
—– স্যরি,
– ঘাড়টা ঘুরিয়ে চোখ মেলে তাকায় বাঁধন, কিসের স্যরি?
—— আমার ভুল হয়ে গেছে।
– কিসের ভুল?
——- আমি এতদিন আপনার সাথে যা করেছি সব ভুল। সত্যি আজ বুঝতে পারছি আপনিই ঠিক, আমি ভুল।
– এতদিন ধরে কি করছ তুমি? আর কোনটা ভুল? আর আমিই বা সঠিক এটা কিসের ভিত্তিতে বলছ?
——– এতকিছুর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ আমি করতে পারব না। আমি শুধু জানি আমি আপনার বিয়ে করা বববব…..(….)….???
– হ্যাঁ, বলো। তুমি আমার কী?
(মুচকি হেসে বাঁধন)
——- জানি না……(ঘোর লজ্জা পেয়ে)
– তাহলে কিসের ক্ষমা কিসের কি?
(কিছুটা গম্ভীর কন্ঠে)
——- বলছি…..😞
– জ্বি, বলো…..😊
——- আমি মানে বলতে চাচ্ছি আমাদের বিয়ে হয়েছে।
– তো, এখানে আমার কাছে ক্ষমা চাওয়ার কি আছে? আর তোমার অন্যায়’ই বা কোথায়?
——- বুঝতে কেন পারছেন না আমি আপনার বি ব ববববব……(…..)….???
– কি সব বি ববববব করছ? স্পষ্ট করে বলতে পারলে বলো, না হলে আমি ঘুমাচ্ছি।
——-……..
– ওকে, ফাইন। আমি ঘুমাইলাম।
—– আপনি আপনার বববববব ব…(…)…????
– বলো……
—— বববববব….. (…..)….???
– বলো, 😎😎
——- মজা করেন? হাসার কথা বলছিলাম আমি আপনাকে???
– কি জ্বালা! হাসলাম কোথায় আমি? তুমি না বললে আমি ক্ষমা করব কিসের ভিত্তিতে? কোন সে অপরাধে?
—– লাগবে না আপনার ক্ষমা….

কথাটা বলেই অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নাক মুখ কম্বলে ঢেকে শুয়ে পরে মায়া। রীতিমত রাগে ফুসছে সে। আজ আমার দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে আমায় নিয়ে হাসাহাসি?!!! হুহ! লাগবে না আমার ক্ষমা। প্রচন্ড অভিমানে কান্নায় নাক মুখ ফুলে লাল হয়ে গেছে মায়ার।
মায়ার খুব ঘুম পাচ্ছে। চোখটা কেমন না চাইতেই লেগে আসছে। ঘুমে ঢুলুঢুলু মায়া টের পায় ওর শরীর থেকে একটু একটু করে কম্বলটা সরে যাচ্ছে। প্রথমে পা, তারপর শরীর কম্বলবিহীন হয়ে যাচ্ছে। পুরো ব্যাপারকে মায়া ঘুমের ঘোর ভেবে উঁড়িয়ে দিয়েছে। হতে পারে ঘুমের ঘোরে এমন ভাবনা হচ্ছে এটা ভেবেই চুপ রইল মায়া। কিন্তু সত্যি’ই কি ঘুমের ঘোর থেকে এমন হচ্ছে?
মনে তো হয়, না। না হলে কম্বলের সাথে ফ্যানের স্পিডটা কমে যাবে কেন? আসলে কি হচ্ছেটা কি? এটা ভেবেই চোখ খুলে তাকায় মায়া।
চোখ খুলে তো হতবাক মায়া!
—– এ আপনি কি করছেন? কম্বলটা টেবিলের উপর রাখছেন কেন?
– এমনি, আমার ঘুমাতে ঝামেলা হচ্ছে, তাই!
—— দেখুন, এবার কিন্তু বেশী বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে।
– আমার ক্ষমা পেতে হলে এই বাড়াবাড়ি’টাকেই মেনে নিতে হবে।
——- মানে???
– মানে খুব সহজ। এই কম্বল ওখানেই থাকবে।
——– কিন্তু আমি যে ঘুমাতে পারি না কম্বল ছাড়া।
– সেই জন্যই তো ফ্যানের স্পিডটা কমিয়ে দিয়েছি।
—— তারপরও আমার পাতলা কাথা হলেও লাগে।
– আছে তো…..
—— কোথায়???
– এই যে….
—— এটা তো আপনার গায়ে দেয়া। আমার গায়ে দেয়ার কাথা এখন কোথায় পাব?
– এত কথা না বলে আসো না নিচে।
—— কিহ?!!!
– আমার না কাথার…..🙊🙊🙊
——- এটাও কি ক্ষমার পূর্বশর্ত?
– বলতে গেলে বলতে পারো সেটাই।
——– আচ্ছা…😞
– কি হলো? আচ্ছা বলে থেমে গেলে কেন?
—— আপনি লুঙ্গি পরেছেন???
– হ্যাঁ, পরেছি। কেন বলো তো?
—– এ্যাঁ, না…………
আমায় নতুন করে মাফ করেন। আমি পারব না কাথার নিচে যেতে…….
– হায় আল্লাহ! এখানে আমার লুঙ্গির কি দোষ???😜😜😜
– 😰😰😰😰

চলবে……..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here