ভুল এবং ভালোবাসা পর্ব:- ১৮

ভুল এবং ভালোবাসা
পর্ব:- ১৮
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

ফোনটা কেটে বন্ধ করে টেবিলে মাথা রেখে নিঃশব্দে কেঁদে উঠে লাবণ্য। মাথার নিচে খোলা বইয়ের পাতাগুলো একটু একটু করে ভিঁজে একাকার হয়ে যাচ্ছে লাবণ্যর চোখে জলে। গোসল সেরে রুমে আসে শিশির। এই অসময়ে ভাবিকে এভাবে টেবিলে ঝিমুতে দেখে ভাবির পাশে গিয়ে দাঁড়ায় শিশির।
” ভাবি তোমার শরীর খারাপ?”
চমকে উঠে মাথা তুলে তাকাই লাবণ্য। শিশিরকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে চোখের জলটুকু মুছে নেয় সে। শিশির ওর ভাবির মুখটা ওর দিকে ফিরিয়ে নেয়। অবাক বিস্ময়ে প্রশ্ন করে, সেকি! তোমার চোখে জল? তুমি কাঁদছ ভাবি?!!! কান্না লুকিয়ে লাবণ্যর জবাব, কই! না তো। আসলে চোখে কি যেন পরছিল তাই…..(….)…..????
তাই চোখ থেকে গড়িয়ে অশ্রু পরছে। আর সেই সব অশ্রুকণা দিয়ে বইয়ের পাতা ভিঁজে একাকার, সাথে চোখ দুটোও ফুলে তালগাছ হয়ে গেছে। এইসব তুমি বললে, আর আমি বিশ্বাস করে নিব তাই না?
লাবণ্য শিশিরের গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়। লাবণ্যর চোখ থেকে এখনো একটু একটু করে অশ্রু ঝরছে। শিশির সেটা লক্ষ করেছে। আর তাইতো লাবণ্যর মুখটা ওর দিকে ফিরিয়ে নেই আবারো। দু’গাল গড়িয়ে পরা জলটুকু মুছে দিয়ে প্রশ্ন করে, কি হয়েছে তোমার? বলবা না আমাকে? আমাকে না তুমি তোমার বোনের মত দেখো। এই তার নমুনা? শিশিরের দিকে তাকিয়েই লাবণ্য কেঁদে দেয়। অনর্গল বলতে শুরু করে, আমি ওকে ভালোবাসি না, একদম না। আমি তো শুধু এমনিই দেখা করতে বলছিলাম। আর ও কি না মিটিমিটি হাসছিল আমার কথা শুনে। আচ্ছা, তুমিই বলো শিশির আমি কি জোকার? আমাকে কি তোমার জোকার মনে হয়? শিশির টেবিলে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, নাহ! একদম না। আমার ভাবি কেন জোকার হবে? জোকার তো ঐ ব্যাটা যে আমার ভাবিকে জোকার বলে। কাঁদায়। লাবণ্য টেবিল থেকে উঠে গিয়ে গম্ভীর হয়ে খাটে বসে। লাবণ্যর ঠিক পাশে গিয়ে শিশিরও বসে। শিশির মুচকি হেসে বলে, তারপর কি হয়েছে ভাবি? লাবণ্য কিছু একটা বলতে গিয়ে শিশিরের দিকে তাকিয়ে দেখে সেও হাসছে। মেজাজটা চরম পর্যায়ে উঠে যায় ওর। রাগে অভিমানে রুম ত্যাগ করে ও। লাবণ্য চলে যাওয়ার পর ভাইকে কল দেয় শিশির। ভাই বোনে মিলে অট্টহাসিতে মেতে উঠে।

হুহ, আমাকে কি মনে করে? ছেঁড়া পলিথিন? আমার কোনো’ই মূল্য নেই? সব মূল্য শুধু ওনার’ই? হুহ! খুব প্রায়োরিটি দেই তো, তাই এতো উপরে উঠে গেছে। উপর থেকে যে কিভাবে নামাতে হয় সেটা আমি জানি। কল দিব না আর ওকে। এই ফোনটা অফ করে আলমারিতে রাখলাম। আগামী ৩০দিনে ফোন হাতে নিব না।
মনে মনে জটিল প্রতিজ্ঞা করে লাবণ্য নিজেই নিজের সাথে। ফোনটা আলমারিতে রাখছে বিকেল ৫টা নাগাদ। এখন ৬টা বেজে ১৯মিনিট। এরই ভিতর বার কয়েক আলমারির কাছে গিয়েও কি মনে করে যেন ফিরে এসেছে লাবণ্য।
সন্ধ্যা ৭টা। খুলবে না খুলবে না করেও অবশেষে খুলেই ফেলে আলমারিটা। ফোন হাতে নিয়ে ওপেন করে চাতকের ন্যায় ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে লাবণ্য। কিন্তু কোনো কল বা এসএমএস আসেনি। ফোনটা বন্ধ করে আবারো আলমারির ভিতর রেখে দেয়। এবার মনে মনে এই বলে রাখে, যত যায় হোক ফোনে আর হাত দিবে না। ফোন আলমারিতে রেখে কিছুক্ষণ পর পর দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে লাবণ্য। কোনো রকম ২০মিনিট চুপসে থেকে সন্ধ্যে ৭টা ২১মিনিটে আলমারিটা আবারো খুলে। ফোনে হাত দিবে না দিবে না করেও দিয়ে ফেলে। তারপর ওপেন করে হাতে নিয়ে চাতকের ন্যায় একটা ফোন কলের আশায় বসে আছে। রাত্রি ১১টা। শুভ্রর ফোনটা বেজে উঠে। ভাব নিয়ে হ্যালো বলে শুভ্রর প্রশ্ন- কিছু বলবে? নরম স্বরে লাবণ্যর জবাব, খুব বিজি?
— সেরকম বিজি না।
লাবণ্য এবার কিছুটা উঁচু কন্ঠে বলে, কালকে কয়টায় হসপিটালে যাবেন? শুভ্র ভেবে বলে, প্রতিদিনই তো ৯টায় যায়, কিন্তু কালকে একটু জলদিই যেতে হবে। একটু দরকার আছে। লাবণ্য একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, তারপর কখন ফ্রি হবেন? শুভ্র কোনো রকম হাসি থামিয়ে বলে, ফ্রি বলতে লাঞ্চ টাইমে যতটুকু সময় পাই আর কি।
এবার কন্ঠ কিছুটা নীচু করে লাবণ্যর প্রশ্ন, রাত্রিতে তো আপনি ফ্রি’ই থাকেন। আমি রাত্রে আপনার সাথে দেখা করতে চাই যদি আপনি চান….
– আচ্ছা, ঠিক আছে। তোমার কষ্ট করতে হবে না। আপনি আসব কালকে। তুমি প্রস্তুত থেকো। পরে কথা হবে। এখন রাখি। টেইক কেয়ার। শুভ রাত্রি।
কল কেটে দিয়ে শুভ্র হো, হো করে হেসে উঠল। হাসি দেখে মনে হবে যেন বিশ্বজয় করে ফেলেছে সে।
বিছানার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে গড়াগড়ি করতে করতে বালিশ বুকে নিয়ে একটা সময় ঘুমিয়ে পরে শুভ্র।

পরদিন__
লাবণ্যর সময় যেন কাটছে’ই না। কখন রাত্রি হবে, আর কখন শুভ্র আসবে। ওর শুভ্রকে নিয়ে ঘুরতে যাবে। সারাটা দিন বহুকষ্টে কাটল লাবণ্যর। কখনো খাটে বসে, কখনো শুয়ে, কখনো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে, কখনো বারান্দায় গিয়ে, কখনো ছাদে, কখনো বা টিভির সামনে বসে থেকে। সারাটা দিন এভাবেই কাটল লাবণ্যর। সন্ধ্যে ৮টা নাগাদ লাবণ্যকে নেওয়ার জন্য এ বাসায় আসে শুভ্র। বাসায় এসে মায়ের সাথে কথা বলে যা বুঝতে পারল সেটা হলো, এই রাত্রের বেলা মা কিছুতেই ওর সঙ্গে লাবণ্যকে দিবে না। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে যেটা সেটা হলো, রোকসানা বেগম এখনো ছেলের প্রতি প্রচন্ড রেগে। আচ্ছা, ঠিক আছে। তোমার মেয়ে, আই মিন তোমার বান্ধবীর মেয়েকে তুমি সারাজীবন এভাবেই ঘরে বসিয়ে রেখো। অনেকটা রাগ দেখিয়ে মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে উপরে শিশিরের রুমের দিকে পা বাড়াই শুভ্র। রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নক করে শুভ্র, আসতে পারি? ভিতর থেকে শিশিরের জবাব, এখানে এসে কি করবি? ছাদে চলে যা। ছাদে পাবি তোর মানুষকে…..

শুভ্র আর কোনো কথা না বলেই ছাদের দিকে পা বাড়াই। ছাদে পা দিতেই শুভ্রর মাথা ঘুরার উপক্রম। গোলাপী কালার শাড়ি পরিহিত, হাতে সেইম কালার চুড়ি, আর খোলা চুলে এক অপূর্ব সুন্দরী রমনী ছাদের এককোণে দাঁড়িয়ে। এহেম কাশি দিতেই পিছু ফিরে সুন্দরী রমনী। এ যে আর কেউ নয়। তারই লাবণ্য। চোখ ফেরাতে পারছে না ওর থেকে শুভ্র। শুভ্রর এমন পলকহীনভাবে তাকিয়ে থাকায় কিছুটা লজ্জা পেয়ে যায় লাবণ্য। আমতা আমতা করে বলে,
” ইয়ে মানে ঘুরতে যাব ভাবছিলাম তো, তাই…….. (…..)….???
ঘোর কাটে শুভ্রর। মুচকি হেসে জবাব দেয়, শুধু কি ঘুরতে যাওয়ার জন্য’ই এ সাজ নাকি এর পিছনে বড় কোনো কারন আছে?
লাবণ্যর মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে যায়। তুতলিয়ে তুতলিয়ে বলে, কা কা কারন?
শুভ্র কোনো রকম হাসি থামিয়ে বলে, হুম কা কা কারন কি? শুভ্রর কথায় লাবণ্য লজ্জা পেয়ে যায়। নাক মুখের ঘাম মুছতে মুছতে বলে আসলে শাঁড়িতে অভ্যস্ত নেই তো তাই….(…..)…..???
হা, হা। জীবনভর শুনে এসেছি শাঁড়িতে অভ্যস্ত না থাকলে মেয়েরা হোচট খেয়ে পরে যায়, প্যাঁচ লেগে পরে যায়। আজ এও শুনার ছিল? শাঁড়িতে অভ্যস্ত নাই বিধায় তুতল্লাচ্ছে। সাথে চোখ মুখ ফ্যাকাশেও হয়ে গেছে। থ্যাংক্স গড! আমাকে এখানে আসার তৌফিক দান করার জন্য। নতুন একটা অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। কথাগুলো বলে শুভ্র হাসছে, আর লাবণ্য লজ্জায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। শুভ্র হাসি থামিয়ে লাবণ্যর কাছে যায়। তারপর ছোট্ট করে বলে, স্যরি! মজা করলাম একটু।
লাবণ্য তখনো কোনো কথা না বলে নিচের দিকে তাকিয়ে চুপসে দাঁড়িয়ে আছে। নিরবতা ভাঙার জন্য শুভ্র লাবণ্যের কানের খুব কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে আস্তে করে বলে, tnx a lot….
মাথা তুলে তাকাই লাবণ্য। কাঁপা স্বরে প্রশ্ন করে, কিসের থ্যাংক্স? শুভ্র মুচকি হেসে বলে, এই যে ঘুরতে যাওয়ার বাহানায় আমার জন্য শাঁড়িটা পরছ…..!!!!
লজ্জায় লাবণ্যর মুখ থেকে কথা সরছে না। এভাবে এত তাড়াতাড়ি ও ধরা খেয়ে যাবে বুঝতে পারেনি। যে লজ্জার হাত থেকে বাঁচার জন্য ঘুরতে যাওয়ার মিথ্যে অজুহাত দেখিয়েছিল ও, সেই লজ্জাটাই পেয়ে গেল। লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে লাবণ্যর।
তোমার ঠোঁটগুলো খুব সুন্দর, আরো বেশী সুন্দর দেখায় যখন তুমি লজ্জা পাও। লাবণ্য! তুমি কি জানো তুমি লজ্জা পেলে তোমার নাক ঘামে, ঠোঁটগুলো কাঁপে। লাবণ্য যেন শুভ্রর বলা এক একটা কথায় লজ্জাবতী পাতার মতই একটু একটু করে চুপসে যাচ্ছে। লাবণ্যর সেই করুণ অবস্থার সুযোগটাই নিয়েছে শুভ্র। বার বার শুভ্র লাবণ্যকে একেক কথা দ্বারা খোঁচা দিচ্ছে। লাবণ্য না পারছে সেখান থেকে যেতে, না পারছে কিছু বলতে।
আচমকা শুভ্র লাবণ্যর একটা হাত ধরে ফেলে। কাঁপা দৃষ্টিতে লাবণ্য শুভ্রর দিকে তাকাই। শুভ্র মুচকি হেসে বলে, আমার সাথে রাগ করে হাতের আঙুল কি ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছ নাকি?
ইয়ে, না, মানে আসলে….. আমি তো…..(….)……????

শুভ্র একগাল হেসে বলে, বুঝতে পারছি ইয়ে না মানে তুমি আসলে আমার কথায় লজ্জা পেয়েছ। আর তাই বোবার মত চুপসে শুধু একহাত দিয়ে আরেক হাতের আঙুল মুচড়াচ্ছিলে। তাই না?
লাবণ্য কোনো কথা না বলে নিরব থাকে।
নিরব দৃষ্টিতে ছাদের কর্ণারে দাঁড়িয়ে দুর, বহুদুর তাকিয়ে আছে। শুভ্র মুচকি হেসে লাবণ্যর পাশে দাঁড়িয়ে একটা হাত দিয়ে ওকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে।

চলবে…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here