এক অভিমানীর গল্প পর্ব- ০৬

এক অভিমানীর গল্প
পর্ব- ০৬
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

বাঁধনের প্রশ্নের কোনো জবাব না দিয়ে চুপচাপ বিপরীতমুখী হয়ে শুয়ে পরলো মায়া। ” কি হলো? আমার প্রশ্নের কোথায় কোথায়?” বাঁধন মায়াকে ধাক্কা দিয়ে প্রশ্নটা করে।
মায়া উঠে বসে। বাঁধনের দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে, আপনি আমার গায়ে হাত দিলেন কেন?
বাঁধন বিস্মিত নয়নে মায়ার দিকে তাকালো। তারপর কি যেন বলতে গিয়েও থেমে যায়। এদিকে মায়া থেমে নেই। ওর মুখ চলছে তো চলছেই।
” আপনাকে আমি যায় বলতাম না কেন মনে মনে আমি আপনাকে ভালোই জানতাম। কিন্তু আপনি আজ রেকর্ড ভেঙে দিলেন। প্রমাণ করে দিলেন আপনি আসলেই আমার……(…….)…….???”
পুরো কথা বলতে পারেনি মায়া। তার আগেই খাট থেকে নেমে বাহিরে চলে যায় বাঁধন। যাওয়ার আগে বলে যায়-
” দরজা দিয়ে শুয়ে পরো। কতক্ষণ পর ফজর আজান দিবে। আমি নামাজ পড়ে মাকে নিয়ে বাসায় চলে যাব।”
চোখ বড় বড় করে প্রশ্ন করে মায়া, দরজা লাগাবো মানে? আপনি রুমে ঘুমাবেন না?
শান্ত গলায় বাঁধনের জবাব, বলাতো যায় না কখন আপনার উপর হাত উঠিয়ে দেই ঘুমের ঘোরে। ধূর! ঘুমের ঘোর কেন বলছি? বলাতো যায় না কখন আপনার উপর ঝাপিয়ে পরি, লুচু বলে কথা। তাই, তাই আমি নিজেকে সর্বোপরি নিজের ভিতরের পুরুষসত্তাকে কন্ট্রোল করার জন্য বাহিরে চলে যাচ্ছি।
মায়াকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বাহিরে বারান্দায় চলে যায় বাঁধন। এই মুহূর্তে বাঁধন বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। নাহ! নিজের ভেতরের পুরুষসত্তাকে কন্ট্রোলের জন্য নয়, নিজের আবেগটাকে কন্ট্রোল করার জন্য বাঁধনের এখানে দাঁড়িয়ে থাকা। চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে বাঁধন, আর চোখ থেকে জল বৃষ্টির ফোঁটার মতই নিচে ঝরে পরছে।
এদিকে বাঁধন রুম থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর মায়া কিন্তু ঘুমিয়ে যায়নি। একটু পর পর উঁকি দিয়ে বাঁধনকে দেখছিল। বার বার বলতে গিয়েও বলতে পারল না, স্যরি! রুমে আসুন এখন।

সকালে ব্রেকফাস্ট করে বাঁধন যখন ওর মায়ের কাছে যাবে ভাবছে, তখনি মায়ার নানু বাড়ি থেকে খবর আসে মায়ার নানু খুব অসুস্থ। খবরটা শুনার পর বাঁধন কিংবা বাঁধনের মা এভাবে বাসায় চলে যেতে পারল না। বাঁধনের বাবা ওর মাকে নিতে আসলে বাঁধনের মা মায়ার নানুর অসুস্থতার কথা জানায়।
আর তাই সেদিন দুপুরের খাবার খেয়ে সবাই মায়ার নানুর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। বিকেল ৪টা কি সাড়ে ৪টার দিকে ওরা সবাই ও বাড়িতে গিয়ে উঠে।
বাঁধনের বাবা মা ভেবেছিল রাত পোহালেই ওরা বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়ে দিবে, কিন্তু এখানে এসে তার উল্টোটা হলো। অসুস্থতার খবর শুনে সবাই এখানে আসলেও জানা যায়, শুক্রবার মানে পরদিন’ই বাঁধনের মামা শ্বশুরের বিয়ে। ওরা কিছুতেই তাই ওদেরকে ছাড়তে রাজি নয়।
বাধ্য বাঁধনের বাবা মা বিয়েটা খেয়ে যাবার প্রতিশ্রুতি দেয়।

ঘড়ির কাটা বলছে সময় এখন রাত্রি ৮বেজে ৫৯মিনিট। অর্থাৎ আরো একটা দিন অতিবাহিত হয়ে গেল। এই পুরো দিনের ভিতর বাঁধন একটাবারের জন্য মায়ার কাছে যায়নি। মায়াকে খাওয়ানো, গোসল করার ব্যপারে একটুও জোর করেনি। কিংবা রোজকার ঐ মায়ার নাকে, গালে, কপালে ভালোবাসার কোনো উষ্ণ পরশও এঁকে দেয়নি। সর্বোপরি বাঁধন মায়ার থেকে দুরে দুরেই থেকেছে।
অন্যদিকে মায়া?!
বাঁধনের এই নিরবতা মেনে নিতে পারেনি। প্রচন্ড অভিমানে রুমে সবার আনন্দ উৎসব থেকে বেরিয়ে বাইরে চেয়ার পেতে চুপটি করে আকাশের দিকে তাকিয়ে বসে আছে।
ব্যাপারটা মায়ার কাজিন তানিয়া লক্ষ করল। তানিয়া সম্পূর্ণ না বুঝলেও এটুকু বুঝতে পারলো ওদের মধ্যে কিছু একটা চলছে। আর তাই ব্যাপারটা ক্লিয়ার করার জন্য তানিয়া রুমভর্তি সকল ছেলে মেয়েদের লক্ষ করে বলে, রুমে তো অনেক হৈহুল্লুর করলা। এবার না হয় বাহিরে চলো। উঠোনে মাদুর পেতে গানের কলি খেলব। সবাই একসাথে আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল।
তানিয়া খুঁজে খুঁজে ২টা মাদুর আর কিছু চেয়ার আনল। তারপর সেটা উঠোনে পেতে সবাইকে বসতে দিল। ওদের অবস্থানটা মায়ার ঠিক পাশেই। চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে সবাই আনন্দ করছে, বাঁধন মায়াকে শুনিয়ে শুনিয়ে জোর গলায় ওদের সাথে হাসি আনন্দ আর গানের সুরে মেতে উঠছে। অভিমানী মায়া খুব বেশীক্ষণ কানে আঙুল দিয়ে বসে থাকতে পারেনি। কিছুক্ষণ পর দৌঁড়ে রুমে চলে যায় সে।
একাধারে রোগী এবং বিয়ে বাড়ি। কে যে কোথায় ঘুমিয়েছে তার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। মায়া হাজার খুঁজ করেও জানতে পারেনি বাঁধন কোন রুমে কার সাথে ঘুমিয়েছে! কিন্তু বাঁধন?! বাঁধন ঠিক জেনে নিয়েছে মায়ার ব্যাপারে। একে একে সবাই নির্লজ্জের মত কল দেওয়ার পর অবশেষে জানা গেছে, মায়া ওর কবিতা আন্টির সাথে ওনার রুমে ঘুমিয়েছে। মায়া অসুস্থ, ওর জ্বর+কাশি, পা’টাও ভাঙা, ও ঘুমানোর সময় যাতে ওর পায়ের ওপর কেউ পা রাখে, এমন হাজার সব কথা শুনিয়ে তবেই ফোন রাখে বাঁধন। আহ! কি ভালোবাসার টান?! কথাটা বলেই লাইটটা অফ করে কবিতা। কবিতা মায়ার আন্টি হলেও বয়সে মায়ার থেকে ৪বছরের জুনিয়র সে। মাত্র স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজে পা রেখেছে কবিতা। কিন্তু এই অল্প বয়সেই ডজনখানি প্রেমের অভিজ্ঞতা আছে ওর। বাঁধন এবং মায়া দু’জনই কবিতাকে বিচারক মানে। সবসময় বিভিন্নসব বিচার নিয়েই কবিতাকে কল করত ওরা। কবিতা মাঝে মাঝে তো এদের বিচারের জ্বালায় ফোন অফ করে রাখত।

পরদিন সকাল সকাল বাঁধন ঘুম থেকে উঠে।
ফ্রেশ হয়ে ব্রেকফাস্ট করার এক পর্যায়ে বাঁধন ওর শ্বশুর মারফত জানতে পারে গতকাল সকাল থেকে কিচ্ছু খায়নি মায়া।
বাঁধনের মাথা নষ্টর উপক্রম। কাল থেকে কিচ্ছু খাচ্ছে না, অথচ ওরা আমাকে মাত্র জানায়? মানলাম ওর আগে পরে না খেয়ে থাকার অভ্যাস আছে, তাই বলে এই অসুস্থ শরীরেও???
সবার সামনে ভদ্রতার খাতিরে ব্রেকফাস্ট পুরোটা করে তবেই উঠল বাঁধন। ব্রেকফাস্ট টেবিল থেকে উঠে একমুহূর্তও দেরী করেনি বাঁধন, সোজা মায়ার কাছে চলে যায়। মায়া এখনো হাত পা ছেড়ে দিয়ে ঘুমুচ্ছে। বাঁধন কাছে গিয়ে মাথায় একটু হাত বুলিয়ে ধীর গলায় ডাক দেয়, মায়া!
মায়া তাড়াহুড়ো করে বিছানায় উঠে বসে এলোমেলো চুল বাঁধতে লাগে। বাঁধন ঘড়ির দিকে একনজর তাকিয়ে মায়ার দিকে তাকালো। ” ঘড়িতে সময় এখন ৮টা বেজে ২২মিনিট।” এতক্ষণ কেউ ঘুমায়?
মায়া কোনো কথা না বলে কাথা বালিশ ভাঁজ করে সব একপাশে রাখল। তারপর কি মনে করে যেন চুপটি করে ফোনটা ওপেন করল, তারপর ডাটা অন করে জানালার পাশে হেলান দিয়ে রাখল।
বাঁধন চোখ বড় বড় করে মায়ার দিকে তাকালো। ” এই যে মহারানী ভিক্টোরিয়া!আপনাকে আমি ফেসবুকে ঢুকার জন্য ডেকে উঠাইনি, সাড়ে আটটা বাজে। চলুন, খাবেন!”
মায়া ভ্রু কিঞ্চিৎ বাঁকা করে বলে, আমি ফেসবুক চালানোর জন্য ঢুকিনি। বাঁশেরকেল্লা নামক পেইজ থেকে নিউজ শুনার জন্য ঢুকেছি। দেশের এখন কি অবস্থা সেটা জানার জন্য ঢুকেছি।
বাঁধন এবার কিছুটা জোর গলায় বলে, শুনোন! দেশ কিংবা আন্দোলন কোনোটাই আপনার জন্য থেমে নেই। আর শুনোন, যেসকল ছেলে মেয়েরা আন্দোলন করছে তারাও কিন্তু খাচ্ছে। খাওয়া বাদ দেই নি। তাই চলুন, খাবেন!
একে তো গত একটা দিনে একটা বারের জন্যও ওর কাছে আসেনি, আজ এভাবে আপনি আপনি কথা বলা, মেনে নিতে পারেনি মায়া।
রাগে উচ্চস্বরে বলে উঠে মায়া, দেখুন! ভদ্রতা দেখাতে আসবেন না এখানে। ভদ্রতা অন্য জায়গায় গিয়ে দেখান। আর লেকচার শুনাবেন না আমাকে। আমি আপনার মেডিকেলের স্টুডেন্ট না যে আপনি লেকচার দিবেন, আর আমি গভীর মনোযোগে সেগুলো শুনে প্র্যাক্টিকেলি করে দেখাবো আপনাকে। যান, এ রুম থেকে বেরিয়ে যান।
বাঁধন হাসিমুখে বলে, যাবো তো! তবে তোমাকে সাথে নিয়ে। এই বলে বাঁধন মায়ার একটা হাত ধরে।
মায়া হেঁচকা টানে ওর হাতটা ছাড়িয়ে নেয়। আমি খাব না, খাব না, খাব না। এখন আমি খা বো না। আমার মায়ের কসম এখন আমি মরে গেলেও খাবো না।
বাঁধন অবাক দৃষ্টিতে মায়ার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখের কোণায় জল চিক চিক করছে কিন্তু সেটাকে বেরুতে দিচ্ছে না।
কিছুক্ষণ পলকহীনভাবে তাকিয়ে থাকার পর নিঃশব্দে রুম ত্যাগ করে বাঁধন।

সকাল ১০টা_
মায়া চুপচাপ বসে খাচ্ছে। হঠাৎ’ই রুমে প্রবেশ করে মায়ার ছোট খালা আঁখি। ” তুই এখানে বসে আছিস? তোর জামাই এই পাগলামী কেন করছে। কত করে বললাম, চলে কেন যাচ্ছে? মানুষজনকে এখন কি বলব?
মায়া ভাতের প্লেটে হাত ধূয়ে রুম থেকে বের হয়ে দৌড় দেয়। বাঁধন ততক্ষণে যাওয়ার জন্য সিএনজি আনতে মোড়ে চলে গেছে। মায়া পিছন পিছন ডাকছে। “দাঁড়ান, দাঁড়ান! বাঁধন একমুহূর্ত দাঁড়ায়নি। মায়ার পৌঁছার আগেই বাঁধন সিএনজিতে উঠে পরে। চলন্ত সিএনজি থেকে বাঁধন মায়াকে শুধু এটুকু বলে, আমার তাড়া আছে।
” তাড়া না ছাই!”
রাস্তা থেকে বাসায় ফেরার পর একেকজনের একেক কথা, সহ্য করতে পারছিল না মায়া। যার দরুন বিয়ে না খেয়েই সকাল ১১টার দিকে রাগে নানু বাড়ি থেকে বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়ে দেয়।
শূন্য বাসা মায়ার ভেতরের শূন্যতাকে বহুগুনে বাড়িয়ে দিয়েছে। বিছানায় শুয়ে কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় মায়া। তখনি ওর ফোনটা বেজে উঠে। ফোন দিয়েছে বাঁধনের বন্ধু হৃদয়। হৃদয়ের সাথে মায়ার কথা হতো আগে বাঁধনের সাথে রিলেশন চলাকালীন সময়ে। মায়া ওকে ভাইয়া বলে সম্ভোধন করত, আর হৃদয়ও ওকে বোন বলে ডাকত।
আজ এতদিন পর হৃদয়ের ফোন পেয়ে অনেকটা অবাক হলো মায়া।

কলটা রিসিভ করে কুশল বিনিময় করতেই হৃদয়ের প্রশ্ন-
” খুব বেশী হয়ে গেল না মায়া?”
মায়া অবাক বিস্ময়ে প্রশ্ন করে,
ভাইয়া আপনি জানেন??? হৃদয় গম্ভীর কন্ঠে বলে, হ্যাঁ আমি জানি। আর এটাও জানি তুই রাগে এরকমটি করেছিস।
— ………
তোর কি মনে হয় না তুই প্রয়োজনের চেয়ে একটু বেশীই কষ্ট দিয়ে ফেলেছিস ওকে?
মায়া আমি জানি তুই ওকে ভুল বুঝিসনি, সেদিনের ব্যাবহারে রেগে গিয়ে ওকে শাস্তিটা দিয়েছিস। আমি কি ঠিক বলেছি???
নিচু গলায় মায়ার জবাব- জি, ভাইয়া! আসলে সেদিন বাসায় আসার পর মনে জেদ জন্ম নেয়। ওকে শায়েস্তা না করা অবধি আমি শান্তি পাবো না, সেটা আমি বুঝতে পারছিলাম। তাই এমন করলাম।
— শায়েস্তা করার আর রাস্তা খুঁজে পেলি না? আর তোর কি একটুও মনে হয়নি এটা ঠিক হচ্ছে না?!
মনে হয়ছে ভাইয়া, আর যখন মনে হয়ছে আমি ভুল করছি, তখন ও চলে গেল।
বড়দের শত বারণ অমান্য করে ও চলে গেল।
— এবার বুঝ তাহলে কতটা কষ্ট পেয়েছে!
স্যরি, ভাইয়া! আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি সত্যিই অনুতপ্ত আমার কৃতকর্মের জন্য।
— ……….
ভাইয়া আমার সত্যিই খুব খারাপ লাগছে।

খারাপ লাগাটা তো কেবল শুরু, কথাটা বলেই টুট টুট করে কলটা কেটে দেয় হৃদয়।
মায়া বালিশে মুখ গুঁজে গুমড়ে গুমড়ে কাঁদছে।

সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ মায়া বাঁধনকে কল দেয়। মায়া জানে যত জ্যামই হোক, এতক্ষণে নিশ্চয় বাঁধন বাসায় পৌঁছেছে। কিন্তু একি?!!! ফোন যে বন্ধ……..

চলবে…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here