এক অভিমানীর গল্প পর্ব- ০৩

এক অভিমানীর গল্প
পর্ব- ০৩
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

কামড়টা এতটাই জোরে দিয়েছে যে দাঁতের দাঁগ হয়ে গেছে বাঁধনের হাতে। কিন্তু সেদিকে পরোয়া না করে ভাতের প্লেট নিয়ে বাঁধন মায়ার পিছুপিছু রুমের দিকে ছুটলো। রুমে গিয়ে কোনো কথা না বলে বাঁধন মায়ার পাশেই বসল। তারপর নিঃশব্দে তরকারী দিয়ে কিছু ভাত মেখে একমুঠো ভাত বাঁধন মায়ার দিকে এগিয়ে দেয়। মায়া বসা থেকে উঠে পরতে চাইলে বাঁধন আবারো মায়ার হাতটা ধরে বসিয়ে মুখের দিকে একমুঠো ভাত এগিয়ে নিয়ে যায়।
মায়া মুখটা ঘোর কালো অন্ধকারের ন্যায় করে জবাব দেয়, খাব না আমি! মরে গেলেও এই মুহূর্তে আমি ভাত খাব না। আর একবার যেহেতু আমি খাব না বলছি, সেহেতু আমি খাব না।
মায়ার এভাবে ‘না’ বলা সত্ত্বেও বাঁধন অশ্রুভেঁজা চোখে আরো ৪,৫বার খাবে কি না জিজ্ঞেস করছে। প্রতিবারই মায়ার কাছ থেকে না বোধক জবাব আসে। রাগে দুঃখে বাঁধন কিছু মুখে না দিয়েই খাবার প্লেটে পানি ঢেলে দিয়ে হসপিটালের উদ্দেশ্যে বের হয়ে যায়। সন্ধ্যার বেশকিছু ক্ষণ আগে বাসায় ফিরে বাঁধন। ক্লান্ত বাঁধন প্রতিদিনের মত সেদিন চেম্বার থেকে ফিরে মায়ার নাকে, মুখে, কপালে ভালোবাসার উষ্ণ পরশ এঁকে দেয়নি। কানের কাছে গিয়ে বলেনি, ভালোবাসি লক্ষ্মী! রুমে প্রবেশ টেবিলে ব্যাগটা রেখে মায়াকে দেখেও না দেখার ভান করে মাথা নিচু করে ওয়াশরুমে চলে যায় বাঁধন। ওয়াশরুম থেকে ফিরে আসলে চুপটি করে সোফায় গা এলিয়ে দেয় সে।
সন্ধ্যা হয়ে গেছে। দুরের মসজিদ থেকে আজানের স্বর প্রতিধ্বণিত হচ্ছে। বাঁধন শুয়া থেকে উঠে ওজু করে টুপিটা নিয়ে মাথা নিচু করে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
পুরো ব্যাপারটাই খেয়াল করেছে মায়া। বাঁধন বাইরে চলে গেলে সেও চটজলদি নামাজটা আদায় করে রান্নার কাজে লেগে যায়। সেই যে মাগরিবের আজানের সময় বাসা থেকে বের হয়েছিল বাঁধন, আসে রাত্রি ১০টায়। মায়া যেন বাঁধনের আসার’ই অপেক্ষায় ছিল। বাঁধন রুমে প্রবেশ করা মাত্র’ই খাবার টেবিলে খাবার পরিবেশনে ব্যস্ত হয়ে পরে মায়া।

টেবিলে খাবার দিয়ে মায়া বাঁধনের দিকে তাকালো। বাঁধনের দৃষ্টিও সেই সময় মায়ার দিকে ছিল। মায়ার ঐভাবে তাকানোর মানে, খাবার দিয়েছি টেবিলে, খেতে আসুন।
এটা বেশ বুঝতে পারে বাঁধন। তাইতো মায়ার থেকে সাথে সাথে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয় সে। বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে বাঁধন কিছুক্ষণ পর আড়চোখে মায়ার দিকে তাকাচ্ছিল। মায়া তখনো পূর্বের ন্যায় খাবার টেবিলে খাবার সামনে নিয়ে চুপটি করে বসে আছে।
“ওহ! তুমি তাহলে বোবার মত চোখে চোখেই কথা বলবে শুধু! মুখে আর বলবে না। বেশতো! আমি দেখতে চাই কতক্ষণ তুমি আমার সাথে কথা না বলে থাকতে পারো। কথাগুলো মনে মনে ভেবেই বাঁধন ওর রুমের লাইটটা অফ করে দেয়।”
মায়া অন্ধকার রুমের দিকে একবার তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে খাবারগুলো ঢেকে রেখে কিচেনের লাইটটা অফ করে রুমে প্রবেশ করে। নাহ! বাঁধনের রুমে নয়….
এ বাসায় আরো একটা রুম আছে। মায়া সেই ছোট্ট রুমটাতে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে দেয়। নিশ্চুপ থেকে বাঁধন সবটা লক্ষ্য করেছে কিন্তু মুখে কিছু বলেনি। কিছুক্ষণ ছটফট যন্ত্রণায় বিছানায় এপাশ ওপাশ করে একটা সময় ঘুমিয়ে যায় বাঁধন।
শেষ রাত্রে বিছানা থেকে উঠে বসে মায়া। প্রচন্ড ক্ষিদের জ্বালায় ভেতরটা শেষ হয়ে যাচ্ছে ওর। হাতমুখ ধুয়ে টেবিলে ঢেকে রাখা খাবারগুলো মেলে মুখে দিতে গিয়ে থেমে যায় মায়া।
” আমি ক্ষিদের জ্বালা সইতে পারছি না, ও কি করে আছে এতক্ষণ? আমি বাসায় বসে থেকেও এতটা ক্ষিদে পেয়েছে, আর ও তো সারাটা দিন অভুক্ত থেকে রোগীদের সাথে কথা বলেছে, ওদের বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দিয়েছে। আমার থেকে বেশী তো ওর ক্ষিদে পেয়েছে মনে হয়।”
সাত পাঁচ ভেবে খাবার টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় মায়া। উদ্দেশ্য বাঁধনের রুমের দরজায় কড়াঘাত। বাঁধন ডাকার জন্য দরজায় হাত দিতেই দরজা খুলে যায়। আসলে বাঁধন রাত্রিতে মেইন দরজাটা দিয়ে এই দরজা হালকা একটু মিশিয়ে রেখেছে, যাতে করে মায়া রুমে আসতে চাইলে খুব সহজেই ঢুকতে পারে। রুমের দরজাটা ক্ষাণিকটা ফাঁক করে রুমে প্রবেশ করে মায়া। লাইটটা অন করে বিছানার দিকে এগিয়ে গিয়ে আস্তে করে ডাক দেয় মায়া, শুনছেন? বাঁধন চোখ মেলে তাকাই।
মায়া ঢোক গিলে মাথা নিচু করে বলে, আমার না খুব ক্ষিদে পেয়েছে……
বাঁধন গম্ভীর মুখে বলে, ক্ষিদে পেয়েছে তো আমি কি করব? আমি কি তোমার খাবার ধরে রেখেছি?
এতটুকু কথাতেই কেল্লাফতে। বাঁধনের এই একটু কথা’ই অভিমানী মায়ার ভিতরে আঘাত করে। দু’চোখের লোনাজল ছেড়ে দিয়ে মায়া ছুটে বেরিয়ে যায় রুম থেকে। রুমের দরজা দিয়ে বালিশে মুখ গুজে গুমড়ে গুমড়ে কেঁদেছে মায়া। বেশকিছু ক্ষণ কাঁদার পর হঠাৎ করে কি মনে করে যেন মায়া চোখের জল মুছে চোখ মুখ শক্ত করে ফেলে। ধীরপায়ে রুম থেকে বের হয়ে টেবিল এবং ফ্রিজে রাখা খাবারগুলো গপাগপ করে দুটো ঝুড়িতে ফেলে দিয়ে আসে।

ফজর নামাজ পড়ে সকালের দিকে বিছানায় একটু গা এলিয়ে দিয়েছিল বাঁধন, হঠাৎ কোথা থেকে যেন একটা পোঁড়া গন্ধ ওর নাকে এসে ঠেকল। বিছানা থেকে উঠে বসল বাঁধন। কোথা থেকে আসছে এই গন্ধ?
কিছুক্ষণ নাক খাড়া ভালো ভাবে শুকে বুঝতে পেল গন্ধটা কিচের থেকেই আসছে।
সকাল সকাল কিচেন থেকে পোঁড়া গন্ধ? ভড়কে উঠে দৌঁড়ে যায় বাঁধন কিচেনের দিকে। কিচেনের বাইরে থেকেই বাঁধন মায়াকে কিচেনে দাঁড়িয়ে একমনে কি যে পোঁড়াতে দেখে। ধীর পায়ে বাঁধন মায়ার পাশে এসে দাঁড়ায়। “কি করছ কি? এভাবে ভালো ওড়নাটা কেন পুঁড়ছ?”
বাঁধনের প্রশ্ন শুনেও মাথা তুলে তাকায়নি মায়া। চুপচাপ আনমনে ওড়না পুঁড়িয়েই চলছে মায়া। বাঁধন বুঝতে সেদিন রাত্রের বলা কথাগুলোর পর যে অভিমানটা করেছিল, সে অভিমানটা এখনো মনে ঝেকে বসে আছে মায়ার। বাঁধন জানে এখন এই মেয়েকে কিছু বললে হিতে বিপরীত হবে।আর বাঁধন কথা না বাড়িয়ে মায়াকে ওড়না পোঁড়ানোর সুযোগ করে দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যায়। বাঁধন বাহিরে চলে যাওয়ার পর অর্ধ পোঁড়া ওড়নাটা ময়লা ফেলার ঝুড়িতে রেখে সেগুলো রাস্তার পাশে ফেলে দিয়ে আসে। ততক্ষণে বাঁধনও হাতে কয়টা পরোটা সবজিসহ প্যাক করে নিয়ে হাজির হয়। প্লেটে কয়টা পরোটা এবং সবজি দিয়ে বাঁধন মায়ার সামনে দিয়ে আসে। মায়া একবার পরোটা, আবার সোফায় বসে থাকা বাঁধনের দিকে তাকাচ্ছে। একমনে বাঁধন খেয়েই চলছে। খাওয়া শেষে আমি গেলাম, খেয়ে নিও বলে হসপিটালে চলে যায় বাঁধন।
হসপিটালে গিয়েও শান্তি পাচ্ছে না বাঁধন। কেমন যেন অস্বস্তিতে ভুগছে। ছটফট বাঁধন দুপুরের দিকে বাসায় চলে আসে। মায়া তখন ভাতের প্লেট নিয়ে বসছিল। বাঁধন একবার সেদিকে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে রুমের খাটে বসে পরল। বাঁধন লক্ষ করছে, মায়া কিছুক্ষণ পর পর প্লেটের দিকে হাত নিয়েও ফিরিয়ে আনছে। বাঁধনের দৃষ্টি ওর দিকে সেটা বুঝতে পেরে জোর করে অনেকটা বুকে সাহস নিয়ে তরকরী দিয়ে ভাত মাখানোর জন্য তরকারী হাত রাখে মায়া। বাঁধন বসা থেকে উঠে শার্ট আর গেঞ্জিটা খুলে কেবল দাঁড়ালো, তখনি মায়ার একটা চিৎকার শুনা যায়। ওহ বলে চোখ বন্ধ করে ফেলে মায়া। বাঁধন সেই অবস্থায়’ই দৌঁড়ে মায়ার কাছে গিয়ে হাতটা ধরে ফেলে।
” এত গরম ভাত খাইতে কে বলছে?”
কথাটা বলেই বাঁধন মায়ার হাতের দিকে তাকাতেই চমকে উঠে। একি! হাত কাটছ কিভাবে?”
জবাবে মায়া কিছুই বলে না।
কাটা হাত, ব্যান্ডেজ না করে ভাত নিয়ে বসে পরেছ। কেন? আমায় বাসায় আসছি দেখো নি তুমি? একবার আমাকে বললেই তো হতো। মায়া কিছু না বলে একঝটকায় বাঁধনের মুঠো থেকে ওর হাতটা ছাড়িয়ে রুম থেকে ফোনটা কানে নিয়ে আলমারির উপর থেকে গেইটের চাবিটা নিয়ে কার সাথে কথা বলতে বলতে যেন নিচে চলে যায়।

মিনিট পাঁচেক পর মায়া ফিরে আসে। তবে সে একা নই। সাথে আছে ওর শ্বশুর শাশুড়ি।

বাঁধন কিছুটা ঘোরের মধ্যেই বাবা মাকে সালাম জানাই। অতঃপর অবাক বিস্ময়ে প্রশ্ন করে বাবা মাকে, মা- বাবা! তোমরা?!!
আসলে কাল রাত্রিতে কল দিয়েছিলাম তোর শ্বশুর বাড়িতে। মায়ার জন্য খারাপ লাগছিল, ভাবলাম একটু কথা বলি। কিন্তু পরে জানতে পারলাম, ও তোর কাছে। তাই সকাল সকাল রওয়ানা দিয়ে দিলাম। বাঁধন হাসোজ্জ্বল মুখে বলে, ভালো হয়েছে এসেছ। কয়টা দিন বউ শ্বাশুড়ি মিলে চুটিয়ে আড্ডা দিবা। বাঁধনের কথার জবাবে মুখটা মলিন করে বাঁধনের মা বলে, তা আর পারলাম কই? মায়ার নাকি পরীক্ষা। ও আজই বাড়িতে চলে যেতে চাচ্ছে। আমায় বারবার রিকোয়েস্ট করছে, যাতে নিয়ে দিয়ে আসি। তোর হসপিটাল আছে, তাই তোকে বলেনি।
বাঁধন এক নজর মায়ার দিকে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নেয়। “ওহ! কথা বার্তা পাকা করে ফেলেছে তাহলে।”

আচ্ছা, পরেরটা পরে। এখন ফ্রেশ হয়ে রেস্ট নাও, কথাটা বলে বাঁধন ছাদে চলে গেল।

এমনি বয়স হয়েছে, তারউপর জার্নি করে ক্লান্ত শরীর। সেদিন আর যাওয়া হয়নি মায়ার। পরদিন বাঁধন চেম্বারে চলে যাওয়ার পর পাগলের মত হয়ে যায় মায়া। শাশুড়ির কানের কাছে গিয়ে বার বার প্যানপ্যান করতে থাকে কখন বাসায় যাব মা? এভাবে হেলায় দিন কাটালে আমি যে পরীক্ষায় ফেল করব। মা, প্লিজ আমায় দিয়ে আসুন না হয় টিকিট কেটে দিন। আমিই যেতে পারব। বাধ্য শাশুড়ি একমাত্র আদরের বউমার কথায় রাজি হয়। সেদিনই মায়া ওর শাশুড়ির সাথে বাবার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে বাঁধন ওর বাবার থেকে জানতে পারে মায়া ওর মাকে পটিয়ে নিয়ে গেছে বাপের বাড়ি।
ও কি সেদিন রাত্রের ব্যবহারে আমায় ভুল বুঝছে?
বাঁধনের ভিতরটা অজানা আশঙ্কায় মুচড় দিয়ে উঠে। সন্ধ্যার একটু পরই কল করে বাঁধন ওর মাকে। ওর মায়ের থেকে জানতে পারে, এই মাত্রই ওরা ভালো ভাবে বাসায় পৌঁছে’ছে…….

চলবে……

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here