এক অভিমানীর গল্প পর্ব- ০৫

এক অভিমানীর গল্প
পর্ব- ০৫
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

সারারাত কান্না করে সকালের দিকে চোখ দুটো এক করে বাঁধন।
এদিকে দুপুর হয়ে গেছে বাঁধনকে হসপিটালে খুঁজতে গিয়ে না পেয়ে বাসায় চলে আসে ওর বন্ধু হৃদয়। দরজা খুলা পাওয়াতে রুমের ভিতরে ঢুকতে বেগ পেতে হয়নি হৃদয়কে। কপালে হাত দিয়ে চোখ বোজে শুয়ে ছিল বাঁধন।
” শরীর খারাপ?”
চোখ খুলে বন্ধু হৃদয়ের দিকে একপলক তাকিয়ে চোখটা ফিরিয়ে নেয় বাঁধন। বিছানা থেকে উঠে খাটের সাথে হেলান দিয়ে জবাব দেয়, নাহ!
” তাহলে অবেলায় শুয়ে আছিস যে?”

এমনি…..
কিছু বলবি???
ব্লাডডোনার খুঁজতে হসপিটালে গিয়েছিলাম। ভাবলাম তোর সাথে দেখা করে আসি। পাইনি তোকে। তাই দেখতে আসা এই আর কি!
” ওহ……”
তোর কি কোনো কারনে মন খারাপ???
বন্ধু হৃদয়ের প্রশ্নে মুখে শুকনো হাসির রেখা টেনে বাঁধনের জবাব, কই নাতো!

হাসিখুশি ও চঞ্চল মনের মানুষের হঠাৎ এভাবে গম্ভীর হয়ে যাওয়া, চোখ দুটো ফুলে তালগাছের মত হওয়া, এসব কিছুর মানে আমি কিছুটা হলেও বুঝি বাঁধন! যাক, তুই যদি আমায় না বলতে চাস জোর করব না। আচ্ছা, আসিরে….
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হৃদয় চলে যাচ্ছিলো,
পিছন থেকে হাতটা ধরে বাঁধন। হৃদয় বিছানার এককোণে বসে পরে। বাঁধন শুয়া থেকে চুপটি করে উঠে বসে।
” চা খাবি?”
——–সেতো খাওয়ায়’ই যায়…….
” আচ্ছা, তুই বস! আমি আসছি”

বন্ধু হৃদয়কে বসিয়ে রেখে রুমের বাহিরে চলে যায় বাঁধন। মিনিট পাঁচেক পর হাতে দু’কাপ চা নিয়ে হাজির হয় বাঁধন।
” চা খা, আমারটাও এখানে রাখলাম। আমি একমিনিট, জাস্ট ১মিনিট পর আসছি।”
হৃদয়ের দিকে চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে ফোন হাতে সোজা পাশের রুমের বারান্দায় চলে যায় বাঁধন। কল করে ওর মায়াকে। রাত্রের ন্যায় মায়া এখনো উল্টাপাল্টা কথা বলে বাঁধনের সাথে। ব্যর্থ বাঁধন কলটা কেটে জল ছলছল চোখে পিছনে ঘুরে তাকাতেই ঘাবড়ে যায়। হৃদয় জিজ্ঞাসসো দৃষ্টিতে বাঁধনের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে, এটা দেখে তাড়াতাড়ি বাঁধন ওর চোখের জল মুছে নেয়।
” খুব তো চোখের জল আড়াল করে ফেললি! আমি যে তোর ভিতরের কান্না’টাও শুনে নিয়েছি সেটার কি হবে?”
” এখানে কেন তুই? আয়! রুমে আয়! চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে…..”
কথাটা বলেই বাঁধন ওর রুমের দিকে পা বাড়ালো। বাঁধনের সাথে সাথে হৃদয়ও গেল।
” কি হলো?! বস!!!”
হৃদয় বাঁধনের দিকে তাকিয়ে চুপসে দাঁড়িয়ে আছে। বাঁধন সেটা দেখে আবারো বলল, বুঝলাম না, এভাবে স্টেচুর মত দাঁড়িয়ে কেন আছিস? কি প্রবলেম?
হৃদয় গম্ভীর কন্ঠে বলে, তুই আমায় এভাবে পর করে দিলি? এত বড় একটা ঘটনা তুই আমার থেকে গোপন রাখতে পারলি?
বাঁধন একটানে ওর পাশে হৃদয়কে বসায়।
” আসলে ও যে আমায় এত বড় ভুল বুঝে আছে, সেটা আমি কাল রাত্রেই জানতে পারলাম। আমি কি করব কিচ্ছু বুঝতে পারছি না দোস্ত। আমার আসলে কিচ্ছু ভালো লাগছে না। আর তুই তো জানিস আমাদের রিলেশনের ব্যাপারে। তোকে নতুন করে আর কি বলব? এখন বল আমি কি করব? আমার মাথায় কিচ্ছু কাজ করছে নারে….”
হৃদয় বাঁধনের পিঠে ভরসার হাত রেখে বলে, আরে ব্যাটা! একটু ধৈর্য্য ধর। এভাবে ভেঙে পরলে তো হবে না। তোদের মধ্যে একটা Misunderstanding চলছে, সেটা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে মায়াকে ভালো ভাবে বুঝাতে হবে। না হলে জানিস তো, সম্পর্কে Understanding না থাকলে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়!
হৃদয়ের কথায় কান্নাভেঁজা কন্ঠে বাঁধনের জবাব, তাহলে আমি এখন কি করব? কিভাবে ওর ভুলটা ভাঙাবো?
প্রতিউত্তরে হৃদয়ের জবাব, তোদের এখন সামনাসামনি কথা বলা দরকার। তুই এখানকার কাজ শেষ করে যত শিগ্রয় পারিস তোর শ্বশুর বাড়িতে যা। মায়ার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বল। ব্যাপারটা বুঝানোর চেষ্টা কর। আমার মনে হয় এতে ফলাফল কিছুটা হলেও ভালো হবে।
বাঁধন যেন হৃদয়ের কথায় কিছুটা স্বস্তি পেল। হৃদয়ের দিকে কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, আগামী বোধ বার দিন আমি ফ্রি থাকব। ঐদিনই তাহলে রওয়ানা দিব।
হৃদয় চলে গেল। যাওয়ার আগে বলে গেল, কি হয়, না হয় আমায় কিন্তু জানাবি!

কথামতো বুধবার দিন বাঁধন ওর শ্বশুরালয়ে গিয়ে হাজির হলো। বাঁধনকে দেখে ওর মা হাসোজ্জ্বল মুখে বলে, এসেছিস! আমি তো তোকেই ফোন করতাম আজকে। আসলে কালকে চলে যাব। এদিকে মেয়েটাও অসুস্থ। তাই ভাবছিলাম তোকে ফোন করে বলে দিব। ভালোই হলো। কালকে তোর বাবা আসবে আমাকে নিতে। ওখানে গিয়ে আমার আর টেনশন করতে হবে না। এখন থেকে যে কয়দিন পরীক্ষা হবে, তুই’ই নিয়ে আসা যাওয়া করবি।
বাঁধনের হাসি মুখটা নিমিষেই মলিন হয়ে গেল। অবাক বিস্ময়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে বাঁধন, অসুস্থ্য?
বাঁধনের মায়ের আর কষ্ট করে প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়নি। উত্তর দেওয়ার আগেই পাশের রুম থেকে খুঁকখুঁক করে কাশির শব্দ আসে। বাঁধন কোনো কথা না বলে চটজলদি ঐ রুমে প্রবেশ করে।
এই মুহূর্তে বাঁধনের চোখ বিছানায়, যেখানে নিথর হয়ে ওর মায়া পরে আছে। কিছুক্ষণ পর পর কাশি আর শীতে কাঁপছে মায়া। বাঁধনের চোখ একবার মায়ার মুখের দিকে, আবার পায়ের দিকে। কি হয়েছে এটা ঠিক বুঝতে পারছে না বাঁধন। একদিকে মায়ার কাশি, অন্যদিকে পায়ে ব্যান্ডেজ। মায়ার সত্যিকার অর্থে কি হয়েছে সেটাই বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে বাঁধনের।
ধীর গলায় বাঁধন মায়াকে ডাকতে ডাকতে বিছানায় উঠে। মায়া… সন্ধ্যা হয়েছে, মাগরিবের আজান দিচ্ছে মসজিদে, উঠে বসো। কথাটা বলতে বলতেই মায়ার গালে হাত ছুঁয়ায় বাঁধন। শিউরে উঠে মায়া।
উহ, করে চোখ মেলতেই বাঁধনকে খুব কাছে দেখতে পায়। বিছানা থেকে উঠে বসে চাদর দিয়ে শরীরটা ডেকে নেয় মায়া। অস্ফুট স্বরে বলে, আ আ আপনি???
বাঁধন মায়ার বোন হিয়াকে ডাকে।
ডাক শুনে দৌঁড়ে আসে হিয়া। ” জি, ভাইয়া! কিছু বলবেন???
উৎকন্ঠার সাথে বাঁধন ওর শ্যালিকাকে প্রশ্ন করে, এত জ্বর ওর শরীরে! কখন এলো?
” কাল সকাল থেকে জ্বর। আজকে আপুর পরীক্ষা ছিল। এই জ্বরের কারণে আজকে তো আপু বিছানা থেকেই দাঁড়াতে পারছিল না। তবুও বহুকষ্টে পরীক্ষা হলে নিয়ে গেলাম আপুকে। কিন্তু নিয়ে গেলে কি হবে? আপু পরীক্ষা দিতে পারেনি। শুনেছি ওখানে গিয়ে নাকি বেঞ্চে মাথা রেখে শুয়ে পরে। তারপর ধরাধরি করে ওকে সেমিনারে নেওয়া হয়। সেখান থেকে একটু রেস্ট নেওয়ার পর, আপুকে নিয়ে বাসায় চলে আসলাম।”
“আর পা? পা কিভাবে ভাঙলো?”
বাঁধনের প্রশ্নের জবাবে হিয়া বলতে শুরু করে, ঢাকা থেকে আসার পরদিন দুপুরে আপু গোসল করতে গিয়েছিল। ওখানে অসাবধানতাবশত সাবানে পা পিছলে পরে গিয়ে এ অবস্থা। তবে ডাক্তার বলেছে পা ভাঙেনি, মচকে গেছে।
বাঁধন এবার কিছুটা ধমকের স্বরে বলে, এতকিছু হয়ে গেল তোমরা আমায় জানাও নি কেন???
হিয়া মাথা নিচু করে বলে, আসলে ভাইয়া আন্টি মানা করছিল, আপনি নাকি টেনশন করবেন!
বাঁধন দাঁতে দাঁত চেপে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, আন্টি কতকিছু বলবে……

রাত্রি ১১টা বেজে ৩৫মিনিট_
একই বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে আছে দু’জন। মাঝখানে দেয়াল হিসেবে বিরাট বড় একটা কোলবালিশ রাখা। নিশ্চুপ মায়া একদৃষ্টিতে উপরের দিকে তাকিয়ে আছে। আর বাঁধন সেই কখন থেকে পলকহীনভাবে তাকিয়ে আছে মায়ার দিকে।
এভাবে কেটে যায় আরো কিছুটা সময়।
রাত্রি তখন আনুমানিক ১টা কি দেড়টা। বাঁধনের চোখটা লেগে এসেছিল প্রায়। হুট করে ঘুমটা ভেঙে যায়। প্রাণের মায়াকে দেখার জন্য পাশ ফিরে কিছুটা অবাক হয় বাঁধন। মাঝখানে দেয়াল হিসেবে রাখা বালিশটা আর নেই। তার পরিবর্তে মায়া সেখানে শুয়ে আছে। বলতে গেলে বাঁধনের অনেকটা কাছেই শুয়ে আছে মায়া।
” কি সুন্দর! মায়াবী’ই না লাগছে দেখতে।”
মাথার উপর ধীর গতিতে ফ্যান ঘুরছিল। সেই বাতাসে মায়ার চুলগুলো কেমন উড়ছিল। ড্রিমলাইটের মৃদু আলোয় বাঁধন দেখতে পায় অবাধ্য চুলগুলো কেমন বার বার মায়ার চোখে মুখে এসে ছিটকে পরছে। বাঁধন সেই চুলগুলো মায়ার কানের কাছে গুজে দেওয়ার জন্য হাত এগিয়ে নিতেই চোখ মেলে তাকায় মায়া।
মায়ার এভাবে দেখে ফেলাতে ইতস্তত বাঁধন ওর হাতটা সরিয়ে নেয়।

দু’জনেই চুপচাপ শুয়ে। কারো মুখেই যেন কোনো কথা নেই। অথচ দু’জনার বুকের ভিতরই দুরমুশ পেটাচ্ছে অনেক না বলা কথারা…..
হঠাৎ’ই মায়া কি মনে করে যেন বাঁধনের বুকে মাথা রাখে। স্তব্ধ দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ মায়ার দিকে তাকিয়ে থাকলেও মায়া শক্ত করে জাপটে ধরাতে ঘোর কাটে বাঁধনের।
বাঁধন মনে মনে ভাবে, এই সুযোগ! ঐদিনের ব্যবহারের জন্য স্যরি বলা, আর ওর ভুলটা ভাঙানোর। মুখ খুলল বাঁধন,
” আমি স্যরি মায়া। আমি আসলে জানতাম না তুমি……(……)….???
ধূর! স্যরি কেন বলছেন? আপনি তো আপনার বউয়ের দিকেই হাত বাড়িয়েছেন।
এতে এতো ইতস্তত করার কি আছে? নিজের বউকেই তো আদর করতে চাচ্ছিলেন। তার জন্য এতো ভয় পাওয়ার কি আছে???
বাঁধন মায়াকে স্যরি বলতে চাচ্ছিল ঐ রাত্রের জন্য, আর মায়া ভাবছে বাঁধন ওর দিকে হাত বাড়াচ্ছিল এটা দেখে ফেলাতেই হয়তো স্যরি বলছে। আর তাইতো পূর্বের ন্যায় ওয়াজ করা শুরু করে দেয়।
বাঁধন মায়াকে থামানোর জন্য মুখ খুলে। মায়া আমি স্যরি বলছি….(…..)…..????

মায়া বাঁধনের ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে বাঁধনকে থামিয়ে দেয়। তারপর চুপিসারে বলে,
টেনশনের কিছু নেই। রাত এখনো শেষ হয়নি। আপনি চাইলে এখনি শুরু করতে…..(……)……???

পুরো কথা বলতে পারেনি মায়া। তার আগেই মায়ার মাথাটা বাঁধন ওর বুক থেকে সরিয়ে বিছানায় উঠে বসে।
একে তো জ্বর, কাশি, তারউপর প্রচন্ড মাথা ব্যথা। বিছানা থেকে উঠতে পারছিল না মায়া, তবুও বহুকষ্টে উঠে বসল। একটু জোরে কথা বললেই কাশি উঠে যাবে ওর, আর কাশি উঠলে বুকে প্রচন্ড ব্যথা করে ওর, তাই অত্যন্ত ধীর গলায় বলল,
ঘড়িতে সময় এখন ২টা কি আড়াইটা। ঘড়ির কাটা বলছে সময় এখনো চলে যায়নি। আপনি চাইলে এখনো হতে পারে……(…….)……???

কথাটা বলতে দেরী, ঠাস করে বাঁধন ওর হাতটা দেয়ালে ছুঁড়ে মারতে দেরী করে নি।
ভড়কে যায় মায়া। কাঁপা গলায় প্রশ্ন করে,
” কি করছেন এসব? ব্যথা পাবেন তো।”

বাঁধন মায়ার চোখের দিকে তাকালো।
” তুমি শুধু আমার বাইরের দিকটাই দেখলে। ভিতরে যে কি বয়ে যাচ্ছে সেটা একটা বারের জন্যও বুঝলে না…..”

চলবে……

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here